ঠগি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ঠগি
Group of Thugs.gif
ঠগিদের একটি দল (১৮৯৪)
প্রতিষ্ঠা ১৩৫৬ সালের পূর্বে
নামকরন সংস্কৃত ঠগ (অর্থ- ঠক বা প্রতারক বা ধূর্ত বা প্রবঞ্চক) শব্দ থেকে এসেছে।
প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশ
সক্রিয় ~৪৫০ বছর
বিচরন ভারতীয় উপমহাদেশ
জাতি ভারতীয়
সন্ত্রাসী কর্মকান্ড খুন, ডাকাতি

ঠগি (হিন্দি: ठग्गी or ṭhagī; উর্দু: ٹھگ; সংস্কৃত: sthaga), বিশেষ শ্রেণীর দস্যুদল যারা পথিকের গলায় রুমাল বা কাপড় জড়িয়ে হত্যা করত। ঠগিরা ১৩ থেকে ১৯ শতকে বাংলাসহ উত্তর ভারতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তারা হিন্দুদের দেবী কালীর পূজা করত।[১] তাদের কথা প্রথম জানা যায় ১৩৫৬ সালে ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন বারানি লিখিত ‘ফিরোজ শাহর ইতিহাস’ গ্রন্থে।[২] ১৮৩০ সালে গর্ভনর জেনারেল লর্ড বেন্টিক ভারতে প্রশাসক উইলিয়াম হেনরি শ্লীম্যানকে ঠগিদের নির্মুল করতে নির্দেশ দেন। হেনরি শ্লীম্যান কয়েক বছরের চেষ্ঠার ফলে ঠগিদের নির্মুল করতে সমর্থ হন।[১][৩] কিছু হিসেব অনুযায়ী ১৭৪০ সাল থেকে ১৮৪০ সাল পর্যন্ত ঠগিরা ১ মিলিয়ন এর বেশি মানুষ হত্যা করেছিল।[৪]

ঠগিরা সাধারণত দলগতভাবে ব্যবসায়ী, তীর্থযাত্রীর কিংবা সৈন্যের ছদ্মবেশে ভ্রমণ করত এবং পথিমধ্যে অন্য তীর্থযাত্রীদের সাথে ভাল ব্যবহার করত ও তাদের সাথে মিশে যেত। তারপর তারা হঠাৎ করেই কোন যাত্রাবিরতীতে ভ্রমনকারীদেরকে গলায় হলুদ রং এর কাপড় পেচিয়ে হত্যা করত। মৃতদেহ গুলোকে তারা হিন্দু দেবী কালীর নামে উৎসর্গ করত।[১] হত্যার পর মৃতদেহগুলোকে একসাথে হাড় ভেঙ্গে কবর দিয়ে রাখত যাতে পচন প্রক্রিয়াটি ত্বরানিত হয় এবং তাদের মুল্যবান ধনরত্ন লুট করত।[৫]

ঠগি শব্দটি সংস্কৃত ঠগ শব্দ থেকে এসেছে। ঠগ অর্থ- ঠক বা প্রতারক বা ধূর্ত বা প্রবঞ্চক।[৬] ভারত শাসনের সময় যেসব শব্দ ইংরেজি ভাষায় যুক্ত হয়েছে থাড তাদের মধ্যে অন্যতম। শব্দটির অর্থ- ধপ করে পড়া বা আঘাত করা। থাড শব্দটি সংস্কৃত ঠগি শব্দ থেকে এসেছে। ১৮৩৯ সালে ফিলিপ মেডোউস টেলরের উপন্যাস কনফেসনস অফ অ্য ঠগ এর মাধ্যমে ঠগিদের কাহিনী জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং একই সাথে ঠগ শব্দটি ইংরেজি ভাষায় যুক্ত হয়ে যায়। এই ধরনের হত্যাকান্ড দক্ষিণ এশিয়া তথা ভারতে জনপ্রিয় ছিল।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৩৫৬ সালের জিয়াউদ্দীন বারানি লিখিত ‘ফিরোজ শাহর ইতিহাস’ গ্রন্থে থেকে জানা যায়,

১২৯০ এর দিকে সুলতানের শাষন আমলে কিছু ঠগ ধরা পরে, কেউ কেউ বলে এ সংখ্যা এক হাজার তাদের নতুন দিল্লী নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কিন্তু সুলতান তাদের একজনকেও হত্যা করেন নি বরং তাদেরকে নৌকায় তুরে ভাটির দেশে পাঠিয়ে দিতে নির্দেশ দেন যাতে তারা আর কোনদিন দিল্লীতে বিশৃঙ্কলা সিৃষ্টি করতে না পারে।
— স্যার এইস.এম এলিয়ট ,  "ভারতের ইতিহাস" , iii. ১৪১

ঠগিরা সাধারনত বংশপরম্পরায় এই হত্যাকান্ড ঘটাত। একজন ঠগি বালক ১৮ বছর হলে সে হত্যার অনুমতি পেত। ১৮১২ সালে ব্রিটিশ সরকার ঠগিদের কথা প্রথম জানতে পারে। সেসময় একটি গণকবরে ৫০টি মৃতদেহ গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। ঠগিরা তাদের দেবীকে বাংলায় ভবানী নামে ডাকত। তারা সাধারনত বছরের এক সময় ঘর সংসার করত এবং শরৎকালে দলগত ভাবে যাত্রা করত মানুস হত্যার জন্য। ঠগিরা দলের সর্দারকে জমাদার নামে অভহিত করত। ঠগিদের প্রধান তীর্থক্ষেত্র ছিল পশ্চিমবাংলার ’কালীঘাট’ ও বিন্ধ্যাচলের ’ভবানী মন্দির’।

হত্যা পদ্ধতি[সম্পাদনা]

ঠগিরা হত্যাকান্ডের জন্য একটি হলুদ রংএর রুমাল ব্যাবহার করত যার র্দৈঘ্য ছিল মাত্র ৩০ ইঞি। রুমালটি ভাজ করে তার দুই মাথায় দুটি রুপার মুদ্রা দিযে বেধে দিত। হত্যা সময় একজনকে হত্যার জন্য তিনজন ঠগি ছিল এদের একজন মাথা ঠেসে ধরত, একজন রুমালটি হত্যার শিকার ব্যাক্তির গলায় পেচিয়ে ধরত ও অরেকজন পা ধরে থাকত।

ঠগিরা হত্যার পর লাশ গুলো মাটিতে পুতে ফেলত। কেউ পালিয়ে গেলে ঠগিদের অগ্রবর্তী দল তাদের হত্যা করত। তারা সাধারনত ভিক্ষুক, সংগীতজ্ঞ, নৃত্যশিল্পী, ঝাড়ুদার, তেল বিক্রেতা, কাঠমিস্ত্রি, কামার, বিকলাঙ্গ, কুষ্ঠরোগী, গঙ্গাজলবাহক ও নারীদের হত্যা করত না।

দমন[সম্পাদনা]

উইলিয়াম হেনরি শ্লীম্যান (১৮৩৫)

প্রথমদিকে কোন তীর্থযাত্রী নিখোজ হলে ব্রিটিশ শাষকরা এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে করত কিন্তু যখন আস্তে আস্তে ব্রিটিশরাও নিখোজ হওয়া শুরু করল তখন গর্ভনর জেনারেল লর্ড বেন্টিক জানতে পাড়েন এটাতে একটি ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের হাত রয়েছে। তখন তিনি ঠগীদের নির্মূল করতে ১৮৩০-এর সালে ভারতের প্রশাসক উইলিয়াম হেনরি শ্লীম্যানকে নির্দেশ দেন।

হেনরি ঠগিদের নির্মুল করতে গুপ্তচর নিয়োগ করেন যাতে তাদের গতিবিধি সম্পর্কে আগেই আচ করা যায়। ১৮৩০ সাল থেকে ১৮৪১ সাল পর্যন্ত তিনি প্রায় ৩৭০০ ঠগিকে ধরতে সমর্থ হন। ১৯৪০ সালের দিকে প্রায় ৫০০ ঠগির ফাঁসি দেওয়ার পর ঠগিদের সংখ্যা কমে আসে। এখনো ভারতের রাজস্থানে ঠগিদের বংশধরদের দেখা য়ায় কিন্তু তারা স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে।

ঠগিদের তথ্য সম্বলিত বই সমূহ[সম্পাদনা]

  • Dash, Mike Thug: the true story of India's murderous cult ISBN 1-86207-604-9, 2005
  • Dutta, Krishna (2005) The sacred slaughterers. Book review of Thug: the true story of India's murderous cult by Mike Dash. In The Independent (Published: 8 July 2005) text
  • Guidolin, Monica "Gli strangolatori di Kali. Il culto thag tra immaginario e realtà storica", Aurelia Edizioni, 2012, isbn: 978-88-89763-50-6.
  • Paton, James 'Collections on Thuggee and Dacoitee', British Library Add. Mss. 41300
  • Woerkens, Martine van The Strangled Traveler: Colonial Imaginings and the Thugs of India (2002),

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ ১.২ "Tracing India's cult of thugs". 3 August 2003. Los Angeles Times.
  2. http://www.britannica.com/EBchecked/topic/594263/thug
  3. http://www.mahavidya.ca/hindu-sects/the-thuggee-cult/
  4. Rubinstein, W. D. (2004)। Genocide: a history। Pearson Education। পৃ: 82–83। আইএসবিএন 0-582-50601-8 
  5. R.V. Russell; R.B.H. Lai (1995)। The tribes and castes of the central provinces of India। Asian Educational Services। পৃ: 559। আইএসবিএন 978-81-206-0833-7 
  6. Thugs 1902 Encyclopædia Britannica'.Pali-sthag