জেমস রেনেল

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Portrait of James Rennell (1799)

মেজর জেমস রেনেল (ডিসেম্বর ৩, ১৭৪২ - মার্চ ২৯, ১৮৩০) একজন ব্রিটিশ ভূবিদ, ভূগোলবিদ, নৌ-প্রকৌশী ,ঐতিহাসিক এনং মহাসমুদ্রবিদ্যার জনক ছিলেন।

পরিচ্ছেদসমূহ

প্রাথমিক জীবন [সম্পাদনা]

ইংল্যান্ডের ডেবনশায়ারে জন্মগ্রহণকারী জেমস রেনেল ১৭৫৬ সালে ব্রিটিশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন। তাঁর পিতা জন রেনেল রাজকীয় সেনাবাহিনীর গোলন্দাজ শাখার ক্যাপ্টেন ছিলেন। নৌবাহিনীতে কাজ করার সময় রেনেল সমুদ্র-জরিপ ও নৌ-প্রকৌশল বিদ্যায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।মাত্র ১৪ বছর বয়সে মানে ১৭৫৬ সালে তিনি নৌবাহিনীর চাকরি লইয়াছিলেন। ১৭৬৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরিতে যোগদানের পূর্বে রেনেল ফিলিপাইনের কয়েকটি পোতাশ্রয়ের জরিপকার্য সম্পন্ন করেন।[১]

বাংলায় জেমস রেনেল [সম্পাদনা]

তিনি বাংলার নদী অববাহিকা সম্পর্কে অনুসন্ধান চালান এবং সর্বপ্রথম এদের মানচিত্র অঙ্কন করেন।বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল সহজ করার জন্য ফোর্ট উইলিয়মের গভর্নর হেনরী ভ্যান্সিটার্ট কোম্পানির সেনাবাহিনীর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ার্স কোর-এ তাঁকে কমিশন প্রদান করে বাংলার প্রধান প্রধান নদী ও এদের শাখা নদীর একটি জরিপকার্য সম্পাদনের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব তাঁর উপর দেওয়া হয়। কোম্পানি কর্তৃক বাংলা, বিহারউড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ বা দীউয়ানি লাভের (১৭৬৫) পর এই ধরনের একটি জরিপের প্রয়োজনীয়তা আরও তীব্রভাবে অনুভূত হয়। গভর্নর রবার্ট ক্লাইভ ১৭৬৭ সালে একটি নিয়মিত জরিপ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং জেমস রেনেলকে এই বিভাগের সার্ভেয়ার জেনারেল নিয়োগ করা হয়। অবশ্য এই সময় নাগাদ রেনেল গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্রমেঘনা নদীর গতিপ্রকৃতি ও আনুষঙ্গিক অবস্থার অনুসন্ধানকার্য বহুলাংশে সম্পন্ন করেছিলেন। রেনেলকে প্রথমত নিয়োগ করা হয়েছিল শুধু গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ জরিপ করার জন্য, যার বিশেষ লক্ষ্য ছিল সুন্দরবনমেঘনার মধ্যবর্তী পথের পরিবর্তে গঙ্গা থেকে কলকাতায় বৃহদাকার নৌযান চালানোর উপযোগী অপেক্ষাকৃত কম দূরত্বের নৌপথ খুঁজে বের করা। তাঁর লেখা দিনপঞ্জি থেকে এই অভিযান এবং পরবর্তী তিনটি অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। এই অভিযানকালে তিনি উত্তর ও পূর্ব বঙ্গের অধিকাংশ অঞ্চলে জরিপকার্য সম্পন্ন করেন এবং গোয়ালপাড়া ছাড়িয়ে আসামে ঢুকে পড়েন।

রেনেল তাঁর দিনপঞ্জিতে উল্লেখ করেছেন যে, অনুসন্ধান পরিচালনাকালে তিনি অনেকবার বাঘ, সরীসৃপ, ডাকাত ও শত্রুভাবাপন্ন লোকদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অপ্রতুলতা সত্ত্বেও মাত্র চারজন সহকারী নিয়ে তিন বছরের মধ্যে তিনি জরিপকার্য সম্পন্ন করেন।৬ মে,১৭৬৪ সালে কলিকাতার গবর্নর হেনরী ভ্যান্সিটার্ট জেমস রেনেলকে নদীয়া জেলার উত্তর সীমানাবর্তী জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে পূর্বদিকে ঢাকা পর্যন্ত গঙ্গাপদ্মার দক্ষিণ তীর তথা অববাহিকাবর্তী নদীনালা জরিপের লক্ষ্যে জরিপকার বা আমিন নিযুক্ত করেন।এই জরিপের অংশস্বরূপ গবর্নরে নিযুক্ত গোয়েন্দা কর্মচারি জেমস রেনেল ১৭৬৪ সালের ৭ই মে তারিখ হইতে তাঁহার রোজনামচা বা দিনলিপি লিখিতে শুরু করেন। সেই দিনলিপি ১৯১০ সালে কলিকাতা এশিয়াটিক সোসাইটি তৎকালীন ‘ভারতবর্ষের ভূতাত্ত্বিক জরীপ’(Geological Survey of India) নামক সংস্থার সদস্য টি. এইচ. ডি. লা টুশ (T. H. D. La Touche) সম্পাদনয় এই দিনলিপি প্রকাশ করেন। টি. এইচ. ডি. লা টুশের মতে ১৭৬৪ সাল হইতে ১৯৬৭ সালের মধ্যে গঙ্গা ও ব্রহ্মপূত্র নদীর জরিপ চলার সময় পরাধীন বঙ্গদেশের গবর্নরদের গোয়েন্দা হিসাবে জেমস রেনেল এই বিবরণী লিখেছিলেন। লা টুশ সম্পাদিত রেনেলের রোজনামচায় তিনটি খন্ড আছে। প্রথমখন্ড ১৭৬৪ সালের মে হইতে ১৭৬৫ সনের মে পর্যন্ত বিস্তৃত। দ্বিতীয়খন্ড ১৭৬৫ সালের মে হইতে ১৭৬৬ সালের জানুয়ারি। আর তৃতীয়খন্ড ১৭৬৬ সনের জানুয়ারি হইতে ১৭৬৭ সনে মার্চ অবধি।১৭৬৭ সালে তাঁহাকে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মহা আমিন বা সার্ভেয়ার জেনারেল নিয়োগ করা হয়। ১৭৬৪ সাল হইতে ১৭৭৭ - সর্বমোট তের বছর তিনি বঙ্গদেশের ব্রিটিশ জরীপকাজে নিযুক্ত ছিলেন। মহা আমিনের প্রধান কার্যালয় বসিত পূর্ব বাংলার ঢাকা শহরে। বাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে ইংরেজ বিরোধী সংগ্রাম তখন চলছিল। ইংরেজরা এই সংগ্রামকে ফকির বিদ্রোহ বলত।১৭৭৬ সালে ভূটানের সীমান্ত ও কুচবিহার সীমান্তে এই দায়িত্বে নিয়োজিত থাকাকালে তিনি ফকির মজনু শাহ এর অনুসারী একদল বিদ্রোহী কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে গুরুতর আহত হন। সম্ভবত এই ঘটনাই ১৭৭১ সালে ফকির বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে উত্তরবঙ্গে এক অভিযানে নেতৃত্ব দানে রেনেলকে তাড়িত করেছিল। এই আঘাত থেকে তিনি কখনও পুরাপুর সারিয়া উঠেন নি। জানা যায় যে এই আঘাতের কারণেই অল্পবয়সে তিনি অবসর গ্রহণে বাধ্য হয়েছিলেন। ১৭৭৬ সালের ৫ এপ্রিল তাঁহার মেজর পদে উন্নতি হয়। গভর্ণর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস তাঁহাকে বার্ষিক ৬০০ পাউন্ডের ভাতা মন্জুরি প্রদান করিয়াছিলেন। তখন ভারতে ব্রিটিশ শাসনে সহায়তা করিবার নিমিত্ত প্রতিষ্ঠিত “ইস্ট ইন্ডিয়া হাউস” নামক দপ্তরে কাজ করিতেন জেমস রেনেল।[১]

বঙ্গীয় জরিপ ও মানচিত্র [সম্পাদনা]

রেনেলের লেখার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করার যোগ্য বিবেচিত হইয়াছে ১৭৭৯ সালে প্রকাশিত Bengal Atlas বা বঙ্গদেশের মানচিত্র । ১৭৮৩ সনে তিনি ‘ভারতবর্ষের খসড়া মানচিত্র’ প্রকাশ করেন। ১৮০০ সালে প্রকাশিত হয় Geographical System of Herodotus বা ‘এরোদোতসের ভূগোলজগত’। তাঁহার আরেকটি উল্লেখ্য বই Comparative Geography of Western Asia বা ‘এশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের তুলনাভিত্তিক ভূগোল’ ।

মানচিত্র প্রকাশ [সম্পাদনা]

Map of the currents in Atlantic and Indian ocean around Africa, created by James Rennell in 1799. Amazing is the accuracy of the marine currents and winds in contrast to the nearly phantasylike depiction of the inner parts of Africa (unknown to the Europeans until 1877).

তাঁর অনুসন্ধানী কার্যক্রম এতোটাই সন্তোষজনকভাবে সম্পাদিত হয়েছিল যে, পরবর্তীকালে সার্ভে অব ইন্ডিয়া কর্তৃক তাঁর শনাক্তকরণ অত্যন্ত নির্ভুল প্রতিপন্ন হয়। বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ার্সে মেজর পদে পদোন্নতি লাভের অল্পকাল পরেই রেনেল ১৭৭৬ সালে পেনশনসহ চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ১৭৭৯ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘বেঙ্গল অ্যাটলাস’ ছিল বাণিজ্যিক, সামরিক ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সর্বোচ্চ গুরুত্বসম্পন্ন অবদান। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বাজারে মানচিত্রের সহজলভ্যতার পূর্ব পর্যন্ত রেনেলের ‘অ্যাটলাস’ (ভূমানচিত্র) শিক্ষার্থিসহ প্রশাসনিক ও নৌ-চলাচল কাজে সর্বস্তরের ব্যবহারকারীদের কাছে ছিল একটি-নির্ভরযোগ্য অবলম্বন। রেনেলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবদান সর্বপ্রথম মোটামুটি নির্ভুলভাবে অঙ্কিত ভারতবর্ষের মানচিত্র। এই মানচিত্রের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল রেনেলের একটি ‘ভাষ্য’ (১৭৮৩)। যে পরিকল্পনার ভিত্তিতে মানচিত্রটি অঙ্কিত হয়েছিল তার পূর্ণ বিবরণ লিপিবদ্ধ ছিল এই ভাষ্যে। ১৭৯০ সালে তিনি উত্তর আফ্রিকার একটি মানচিত্রও অঙ্কন করেন। ১৭৮১ সালে জেমস রেনেল রয়্যাল সোসাইটির একজন ‘ফেলো’ নির্বাচিত হন। ১৭৯১ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটির ‘কপলে পদক’ লাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি বায়ু ও সমুদ্র সে্রাত সম্পর্কিত অধ্যয়নে সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর সকল পর্যবেক্ষণ ও সমুদ্র সম্পর্কিত অধ্যয়ন লব্ধ জ্ঞান একটি একক পদ্ধতিতে সমম্বিত করেন। ভূগোলবিদদের নিকট এটি ‘রেনেলের সে্রাত’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৮০০ সালে তাঁকে ইনস্টিটিউট অব ফ্রান্স-এর একজন সহযোগী মনোনীত করা হয় এবং ১৮২৫ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটি অব লিটারেচার-এর স্বর্ণপদক লাভ করেন।

শেষ জীবন [সম্পাদনা]

১৭৭৭ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।জীবনের বাকি ৫৩ বছর তিনি লন্ডন শহরেই কাটাইয়াছিলেন। শেষ বয়সে জেমস রেনেল সমুদ্রস্রোত বিষয়ে গবেষণা করিয়া আপন খ্যাতির বৃদ্ধি সাধন করেন। তাঁহাকে ওসানোগ্রাফি বা মহাসমুদ্রবিদ্যার পিতা বলিয়াও ডাকিবার রীতি ইংরেজরা চালু করিয়াছিলেন। তাঁহার এন্তেকালান্তে মোতাবেক ১৮৩২ সালে তদীয় কন্যার সম্পাদনায় Currents of the Atlantic Ocean বা ‘অতলান্তিক মহাসমুদ্রের স্রোতধারা’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ১৭৮১ সালে তিনি ইংলন্ডের রাজকীয় সমিতির সদস্য মনোনীত হইয়াছিলেন। মার্চ ২৯, ১৮৩০ সালে লন্ডন শহরে তিনি পরলোক গমন করেন এবং ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবিতে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

তথ্যসূত্র [সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ Oxford Dictionary of National Biography (ODNB) volume 48, 1896

বহিঃসংযোগ [সম্পাদনা]