রসবোধ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

রসবোধ হচ্ছে বিশেষ জ্ঞান সম্বন্ধীয় অভিজ্ঞতার প্রবণতা যেটা হাসির উদ্রেক করে এবং আনন্দ দেয়। এই শব্দটি প্রাচিন গ্রিক রসবোধের ঔষধ (humoral medicine) থেকে এসেছে যেটা শিখিয়েছিল যে মানুষের শরীরের তরলের সমতা, যেটা জীবদেহনি:সৃত রস নামে পরিচিত(ল্যাতিনঃ humor), মানুষের স্বাস্থ্য এবং অনুভুতি নিয়ন্ত্রন করে।

সকল বয়স এবং সংস্কৃতির মানুষের মাঝেই রসবোধ আছে। বেশিরভাগ মানুষ রসবোধ অনুভব করতে পারে -- আনন্দিত হয়, মজাদার কিছুতে মৃদু অথবা অট্টহাসি হাসে -- এবং সেজন্য তাদের রসবোধ আছে বলে মনে করা হয়। যে যুক্তিবাদী মানুষটার রসবোধ নেই সে এসব আচরণকে অনির্বচনীয়, অদ্ভুত এমনকি অসঙ্গতও মনে করতে পারে। যদিও শেষতক ব্যক্তিগত পছন্দ দ্বারাই রসবোধ নির্ধারিত হয়, একজন ব্যক্তি কোনও কিছুতে কতটুকু রস খুঁজে পায় তা নির্ভর করে কয়েকটি উপাদানের উপর যার মধ্যে আছে ভৌগোলিক অবস্থান, সংস্কৃতি, মানসিক পরিপক্কতা, শিক্ষার স্তর, বুদ্ধি এবং ঘটনার প্রসঙ্গ। উদাহরণস্বরূপ, ছোট ছেলেমেয়েরা পাঞ্চ অ্যান্ড জুদি পুতুল নাচ অথবা টম অ্যান্ড জেরি রঙ্গচিত্র এর মত চরকিবাজি দেখে আনন্দ পেতে পারে যাদের শারীরিক প্রকৃতি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য। অপরপক্ষে, ব্যঙ্গধর্মী রচনার মত অধিক বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন রসবোধের জন্য প্রয়োজন তার সামাজিক অর্থ এবং ঘটনার বোধশক্তি, এবং সেজন্য অধিক মানসিক পরিপক্ক শ্রোতাদের তা আকৃষ্ট করে।

মতবাদ সমূহ[সম্পাদনা]

  প্রকৃত প্রবন্ধঃ Theories of humor

রসবোধের সামাজিক ক্রিয়া সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ রয়েছে। রসবোধের অস্তিত্বের কারন খোঁজা সম্পর্কে প্রভাবশালী মতবাদগুলোর মধ্যে রয়েছে মনোবিদ্যাগত মতবাদ, যার বেশিরভাগটা মনে করে রসবোধ-প্রবৃত্ত ব্যবহার অনেক স্বাস্থ্যকর; আধ্যাত্মিক মতবাদ, যেখানে রসবোধকে সৃষ্টিকর্তা থেকে পাওয়া উপহার হিসেবে বিবেচনা করতে পারে; এবং সেসব মতবাদ যেগুলো ঠিক একটি রহস্যময় অভিজ্ঞতার মত রসবোধকে একটা ব্যাখ্যাতীত রহস্য বলে মনে করে ।

পিটার ম্যাকগ্রো এর দেয়া ক্ষতিকর-লঙ্ঘন মতবাদ রসবোধের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করে। মতবাদটি বলে "রসবোধের উৎপত্তি তখনি হয় যখন মনে হয় কোনোকিছু নিয়মবিরুদ্ধ, বিচলিত অথবা হুমকিস্বরূপ, কিন্তু একই সাথে সঠিক, গ্রহণযোগ্য এবং নিরাপদ"। সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মত অপ্রতিভ, অস্বস্তিকর অথবা অস্বচ্ছন্দ অনুভূতি দূর করার মাধ্যমে রসবোধকে সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় খুব সহজেই যুক্ত করার একটি পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

অন্য অনেকেই বিশ্বাস করে "রসবোধের যথাযথ ব্যবহার সামাজিক মিথস্ক্রিয়া সহজতর করে"।

দর্শন সমূহ[সম্পাদনা]

কিছু ব্যক্তি দাবি করে যে রসবোধকে ব্যাখ্যা করা যায়না অথবা একে ব্যাখ্যা করা উচিত না। গ্রন্থকার ই.বি.হোয়াইট (E.B.White) একবার বলেছিলেন, "রসবোধকে একটি ব্যাঙের মতই ব্যবচ্ছেদ করে বিশ্লেষণ করা যায়, কিন্তু জিনিসটা এই প্রক্রিয়ায় মারা যায় এবং ভিতরের অন্ত্রাদি বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক মন ছাড়া আর সকলের মনোভঙ্গের কারন হয়"। এই যুক্তির বিপরীতে বলা যায়, "আপত্তিকর" কার্টুনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ক্ষুব্ধ ব্যক্তি এবং জনগোষ্ঠী দ্বারা রসবোধের বিশ্লেষণ কিংবা অভাবকে আহ্বান করে। রসবোধের এই বিশ্লেষণ রসবোধকে দূর করে না কিন্তু তার রাজনৈতিক এবং অধিকৃত সার্বজনীনতার প্রতি মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে।

আরথার শপেনহাউয়ার কৌতুকপ্রদ কোনও কিছুকেই রসবোধের(একটা ইংরেজি থেকে জার্মান ঋণশব্দ) সাথে তুলনা করা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। যাহোক, বিষয়টির তত্ত্বীয় বর্ণনার ক্ষেত্রে রসবোধ এবং কৌতুক প্রায় সমার্থক ব্যবহার করা হয়। প্রতিক্রিয়া এবং উদ্দীপক বস্তুর মাঝে যে সম্পর্ক সেটাই কৌতুকের বিপরীত, রসবোধের জাত্যর্থে বলা যায়। এছাড়াও, রসবোধ কোনও ব্যক্তির হাস্যকরতা এবং উপস্থিত বুদ্ধির একটি সংমিশ্রণ বলে মনে করা হয়; যার একটি দৃষ্টান্ত শেক্সপীয়ারের স্যার জন ফালস্টাফ। ফরাসিরা অনেক ধিরে রসবোধের ধারণাটি গ্রহণ করে। এখনও ফরাসিতে মেজাজ(humeur) এবং মানসিক অবস্থা(humour) দুটি ভিন্ন শব্দ, পরেরটি কোনও ব্যক্তির মেজাজ অথবা রসবোধের প্রাচীন চারটি ধারণাকে নির্দেশ করে।

অ-ব্যঙ্গাত্মক হাস্যরসকে নির্দিষ্টভাবে মাতাল হাসি অথবা বিনোদনমূলক রঙ্গ বলা যায়।

সামাজিক নিয়ামকসমূহ[সম্পাদনা]

অন্য যেকোনো শিল্পের মতো রসবোধের নির্দিষ্ট শৈলী এবং ঘটনার গ্রহণযোগ্যটা নির্ভর করে সামাজিক নিয়ামকের উপর এবং ব্যক্তিবিশেষে এটা পরিবর্তিত হয়। ইতিহাসজুড়ে, সারা পৃথিবীতে বিনোদনের একটি মাধ্যম হিসেবে কৌতুক ব্যবহার করা হয়েছে, সেটা পশ্চিমা রাজাদের প্রাসাদ হোক কিংবা দূর পূর্বের কোনও গ্রাম। রসিকতা এবং বিদ্রূপের মাধ্যমে সামাজিক শিষ্টাচার এবং নির্দিষ্ট বুদ্ধিমত্তা উভয়ই প্রদর্শন করা যায়। আঠারো শতকের জার্মান গ্রন্থকার জরগ লিচটেনবারগ বলেছিলেন "আপনার যত বেশি রসবোধ থাকবে, তত বেশি সুন্দরের দাবিদার হবেন"।

প্রাচীন গ্রীস

পশ্চিমা রসবোধ মতবাদ প্লেটোর মাধ্যমে শুরু হয় যিনি সক্রেটিসের ফিলেবাসে আলোকপাত করেন যে দুর্বলরা হাস্যকর জিনিসের মর্মার্থ বুঝতে অজ্ঞ এবং সেজন্য যখন তাদের উপহসিত করা হয় তারা পাল্টা কোনও কিছু করতে পারে না। পরবর্তীতে, গ্রীক দর্শনে, পয়েটিক গ্রন্থে অ্যারিস্টট্ল প্রস্তাব করেন যে বিরক্তির উদ্রেক করে না এমন কদর্য হচ্ছে রসবোধের মৌলিক জিনিস।

ভারত

প্রাচীন সংস্কৃত নাটকে, ভরত মুনির নাট্য শাস্ত্র রসবোধকে নয়টি নব রস অথবা প্রধান রসের (আবেগি প্রতিক্রিয়া) মধ্যে একটি বলে উল্লেখ করেন যেটা ভবের মাধ্যমে, যেটা অভিনেতাদের আবেগের অনুকরন, শ্রোতাদের অনুপ্রাণিত করতে পারে। প্রতিটি রস মঞ্চে বর্ণিত একটি নির্দিষ্ট ভবের সাথে সম্পর্কযুক্ত।

আরবি এবং ফারসি সংস্কৃতি

মধ্যযুগীয় ইসলামী পৃথিবীতে অ্যারিস্টট্লের পয়েতিক আরবিতে অনুবাদের পর কৌতুক এবং ব্যঙ্গ শব্দদুটো সমার্থক হয়ে যায়, যেটা আরব্য লেখক ও আবু বিস্কার, তার শিষ্য আল-ফারাবি, পারস্যের আভিসিনা এবং আভেরসের মত ইসলামী দার্শনিকের দারা সম্প্রসারিত হয়। সংস্কৃতির পার্থক্যের কারনে তারা গ্রীকদের নাটকীয় বর্ণনা থেকে কৌতুককে পৃথক করে এবং তার বদলে তারা একে হিজার (ব্যঙ্গাত্মক কবিতা) মত আরব্য কবিতার বিষয় এবং গঠন হিসেবে চিহ্নিত করে। তারা কৌতুককে কেবল একটি "প্রতারণার শিল্প" হিসেবে দেখত এবং চিরায়ত গ্রীক কৌতুকের হালকা এবং আনন্দদায়ক ঘটনা অথবা কষ্টকর শুরু এবং শুভ সমাপ্তির সাথে কোনো যোগসূত্র রাখে নি। ১২শ শতকে ল্যাতিন অনুবাদের পর মধ্যযুগীয় সাহিত্যে কৌতুক শব্দটি নতুন শব্দার্থিক অর্থ লাভ করে।

ক্যারিবীয়

১৯৫৭ সালের এক সাক্ষাৎকারে মেন্তো তারকা লর্ড ফ্লিয়া বলেন যে তিনি মনে করেছিলেনঃ "সারা পৃথিবীতে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের রসবোধ সবচেয়ে বেশি। এমনকি লাস কিন ফাইন [Lost and Can Not Be Found] এর মত গুরুগম্ভীর গানেও, যেখানে আখ ক্ষেতের একটি ফোটানোর পাত্র বিস্ফোরণে কয়েকজন কর্মী মারা যাওয়ার কথা বর্ণিত আছে, তাদের সহজাত বুদ্ধির দীপ্তি এবং রসবোধ জাজ্বল্যমান"।

চীন

কনফুসিয়ানিস্ট নব্য-কনফুসিয়ান গোঁড়ামি, যেটা শাস্ত্রীয় আচারপালন ও সামঞ্জস্যতাকে গুরুত্ব দেয়, ঐতিহ্যগতভাবে রসবোধকে বিধ্বংসী ও কুরুচিকর বলে হেয় করে দেখে। কিন্তু একবার একটি গৃহহীন কুকুরের অস্তিত্বের ভ্রান্ততা তুলনা করতে যেয়ে কনফুসিয়ান সাহিত্যসংগ্রহ নিজেই তার মনিবকে আত্মসমালোচনা ভিত্তিক রসবোধের একজন পছন্দকারী বলে বর্ণনা করে। ঝুয়াংঝি এর মত প্রথমদিকের ডাওইস্ট দার্শনিক গ্রন্থে কনফুসিয়ান গাম্ভীর্যকে নিয়ে মজা করা এবং স্বয়ং কনফুসিয়াসকে একজন ক্ষীণবুদ্ধিসম্পন্ন চরিত্র বলে ব্যঙ্গ করার কথা স্পষ্ট উল্লেখ আছে। বুদ্ধিদীপ্ত তর্কাদি, শ্লেষ, পরিস্থিতিগত কৌতুক এবং যৌনসহবাস ও অশ্লীল সাহিত্যের মত নিষিদ্ধ বিষয়ের সংমিশ্রণ যেসব কৌতুক বইয়ে থাকতো সেগুলো শতাব্দী ধরে জনপ্রিয় ছিল। স্থানীয় শিল্প অনুষ্ঠান, গল্পবলা, আঞ্চলিক উপন্যাস এবং কবিতা হাস্যকর শৈলী ও চেতনার ব্যাপক বৈচিত্র্য প্রদর্শন করে।

বিখ্যাত চীনা রম্য-কাহিনী রচয়িতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, বহুযুগ আগেকার ভাঁড় চুনু কুন এবং ডংফাং সুয়ো; ফেং মেংলং, লি ইয়ু এবং য়ু জিংজির মত মিং ও কিং রাজবংশের লেখকেরা; এবং লু জুন, লিন য়ুটাং, লাও সে, কিয়ান ঝংসু, ওয়াং জিয়াবো ও ওয়াং সুয়ো এর মত আধুনিক রম্য লেখকেরা এবং গে ইউ, গুও দেগাং ও ঝউ লিবো এর মতো অভিনয়কারীরা।

আধুনিক চীনা রসবোধ শুধুমাত্র আদিবাসী ঐতিহ্য দ্বারাই প্রভাবিত হয়নি বরং মুদ্রণ সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, টিভি এবং ইন্টারনেট থেকে আসা বিদেশী হাস্যরস দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছে। ১৯৩০ সালে যখন "ইউমো"(humor) কে হাস্যরসের নতুন বর্ণান্তর হিসেবে ধরা হয় তখন রম্য সাহিত্যে একটি আকর্ষণীয় উম্মাদনার সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি চীনের মত একটি আংশিক বিদেশী পেশায় থাকা গরিব এবং দুর্বল দেশে কি ধরনের কৌতুকপূর্ণ চেতনা সবচেয়ে উপযুক্ত তা নিয়ে আবেগপূর্ণ বিতর্কের সূচনা হয়। মাও যেদং এর শাসনামলে কিছু ধরনের কৌতুক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পেলেও হাস্যরসের প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মূলত দমনমূলক। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একটি আক্রমণাত্মক বিবাচন ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ১৯৮০ সালের সামাজিক উদারীকরণ, ১৯৯০ সালের সাংস্কৃতিক বাজারের বাণিজ্যিকিকরন এবং ইন্টারনেটের আগমন প্রত্যেকেই সাম্প্রতিক দশকে চীনে নতুন ধরণের হাস্যরস প্রচলনে সহায়তা করেছে।

সামাজিক পরিবর্তনের রূপরেখা

হাস্যরসের সামাজিক পরিবর্তনের রূপ এই অনুমান করে যে শারীরিক আকর্ষণীয়তার মতো কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রসবোধের উপর প্রভাব ফেলে। এই তত্ত্বটি রম্যলেখক, একজন শ্রোতা এবং বিষয়বস্তুর হাস্যরসের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সাথে সম্পর্কযুক্ত। এই নির্দিষ্ট তত্ত্বের সাথে যে দুটি পরিবর্তন জড়িত তাহলো হাস্যরসের বিষয়বস্তু এবং হাস্যকর ব্যক্তি সম্পর্কে শ্রোতাদের উপলব্ধির পরিবর্তন, যেকারনে হাস্যকর ব্যক্তি এবং শ্রোতাদের মাঝে একটি সম্পর্ক স্থাপিত হয়। সামাজিক পরিবর্তনের রূপটি রসবোধকে অভিযোজিত হিসেবে বিবেচনা করে কারন এটা বর্তমান অবস্থাকে হাস্যকর করার সাথে সাথে এই বার্তা দেয় যে তার পরবর্তী ইচ্ছাও হবে হাস্যরস দেয়া। আত্মসমালোচনামূলক হাস্যরসে এই তত্ত্ব সুচিন্তিতভাবে ব্যবহার করা হয় যেখানে একজন অন্য আরেকজনের সামাজিক গোষ্ঠীর মাঝে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। যদিও অন্যের সহানুভূতি অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে আত্মসমালোচনামূলক হাস্যরস হচ্ছে দুর্বলতা এবং ভুলের পরিচায়ক তবুও এই তত্ত্ব থেকে এটা বলা যায় যে অন্য নিয়ামকগুলো অনুকূলে থাকলে এই ধরণের রসবোধ রম্যলেখকের প্রতি আবেগপ্রবন আকর্ষণ বাড়িয়ে দিতে পারে। যেখানে হাস্যরস ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান সম্বন্ধীয় ক্ষমতার উন্নতি করা হয় সেখানে শিক্ষা ও পাঠদানের সময় সামাজিক পরিবর্তনের এই রূপটি ব্যবহার করা যেতে পারে। রসবোধ একটি অনুকূল এবং ঘরোয়া শ্রেণীকক্ষ পরিবেশ তৈরি করতে পারে যা শিক্ষার্থীদের আগ্রহ এবং স্বতঃস্ফূর্তটায় উৎসাহী করে।

শারীরিক আকর্ষণীয়তা

মহাবিদ্যালয় পড়ুয়া ৯০% পুরুষ এবং ৮১% নারী বলে যে আবেগপূর্ণ সঙ্গীর ক্ষেত্রে রসবোধকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হয়। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ক্ষেত্রে রসবোধ এবং সততাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রধান দুইটি বিশেষণ হিসেবে স্থান দেয়া হয়েছিল। সেই থেকে দেখা যায় একটা আবেগপূর্ণ সম্পর্ক যত গাঢ় হয় ততই রসবোধ আরও বেশি প্রকট এবং বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায় শারীরিক আকর্ষণীয়তার সাথে রসবোধের প্রকাশ হচ্ছে ভবিষ্যৎ মিথস্ক্রিয়ার জন্য প্রধান দুইটি উপাদান। ডেটিং, গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং যৌন সংসর্গের ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীরা শারীরিক আকর্ষণীয়তাকে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। অপরদিকে, গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং বিয়ের জন্য নারীরা রসবোধসহীন ব্যক্তির চেয়ে রসবোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের বেশি আকাংখিত মনে করে যখন সেই ব্যক্তিরা শারীরিকভাবে আকর্ষণীয় হয়।

এছাড়া, অন্যরা রসবোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের অধিক উৎফুল্ল কিন্তু রসবোধহীন ব্যক্তিদের তুলনায় কম বুদ্ধিসম্পন্ন হিসেবে মনে করে। একটি প্রুতিশ্রুত সম্পর্কের ক্ষেত্রে আত্মসমালোচনা ভিত্তিক রসবোধ শারীরিকভাবে আকর্ষণীয় ব্যক্তির উপযোগ বাড়ায় বলে দেখা গেছে। ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে একটি নির্দিষ্ট সম্পর্কের সহযোগীর উপযোগিতা বৃদ্ধির জন্য রসবোধ সহায়তা করে, কিন্তু এটা তখনি কাজ করে যখন পুরুষরা কৌতুক করে এবং নারীরা তা মূল্যায়ন করে। পুরুষদের অধিক রসবোধসম্পন্ন নারীদের জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দের ক্ষেত্রে যেমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি ঠিক তেমনি নারীদের রসবোধসম্পন্ন অন্য নারীদের সুপ্ত সঙ্গী হিসেবে পছন্দ করার পক্ষেও প্রমাণ অনুপস্থিত। যখন নারীদের বাধ্য-নির্বাচন পরিকল্পনা দেয়া হয়েছিল, তখন রসবোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের কম সৎ এবং বুদ্ধিমান ভাবার পরও তাদের ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করেছিল। পোষ্ট-হক বিশ্লেষণ কৌতুকের গুন এবং অনুকূল সিদ্ধান্তের মধ্যে কোনও সম্পর্ক দেখায় না।

মনস্তাত্ত্বিক কল্যাণ

সাধারণভাবে মনে করা হয় রসবোধ উচ্চতর মানবিক সুখী (শারীরিক এবং মনস্তাত্ত্বিক উভয়ই) হওয়াতে সাহায্য করে। রসবোধ এবং মনস্তাত্ত্বিক কল্যাণের উপর পূর্বের গবেষণা বলে যে উচ্চতর মনস্তাত্ত্বিক কল্যাণ অর্জন এবং রক্ষা করতে রসবোধ বস্তুত প্রধান ভূমিকা পালন করে। এই প্রকল্প রসবোধের সাধারন পদ্ধতিগত প্রকল্প নামে পরিচিত। যেটা বোঝায়, ইতিবাচক হাস্যরস ইতিবাচক স্বাস্থ্য আনয়ন করে। কিন্তু রসবোধ যে বস্তুত অধিক ভালো মনস্তাত্ত্বিক কল্যাণের কারন এই দাবিকে সমসাময়িক সব গবেষণা মেনে নেয় নি। পূর্বের কিছু গবেষকের এই সীমাবদ্ধতা ছিল যে রসবোধকে সবসময় ইতিবাচক হিসেবে ধরে নেয়ার কারনে তারা রসবোধের একটি একমাত্রিক উপায় হিসেবে ব্যবহার করতে বেশি ঝুঁকতেন। তারা কৌতুকের প্রকার এবং তার শৈলী বিবেচনা করেন নি। উদাহরণস্বরূপ, স্ব-পরাজিত অথবা আক্রমনাত্মক হাস্যরস। গবেষণায় দেখা যায় ২ প্রকারের রসবোধ, যার প্রতিটি ২ টি শৈলী দ্বারা তৈরি, সর্বমোট ৪ টি শৈলী তৈরি করে। এই দুই প্রকার হচ্ছে অভিযোজিত বনাম অ-অভিযোজিত হাস্যরস। অভিযোজিত হাস্যরস পদ্ধতিগত এবং স্ব-বৃদ্ধিকারী হাস্যরসের সমন্বয়ে এবং অ-অভিযোজিত হাস্যরস স্ব-পরাজিত এবং আক্রমনাত্মক হাস্যরসের সমন্বয়ে গঠিত। এই প্রত্যেক প্রকার শৈলী একজন ব্যক্তির সামগ্রিক মনস্তাত্ত্বিক এবং ব্যক্তিত্বগত সুখের উপর বিভিন্ন প্রভাব ফেলতে পারে।

  1. সম্মিলিত শৈলী হাস্যরস। এই প্রকারের হাস্যরসসম্পন্ন ব্যক্তিদের কৌতুককে সম্পর্কযুক্ত সম্পর্ক, অপরকে অভিভূত করা এবং দুশ্চিন্তা কমানোর একটা মাধ্যম হিসেবে নেয়ার প্রবণতা থাকে।
  2. স্ব-উন্নত শৈলী হাস্যরস। এই প্রকারের মানুষেরা জীবনকে একটি হাস্যময় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে থাকে। স্ব-উন্নত হাস্যরসের মানুষেরা হাস্যরসকে দুশ্চিন্তা কমানোর একটি উপায় হিসেবে ব্যবহার করে।
  3. আক্রমণাত্মক হাস্যরস। মজা পাওয়ার জন্য বর্ণবাদী কৌতুক, ব্যঙ্গ এবং অপরকে হেয় করা। এই ধরণের হাস্যরস সেইসব মানুষ ব্যবহার করে যারা যারা তাদের কৌতুকের পরিনাম সম্পর্কে চিন্তা করে না এবং প্রধানত শ্রোতার বিনোদনের দিকেই নজর দেয়।
  4. আত্ত্ব-হেয়মূলক হাস্যরস। এই ধরণের হাস্যরসের মানুষেরা আত্ত্ব-হেয়মূলক কৌতুকের মাধ্যমে অপরকে আনন্দ দিতে সচেষ্ট থাকে এবং যখন উপহাসিত হয় তখন সবার সাথে তারাও হাসিতে যোগ দেয়। ধারণা করা হয় যে, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যম হিসেবে মানুষ এই ধরণের হাস্যরস ব্যবহার করে থাকে। এটাও বলা হয়ে থাকে যে এই ধরণের মানুষের মাঝে একটা উহ্য নেতিবাচক অনুভূতি থাকে। তাই তারা এই হাস্যরসকে তারা তাদের গুঢ় নেচিবাচক অনুভুতিকে ঢেকে রাখার একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে।

হাস্যরস এবং মনস্তাত্ত্বিক কল্যাণের উপর গবেষণায় জানা যায় উচ্চস্তরের অভিযোজিত হাস্যরস (সম্মিলিত এবং স্ব-উন্নত উভয়ই) উন্নত আত্ত্ব-মর্যাদা, ইতিবাচক প্রভাব, অধিক স্ব-পারদর্শিতার সাথে দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার সাথে সম্পর্কযুক্ত। এগুলোর সবই মনস্তাত্ত্বিক কল্যাণের উপাদান। এছাড়াও, সংযোজিত হাস্যরস মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা থাকার পরেও মানুষকে তাদের কল্যাণের ব্যাপারে সজাগ রাখতে পারে। অপরদিকে, অ-অভিযোজিত হাস্যরস (আক্রমনাত্মক এবং আত্ত্ব-হেয়মূলক) তুলনামূলক খারাপ মনস্তাত্ত্বিক কল্যাণের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেটা অধিক দুশ্চিন্তা এবং হতাশা আনয়ন করে। তাই বলা যায়, যদি হাস্যরস নেচিবাচক চরিত্রের হয় তবে সেটা মনস্তাত্ত্বিক কল্যাণের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

শারীরবৃত্তীয় প্রভাবসমূহ

সাধারনভাবে কঠিন এবং দুর্বোধ্য পরিস্থিতি সহজ করতে এবং সামাজিক পরিবেশ স্বাভাবিক করতে হাস্যরস প্রায়ই ব্যবহৃত হয়। অনেকেই এটাকে ইতিবাচক এবং আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা বলে বিশ্বাস করে যার কারনে শরীরের উপর ইতিবাচক শারীরবৃত্তীয় প্রভাবের উপর হাস্যরসের অবদান আছে ভাবাটা যুক্তিযুক্ত।

হাস্যরসের ইতিবাচক প্রভাব নির্ণয়ের এক পরীক্ষা, যেটা ছিল আসলে হাস্যরস এবং ব্যথা সহনশীলতার উপর সম্পর্ক নিরুপনে, ক্যারেন জিয়ের, বারবারা ভেল্কার এবং উলিবালদ রুচের দ্বারা ১৯৯৪ সালে পরিচালনা করা হয়েছিল।