মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা (ইংরেজি: Human resource management) একই সঙ্গে একটি অধ্যয়নের বিষয় ও ব্যবস্থাপনা কৌশল যা একটি প্রতিষ্ঠানের অভীষ্ঠ লক্ষ্যসমূহ অর্জনের জন্য আভ্যন্তরীক মানবসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির ওপর আলোকপাত করে। কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি আকৃষ্ট করা, আগ্রহীদের মধ্য থেকে যোগ্যদের খুঁজে বের করা ও নিয়োগ প্রদান, কর্মীদের অনুপ্রাণিত করা ও তাদের সাথে প্রতিষ্ঠানের সু-সম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের কর্মজীবনে উত্তরোত্তর উন্নয়নের পথ সৃষ্টি করা এবং প্রয়োজনে তাদের ছাঁটাই করাসহ প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ সম্পর্কিত সব ধরনের কাজই প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের কাজ। কিন্তু এর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যসমূহ অর্জন করা যার মধ্যে প্রধান চারটি হলো বিক্রয় ও রাজস্বআয় বৃদ্ধি, মুনাফা অর্জন ও বর্ধন, মার্কেট শেয়ার বৃদ্ধি এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি উন্নততর করণ। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়ে কাজ করার সময় মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগকে সেই দেশের শ্রম আইন ও কর্মসংস্থান আইন মেনে চলতে হয়। প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে যিনি থাকেন তাকে সচরাচর মানব সম্পদ ব্যবস্থাপক বলা হয়।

বিংশ শতাব্দির শুরুর দিকে সারা বিশ্বে শিল্প বিপ্লব শুরু হলে তুমুল প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের দিয়ে অবৈধভাবে কাজ করিয়ে নেয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। এবং এর ফলে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিতে থাকে। মূলত এই শ্রমিক অসন্তোষের ফলেই মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা ধারণার জন্ম হয়।[১] তৎকালীন সময়ে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার কাজ ছিল শ্রমিকদের কর্ম-ঘণ্টার হিসাব রাখা এবং তাদের যথোপযুক্ত পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রয়োজনের তাগিদে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার পরিধি অনেক বিস্তৃত হয়েছে। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রথাগত পারসোনেল ম্যানেজমেণ্ট থেকে পৃথক।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

বিংশ শতাব্দির শুরুর দিকে মানব সম্পদ ব্যাবস্থাপনার শুরু হয়েছিল মূলত ফেড্রিক টেইলরের বৈজ্ঞানিক ব্যাবস্থাপনা তত্ব থেকে। বৈজ্ঞানিক ব্যাবস্থাপনা মূলত উৎপাদনে প্রক্রিয়ার কার্যকারীতা, দক্ষতা এবং মিতব্যাযয়িতা আনয়ন করেছিল। এই বৈজ্ঞানিক ব্যাবস্থাপনাকে প্রায়োগিক করার জন্য এর আরো একটি উন্নত তত্বের প্রয়োজন ছিল যা মানব সম্পর্ক বিজ্ঞান বা হিউম্যান রিলেশন সায়েন্স নামে পরিচীতি পায়। পরবর্তীতে এই মানব সম্পর্ক বিজ্ঞানই মানব সম্পদ ব্যাবস্থাপনার রুপ নেয়।
মানব সম্পর্ক বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এলটন মেয়ো বিংশ শতাব্দির মাঝামঝি সময়ে এসে দেখান যে কেমন করে মজুরি এবং শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যাবস্থা ত্বরান্বিত করে এবং শ্রমিকদের আরোও বেশি উৎপাদনে প্ররণা যোগায়। এছাড়াও ম্যাক্স ভাইবার, অ্যাব্রহাম মাসলো, হার্জবার্গ এবং ডেভিড ম্যাকক্লিল্যান্ড প্রমুখ ব্যাবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক তত্বের জন্য একটি সুস্পষ্ট ভিত্তি দাঁড় করান।

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বনাম জনপ্রশাসন[সম্পাদনা]

আধুনিক মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার ধারণা প্রচলিত জনপ্রশাসনের ধারণার বিচেনায় কার্যত প্রায় অভিন্ন কিন্তু উদ্দেশ্যগতভাবে পৃথক। জনপ্রশাসন একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়া। আর মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য হলো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিল করা।

মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার সূত্রবলী[সম্পাদনা]

প্রেষণা[সম্পাদনা]

প্রেষণা হলো শ্রমিক-কর্মচারীকে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে কর্মে উদ্দীপ্ত করা। যে কোনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের চারটি উদ্দেশ্য থাকে যথা: বিক্রয় তথা রাজস্ব বৃদ্ধি, মুনাফা বৃদ্ধি, বাজার বৃদ্ধি এবং গুডউইল বৃদ্ধি। শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্তরিকভাবে সক্রিয় না হলে এই উদ্দেশ্যাবলী আদায় হবে না। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা শাস্ত্রের অন্যতম লক্ষ্য হলো কীভাবে শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যানুযায়ী কাজে ব্যাপৃত করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করা। অ্যাব্রাহাম মাসলো বলেছেন মানুষের অনেক চাহিদা থাকে। এই সব চাহিদা পূরণ করা হলে মানুষ কাজে উদ্দীপ্ত হয়। তিনি মানুষের সকল চাহিদাকে ৫টি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। তিনি বলেছেন, এই পাঁচ প্রকার চাহিদা একটি নির্দিষ্ট ক্রমে কার্যকর হয়। সর্ব প্রথমে জৈবিক চাহিদাগুলো সক্রিয় থাকে। সুতরাং প্রেষণার প্রথম ধাপ হবে এই সব জৈবিক চাহিদা পূরণ করা। লো হলো: আহার, বাস্থান এবং লজ্জানিবারণের পোষাকআশাক। পরবর্তীতে যৌনতৃপ্তিকে এই পর্যায়ে অন্তুর্ভুক্ত করা হয়েছে। চাহিদার দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে নিরাপত্তর চাহিদা। জৈবিক চাহিদা পূরণ হওয়ার পর নিরাপত্তার চাহিদা সক্রিয় হয়। জৈবিক চাহিদাগ ও নিরাপত্তার চাহিদা - এই দুটি স্তরের পর ক্রমান্বয়ে সক্রিয় হয় সামাজি চাহিদা, মর্যাদার চাহিতা এবং আত্মোচরিতার্থতার চাহিদা। মাসলোর মতে নিম্নতর চাহিদা পূরণ না হলে উচ্চতর চাহিদা সক্রিয় হয় না। আবার একটি চাহিদা সর্বাংশে মিটে গেলে তা আর প্রেষণা সৃষ্টি করতে পারে না। মাসলোর তত্ত্বটি তাৎপর্যময় কিন্তু গবেষণা দিয়ে এটিকে প্রতিপন্ন করা কঠিন। তবে মাসলো যা উল্লেখ করেন নি তা হলো এই যে কর্মের ধরণ এবং প্রতিষ্ঠানের কর্ম পরিবেশ শ্রমিক-কর্মচারীর প্রেষণা ব্যাপকভাবে প্রভাবান্বিত করে থাকে। এই বিষয়টি হার্জবার্গ তাঁর তত্ত্বে উপস্থাপন করেছেন।

প্রশিক্ষণ ও প্রোফেশনাল উন্নয়ন[সম্পাদনা]

মজুরি ও পারিতোষিক[সম্পাদনা]

কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন[সম্পাদনা]

কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা[সম্পাদনা]

কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বা স্ট্র্যাটিজিক হিউম্যনা রিসৌর্স ম্যানেজমেন্ট (Strategic Human Resource Management - SHRM) একটি নবতর ধারণা যার লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়-কৌশল অনুযায়ী মানব সম্পদ আহরণ, উন্নয়ন এবং ব্যবস্থাপনা। কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তাত্ত্বিকদের অবস্থান এখনো সুপরিষ্কার নয়। কৌশলগত মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা দাবী করে যে ব্যবসায় কৌশল এবং মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা পারস্পরিকভাবে যুক্ত।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Human Resource Management by Robert L. Mathis & John L. Jackson, ISBN- 10:0-538-45315-8