ফিরোজ শাহ তুঘলক

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ফিরোজ শাহ তুঘলক
দিল্লির সুলতান
রাজত্বকাল ১৩৫১-১৩৮৮
জন্ম ১৩০৯
মৃত্যু ২০ সেপ্টেম্বর ১৩৮৮
সমাধিস্থল হৌজ খা কমপ্লেক্স, দিল্লি
পূর্বসূরি মোহাম্মদ বিন তুঘলক
উত্তরসূরি গিয়াস উদ দিন তুঘলক দ্বিতীয়
রাজবংশ তুঘলক রাজবংশ
মাতা দীপালপূরের হিন্দু রাজকন্যা
ধর্মবিশ্বাস ইসলাম

সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক (ফার্সি: فیروز شاہ تغلق, হিন্দি: फ़िरोज़ शाह तुग़लक़; জন্ম: ১৩০৯- মৃত্যু: ২০শে সেপ্টেম্বর ১৩৮৮) তুঘলক রাজবংশের একজন শাষক যিনি মোহাম্মদ বিন তুঘলকের মৃত্যুর পর ১৩৫১ সালে দিল্লির শিংহাসনে আরোহন করেন এবং ১৩৮৮ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকেন।[১] তার মা ছিলেন দীপালপূরের একজন হিন্দু রাজকন্যা এবং পিতার নাম ছিলো রজব যিনি গিয়াস উদ দিন তুঘলকের ছোট ভাই এবং দীপালপুরের সিপাহসাহলার ছিলেন।[২] সুলতান মোহাম্মদ বিন তুঘলক অসুস্থাবস্থান মৃত্যুবরন করলে ১৩৫১ সালে তিনি ক্ষমতায় আসীন হন। তার ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পূর্বেই তার সম্রাজ্যে অস্থিরতা ছড়িয়ে পরে তাই তার ভাতিজার চেয়ে তার সম্রাজ্য অনেকটাই ছোট ছিল। তার রাজত্বকালে তিনি বাংলাকে আপাতঃ স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হন।

শাষন ব্যাবস্থা[সম্পাদনা]

১৮০২ সালে ধ্বংশপ্রাপ্ত ফিরোজাবাদ শহরের পশিম গেট। এই স্থানটি বর্তমানে ফিরোজ শাহ কোটলা নামে পরিচীত

মোহাম্মদ বিন তুঘলকের মৃত্যুর পর তার চাচা ফিরোজ শাহ তুঘলক ১৩৫১ থেকে ১৩৮৮ সাল পর্যন্ত দিল্লির সুলতান ছিলেন। সিংহাসনে আরোহনের পর তিন বাংলা, গুজরাট এবং অন্যান্য স্থান হতে বিভিন্ন সময়ে বিদ্রোহের শিকার হন। তার পরেও তিনি তার রাজ্যের ক্যানেল এবং অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে মনোযোগ দেন। তিনি ভ্রমণকারীদের জন্য বিশ্রামাগার, হাসপাতাল ও পানির চাহিদা মেটানোর জন্য কূপ খনন করেন। তিনি জয়পুর, ফিরোজপুর এবং হিসার-ফিরোজ সহ বিভিন্ন শহরের গোড়াপত্তন করেন। ১৩৫০ সালে দিল্লির কাছে একটি শহর প্রতিষ্ঠা করেন যার নাম হয় ফিরোজাবাদ।

অবকাঠামো ও শিক্ষা ব্যাবস্থা[সম্পাদনা]

দিল্লিতে অবস্থিত কুতুব মিনার যা ফিরোজ শাহ তুঘলক ১৩৬৮ সালে পূনর্নিমান করেন
দিল্লিতে একটি মাদরাসা সংলগ্ন ফিরোজ শাহের মাজার।

ফিরোজ শাহ তুঘলক তার রাজ্য তথা প্রজাদের প্রকৃত উন্নয়নের লক্ষে অর্থনৈতিক উন্নয়নের রুপরেখা নির্ধারন করেন। তিনি জনগনের কাছে শিক্ষা পৌছে দেওয়ার জন্য অনেক মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি গরীব প্রজাদের চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য অনেক হাসপাতাল স্থাপন করেন। এছাড়াও তিনি ডাক্তারদের ইউনানি চিকিৎসা ব্যাবস্থা উন্নত করার জন্য উৎসাহ দিতেন[৩]। কন্যা দায়গ্রস্থ পরিবারগুলোকে তিনি অর্থসহযোগিতা করতেন। তার শাষন আমলেই তিনি দিল্লিতে বিভিন্ন সরকারী কাজকর্ম ও রাজ প্রশাষনের কাজ পরিচালনার জন্য বড় বড় সরকারী দালান ও অবকাঠামো নির্মান করান। তার আমলেই দিল্লির আশেপাশে প্রায় ৩০০ গ্রামের গড়াপত্তন করা হয় এবং পাঁচটি বড় ক্যানেল খনন করা হয়, এতে করে সেচের সুবিধা হওয়ায় আবাদি জমির পরিমান বেড়ে যায় এবং অধিক জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা মেটাতে যথেষ্ট ছিল। শাষন কার্য পরিচালনার জন্য সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক মালিক মকবুলের উপর অতিমাত্রায় ভরসা করতেন। মালিক মকবুল একসময় ওয়ারেংগেল ফোর্টের সেনাপতি ছিলেন এবং সুলতান কতৃক ধৃত হন এবং পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন[৪]। শোনা যায় যে সুলতান একবার সিন্ধ ও গুজরাট অভিযানে যাওয়ার ছয় মাস পরও কোন খোজ খবর পাওয়া না গেলে মালিক মকবুল একাই সক্ষমভাবে দিল্লির সালতানাতের সুরক্ষা করেছিলেন[৫]। ফিরোজ শাহ তুঘলক মালিক মকবুলকে ভাই বলে ডাকতেন এবং তাকে খান-ই-জাহান উপাধি দেন[৬]

আধুনিকায়ন[সম্পাদনা]

সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক তার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ বিন তুঘলকের রাজ্য পরিচালনা থেকেই অনেক কিছু শিখেছিলেন। সিংহাসনে আরোহন করে তিনি রাজ্যের হারানো অংশগুলো পূনরূদ্ধারের কোন চেষ্টাই করেন নি, বরং তার বদলে যতটুকু তার রাজ্যের অধীনে ছিল ততটুকুই ভালভাবে শাষন করার চেষ্টা করে যান। তার সম্রাজ্যের বিদ্রোহিদের বিরূদ্ধেও ব্যাবস্থা গ্রহন বন্ধ রাখেন কারন সমস্ত বিদ্রোহীই তার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ বিন তুঘলকের আমলে জন্ম নেয় এবং তিনি নতুন করে এগুলোকে উষ্কে দিতে চান নি। তিনি তার রাজ্যে পিতার বদলে পুত্র প্রথা চালু করেন। সেনাবাহিনী কিংবা রাজকার্য যেখানেই হোক পিতা যদি উপস্থিত না হতে পারতেন তাহলে পুত্রকে পাঠিয়ে দেওয়া যেত। তিনি সরকারী কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি করেন এবং হাত কেটে ফেলা, গর্দান নেওয়া সহ সমস্ত প্রকার কঠোর শাস্তি দেওয়া বন্ধ করেন। এছাড়াও তিনি মোহাম্মদ বিন তুঘলকের আমলে আরোপিত ভূমির উপর অতিরিক্ত কর প্রত্যাহার করেন। এটা মনে করা হয় যে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের আমল ভারতের মধ্যযুগের ইতিহাসে সবচেয়ে দূর্নিতীগ্রস্থ ছিল। একটা গল্প থেকে জানা যায় যে সুলতান একবার এক সিপাহীকে একটি সোনার টংকা দেন আস্তাবলের দাড়োয়ানকে ঘুষ দিয়ে তার ঘোড়া আস্তাবল থেকে ছাড়ানোর জন্য। এছাড়াও সূলতানের সেনবাহিনীর প্রধান ছিলেন ইমাদুল-মুল্ক বাশির যে প্রথমদিকে সুলতানের কৃতদাশ ছিল। সুলতানের এই সেনাপতি অবৈধ পথে প্রায় তের কোটি টংকার সম্পদ অর্জন করেছিল যেখানে পুরো সম্রাজ্যের উত্তোলিত করের পরিমান ছয় কোটি সাতান্ন লাখ টংকার বেশি ছিল না।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. তুঘলক শাহীস অফ দিল্লি: Chart The Imperial Gazetteer of India, 1909, v. 2, p. 369.
  2. Elliot, Henry Miers, Sir; Dowson, John (1871)। "Chapter XVI, Táríkh-i Fíroz Sháhí of Shams-i Siráj 'Afíf"। The history of India, as told by its own historians: The Muhammadan period। London: Trübner and Company। পৃ: 273 
  3. Tibb Firoz Shahi (1990) by Hakim Syed Zillur Rahman, Department of History of Medicine and Science, Jamia Hamdard, New Delhi, 79pp
  4. Sultan Firoz Shah Tughlaq by M. Ahmed, 1978, Chugh Publications, New Delhi p. 46 and 95
  5. A History of India, H. Kulke and D. Rothermund, 1998, Routledge, p.167, ISBN 0-415-15482-0
  6. The Delhi Sultanate: A Political and Military History, P. Jackson, 1999, Cambridge University Press, p. 186, ISBN 0-521-54329-0
পূর্বসূরী
মোহাম্মদ বিন তুঘলক
দিল্লির সুলতান
১৩৫১১৩৮৮


উত্তরসূরী
গিয়াস উদ দিন তুঘলক দ্বিতীয়
নতুন রাজবংশ তুঘলক রাজবংশ
১৩২০–১৩৮৮