অনিল করঞ্জাই

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
১৯৮৫ সালে অঙ্কিত আত্মপ্রতিকৃতি

অনিল করঞ্জাই (২৭ জুন ১৯৪০ – ১৮ মার্চ ২০০১) ভারতবর্ষের একজন খ্যাতনামা বাঙালি চিত্রশিল্পী যিনি হাংরি আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলায় প্রথম পোস্টার কবিতার প্রচলন করেন।

জীবনী[সম্পাদনা]

অনিল করঞ্জাই অবিভক্ত বঙ্গের রংপুরে (বর্তমান বাংলাদেশ০ জন্মগ্রহণ করেন। রংপুরে মৃত্তিকার পাড়ায় শৈশব অতিবাহিত করায় তিনি মাটির মূর্তি গড়ায় ছোটবেলা থেকেই আগ্রহী হন। দেশভাগের ফলে ১৯৪৭ সালে তঁদের পরিবার ভারতবর্ষে বিভিন্ন অঞ্চলে জীবিকার সন্ধানে ঘোরাঘুরির পর বেনারসের বাঙালিটোলায় থিতু হয়। অত্যধিক দারিদ্রের কারণে ম্যাট্রিক পাশ করার পর তিনি আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা ছেড়ে ১৯৫৬ সালে প্রখ্যাত শিল্পী কর্ণমান সিংহের অধীনে ভারতীয় কলা কেন্দ্রে ভাস্কর্য শেখার বৃত্তি নিয়ে ১৯৫৯ পর্যন্ত ছাত্র ছিলেন। কিন্তু ক্রমশ তিনি ছবি আঁকায় আগ্রহী হন এবং ১৯৬০ সালে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারত কলা ভবনে মিনিয়েচার পেইনটিঙ শেখার ক্লাসে ভর্তি হন। বেনারসে ছিত্রশিল্পী করুণানিধান মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়, এবং আরও কয়েকজন চিত্রশিল্পীর সঙ্গে মিলিত হয়ে 'গেরিলা পেইনটার্স' নামে একটি গোষ্ঙী গড়ে তোলেন। বাঙালিটোলায় তাদের স্টুডিওর পত্তন হয় এবং স্হানীয় প্যারাডাইস কেফেকে তারা চিত্র প্রদর্শনীর গ্যালারিরূপে ব্যবহার আরম্ভ করেন। তার আগে বেনারে কোনো গ্যালারি ছিল না।

হাংরি আন্দোলন[সম্পাদনা]

১৯৬৩ সালে কলকাতায় অনিল করঞ্জাই ও করুণানিধান মুখোপাধ্যাবের সঙ্গে হাংরি আন্দোলন -এর স্রস্টা মলয় রায়চৌধুরীর পরিচয় হয়। হাংরি আন্দোলন এর ভাবতত্ব, কর্মকাণ্ড ও তৎসম্পর্কিত সংবাদ তাদের দুজনকে আকৃষ্ট করে এবং তারা হাংরি আন্দোলন এ যোগ দেন। আন্দোলনের প্রয়োজনমত তারা দুঃস্বপ্নময় পোস্টার ও প্রচ্ছদ আঁকা শুরু করেন এবং তা দ্রুত সাড়া ফ্যালে। অনিলের আঁকা কবিতা পোস্টারগুলি ছিল বাংলা সাহিত্যে প্রথম কবিতা-পোস্টার। গেরিলা পেইনটার্সের স্টুডিওয় বাঙালিটোলার হিপি-তরুণী অধ্যুষিত এলাকায় হাংরি আন্দোলনকারীদের যৌনতা ও মাদকের কর্মকাণ্ড সংবাদ মাধ্যমের দৌলতে কিম্বদন্তিতে পরিণত হয়। ১৯৬৫ সালে নেপাল সরকারের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা বাসু শশির আমন্ত্রণে আন্যান্য আন্দোলনকারীসহ অনিলও কাঠমাণ্ডু যান এবং সেখানে নিজের পেইনটিঙের প্রদর্শনী করেন। প্রদর্শনীর শেষে করুণানিধান নিজের পেইনটিঙগুলি পুড়িয়ে দেয়ায় তা সেখানের সংবাদপত্রে বিশেষ আকর্ষণীয় ব্যাপার হয়ে ওঠে। হাংরি আন্দোলন-এর ছবি আঁকা সম্পর্কিত ৪৮ নম্বর ইশতাহারটি লিখেছিলেন অনিল করঞ্জাই ও করুণানিধান মুখোপাধ্যায়। হিন্দি ভাষায় তাদের দখল থাকায় ভারতবর্ষের মূল ভূখণ্ডে হাংরি আন্দোলনকে দ্রত ছড়িয়ে দিতে তারা সাহায্য করেন। এই সময় অনিল একজন মার্কিন হিপি মহিলাকে হিন্দু মতে বিবাহ করেন। ১৯৭২ সালে অনিল ললিতকলা অকাদেমি পুরস্কার পান।

আমেরিকা[সম্পাদনা]

১৯৬৫ সালে মামলা - মকদ্দমার দরুন হাংরি আন্দোলন ফুরিয়ে যায় এবং বামপন্হী আন্দোলন একটি ভিন্ন মাত্রায় দেখা দিলে অনিল করঞ্জাই ও করুণানিধান মুখোপাধ্যায় বামপন্হী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যোগ দেন। ষাট দশকের শেষে নকশাল আন্দোলন আরম্ভ হওয়ায় তারা দুজনে বৈপ্লবিক বামপন্হায় যোগ দেন; প্রশাসন তাদের বিরক্ত করা আরম্ভ করলে অনিল করঞ্জাই তার বিদেশিনী স্ত্রীকে নিয়ে দিল্লি এবং করুণানিধান মুখোপাধ্যাব পাটনায় চলে যান। দিল্লিতেও বামপন্হী আন্দোলন জওহারলাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কারণে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল। প্রশাসন অনিলকে সতর্ক করলে আনিলের স্ত্রী আতঙ্কিত হন এবং আনিলকে নিয়ে আমেরিকায় চলে যান। তার ছবি আঁকার নূতন দরজা খুলে যাবে, এই আশায় অনিল আমেরিকা যেতে রাজি হন। কিন্তু আমেরিকায় তার স্ত্রী নিজের পৈতৃক বাসা ওয়াশিংটন ডি সি শহরে থাকার নির্ণয় নিলে অনিল মুষড়ে পড়েন। তার স্ত্রী ওয়াশিংটন ডি সিতে ভালো চাকরি পাবার দরুন তাদের জীবনযাত্রা অনেক সহজ হয়ে ওঠে বটে তবে তা আনিলের পক্ষে সুখকর হয়নি। ওয়াশিংটন ডি সি শিল্পীদের শহর নয়। নিউ ইয়র্কে গিয়ে থাকার জন্য ওয়াশিংটন ডি সিতে অনিল কয়েকটি প্রদর্শনী করেন কিন্তু দারিদ্র ও দঃস্বপ্নময় তৈলচিত্রগুলি বেশি দাম পায় না। স্ত্রীকে বিবাহবিচ্ছেদ দিয়ে অনিল ভারতবর্ষে ফিরে আসেন।

নূতন উদ্যম[সম্পাদনা]

ভারতবর্ষে ফিরে আসার পর অনিল করঞ্জাই পুনরায় বামপন্হী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যোগ দেন এবং সেই সূত্রে তার সঙ্গে ব্রিটিশ গবেষক জুলিয়েট রেনোল্ডসের পরিচয় হয়। তারা বিবাহসূত্রে আবদ্ধ না হলেও একত্রে থাকতেন। আনিলকে নূতন উদ্যমে জীবন্ত করে তোলেন জুলিয়েট; সে সম্পর্ক তাদের আজীবন ছিল।জুলিয়েটের সংস্পর্শে অনিলের ছবিগুলি বিক্রয়যোগ্য হয়ে উঠতে পেরেছিল।অনিল যখন দেশে ফিরলেন তখন করুণানিধান মুখোপাধ্যায় পাটনা থেকে দিল্লিতে চলে এসেছিলেন। অনিলের মৃত্যুর পর অনিলের কাজের সংরক্ষণ এবং অনিল সম্পর্কে গবেষণার কাজ চালিয়ে গেছেন জুলিয়েট। অনিল দেশে ফেরার পর বামপন্হী সাংস্কৃতিক আন্দোলন তৃণমূল স্তর পর্যন্ত শিকড় বিস্তার করে ফেলেছিল; অনিল ও জুলিয়েট ভারতবর্ষের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে যেতেন এবং ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের লৌকিক ছবি আঁকার শৈলীর সঙ্গে পরিচিত হতেন। এই অভি্ঞ্জতা বিপুল পরিবর্তন এনেছিল আনিলের ছবি আঁকায় এবং লেখায়। শ্রীমতী রেনোল্ডস ছিলেন ভারতীয় ভাস্কর্য বিষেশজ্ঞ।

পুরস্কার[সম্পাদনা]

১৯৭২ সালে ললিতকলা অকাদেমি পুরস্কারসহ একাধিক পুরস্কারে সম্মানিত।

তথ্যচিত্র[সম্পাদনা]

  • The Nature of Anil Karanjai's Art. Directors: Anusuya Vaidya and Ajay Shetty. Producers: Sarega Productions and Doordarshan. (1995)

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • অনিল করঞ্জাই আলোচনাসমগ্র। সম্পাদক: সমীর রায়চৌধুরী। আলোচকগণ: জুলিয়েট রেনোল্ডস, কাঞ্চন মুখোপাধ্যায়, শান্ত দত্ত, সুনীত চোপড়া, পার্থপ্রতিম চট্টোপাধ্যায়, সুবিমল বসাকমলয় রায়চৌধুরী। হাওয়া ৪৯ প্রকাশনী, বাঁশদ্রোণী, কলকাতা ৭০০০৭০। (২০০২)
  • Nightmarish by Anil Sarai. Link, New Delhi (26 January 1973 ).
  • Anil Karanjai: Painting Modes of India By Ross Betty Jr. Washington Review of the Arts. Washington, USA. 1979.
  • Stat Debut by Jnyashwar Nadkarni. Debonair. Mumbai. March 1978
  • Karanjai's Works Show Freshness and Dynamism. The Times of India. Mumbai. March 9, 1978.
  • Forgotten Genres of Landscape by Shanto Datta. Indian Express. Mumbai. October 24, 1985.
  • Paintings of Disquiet by Parthapratim Chatterjee. The Economic Times. Mumbai. October 27, 1985.
  • The Door of Kusuma: A Painting by Anil Karanjay by Juliet Reynolds. NOW. New Delhi. 1985.
  • Journey Towards A Synthesis by Juliet Reynolds. Art Heritage. New Delhi. 1991.
  • Art As A Political Statement by Suneet Chopra. Frontline. Madras. 1998..

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]