কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভূমিকা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের ভূমিকা থেকে পুনর্নির্দেশিত)
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

কোয়ান্টাম বলবিদ্যা হচ্ছে অতি ক্ষু্দ্র বস্তু সম্পর্কিত বিজ্ঞান।এটি পরমাণু ও অতিপারমাণবিক কণার মানদন্ডের উপর ভিত্তি করে বস্তুর আচরণ এবং বস্তু ও শক্তির পারস্পরিক ক্রিয়ার ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করে।অপর দিকে,শাস্ত্রীয় পদার্থবিজ্ঞান কেবলমাত্র মানুষের অভিজ্ঞতার সাথে পরিচিত একটি মানদন্ডের উপর ভিত্তি করে পদার্থ এবং শক্তিসহ চাঁদের মতো জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কিত বস্তুসমূহের আচরণকে ব্যাখ্যা করে।শাস্ত্রীয় পদার্থবিজ্ঞানএখনও আধুনিক বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।তবে, উনিশ শতকের শেষের দিকে, বিজ্ঞানীরা বৃহত্তর(ম্যাক্রো) এবং ক্ষুদ্র(মাইক্রো) উভয় জগতে এমন কিছু ঘটনা আবিষ্কার করেন যা শাস্ত্রীয় পদার্থবিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে পারেনি।পর্যবেক্ষিত ঘটনা এবং শাস্ত্রীয় তত্ত্বের মধ্যে অসঙ্গতিগুলি সমাধানের আকাঙ্ক্ষায় পদার্থবিদ্যায় সংগঠিত হয়েছিল দুইটি বড় বিপ্লবঃ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এবংকোয়ান্টাম মেকানিক্স যা মূল বৈজ্ঞানিক দৃষ্টান্তে একটি আমূল পরিবর্তন সৃষ্টি করেছিল।এই নিবন্ধটি বিশ শতকের গোড়ার দিকের দশকে কীভাবে পদার্থবিজ্ঞানীরা শাস্ত্রীয় পদার্থবিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতাগুলি আবিষ্কার করেছিলেন এবং কোয়ান্টাম তত্ত্বের মূল ধারণাগুলি বিকশিত করেছিলেন তা বর্ণনা করেছে।এই নিবন্ধটি কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ধারণাগুলিকে মোটামুটি তাদের আবিষ্কারের ক্রম হিসাবে বর্ণনা করেছে।

আলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে কণার মতো আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তরঙ্গের ন্যায় আচরণ করে।মহাবিশ্বের উপাদানসমূহ যা ইলেক্ট্রন এবং পরমাণুর মতো কণা নিয়ে গঠিত তারাও তরঙ্গের ন্যায় আচরণ প্রকাশ করে। কিছু আলোক উৎস,যেমন নিয়ন লাইট,কেবলমাত্র নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো উৎপন্ন করে।কোয়ান্টাম বলবিদ্যা দেখায় যে আলোসহ অন্যান্য সকল বৈদ্যুতিক চৌম্বকীয় বিকিরণ এক প্রকার স্বতন্ত্র এককে আসে যা ফোটন নামে পরিচিত এবং এদের শক্তি, রঙ এবং বর্ণালী তীব্রতার হিসাব করে।একক ফোটন হচ্ছে তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের একটি কোয়ান্টাম বা ক্ষুদ্রতম পর্যবেক্ষণযোগ্য পরিমাণ কারণ আংশিক ফোটন কখনও দেখা যায়নি।আরও বিস্তৃতভাবে বলা যায় যে,কোয়ান্টাম বলবিদ্যা এটি দেখায় যে বিভিন্ন ধরনের পরিমাপ যেমন কৌণিক ভরবেগ যা শাস্ত্রীয় বলবিজ্ঞানের জুম আউট মানদন্ডে অবিচ্ছিন্ন মনে হলেও কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ছোট জুম-ইন মানদন্ডে এটি আসলে পরিমাপযোগ্য।কৌণিক গতি পরিমাপ করার জন্য একটি বিচ্ছিন্ন অনুমোদনযোগ্য মানের সেট গ্রহণ করতে হয়,এবং যেহেতু এই মানগুলির মধ্যে ব্যবধান এতই ক্ষুদ্র যে এদের বিচ্ছিন্নতা কেবলমাত্র পারমাণবিক স্তরেই ল্ক্ষনীয়।

কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অনেকগুলি দিক আপাতবিপরীত এবং অনির্দিষ্ট বলে মনে হতে পারে,কারণ তারা বৃহত্তর মানদন্ডে দেখা আচরণের থেকে একেবারে পৃথক আচরণ বর্ণনা করে।কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফেনম্যানের ভাষায়,কোয়ান্টাম মেকানিক্স প্রকৃতির সকল অবাস্তব জিনিস নিয়ে কাজ করে।উদাহরণস্বরূপ,কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অনিশ্চিয়তা নীতিটির অর্থ হলো কোনো কণার একটি মাপকাঠি(যেমন একটি কণার অবস্থান) যত সূক্ষভাবে নেওয়া হবে ওই একই কণার অন্য মাপকাঠি (যেমন এর গতিবেগ) ঠিক ততটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

প্রথম কোয়ান্টাম তত্ত্ব: ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক এবং ব্ল্যাক-বডি রেডিয়েশন[সম্পাদনা]

তাপীয় বিকিরণ হচ্ছে কোনও বস্তুর অভ্যন্তরীণ শক্তির কারণে বস্তুর পৃষ্ঠ থেকে নির্গত বৈদ্যুতিক চৌম্বকীয় বিকিরণ।যদি কোনো বস্তুকে পর্যাপ্ত পরিমাণে উত্তপ্ত করা হয় তবে সেটি লাল বর্ণের আলো ছড়াতে থাকে কারণ বস্তুটি প্রচন্ড উত্তাপের কারণে লাল বর্ণ ধারণ করে।

বস্তুটিকে আরো গরম করলে এর রং লাল থেকে হলুদ, সাদা এবং নীল রং-এ পরিবর্তিত হয় কারণ কারণ বস্তুটি ক্রমান্বয়ে ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের(উচ্চতর ফ্রিকোয়েন্সি)আলো নির্গত করে।একটি নিখুঁত নির্গমনকারী একটি নিখুঁত শোষকও বটেঃএটি যখন ঠান্ডা অবস্থায় থাকে তখন এ জাতীয় জিনিস পুরোপুরি কালো দেখায়, কারণ এটি তার উপর আপতিত সমস্ত আলো শোষণ করে নেয় এবং কোনো আলো নির্গত হয় না।ফলস্বরূপ, একটি আদর্শ তাপ নির্গমনকারী বস্তু একটি কালো পদার্থ হিসাবে পরিচিত এবং এটি থেকে যে রশ্মি বিকিরিত হয় তাকে ব্ল্যাক-বডি রেডিয়েশন বলে।

১৯ শতকের শেষদিকে,তাপীয় বিকিরণসমূহকে পরীক্ষামূলকভাবে বেশ ভালভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।তবে, শাস্ত্রীয় পদার্থবিজ্ঞানের রেলেইগ-জিন্স সূত্র উচ্চ তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের(কম ফ্রিকোয়েন্সি)পরীক্ষামূলক ফলাফলের সাথে একমত হলেও ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের(উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি) দৃড়ভাবে দ্বিমত পোষণ করে।পদার্থবিজ্ঞানীরা একটি একক তত্ত্ব অনুসন্ধান করেন যা পরীক্ষামূলকভাবে সমস্ত ফলাফল ব্যাখ্যা করে।

১৯00 সালে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক সর্বপ্রথম একটি মডেল তৈরী করেন যেটি তাপ বিকিরণের পূর্ণ বর্ণালী ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়।তিনি একটি গাণিতিক মডেলের প্রস্তাব করেন যেখানে তাপীয় বিকিরণ সমন্বয়পূর্ণ দোলক-এর একটি সেটের সাথে সাম্যাবস্থায় অবস্থান করে।পরীক্ষামূলক ফলাফলগুলি পুনর্গঠন করার জন্য,তাকে ধরে নিতে হয়েছিল যে প্রতিটি দোলক যেকোন যথেচ্ছ পরিমাণ শক্তি নির্গত করার পরিবর্তে একই বৈশিষ্ট্যযুক্ত ফ্রিকোয়েন্সিতে যেকোন পূর্ণসংখ্যাক পরিমাণ একক শক্তি নির্গমন করে।অন্য কথায়, একটি দোলক দ্বারা নির্গত শক্তি নিরবচ্ছিন্ন ছিল।প্ল্যাঙ্কের মতে,প্রতিটি দোলকের শক্তির পরিমাণ দোলকের ফ্রিকোয়েন্সির সমানুপাতিক ছিল;আনুপাতিক এই ধ্রুবকটি এখন প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক হিসাবে পরিচিত।প্ল্যাঙ্ক ধ্রুবককে সাধারণত এইচ (h)হিসাবে লেখা হয়,এর মান 6.63×10−34 J s।সুতরাং, এফ(f) ফ্রিকোয়েন্সি সম্প্ন্ন একটি দোলকের শক্তি ই(E) হলে,

E=nhf যেখানে n=1,2,3,.....

একটি তেজস্ক্রিয় রশ্মি বিকিরণকারী পদার্থের রঙ পরিবর্তন করতে হলে এটির তাপমাত্রা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। প্ল্যাঙ্কের নীতি এর কারণ ব্যাখ্যা করেঃকোনও পদার্থের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করা হলে এটি সামগ্রিকভাবে আরও বেশি শক্তি নির্গত করে এবং শক্তির একটি বৃহত অনুপাত বেগুনি বর্ণালীর শেষ দিকে হয়।

প্ল্যাঙ্কের নীতি পদার্থবিজ্ঞানের প্রথম কোয়ান্টাম তত্ত্ব ছিল এবং প্ল্যাঙ্ক শক্তি কোয়ান্টা আবিষ্কারের মাধ্যমে পদার্থবিদ্যার অগ্রগতিতে যে অবদান রেখে ছিলেন তার স্বীকৃতি হিসাবে ১৯১৮ সালে তাকে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়ে ছিল। তবে সেই সময় প্লাঙ্কের দৃষ্টিভঙ্গি মতে কোয়ান্টাইজেশন হলো সম্পূর্ণ একটি অনুসন্ধানমূলক গানিতিক গঠন বরং (বর্তমানে যেমন বিশ্বাস করা হয়) আমাদের বিশ্ব সম্পর্কে বোঝার মৌলিক পরিবর্তন।

ফোটনঃআলোর পরিমাণ নির্ধারণ[সম্পাদনা]

১৯০৫ সালে,আলবার্ট আইনস্টাইন একটি অতিরিক্ত পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন যে কোয়ান্টাইজেশন কেবল একটি গাণিতিক গঠন নয়,বরং আলোকরশ্মির মাধ্যমে শক্তি আলাদা আলাদা প্যাকেটে স্থানান্তরিত হয়,যা এখন ফোটন নামে পরিচিত।একটি ফোটনের শক্তির পরিমাণ হলো তার কম্পাঙ্ক এবং প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবকের গুণফলঃ

E=hf

কয়েক শতাব্দী ধরে,বিজ্ঞানীরা আলোর দুটি সম্ভাব্য তত্ত্ব নিয়ে বিতর্ক করেছিলেনঃএটি কি একটি তরঙ্গ ছিল নাকি ক্ষুদ্র কণার একটি ধারা প্রবাহ? ১৯শতকে, বিতর্কটি সাধারণত তরঙ্গ তত্ত্বের পক্ষে বলে মনে করা হত,কারণ এটি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রতিসরণ,অপর্বতন,ব্যাতিচার এবং সমার্বতনের মতো প্রভাবগুলি ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়েছিল।জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল দেখিয়েছিলেন যে বিদ্যুৎ, চৌম্বকীয়তা এবং আলো এই সমস্ত কিছুই একই ঘটনার বহিঃপ্রকাশঃবৈদ্যুতিক চৌম্বকীয় ক্ষেত্র।ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ হচ্ছে শাস্ত্রীয় বৈদ্যুতিক চৌম্বকীয়তার নীতিগুলোর একটি সম্পূর্ণ সেট এবং আলোকে তরঙ্গ হিসাবে বর্ণনা করে যা দোদুল্যমান বৈদ্যুতিক এবং চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের সংমিশ্রণ।তরঙ্গ তত্ত্বের পক্ষে প্রমাণের অগ্রগতির কারণে আইনস্টাইনের ধারণাগুলি প্রথমে খুব সন্দেহের সাথে দেখা হয়েছিল।এর ফলে ফোটন মডেলটি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে। ফোটন মডেলটির গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কারণগুলির মধ্যে একটি হলো নিম্নলিখিত বিভাগে বর্ণিত ফোটো ইলেক্ট্রিক ইফেক্টের কয়েকটি গোলমেলে বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা।তবুও,আলোর তরঙ্গ উপমা আলোর অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলি(প্রতিসরণ,অপর্বতন,ব্যাতিচার)বুঝতে সহায়তা করার জন্য অপরিহার্য ছিল।

ফোটো বৈদ্যুতিক প্রভাব

১৮৮৭ সালে,হেনরিচ হার্টজ পর্যবেক্ষণ করেন যে পর্যাপ্ত ফ্রিকোয়েন্সি সহ আলো যখন ধাতব পৃষ্ঠকে আঘাত করে তখন এটি ইলেকট্রন নির্গত করে।১৯০২ সালে ফিলিপ লেনার্ড আবিষ্কার করেন যে নির্গত ইলেক্ট্রনের সর্বাধিক সম্ভাব্য শক্তি আলোর কম্পাঙ্কের সাথে সম্পর্কিত,এর তীব্রতার সাথে নয় এবং কম্পাঙ্ক যদি খুব কম হয় তবে তীব্রতা নির্বিশেষে কোনও ইলেকট্রন বের হয় না।বেশি তীব্রতা যুক্ত লাল বর্ণের আলোকরশ্মি যখন কোনওরূপ বৈদ্যুতিক ভোল্টেজ তৈরি করতে পারে না তখন কম তীব্রতা যুক্ত বেগুনী বর্ণের আলোকরশ্মি উচ্চতর ভোল্টেজ তৈরি সক্ষম।আলোর প্রান্তিক কম্পাঙ্ক অর্থাৎ আলোর সর্বনিম্ন কম্পাঙ্ক যার ফোলে ধাতু হতে ইলেক্ট্রনগুলি নির্গত হয় তা বিভিন্ন ধাতুর ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন।এই পর্যবেক্ষণটি শাস্ত্রীয় বৈদ্যুতিক চৌম্বকীয়তার সাথে বৈপরীত্যপূর্ণ,যা পূর্বাভাস দেয় যে ইলেক্ট্রনের শক্তি আলোকরশ্মি বিকিরণের তীব্রতার সাথে আনুপাতিক হওয়া উচিত।তাই পদার্থবিজ্ঞানীরা যখন প্রথম ফটোইলেক্ট্রিক প্রভাব প্রদর্শনকারী ডিভাইসগুলি আবিষ্কার করেন তখন তারা প্রাথমিকভাবে প্রত্যাশা করেছিলেন যে উচ্চতর তীব্রতা বিশিষ্ট আলো ফটোইলেক্ট্রিক যন্ত্র থেকে উচ্চতর ভোল্টেজ তৈরি করবে।

আইনস্টাইন এই প্রভাবটি ব্যাখ্যা করেন এবং দাবি করেন যে আলোকরশ্মি ফোটোণ নামক কণার একটি ধারাএবং আলোকরশ্মির কম্পাঙ্ক যদি এফ(F) হয় তবে প্রতিটি ফোটনের শক্তি এইচ*এফ(hf)এর সমান হবে।ইলেক্ট্রনটিকে কেবলমাত্র একটি ফোটন দ্বারা আঘাত করা হতে পারে যা ইলেক্ট্রনকে সর্বাধিক একটি শক্তি hf সরবরাহ করে। অতএব,ইলেক্ট্রনের শক্তির ক্ষেত্রে আলোকরশ্মির তীব্রতার কোনও প্রভাব নেই বরং কেবলমাত্র তার কম্পাঙ্ক ইলেক্ট্রনকে সর্বোচ্চ শক্তি প্রদান করে।