ট্রিভিয়াল নাম

রসায়নে ট্রিভিয়াল নাম বলতে বোঝানো হয় এমন নাম, যা কোনো রাসায়নিক পদার্থের জন্য ব্যবহৃত হলেও, তা আইইউপিএসি-এর মতো আনুষ্ঠানিক নামকরণ পদ্ধতির নিয়ম অনুযায়ী তৈরি নয়। এই নামগুলো সাধারণত প্রচলিত বা সাধারণ নাম হিসেবে পরিচিত এবং এগুলোকে আনুষ্ঠানিক নাম হিসেবে ধরা হয় না।
ট্রিভিয়াল নাম দিয়ে সাধারণত ওই পদার্থের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য—যেমন অণুর গঠন—বুঝা যায় না। অনেক সময় এই নামগুলো বিভ্রান্তিকর হতে পারে, কারণ ভিন্ন ভিন্ন শিল্প বা অঞ্চলে একই নামের ভিন্ন অর্থ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সাদা ধাতু নামটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন উপাদান বোঝাতে ব্যবহার হয়। তবে ট্রিভিয়াল নাম সহজ ও সংক্ষিপ্ত হওয়ায়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এগুলোকে রক্ষিত নাম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
এই ধরনের নাম অনেক সময় সাধারণ কথাবার্তা থেকে এসেছে। অনেক নাম আবার প্রাচীন আলকেমির যুগ থেকে চলে এসেছে, যা আনুষ্ঠানিক নামকরণের আগেই প্রচলিত ছিল। ট্রিভিয়াল নামের উৎস হতে পারে পদার্থের রং, গন্ধ, স্বাদ, অবস্থা বা স্ফটিক গঠন; এটি আবিষ্কৃত হয়েছে যে জায়গায়, বা আবিষ্কারকের নাম; কোনো বিজ্ঞানী, পৌরাণিক চরিত্র, গ্রহ-নক্ষত্র, অণুর আকার কিংবা এমনকি কোনো কল্পিত চরিত্রের নাম থেকেও হতে পারে। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রতিটি মৌলেরই একটি করে ট্রিভিয়াল নাম রয়েছে।
সংজ্ঞা
[সম্পাদনা]বৈজ্ঞানিক নথিপত্র, আন্তর্জাতিক চুক্তি, পেটেন্ট ও আইনগত সংজ্ঞার ক্ষেত্রে এমন রাসায়নিক নামের প্রয়োজন হয়, যা স্পষ্ট ও নির্ভুলভাবে সেই পদার্থকে চিহ্নিত করতে পারে। এই প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয় পদ্ধতিগত নামসমূহ। এ ধরনের একটি নামকরণ পদ্ধতি তৈরি করেছে আইইউপিএসি, যা ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়াও, আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি, আন্তর্জাতিক মান সংস্থা (ISO), এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-ও নিজস্ব নামকরণ পদ্ধতি তৈরি করেছে।
তবে, রসায়নবিদরা এখনো অনেক সময় ঐতিহ্যগত বা ব্যবহারে সহজ বলে অনেক নাম ব্যবহার করে থাকেন, যা পদ্ধতিগত নয়। এসব নামকে বলা হয় ট্রিভিয়াল নাম। "ট্রিভিয়াল" শব্দটি অনেক সময় তাচ্ছিল্যসূচক মনে হলেও, এর মূল অর্থ ছিল "সাধারণ" বা "প্রচলিত"।[১]
ট্রিভিয়াল নাম ছাড়াও, রসায়নবিদরা সেমি-ট্রিভিয়াল নাম তৈরি করেছেন, যেখানে ট্রিভিয়াল নামের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট প্রতীক যুক্ত করা হয়েছে।[২] কিছু ট্রিভিয়াল ও সেমি-ট্রিভিয়াল নাম এতটাই ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত যে আইইউপিএসি সেগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছে। এসব নামকে বলা হয় রক্ষিত নাম।
কীটনাশকের সাধারণ নাম
[সম্পাদনা]
কীটনাশকের সাধারণ নামগুলো কেবল বারবার ব্যবহারের মাধ্যমে প্রচলিত হয়নি। বরং, এই নামগুলো নির্ধারিত হয় আইএসও-র TC81 কমিটির মাধ্যমে, যারা ISO1750 অনুযায়ী নাম অনুমোদন করে।[৩]
মৌল
[সম্পাদনা]মৌলগুলোর প্রচলিত নামগুলো মূলত ট্রিভিয়াল নাম, যেগুলোর অনেকগুলোর উৎস আলকেমিতে। যদিও আইইউপিএসি (IUPAC) এই নামগুলো স্বীকৃতি দিয়েছে, তবে তারা এমন মৌলগুলোর জন্যও পদ্ধতিগত নাম নির্ধারণ করেছে, যেগুলো এখনো প্রস্তুত করা হয়নি। আইইউপিএসি এমন একটি প্রক্রিয়া চালু করেছে, যার মাধ্যমে যে বিজ্ঞানীরা কোনো মৌল আবিষ্কারের কৃতিত্ব পান, তারা নতুন নাম প্রস্তাব করতে পারেন। এই নামটি গৃহীত হলে, সেটি আগের পদ্ধতিগত নামের পরিবর্তে চূড়ান্ত নাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়।[১]
উৎস
[সম্পাদনা]
মধ্যযুগে নয়টি মৌল পরিচিত ছিল: সোনা, রূপা, টিন, পারদ, তামা, সীসা, লোহা, গন্ধক এবং কার্বন।[৪] পারদের নাম এসেছে গ্রহ 'Mercury' থেকে, কিন্তু এর সংকেত এসেছে ল্যাটিন hydrargyrum শব্দ থেকে, যার উৎস গ্রিক শব্দ υδράργυρος, অর্থাৎ 'তরল রূপা'। ইংরেজিতে একে quicksilver নামেও ডাকা হয়। অন্য আটটি মৌলের সংকেত তাদের ল্যাটিন নাম থেকে নেওয়া হয়েছে।[৪]
পদ্ধতিগত নামকরণের ধারণা দেন লুইস-বার্নার্দ গুইতঁ দ্য মোর্ভো, যিনি একটি "স্থায়ী নামকরণ পদ্ধতির" প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন, যা বুঝতে সাহায্য করে এবং মনে রাখা সহজ করে।[৫] এই ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলেন অঁতওয়ান লাভোয়াজিয়ে, যিনি ১৭৮৭ সালে প্রকাশ করেন Méthode de nomenclature chimique (রাসায়নিক নামকরণ পদ্ধতি)। তিনি পরামর্শ দেন মৌলগুলোর নামকরণ যেন তাদের গুণাবলির ভিত্তিতে হয়। এরপর প্রায় ১২৫ বছর ধরে অধিকাংশ রসায়নবিদ গ্রিক ও ল্যাটিন শব্দমূল ব্যবহার করে নামকরণ করেন, যেমন: হাইড্রোজেন ("জল উৎপাদক"), অক্সিজেন ("অম্ল উৎপাদক"), নাইট্রোজেন ("সোডা উৎপাদক"), ব্রোমিন ("দুর্গন্ধ"), এবং আর্গন ("নিষ্ক্রিয়")। আয়োডিন ও ক্লোরিন নাম দুটো তাদের বৈশিষ্ট্যমূলক রঙের গ্রিক নাম থেকে এসেছে। ইন্ডিয়াম, রুবিডিয়াম ও থ্যালিয়াম-এর নাম এসেছে তাদের নিঃসরণ বর্ণালির নির্দিষ্ট রঙের রেখা থেকে। ইরিডিয়াম-এর নাম এসেছে ল্যাটিন iris (রংধনু) থেকে, কারণ এর যৌগে বিভিন্ন রঙ দেখা যায়।[৪] নোবেল গ্যাসগুলোর নামকরণ হয়েছে তাদের উৎস বা গুণাবলির ওপর ভিত্তি করে। হিলিয়াম এসেছে গ্রিক helios থেকে, যার অর্থ 'সূর্য', কারণ এটি প্রথম সূর্যের বর্ণালিতে শনাক্ত করা হয়েছিল (যদিও ধাতুর জন্য ব্যবহৃত -ium প্রত্যয় কেন ব্যবহার করা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়)।[৬] অন্যান্য নোবেল গ্যাস: নিয়ন ("নতুন"), আর্গন ("নিষ্ক্রিয়"), ক্রিপটন ("গোপন"), জেনন ("অপরিচিত"), এবং রাডন ("রেডিয়ামের উৎস")।[৭]
আরও অনেক মৌলের নামকরণ হয়েছে যেগুলোর সঙ্গে তাদের গুণাবলির তেমন সম্পর্ক নেই। কিছু মৌল নামকরণ হয়েছে গ্রহ-নক্ষত্র বা মহাজাগতিক বস্তু থেকে (হিলিয়াম, সেলেনিয়াম, টেলুরিয়াম – সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবীর নাম থেকে; সেরিয়াম ও প্যালাডিয়াম – সেরেস ও প্যালাস গ্রহাণুর নাম থেকে)। কিছু মৌলের নাম এসেছে পৌরাণিক চরিত্র থেকে, যেমন টাইটেনিয়াম (টাইটান), প্রোমেথিয়াম (প্রোমিথিউস), ইউরেনিয়াম, নেপ্টুনিয়াম, প্লুটোনিয়াম (রোমান দেবতারা), ট্যান্টালাম ও নিওবিয়াম (ট্যান্টালাস ও তার কন্যা নিওবি), এবং ভানাডিয়াম ও থোরিয়াম (নর্স দেবতারা ভানাডিস ও থর)।[৭]
কিছু মৌলের নাম এসেছে তাদের আবিষ্কারের ইতিহাস থেকে। যেমন টেকনেটিয়াম ও প্রোমেথিয়াম-এর নামকরণ হয়েছে এ কারণে যে তারা কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে, কারণ তাদের কোনো প্রাকৃতিকভাবে স্থিতিশীল আইসোটোপ নেই। প্রোমেথিয়াস দেবতা মানুষকে আগুন দান করেছিলেন—এই পৌরাণিক দৃষ্টান্তই নামকরণের পেছনের ভাবনা।
কিছু মৌলের নাম এসেছে আবিষ্কারকের দেশের বা শহরের নাম থেকে। মারি কুরি পোলোনিয়াম-এর নাম রাখেন পোল্যান্ড-এর নাম অনুসারে। রুথেনিয়াম, গ্যালিয়াম, জার্মেনিয়াম, ও লুটেশিয়াম-এর নাম এসেছে রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি ও প্যারিস-এর ল্যাটিন নাম থেকে। আরও কিছু মৌলের নাম এসেছে আবিষ্কারের স্থান থেকে, যেমন: টারবিয়াম, এরবিয়াম, ইটারবিয়াম, ও ইট্রিয়াম—সবই ইটারবি নামক সুইডিশ গ্রাম থেকে, যেখানে এসব মৌলের আকরিক পাওয়া যায়।[৪] অন্যান্য জায়গানির্ভর নাম: ম্যাগনেসিয়াম (Magnesia অঞ্চল), স্ট্রনটিয়াম, স্ক্যান্ডিয়াম, ইউরোপিয়াম, থুলিয়াম (একটি রহস্যময় উত্তর অঞ্চল), হোলমিয়াম, কপার (Cyprus), হ্যাফনিয়াম, রিনিয়াম, আমেরিসিয়াম, বার্কেলিয়াম, ক্যালিফোর্নিয়াম ও ডার্মস্ট্যাটিয়াম।[৭]
মৌল সংখ্যা ৯২ পর্যন্ত (ইউরেনিয়াম) ব্যক্তির নামে মৌল নামকরণ নিরুৎসাহিত ছিল। তবে দুটি ব্যতিক্রম ছিল, যেগুলো ছিল খনিজের নামে নামকরণ, যেগুলো আবার ব্যক্তির নামে। যেমন: গ্যাডোলিনিয়াম (খনিজ গ্যাডোলিনাইট থেকে, যা জোহান গ্যাডোলিন-এর নামে) এবং সামারিয়াম (খনিজ সামারস্কাইট থেকে, ভাসিলি সামারস্কি-বিখোভেটস-এর নামে)। ট্র্যান্সইউরেনিয়াম মৌলগুলোর ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয় এবং তখন আসে কিউরিয়াম, আইনস্টাইনিয়াম, ফার্মিয়াম, মেন্ডেলেভিয়াম, নোবেলিয়াম এবং লরেন্সিয়াম।[৭][৮]:৩২০
আইইউপিএসি মানের সঙ্গে সম্পর্ক
[সম্পাদনা]আইইউপিএসি মৌলগুলোর নামকরণের জন্য আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণ করেছে। যে বিজ্ঞানী বা গবেষণা দল প্রথম কোনো মৌল পৃথক করতে সক্ষম হয়, তারা একটি নাম প্রস্তাব করতে পারে। পর্যালোচনার পর আইইউপিএসি কাউন্সিল নামটি চূড়ান্ত করে। ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই নাম পৌরাণিক চরিত্র, মহাজাগতিক বস্তু, খনিজ, স্থান, মৌলের ধর্ম বা কোনো বিজ্ঞানীর নাম থেকে নেওয়া যেতে পারে।[৫]
যেসব মৌল এখনো আবিষ্কৃত হয়নি, তাদের জন্য আইইউপিএসি একটি পদ্ধতিগত নাম নির্ধারণ করেছে, যা মৌলটির পারমাণবিক সংখ্যা অনুসারে একাধিক অংশে গঠিত হয় এবং -ium প্রত্যয় দিয়ে শেষ হয়। যেমন, মৌল ১১১-এর নাম হয় unununium (un মানে ১)।[৯] তবে যখন কোনো মৌল আবিষ্কৃত হয়, তখন এই পদ্ধতিগত নাম একটি ট্রিভিয়াল নাম দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়, যেমন রন্টজেনিয়াম।[১]
আইইউপিএসি-নির্ধারিত নামগুলো অফিসিয়াল ভাষাগুলোর জন্য নির্ধারিত। প্রাথমিকভাবে এ ভাষাগুলো ছিল ইংরেজি ও ফরাসি, তবে বর্তমানে শুধু ইংরেজিই একমাত্র অফিসিয়াল ভাষা।[১০]
তবে অন্যান্য ভাষাতেও মৌলের নাম পৃথক হতে পারে। যেমন টাংস্টেন-এর সংকেত W এসেছে এর জার্মান নাম Wolfram থেকে, যা wolframite খনিজ থেকে উদ্ভূত এবং যার অর্থ "নেকড়ে-ফেনা"। অপরদিকে tungsten শব্দটির অর্থ "ভারী পাথর", যা scheelite খনিজের বর্ণনা।[১১]
রাশিয়ান ভাষায় হাইড্রোজেন, অক্সিজেন ও কার্বন যথাক্রমে vodorod (জল উৎপাদক), kislorod (অম্ল উৎপাদক) এবং uglerod (কয়লা উৎপাদক)। জার্মান ভাষায়: Wasserstoff (জল পদার্থ), Sauerstoff (অম্ল পদার্থ), Stickstoff (দমনকারী পদার্থ)। চীনা ভাষায় এদের নাম qīngqì (হালকা গ্যাস), yǎngqì (পুষ্টিদায়ক গ্যাস), এবং dànqì (পাতলা গ্যাস)। ১৮৭১ সালে জন ফ্রায়ার ও শু শো চীনা ভাষায় রাসায়নিক নাম অনুবাদের একটি পদ্ধতি তৈরি করেন। প্রচলিত নাম থাকলে তা সংরক্ষিত রাখা হয়, অন্যথায় একটি একক চিহ্ন তৈরি করা হয়।[N ১]
অজৈব রসায়ন
[সম্পাদনা]
প্রাথমিক যুগে যৌগিক রাসায়নিক পদার্থের নামকরণও মৌলগুলোর নামকরণের মতো নিয়ম অনুসরণ করত। এসব নাম অনেক সময় পদার্থটির চেহারা বা পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপলব্ধ গুণাবলির ভিত্তিতে নির্ধারিত হতো। এছাড়াও, পদার্থটির গঠন, স্ফটিক আকৃতি, কোনো ব্যক্তি বা স্থানের নাম, চিকিৎসাগত গুণাবলি বা প্রস্তুত প্রণালী অনুযায়ীও নামকরণ করা হতো।[১৩]:৬৮
উদাহরণস্বরূপ, লবণ (সোডিয়াম ক্লোরাইড) পানিতে দ্রবণীয় এবং এটি খাদ্যে স্বাদ বাড়াতে ব্যবহৃত হয়। এ ধরনের বৈশিষ্ট্যযুক্ত অন্যান্য পদার্থকেও 'লবণ' বলা হতে শুরু করে, যেমন এপসাম লবণ (ম্যাগনেসিয়াম সালফেট), যা ইংল্যান্ডের এপসাম শহরের একটি তেতো ঝর্ণা থেকে পাওয়া যায়।
অ্যামোনিয়াম (যার পদ্ধতিগত নাম আজানিয়াম [১৪]) প্রথম আহরণ করা হয় স্যাল অ্যামোনিয়াক (Amun-এর লবণ) নামক একটি পদার্থ থেকে। প্রাচীন রোমানরা মিশরের মন্দিরগুলোতে এই স্ফটিকগুলো দেখতে পান, যেখানে আমুন দেবতাকে উৎসর্গ করা হতো। সেগুলো মূলত উটের গোবর পোড়ানোর ধোঁয়া থেকে জমা হয়েছিল।[১৫]
সীসা অ্যাসিটেট-কে এক সময় বলা হতো সীসার চিনি।[১৩]:৭০,৭৭–৭৮ অন্যদিকে, কিছু নাম যেমন সীসার চিনি (lead(II) acetate), অ্যান্টিমনির মাখন (antimony trichloride), ভিট্রিয়লের তেল (গন্ধকের অ্যাসিড) এবং টারটারের সরবত (পটাশিয়াম বিটারট্রেট) রান্নাঘরের পরিভাষা থেকে গৃহীত।[১৩]:৬৫–৬৬
অনেক নাম রং থেকে উদ্ভূত, যেমন: হেমাটাইট, অরপিমেন্ট, ও ভার্ডিগ্রিস, যাদের নামের অর্থ হলো—"রক্ত-সদৃশ পাথর", "সোনালি রঙের রঞ্জক", ও "গ্রিসের সবুজ"।[১৩]:৭০
কিছু নাম পদার্থটির ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে রাখা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, চুন এমন পদার্থগুলোর একটি সাধারণ নাম, যেগুলো ক্যালসিয়ামের সঙ্গে কার্বোনেট, অক্সাইড বা হাইড্রোক্সাইড মিলিয়ে তৈরি হয়। এর নাম এসেছে এমন একটি শব্দমূল থেকে যার অর্থ "আটকে থাকা বা লেগে থাকা"। প্রাচীন কালে এটি গাঁথুনির মর্টার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।[১৬]
পানির একাধিক পদ্ধতিগত নাম রয়েছে, যেমন অক্সিডেন (আইইউপিএসি নাম), হাইড্রোজেন অক্সাইড, ও ডাইহাইড্রোজেন মনোক্সাইড (DHMO)। এই শেষ নামটি ব্যবহার করে এক সময় একটি ঠাট্টাপূর্ণ প্রচারণা চালানো হয়েছিল, যাতে দেখানো হয় যে এই রাসায়নিকটি অত্যন্ত বিপজ্জনক (যেমন: এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করলে প্রাণঘাতী)।[১৭][১৮]
জৈব রসায়ন
[সম্পাদনা]জৈব রসায়নে অনেক ট্রিভিয়াল নাম কোনো গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে রাখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, লেসিথিন—যা ফসফাটিডাইলকোলিন নামেও পরিচিত—প্রথমে ডিমের কুসুম থেকে আলাদা করা হয়। এর নাম এসেছে গ্রিক শব্দ λέκιθος (lékithos) থেকে, যার অর্থ "কুসুম"।[১৯][২০]
অনেক ট্রিভিয়াল নাম এখনো ব্যবহার করা হয় কারণ তাদের সরকারিভাবে স্বীকৃত পদ্ধতিগত নামগুলো দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত জটিল। যেমন, টারটারিক অ্যাসিড—যা মদে পাওয়া যায়—তার পদ্ধতিগত নাম হলো 2,3-ডাইহাইড্রক্সিবুটানডিওয়িক অ্যাসিড। আবার বিটা-ক্যারোটিন নামক রঞ্জকের IUPAC নাম এত দীর্ঘ যে সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছে তা প্রায় অপ্রয়োগযোগ্য: 1,3,3-ট্রাইমিথাইল-2-[(1E,3E,5E,7E,9E,11E,13E,15E,17E)-3,7,12,16-টেট্রামিথাইল-18-(2,6,6-ট্রাইমিথাইলসাইক্লোহেক্সেন-1-ইল)অক্টাডেকা-1,3,5,7,9,11,13,15,17-নোনায়েনিল]সাইক্লোহেক্সিন।[২১]
তবে, ট্রিভিয়াল নাম কখনো কখনো বিভ্রান্তির কারণও হতে পারে। যেমন, নাম দেখে থিওব্রোমিন-এ ব্রোমিন উপাদান থাকার ধারণা হতে পারে, কিন্তু আসলে এটি একটি অ্যালকালয়েড, যার গঠন ক্যাফেইন-এর অনুরূপ।
আকৃতিভিত্তিক নাম
[সম্পাদনা]কিছু জৈব যৌগের সেমি-ট্রিভিয়াল নাম তাদের আকার থেকে এসেছে। এখানে নামের সঙ্গে -ane (যেমন আলকেনের জন্য) বা -ene (যেমন আলকিনের জন্য) প্রত্যয় যুক্ত থাকে।[৮]:xi কিছু উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো, যেগুলোর নামকরণ হয়েছে আকৃতির সঙ্গে মিল রেখে:
- ব্যারেলিন – ব্যারেলের মতো আকার
- ফেনেস্ট্রেন – জানালার ফ্রেমের মতো
- ল্যাডারেন – মইয়ের মতো
- অলিম্পিয়াডেন – অলিম্পিক রিংস-এর মতো
- কোয়াড্রাটিক অ্যাসিড বা স্কোয়ারিক অ্যাসিড – চতুষ্কোণ গঠনের কারণে
কল্পকাহিনি ভিত্তিক নাম
[সম্পাদনা]
বোয়েমিক অ্যাসিড একটি রাসায়নিক মিশ্রণ, যা একটি অ্যাক্টিনোব্যাক্টেরিয়া প্রজাতির গাঁজন প্রক্রিয়া থেকে প্রাপ্ত। ১৯৭৭ সালে এর উপাদানগুলো আলাদা করা হয় এবং পরবর্তীকালে এগুলোকে অ্যানথ্রাসাইক্লিন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ও ক্যানসার প্রতিরোধী উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই যৌগগুলোর নাম রাখা হয় অপেরা লা বোয়েম-এর চরিত্রগুলোর নামানুসারে:
- বোহেমামিন (মূল যৌগ),
- আলসিন্ডোরোমাইসিন (Alcindoro),
- কলিনেমাইসিন (Colline),
- মার্সেলোমাইসিন (Marcello),
- মিমিমাইসিন (Mimi),
- মুসেটামাইসিন (Musetta),
- রুডলফোমাইসিন (Rodolfo),
- সোনার্ডিমাইসিন (Schaunard)।[৮]:৬৪[২২]
তবে, এই নামগুলো চরিত্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের সঙ্গে যৌগগুলোর রাসায়নিক সম্পর্কের মিল রাখে না।[২৩]
লেপেতিত ফার্মাসিউটিক্যালস-এর গবেষণাগারে, পিয়েরো সেনসি-র নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কৃত যৌগগুলোর জন্য কৌতুকপূর্ণ ডাকনাম ব্যবহার করতেন, পরে সেগুলোকে গ্রহণযোগ্য প্রকাশযোগ্য নামে রূপান্তর করতেন। যেমন, অ্যান্টিবায়োটিক রিফ্যাম্পিসিন-এর নাম রাখা হয় একটি ফরাসি চলচ্চিত্র Rififi-এর নামে, যেখানে একটি রত্ন চুরির কাহিনি আছে। আরেকটি অ্যান্টিবায়োটিকের নাম ছিল "মাতা হারি", যেটিকে পরবর্তীতে মাটামাইসিন নাম দেওয়া হয়।[২৩]
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 3 Leigh 2012
- ↑ Smith, Peter A. S. (১৯৯২)। "Trivial names for chemical substances: Will they be taught or forgotten in the twenty-first century?"। Journal of Chemical Education। ৬৯ (11): ৮৭৭। বিবকোড:1992JChEd..69..877S। ডিওআই:10.1021/ed069p877।
- ↑ "Compendium of Pesticide Common Names. Basic Introduction"। British Crop Production Council (BCPC)। সংগ্রহের তারিখ ৮ জানুয়ারি ২০২৫।
- 1 2 3 4 Davis, Raymond E.; Stanley, George G.; Peck, Larry M. (২০০৭)। "Names of the elements"। Whitten, Kenneth W. (সম্পাদক)। Chemistry (8th সংস্করণ)। Belmont: Thomson Brooks/Cole। পৃ. ৬৪–৬৫। আইএসবিএন ৯৭৮০৪৯৫০১১৯৬৫।
- 1 2 Koppenol, W. H. (২০০২)। "Naming of new elements (IUPAC Recommendations 2002)" (পিডিএফ)। Pure and Applied Chemistry। ৭৪ (5): ৭৮৭–৭৯১। ডিওআই:10.1351/pac200274050787। এস২সিআইডি 95859397।
- ↑ Jensen, William B. (২০০৪)। "Why Helium Ends in "-ium"" (পিডিএফ)। Journal of Chemical Education। ৮১ (7): ৮১–৮২। ডিওআই:10.1021/ed081p944।
- 1 2 3 4 Enghag, Per (২০০৪)। "7.1. Element names"। Encyclopedia of the Elements: Technical Data - History - Processing - Applications। Weinheim: Wiley-VCH। পৃ. ৭১–৭৮। আইএসবিএন ৯৭৮৩৫২৭৬১২৩৪৫।
- 1 2 3 Nickon ও Silversmith 1987
- ↑ Chatt, J. (১৯৭৯)। "Recommendations for the Naming of Elements of Atomic Numbers Greater than 100"। Pure and Applied Chemistry। ৫১ (2): ৩৮১–৩৮৪।
- ↑ Damhus, Ture (জুলাই–আগস্ট ২০০৫)। "Reply to 'Wolfram vs. Tungsten' by Pilar Goya and Pascual Román"। Chemistry International। ২৭ (4)।
- ↑ Goya, Piler; Román, Pascual (জুলাই–আগস্ট ২০০৫)। "Wolfram vs. Tungsten"। Chemistry International। ২৭ (4)।
- ↑ Hao, Chang (জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি ২০০৪)। "Chinese Terms for Chemical Elements: Characters Combining Radical and Phonetic Elements"। Chemistry International। ২৬ (1)।
- 1 2 3 4 Crosland, Maurice P. (২০০৪)। Historical studies in the language of chemistry (First published in 1978; 2004 reprint সংস্করণ)। Mineola, N.Y.: Dover Publications। আইএসবিএন ৯৭৮০৪৮৬৪৩৮০২৩।
- ↑ আন্তর্জাতিক বিশুদ্ধ ও ফলিত রসায়ন সংস্থা (২০০৫). অজৈব রসায়নের নামকরণ (ইউপ্যাক নির্দেশনা ২০০৫). কেমব্রিজ (যুক্তরাজ্য): আরএসসি–ইউপ্যাক. আইএসবিএন ০-৮৫৪০৪-৪৩৮-৮. পৃ. 71,105,314. ইলেকট্রনিক সংস্করণ
- ↑ Lower, Stephen। "Naming chemical substances"। General Chemistry Virtual Textbook। সংগ্রহের তারিখ ৬ নভেম্বর ২০১৩।
- ↑ Harper, Douglas (২০০১–২০১৩)। "lime (n.1)"। Online etymology dictionary। সংগ্রহের তারিখ ৪ নভেম্বর ২০১৩।
- ↑ Kruszelnicki, Karl S. (১৭ মে ২০০৬)। "Mysterious killer chemical"। ABC Science। America Broadcasting Corporation। সংগ্রহের তারিখ ৫ নভেম্বর ২০১৩।
- ↑ Jackson, Craig (১৯৯৪), Ban Dihydrogen Monoxide!, Coalition to ban DHMO, ৩১ অক্টোবর ১৯৯৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত. Coalition to ban DHMO officers, Coalition to ban DHMO, ২৫ জানুয়ারি ১৯৯৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত.
- ↑ Dalmeijer, GW; Olthof, MR; Verhoef, P; Bots, ML; Van der Schouw, YT (২০০৮)। "Prospective study on dietary intakes of folate, betaine, and choline and cardiovascular disease risk in women."। European Journal of Clinical Nutrition। ৬২ (3): ৩৮৬–৯৪। ডিওআই:10.1038/sj.ejcn.1602725। পিএমআইডি 17375117।
- ↑ Gobley, Nicolas Theodore (১৮৭৪)। "Sur la lécithine et la cérébrine"। Journal de Pharmacie et de Chimie: t২০, ৯৮–১০৩, ১৬১–১৬৬।
- ↑ "beta Carotene - Compound Summary"। PubChem Compound। National Center for Biotechnology Information। সংগ্রহের তারিখ ১০ নভেম্বর ২০১৩।
- ↑ Nettleton, Donald E.; Balitz, David M.; Doyle, Terrence W.; Bradner, William T.; Johnson, David L.; O'Herron, Frances A.; Schreiber, Richard H.; Coon, Alonzo B.; Moseley, John E.; Myllymaki, Robert W. (১৯৮০)। "Antitumor Agents From Bohemic Acid Complex, III. The Isolation of Marcellomycin, Musettamycin, Rudolphomycin, Mimimycin, Collinemycin, Alcindoromycin, and Bohemamine"। Journal of Natural Products। ৪৩ (2): ২৪২–২৫৮। ডিওআই:10.1021/np50008a003। পিএমআইডি 7381507।
- 1 2 Aronson, Jeff (১৯৯৯)। "That's show business"। British Medical Journal। ৩১৯ (7215)। BMJ Group: ৯৭২। ডিওআই:10.1136/bmj.319.7215.972। পিএমসি 1116803। পিএমআইডি 10514162।
আরও পড়ুন
[সম্পাদনা]- আন্দ্রাওস, জন। "বিজ্ঞানে ব্যবহৃত গঠিত নাম ও পরিভাষার শব্দকোষ" (পিডিএফ)। careerchem.com। কানাকা ডট কম। সংগ্রহের তারিখ ৩ নভেম্বর ২০১৩।
- আর্ভিং, এইচ. এম. এন. এইচ. (১৯৭৮)। "বিশ্লেষণাত্মক নামকরণে ব্যবহৃত পদার্থসমূহের ট্রিভিয়াল নাম, বাণিজ্যিক নাম ও সমার্থক শব্দের নির্দেশিকা" (পিডিএফ)। পিউর অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রি (খাঁটি ও প্রয়োগিক রসায়ন)। ৫০: ৩৩৮–৩৭০। ডিওআই:10.1016/b978-0-08-022382-7.50003-6। ৪ মার্চ ২০১৬ তারিখে মূল থেকে (পিডিএফ) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩ নভেম্বর ২০১৩।
- কপেনোল, ডব্লিউ. এইচ. (২০০২)। "নতুন মৌলের নামকরণ (আইইউপিএসি সুপারিশ ২০০২)" (পিডিএফ)। পিউর অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রি। ৭৪ (৫): ৭৮৭–৭৯১। ডিওআই:10.1351/pac200274050787। এস২সিআইডি 95859397।
- লি, জি. জে. (২০১১)। রাসায়নিক নামকরণের নীতি: আইইউপিএসি সুপারিশের নির্দেশিকা (২০১১ সংস্করণ)। কেমব্রিজ: রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি। আইএসবিএন ৯৭৮১৮৪৯৭৩০০৭৫।
- লি, জেফ্রি (২০১২)। "পদ্ধতিগত ও ট্রিভিয়াল নামকরণ"। কেমিস্ট্রি ইন্টারন্যাশনাল। ৩৪ (৫)। সংগ্রহের তারিখ ৩ নভেম্বর ২০১৩।
- মে, পল ডব্লিউ. (২০০৮)। অদ্ভুত বা মজার নামবিশিষ্ট অণুগুলি। লন্ডন: ইম্পেরিয়াল কলেজ প্রেস। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৮৪৮১৬-২০৭-৫।
- নিকন, অ্যালেক্স; সিলভারসমিথ, আর্নেস্ট এফ. (১৯৮৭)। জৈব রসায়ন, নামের খেলা: আধুনিক গঠিত শব্দ ও তাদের উৎস। পারগামন প্রেস। আইএসবিএন ০-০৮-০৩৪৪৮১-X।
- সোনেভেল্ড, ডব্লিউ. বি.; লোনিং, কে. এল. (১৯৮৮)। "রাসায়নিক নবশব্দ নিয়ে একজন পরিভাষাবিদ ও একজন রসায়নবিদের দৃষ্টিভঙ্গি"। স্ট্রেলো, রিচার্ড এ. (সম্পাদক)। প্রযুক্তিগত পরিভাষার মানিকরণ: নীতি ও অনুশীলন (দ্বিতীয় খণ্ড)। ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া: এএসটিএম এসটিপি ৯৯১। পৃ. ২৩–২৮। আইএসবিএন ৯৭৮০৮০৩১১১৮৩৭।
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]- পরিশিষ্ট ১৩: নির্বাচিত অজৈব ও জৈব যৌগ, অজৈব আয়ন ও জৈব উপস্থানকের জন্য প্রচলিত ট্রিভিয়াল নাম[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
- ↑ এই চিহ্নে একটি র্যাডিক্যাল থাকে—যেমন ধাতুর জন্য 'ধাতু', গ্যাসের জন্য 'বায়ু', তরলের জন্য 'জল', আর ধাতব-অধাতবের জন্য 'পাথর'—এবং সঙ্গে থাকে পাশ্চাত্য নাম থেকে ধ্বনিগত উপাদান।[১২] বিস্তারিত জানুন: Chemical elements in East Asian languages#Chinese।
<ref> ট্যাগ রয়েছে, কিন্তু এর জন্য কোন সঙ্গতিপূর্ণ <references group="N"/> ট্যাগ পাওয়া যায়নি