নাগর্নো-কারাবাখ যুদ্ধবিরতি চুক্তি- ২০২০

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
নাগর্নো-কারাবাখ যুদ্ধবিরতি চুক্তি- ২০২০
আজারবাইজান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি, আর্মেনিয়া প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী এবং রাশিয়ান ফেডারেশনের রাষ্ট্রপতির বিবৃতি
Ilham Aliyev, Russian President Vladimir Putin met in a videoconference format 3.jpg
ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইলহাম আলিয়েভ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চুক্তিতে স্বাক্ষর করছেন
ধরণআর্মিস্টাইস
প্রেক্ষাপট২০২০ নাগর্নো-কারাবাখ যুদ্ধ
স্বাক্ষর৯ নভেম্বর ২০২০ (2020-11-09)
কার্যকর১০ নভেম্বর ২০২০ (2020-11-10)
মধ্যস্থতাকারী
স্বাক্ষরকারী

নাগর্নো-কারাবাখ যুদ্ধবিরতি চুক্তি- ২০২০ একটি সশস্ত্র যুদ্ধাবসান চুক্তি যা ২০২০ সালের নাগর্নো-কারাবাখ যুদ্ধের অবসান ঘটায়। এটি ৯ই নভেম্বর আজারবাইজানের রাষ্ট্রপতি ইলহাম আলিয়েভ, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল প্যাসিনিয়ান এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন স্বাক্ষর করেন এবং মস্কোর সময় ১০ নভেম্বর, ০০:০০ থেকে নাগর্নো-কারাবাখ অঞ্চলে সমস্ত যুদ্ধ সমাপ্ত করে শান্তিচুক্তি কার্যকর হয়। স্ব-ঘোষিত আর্টসখ প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি আরিক হার্টিউইয়ানও সংঘাত বন্ধে সম্মত হয়েছেন।[১][২][৩]

পটভূমি[সম্পাদনা]

আর্মেনিয়া সমর্থিত স্ব-ঘোষিত আর্টসখ প্রজাতন্ত্র এবং আজারবাইজান এর মধ্যে নতুন করে ২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল। পরবর্তী ছয় সপ্তাহ ধরে আজারবাইজান একাধিক আঞ্চলিক লাভ করেছে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর শুশাকে দখল করতে সক্ষম হয়েছিল। ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর উভয়পক্ষ যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হন।[৪]

চুক্তির সারাংশ[সম্পাদনা]

চুক্তি অনুসারে, উভয় পক্ষই যুদ্ধাপরাধী ও নিহতদের বিনিময় করার উদ্যোগ নিয়েছিল। তদুপরি, আর্মেনিয়ান বাহিনীকে নাগর্নো-কারাবাখকে ঘিরে আর্মেনিয়ান-অধিকৃত অঞ্চলগুলি থেকে ১ ডিসেম্বরের মধ্যে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। রাশিয়ান স্থল বাহিনী থেকে প্রায় ২ হাজার রাশিয়ান শান্তিরক্ষা বাহিনী সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের জন্য এই অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে, এর অন্যতম কারণ ছিল লাচিন করিডোরের সুরক্ষা, যা আর্মেনিয়া এবং নাগরোণো-কারাবাখ অঞ্চলকে সংযুক্ত করে। অধিকন্তু, আর্মেনিয়ার সিউনিক প্রদেশের মূল ভূখণ্ডের মাধ্যমে আজারবাইজান এবং এর নাখচিভান উত্তোলনের মধ্য দিয়ে উত্তরণের "গ্যারান্টি সুরক্ষা" গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছিল। রাশিয়ান এফএসবি'স সীমান্ত বাহিনী করিডোরের পরিবহন যোগাযোগের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করবে।[৫][৬][৭]

চুক্তির শর্ত[সম্পাদনা]

  সংশ্লিষ্ট এলাকার বাইরে আজারবাইজান
  আর্মেনিয়া।
  নিয়ন্ত্রণে নেওয়া আজারবাইজান কর্তৃক দখলকৃত অঞ্চলগুলি।
  আগডাম জেলা; ২০ নভেম্বর নাগাদ আর্মেনিয়া দ্বারা সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছে
  কালবাজার জেলা: আর্মেনিয়া ২৫ নভেম্বরের মধ্যে সৈন্য সরিয়ে নিয়েছে।[৮]
  লাচিন জেলা: ১ ডিসেম্বর নাগাদ আর্মেনিয়া দ্বারা সৈন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল
  নাগরানো-কারাবাখ এর একটি অংশ যা আজারবাইজানীয় নিয়ন্ত্রণে নির্ধারিত অধিবেশন ছাড়াই।
  লাচিন করিডোর, রাশিয়ান শান্তিরক্ষীদের সাথে
                     নাগর্নো-কারাবাখের দুটি সংযোগ রাস্তা                      আর্মেনিয়া জুড়ে নতুন আজারি পরিবহন করিডোর প্রতিষ্ঠিত হবে                      নাগরানো-কারাবাখ যোগাযোগের লাইন 2020 বিরোধের আগে                      আর্টসখ দ্বারা দাবি করা অন্যান্য অঞ্চল

চুক্তিটিতে মোট ৯টি শর্ত বা ধারা রয়েছে,

  • প্রথম ধারা- ২০২০ সালের ১০ নভেম্বর মস্কো সময় রাত ১২টা থেকে নাগর্নো–কারাবাখের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে পূর্ণ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে, এবং আর্মেনীয় ও আজারবাইজানি সৈন্যরা তাদের বর্তমান অবস্থানে স্থির থাকবে।
  • দ্বিতীয় ধারা- ২০২০ সালের ২০ নভেম্বরের মধ্যে আর্তসাখ–অধিকৃত আগদাম জেলা আজারবাইজানের নিকট হস্তান্তর করা হবে।
  • তৃতীয় ধারা- 'নাগর্নো–কারাবাখ সংযোগরেখা' এবং 'লাচিন করিডোর' বরাবর রাশিয়া একটি শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করবে। এই বাহিনীটিতে ১,৯৬০ জন সৈন্য থাকবে, এবং বাহিনীটি হালকা অস্ত্র, ৯০টি আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার এবং ৩৮০টি অটোমোবাইল ও বিশেষ সরঞ্জামে সজ্জিত থাকবে।
  • চতুর্থ ধারা- যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আর্মেনীয় সৈন্য প্রত্যাহারের সমান্তরালে ঐ অঞ্চলে রুশ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা হবে। রুশ শান্তিরক্ষীরা পাঁচ বছর পর্যন্ত এই অঞ্চলে অবস্থান করবে। যদি পাঁচ বছর শেষ হওয়ার ৬ মাস আগে কোনো পক্ষ চুক্তিটির এই ধারা বাতিল করার আগ্রহ প্রকাশ না করে, তাহলে রুশ শান্তিরক্ষীদের অবস্থানের মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরো পাঁচ বছর বৃদ্ধি পাবে।
  • পঞ্চম ধারা- বিবদমান পক্ষ দুইটির মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির বাস্তবায়ন কার্যকর করার জন্য এবং যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি 'শান্তিরক্ষা কেন্দ্র' মোতায়েন করা হবে।
  • ষষ্ঠ ধারা- আর্মেনিয়া আজারবাইজানকে ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বরের মধ্যে কালবাজার অঞ্চল এবং ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বরের মধ্যে লাচিন অঞ্চল ফিরিয়ে দেবে। ৫ কি.মি. প্রশস্ত লাচিন করিডোর, যেটি আর্মেনিয়ার সঙ্গে নাগর্নো–কারাবাখের সংযোগ নিশ্চিত করে, রুশ শান্তিরক্ষী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে, এবং শুশা শহরের ক্ষেত্রে এই শর্ত প্রযোজ্য হবে না। পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে আর্মেনিয়া ও নাগর্নো–কারাবাখের মধ্যে যোগাযোগ নিশ্চিত করার জন্য লাচিন করিডোর বরাবর একটি নতুন রাস্তা নির্মাণ করা হবে, এবং রুশ শান্তিরক্ষীদের এই নতুন পথ বরাবর মোতায়েন করা হবে। আজারবাইজান লাচিন করিডোর দিয়ে যাতায়াতরত নাগরিক, যানবহন ও পণ্যসামগ্রীর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করবে।
  • সপ্তম ধারা- জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনারের কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে নাগর্নো–কারাবাখ এবং এর আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে শরণার্থীরা প্রত্যাবর্তন করবে।
  • অষ্টম ধারা- উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবন্দি, জিম্মি ও অন্যান্য বন্দি বিনিময় করবে, এবং উভয় পক্ষে নিজ নিজ পক্ষের নিহত সৈন্যদের মৃতদেহ বিনিময় করবে।
  • নবম ধারা- অঞ্চলটির সমস্ত অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ সংক্রান্ত সংযোগ উন্মুক্ত করা হবে। আর্মেনিয়া আজারবাইজানের পশ্চিমাঞ্চল এবং নাখচিভান স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্রের মধ্যে যোগাযোগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, এবং এতদঞ্চলের উভয় দিক থেকে মানুষ, যানবাহন ও পণ্যসামগ্রী যাতায়াত করতে পারবে। রাশিয়ার এফএসবির নিয়ন্ত্রণাধীন বর্ডার গার্ড সার্ভিস এই যোগাযোগ পথটির নিয়ন্ত্রণে থাকবে। উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে নাখচিভান স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্র ও আজারবাইজানের পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে নতুন যোগাযোগের পথ নির্মিত হবে।

প্রতিক্রিয়া[সম্পাদনা]

আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান এ চুক্তিকে তার এবং তার জনগণের জন্য 'খুবই বেদনাদায়ক' বলে আখ্যায়িত করেছেন।

আজারবাইজানের রাষ্ট্রপতি আলিয়েফ বলেছেন সমঝোতাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে এবং আর্মেনিয়া তা মেনে নিতে অনেকটা বাধ্য হয়েছে।

নাগোর্নো কারাবাখে আর্মেনিয়ান নেতা আরাইখ হারুতুনিয়ান বলেছেন দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে তিনি তার সম্মতি দিয়েছেন।

চুক্তির পরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারের বলেছেন, চুক্তি যাতে রক্ষিত হয়, তার দিকে নজর রাখা হবে। কোনো পক্ষই যাতে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করতে না পারে, সে দিকে নজর রাখা হবে। বিতর্কিত অঞ্চলে এবং দুই দেশের সীমান্তে রাশিয়ার প্রায় দুই হাজার সেনা মোতায়েন করা হবে। যারা শান্তির জন্য কাজ করবে। শুধু তাই নয়, যুদ্ধবন্দিদের দ্রুত হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হবে বলেও পুটিন জানিয়েছেন। জানিয়েছেন, আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজানের সীমান্ত খুলে দেওয়া হবে। যে সীমান্ত ব্লকেড তৈরি করা হয়েছিল, তা আর থাকবে না।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Путин выступил с заявлением о прекращении огня в Карабахе"RIA Novosti (রুশ ভাষায়)। ৯ নভেম্বর ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ৯ নভেম্বর ২০২০ 
  2. "Пашинян заявил о прекращении боевых действий в Карабахе"RIA Novosti (রুশ ভাষায়)। ৯ নভেম্বর ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ৯ নভেম্বর ২০২০ 
  3. "Президент непризнанной НКР дал согласие закончить войну"RIA Novosti (রুশ ভাষায়)। ৯ নভেম্বর ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ৯ নভেম্বর ২০২০ 
  4. "Armenian President says nation 'misjudged' its negotiating power in Nagorno-Karabakh conflict"SBS News 
  5. "Пашинян заявляет о подписании мирного соглашения"BBC Russian Service (রুশ ভাষায়)। ১০ নভেম্বর ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ১০ নভেম্বর ২০২০ 
  6. "Armenia, Azerbaijan and Russia sign Nagorno-Karabakh peace deal"BBC News। ১০ নভেম্বর ২০২০। সংগ্রহের তারিখ ১০ নভেম্বর ২০২০ 
  7. "Azerbaijan, Armenia sign peace deal to end conflict"GulfToday। ২০২০-১১-১০। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১১-১০ 
  8. "Azerbaijan extends Armenian pullout deadline from Kalbajar"Al Jazeera। ২০২০-১১-১৫। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১১-১৭ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]