মালবে

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

প্রাচীন মালব রাজবংশের সময় থেকেই মালব একটি পৃথক রাজনৈতিক অংশ ছিল। এটি বিভিন্ন রাজ্য ও রাজবংশ দ্বারা শাসিত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে অবন্তি রাজ্য, মৌর্য, মালভা, গুপ্ত, পরমার, মালওয়া সুলতান, মুগল ও মারাঠা। মালবে একটি প্রশাসনিক বিভাগ ছিল ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত, যখন ব্রিটিশ ভারতের মালওয়া এজেন্সিটি স্বাধীন ভারতের মধ্য ভারতের (মালওয়ায় নামে পরিচিত)সাথে মিশে গিয়েছিল।

যদিও ইতিহাসে এর রাজনৈতিক সীমানার উত্থান-পতন অনেকবার ঘটেছে, তবুও এই অঞ্চলের নিজস্ব পৃথক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে , যা রাজস্থানী, মারাঠি ও গুজরাটি সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত। ভারতীয় ইতিহাসের বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তি, কবি ও নাট্যকার কালিদাস, লেখক ভর্তিহরি, গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী বরাহমিহির ও ব্রহ্মগুপ্ত এবং বহুবিদ্যাজ্ঞ রাজা ভোজ মালবকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। প্রাচীনকালে উজ্জয়িনী ছিল এই অঞ্চলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক রাজধানী আর বর্তমানে ইন্দোর বৃহত্তম শহর ও বাণিজ্য কেন্দ্র।

মূলত কৃষিকাজই ছিল মালবের মানুষের মূল জীবিকা। এ অঞ্চল ছিল পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আফিম উৎপাদক। গম ও সয়াবিন এখানে অন্যতম অর্থকরী ফসল, এবং বস্ত্র উৎপাদনও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প।

ইতিহাস

আদি প্রস্তর যুগের ও লোয়ার প্যালিওলিথিক যুগের বিভিন্ন চিহ্ন পূর্ব মালবে আবিষ্কৃত হয়েছে। মালব নামটি এসেছে প্রাচীন ভারতীয় গোষ্ঠী মালাভাস থেকে। বলা হয় মালব শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ মালভ থেকে, যার অর্থ "লক্ষ্মীর গৃহের অংশবিশেষ"। সপ্তম শতাব্দীর চীনা পরিব্রাজক ইউএনসাঙের বর্নিত মালব বা মহলো বর্তমানে বর্তমান গুজরাট বলে চিহ্নিত হয়েছে। বিভিন্ন এ্যারেবিক দস্তাবেজে এই অঞ্চল মালিবা বলে বর্নিত হয়েছে, যেমন ইবন আসিরের কামিলুল-ত-তাহরিকে।

মালব সংস্কৃতি ছিল চ্যালকোলিথিক পূরাত্ত্বাতিক সংস্কৃতি, যা মালওয়া অঞ্চলে বিদ্যমান ছিল, একইভাবে পার্শবর্তী দক্ষিণ মহারাষ্ট্রের বিদ্যমান ছিল, খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী নাগাদ। উজ্জয়িনী, ঐতিহাসিকভাবে যা উজায়িনী এবং অবন্তি নামে পরিচিত, ভারতের দ্বিতীয় নগরায়নের তরঙ্গের সাথে, খ্রীষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে মালব অঞ্চলে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দবিন্দু হিসেবে গড়ে ওঠে।

                             খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী নাগাদ উজ্জয়িনীর চারপাশে মাটির কেল্লা গড়ে তোলা হয়, যা ছিল মোটামুটি বড় আকারের। উজ্জয়িনী ছিল প্রাচীন ভারতের মহাজনপদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, অবন্তী রাজ্যের রাজধানী। মহাভারতের পরবর্তী সময়ে, খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে অবন্তী, পশ্চিমভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য, শাসিত হত হৈহয়দের দ্বারা, যারা পশ্চিমভারতে নাগ শক্তিকে পরাজিত করেছিল। 

খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যভাগে এই অঞ্চল নন্দ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়, যা ছিল মৌর্য সাম্রাজের অংশ। অশোক, যিনি পরবর্তীকালে মৌর্য সাম্রাজের অধিপতি হয়েছিলেন, নিজ যৌবনকালে উজ্জয়িনীর অধিকর্তা হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। খ্রীষ্টপূর্ব ২৩২ সনে সম্রাট অশোকের মৃত্যুর পর, মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়। যদিও কোন সুনিদৃষ্ট প্রমান নেই, তবে মনে করা হয় প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীতে মালব সম্ভবত কুষান, শাক্য ও সাতবাহন রাজবংশের অধীনে ছিল। প্রথম তিন শতাব্দী জুড়ে এই অঞ্চল পশ্চিমী ক্ষত্রাপ এবং সাতবাহনদের মধ্যে বিরোধের কারন ছিল।প্রথম শতাব্দীতে উজ্জয়িনী একটি প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়।

চন্দ্রগুপ্ত দ্বিতীয় (৩৭৫-৪১৩) যিনি বিক্রমাদিত্য নামেও পরিচিত, পশ্চিমী ক্ষত্রাপদের বিতারিত করে মালবকে গুপ্ত সাম্রাজের অধীনে আনেন। মালবের ইতিহাসে গুপ্ত যুগ, সুবর্ণ যুগ রূপে চিহ্নিত হয়, যখন উজ্জয়িনী ছিল সাম্রাজ্যের পশ্চিম রাজধানী। কালিদাস, আয্যভট্ট ও বরহামিহির এঁদের কেন্দ্র করে, উজ্জয়িনী এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়, বিশেষত জ্যোতির্বিদ্যা এবং গনিতশাস্ত্রের । ৫০০ খ্রীষ্টাব্দে, গুপ্ত সাম্রাজ্য থেকে পৃথক হয়ে মালব পুনরায় এক স্বাধীন রাজ্য হিসাবে আবির্ভূত হয়, ৫২৮ খ্রিস্টাব্দে মালবের যশোবর্ধন হুনদের পরাজিত করেন, যারা উত্তর-পশ্চিম থেকে ভারত আক্রমণ করেছিলো। সপ্তম শতাব্দীতে এই অঞ্চল হর্ষের সাম্রাজ্যভুক্ত হয়, যা নিয়ে তার সাথে দাক্ষিণাত্যের বাদামির চালুক্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশির সাথে বিরোধ বাধে।

৭৫৬ খ্রীষ্টাব্দে গুজ্জর-প্রতীহাররা মালবে আসে। ৭৮৬ খ্রীষ্টাব্দে দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূট রাজারা এই অঞ্চল দখল করে,এবং এই নিয়ে দশম শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত রাষ্ট্রকূট এবং কনৌজের গুজ্জর-প্রতিহর রাজাদের মধ্যে বিরোধ চলতে থাকে। রাষ্ট্রকূট সাম্রাজের সম্রাট পরমার শাসকদের মালবের শাসনকর্তা হিসেবে নিযুক্ত করেন। দশম শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে মালওয়ার শাসক ছিলেন পরমার রাজারা, যারা ধর নামক স্থানে রাজধানী স্থাপন করেছিলেন।১০১০ থেকে ১০৬০ সাল পর্যন্ত রাজা ভোজ এর শাসক ছিলেন, যিনি ছিলেন মধ্যযুগীয় ভারতের মহান বহুবিদ্যাজ্ঞ রাজা; তাঁর লেখার অর্ন্তভুক্ত ছিল দর্শন, কাব্য, ঔষধ, পশুচিকিত্সা বিজ্ঞান, ধ্বনিবিদ্যা, যোগ এবং ধর্নুবিদ্যা। তাঁর শাসনাধিনে মালব ভারতের শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তাঁর উত্তরাধিকারীরা ১৩০৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন, এরপর দিল্লি সুলতান মালব জয় করেন। মালব দক্ষিণ ভারতের পশ্চিম চালুক্য সাম্রাজ্যের দ্বারা বহুবার আক্রান্ত হয়েছিল।

১৪০১ খ্রীষ্টাব্দে মোঘল বিজয়ী তৈমুর দিল্লী আক্রমণ করলে, সাম্রাজ্য ভেঙে যায়, সেই সুযোগে দিল্লী সুলতান অধীন মালবের পূর্বতন শাসক দিলাওয়ার খান সালে নিজেকে মালওয়া সুলতান ঘোষণা করেন। খান মালবে সুলতানি প্রতিষ্ঠা করে, এবং মান্ডুতে রাজধানী স্থাপন করেন, যা বিন্ধ্যপর্বতের নর্মদা নদীর উপত্যকা অবস্থিত। তার পুত্র এবং উত্তরাধিকারী, হোসেঙ শাহ (১৪০৫-৩৫), মান্ডুকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর পরিনত করেন। হোসেঙ শাহের পুত্র, গজনী খান, মাত্র এক বছরের শাসনকালে মাহমুদ খিলজী (১৪৩৬-৬৯) দ্বারা আক্রান্ত ও পরাজিত হন। খিলজী তার সাম্রাজ্যকে গুজরাট, রাজস্থান এবং দাক্ষিণাত্যে প্রসারিত করেন। মুসলিম সুলতানরা রাজপুতদের দেশে বসবাসের আমন্ত্রণ জানান। ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে সুলতান রাজপুতদের ক্রমবর্ধমান বিরুদ্ধে গুজরাটের সুলতানের সাহায্য প্রার্থনা করেন, অন্যদিকে রাজপুতরা মেবারের শিশোদিয়া রাজপুত রাজবংশের সমর্থন পেয়েছিলেন।

                               ১৫১৮ খ্রীষ্টাব্দে গুজরাত মান্ডু আক্রমণ করে। ১৫৩১ খ্রীষ্টাব্দে, গুজরাতের বাহাদুর শাহ, মান্ডু আক্রমন করেন এবং দ্বিতীয় মাহমুদ (১৫১১-৩১)কে হত্যা করেন এবং এর পরেই মালবে সুলতানির পতন ঘটে। ১৫৬২ সালে মুঘল সম্রাট আকবর মালব আক্রমণ করে একে তার সাম্রাজ্যের একটি সুবা (প্রদেশ) পরিনত করেন। মালব সুবা ১৫৬৮ থেকে ১৭৪৩ খ্রীষ্টাব্দ অবধি বিদ্যমান ছিল। সপ্তদশ শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ে মান্ডু পরিত্যক্ত হয়।
                         ১৭০০ খ্রীষ্টাব্দের কাছাকাছি মুগল সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়লে মারাঠা শাসক প্রথম বাজি রাও-এর মারাঠা বাহিনী চিমনাজি আপ্পা, নেমাজি শিণ্ডে এবং চিমনাজি দামোদরের নেতৃত্বে প্রথমবার মহারাষ্ট্র সীমান্ত পার হয়ে মালবে আক্রমণ চালায় ১৬৯৮ খ্রীষ্টাব্দে। পরবর্তীকালে, ১৭২৪ খ্রীষ্টাব্দে মালহা রাও হোলকার (১৬৯৪-১৭৬৬) মালবে মারাঠা বাহিনীর নেতা হন এবং ১৭৩৩ খ্রীষ্টাব্দে মারাঠা পেশোয়া তাকে এই অঞ্চলের শাসক হিসেবে  নিয়োগ করেন, যা ১৭৩৮ খ্রীষ্টাব্দে আনুষ্ঠানিকভাবে মুগলদের দ্বারা হস্তান্তরিত হয়। রানাজি সিন্ধিয়া, প্রসিদ্ধ মারাঠা সেনাপতি , ১৭২১ এ উজ্জয়িনীতে তাঁর সদর দফতর স্হাপন করেন। পরবর্তী কালে এই দৌলতরাও সিন্ধিয়া দ্বারা এই রাজধানী গোয়ালিয়র রাজ্যে স্থানান্তরিত করেন। আরেকজন মারাঠা সেনানায়ক আনন্দ রাও পাওয়ার, ১৭৪২ খ্রীস্টাব্দে ধরের রাজা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন, এবং দুই পাওয়ার ভ্রাতা দিবাস রাজ্যের রাজা ছিলেন।

১৮ শতকের শেষের দিকে, মালব প্রতিদ্বন্দ্বী মারাঠা শক্তি এবং পিন্ডারিদের মধ্যে লড়াইয়ের স্থান হয়ে ওঠে, যারা ছিল মূলত অনিয়মিত লুন্ঠনকারী। ব্রিটিশ সেনানায়ক লর্ড হেস্টিংস পিন্ডারিদের দমন করেন এবং স্যার জন ম্যালকমের অধীনে পুনরায় এই অঞ্চলে স্থিতাবস্থা আসে। ১৮১৮ খ্রীষ্টাব্দে তৃতীয় এ্যাংলো-মারাঠা যুদ্ধে মারাঠারা পরাজিত হবে ব্রিটিশ রাজের করদ রাজ্যে পরিনত হবার আগে পর্যন্ত হোলকার রাজবংশ ইন্দোর থেকে মালব এবং নর্মদা তীরবর্তী মহেশ্বর শাসন করতেন।

১৮১৮ খ্রীষ্টাব্দে ব্রিটিশরাজ মধ্যভারতের বিভিন্ন করদ রাজ্যগুলিকে একত্রিত করে কেন্দ্রীয় ভারতীয় এজেন্সি গড়ে তোলে; মালব এজেন্সি কেন্দ্রীয় ভারতের একটি বিভাগ ছিল, যার এলাকা ছিল ২৩১০০ স্কোয়ার কিলোমিটার এলাকা (৮,৯০০ বর্গ মাইল) এবং ১৯০১ সালে জনসংখ্যা ছিল ১,০৫৪,৭৫৩। এটি দিবাস রাজ্য (সিনিয়র এবং জুনিয়র শাখা), জওরা, রতলম, সিতামৌ ও শেইলানা, এবং একসঙ্গে গোয়ালিয়রের একটা বড় অংশ, ইন্দোর ও টঙ্কের কিছু অংশ এবং প্রায় 35 টি ছোট্ট এস্টেট এবং নিয়ে গড়ে উঠেছিল। নেমুচ থেকে এই অঞ্চল শাসিত হত।

১৯৪৭ এ ভারতের স্বাধীনতার পর হোলকার ও অন্যান্য করদ রাজ্য ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়, এবং মালবের বেশিরভাগ অংশ নতুন রাজ্য মধ্যভারতের সাথে সংযুক্ত হয়, যা ১৯৫৬ সালে মধ্যপ্রদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়।

ভূগোল মালব

অঞ্চলটি ছড়িয়ে রয়েছে পশ্চিম মধ্যপ্রদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব রাজস্থান (২১ ° ১০'উত্তর  ৭৩ ° ৪৫'পূর্ব/২১.১৬৭ ° উত্তর ৭৩.৭৫০ ° পূর্ব  এবং ২৫ ° ১০'উত্তর  ৭৯ ° ১৪' পূর্ব  /

২৫.১৬৭ ° উত্তর ৭৯.২৩ ° পূর্ব ), পশ্চিম গুজরাটের বিরাট এলাকা জুড়ে। এই অঞ্চলটি মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রদেশের আগর, দিবাস, ধর, ইন্দোর, ঝাবুয়া, মান্দাসোর, নেমুচ, রাজগড়, রতলম, শাজাপুর, উজ্জয়িনী প্রভৃতি জেলা গুনা ও সিহোরের কিছু অংশ এবং রাজস্থানের ঝালাওয়ার জেলা এবং কোটা, বানসওয়ারা এবং প্রতাপগড়ের কিছু অংশ।

                    মালবের উত্তর-পূর্বে রয়েছে হাওতি অঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমে মেবার,  পশ্চিমে ভগাদ অঞ্চল ও গুজরাট দক্ষিণ ও পূর্বের বিন্ধ্যপর্বত এবং উত্তরে বুন্দেলখন্ড। 

এই মালভুমি মূলত দাক্ষিণাত্য মালভুমির অংশ, যা ক্রিটেসিয়াস যুগের শেষের দিকে ৬ কোটি থেকে ৬.৮ কোটি বছর আগে গড়ে উঠেছিল। এই অঞ্চলের মাটি প্রধানত কালো, বাদামি এবং ভরতী (পাথুরে) মাটি। আগ্নেয়পাথরের মত কালো রঙের মাটির কারন হল এখানের মাটিতে লৌহ আকরিকের আধিক্য, যা এসেছে ব্যাসল্ট থেকে।উচ্চ আর্দ্রতা ধারণ ক্ষমতার কারনে এই মাটিতে সেচের প্রয়োজন কম। বাকি দুধরনের মাটিতে বালির পরিমাণ বেশি এবং তুলনায় নরম।

মালভুমির গড় উচ্চতা ৫০০ মিটার। ৮০০ মিটার উচ্চতায় কিছু শিখর রয়েছে সিগার (৮৮১ মিটার), জনপভ (৮৫৪ মিটার) এবং গাজারি (৮১০ মিটার)। এই মালভুমির ঢাল উত্তর দিকে, আর পশ্চিমদিকে প্রবাহিত মাহী নদী, অন্যদিকে চম্বল নদী প্রবাহিত হয়েছে মধ্যভাগ দিকে এবং বেতোয়া, ধেসান ও কেন নদীগুলি পূর্বদিকে প্রবাহিত। শিপ্রা নদী ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এর তীরে প্রতি ১২ বছর বাদে অনুষ্ঠিত সিমহস্ত মেলার জন্য। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নদীগুলি হল পার্বতী, গৌতম এবং ছোটি কালী সিন্ধ।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৫০ থেকে ৬০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিতির কারণে এখানে গ্রীষ্মকালে সন্ধ্যার তাপমাত্রা দিনের তুলনায় কম। এমনকি যদি দিনের তাপমাত্রা ৪২ থেকে ৪৩ ডিগ্রী সেলসিয়াসেও পৌঁছায়, তা হলেও রাতের তাপমাত্রা সবসময় ২০ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয় এবং যার কারনে এই অঞ্চলের তাপমাত্রা অন্য অঞ্চলের তুলনায় শীতল থাকে। সকালের ঠান্ডা বাতাস, কারামান এবং সন্ধ্যায় বাতাস, শাব-ই-মালওয়া, গ্রীষ্মকে তুলনায় বেশি সহনীয় করে তোলে। শাব-ই-মালওয়া, শব্দের অর্থ সন্ধ্যার মালওয়া (শাব থেকে শব্দটি এসেছে, রাতের জন্য উর্দুতে ব্যবহৃত হয়) মুগলরা প্রথম ব্যবহার করে। বছরে সাধারণত তিনটি ঋতু দেখা যায় ঃ গ্রীষ্মকাল, বর্ষাকাল এবং শীতকাল। গ্রীষ্মকাল চৈত্র মাস থেকে জৈষ্ঠ (মধ্য মার্চ থেকে মধ্য মে)। গ্রীষ্মকালীন গড় তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড, যা সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পেরিয়ে যায়। বর্ষা শুরু হয় আষাঢ়ের মাঝামাঝি থেকে (মধ্য জুন) বৃষ্টিপাত শুরু হয় এবং আশ্বিন (সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত চলে। বেশিরভাগ বৃষ্টি দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে হয়, পশ্চিম দিকে এই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৮০ সেন্টিমিটার এবং পূর্বে ১০.৫ সেন্টিমিটার। ইন্দোর ও পার্শবর্তী এলাকায় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৯০ সেন্টিমিটার। সাধারণত ৯০ থেকে ১৫০ দিন পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়, এই সময় দৈনিক তাপমাত্রা গড় ৩০ ডিগ্রীর নীচে থাকে তবে খুব কম সময়েই তা ২০ ডিগ্রীর নীচে নামে। তিন ঋতুর মধ্যে শীতকাল দীর্ঘতম, প্রায় পাঁচ মাস(মধ্য অশ্বিন থেকে ফাল্গুন, অর্থাৎ অক্টোবর থেকে মধ্য মার্চ)। এই সময় গড় দৈনিক সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রী থেকে ৯ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের মধ্যে থাকে, কোন কোন রাতে 3 ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের কম হয়ে যায়। কৃষকেরা বিশ্বাস করেন যে, পৌষ ও মাঘমাসে মাওতা নামক যে শীতল বাতাস বয়, তা গ্রীষ্মকালের শুরুর দিকে গম ও অঙ্কুর চাষের জন্য সহায়ক। এই অঞ্চল কাথিয়াবাড়-গিরের রুক্ষ বনভুমির অংশ।

উদ্ভিদ: এই অঞ্চল ক্রান্তীয় শুষ্ক বনভুমি, যেখানে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সেগুন (টেটোনা গ্র্যান্ডি) বন। প্রধান বৃক্ষ হল পলাশ, শিমুল, অ্যানোগিয়াসাস, অ্যাকোশিয়া, পিয়াল এবং গুগ্গুল। গুল্মজাতীয় গাছের মধ্যে রয়েছে প্রজাতি ফলসা, কুল, চিল্লা,ক্যাপারিস, উডফোর্ডিয়া, ফিলেনথাস এবং কারিসা।

বন্যপ্রাণী: সাম্বার (সারভেস ইউনিকালার), ব্ল্যাকব্যাক(অ্যানিলোপ সার্ভিকপরা), এবং চিঙ্কারা (গাজেলা বেনেটি) কিছু প্রজাতি। গত এক শতাব্দী ধরে, বনভুমি ধংস দ্রুততর হারে ঘটেছে, যা তীব্র জলের সমস্যা সৃষ্টি করছে।

জনসংখ্যা ২০০১ সালে মালবের জনসংখ্যা ছিল ১.৮ কোটি, এই অঞ্চলের জনঘনত্ব ২৩১/স্কোয়ার কিমি। বার্ষিক জন্ম হার ছিল ৩১.৬ প্রতি ১০০০ জনে, এবং মৃত্যুর হার ১০.৩। এখানে নবজাতকের মৃত্যুহার ৯৩.৮, যা মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের সামগ্রিক নবজাতকের মৃত্যু হারের তুলনায় সামান্য বেশি।

এই অঞ্চলের অসংখ্য উপজাতি রয়েছে, যেমন ভিল ও তাদের উপগোষ্ঠী, মেওস ভিল, বারেলাসএবং পতালিরস্-এবং মিন, যাদের ভাষা এবং জীবনযাত্রা এই অঞ্চলের অন্য জনবসতির থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই অঞ্চলের কিছু উপজাতি, বিশেষ করে কনজাররা, তাদের অপরাধমূলক কাজের জন্য ১৯ শতবে বিশেষভাবে চিহ্নিত ছিল। রাজস্থানের মারওয়ার অঞ্চলের এক যাযাবর গোষ্ঠী গদিয়া লোহার - যারা লোহার (কামার) হিসাবে কাজ করে- কৃষি মরসুমের শুরুতে কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি মেরামত ও বিক্রি করার জন্য এই অঞ্চলে আসে, গ্রাম ও শহরের বাইরে অস্থায়ীভাবে থামে এবং তাদের সাজানো গোযানে বসবাস করে। কালবেলিয়া রাজস্থান থেকে আগত আর একটি যাযাবর গোষ্ঠী, যারা প্রায়ই এ অঞ্চলে আসে।

মালবে, গুজরাটের শিয়া মুসলমানদের একটি শাখা দাউদী বোহারস উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় রয়েছে, যারা মূলত ব্যবসায়ী। স্থানীয় ভাষায় কথা বলার পাশাপাশি, বোহারসদের নিজস্ব ভাষা রয়েছে, লিসান আল-দাউত। পাতিদার, যারা মূলত পাঞ্জাবের কুর্মিদের থেকে এসেছে, প্রায় ১৪০০ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ গুজরাটে বসবাস শুরু করেছে, মূলত কৃষক। মারাঠা শাসনকালের কারনে মারাঠি জনসংখ্যাও যথেষ্ট । ইন্দোর, ধর, দিবাস ও উজ্জয়িনীতে মারাঠি ভাষাভাষীর জনসংখ্যা প্রচুর। প্রচুর সংখ্যক মারোয়ারি, জাঠ এবং রাজপুতরা এই অঞ্চলে বাস করে। সিন্ধিরা, যারা ভারত ভাগের পর এই অঞ্চলে বসবাস শুরু করে, এখানের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দক্ষিণ রাজস্থানের মত, এই অঞ্চলে অনেক জৈন রয়েছেন, যারা সাধারণত ব্যবসায়ী। এখানে অল্প সংখ্যক গোয়ান ক্যাথলিকর,অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, পাঞ্জাবি এবং পারসিস বা জোরাস্ট্রীয়ানরাও আছেন। পারসীরা মহোর বৃদ্ধি এবং বিবর্তনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, যার মধ্যে রয়েছে পারসী আগুন মন্দির এবং টাওয়ার অব সাইলেন্স।

অর্থনীতি ইন্দোর হল মালবের অর্থনৈতিক রাজধানী। মালব পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম আফিন উৎপাদক। এই ফসলের ফলে মালবের অর্থনীতির সাথে, পশ্চিম ভারতীয় বন্দর ও চীনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সংযোগ গড়ে ওঠে অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে, যার ফলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আসে। মালবের আফিম রপ্তানির পুরোটাই ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া অধিকার, যারা চীনে বাংলার আফিম সরবরাহ করত। এর ফলে ব্রিটিশ কোম্পানি মাদকের উৎপাদন ও বাণিজ্যের ওপর অনেক বিধিনিষেদ আরোপ করেছিল; ফলে গোপনে আফিম রপ্তানি শুরু হয়। চোরাকারবার ছড়িয়ে পড়লে ব্রিটিশরা বিধিনিষেদ তুলে নেয়। বর্তমানে এই অঞ্চল বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ আইনগত ভাবে আফিমের উৎপাদক। নেমুচ শহরে সরকারি মালিকানাধীন একটি আফিম এবং ক্ষার প্রস্তুত কারক কারখানা রয়েছে। তবুও, এখনও যথেষ্ট পরিমাণ বেআইনি আফিম উৎপাদিত হয়, যা কালো বাজারে রপ্তানি হয়। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যুরো অফ নারকোটিকসের সদর দপ্তর গোয়ালিয়রে অবস্থিত। ১৮৭৬ ​​সালে রাজপুতানা-মালওয়া রেলওয়ে খোলা হয়। এটি মূলত কৃষিনির্ভর অঞ্চল। এখানের কিছু অংশের বাদামি মাটি উনালু(প্রারম্ভিক গ্রীষ্মকালীন) ফসল, যেমন গম, ছোলা এবং তিল প্রভৃতি ফসলের জন্য বিশেষভাবে উপযুক্ত। তুলনামূলকভাবে অনুর্বর মাটি, সিয়ালো (প্রারম্ভিক শীতকালীন) ফসল বাজরা, ভুট্টা, মুগ বীজ , উরাত, মটরশুঁটি এবং চিনাবাদাম চাষের জন্য ব্যবহৃত হয়। সামগ্রিকভাবে, প্রধান শস্য হল জোয়ার, চাল, গম, বাজরা, চিনাবাদাম, ডাল, সয়াবিন, তুলা, তিসি, তিল এবং আখ। ছোট শহরগুলিতে প্রচুর সংখ্যক চিনিকল গড়ে উঠেছে। কালো, আগ্নেয় মৃত্তিকা তুলা চাষের পক্ষে সম্পূর্ণ উপযুক্ত, এবং বস্ত্র উৎপাদন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। বস্ত্র উৎপাদনের মূল কেন্দ্রগুলি হল ইন্দোর, উজ্জয়িনী এবং নাগদা। মহেশ্বর বিখ্যাত তার অসাধারন মহেশ্বরী শাড়ির জন্য, আর মান্দসোর পরিচিত তার মোটা উলের কম্বলের জন্য। আদিবাসী সম্প্রদায়ের আয়ের একটি বড় উৎস হস্তশিল্প। রতলামের রঙিন গালার হস্তশিল্প, ইন্দোরের কাপড়ের পুতুল আর ইন্দোর ও উজ্জয়িনীর কাগজের মন্ডের সামগ্রী ইত্যাদি।

ভারতে একমাত্র মান্দসোর জেলাতেই সাদা এবং লাল রঙের স্লেট পাওয়া যায়, যা জেলার ১১০টি স্লেট পেন্সিল কারখানায় ব্যবহৃত হয়। এখানে একটি সিমেন্ট কারখানা আছে। তবে, অঞ্চলে খনিজ সম্পদের অভাব রয়েছে। এই অঞ্চলের শিল্পগুলি প্রধানত ভোগ্যপণ্যের উৎপাদক, তবে বর্তমানে ইন্দোর, নাগদা ও উজ্জয়িনীতে বড় এবং মাঝারি শিল্পের কারখানা গড়ে উঠেছে। ইন্দোরে ডিজেল ইঞ্জিন তৈরির একটি বড় কারখানা রয়েছে। ইন্দোর থেকে ২৫ কিমি দুরে অবস্থিত শিল্পশহর প্রীতমপুরা, প্রচুর সংখ্যক স্বয়ংক্রিয় শিল্পের কারখানা গড়ে ওঠায় যা ভারতের ডেট্রয়েট নামে খ্যাত। ইন্দোরকে মধ্যপ্রদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী এবং বস্ত্র ও কৃষি ভিত্তিক ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট এর ছয়টি কেন্দ্রের একটি এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির ষোলটি কেন্দ্রের মধ্যে একটি এখানে অবস্থিত।

সংস্কৃতি মালবের সংস্কৃতি, রাজস্থানি সংস্কৃতির দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছে, তাদের ভৌগলিক নৈকট্যের কারণে । মারাঠা শাসনের কারণে মারাঠা প্রভাবও দেখা যায়। মালবের মূল ভাষা মালভী, যদিও হিন্দী, শহরে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। ইন্ডো-ইউরোপীয় ভাষাটি ইন্ডো-আর্য ভাষারই উপবিভাগ। এই ভাষা কখনও মালাবি বা উজেনি নামে পরিচিত। মালবি, রাজস্থানী ভাষারই একটি শাখা; মধ্যপ্রদেশ এবং রাজস্থানের নিমার অঞ্চলে নিমাডি ভাষা প্রচলিত। বর্ণানুক্রমিকভাবে,মালবির উপভাষাগুলি হল বাকদি, ভৈয়ারী, ধোলেওয়ারী, হোশঙ্গাবাদি, জামরাল, কাটিয়া, মালবী, পাতভি, রঙ্গারী, রঙ্গি ও সন্দ্বারি। ২০০১ সালে জরিপে কেবল চারটি উপভাষার সন্ধান পাওয়া গেছে, উজায়িনী (উজ্জয়িনী , ইন্দোর, দিবাস ও সেহোর জেলায়), রাজাওয়ারী (রতলম, মান্দসৌর ও নিমুচ), উমদওয়ারী (রাজগড়) এবং সন্ধওয়াড়ী (ঝালওয়ার, রাজস্থান)। মালওয়া জনসংখ্যার প্রায় ৫৫% সাক্ষর করতে পারেন এবং প্রায় ৪০% জনগন হিন্দী ভাষায় শিক্ষিত, যা মধ্যপ্রদেশের রাজ্য ভাষা।

মালবের ঐতিহ্যবাহী রন্ধনপ্রণালীর উপর রাজস্থানী, গুজরাটি এবং মহারাষ্ট্রীয় রান্নার প্রভাব আছে। ঐতিহ্যগতভাবে, জোয়ার ছিল প্রধান খাদ্যশস্য, তবে ভারতে সবুজ বিপ্লবের পর জোয়ারের পরিবর্তে গম প্রধান খাদ্যশস্যে পরিণত হয়; অনেকেই এখানে নিরামিষাশী। যেহেত সারা বছর জলবায়ু সাধারণত শুষ্ক থাকে, তাই অধিকাংশ জনগন ডালের মত সংরক্ষিত খাদ্যে উপর নির্ভরশীল এবং তুলনায় সবুজ শাকসবজি কম ব্যবহৃত হয়। মালবের একটি জনপ্রিয় খাবার ভুট্টে কী ক্ষীর (গুড়ো করা ভুট্টা ঘি তে ভেজে এবং পরে দুধ ও অন্যান্য মসলা দিয়ে প্রস্তুত করা হয়)।
চাক্কি রি শাক গমের মণ্ড দিয়ে তৈরী হয়, যা জলে ধুয়ে, সিদ্ধ করা হয় এবং তারপর দইয়ের সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করা হয়। মালবের ঐতিহ্যবাহী রুটি বাটি / বাফলা নামে পরিচিত, যা মূলত একটি ছোট, আটার বল, ঘুঁটের আগুনে পুড়িয়ে বানানো হয়। বাটি সাধারণত ডালের সাথে খাওয়া হয়, অন্যদিকে বাফলা ঘি মাখিয়ে এবং ডাল দিয়ে খাওয়া হয়। আম্লি রি কারির করি দইএর পরিবর্তে তেঁতুল দিয়ে বানানো হয়। ধর্মীয় উৎসবের সময় গম দিয়ে টাপু নামক এক ধরনের মিষ্টি তৈরি করা হয়। মিষ্টি থুল্লি সাধারণত দুধ বা দই সঙ্গে খাওয়া হয়। ঐতিহ্যবাহী মিষ্টিগুলি হল, মাওয়া-বাটি (দুধের  মিষ্টি গোলাপ জ্যামুনেরর মত), কাপরাপাক (নারকেলের মিষ্টি), শ্রীখন্ড (দইএর মিষ্টি) এবং মালপোয়া।

লাবণী, দক্ষিণ মালবে প্রচলিত লোকসঙ্গীত, যা মারাঠারা এখানে নিয়ে আসে। নিরগুনী লাবনী (দার্শনিক) এবং শৃঙ্গারী লাবনী (প্রেমিক), লাবনীর দুই প্রধান ঘরানা। ভিলদের নিজস্ব লোকসঙ্গীত আছে, যা নৃত্য সহকারে পরিবেশিত হয়। মালবের লোকগীতির ছন্দ চার বা পাঁচ তালের উপর ভিত্তি করে গঠিত এবং বিরল ক্ষেত্রে ছয়টির উপর। ভক্তিমূলক সঙ্গীত নিরগুনী মালব জুড়ে জনপ্রিয়। রাজা ভোজের এবং বিজরির কিংবদন্তী, কানজার মেয়ে, এবং বালাবুর গল্প লোকগীতির জনপ্রিয় বিষয়বস্তু। মালবে সঙ্গীতে স্তব প্রচলিত আছে, যা মূলত চার প্রকারের ঃ মন্ত্র স্তব, বর্ণ স্তব, শব্দ স্তব এবং বাক্য স্তব।

গুপ্ত যুগে এবং পরবর্তীকালে সংস্কৃত সাহিত্যের কেন্দ্র ছিল মালব। এ অঞ্চলের সবচেয়ে বিখ্যাত নাট্যকার, কালিদাস, সর্বশ্রেষ্ঠ ভারতীয় লেখক বলে গন্য হন। তাঁর প্রথম নাটক মালবিজ্ঞাগ্নিমিত্রা (মালবিকা এবং অগ্নিমিত্রা)। কালিদাসের দ্বিতীয় নাটকটি তার সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ , অভিজ্ঞানশকুন্তলম, যেটি রাজা দুষমন্তের গল্প নিয়ে রচিত, যিনি একাকী সুন্দরী শকুন্তলার প্রেমে পড়েন। কালিদাসের শেষ নাটকগ বিক্রমউর্বশী ("উর্বশী বিজয়ের কাহিনী ")। কালিদাস এছাড়াও বেশকিছু মহাকাব্য রচনা করেছেন, রঘুবংশম ("রঘুর রাজবংশ"), ঋতুসংহার এবং কুমারসম্ভব ("যুদ্ধের দেবতার জন্ম"), এবং মেঘদূত ("মেঘের দূত") নামের।

মালওয়ায় একটি জনপ্রিয় নৃত্য হল সোয়ং; যার উদ্বব খ্রীষ্টপূর্ব প্রথমশতাব্দীতে। যেহেতু সেইসময় নারীরা নাচ বা নাটকে অংশগ্রহণ করত না, পুরুষরা তাদের ভূমিকা পালন করত। সোয়াং এর মধ্যে নাটক এবং ভাঁড়ামি, গান এবং সংলাপ দ্বারা সবই থাকে। এই ধারাটি অঙ্গসঞ্চালন ভিত্তিক নয় বরং সংলাপ-ভিত্তিক।

মানদানা (আক্ষরিকভাবে অঙ্কন শিল্প) দেওয়াল এবং ভুমি চিত্র হল মালবের বিখ্যাত চিত্রকলার ঐতিহ্য। লাল মাটি এবং গরুর গোবর মিশিয়ে সাদা ভিত্তির উপর বিপরীতধর্মী চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। ময়ূর, বিড়াল, সিংহ, গুজরাটি, বাবরী, স্বস্তিকা এবং চৌকি মোটিফ ব্যবহার করা হয়। সাঞ্জা হল একপ্রকার ধর্মীয় দেওয়াল চিত্র, যা যুবতী মেয়েদের দ্বারা নির্মিত হয় বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে, যখন হিন্দুরা তাদের পূর্বপুরুষদের স্মরণে করে। মালবের ক্ষুদ্র চিত্রকলা প্রসিদ্ধ তার সুক্ষ কাজের জন্য। ১৭ শতকের মাঝামাঝি সময়, রাজস্থানি মিনিয়েচার চিত্রশৈলীর একটি শাখা, যা মালব চিত্রশিল্প বলে খ্যাত, মূলত মালব ও বুন্দেলখণ্ড কেন্দ্রিক ছিল। এই ধারায় একদম প্রথমদিকের উদাহরনগুলি দেখতে পাওয়া যায়, যেমন রসিকপ্রিয়া ধারা ১৬৩৬ (প্রেমের অনুভূতি বিশ্লেষণের কবিতা) এবং অমুর সাতকা (১৭ শতকের সংস্কৃত কবিতা)। এই চিত্রশৈলীর ধারায় কালো এবং বাদামী পটভুমিতে বিভিন্ন রঙের সাহায্যে প্রানবন্ত চিত্র রচিত হত।

মালবের সবচেয়ে বড় উৎসব হল সিংহাস্ত মেলা, প্রতি ১২ বছর বাদে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে চার কোটিরও বেশি তীর্থযাত্রী শিপ্রা নদীতে স্নান করেন।ঘনঘৌর উদযাপিত হয় শিব এবং পার্বতির সম্মানে। এই উৎসবের উৎপত্তি রানো বাইয়ের সময়, যার পিতৃগৃহ ছিল এই মালবে, কিন্তু তার বিয়ে হয়েছিল রাজস্থানে। রানো বাই মালবকে খুব ভালোবাসতেন, তাই রাজস্থানে থাকতে চাইতেন না। বিয়ের পর, তাকে বছরে একবার মালবে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়; ঘনঘৌর এই বার্ষিক আগমনের প্রতীক। চৈত্র(মার্চ মাসের মাঝামাঝি) এবং ভাদ্রে (মধ্য আগস্ট) এই অঞ্চলের মহিলারা এই উৎসব পালন করেন। গাদলিয়া (মাটির পাত্র) উৎসব এই অঞ্চলের মেয়েদের করে, যারা সন্ধ্যায় তাদের গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে ঘুরে বেড়ায়, মাটির ফুটো করা পাত্রের মধ্যে তেলের প্রদীপ নিয়ে। প্রত্যেক বাড়ির সামনে, মেয়েরা গাদলিয়া সম্পর্কিত গান করে, এবং তার বদলে খাদ্য বা অর্থ পায়। গোদ্ধান উৎসব কার্তিক মাসের ১৬ তম দিনে পালিত হয়। এ অঞ্চলের ভিলরা হিডা গান করে, যা গবাদিপশু নিয়ে লেখা আর নারীরা কৃষ্ণ প্রেম সংক্রান্ত চন্দ্রওয়ালী গান গায়। 
             সবচেয়ে জনপ্রিয় মেলা ফাল্গুন, চৈত্র, ভাদ্র, আশ্বিন ও কার্তিক মাসে হয়। মালব অঞ্চলের দুই ডজন গ্রামে বায়োরার চৈত্র মেলা, এবং গল যাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। তেজানির জন্ম উপলক্ষে ভাদ্র মাসের দশম দিন ধরে অনেক মেলা হয়। রতলামে  ত্রিবেনী মেলা  হয় এবং অন্যান্য মেলা কার্তিকে অনুষ্ঠিত হয়, উজ্জয়িনী, মান্দসৌর(নিমাদ), অন্যান্য জায়গায়।

ভ্রমন মালবের প্রধান পর্যটন স্থান হল ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় স্থান। শিপ্রা নদী এবং উজ্জয়িনী শহর হাজার বছর ধরে পবিত্র বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। উজ্জয়িনীর মহাকাল মন্দির ১২ টি জ্যোতিলিঙ্গের মধ্যে একটি। উজ্জয়িনীতে ১০০ এর বেশি প্রাচীন মন্দির রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে হারসিদ্ধি, চিন্তমান গণেশ, গধ কালিকা, কাল ভৈরব এবং মঙ্গলনাথ। শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত কালিধের প্রাসাদ প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যের একটি চমৎকার নিদর্শন। ভর্তিহারি গুহাগুলির সাথে যুক্ত আছে আকর্ষণীয় কিংবদন্তী। খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকে উজ্জয়িনী ভারতের "গ্রিনিচ " রূপে খ্যাত, হিন্দু ভৌগোলিকদের মূলমধ্যরেখা হিসাবে। দ্বিতীয় জয় সিং দ্বারা নির্মিত ভারতের চারটি মানমন্দিরের একটি এখানে রয়েছে, যেখানে প্রাচীন জ্যোতিবিদ্যা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি রয়েছে। সিমহস্তা মেলা, প্রতি ১২ বছর অন্তর হয়, চৈত্রের পূর্ণিমার(এপ্রিল) দিন থেকে শুরু হয় এবং পরবর্তী পূর্ণিমা দিবস পর্যন্ত বৈশাখ (মে) চলতে থাকে।

মান্ডু মূলত পারমার শাসকদের দুর্গ রাজধানী ছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ দিকে, এটি মালবের সুলতানদের অধীনে আসে, প্রথম সুলতান এর নাম দেন সাদিয়াবাদ (আনন্দ নগর)। এটি রাজধানীর মতোই ছিল, এবং সুলতানরা এখানে জাহাজমহল ও হিন্দোলা মহল, কারূকার্যময় খাল, স্নানাগার এবং চমৎকার প্রাসাদ নির্মাণ করেছিল। বিশাল জামি মসজিদ এবং হুসেঙ শাহের কবরটি কয়েক শতাব্দী পরেও স্থপতিদের তাজমহলের নকশার অনুপ্রেরণা প্রদান করে। বাজ বাহাদুর ষোড়শ শতাব্দীতে মান্ডুতে এক বিরাট প্রাসাদ নির্মাণ করেন। অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপত্য গুলি হল রেওয়া কুন্ড, রূপমতীর প্রাসাদ, নীলকন্ঠ মহল, হাতি মহল, দ্বারা খানের সমাধি, দাই কা মহল, মারিক মুঘিত মসজিদ এবং জালি মহল।

মান্ডুর কাছে নর্মদা নদীর তীরে অবস্থিত মহেশ্বর রাজমাতা অহল্যা দেবী হোলকারের সময়ে ইন্দোর রাজ্যের রাজধানী ছিল। মারাঠা রাজোয়াদা(দুর্গ) এখানের প্রধান আকর্ষণ। দুর্গের মধ্যে রানী অহল্যার একটি প্রমান আকারের সিংহাসনে বসা মূর্তি আছে। মান্ডু ১৪০৫ সালে মালবের রাজধানী হওয়ার আগে ধর মালবের রাজধানী ছিল। যদিও সেই দুর্গ বর্তমানে সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত, কিন্তু তাও অসাধারন। ভোজসালা মসজিদ (১৪০০ খ্রীষ্টাব্দে নির্মিত) বর্তমানেও শুক্রবারে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হয়। পরিত্যক্ত লাট মসজিদ (১৪০৫) এবং কমল মৌলা (১৫ শতকের প্রথম দিকে), একটি মুসলিম সন্তের সমাধি,প্রসিদ্ধ স্থান।

আধুনিক ইন্দোরের পরিকল্পনাকার ও রূপকার হলেন রাজমাতা অহল্যা দেবী হোলকার। সুবৃহত লালবাগ প্যালেস এর অন্যতম অসাধারন স্থাপত্য। বাবা গনপতি মন্দিরে সম্ভবত বিশ্বের বৃহত্তম গনপতি মূর্তি টি আছে, যার পদপ্রান্ত থেকে মুকুট পর্যন্ত উচ্চতা ৭.৬ মিটার। কাঁচ মন্দির হল একটি জৈন মন্দির, যা সম্পূর্ণ কাঁদ দ্বারা অলঙ্কৃত। ১৯০৪ সালে টাউন হল, কিং এডোয়ার্ড হল প্রতিষ্ঠিত হয়, যেটা ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধী হল নামে নামাঙ্কিত হয়। মৃত হোরকার শাসক এবং তাদের পরিবারবর্গের স্মৃতিতে ছত্রী নামক সমাধি সৌধ নির্মিত হয়েছে। রতলম জেলার জাওরার উপকন্ঠে, জাওরার নবাব মোহাম্মদ ইফতিখার আলী খান বাহাদুর, হুসেন তেকরির তীর্থস্থান, নির্মাণ করেন ১৯ শতকে। মোহাম্মদ ইফতিখিল আলী খান বাহাদুর সেই একই কবরস্থানে সমাহিত হন, যেখানে হুসেন তেকরি সমাহিত ছিলেন। মহরমের মাসে, সারা পৃথিবীর হাজার হাজার মানুষ হযরত ইমাম হোসেন তীর্থস্থানে আসেন, যা ইরাকি মূলের প্রতিরূপ। এই স্থান মানসিক অসুস্থতার নিরাময় করতে হাজরি নামক অনুষ্ঠান জন্য বিখ্যাত।

খেলাধুলা ক্রিকেট এই অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়াগুলির মধ্যে অন্যতম। ইন্দোরে আছে মধ্য প্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্র। এই শহরে দুটি আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট মাঠ রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হল হোলকার ক্রিকেট স্টেডিয়াম। রাজ্যে প্রথম ওয়ানডে ম্যাচটি ইন্দোরে অনুষ্ঠিত হয়।