বিষয়বস্তুতে চলুন

অভিধা (সম্বোধনের রীতি)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(Style (manner of address) থেকে পুনর্নির্দেশিত)

পদের অভিধা (style of office), যাকে পরোক্ষ উল্লেখের রীতি (manner of reference) বা সরাসরি কথা বলার সময় সম্বোধনের রূপও (form of address) বলা হয়, সেটি হল কোনো ব্যক্তি বা অন্য কোনো সত্তার (যেমন কোনো সরকার বা কোম্পানি) জন্য একটি আনুষ্ঠানিক বা আইনগতভাবে স্বীকৃত উল্লেখের ধরন, এবং এটি প্রায়শই কোনো ব্যক্তিগত উপাধির সাথে যুক্ত করে ব্যবহৃত হতে পারে।[] [][] প্রথা বা আইন অনুযায়ী, কোনো অভিধা সাধারণত এমন একজন ব্যক্তির নামের পূর্বে ব্যবহৃত হয় যিনি কোনো নির্দিষ্ট পদ বা রাজনৈতিক দপ্তরে অধিষ্ঠিত; আবার কখনও কখনও এটি খোদ দপ্তরটিকে বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়। কোনো ব্যক্তিকে ব্যক্তিগত পর্যায়েও সম্মানসূচক পদবি প্রদান করা যেতে পারে। ম্যালোথের কথায়, "কোনও ব্যক্তিকে সম্বোধন করার বেলায় আমাদের সমোচিত দেশকালবোধে উপযুক্ত শব্দ ব্যবহার করা উচিত"।[] কোনো ব্যক্তিকে ব্যক্তিগত পর্যায়েও সম্মানসূচক পদবি প্রদান করা যেতে পারে। তাছাড়া, সামাজিক পরিস্থিতিও একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে উপযুক্ত সম্বোধনের রীতি নির্ধারণ করে। এই ধরনের অভিধাগুলো বিশেষত রাজতন্ত্রের সাথে যুক্ত, যেখানে পদাধিকারী বা রাজকীয় রক্তের কোনো রাজপুত্রের স্ত্রী তাঁদের বিবাহিত জীবনে এটি ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়াও প্রজাতন্ত্রগুলোতে রাষ্ট্রপতিদের ক্ষেত্রে, এবং অনেক দেশে আইনসভার সদস্য, উচ্চপদস্থ বিচারক এবং প্রবীণ সাংবিধানিক পদাধিকারীদের ক্ষেত্রে প্রায় সর্বজনীনভাবে এগুলোর ব্যবহার দেখা যায়। ধর্মীয় নেতাদেরও নিজস্ব অভিধা রয়েছে।

ইংরেজিতে দ্বিতীয় পুরুষের (একবচন ও বহুবচন) সম্বন্ধবাচক বিশেষণ 'your' সরাসরি সম্বোধনের রূপ হিসেবে ব্যবহৃত হয় (অর্থাৎ, যখন অভিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তির/ব্যক্তিদের সাথে সরাসরি কথা বলা হয়); তৃতীয় পুরুষের সম্বন্ধবাচক বিশেষণ 'his/her' - একবচন এবং 'their' - বহুবচন পরোক্ষ উল্লেখের রূপ হিসেবে ব্যবহৃত হয় (অর্থাৎ, যখন অভিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি/ব্যক্তিদের সম্পর্কে কথা বলা হয়)। যথা, 'your majesty', 'his/her majesty' এবং 'their majesties'।

'অভিধা' এবং 'অভিহিত করা'-র প্রয়োগ বিশেষ্য হিসেবে 'অভিধা' এবং ক্রিয়া হিসেবে 'অভিহিত করা' শব্দদুটি বাংলা ভাষায় আনুষ্ঠানিক ও সম্মানসূচক প্রয়োগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ্য হিসেবে এর একটি উদাহরণ হল: "ব্রিটিশ শাসনকালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে 'নাইট' অভিধা প্রদান করা হয়েছিল, যা তিনি জালিয়ানওয়ালাবাগের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সগর্বে বর্জন করেন।" অন্যদিকে, ক্রিয়া হিসেবে এর প্রয়োগ দেখা যায় এভাবে: "পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে সরকারি এবং আনুষ্ঠানিক চিঠিপত্রে সর্বদা 'মাননীয়া' হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে।"

বাংলার সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থায় ব্যবহৃত অভিধা বা সম্বোধন

[সম্পাদনা]

বাংলার সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষাগত এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ধরনের সম্মানসূচক অভিধা ব্যবহারের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।

আধুনিক রাষ্ট্রীয়, আইনি ও প্রশাসনিক সম্বোধন

[সম্পাদনা]

এই বিভাগে বর্তমান সময়ের সরকারি, আইনি এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিধিবদ্ধ সম্বোধনগুলো রাখা হল।

  • মাননীয় / মাননীয়া: মন্ত্রী, বিধায়ক, সাংসদ বা উচ্চপদস্থ জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে সর্বজনীন সম্বোধন।
  • মহামান্য / মহামান্যা: রাষ্ট্রপতি, রাজ্যপাল বা সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদাধিকারীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত।
  • মান্যবর / মান্যবরা: রাষ্ট্রদূত বা অত্যন্ত উচ্চপদস্থ পদাধিকারীদের ক্ষেত্রে।
  • মহামহিম: অত্যন্ত রাজকীয় বা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বোঝাতে (যেমন— মহামহিম রাষ্ট্রপতি)।
  • মাননীয় বিচারপতি: হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বিধিবদ্ধ আইনি সম্বোধন।
  • মহামান্য আদালত: বিচারব্যবস্থায় বিচারককে বা কোর্টকে সামগ্রিকভাবে সম্বোধন।
  • জজসাহেব / হুজুর: জেলা বা দায়রা আদালতের বিচারকের সম্মানজনক দেশজ সম্বোধন।
  • বিজ্ঞ কৌঁসুলি: (Learned Counsel)-এর আইনি বাংলা রূপ, যা আদালতে বিপক্ষ বা স্বপক্ষের আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়।
  • পেশকার: আদালতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী যিনি বিচারকের সামনে আইনি নথি পেশ করেন।
  • মহাশয় / মহাশয়া: সাধারণ আনুষ্ঠানিক চিঠিপত্রে বা সম্মান প্রদর্শনে।
  • মহোদয় / মহোদয়া: বিধিবদ্ধ ও অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক (Formal) সম্বোধনে।
  • মহানুভব / মহানুভবা: অত্যন্ত মহানুভব এবং উচ্চপদস্থ অভিজাত (His Magnanimity)।
  • নাগরিকবৃন্দ: রাজনৈতিক বা সামাজিক ভাষণে সাধারণ মানুষকে সম্মানজনক সম্বোধন।

পশ্চিমবঙ্গের সমাজ, কুটুম, পাড়া সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন সম্বোধন

[সম্পাদনা]

দৈনন্দিন জীবনে সম্মান, নৈকট্য এবং সামাজিক অধিকারবোধ থেকে উদ্ভূত সম্বোধন।

  • দাদা / দিদি: যেকোনো অজানা পুরুষ বা নারীকে ডাকার সর্বজনীন সম্মানসূচক পদ (এমনকী মুখ্যমন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষেত্রেও)।
  • কাকু / জেঠু / মেসোমশাই / পিসেমশাই: অপরিচিত বা পরিচিত বয়স্ক পুরুষদের সর্বজনীন সম্বোধন।
  • কাকিমা / জেঠিমা / মাসিমা / পিসিমা: বয়স্কা নারীদের সম্মান ও নৈকট্যসূচক ডাক।
  • বৌদি: বিবাহিতা নারী বা পাড়ার সম্মানীয় গৃহবধূদের সর্বজনীন সম্বোধন।
  • বড় / মেজ / সেজ / ন / ছোট দা/দি: বাড়ির দাদা-দিদিদের প্রতি বয়সানুক্রমে ডাক।
  • দিদিভাই / দাদাভাই: কর্মক্ষেত্রে বা পরিবারে অত্যন্ত স্নেহমাখানো অথচ সম্মানজনক ডাক।
  • বাবু: ভদ্রলোকদের নামের শেষে যুক্ত হওয়া চিরাচরিত সম্মানসূচক শব্দ।
  • সাহেব / সায়েব: কলকাতার কর্পোরেট ও ক্লাব সংস্কৃতিতে 'বস' বা উচ্চপদস্থ কর্তাকে সম্বোধন।
  • দারোগাবাবু / থানার বড়বাবু: সাব-ইন্সপেক্টর বা অফিসার-ইন-চার্জদের (OC/IC) চিরন্তন সামাজিক ডাক।
  • কেরানিবাবু: অফিসের ক্লার্ক বা করণিকদের চিরাচরিত ডাক।
  • সভাপতি মশাই / সম্পাদক মশাই: পাড়ার ক্লাব, পূজা কমিটি বা সভার প্রধানদের সম্বোধন।

শিক্ষাগত, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক অভিধা

[সম্পাদনা]

শিক্ষা ও সংস্কৃতির জগতে মেধা ও প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ ব্যবহৃত উপাধি।

  • আচার্য: বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদাধিকারী বা চ্যান্সেলর (পশ্চিমবঙ্গে সাধারণত রাজ্যপাল)।
  • উপাচার্য: বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর।
  • আচার্যদেব / গুরুদেব: অত্যন্ত সম্মানীয় শিক্ষাগুরু বা আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক।
  • অধ্যাপক / অধ্যাপিকা: কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আনুষ্ঠানিক অভিধা।
  • জাতীয় অধ্যাপক: (National Professor) দেশের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের রাষ্ট্রীয় উপাধি। উল্লেখ্য জাতির জনক (Father of the nation) দেশের শ্রেষ্ঠ নাগরিক এবং জাতির পরিত্রাতার উপাধি।
  • মাস্টারমশাই / পণ্ডিতমশাই: শিক্ষকদের প্রতি গভীর সম্মান ও নিজস্বতা মেশানো চিরন্তন সম্বোধন।
  • দিদিমণি / মাস্টারদিদি: মহিলা শিক্ষিকার প্রতি সম্মানের ডাক।
  • মহামহোপাধ্যায়: সংস্কৃত পণ্ডিতদের দেওয়া সর্বোচ্চ উপাধি বা প্রফেসর ইমেরিটাস সমতুল্য।
  • বাণীবিনোদ / বিদ্যারত্ন / বিদ্যাভূষণ: শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতদের পাণ্ডিত্যের অলংকারস্বরূপ ঐতিহাসিক উপাধি।
  • বিদ্যাসাগর: জ্ঞানে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য দেওয়া উপাধি (ঈশ্বরচন্দ্র শর্মার ক্ষেত্রে সর্বাধিক পরিচিত)।
  • কৃতিমান / কৃতিমতী: কৃতিত্ব অর্জনকারী শিক্ষার্থী বা গুণীজনদের সম্বর্ধনায় ব্যবহৃত।
  • সুধী / সুধীবৃন্দ: সম্মানীয় দর্শক বা শ্রোতমণ্ডলীকে সম্বোধন।
  • বিশ্বকবি / কবিগুরু: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্মানসূচক উপাধি।
  • সাহিত্যসম্রাট / কথাশিল্পী: সাহিত্যিকদের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি (বঙ্কিমচন্দ্র ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে)।
  • রায়গুণাকর: রাজসভার শ্রেষ্ঠ কবি (মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র কর্তৃক ভারতচন্দ্র রায়কে প্রদত্ত উপাধি)।
  • মহানায়ক: সংস্কৃতির সর্বোচ্চ শিখর বোঝাতে ব্যবহৃত (উত্তম কুমারের ঐতিহাসিক উপাধি)।
  • নাট্যাচার্য / শিল্পগুরু / সুরসম্রাট: থিয়েটার, চারুকলা বা উচ্চাঙ্গ সংগীতের দিকপালদের উপাধি।
  • পণ্ডিতজি / ওস্তাদজি: উচ্চাঙ্গ সংগীত মহলে শিল্পীদের প্রতি সম্মানজনক ডাক।

আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় সম্বোধন

[সম্পাদনা]

হিন্দু, মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মের আধ্যাত্মিক গুরুদের সম্বোধন।

  • শ্রী / শ্রীমতী: হিন্দু নামের পূর্বে ব্যবহৃত সাধারণ সম্মানসূচক অভিধা।
  • দাস / দাসী: পূর্বে ব্যবহৃত পত্রাচারে অদ্বিজ হিন্দু নামে যুক্ত অভিধা।
  • শ্রীমত্যা / দেব্যা / দাস্যা: পূর্বে ব্যবহৃত পত্রাচারে বিধবা হিন্দু স্ত্রীর অভিধা।
  • কুমার / কুমারী: অবিবাহিত হিন্দু নামের অভিধা।
  • পরম পূজ্যপাদ / শ্রীমৎ / শ্রীপাদ: উচ্চমার্গীয় সন্ন্যাসী, মঠাধ্যক্ষ বা ধর্মীয় নেতার ক্ষেত্রে।
  • পরমারাধ্যা / মাতাঠাকুরানী: সর্বোচ্চ পূজিত নারী বা নারী গুরুর ক্ষেত্রে।
  • শ্রীল / শ্রীময়ী: বৈষ্ণব গুরু, সাধু বা আধ্যাত্মিক গুণসম্পন্না নারী।
  • প্রভু / মহাপ্রভু: বৈষ্ণব সাহিত্যে পরম শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় নেতাদের ক্ষেত্রে।
  • দয়াসাগর / করুণাসিন্ধু / কৃপানিধান: অত্যন্ত দয়ালু মহাপুরুষ বা ঈশ্বরের ক্ষেত্রে।
  • মহারাজ / স্বামীজী: মঠ ও মিশনের সন্ন্যাসী বা হিন্দু মঠাধ্যক্ষদের সম্মানার্থে।
  • ঠাকুরমশাই / পুরোহিত মশাই: ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের প্রতি ব্যবহৃত সামাজিক সম্বোধন।
  • মোহন্ত মহারাজ: হিন্দু মঠ বা আশ্রমের প্রধান।
  • গোঁসাই / গোস্বামী: বৈষ্ণব সমাজে অত্যন্ত সম্মানীয় আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক।
  • সাধুবাবা: যেকোনো তপস্বী বা সন্ন্যাসীর গ্রামীণ সম্বোধন।
  • সেবায়েত / অধিকারী: মন্দির বা দেবোত্তোর সম্পত্তির আইনি ও ধর্মীয় ট্রাস্টি বা রক্ষক।
  • হজরত / মখদুম / পীরসাহেব / পীর কেবলা: উচ্চপদস্থ সুফি সাধক বা ইসলামি আধ্যাত্মিক গুরু।
  • মাওলানা / মুফতি সাহেব / হাফেজ সাহেব: ইসলামি পণ্ডিত, ফতোয়া প্রদানকারী এবং কোরআন মুখস্থকারীদের সম্মানসূচক ডাক।

চিঠিপত্রের সাবেকি ও আলংকারিক সম্বোধন

[সম্পাদনা]

চিঠিপত্রে প্রাপকের বয়স, লিঙ্গ এবং সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা অত্যন্ত পরিশীলিত সম্বোধন রীতি।

  • শ্রীচরণেষু / শ্রীচরণকমলেষু: চিঠির প্রারম্ভে পিতা, মাতা, শিক্ষাগুরু বা অত্যন্ত পূজনীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সর্বোচ্চ বিনয় প্রকাশ (অর্থাৎ, আপনার শ্রীচরণের উদ্দেশ্যে)।
  • পরমপূজনীয়াসু / পরমপূজনীয়েষু: পরম শ্রদ্ধেয় নারী (যেমন মাতা বা মাতৃস্থানীয়া) ও পুরুষদের (যেমন পিতা বা পিতৃতুল্য) ক্ষেত্রে ব্যবহৃত।
  • শ্রদ্ধাভাজনেষু / শ্রদ্ধাভাজনাসু / মাননীয়েষু / মাননীয়াসু: অত্যন্ত সম্মানীয় কিন্তু 'শ্রীচরণেষু' বলার মতো পারিবারিক বা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ নন, এমন গুরুজন বা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি।
  • সুধী / সুধীবৃন্দ: (উভয় লিঙ্গে) সুরুচিসম্পন্ন, শিক্ষিত ও জ্ঞানান্বেষী পাঠক বা শ্রোতাদের প্রতি অত্যন্ত সম্মানজনক ও মার্জিত সম্বোধন। আধুনিক নিমন্ত্রণপত্র, পত্রিকার সম্পাদকীয় বা আনুষ্ঠানিক চিঠিতে এটি বহুল ব্যবহৃত।
  • সুচরিতাসু / সুচরিতেষু: সমবয়সী, বন্ধু বা সতীর্থ নারী ও পুরুষদের ক্ষেত্রে সম্মান ও প্রীতির এক অনবদ্য মিশ্রণযুক্ত সম্বোধন (যাঁর চরিত্র সুন্দর)।
  • মান্যবরেষু / মান্যবরাসু: অত্যন্ত সম্মানীয়, বিশেষ করে প্রশাসনিক, রাজনৈতিক বা আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে বিশিষ্ট ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের প্রতি।
  • পরমারাধ্যেষু / পরমারাধ্যাসু: যাঁর আরাধনা করা যায়; পিতা-মাতার সমতুল্য বা অত্যন্ত পূজনীয় বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির ক্ষেত্রে।
  • প্রীতিভাজনেষু / প্রীতিমাপন্নেষু: প্রিয়জন, বন্ধু বা সমবয়সীদের প্রতি স্নেহ ও ভালোবাসাপূর্ণ সম্বোধন।
  • স্নেহভাজনেষু / স্নেহভাজনাসু: অত্যন্ত স্নেহধন্য কনিষ্ঠদের প্রতি (যেমন— অনুজ, ছাত্র বা সহকর্মী)।
  • প্রিয়বরেষু / প্রিয়বরাসু: অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু, সহকর্মী বা সমবয়সী আত্মীয়দের প্রতি গভীর প্রীতিমূলক সম্বোধন।
  • সুহৃদয়েষু / সুহৃদয়াসু: সমবয়সী বা পরিচিত গুণীজন, যাঁর হৃদয় সুন্দর, সহানুভূতিশীল ও সমমনা।
  • সতীর্থেষু: (উভয় লিঙ্গে) এক গুরুর শিষ্য, সহপাঠী বা বাল্যবন্ধুদের প্রতি সাবেকি সম্বোধন (যাঁরা একই তীর্থে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জ্ঞান লাভ করেছেন)।
  • বান্ধবেষু: (পুরুষ) পুরুষ বন্ধু বা সুহৃদের প্রতি সাবেকি সম্বোধন। স্ত্রীলিঙ্গে সাধারণত 'সুচরিতাসু' বা 'প্রিয়সখী/ সই' ব্যবহৃত হয়।
  • প্রাণাধিকেষু / প্রাণাধিকাসু: প্রাণের চেয়েও প্রিয় ব্যক্তি (বিশেষ করে স্বামী, স্ত্রী বা অত্যন্ত কাছের প্রেমিক/প্রেমিকা)-র প্রতি গভীর অন্তরঙ্গ ও আবেগপূর্ণ সম্বোধন।
  • হৃদয়েশ্বর / প্রাণেশ্বরী: স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি একান্ত ব্যক্তিগত চিঠিতে ব্যবহৃত সাবেকি ও রোমান্টিক সম্বোধন।
  • কল্যাণীয়াসু / কল্যাণীয়েষু / স্নেহাস্পদেষু / স্নেহাস্পদাসু: চিঠিপত্রে স্নেহভাজন অনুজ, ছোট ভাই-বোন বা ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি প্রারম্ভিক সম্বোধন।
  • পরমকল্যাণীয়েষু / পরমকল্যাণীয়াসু: ছোট ভাই-বোন, পুত্র-কন্যা বা অত্যন্ত আদরের কনিষ্ঠদের পরম কল্যাণ কামনা করে ব্যবহৃত।
  • চিরঞ্জীবেষু / আয়ুষ্মতীষু: কনিষ্ঠদের দীর্ঘায়ু ও সুন্দর জীবন কামনা করে চিঠির প্রারম্ভে ব্যবহৃত আশীর্বাদসূচক পদ।
  • কল্যাণীয় / কল্যাণীয়া: বাঙালি হিন্দু বিবাহের নিমত্রণপত্রে বর-কনের নামের পূর্ব বসা অভিধা।
  • পরম পূজনীয় / পরমারাধ্য / পরম শ্রদ্ধেয়: কোনো আধ্যাত্মিক গুরু। স্ত্রীলিঙ্গে পরম পূজনীয়া / পরমারাধ্যা / পরম শ্রদ্ধেয়া
  • আয়ুষ্মতী / আয়ুষ্মান: ছোটদের দীর্ঘায়ু কামনা করে আশীর্বাদসূচক সম্বোধন।
  • পরমাত্মীয়: চিঠিপত্রে সবচেয়ে কাছের এবং সম্মানীয় আত্মীয়ের প্রতি।
  • সবিনয় নিবেদন / বিনীত নিবেদন: চিঠির মূল অংশ শুরু করার আগে গুরুজন বা সম্মানীয়দের প্রতি ব্যবহৃত আনুষ্ঠানিক প্রারম্ভিকা।
  • ভবদীয় / ভবদীয়া: চিঠির শেষে ব্যবহৃত আনুষ্ঠানিক বিদায়ী সম্বোধন (যিনি আপনার অনুগত)।
  • বিনীত / বিনীতা: চিঠির শেষে কনিষ্ঠ বা অধীনস্থদের বিদায়ী স্বাক্ষর (Yours sincerely/faithfully)।
  • স্নেহমুগ্ধ / স্নেহাবনত (পুরুষ) / স্নেহাবনতা (নারী): বয়োজ্যেষ্ঠ বা গুরুজনদের কাছে লেখা চিঠির শেষে বিদায়ী স্বাক্ষর (অর্থাৎ, আমি আপনার স্নেহে মুগ্ধ বা অবনত)।
  • শুভাকাঙ্ক্ষী / শুভানুধ্যায়ী: যিনি প্রাপকের শুভ কামনা করেন; বন্ধু, সমবয়সী বা প্রাতিষ্ঠানিক চিঠির শেষে ব্যবহৃত সর্বজনীন বিদায়ী সম্বোধন।
  • আশীর্বাদক / আশীর্বাদিকা: চিঠির শেষে জ্যেষ্ঠদের স্নেহাশিসমূলক বিদায়ী স্বাক্ষর।
  • ইতি / নিবেদক (পুরুষ) / নিবেদিকা (নারী): চিঠির শেষে নিজের নাম লেখার ঠিক আগে ব্যবহৃত সাধারণ ও বিনীত সমাপ্তিসূচক শব্দ।
  • কিবলাহ / ক্বেবলা (Qiblah / Qibla): পিতা, পিতৃস্থানীয় গুরুজন এবং পীর-মুর্শিদদের প্রতি সর্বোচ্চ ভক্তিজ্ঞাপক সম্বোধন। (নামাজের সময় যেমন কাবার দিকে মুখ করা হয়, তেমনি চিঠিতে প্রাপককে ভক্তির কেন্দ্রবিন্দু বা ক্বেবলা হিসেবে মান্য করা হয়। অনেক সময় 'ক্বেবলা ও কাবা' বলেও সম্বোধন করা হয়)।
  • মখদুম / মখদুমেষু: অত্যন্ত সম্মানীয় আধ্যাত্মিক গুরু, পীরসাহেব বা ইসলামি পণ্ডিতদের (আলেম) প্রতি সাবেকি সম্বোধন (যাঁকে সেবা করা হয়)।
  • মুরুব্বিয়ানেষু: বয়োজ্যেষ্ঠ অভিভাবক বা মুরুব্বিদের প্রতি। (এটি আরবি 'মুরুব্বি'-র সাথে সংস্কৃত 'এষু' প্রত্যয়ের এক অসামান্য ভাষাতাত্ত্বিক সংমিশ্রণ)।
  • মুহতারামেষু / মুহতারামাসু: অত্যন্ত সম্মানীয় ও প্রবীণ ভদ্রলোক (মুহতারাম) বা ভদ্রমহিলাদের (মুহতারামাসু) প্রতি আনুষ্ঠানিক সম্বোধন।
  • মোকাররম / মোকাররমেষু: সম্মানিত বা মান্যবর অর্থে। সমকক্ষ বা বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক চিঠিপত্রে বহুল ব্যবহৃত।
  • জনাবেষু / জনাবাসু: সম্মানীয় মুসলিম ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলাদের প্রতি চিঠিপত্রের সবচেয়ে প্রমিত, ঐতিহ্যবাহী ও মার্জিত সম্বোধন।
  • হুজুর-ই-আলা / হুজুর-ই-কেবলা: উচ্চপদস্থ আধিকারিক, নবাব বা জমিদারদের প্রতি সাবেকি দরবারি সম্বোধন (The Most Exalted Presence)।
  • আজিজেষু / আজিজাসু: অত্যন্ত প্রিয় বা স্নেহভাজন অনুজ, বন্ধু বা কনিষ্ঠদের প্রতি আবেগপূর্ণ সম্বোধন। (আরবি 'আজিজ' অর্থাৎ প্রিয় বা আদরের)।
  • দোয়াভাজনেষু: যে দোয়ার বা আশীর্বাদের যোগ্য। ছোটদের প্রতি বা ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি গুরুজনদের ব্যবহৃত স্নেহসূচক পদ।
  • খাদেম / খাদেমা: আক্ষরিক অর্থ সেবক বা সেবিকা। গুরুজন বা সম্মানীয়দের কাছে লেখা চিঠির শেষে 'বিনীত নিবেদক'-এর ইসলামিক সমকক্ষ হিসেবে এই বিনয়ী স্বাক্ষর ব্যবহৃত হয় (Yours faithfully)।
  • তাবেদার / ফরমাবরদার: আজ্ঞাবহ বা অনুগত। চিঠির শেষে অধীনস্থদের বা বিশ্বস্ত কর্মচারীদের সাবেকি বিদায়ী সম্বোধন (Yours obediently)।
  • তালিব-উদ-দোয়া / দোয়াপ্রার্থী: গুরুজন বা পীরসাহেবের কাছে লেখা চিঠির শেষে নিজের নাম লেখার আগে বিনীত অভিব্যক্তি (অর্থাৎ, যে আপনার দোয়ার ভিখারি)।
  • দোয়াগো: কনিষ্ঠদের কাছে বা স্নেহের কাউকে চিঠি লেখার পর শেষে গুরুজনদের স্বাক্ষর (অর্থাৎ, যিনি সর্বদা তোমার জন্য দোয়া করেন; 'আশীর্বাদক'-এর সমতুল্য)।
  • অধম / হাকির: বিনীত নিবেদক অর্থে নিজেকে প্রাপকের কাছে অতি ক্ষুদ্র, নগণ্য বা অধম হিসেবে উপস্থাপন করার সাবেকি সুফি রীতি, যা চিঠির শেষে বিনয় প্রকাশের চরম রূপ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

বনেদি একান্নবর্তী পরিবারের অভ্যন্তরীণ সম্বোধন

[সম্পাদনা]

জমিদার বাড়ি বা বৃহৎ একান্নবর্তী পরিবারের ভেতরে জ্যেষ্ঠতা, লিঙ্গ এবং পদমর্যাদাক্রম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সম্বোধনের রীতি।

  • কর্তামশাই / বড়কর্তা: পরিবারের সর্বাধিনায়ক, সাধারণত জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, পিতা বা জমিদারির প্রধান।
  • গিন্নিমা / কর্তামা: জমিদার বাড়ির বা বৃহৎ একান্নবর্তী পরিবারের প্রধান নারী, যাঁর হাতে অন্দরমহলের সমস্ত চাবিকাঠি থাকত।
  • বড়বাবু, মেজবাবু, সেজবাবু, ন'বাবু, ফুলবাবু, ছোটবাবু: পরিবারের পুরুষদের (ভাইদের বা ছেলেদের) জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী অলিখিত পদমর্যাদাক্রম।
  • বড়রানি, মেজরানি, সেজরানি, ছোটরানি: রাজপরিবার বা বিশাল জমিদারির অন্দরমহলে নারীদের (ভাইদের স্ত্রীদের) সম্মানীয় পদমর্যাদাক্রম।
  • মা-ঠাকরুন / পিসি-ঠাকরুন / মাসি-ঠাকরুন: পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ, সম্মানীয় বা বিধবা প্রবীণ নারীদের প্রতি পরম শ্রদ্ধার ডাক।
  • বৌঠাকরুন / বৌঠান / বৌমণি / বড়বৌ: বাড়ির সম্মানীয় গৃহবধূ বা বনেদি পরিবারের বউদের সম্বোধন (রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে 'বৌঠান' অত্যন্ত সুপরিচিত)।
  • দাদামশাই / ঠাকুরদাদা: মাতামহ ও পিতামহদের প্রতি বনেদি পরিবারের ঐতিহ্যবাহী সম্বোধন।
  • খোকাবাবু / খুকিমণি / দাদামণি: বনেদি পরিবারে কর্তা বা মনিবের ছোট ছেলে-মেয়েদের স্নেহমিশ্রিত সম্মানজনক ডাক।

জমিদারি এস্টেট ও ভৃত্যশ্রেণির ব্যবহৃত সম্বোধন

[সম্পাদনা]

জমিদারি পরিচালনার সাথে যুক্ত পদাধিকারী এবং ভৃত্য বা প্রজাদের দ্বারা মনিবকে সম্বোধনের ঐতিহাসিক রীতি।

  • হুজুর / ধর্মাবতার / অন্নদাতা: প্রজা বা ভৃত্যদের দ্বারা জমিদার, বিচারক বা মনিবকে চরম আনুগত্য ও অসহায়তা প্রদর্শনের সম্বোধন।
  • রাজামশাই, জমিদারমশাই: প্রজাদের ব্যবহৃত অত্যন্ত সম্মানজনক অথচ স্নেহপূর্ণ ডাক।
  • রাজা সাহেব: হিন্দু 'রাজা' এবং আরবি 'সাহেব'-এর মিশ্রণ। ব্রিটিশ যুগে এর প্রতিপত্তি ছিল প্রবল।
  • রানিমা: রানিকে প্রজারা নিজেদের মায়ের সমতুল্য মনে করে এই ডাক ডাকত।
  • রানি সাহেবা: রানির অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক ডাক।
  • কুমার বাহাদুর: যুবরাজ বা সম্মানীয় পুত্র।
  • দেওয়ানজি / দেওয়ানমশাই: জমিদারি এস্টেটের প্রধান ম্যানেজার, অর্থমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা।
  • নায়েব মশাই: জমিদারের প্রধান প্রতিনিধি বা উপ-শাসক, যিনি এস্টেটের খাজনা আদায় ও শাসনকার্য সরাসরি তদারকি করতেন। (যেমন— নায়েব নাজিম, বা অনুপস্থিত জমিদারের ম্যানেজার)
  • সরকারমশাই / গোমস্তা: জমিদারির হিসাবরক্ষক, তত্ত্বাবধায়ক বা খাজনা আদায়কারী সম্মানীয় কর্মচারী।
  • খাজাঞ্চিবাবু: এস্টেটের কোষাধ্যক্ষ বা ক্যাশিয়ার, যাঁর কাছে এস্টেটের সমস্ত অর্থ রক্ষিত থাকত।
  • মুন্সিবাবু: এস্টেটের চিঠিপত্র লেখক, দোভাষী বা শিক্ষিত করণিক।
  • পুরোহিত মশাই / ঠাকুরমশাই: পরিবারের দেবদেবী ও ধর্মীয় আচার পালনকারী ব্রাহ্মণদের প্রতি সম্মানসূচক ডাক।
  • দিদিমণি / দাদাবাবু: মনিবের ছেলে/মেয়ে বা সম্মানীয় দাদা/দিদিকে ভৃত্যদের বা অধীনস্থদের সম্বোধন।
  • মা জননী: মাতৃস্থানীয়া নারী বা কর্তামাকে ভৃত্য বা প্রজাদের গভীর শ্রদ্ধায় এবং নির্ভরতায় ডাকা।
  • মা ঠাকরুন: উচ্চবিত্ত বা ব্রাহ্মণ পরিবারের সম্মানিতা নারীদের ভৃত্য ও সাধারণ প্রজারা এই নামে ডাকত।

বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক বিশেষ সম্বোধন

[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধে উদ্ভূত অনন্য সম্বোধন।

  • জনাব / জনাবা: অত্যন্ত মার্জিত ও আনুষ্ঠানিক সম্বোধন (Sir/Madam-এর বিকল্প)।
  • বঙ্গবন্ধু: বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সর্বজনীন উপাধি।
  • বীর মুক্তিযোদ্ধা / ভাষা সৈনিক: ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের রাষ্ট্রীয় সম্মান।
  • বীর উত্তম / বীর বিক্রম / বীর প্রতীক: মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় সামরিক উপাধি।
  • জননেত্রী: সম্মানীয় রাজনৈতিক নেত্রীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত (মূলত প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে)।
  • ভাইয়া / ভাইজান / আপা / বুবু: বড় ভাই বা বোন স্থানীয় ব্যক্তিকে অত্যন্ত সম্মান ও নৈকট্যের সাথে সম্বোধন।
  • মুরুব্বি / মাতব্বর: বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি বা গ্রাম্য পঞ্চায়েত প্রধান যাঁর কথা সমাজে মান্য করা হয়।
  • বাপজান / আব্বাজান / মিয়াঁভাই: গ্রামীণ সমাজে পুরুষদের প্রতি চরম শ্রদ্ধাসূচক ডাক।
  • খালাম্মা / ফুপাম্মা: মাসি বা পিসী স্থানীয়া বয়স্ক নারীদের সম্মান জানানোর সর্বজনীন ডাক।
  • হুজুর / খতিব সাহেব: মাদ্রাসার শিক্ষক, ইমাম বা যিনি মসজিদে জুমার খুতবা পাঠ করেন।
  • আলহাজ্ব: যিনি হজ সম্পন্ন করেছেন, এটি বড় সামাজিক সম্মানের প্রতীক।
  • উকিল সাহেব / কাজী সাহেব: আইনজীবী এবং বিবাহ/বিচার সম্পন্নকারীদের প্রতি গ্রামীণ সমাজের ডাক।

ঐতিহাসিক, রাজকীয় ও জমিদারি অভিধা

[সম্পাদনা]

প্রাক-ঔপনিবেশিক ও ব্রিটিশ আমলের শাসনকাঠামোয় ব্যবহৃত রাজকীয় উপাধি।

  • মহারাজাধিরাজ / শাহেনশাহ / রাজরাজেশ্বর: রাজাদের রাজা বা সম্রাটদের সম্রাট।
  • দিল্লীশ্বর: মুঘল সম্রাটের ঐতিহাসিক অভিধা।
  • অধীশ্বর / অধীশ্বরী / পৃথ্বীপতি: সার্বভৌম রাজা বা রানির ক্ষেত্রে। (Regnant)
  • রাজমাতা / রাজমাতা ঠাকরুন / সাবেক বেগম / রানিমা: রাজা বা জমিদারের বিধবা মা (Dowager)।
  • রাজভর্তা / রাজপতি: শাসিকা রানির স্বামী (Prince Consort), ব্রিটিশ রাজব্যবস্থার অনুষঙ্গে নবসৃষ্ট পরিভাষা।
  • রাজমহিষী / পটরানি / মহারানি / প্রধানা বেগম: রাজা বা নবাবের প্রধান স্ত্রী যিনি সিংহাসনে বসেন। (Queen Consort)
  • যুবরাজ / ওয়ালী আহাদ: সিংহাসনের প্রধান উত্তরাধিকারী (Heir Apparent), স্ত্রীলিঙ্গে যুবরানি
  • রাজকুমার / রাজকুমারী (রাজকন্যা): রাজার সন্তানদের অভিধা।
  • শাহজাদা / শাহজাদী / নবাবজাদা: সম্রাট বা নবাবের পুত্র-কন্যা।
  • জাঁহাপনা / আলীজাহ / হজরত-ই-আলা: দরবারে নবাব বা সম্রাটদের সম্মানসূচক সম্বোধন।
  • রাজপুরোহিত: রাজবাড়ির প্রধান ধর্মোপদিষ্টা এবং পূজানুষ্ঠানের যাজক।
  • ধর্মাবতার / খোদাবন্দ / অন্নদাতা / গরিবপরওয়ার: প্রজা কর্তৃক দয়ালু জমিদার বা বিচারককে আনুগত্যসূচক সম্বোধন।
  • দয়াময় / করুণাময়: "হে দয়াময়"। আধ্যাত্মিক গুরু বা দয়ালু প্রভুর কাছে সরাসরি ব্যবহৃত। স্ত্রীলিঙ্গে দয়াময়ী, করুণাময়ী
  • দয়াসাগর / করুণাসিন্ধু: যাঁর দয়ার কোনো অন্ত নেই (যেমন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা কোনো দয়ালু রাজা)।
  • পরমকরুণাময়: ঐশ্বরিক ক্ষমতা বা অসীম দয়ালু মহিমা।
  • কৃপানিধান: "কৃপার আধার"। উচ্চপদস্থ পৃষ্ঠপোষককে ডাকার উচ্চাঙ্গের সংস্কৃত রূপ।
  • রায় বাহাদুর / রায় সাহেব / খান বাহাদুর / খান সাহেব: ব্রিটিশ আমলে হিন্দু ও মুসলিম জমিদার বা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া খেতাব।
  • নবাব বাহাদুর / কুমার বাহাদুর: মুসলিম অভিজাত এবং জমিদার বংশের সম্মানীয় পুত্র।
  • হুজুর-ই-আলা: নবাব বা ডিউক সমতুল্য অভিজাতদের দরবারে ডাকার ফার্সি রূপ।
  • গরিবপরওয়ার: "গরিবের রক্ষাকর্তা"। যখন কোনো প্রজা জমিদারের কাছে অনুগ্রহ বা Grace ভিক্ষা করত।
  • রাজপ্রতিনিধি / অছি: রাজার অবর্তমানে শাসনভার পরিচালনাকারী (Viceroy) বা নাবালকের আইনি অভিভাবক (Regent)।
  • সুবাদার / মন্ডলেশ্বর / মনসবদার: প্রদেশের শাসক, বিশাল অঞ্চলের অধিপতি বা উচ্চপদস্থ সামরিক অভিজাত।
  • জমিদারবাবু / জোতদার / মিরাশদার: গ্রাম বাংলার বৃহৎ বা প্রান্তিক ভূস্বামী।
  • নায়েব / দেওয়ানজী: জমিদারের প্রধান প্রতিনিধি বা এস্টেটের প্রধান হিসাবরক্ষক।
  • বড়োলাট / ছোটোলাট: ঔপনিবেশিক কলকাতায় যথাক্রমে গভর্নর জেনারেল ও লেফটেন্যান্ট গভর্নরের দেশজ ডাক।
  • মুতসুদ্দি: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেশীয় ব্যবসায়িক প্রতিনিধি বা লিয়াজোঁ অফিসার।

ঐতিহাসিক পদবি বা উপাধি (যা বর্তমানে সারনেম বা পদবিতে পরিণত হয়েছে)

[সম্পাদনা]

সুলতানি, মোঘল, জমিদারি ও ব্রিটিশ আমলের প্রশাসনিক, সামরিক ও পেশাভিত্তিক পদবি যা কালের বিবর্তনে বাঙালির পারিবারিক পদবিতে (Surnames) পরিণত হয়েছে। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লগ্নে সমস্ত রাজকীয় অভিধা এবং উপাধি বাতিল হলেও মানুষের নামে পুরাতন সেই ঐতিহ্যের লেশ এখনও বিদ্যমান।

প্রশাসনিক ও আইনি পরিভাষা:

  • মজুমদার: ফার্সি 'মজমুয়াদার' অর্থাৎ রাজকীয় নথি বা রেকর্ডের রক্ষক।
  • চৌধুরি: 'চৌথ-হরী' অর্থাৎ বিশাল পরগণার রাজস্বের চার ভাগের এক ভাগের (চৌথ) অধিকারী।
  • কানুনগো: রাজকীয় ভূমি আইনের (কানুন) বিশেষজ্ঞ বা নিবন্ধক।
  • তালুকদার: নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের বা 'তালুকের' ইজারাপ্রাপ্ত অধিপতি। রায় তালুকদার রাজা উপাধিপ্রাপ্ত তালুদকার।
  • সরকার: মোঘল প্রশাসনিক একক 'সরকার'-এর প্রধান বা রাষ্ট্রীয় হিসাবরক্ষক।
  • দস্তিদার: রাজকীয় ফরমান বা নথিপত্রে মোহর বা দস্তখত (স্বাক্ষর) প্রদানকারী আধিকারিক। ১
  • শিকদার: মোঘল উপবিভাগ 'শিক'-এর শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা ও রাজস্ব আদায়কারী ম্যাজিস্ট্রেট।
  • মোল্লা / কাজী: ইসলামি আইন ও বিচারব্যবস্থায় ধর্মীয় বিচারক বা পণ্ডিত।
  • মুন্সি: রাজকীয় দোভাষী, চিঠিপত্র লেখক বা সচিবালয়ের উচ্চপদস্থ আধিকারিক।
  • বিশ্বাস: অত্যন্ত বিশ্বস্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা হিসাবরক্ষক (হিন্দু ও মুসলিম উভয় সমাজেই প্রচলিত)।
  • রায় / রায়চৌধুরী: মোঘল ও ব্রিটিশ আমলে রাজা বা বিশাল পরগণার অধিপতিদের দেওয়া উপাধি।
  • মল্লিক: সুলতানি আমলে রাজপুরুষ বা সামন্ত প্রভুদের দেওয়া রাজকীয় উপাধি।
  • তরফদার: পরগণার উপবিভাগ 'তরফ'-এর শাসক বা রাজস্ব আদায়কারী।
  • হাওলাদার: নির্দিষ্ট হাওলা বা অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক (বিশেষত দক্ষিণ ও পূর্ববঙ্গে)।
  • মহলানবীশ: রাজকীয় মহলের হিসাব ও নথিপত্র রক্ষক (ফার্সি 'নবীশ' অর্থাৎ লেখক বা করণিক)।

সামরিক ও প্রতিরক্ষা পরিভাষা:

  • সেনাপতি / বক্সি: সৈন্যবাহিনীর প্রধান এবং সামরিক বাহিনীর বেতন প্রদানকারী কর্মকর্তা ।
  • লস্কর: নৌবাহিনী বা পদাতিক বাহিনীর দক্ষ সৈনিক (ফার্সি ভাষায় লস্কর অর্থ সৈন্যদল)।
  • হাজরা / হাজারি: এক হাজার সৈন্যের অধিনায়ক বা সেনাপতি।
  • কোতোয়াল: শহরের বা দুর্গের প্রধান পুলিশ আধিকারিক বা রক্ষক।
  • পাইক / বরকন্দাজ: রাজার পদাতিক সৈন্য বা বন্দুকধারী দেহরক্ষী বাহিী:।
  • ঢালি: রাজার সেনায় ঢালবাহী।
  • মৃধা: পদাতিক বাহিনী বা দেহরক্ষী দলের প্রধান।
  • সরখেল: রাজকীয় নৌবাহিনীর প্রধান বা অশ্বারোহী বাহিনীর আধিকারিক।
  • দুয়ারি: রাজপ্রাসাদ বা দুর্গের প্রধান দ্বাররক্ষী।
  • রক্ষিত: রাজকোষ, দুর্গ বা রাজপ্রাসাদ রক্ষার বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক।
  • পাঞ্জা / পাঁজা: রাজকীয় প্রতীক, সিলমোহর (পাঞ্জা) বা আদেশনামা বহনকারী ও রক্ষাকারী।
  • খাঁ: 'খাঁ' বা 'খান' মূলত একটি তুর্কি-মঙ্গোল সামরিক উপাধি, যার অর্থ 'সেনাপতি', 'নেতা' বা 'শাসক' (যেমন— চেঙ্গিস খান)। মোঘল ও পাঠান শাসনামলে বাংলায় হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে এটি একটি অত্যন্ত উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক ও সামরিক খেতাব হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।

অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য ভিত্তিক পদবি:

  • পোদ্দার / খাজাঞ্চি: 'ফতেদার' থেকে আগত; রাজকীয় কোষাধ্যক্ষ, মুদ্রা পরীক্ষক বা ব্যাংকার।
  • তহশিলদার: খাজনা বা রাজস্ব আদায়ের প্রধান সরকারি কর্মকর্তা।
  • হালদার: 'হাল' বা লাঙ্গলের অধিকারী; কৃষিব্যবস্থার সাথে যুক্ত ভূস্বামী।
  • বণিক / সওদাগর / সাউ / সাহা: রাজকীয় আনুকূল্যপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ ব্যবসায়ী বা বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক।
  • কুণ্ডু / জোয়ারদার: বড়ো ব্যবসায়ী, শস্য মজুতকারী মহাজন বা বিশাল জোতের মালিক।
  • গোলদার: গোলাঘর বা শস্যভাণ্ডারের রক্ষক এবং পাইকারি ব্যবসায়ী।
  • সাধুখাঁ: মধ্যযুগে যে সমস্ত হিন্দু বণিক বা মহাজন সততার সাথে বিশাল বাণিজ্য পরিচালনা করতেন এবং নবাবদের কোষাগারে বিপুল রাজস্ব বা ঋণ প্রদান করতেন, বাংলার নবাবরা তাঁদের সম্মানার্থে 'সাধু' (সৎ ব্যবসায়ী)-র সাথে 'খাঁ' (অভিজাত) উপাধি যুক্ত করে 'সাধুখাঁ' খেতাবে ভূষিত করতেন।

পেশা ও বিদ্যাকেন্দ্রিক পদবি:

  • ঠাকুর: ব্রাহ্মণ ভূস্বামীদের পদবি বিশেষ।
  • ভট্টাচার্য / চক্রবর্তী: বেদজ্ঞ পণ্ডিত এবং রাজকীয় যজ্ঞকারী ব্রাহ্মণ (চক্রবর্তী অর্থাৎ চক্র বা বিশাল অঞ্চলের অধিকারী পণ্ডিত)।
  • চট্টোপাধ্যায় (চাটুজ্যে) / বন্দ্যোপাধ্যায় (বাঁড়ুজ্যে) / মুখোপাধ্যায় (মুখুজ্যে) / গঙ্গোপাধ্যায় (গাঙ্গুলি): যথাক্রমে চট্ট, বন্দ্য, মুখ্য এবং গঙ্গা তীরবর্তী গ্রামের উচ্চপদস্থ রাজশিক্ষক বা উপাধ্যায়, ব্রাহ্মণ।
  • ওঝা / ঝা - 'উপাধ্যায়' শব্দ থেকে আগত আচার্য ব্রাহ্মণ বা শিক্ষক। বিহার ও মিথিলার প্রভাবযুক্ত অঞ্চলে (এবং রাঢ় বাংলায়) এঁরা মূলত জ্যোতিষ, আয়ুর্বেদ বা তন্ত্রশাস্ত্রের পণ্ডিত ছিলেন।
  • কর্মকার / সূত্রধর / তন্তুবায় / মোদক: রাজকীয় অস্ত্রাগার, স্থাপত্য, বস্ত্র বা মিষ্টান্ন শিল্পের প্রধান শিল্পীদের উপাধি।
  • বৈদ্য / কবিরাজ: রাজপরিবারের ব্যক্তিগত চিকিৎসক বা আয়ুর্বেদ শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত।
  • খন্দকার / আখন্দ: ফার্সি প্রভাবজাত শব্দ, যার অর্থ শিক্ষক, পাঠক বা বিদ্বান ব্যক্তি।
  • মিত্র / দত্ত / গুহ / ঘোষ / বসু: রাজসভার উচ্চপদস্থ পরামর্শদাতা, হিসাবরক্ষক বা রাজকর্মচারীদের উপাধি।
  • দত্ত / পুরকায়স্থ: রাজকীয় দানে নিয়োজিত বা সিবিল সার্ভেন্টের উপাধি।
  • দাশ / দে: প্রাচীনকালে নিজেকে ঈশ্বর বা রাজার সেবায় নিয়োজিত করার উপাধি, যা পরে প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয় (যেমন নৌ-সেনাপতিদের পদবি ছিল 'দাস')।
  • মহাপাত্র: উৎকল বা স্বাধীন হিন্দু রাজাদের প্রধান মন্ত্রী বা সর্বোচ্চ প্রশাসনিক উপদেষ্টা।
  • পাত্র: রাজসভার মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ অমাত্য।
  • শতপথী / ত্রিপাঠী / পাণিগ্রাহী: উৎকলীয় ঘরানার বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ বা রাজপুরোহিত, যাঁরা পরবর্তীতে মেদিনীপুরে স্থায়ী হন।
  • বেদী / দ্বিবেদী (দুবে) / ত্রিবেদী (তেওয়ারি) / চতুর্বেদী (চৌবে): যথাক্রমে এক, দুই, তিন এবং চারটে বেদে পারদর্শী পণ্ডিতের ভূষিত অভিধা।
  • ষড়ঙ্গী: শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ এবং জ্যোতিষ এই ছ-টি বেদাঙ্গ বিদ্যা যিনি পারদর্শী ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের উপাধী।
  • পাণ্ডা: রাজকীয় মন্দির বা দেবোত্তর সম্পত্তির পরিচালক এবং প্রধান পুরোহিত।
  • প্রধান / মাইতি / জানা: মেদিনীপুরের স্থানীয় গ্রাম-প্রধান, প্রতিরক্ষায় নিযুক্ত সেনাপতি বা কৃষিব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক। এঁরা মূলত স্বাধীন সামন্ত রাজাদের সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তি ছিলেন।
  • বেড়া / ঘোড়ুই (ঘোড়াই): রাজকীয় অশ্বারোহী বাহিনীর রক্ষক বা সীমান্ত পাহারাদার।
  • কর: রাজকীয় কর বা রাজস্ব আদায়কারী আধিকারিক।
  • ভুঁইয়া / মহাপাত্র ভুঁইয়া: বিশাল ভূমির অধিকারী বা স্বাধীন স্থানীয় শাসক।
  • মাহাতো / মাহাতা: কুড়মি বা ভূমিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে গ্রামের প্রধান, বিচারক বা কৃষিব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক। মানভূম অঞ্চলে এঁরা অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন।
  • সিংহ: রাজপুত বা ক্ষত্রিয় প্রভাব থেকে আগত বীর বা সামরিক উপাধি। বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের সেনাবাহিনীতে বা স্থানীয় সামন্ত রাজাদের পদবি হিসেবে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত।
  • লায়া / নায়া: রাঢ় বাংলার গ্রাম্য দেবতা বা বনদেবতার উপাসক এবং আদিবাসী/প্রান্তিক সমাজের পুরোহিত।
  • প্রামাণিক: গ্রাম্য সমাজ বা নির্দিষ্ট পেশাজীবী সংগঠন (Guild)-এর প্রধান বিচারক বা নিয়ন্ত্রক।
  • গোরাই: সীমান্তে কৃষিকাজ ও পশুপালনের সাথে যুক্ত বৃহৎ গোষ্ঠীর প্রধান বা ব্যবসায়ী।
  • রক্ষিত / রুখিত: সীমান্ত অঞ্চল বা রাজকীয় কোষাগারের পাহারাদার।
  • দেশমুখ: মারাঠা বর্গি আক্রমণের সময় এবং তৎপরবর্তীকালে রাঢ় বাংলায় পরগণার প্রধান বা রাজস্ব আদায়কারী হিসেবে এই পদবির প্রচলন ঘটে।
  • বড়ুয়া: অহম এবং কোচ রাজাদের অধীনে উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক আধিকারিক বা সামরিক সেনাপতি। (আরাকান রাজসভাতেও এই উপাধির প্রচলন ছিল, যেটি বাঙালি বৌদ্ধদের মধ্যে প্রচলিত পদবি)
  • কার্জি: কোচবিহার রাজতন্ত্রে (কোচ রাজবংশ) মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের উপাধি।
  • কাকতি / বড়কাকতি (Kakoti): অহম ও কামরূপী রাজশাসনে রাজকীয় হিসাবরক্ষক বা রাষ্ট্রীয় নথিপত্র সংরক্ষক।
  • শইকীয়া (Saikia): অহম সামরিক ব্যবস্থায় ১০০ জন সৈন্যের অধিনায়ক (পেশাভিত্তিক সামরিক উপাধি)।
  • হাজারিকা (Hazarika): অহম ও উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ১,০০০ সৈন্যের অধিনায়ক।
  • শর্মা / দেবশর্মা (Sarma): কামরূপী ব্রাহ্মণ এবং উত্তরবঙ্গের বেদজ্ঞ পণ্ডিত বা রাজশিক্ষকদের আনুষ্ঠানিক উপাধি। এমনিতে সর্বক্ষেত্রে হিন্দুসমাজে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র এই চতুর্বর্গের আনুষ্ঠানিক অভিধা যথাক্রমে শর্মন্‌ / দেবশর্মন্‌, বর্মন্‌ / দেববর্মন্‌, গুপ্তন্‌ / দেবগুপ্তন্‌ এবং দাস
  • রাজবংশী: মূলত কোচবিহার ও উত্তরবঙ্গে প্রাচীন রাজকীয় বংশের উত্তরাধিকার বা সেনাবাহিনীতে যুক্ত থাকার পরিচায়ক উপাধি।
  • লস্কর / পুরকায়স্থ: সিলেট ও কাছাড় সীমান্তবর্তী অঞ্চলে স্বাধীন রাজাদের অধীনে নৌ-সেনাপতি (লস্কর) এবং প্রধান দলিল লেখক বা রাজকীয় করণিক (পুরকায়স্থ)।

প্রাচীন রাজবংশ, বারোভুঁইয়া এবং হিন্দু সামন্ত রাজাদের স্মৃতিবাহী পদবি

  • ভৌমিক: 'ভূমি' থেকে আগত। বাংলার স্বাধীন বারোভুঁইয়া বা শক্তিশালী ভূস্বামীদের বংশধর। মোঘলদের বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে শাসনকারী হিন্দু জমিদাররা এই উপাধি ব্যবহার করতেন।
  • মল্ল: বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুরের স্বাধীন 'মল্ল' রাজবংশের শৌর্য ও বীরত্বের প্রতীক। এঁরা মল্লযুদ্ধে পারদর্শী হতেন।
  • দেব / দেবরায়: প্রাচীন বাংলার স্বাধীন হিন্দু রাজা এবং ত্রিপুরা বা আসামের রাজবংশীয়দের ব্যবহৃত রাজকীয় উপাধি, যা পরে জমিদার ও উচ্চবর্ণের পদবিতে পরিণত হয়।
  • নারায়ণ: কোচবিহারের মহারাজা, ত্রিপুরার মাণিক্য বংশ এবং কাছাড়ের রাজাদের সম্মানসূচক রাজকীয় পদবি (যেমন— নরনারায়ণ, শিবনারায়ণ)।
  • বড়ভুঁইয়া, মাজারভুঁইয়া, ছোটভুঁইয়া: আসামের বড়াক উপত্যকার কাছাড়ি রাজাদের দেওয়া শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী ভূস্বামীদের উপাধী।
  • সেন: একাদশ-দ্বাদশ শতকের সেন রাজবংশের স্মৃতিবাহী; পরবর্তীতে রাজসভার উচ্চপদস্থ বৈদ্য ও কায়স্থ আধিকারিক বা সেনাপতিদের পদবি হিসেবে ব্যাপকভাবে গৃহীত।
  • পাল: অষ্টম থেকে একাদশ শতক পর্যন্ত পাল সাম্রাজ্যের স্মৃতিবাহী। এর মূল অর্থ রক্ষক বা পালক। এটি মৃৎশিল্পী পাল পদবিটি নয়।
  • বর্মণ: প্রাচীন বর্মন রাজবংশ এবং উত্তরবঙ্গের শূরবীর ক্ষত্রিয়দের পদবি, যার অর্থ 'বর্ম পরিহিত রক্ষক'।
  • ভঞ্জ: রাঢ়বঙ্গ এবং ময়ূরভঞ্জের প্রাচীন রাজবংশের স্মৃতিবাহী উপাধি (যেমন— বীরভঞ্জ, ময়ূরভঞ্জ)।
  • শূর: প্রাচীন বাংলার শূর রাজবংশের (যেমন আদিসূর) বংশধর বা বীরত্বের প্রতীক।
  • সান্ন্যাল, ভাদুড়ি, মৈত্র, লাহিড়ি, বাগচি: বারেন্দ্র ব্রাহ্মণদের এই পদবিগুলো মূলত প্রাচীন হিন্দু রাজাদের (যেমন সেন রাজবংশ এবং তাহেরপুরের রাজবংশ) মন্ত্রী, রাজকীয় পরামর্শদাতা এবং উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের উপাধি ছিল। (উদাহরণস্বরূপ, বাংলার প্রথম দুর্গাপূজা প্রবর্তক রাজা কংসনারায়ণ ছিলেন ভাদুড়ী বংশের)।

সংগীত, নৃত্য, বাদ্যযন্ত্র এবং লোকসংস্কৃতি ভিত্তিক পদবি

  • গায়েন: গ্রামবাংলার লোকসংগীত, মঙ্গলকাব্য, মনসামঙ্গল বা পালাগানের মূল গায়ক। যিনি আসরে দাঁড়িয়ে মূল গানটি পরিবেশন করতেন, তাঁকে এই উপাধি দেওয়া হত।
  • কীর্তনীয়া: বৈষ্ণব পদাবলী এবং নামকীর্তন গাওয়ায় পারদর্শী শিল্পী বা গায়ক।
  • কথক: যিনি সুর, তাল এবং ক্ষেত্রবিশেষে মুদ্রা ও নৃত্যের মাধ্যমে পুরাণ, রামায়ণ বা মহাভারতের কাহিনী পাঠ ও ব্যাখ্যা করতেন।
  • ভট্ট / ভাট: প্রাচীন ও মধ্যযুগের রাজসভায় রাজাদের শৌর্য-বীর্যের স্তুতিগান বা বংশলতিকা সুর করে গাওয়ার চারণকবি (Bards)।
  • দোহরী / দোহার: পালাগান, কীর্তন বা বাউল গানে মূল গায়েনকে যাঁরা সমবেত কণ্ঠে সঙ্গত করেন বা ধুয়ো ধরেন (Chorus singers)।
  • কলোয়াত: 'কলাবন্ত' শব্দ থেকে আগত। নবাব বা রাজদরবারে ধ্রুপদী বা উচ্চাঙ্গ সংগীতের সাধক ও গায়কদের এই অভিধা দেওয়া হত।
  • কবিয়াল: উপস্থিত বুদ্ধি এবং সুরের মাধ্যমে ছন্দে ছন্দে তর্ক বা 'কবিগান' পরিবেশনকারী শিল্পী।
  • বায়েন / বাইন: পালাগান বা লোকসংগীতে যিনি ঢোল, খোল, শ্রীখোল বা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে মূল গায়েনকে সঙ্গত করেন (Rhythm players)। 'গায়েন-বায়েন' বাংলার লোকসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
  • বাদ্যকার / বাজনাদার: বিবাহ, উৎসব বা রাজকীয় অনুষ্ঠানে সানাই, ঢোল বা সাধারণ বাদ্যযন্ত্র বাজানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত শিল্পী সম্প্রদায়।
  • ঢুলি: গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢোল বা ঢাক বাদক।
  • মৃদঙ্গী / খুলি: মৃদঙ্গ বা শ্রীখোল বাজানোয় অত্যন্ত পারদর্শী শিল্পী।
  • নাকারা / নক্কার: সুলতানি ও মোঘল রাজদরবারে বা যুদ্ধের ময়দানে নাকাড়া বা দুন্দুভি (Kettle drum) বাজানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক বা শিল্পী।

নৃত্য, নাটক ও যাত্রাপালা

  • নট / নট্ট: প্রাচীনকাল থেকে নৃত্য, গীত এবং অভিনয়ের সাথে যুক্ত ঐতিহ্যবাহী শিল্পী সম্প্রদায়। এঁরা পেশাগতভাবে রাজসভায় বা লোকসমাজে নৃত্য-নাটিকা পরিবেশন করতেন।
  • অধিকারী: যাত্রাদল, কীর্তনের দল বা থিয়েটারের প্রধান পরিচালক, ম্যানেজার বা স্বত্বাধিকারী। (উদাহরণস্বরূপ, চারণকবি মুকুন্দ দাসের পিতা ছিলেন একজন 'অধিকারী' বা যাত্রাদলের মালিক)।
  • মহান্ত / মোহন্ত: বৈষ্ণব সমাজে বিশাল কীর্তনের দল বা আখড়ার প্রধান গায়ক ও পরিচালক।
  • ওস্তাদ: শাস্ত্রীয় সংগীত, যন্ত্রসংগীত বা লোকনৃত্যের (যেমন লাঠিখেলা বা ঢালি নৃত্য) প্রধান প্রশিক্ষক বা গুরু।
  • গুণীন: রাঢ় বাংলায় লোকনৃত্য (যেমন গাজন বা ছৌ) এবং মন্ত্রতন্ত্রের সাথে যুক্ত ওঝা বা পরিচালক, যিনি বাদ্যের তালে তালে অনুষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করতেন।

ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের সুপ্রতিষ্ঠিত অভিধা

[সম্পাদনা]

অখণ্ড বাংলা এবং ভারতের সুদীর্ঘ সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ইতিহাসে সম্মানসূচক অভিধা বা উপাধি (Titles/Sobriquets) প্রদানের এক অত্যন্ত সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা, সমকালীন গুণীজনদের স্বীকৃতি, কিংবা ঐতিহাসিক কারণে এই যুগান্তকারী ব্যক্তিত্বরা তাঁদের মূল নামের চেয়েও উপাধিটিতেই অধিক পরিচিতি লাভ করেছেন।

অবিভক্ত বাংলা ও ভারতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এমন সুপ্রতিষ্ঠিত অভিধার একটি সর্বাঙ্গীণ ও শ্রেণিবদ্ধ তালিকা নিচে দেওয়া হল, যেখানে প্রতিটি উপাধি প্রাপ্তির কারণ ও প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা হয়েছে:

সাহিত্য, সংস্কৃতি ও চারুকলা

[সম্পাদনা]
  • কবিগুরু / বিশ্বকবি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রেক্ষাপট: তাঁর সাহিত্যের বিশ্বজনীন আবেদন এবং ১৯১৩ সালে নোবেল প্রাপ্তির পর তাঁকে সমগ্র বিশ্বের কবি বা 'বিশ্বকবি' আখ্যা দেওয়া হয়। 'কবিগুরু' উপাধিটি সমগ্র বাংলা সাহিত্যজগতে তাঁর অবিসংবাদিত পিতৃপ্রতিম ও গুরুস্থানীয় আধিপত্যের প্রতীক।
  • গুরুদেব: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রেক্ষাপট: মহাত্মা গান্ধী তাঁকে এই উপাধি দেন। রবীন্দ্রনাথের প্রজ্ঞা, আধ্যাত্মিক দর্শন এবং শান্তিনিকেতনে তাঁর শিক্ষাদর্শের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতেই গান্ধীজি তাঁকে এই নামে সম্বোধন করতেন।
  • বিদ্রোহী কবি: কাজী নজরুল ইসলাম। প্রেক্ষাপট: ১৯২২ সালে তাঁর কালজয়ী 'বিদ্রোহী' কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পর সমাজের অন্যায়, ব্রিটিশ শাসন এবং ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর বজ্রকণ্ঠের জন্য আপামর জনমানুষ তাঁকে এই অভিধায় ভূষিত করে।
  • মহাকবি: মাইকেল মধুসূদন দত্ত। প্রেক্ষাপট: বাংলা সাহিত্যে প্রথম সার্থক মহাকাব্য 'মেঘনাদবধ কাব্য' রচনা এবং অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলা কবিতাকে বিশ্বমানে উন্নীত করার জন্য তাঁকে 'মহাকবি' অভিধা দেওয়া হয়।
  • ভাষাচার্য: ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। প্রেক্ষাপট: বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে তাঁর যুগান্তকারী গবেষণা ('ODBL' বা Origin and Development of the Bengali Language) এবং ভাষাতত্ত্বে তাঁর আন্তর্জাতিক পাণ্ডিত্যের জন্য তাঁকে ভাষার আচার্য বা গুরু বলা হয়।
  • জ্ঞানতাপস: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহপ্রেক্ষাপট: বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম রূপ নিয়ে আজীবন নিরলস গবেষণা এবং আক্ষরিক অর্থেই একজন তাপস বা ঋষির মতো জ্ঞান সাধনায় আত্মনিয়োগ করার জন্য পণ্ডিত সমাজ তাঁকে এই উপাধি দেয়।
  • সাহিত্যসম্রাট: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। প্রেক্ষাপট: বাংলা উপন্যাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং কালজয়ী সৃষ্টির মাধ্যমে সাহিত্যজগতে একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্য বাঙালি পাঠকসমাজ তাঁকে সাহিত্যের সম্রাট অভিধা দেয়।
  • অপরাজেয় কথাশিল্পী: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। প্রেক্ষাপট: সাধারণ বাঙালির জীবন ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে লেখা তাঁর উপন্যাসগুলোর জনপ্রিয়তা ও আবেদনকে কেউ পরাজিত করতে পারে না বলে সমালোচকরা তাঁকে এই আখ্যা দেন।
  • যুগসন্ধিক্ষণের কবি: ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। প্রেক্ষাপট: মধ্যযুগের ধর্মনির্ভর সাহিত্য থেকে আধুনিক যুগের সমাজসচেতন সাহিত্যের মাঝখানের সেতুটি তিনি তৈরি করেছিলেন বলে তাঁকে দুই যুগের সন্ধিক্ষণের কবি বলা হয়।
  • ভোরের পাখি: বিহারীলাল চক্রবর্তী। প্রেক্ষাপট: বাংলা কবিতায় প্রথম আধুনিক ও আত্মমগ্ন গীতিগীতিকা (Lyric) প্রবর্তনের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং তাঁকে বাংলা কাব্যের 'ভোরের পাখি' আখ্যা দিয়েছিলেন।
  • চলিত গদ্যের রূপকার / বীরবল: প্রমথ চৌধুরী। প্রেক্ষাপট: বাংলা সাহিত্যে সাধু ভাষার একাধিপত্য ভেঙে 'সবুজ পত্র' পত্রিকার মাধ্যমে চলিত গদ্যরীতির সার্থক প্রবর্তন করার জন্য তিনি এই অভিধা পান। 'বীরবল' ছিল তাঁর ছদ্মনাম, যা তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিচায়ক।
  • রসরাজ: অমৃতলাল বসু। প্রেক্ষাপট: বাংলা নাটকে এবং প্রহসনে তীক্ষ্ণ অথচ নির্মল হাস্যরস (Humour and Satire) সৃষ্টিতে তাঁর অসামান্য পারদর্শিতার জন্য তাঁকে রসের রাজা বলা হত।
  • ননসেন্স ছন্দের জাদুকর: সুকুমার রায়। প্রেক্ষাপট: 'আবোল তাবোল' এবং 'হ-য-ব-র-ল'-এর মতো সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে সম্পূর্ণ অভিনব 'ননসেন্স' (Nonsense) ধারার প্রবর্তন এবং শব্দের জাদুকরী প্রয়োগের জন্য তিনি এই নামে পরিচিত।
  • রূপকথার জাদুকর: দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার। প্রেক্ষাপট: বাংলার গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা বিলুপ্তপ্রায় মৌখিক রূপকথাগুলোকে সংগ্রহ করে 'ঠাকুরমার ঝুলি' নামক কালজয়ী গ্রন্থে অমর করে রাখার জন্য তাঁকে এই উপাধি দেওয়া হয়।
  • রম্যরচনার সম্রাট: সৈয়দ মুজতবা আলী। প্রেক্ষাপট: বহুভাষাবিদ এই লেখকের রচনায় অসাধারণ রসবোধ, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ এবং বিশ্বভ্রমণের অভিজ্ঞতার অনবদ্য সংমিশ্রণ বাংলা রম্যরচনাকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল।
  • পল্লীকবি: জসীমউদ্দীন। প্রেক্ষাপট: তাঁর কবিতায় গ্রামবাংলার মাটি, মানুষ, প্রকৃতি এবং গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতির নিখুঁত ও দরদি চিত্রায়ণের জন্য তিনি এই উপাধি পান।
  • রূপসী বাংলার কবি: জীবনানন্দ দাশ। প্রেক্ষাপট: বাংলার প্রকৃতির যে অনবদ্য, পরাবাস্তব ও নস্টালজিক চিত্র তিনি এঁকেছিলেন, তার স্বীকৃতিস্বরূপ সাহিত্যিক মহল তাঁকে এই অভিধা দেয়।
  • কিশোর কবি: সুকান্ত ভট্টাচার্য। প্রেক্ষাপট: মাত্র একুশ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগে মার্কসবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তীক্ষ্ণ ও বিপ্লবী কবিতা লেখার জন্য তাঁকে এই অভিধায় ডাকা হয়।
  • ছন্দের জাদুকর: সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। প্রেক্ষাপট: বাংলা কবিতায় অসংখ্য নতুন ছন্দের সফল প্রয়োগ এবং ধ্বনিঝংকারের জাদুকরী সৃষ্টির জন্য সমকালীনরা তাঁকে এই নামে ডাকতেন।
  • মাটি ও মানুষের রূপকার: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রেক্ষাপট: রাঢ় বাংলার রুক্ষ মাটি, প্রান্তিক মানুষ (বেদে, সাপুড়ে, জমিদার) এবং ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততন্ত্রের নিখুঁত চিত্রায়ণের জন্য তিনি এই নামে পরিচিত।
  • চারণ কবি: মুকুন্দ দাস। প্রেক্ষাপট: স্বদেশী আন্দোলনের সময় গ্রামে গ্রামে ঘুরে নিজস্ব লোকজ সুরে গান গেয়ে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তাঁকে চারণ কবি বলা হত।
  • পদাতিক কবি: সুভাষ মুখোপাধ্যায়। প্রেক্ষাপট: তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'পদাতিক'-এর নামানুসারে এবং খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে কলম ধরার জন্য তিনি এই নামে পরিচিত হন।
  • স্বভাব কবি: গোবিন্দদাস (এবং ক্ষেত্রবিশেষে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত)। প্রেক্ষাপট: কোনো প্রথাগত কাব্যিক নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কবিতা রচনার অসামান্য প্রতিভার জন্য এই অভিধা দেওয়া হয়েছিল।
  • কান্তকবি: রজনীকান্ত সেন। প্রেক্ষাপট: তাঁর রচিত ঈশ্বরমুখী ও স্বদেশী গানের গভীর আধ্যাত্মিক শান্তির (কান্ত) কারণে তিনি এই নামে সমধিক পরিচিত।
  • শোকের কবি: অক্ষয়কুমার বড়াল। প্রেক্ষাপট: স্ত্রীর মৃত্যুতে গভীর শোকাচ্ছন্ন হয়ে তিনি 'এষা' কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন, যেখানে শোকের এত নিবিড় প্রকাশ ঘটেছিল যে তাঁকে এই অভিধা দেওয়া হয়।
  • রায়গুণাকর: ভারতচন্দ্র রায়। প্রেক্ষাপট: নবদ্বীপের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় তাঁর রাজসভার এই শ্রেষ্ঠ কবির 'অন্নদামঙ্গল' কাব্যের অনবদ্য শিল্পগুণে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে রাজকীয় উপাধি প্রদান করেন।
  • কবিকঙ্কণ: মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। প্রেক্ষাপট: 'চণ্ডীমঙ্গল' কাব্য রচনার জন্য তৎকালীন জমিদার বাঁকুড়া রায় তাঁকে এই উপাধি দেন (অর্থাৎ যাঁর কবিতা হাতের কঙ্কণের মতো সুন্দর)।
  • মৈথিল কোকিল / অভিনব জয়দেব: বিদ্যাপতি। প্রেক্ষাপট: মৈথিলি ভাষায় রচিত তাঁর রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলির সুমধুর সুরের জন্য তাঁকে মিথিলার কোকিল অভিহিত করা হয়।
  • কবিরত্ন / কবিরাজ: জয়দেব। রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজাসভার পঞ্চরত্নের অন্যতম কবি জয়দেব গীতগোবিন্দের রচয়িতা। গীতগোবিন্দে তিনি নিজেকে পদ্মাবতীচরণচারণচক্রবর্তী অভিধায় ভূষিত করেছেন, যার অর্থ 'যে সম্রাট (চক্রবর্তী) পদ্মাবতীর (জয়দেবের স্ত্রীর নাম) পায় চারণ করে'।
  • মরমী কবি: হাসন রাজা। প্রেক্ষাপট: দেহতত্ত্ব, সংসার-বৈরাগ্য এবং ঈশ্বরের প্রতি প্রেমের গভীর মরমী (Mystic) দর্শনে রচিত তাঁর লোকগানগুলোর জন্য তাঁকে এই আখ্যা দেওয়া হয়।

শিল্প, সংগীত ও নাটক

  • শিল্পাচার্য: জয়নুল আবেদিন। প্রেক্ষাপট: ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের মর্মস্পর্শী স্কেচ এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে চারুকলা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপনের জন্য তাঁকে শিল্পের আচার্য বা সর্বোচ্চ গুরু অভিধা দেওয়া হয়।
  • শিল্পগুরু: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রেক্ষাপট: 'বেঙ্গল স্কুল অফ আর্ট'-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ইউরোপীয় প্রভাব মুক্ত করে নব্য ভারতীয় চিত্রকলার পুনর্জাগরণে তাঁর গুরুদায়িত্বের জন্য তিনি এই উপাধি পান।
  • পটুয়া / লোকশিল্পের জাদুকর: যামিনী রায়। প্রেক্ষাপট: পশ্চিমি কলাকৌশল বর্জন করে বাংলার নিজস্ব 'কালীঘাট পটচিত্র' এবং বাঁকুড়ার পোড়ামাটির পুতুলের আদলে এক নিজস্ব চিত্রশৈলী উদ্ভাবনের জন্য তিনি এই নামে পরিচিত।
  • ভাস্কর্যচার্য / খ্যাপা বাউল: রামকিঙ্কর বেইজ। প্রেক্ষাপট: শান্তিনিকেতনের এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী প্রাতিষ্ঠানিক রীতির তোয়াক্কা না করে সিমেন্ট, কাঁকর ও মাটি দিয়ে আধুনিক ভারতীয় ভাস্কর্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন বলে তাঁকে এই নামে ডাকা হয়।
  • সুরসম্রাট: ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। প্রেক্ষাপট: ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে তাঁর যুগান্তকারী অবদান ও বহু বাদ্যযন্ত্রে অসামান্য দখলের জন্য বৃহত্তর সংগীতজগৎ তাঁকে এই উপাধি দেয়।
  • টপ্পা সম্রাট: রামনিধি গুপ্ত (নিধুবাবু)। প্রেক্ষাপট: রাগাশ্রয়ী সংগীত 'টপ্পা'-কে বাংলা ভাষায় সার্থকভাবে রূপদান এবং জনপ্রিয় করার জন্য তাঁকে টপ্পার সম্রাট বলা হয়।
  • বাউলসম্রাট: লালন ফকির। প্রেক্ষাপট: বাউল দর্শনের চূড়ান্ত উৎকর্ষ এবং হাজার হাজার আধ্যাত্মিক, দেহতত্ত্ব ও মানবতাবাদী গানের স্রষ্টা হিসেবে লোকসমাজে তিনি বাউলদের সম্রাট হিসেবে পূজিত।
  • ভাওয়াইয়া সম্রাট: আব্বাসউদ্দীন আহমদ। প্রেক্ষাপট: উত্তরবঙ্গের বিশেষ লোকজ সুর ভাওয়াইয়া এবং চটকা গানকে গ্রামবাংলা থেকে তুলে এনে আধুনিক সংগীত জগতে জনপ্রিয় করার জন্য তিনি এই অভিধা পান।
  • লোকসংগীত সম্রাট: আব্দুল আলীম। প্রেক্ষাপট: পল্লীগীতি, মুর্শিদি এবং ভাটিয়ালি গানে তাঁর অসামান্য দরদি কণ্ঠের জন্য তিনি অবিভক্ত বাংলা ও বাংলাদেশের লোকসংগীতের সম্রাট হিসেবে পরিচিত।
  • ধামাইল সম্রাট: রাধারমণ দত্ত। প্রেক্ষাপট: সিলেটের ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য ও গান 'ধামাইল'-এর শ্রেষ্ঠ রচয়িতা এবং সাধক হওয়ার কারণে তাঁকে এই অভিধা দেওয়া হয়।
  • নটসূর্য: গিরিশচন্দ্র ঘোষ। প্রেক্ষাপট: বাংলা পেশাদার থিয়েটারের জনক হিসেবে অসংখ্য নাটক রচনা, পরিচালনা এবং অভিনয়ে তাঁর সূর্যের মতো দীপ্তময় উপস্থিতির জন্য নাট্যজগৎ তাঁকে এই সম্মান দেয়।
  • নাট্যাচার্য: শিশির কুমার ভাদুড়ী। প্রেক্ষাপট: বাংলা পেশাদার থিয়েটারকে গতানুগতিকতার বাইরে এনে আধুনিক, পরিশীলিত ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে উন্নীত করার জন্য তাঁকে নাট্যের আচার্য অভিধা দেয়।

সংস্কৃতি ও শিল্পজগতের স্বনামধন্য নারী ব্যক্তিত্ব

  • নারী জাগরণের অগ্রদূত: বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। প্রেক্ষাপট: বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অবরোধবাসিনী নারীদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং লেখনীর ('সুলতানার স্বপ্ন') মাধ্যমে যে অসামান্য সংগ্রাম তিনি করেছিলেন, তার স্বীকৃতি এটি।
  • জননী সাহসিকা: বেগম সুফিয়া কামাল। প্রেক্ষাপট: তাঁর লেখনী কেবল সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ— প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও নারী অধিকার আন্দোলনে তাঁর নির্ভীক মাতৃসুলভ নেতৃত্বের জন্য তাঁকে এই উপাধি দেওয়া হয়।
  • মঞ্চসাম্রাজ্ঞী / নটী: বিনোদিনী দাসী (নটী বিনোদিনী)। প্রেক্ষাপট: উনবিংশ শতাব্দীতে চরম সামাজিক লাঞ্ছনা উপেক্ষা করে বাংলা পেশাদার থিয়েটারের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করা এবং স্টার থিয়েটার প্রতিষ্ঠায় তাঁর আত্মত্যাগের জন্য নাট্যজগৎ তাঁকে এই সম্মান দেয়।
  • মহানায়িকা: সুচিত্রা সেন। প্রেক্ষাপট: বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে নিজের অসামান্য ব্যক্তিত্ব, গ্ল্যামার এবং অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি এমন এক আইকনিক অবস্থান তৈরি করেছিলেন যা তাঁকে চিরকালের জন্য 'মহানায়িকা' অভিধা এনে দেয়।
  • সুরসাম্রাজ্ঞী / ভারতের কোকিলকণ্ঠী: লতা মঙ্গেশকর। প্রেক্ষাপট: সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে হাজার হাজার কালজয়ী গানে তাঁর ঐশ্বরিক কণ্ঠস্বরের জন্য সমগ্র ভারত তাঁকে সুরের সাম্রাজ্ঞী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
  • বাংলার কানন / মেলোডি কুইন: কানন দেবী। প্রেক্ষাপট: বাংলা চলচ্চিত্রের আদি যুগে তিনি কেবল শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীই ছিলেন না, একজন অসাধারণ গায়িকাও ছিলেন। তাঁর অবদানের জন্য তাঁকে এই উপাধি দেওয়া হয়।
  • রবীন্দ্রসংগীতের সম্রাজ্ঞী: সুচিত্রা মিত্র ও কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রেক্ষাপট: রবীন্দ্রসংগীতের জগতে সুচিত্রা মিত্রের দৃপ্ত, দরাজ কণ্ঠ এবং কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (যাঁকে রবীন্দ্রনাথ নাম দিয়েছিলেন মোহর) স্নিগ্ধ, মায়াময় গায়কী তাঁদেরকে এই যৌথ অথচ স্বতন্ত্র অভিধায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
  • নজরুলগীতির সম্রাজ্ঞী: ফিরোজা বেগম। প্রেক্ষাপট: কাজী নজরুল ইসলামের গানকে উপমহাদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার পেছনে তাঁর আজীবন সাধনা এবং অতুলনীয় গায়কীর জন্য তাঁকে এই উপাধি দেওয়া হয়।
  • শবরমাতা (Mother of the Shabars): মহাশ্বেতা দেবী। প্রেক্ষাপট: সাহিত্য রচনার পাশাপাশি তিনি পুরুলিয়া ও ঝাড়খণ্ডের প্রান্তিক লোধা ও শবর জনজাতির অধিকার আদায়ের জন্য আজীবন লড়াই করেছেন। তাই সেই আদিবাসী মানুষেরা তাঁকে নিজেদের 'মাতা' বা শবরমাতা আখ্যা দিয়েছিলেন।
  • নাট্যসাম্রাজ্ঞী: তৃপ্তি মিত্র। প্রেক্ষাপট: শম্ভু মিত্রের 'বহুরূপী' নাট্যদলে 'রক্তকরবী'র নন্দিনী থেকে শুরু করে অসংখ্য নাটকে তাঁর অসামান্য, যুগান্তকারী অভিনয়ের জন্য তাঁকে নাট্যমঞ্চের সাম্রাজ্ঞী বলা হয়।
  • প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক: স্বর্ণকুমারী দেবী। প্রেক্ষাপট: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় বোন হিসেবে তিনি কেবল 'ভারতী' পত্রিকার সম্পাদনাতেই যুক্ত ছিলেন না, বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক মহিলা ঔপন্যাসিক হিসেবেও তিনি এই ঐতিহাসিক আখ্যা লাভ করেন।
  • প্রথম প্রমিলা স্নাতক / নারী পথিকৃৎ: কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ও চন্দ্রমুখী বসু। প্রেক্ষাপট: সরাসরি সাহিত্যের অভিধা না হলেও, ব্রিটিশ ভারতের প্রথম নারী স্নাতক এবং প্রথম প্র্যাকটিসিং মহিলা চিকিৎসক হিসেবে কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর অবস্থান বাঙালি নারীদের জাগরণের অবিসংবাদিত প্রথম মাইলফলক।
  • আলপনার জাদুকর: গৌরী ভঞ্জ। প্রেক্ষাপট: শান্তিনিকেতনের প্রখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসুর কন্যা গৌরী ভঞ্জ, যিনি শান্তিনিকেতনী আলপনাকে এক অসামান্য চারুকলার স্তরে উন্নীত করেছিলেন এবং ভারতের সংবিধানের পাণ্ডুলিপির নকশা অংকনে যুক্ত ছিলেন।
  • গানের পাখি (বুলবুল): রুনা লায়লা। প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের আধুনিক ও পপ গানে তাঁর সুমিষ্ট অথচ শক্তিশালী কণ্ঠস্বরের জন্য শ্রোতারা তাঁকে ভালোবেসে উপমহাদেশের 'গানের পাখি' বা 'দমাদম মাস কালান্দার'-এর জাদুকর বলে ডাকেন।

জাতীয়তাবাদী নেতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামী

[সম্পাদনা]

পুরুষ স্বাধীনতা সংগ্রামী ও জাতীয়তাবাদী নেতা:

  • নেতাজি: সুভাষচন্দ্র বসু। প্রেক্ষাপট: ১৯৪২ সালে জার্মানিতে 'ফ্রি ইন্ডিয়া সেন্টার'-এর ভারতীয় সৈন্যরা এবং জার্মান ফিল্ড মার্শাল এরউইন রোমেল তাঁকে প্রথম 'নেতাজি' (সম্মানীয় নেতা) বলে সম্বোধন করেন। পরে সমগ্র ভারত এই ডাক গ্রহণ করে।
  • মহাত্মা: মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। প্রেক্ষাপট: ১৯১৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে ভারতের দরিদ্র জনতার প্রতি তাঁর অসীম আত্মত্যাগের জন্য 'মহান আত্মা' বা 'মহাত্মা' উপাধি দেন।
  • বাপু / বাপুজি: মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। প্রেক্ষাপট: গুজরাটি ভাষায় 'বাপু' অর্থ পিতা। ভারতের সাধারণ মানুষ তাঁকে ভালোবেসে জাতির পিতা হিসেবে এই নামে ডাকতেন।
  • বঙ্গবন্ধু: শেখ মুজিবুর রহমান। প্রেক্ষাপট: ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে তোফায়েল আহমেদ বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে তাঁকে এই ঐতিহাসিক উপাধি প্রদান করেন।
  • দেশবন্ধু: চিত্তরঞ্জন দাশ। প্রেক্ষাপট: দেশের প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ, বিপুল সম্পত্তি দান এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণে তাঁকে 'দেশের বন্ধু' বা 'দেশবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
  • মাস্টারদা: সূর্য সেন। প্রেক্ষাপট: চট্টগ্রামের উমাতারা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তাঁর অনাড়ম্বর জীবন এবং আদর্শবান আচরণের জন্য বিপ্লবী সহযোদ্ধারা তাঁকে পরম শ্রদ্ধায় 'মাস্টারদা' বলে ডাকতেন।
  • চাচা নেহেরু: জওহরলাল নেহেরু। প্রেক্ষাপট: শিশুদের প্রতি তাঁর অগাধ স্নেহ এবং পোশাকে গোলাপ ফুলের প্রতি ভালোবাসার কারণে দেশের শিশুরা তাঁকে ভালোবেসে এই নামে ডাকত।
  • লৌহমানব (Iron Man of India): সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। প্রেক্ষাপট: স্বাধীনতার পর ৫৬২টি ছিন্নভিন্ন দেশীয় রাজ্যকে দৃঢ়তা, কূটনীতি ও শক্তির মাধ্যমে একক ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার তাঁর ইস্পাতকঠিন মানসিকতার জন্য।
  • সরদার: বল্লভভাই প্যাটেল। প্রেক্ষাপট: ১৯২৮ সালে বারদোলি সত্যাগ্রহের সফল নেতৃত্বের পর স্থানীয় কৃষক নারীরা এবং গান্ধীজি তাঁকে 'সর্দার' (নেতা বা প্রধান) উপাধি দেন।
  • শেরে বাংলা: এ. কে. ফজলুল হক। প্রেক্ষাপট: 'বাংলার বাঘ'। ১৯৩৭ সালে লখনউতে মুসলিম লীগের অধিবেশনে তাঁর বজ্রগম্ভীর ভাষণ এবং প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে অকুতোভয় রাজনীতির জন্য তিনি এই অভিধা পান।
  • বাঘা যতীন: যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। প্রেক্ষাপট: কৈশোরে শুধুমাত্র একটি ছোরা দিয়ে খালি হাতে একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে হত্যা করার অসীম সাহসিকতার জন্য তাঁর এই নামকরণ হয়।
  • দেশপ্রাণ: বীরেন্দ্রনাথ শাসমল। প্রেক্ষাপট: মেদিনীপুরে অসহযোগ আন্দোলন এবং ইউনিয়ন বোর্ড ট্যাক্স বয়কট আন্দোলনের সফল নেতৃত্বের জন্য বাংলার মানুষ তাঁকে 'দেশের প্রাণ' আখ্যা দেয়।
  • দেশনায়ক: সুভাষচন্দ্র বসু। প্রেক্ষাপট: ১৯৩৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুভাষচন্দ্রকে এই উপাধি দিয়ে একটি প্রকাশ্য সভায় সম্মাননা জানান।
  • দেশপ্রিয়: যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত। প্রেক্ষাপট: চট্টগ্রামের এই মহান নেতা ও কলকাতার মেয়রের জনদরদি কাজের জন্য বাংলার মানুষ তাঁকে 'দেশের প্রিয়' উপাধিতে ভূষিত করে।
  • সীমান্ত গান্ধী (Frontier Gandhi): খান আবদুল গাফফার খানপ্রেক্ষাপট: উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে গান্ধীজির অহিংস নীতির অনুকরণে 'খুদাই খিদমতগার' বাহিনী গঠন ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের জন্য।
  • বাদশা খান / বাচা খান: খান আবদুল গাফফার খান। প্রেক্ষাপট: পশতুন উপজাতিদের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে তাঁর অনুগামীরা তাঁকে 'বাদশা খান' বা উপজাতিদের রাজা বলে ডাকতেন।
  • পাঞ্জাব কেশরী: লালা লাজপত রায়। প্রেক্ষাপট: কেশরী অর্থ সিংহ। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে পাঞ্জাবে তাঁর অদম্য সাহস ও নেতৃত্বের জন্য তাঁকে 'পাঞ্জাবের সিংহ' বলা হত।
  • লোকমান্য: বাল গঙ্গাধর তিলক। প্রেক্ষাপট: ব্রিটিশ ভারতে তিনি প্রথম জনসাধারণের দ্বারা ব্যাপকভাবে স্বীকৃত ও পূজিত জাতীয় নেতা ছিলেন, তাই তাঁকে 'লোকমান্য' (জনগণ কর্তৃক সর্বজনীনভাবে মান্য) বলা হত।
  • শহীদ-ই-আজম: ভগৎ সিং। প্রেক্ষাপট: 'আজম' অর্থ সর্বশ্রেষ্ঠ। দেশের জন্য মাত্র ২৩ বছর বয়সে হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি বরণ করার কারণে ভারতীয় জনমানস তাঁকে শহীদদের শিরোমণি হিসেবে এই উপাধি দেয়।
  • কায়েদ-ই-আজম: মহম্মদ আলী জিন্নাহ। প্রেক্ষাপট: উর্দুতে এর অর্থ 'মহান নেতা'। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবিসংবাদিত নেতৃত্বের জন্য তাঁকে এই উপাধি দেওয়া হয়।
  • রাষ্ট্রগুরু: সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রেক্ষাপট: 'ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন' প্রতিষ্ঠা এবং ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম রাজনৈতিক চেতনা ও জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করার জন্য তাঁকে রাষ্ট্রের গুরু বলা হয়।
  • ভারতের বৃদ্ধ প্রপিতামহ (Grand Old Man of India): দাদাভাই নওরোজি। প্রেক্ষাপট: ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রথম ভারতীয় সদস্য হিসেবে এবং ভারতের সম্পদ কীভাবে ব্রিটিশরা লুণ্ঠন করছে (Drain of Wealth theory) তা প্রথম প্রকাশ্যে আনার জন্য তিনি এই মর্যাদাপূর্ণ আখ্যা পান।
  • বীর সাভারকর: বিনায়ক দামোদর সাভারকর। প্রেক্ষাপট: ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দেওয়া এবং সেলুলার জেলে অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করার কারণে তাঁর অনুগামীরা তাঁকে 'বীর' উপাধি দেন।
  • রাজাজি: চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী। প্রেক্ষাপট: স্বাধীন ভারতের প্রথম ভারতীয় গভর্নর জেনারেল এবং প্রখর রাজনৈতিক তীক্ষ্ণতার অধিকারী এই নেতাকে মহাত্মা গান্ধী ভালোবেসে 'রাজাজি' বলতেন।
  • ঋষি অরবিন্দ: অরবিন্দ ঘোষ। প্রেক্ষাপট: প্রথম জীবনে চরমপন্থী সশস্ত্র বিপ্লবী নেতা থেকে পরবর্তীকালে পন্ডিচেরিতে যোগসাধনার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক গুরুতে রূপান্তরিত হওয়ার কারণে তিনি এই অভিধা পান।
  • লোকনায়ক: জয়প্রকাশ নারায়ণ। প্রেক্ষাপট: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং পরবর্তীতে ১৯৭০-এর দশকে 'সম্পূর্ণ বিপ্লব'-এর ডাক দিয়ে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার অবিসংবাদিত নেতা হওয়ার কারণে তাঁকে এই উপাধি দেওয়া হয়।
  • বঙ্গতাজ: তাজউদ্দীন আহমদ। প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর অসামান্য নেতৃত্ব এবং স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে মুকুটের ন্যায় ভূমিকার জন্য তাঁকে 'বাংলার মুকুট' বা বঙ্গতাজ বলা হয়।
  • মজলুম জননেতা: আবদুল হামিদ খান ভাসানী (মাওলানা ভাসানী)। প্রেক্ষাপট: আজীবন শ্রমিক, কৃষক এবং শোষিত (মজলুম) মানুষের অধিকারের জন্য আপসহীন সংগ্রাম করার কারণে তিনি এই আখ্যা পান।

নারী স্বাধীনতা সংগ্রামী ও জাতীয়তাবাদী নেত্রী:

  • বীরকন্যা: প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। প্রেক্ষাপট: মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে ১৯৩২ সালে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে প্রথম বাঙালি নারী হিসেবে নেতৃত্ব প্রদান এবং ধরা পড়ার আগে সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেওয়ার কারণে তাঁকে 'বীরকন্যা' উপাধি দেওয়া হয়।
  • গান্ধীবুড়ি: মাতঙ্গিনী হাজরা। প্রেক্ষাপট: ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে মেদিনীপুরের তমলুকে ৭৩ বছর বয়সে পুলিশের গুলি বুক পেতে নিয়েও হাতে ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা উঁচু করে রাখার অসীম সাহসিকতার জন্য এবং গান্ধীজির অহিংস নীতির প্রতি তাঁর গভীর আনুগত্যের কারণে সাধারণ মানুষ তাঁকে এই নামে ডাকত।
  • ভারতের কোকিল (Nightingale of India): সরোজিনী নাইডু। প্রেক্ষাপট: তাঁর অনবদ্য ইংরেজি কবিতা রচনা এবং সুমিষ্ট বাগ্মিতার জন্য মহাত্মা গান্ধী তাঁকে এই উপাধি দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম ভারতীয় মহিলা সভাপতি।
  • অগ্নিকন্যা: বীণা দাস। প্রেক্ষাপট: ১৯৩২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বাংলার ব্রিটিশ গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে সরাসরি গুলি করার অদম্য সাহসের জন্য বাংলার বিপ্লবী সমাজ তাঁকে 'অগ্নিকন্যা' অভিধা দেয়। (অনেক ঐতিহাসিক কল্পনা দত্তকেও এই অভিধায় উল্লেখ করেন)।
  • বিপ্লবী নারী / চট্টলার অগ্নিকন্যা: কল্পনা দত্ত। প্রেক্ষাপট: সূর্য সেনের ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির অন্যতম সক্রিয় সদস্যা হিসেবে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন এবং জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য।
  • ভারতীয় বিপ্লবের জননী (Mother of Indian Revolution): মাদাম ভিকাজী কামা। প্রেক্ষাপট: ১৯০৭ সালে জার্মানিতে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে তিনি প্রথম ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে বিদেশের মাটিতে ভারতের পতাকা (যা তিনি নিজে নকশা করেছিলেন) উত্তোলন করেন। তাই তাঁকে ভারতীয় বিপ্লবের মাতা বলা হয়।
  • গ্র্যান্ড ওল্ড লেডি (Grand Old Lady of the Independence Movement): অরুণা আসফ আলী। প্রেক্ষাপট: ১৯৪২ সালের 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের সময় ব্রিটিশদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে বোম্বের গোয়ালিয়া ট্যাঙ্ক ময়দানে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে তিনি এই বীরত্বব্যঞ্জক উপাধি লাভ করেন।
  • কাপ্তেন লক্ষ্মী: লক্ষ্মী সেহগল (কাপ্তেন লক্ষ্মী স্বামীনাথন)। প্রেক্ষাপট: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের নারী বাহিনী 'ঝাঁসির রানী রেজিমেন্ট'-এর প্রধান সেনাপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই থেকেই তিনি আজীবন 'কাপ্তেন' অভিধায় পরিচিত ছিলেন।
  • ঝাঁসির রানী: মহারানি লক্ষ্মীবাই। প্রেক্ষাপট: ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে (সিপাহী বিদ্রোহ) ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে অশ্বপৃষ্ঠে তরবারি হাতে তাঁর অসমসাহসী যুদ্ধের কারণে তিনি ভারতীয় নারী বীরত্বের চিরন্তন প্রতীকে পরিণত হন। ৬
  • মাতা বসন্ত: অ্যানি বেসান্ত। প্রেক্ষাপট: আয়ারল্যান্ডের অধিবাসী হয়েও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে (বিশেষ করে হোমরুল লিগ প্রতিষ্ঠায়) তাঁর আত্মত্যাগ এবং থিওসফিক্যাল সোসাইটির মাধ্যমে ভারতীয় দর্শনকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরার জন্য ভারতীয়রা তাঁকে মাতৃজ্ঞানে এই নামে ডাকত। ৬
  • বা (Baa): কস্তুরবা গান্ধী। প্রেক্ষাপট: মহাত্মা গান্ধীর সহধর্মিণী এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পদক্ষেপে গান্ধীজির ছায়াসঙ্গিনী। গুজরাটি ভাষায় 'বা' অর্থ মা। ভারতের মানুষ তাঁকে ভালোবেসে 'মা' বা 'বা' বলে ডাকত।
  • দেশবন্ধু-পত্নী ও নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ: বাসন্তী দেবী। প্রেক্ষাপট: চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী হিসেবে তিনি কেবল স্বামীর সহযোদ্ধাই ছিলেন না, ১৯২১ সালে কলকাতায় বিদেশি দ্রব্য বয়কট করে প্রথম নারী হিসেবে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে সমগ্র ভারতের নারী সমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসু তাঁকে মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতেন।

সমাজ সংস্কারক, শিক্ষাবিদ ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব

[সম্পাদনা]
  • স্বামীজি: স্বামী বিবেকানন্দ। প্রেক্ষাপট: খেতড়ির মহারাজার পরামর্শে সন্ন্যাস গ্রহণের পর 'বিবেকানন্দ' নাম ধারণ এবং ১৮৯৩ সালে শিকাগো ধর্ম মহাসভায় বিশ্বজয়ের পর আপামর ভারতবাসীর কাছে তিনি কেবল 'স্বামীজি' নামেই পরম পূজ্য হয়ে ওঠেন।
  • বিদ্যাসাগর: ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রেক্ষাপট: ১৮৩৯ সালে সংস্কৃত কলেজে পাঠরত অবস্থায় তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে 'বিদ্যার সাগর' উপাধি প্রদান করে।
  • মহর্ষি: দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রেক্ষাপট: তাঁর গভীর ঈশ্বরভক্তি, ব্রাহ্মসমাজের নেতৃত্ব এবং ঋষিতুল্য পবিত্র জীবনযাপনের কারণে ব্রাহ্ম সমাজ ও সমকালীন বিদ্বজ্জনরা তাঁকে 'মহা-ঋষি' বা 'মহর্ষি' অভিধায় ভূষিত করেন।
  • ভারত পথিক: রাজা রামমোহন রায়। প্রেক্ষাপট: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে এই অভিধা দিয়েছিলেন, কারণ রামমোহনই প্রথম ভারতের সমাজকে মধ্যযুগীয় কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে আধুনিকতার পথে নিয়ে যাওয়ার পথপ্রদর্শক ছিলেন।
  • রাজা: রামমোহন রায়। প্রেক্ষাপট: ১৮৩০ সালে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর তাঁর ভাতা বৃদ্ধির আইনি সুপারিশ নিয়ে রামমোহনকে ইংল্যান্ডে পাঠানোর সময় আনুষ্ঠানিক ও রাজকীয় সম্মানসূচক 'রাজা' উপাধি প্রদান করেন।
  • পরমহংস (ঠাকুর/ শ্রীশ্রীঠাকুর): শ্রীরামকৃষ্ণ। প্রেক্ষাপট: হিন্দু আধ্যাত্মিকতায় 'পরমহংস' হল সন্ন্যাসীদের সর্বোচ্চ স্তর, যিনি জলের (মায়া) মধ্য থেকে দুধটুকু (ব্রহ্ম) ছেঁকে নিতে পারেন। তাঁর পরমসমাধি ও ঈশ্বরানুভূতির জন্য ভক্তরা তাঁকে এই নামে ডাকেন।
  • শ্রীমা: সারদা দেবী। প্রেক্ষাপট: শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের পত্নী এবং রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সংঘজননী হিসেবে অগণিত ভক্তের কাছে তিনি সাক্ষাৎ মাতৃরূপিনী বা 'শ্রীমা' হিসেবে পূজিতা।
  • আচার্য: জগদীশচন্দ্র বসু এবং প্রফুল্লচন্দ্র রায়। প্রেক্ষাপট: আধুনিক ভারতীয় বিজ্ঞান ও রসায়নের জনক হিসেবে কেবল গবেষণাই নয়, বরং অসংখ্য বিজ্ঞানী ছাত্র তৈরি করার মহান শিক্ষাগুরু হিসেবে তাঁরা এই অভিধা পান।
  • লোকমাতা: ভগিনী নিবেদিতা। প্রেক্ষাপট: প্লেগ মহামারীর সময় কলকাতার রাস্তায় নেমে নিজের হাতে রোগীদের সেবা করা এবং ভারতীয়দের প্রতি তাঁর মাতৃস্নেহের কারণে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে 'লোকমাতা' আখ্যা দেন।
  • ভগিনী (Sister): মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল। প্রেক্ষাপট: স্বামী বিবেকানন্দ তাঁকে ব্রহ্মচর্য দীক্ষা দেওয়ার পর নাম রাখেন 'নিবেদিতা' (যিনি নিবেদিত) এবং ভারতবাসীর সেবায় তাঁকে 'ভগিনী' বা বোন হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।
  • বাবা সাহেব: ড. বি. আর. আম্বেদকর। প্রেক্ষাপট: দলিত ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণির অধিকার রক্ষা এবং ভারতীয় সংবিধান রচনায় তাঁর পিতৃসুলভ ভূমিকার জন্য তাঁর অনুগামীরা গভীর শ্রদ্ধায় তাঁকে এই নামে ডাকেন।
  • মহামনা: মদনমোহন মালব্য। প্রেক্ষাপট: বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং তাঁর বিপুল পাণ্ডিত্য ও বিশাল হৃদয়ের (মহা মন) কারণে রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজি তাঁকে এই অভিধায় ভূষিত করেন।
  • মহাপ্রভু: শ্রীচৈতন্যদেব। প্রেক্ষাপট: ষোড়শ শতাব্দীতে বাংলায় বৈষ্ণব ধর্মের নবজাগরণ এবং প্রেমভক্তির সর্বোচ্চ প্রকাশের কারণে অনুগামীরা তাঁকে সাধারণ প্রভুর ঊর্ধ্বে 'মহাপ্রভু' অভিধা দেন।
  • দয়ার সাগর / করুণাসিন্ধু: ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (বিদ্যাসাগর)। প্রেক্ষাপট: কেবল অগাধ পাণ্ডিত্যই নয়, আর্ত ও দরিদ্র মানুষের প্রতি তাঁর অসীম বদান্যতা এবং মাতৃভক্তির কারণে বাংলার মানুষ তাঁকে এই নামে ডাকত।
  • ব্রহ্মানন্দ: কেশবচন্দ্র সেন। প্রেক্ষাপট: মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে এই উপাধি দেন। ব্রাহ্মসমাজের প্রসারে তাঁর অগাধ বাগ্মিতা এবং ঈশ্বরের (ব্রহ্ম) প্রতি তীব্র অনুরাগের জন্য এই আখ্যা দেওয়া হয়।
  • ঋষি / জাতীয়তাবাদের পিতামহ: রাজনারায়ণ বসু। প্রেক্ষাপট: ব্রাহ্ম সমাজের এই প্রবীণ নেতা বাংলার হিন্দু সমাজ ও সংস্কৃতির গৌরব পুনরুদ্ধারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। তাঁর পবিত্র জীবনযাপন ও দূরদর্শিতার জন্য তাঁকে 'ঋষি' বলা হত।
  • মহাত্মা (Mahatma): জ্যোতিরাও ফুলে (জ্যোতিবা ফুলে)। প্রেক্ষাপট: মহারাষ্ট্রে দলিত, শোষিত শ্রেণি এবং নারীদের শিক্ষার অধিকার আদায়ে তাঁর আজীবন অসামান্য সংগ্রামের জন্য ১৮৮৮ সালে জনতা তাঁকে 'মহান আত্মা' বা মহাত্মা উপাধি দেয়।
  • পেরিয়ার (Periyar): ই. ভি. রামাসামি। প্রেক্ষাপট: তামিল ভাষায় 'পেরিয়ার' অর্থ সম্মানীয় বা মহান ব্যক্তি। দক্ষিণ ভারতে আত্মমর্যাদা আন্দোলন (Self-Respect Movement) এবং জাতপাত বিরোধী কঠোর সংগ্রামের জন্য তিনি এই অভিধা পান।
  • স্যার (Sir): সৈয়দ আহমদ খান। প্রেক্ষাপট: ভারতীয় মুসলিম সমাজে আধুনিক ইংরেজি শিক্ষা ও বিজ্ঞান প্রসারে (আলিগড় আন্দোলন) তাঁর যুগান্তকারী অবদানের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে এই সম্মানসূচক নাইটহুড প্রদান করে।
  • লোকহিতবাদী: গোপাল হরি দেশমুখ। প্রেক্ষাপট: মহারাষ্ট্রের এই সমাজ সংস্কারক 'প্রভাকর' পত্রিকায় জাতপাত ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে 'লোকহিতবাদী' ছদ্মনামে লিখতেন, যা পরে তাঁর স্থায়ী অভিধায় পরিণত হয়।
  • কাঙাল / চারণ সাংবাদিক: হরিনাথ মজুমদার (কাঙাল হরিনাথ)। প্রেক্ষাপট: 'গ্রামবার্তা প্রকাশিকা' পত্রিকা সম্পাদনা এবং বাউল গানের মাধ্যমে গ্রামীণ জমিদার ও নীলকর সাহেবদের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য তিনি 'কাঙাল' উপাধি গ্রহণ করেন।
  • প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণব: নগেন্দ্রনাথ বসু। প্রেক্ষাপট: ২২ খণ্ডে বাংলার প্রথম 'বিশ্বকোষ' প্রণয়ন এবং প্রাচ্যের ইতিহাস, শিলালিপি ও সাহিত্য নিয়ে তাঁর মহাসমুদ্রের ন্যায় বিশাল গবেষণার জন্য পণ্ডিত সমাজ তাঁকে এই উপাধি দেয়।
  • ক্রান্তিজ্যোতি: সাবিত্রীবাই ফুলে। প্রেক্ষাপট: ভারতের প্রথম মহিলা শিক্ষক এবং নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর বৈপ্লবিক (ক্রান্তিকারী) অবদানের জন্য তাঁকে নারী জাগরণের জ্যোতি হিসেবে এই উপাধি দেওয়া হয়।
  • মা আনন্দময়ী / আনন্দময়ী মা: নির্মলা সুন্দরী দেবী। প্রেক্ষাপট: বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিন্দু আধ্যাত্মিক সাধিকা। তাঁর সদাহাস্যময়, আনন্দঘন মাতৃরূপ এবং গভীর আধ্যাত্মিক দর্শনের জন্য ভক্তরা তাঁকে এই নামে ডাকতেন।
  • পণ্ডিতা: রমাবাই (Pandita Ramabai)। প্রেক্ষাপট: সংস্কৃত শাস্ত্রে তাঁর অগাধ জ্ঞানের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে 'পণ্ডিতা' এবং 'সরস্বতী' উপাধি প্রদান করে। তিনি ছিলেন ভারতের নারী শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের অন্যতম পথিকৃৎ।
  • তাপসী / গৌরী মা: মৃণালিনী চট্টোপাধ্যায়। প্রেক্ষাপট: শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের অন্যতম প্রধান নারী শিষ্যা এবং সারদেশ্বরী আশ্রমের প্রতিষ্ঠাত্রী। তাঁর কঠোর তপস্বিনী জীবনের জন্য তাঁকে এই আখ্যা দেওয়া হয়।
  • কৃষ্ণদাসী মীরাবাঈ / সন্ত মীরা: মীরাবাঈ। প্রেক্ষাপট: ষোড়শ শতকের রাজস্থানের এই রাজকন্যা কৃষ্ণের প্রতি তাঁর নিঃশর্ত ভক্তি এবং রাজকীয় আড়ম্বর ত্যাগের জন্য ভারতীয় ভক্তি আন্দোলনে চিরন্তন সন্ত বা সাধিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
  • মাতা অমৃতানন্দময়ী (আম্মা): মাতা অমৃতানন্দময়ী দেবী। প্রেক্ষাপট: কেরালার এই বর্তমান আধ্যাত্মিক নেত্রী তাঁর অনুগামীদের বুকে জড়িয়ে ধরে (Hug) যে নিঃশর্ত মাতৃত্ব ও সান্ত্বনা প্রদান করেন, তার জন্য বিশ্বজুড়ে তিনি 'আম্মা' বা 'হাগিং সেন্ট' নামে পরিচিত।
  • জগৎগুরু: আদি শঙ্করাচার্য। প্রেক্ষাপট: অষ্টম শতাব্দীতে অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের প্রচার এবং সমগ্র ভারতবর্ষ পায়ে হেঁটে পরিভ্রমণ করে চার প্রান্তে চারটি মঠ স্থাপনের মাধ্যমে হিন্দু ধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য তাঁকে জগতের গুরু বলা হয়।
  • বাবা / লোকনাথ ব্রহ্মচারী: রামনারায়ণ ঘোষ (বাবা লোকনাথ)। প্রেক্ষাপট: হিমালয়ে সুদীর্ঘ তপস্যা এবং বারদীতে আশ্রম স্থাপনের পর তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা ও ভক্তদের প্রতি পিতৃসুলভ অভয়বাণীর ("রণে বনে জলে জঙ্গলে...") কারণে তিনি 'বাবা' হিসেবে পূজিত।
  • যুগাচার্য: স্বামী প্রণবানন্দ। প্রেক্ষাপট: 'ভারত সেবাশ্রম সংঘ'-এর প্রতিষ্ঠাতা। হিন্দু সমাজের সংস্কার, সেবাধর্মের প্রচার এবং আধুনিক যুগে নিষ্কাম কর্মযোগের আদর্শ স্থাপনের জন্য তাঁকে এই যুগের আচার্য বলা হয়।
  • শ্রীল প্রভুপাদ: অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী। প্রেক্ষাপট: আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) প্রতিষ্ঠা করে পাশ্চাত্যে ও বিশ্বজুড়ে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম ও ভগবদগীতা প্রচারের জন্য বৈষ্ণব সমাজ তাঁকে 'প্রভুপাদ' উপাধি দেয়।
  • শ্রীনারায়ণ গুরু: নারায়ণ গুরু। প্রেক্ষাপট: কেরালার এই আধ্যাত্মিক নেতা ও সমাজ সংস্কারক "এক জাতি, এক ধর্ম, এক ঈশ্বর" বাণীর প্রবর্তন করে অবহেলিত ইঝাভা সম্প্রদায়ের মন্দিরে প্রবেশের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
  • যোগীরাজ: শ্যামাচরণ লাহিড়ী (লাহিড়ী মহাশয়)। প্রেক্ষাপট: সম্পূর্ণ গৃহস্থ জীবনে থেকেও মহাবতার বাবাজির কাছ থেকে প্রাপ্ত 'ক্রিয়াযোগ' সাধনার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর জন্য তাঁকে যোগীদের রাজা বলা হয়।
  • পরমহংস যোগানন্দ: মুকুন্দলাল ঘোষ। প্রেক্ষাপট: বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ 'অটোবায়োগ্রাফি অফ আ যোগী'-এর রচয়িতা, যিনি প্রথম পাশ্চাত্যে (আমেরিকায়) হিন্দু আধ্যাত্মিকতা ও ক্রিয়াযোগের স্থায়ী বিস্তার ঘটিয়েছিলেন।
  • মহর্ষি: রমণ মহর্ষি। প্রেক্ষাপট: তামিলনাড়ুর অরুণাচল পাহাড়ে জীবন কাটানো এই মহান সাধকের "আমি কে?" (Who am I?) নামক আত্মানুসন্ধানমূলক অদ্বৈত দর্শনের জন্য তাঁকে মহর্ষি উপাধি দেওয়া হয়।
  • স্বামী / দয়ানন্দ সরস্বতী: মূলশঙ্কর তিওয়ারি। প্রেক্ষাপট: 'আর্য সমাজ' প্রতিষ্ঠা এবং "বেদে ফিরে যাও" ডাকের মাধ্যমে হিন্দু সমাজে প্রচলিত পৌত্তলিকতা ও কুসংস্কার দূর করার আজীবন প্রচেষ্টার জন্য।
  • সাইঁ বাবা: শিরডির সাইঁ বাবা। প্রেক্ষাপট: ঊনবিংশ শতাব্দীর এই অতীন্দ্রিয় সাধক হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই পরম পূজ্য ছিলেন। 'সাইঁ' শব্দটি ফার্সি শব্দ, যার অর্থ পবিত্র ব্যক্তি বা সাধু।
  • দয়াল / সন্ত দাদূ: দাদূ দয়াল। প্রেক্ষাপট: গুজরাট ও রাজস্থানের এই সন্ত ছিলেন কবিরের ভাবশিষ্য। ঈশ্বর ও মানুষের প্রতি তাঁর অসীম দয়ার কারণে অনুগামীরা তাঁর নামের শেষে 'দয়াল' যুক্ত করে দেন।
  • সন্ত কবির / কবির দাস: কবির। প্রেক্ষাপট: পঞ্চদশ শতাব্দীর এই মহান ভক্তি সাধক হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক ছিলেন। 'কবির' একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ 'মহান' এবং দাস অর্থ ঈশ্বরের ভৃত্য।
  • গুরু নানক / নানক দেব: শিখ ধর্মের প্রবর্তক। প্রেক্ষাপট: পঞ্চদশ শতাব্দীতে ভক্তি আন্দোলনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রচারক এবং শিখ ধর্মের প্রথম গুরু হিসেবে তিনি শিখ সম্প্রদায়ের পরম পূজ্য।
  • গোস্বামী / সন্ত তুলসীদাস: তুলসীদাস। প্রেক্ষাপট: মহাকাব্য রামায়ণের আওয়াধি ভাষার রূপ 'রামচরিতমানস'-এর রচয়িতা হিসেবে তাঁকে গোস্বামী (যিনি নিজের ইন্দ্রিয় বা গরুর অধিপতি) উপাধি দেওয়া হয়।
  • বামাক্ষ্যাপা: বামা চরণ চট্টোপাধ্যায়। প্রেক্ষাপট: তারাপীঠের প্রখ্যাত শাক্ত সাধক। পার্থিব জ্ঞানশূন্য হয়ে মা তারার প্রতি তাঁর উন্মাদের ন্যায় ভক্তি এবং অদ্ভুত আচরণের কারণে তাঁকে 'খ্যাপা' বা পাগল সাধক বলা হত।

ঐতিহাসিক ও রাজকীয় ব্যক্তিত্ব

[সম্পাদনা]

১৮শ শতক এবং তার পূর্ববর্তী (প্রাচীন ও মধ্যযুগীয়) অবিভক্ত বাংলা এবং ভারতের ইতিহাস অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। এই সময়ে পণ্ডিত, সম্রাট, সুফি সন্ত এবং শিল্পীদের এমন সব অভিধা বা উপাধি দেওয়া হত, যা তাঁদের কর্ম, পাণ্ডিত্য এবং বীরত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

  • গৌড়েশ্বর: রাজা শশাঙ্ক (এবং পরবর্তীতে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ)। প্রেক্ষাপট: 'গৌড়ের ঈশ্বর' বা প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলার সার্বভৌম অধিপতি। রাজা শশাঙ্ক প্রথম বাংলার স্বাধীন শাসক হিসেবে এই অভিধা ধারণ করেন।
  • বাংলার আকবর: আলাউদ্দিন হোসেন শাহ। প্রেক্ষাপট: মুঘল সম্রাট আকবরের মতো তাঁর রাজত্বকালেও (১৪৯৪-১৫১৯) বাংলায় হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি, বাংলা সাহিত্যের ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য ঐতিহাসিকরা তাঁকে এই নামে ডাকেন।
  • জিন্দা পীর: সম্রাট ঔরঙ্গজেব। প্রেক্ষাপট: মুঘল সম্রাট হয়েও রাজকোষের অর্থ নিজের জন্য ব্যয় না করে টুপি সেলাই করে এবং কোরআন নকল করে অত্যন্ত অনাড়ম্বর জীবনযাপন করার জন্য তৎকালীন কট্টরপন্থীরা তাঁকে 'জীবন্ত সাধু' বা জিন্দা পীর বলত।
  • ছত্রপতি: শিবাজী মহারাজ। প্রেক্ষাপট: ১৬৭৪ সালে রায়গড়ে তাঁর রাজ্যাভিষেকের সময় তিনি সার্বভৌমের প্রতীক হিসেবে এই হিন্দু রাজকীয় উপাধি ধারণ করেন (যাঁর মাথার ওপর সার্বভৌম রাজছত্র থাকে এবং যিনি কারোর অধীন নন)।
  • দেবনামপিয় পিয়দসী (দেবানাংপ্রিয় প্রিয়দর্শী): সম্রাট অশোক। প্রেক্ষাপট: তাঁর শিলালিপিগুলোতে তিনি নিজেকে এই নামে উল্লেখ করেছেন, যার অর্থ 'দেবতাদের প্রিয়' এবং 'যিনি সকলের প্রতি স্নেহের দৃষ্টিতে তাকান'।
  • কাশ্মীরের আকবর: সুলতান জয়নুল আবেদিন। প্রেক্ষাপট: পঞ্চদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরে তাঁর দীর্ঘ ও শান্তিপূর্ণ রাজত্ব, হিন্দুদের উপর থেকে জিজিয়া কর প্রত্যাহার এবং সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতার জন্য তিনি এই নামে পরিচিত।
  • বিক্রমাদিত্য: দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (এবং সম্রাট হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য)। প্রেক্ষাপট: প্রাচীন ভারতের কিংবদন্তি রাজা বিক্রমাদিত্যের (পরাক্রমের সূর্য) ন্যায় বিচক্ষণতা, শৌর্য ও পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য ঐতিহাসিক হিন্দু রাজারা নিজেদের মহিমা বোঝাতে এই উপাধি ধারণ করতেন।

মধ্যযুগের বাংলার পণ্ডিত, শাস্ত্রজ্ঞ ও সাহিত্যিক

  • আগমবাগীশ: কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ (ষোড়শ শতক)। প্রেক্ষাপট: 'আগম' বা তন্ত্রশাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্যের কারণে শ্রীচৈতন্যের সমসাময়িক এই মহান সাধককে 'আগমবাগীশ' (আগম শাস্ত্রের বাক্পতি) উপাধি দেওয়া হয়। তিনিই বাংলায় প্রথম 'কালীপূজা' (দক্ষিণা কালী মূর্তি) প্রবর্তন করেন এবং তন্ত্রশাস্ত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বকোষ 'তন্ত্রসার' রচনা করেন।
  • স্মার্ত ভট্টাচার্য: রঘুনন্দন ভট্টাচার্য (ষোড়শ শতক)। প্রেক্ষাপট: নবদ্বীপের এই পণ্ডিত হিন্দু 'স্মৃতি' শাস্ত্রের (হিন্দু আইন ও আচার) ওপর 'অষ্টবিংশতিতত্ত্ব' নামক বিশাল গ্রন্থ রচনা করেন। হিন্দু সমাজ সংস্কার এবং বিধিনিষেধ প্রণয়নে তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্য তাঁকে এই উপাধি দেওয়া হয়।
  • নব্যন্যায় প্রণেতা / ন্যায়ালংকার: রঘুনাথ শিরোমণি। প্রেক্ষাপট: প্রাচীন ন্যায়শাস্ত্রকে খণ্ডন করে মিথিলায় গিয়ে ভারতীয় দর্শনের পণ্ডিতদের তর্কে পরাজিত করেন এবং নবদ্বীপে 'নব্যন্যায়' (New Logic) প্রতিষ্ঠা করেন, তাই তিনি ন্যায়ের অলংকার বা শিরোমণি হিসেবে পরিচিত।
  • সার্বভৌম: বাসুদেব সার্বভৌম। প্রেক্ষাপট: পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে উড়িষ্যা ও বাংলার শ্রেষ্ঠ বেদান্ত পণ্ডিত এবং শ্রীচৈতন্যের শিক্ষাগুরু। নিখিল ভারতের শাস্ত্রজ্ঞদের মধ্যে তিনি 'সর্বভূমের অধিপতি' বা জ্ঞানরাজ্যের সম্রাট হিসেবে এই উপাধি পেয়েছিলেন।
  • সিদ্ধাচার্য: লুইপা, কাহ্নপা, ভুসুকুপা (অষ্টম-দ্বাদশ শতক)। প্রেক্ষাপট: বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন 'চর্যাপদ'-এর রচয়িতা বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের আধ্যাত্মিক সিদ্ধি লাভের কারণে এই অভিধা দেওয়া হয়েছিল।
  • ত্রিপিটকাচার্য: অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (একাদশ শতক)। প্রেক্ষাপট: বিক্রমশীল বিহারের অধ্যক্ষ এবং বাংলার শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ পণ্ডিত। বৌদ্ধ ধর্মের মূল গ্রন্থ 'ত্রিপিটক'-এ তাঁর অগাধ জ্ঞান এবং তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্ম সংস্কারের জন্য তাঁকে এই উপাধি দেওয়া হয়।
  • কবীন্দ্র: পরমেশ্বর দাস (কবীন্দ্র পরমেশ্বর)। প্রেক্ষাপট: বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের সেনাপতি পরাগল খানের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি বাংলায় প্রথম 'মহাভারত' অনুবাদ করেন। কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ (ইন্দ্র) হওয়ায় তিনি এই উপাধি পান।
  • কবিরাজ: কৃষ্ণদাস কবিরাজ (ষোড়শ শতক)। প্রেক্ষাপট: শ্রীচৈতন্যদেবের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং প্রামাণ্য জীবনীগ্রন্থ 'শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত' রচনার জন্য বৃন্দাবনের বৈষ্ণব সমাজ তাঁকে কবিদের রাজা বা 'কবিরাজ' অভিধায় ভূষিত করে।
  • মহাজন: বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস এবং বৈষ্ণব পদকর্তাগণ। প্রেক্ষাপট: বৈষ্ণব পদাবলীতে রাধা-কৃষ্ণের ঐশ্বরিক প্রেমের গান যাঁরা রচনা করেছেন, বৈষ্ণব সমাজে তাঁদের সম্মানার্থে 'মহাজন' (মহান ব্যক্তি) বলা হয়।
  • কবিরঞ্জন: রামপ্রসাদ সেন (অষ্টাদশ শতক)। প্রেক্ষাপট: তাঁর রচিত শাক্ত পদাবলী এবং শ্যামাসংগীতের অসামান্য ভক্তিমূলক রঞ্জনে মুগ্ধ হয়ে নবদ্বীপের মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় তাঁকে এই রাজকীয় উপাধি প্রদান করেন।
  • মহাস্থবির: শীলভদ্র (সপ্তম শতক)। প্রেক্ষাপট: সমতটের (বর্তমান বাংলাদেশ) এই রাজপুত্র প্রাচীন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অধ্যক্ষ হয়েছিলেন। বৌদ্ধ দর্শনে তাঁর গভীর প্রজ্ঞার জন্য চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং তাঁকে মহাস্থবির (মহান প্রবীণ গুরু) বলতেন।
  • নবদ্বীপাধিপতি: মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় (অষ্টাদশ শতক)। প্রেক্ষাপট: নদীয়া বা নবদ্বীপ রাজবংশের শ্রেষ্ঠ রাজা, যিনি বাংলায় শাক্ত উৎসবের (জগদ্ধাত্রী পূজা) বিস্তার এবং ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের মতো পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন।

গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ

ষোড়শ শতাব্দীতে বাংলায় ভক্তি আন্দোলনের জোয়ারে শ্রীচৈতন্যদেব এবং তাঁর অনুগামীরা এমন এক আধ্যাত্মিক সাম্যবাদের জন্ম দিয়েছিলেন, যেখানে জাতিভেদ মুছে গিয়ে প্রত্যেকেই তাঁদের কর্ম ও ভক্তির জন্য বিশেষ অভিধায় পূজিত হয়েছিলেন।

  • মহাপ্রভু / গৌরাঙ্গ: শ্রীচৈতন্যদেব (নিমাই পণ্ডিত)। প্রেক্ষাপট: তাঁর সন্ন্যাস গ্রহণের পূর্ব নাম ছিল বিশ্বম্ভর বা নিমাই পণ্ডিত। সন্ন্যাসের পর তাঁর নাম হয় শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য। কিন্তু তাঁর ঐশ্বরিক প্রেম, ভক্তি এবং কাঁচা সোনার মতো উজ্জ্বল গৌরবর্ণের কারণে অনুগামীরা তাঁকে 'গৌরাঙ্গ' এবং সাধারণ প্রভুর ঊর্ধ্বে 'মহাপ্রভু' অভিধা দেন।
  • চিরবিরহিণী: বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী, শ্রীচৈতন্যদেবের স্ত্রী। প্রেক্ষাপট: মহাপ্রভুর সন্ন্যাসের পর তাঁর সমগ্র জীবন কেটেছিল স্বামীর জন্য গভীর বিরহ ও অপেক্ষায়। বাংলা সাহিত্যে ও বৈষ্ণব পদাবলিতে তিনি চিরন্তন ত্যাগের প্রতীক বা 'চিরবিরহিণী বিষ্ণুপ্রিয়া' নামে সুপরিচিত।
  • অবধূত / নিতাই: নিত্যানন্দ প্রভু। প্রেক্ষাপট: শ্রীচৈতন্যদেবের প্রধান সহযোগী। আধ্যাত্মিক প্রেমের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে যিনি সমাজের সমস্ত জাতপাত ও নিয়মের ঊর্ধ্বে উঠেছিলেন, বৈষ্ণব সমাজে তাঁকে 'অবধূত' বলা হয়। বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে তিনি দয়াল 'নিতাই' নামেই সর্বাধিক পরিচিত।
  • অদ্বৈত আচার্য: কমলারাক্ষ ভট্টাচার্য। প্রেক্ষাপট: শান্তিপুরের এই প্রবীণ ও পরম পণ্ডিত বৈষ্ণব নেতা শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাবের জন্য হুংকার দিয়ে ঈশ্বরকে আহ্বান করেছিলেন বলে বৈষ্ণব সমাজ তাঁকে 'আচার্য' বা পরম গুরু হিসেবে মান্য করে।
  • নামাচার্য: হরিদাস ঠাকুর। প্রেক্ষাপট: জন্মসূত্রে মুসলিম হয়েও তিনি প্রতিদিন তিন লক্ষ বার হরিনাম জপ করতেন এবং চরম শারীরিক নির্যাতন সহ্য করেও ধর্মত্যাগ করেননি। তাঁর এই অসীম ভক্তির জন্য স্বয়ং শ্রীচৈতন্যদেব তাঁকে 'নামাচার্য' (নামগানের শ্রেষ্ঠ গুরু) উপাধি প্রদান করেন।
  • স্বরূপ / কণ্ঠহার: স্বরূপ দামোদর। প্রেক্ষাপট: পুরীতে শ্রীচৈতন্যদেবের সন্ন্যাস জীবনের ছায়াসঙ্গী এবং তাঁর অন্তরঙ্গ অনুরাগী। চৈতন্যদেবের মনের সমস্ত ভাব তিনি বুঝতে পারতেন বলে তাঁকে মহাপ্রভুর 'স্বরূপ' (alter-ego) বা গলার 'কণ্ঠহার' বলা হত।
  • ষড়গোস্বামী (The Six Goswamis): রূপ, সনাতন, রঘুনাথ ভট্ট, জীব, গোপাল ভট্ট, রঘুনাথ দাস। প্রেক্ষাপট: শ্রীচৈতন্যদেবের নির্দেশে বৃন্দাবনে গিয়ে লুপ্ত তীর্থ উদ্ধার এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের তাত্ত্বিক ভিত্তি ও শাস্ত্র (ভক্তিরসামৃতসিন্ধু ইত্যাদি) রচনার দায়িত্ব যাঁদের ওপর ন্যস্ত হয়েছিল, তাঁরাই ইতিহাসে একত্রে 'ষড়গোস্বামী' নামে পূজিত।
  • পঞ্চসখা: শ্রীচৈতন্যদেব যখন পুরীতে অবস্থান করছিলেন, তখন এই পাঁচজন মহান সাধক তাঁর অহিংসা, প্রেম ও নামকীর্তনের আদর্শে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন এবং উৎকলের (ওড়িশা) সাধারণ মানুষের মধ্যে তা প্রচার করেন। জগন্নাথ দাস, বলরাম দাস, অচ্যুতানন্দ দাস, অনন্ত দাস এবং সিদ্ধ যশোবন্ত।
  • ঠাকুর মহাশয়: নরোত্তম দাস ঠাকুর। প্রেক্ষাপট: সপ্তদশ শতকে 'খেতুরি মহোৎসব'-এর মাধ্যমে বৈষ্ণব সমাজে কীর্তন গানের নতুন ধারা প্রবর্তনের জন্য তিনি এই সম্মানীয় অভিধা লাভ করেন।
  • আচার্য ঠাকুর: শ্রীনিবাস আচার্য। প্রেক্ষাপট: বৃন্দাবন থেকে ষড়গোস্বামীদের রচিত বিপুল বৈষ্ণব সাহিত্য বাংলায় নিয়ে আসা এবং প্রচার করার গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য তাঁকে এই আখ্যা দেওয়া হয়।
  • দুঃখী কৃষ্ণদাস / শ্যামানন্দ প্রভু: শ্যামানন্দ। প্রেক্ষাপট: উড়িষ্যা এবং মেদিনীপুর অঞ্চলে বৈষ্ণব ধর্ম ও প্রেমের বাণী প্রচারের প্রধান কাণ্ডারী ছিলেন তিনি।
  • ঈশ্বরী / জাহ্নবী মাতা: জাহ্নবী দেবী। প্রেক্ষাপট: নিত্যানন্দ প্রভুর প্রথমা স্ত্রী। নিত্যানন্দ এবং শ্রীচৈতন্যদেবের তিরোধানের পর গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের নেতৃত্ব তাঁর হাতেই ন্যস্ত হয়। একজন নারী হয়েও সমগ্র বৈষ্ণব সমাজকে তিনি ঐক্যবদ্ধ রেখেছিলেন বলে তাঁকে পরম শ্রদ্ধায় 'ঈশ্বরী' বা 'মাতা' আখ্যা দেওয়া হয়।

বেদান্ত দর্শন, শংকরাচার্য এবং অন্যান্য সনাতন দার্শনিক

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতে হিন্দু দর্শনের (বিশেষত বেদান্ত) বিভিন্ন ধারা যাঁরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁদের অগাধ পাণ্ডিত্য ও ঈশ্বরানুভূতির কারণে তাঁরা তাঁদের মূল নামের চেয়ে দার্শনিক উপাধিতেই বেশি পরিচিত হন।

  • জগদ্গুরু / ভগবৎপাদ: আদি শংকরাচার্য। প্রেক্ষাপট: অষ্টম শতাব্দীতে অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের প্রচার, বৌদ্ধ ধর্মের তাত্ত্বিক খণ্ডন এবং সমগ্র ভারতবর্ষ পায়ে হেঁটে পরিভ্রমণ করে হিন্দু ধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য তাঁকে 'জগতের গুরু' এবং দেবতার পদচিহ্ন বা 'ভগবৎপাদ' বলা হয়।
  • প্রচ্ছন্ন বুদ্ধ (Hidden Buddha): আদি শংকরাচার্য। প্রেক্ষাপট: এটি মূলত তাঁর দার্শনিক বিরোধীদের দেওয়া একটি ঐতিহাসিক আখ্যা। শংকরাচার্যের 'মায়াবাদ' এবং অদ্বৈত বেদান্তের সাথে বৌদ্ধ ধর্মের 'শূন্যবাদ'-এর তাত্ত্বিক মিল থাকায় সমালোচকরা তাঁকে ছদ্মবেশী বুদ্ধ বা প্রচ্ছন্ন বুদ্ধ বলতেন।
  • পরমগুরু: গৌড়পাদ। প্রেক্ষাপট: তিনি ছিলেন আদি শংকরাচার্যের গুরু গোবিন্দ ভগবৎপাদের গুরু (অর্থাৎ শংকরাচার্যের পরমগুরু বা দাদাগুরু)। অদ্বৈত বেদান্তের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ 'মাণ্ডুক্য কারিকা' রচনার জন্য তিনি এই নামে পূজিত।
  • যতিরাজ / ভাষ্যকার: রামানুজাচার্য। প্রেক্ষাপট: একাদশ শতাব্দীর এই মহান দার্শনিক 'বিশিষ্টাদ্বৈত' বেদান্তের প্রবর্তক। সন্ন্যাসীদের রাজা হওয়ায় তাঁকে 'যতিরাজ' এবং ব্রহ্মসূত্রের ওপর তাঁর বিখ্যাত 'শ্রীভাষ্য' রচনার কারণে তাঁকে 'ভাষ্যকার' বলা হয়।
  • পূর্ণপ্রজ্ঞ / আনন্দতীর্থ: মধ্বাচার্য। প্রেক্ষাপট: ত্রয়োদশ শতাব্দীতে 'দ্বৈত' বেদান্ত দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর জ্ঞানের সম্পূর্ণতার জন্য তাঁকে 'পূর্ণপ্রজ্ঞ' এবং তাঁর আনন্দময় ঈশ্বরানুভূতির জন্য 'আনন্দতীর্থ' উপাধি দেওয়া হয়েছিল।
  • বল্লভ মহাপ্রভু / পুষ্টিমার্গ-প্রণেতা: বল্লভাচার্য। প্রেক্ষাপট: 'শুদ্ধাদ্বৈত' দর্শন এবং পুষ্টিমার্গের (ঈশ্বরের কৃপা বা পুষ্টির মাধ্যমে মোক্ষ লাভ) প্রবর্তক এই দার্শনিক গুজরাট ও রাজস্থানে স্বয়ং কৃষ্ণের অবতার বা 'মহাপ্রভু' হিসেবে পূজিত।
  • সুদর্শন-অবতার: নিম্বার্কাচার্য। প্রেক্ষাপট: 'দ্বৈতাদ্বৈত' দর্শনের প্রবর্তক। বৈষ্ণব সমাজে তাঁর পাণ্ডিত্য ও দার্শনিক তীক্ষ্ণতাকে বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের সাথে তুলনা করে তাঁকে সুদর্শন চক্রের অবতার বলা হয়।
  • বিদ্যাশংকর / বিদ্যারণ্য স্বামী: মাধবাচার্য (বিদ্যারণ্য)। প্রেক্ষাপট: চতুর্দশ শতাব্দীর এই অদ্বৈত বেদান্তী সাধক ও দার্শনিক বিজয়নগর সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হরিহর ও বুক্কার আধ্যাত্মিক এবং রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক ছিলেন। জ্ঞানের অরণ্য বা 'বিদ্যারণ্য' ছিল তাঁর উপাধি।
  • সর্বতন্ত্রস্বতন্ত্র: বাচস্পতি মিশ্র। প্রেক্ষাপট: নবম শতাব্দীর এই মিথিলার পণ্ডিত ছিলেন এক বিস্ময়কর প্রতিভা। তিনি হিন্দু দর্শনের প্রায় প্রতিটি শাখার (ন্যায়, সাংখ্য, যোগ, বেদান্ত) ওপর প্রামাণ্য ভাষ্য রচনা করেছিলেন। তাই তাঁকে 'সমস্ত শাস্ত্রে স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ' বা সর্বতন্ত্রস্বতন্ত্র আখ্যা দেওয়া হয়।
  • মহামহেশ্বর: অভিনবগুপ্ত। প্রেক্ষাপট: দশম শতাব্দীর কাশ্মীর শৈবদর্শন এবং ভারতীয় নন্দনতত্ত্বের (রসতত্ত্ব) এই প্রবাদপ্রতিম পণ্ডিতকে তাঁর জ্ঞান ও যোগসিদ্ধির জন্য 'মহান ঈশ্বর' বা মহামহেশ্বর অভিধা দেওয়া হয়েছিল।

প্রাচীন ভারতের শাসক ও সম্রাট

  • অমিত্রঘাত: সম্রাট বিন্দুসার (মৌর্য বংশ)। প্রেক্ষাপট: গ্রিক ঐতিহাসিকদের মতে, তাঁর সামরিক শৌর্য এতটা প্রবল ছিল যে তিনি শত্রুদের বিনাশকারী বা 'অমিত্রঘাত' উপাধি ধারণ করেছিলেন।
  • সকারী: দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (গুপ্ত বংশ)। প্রেক্ষাপট: প্রাচীন ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে রাজত্ব করা বিদেশি 'শক' (Sakas) রাজাদের সমূলে ধ্বংস করে বিক্রমাদিত্য এই উপাধি ধারণ করেন।
  • একরাট: মহাপদ্ম নন্দ (নন্দ বংশ)। প্রেক্ষাপট: প্রাচীন ভারতের প্রথম সাম্রাজ্য নির্মাতা, যিনি সমস্ত ক্ষত্রিয় রাজাদের পরাজিত করে সমগ্র উত্তর ভারতে একচ্ছত্র (একক) রাজত্ব কায়েম করেছিলেন।
  • শিলাদিত্য: সম্রাট হর্ষবর্ধন (সপ্তম শতক)। প্রেক্ষাপট: চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং তাঁকে এই নামে উল্লেখ করেছেন, যার অর্থ চরিত্রের দৃঢ়তায় যিনি শিলার মতো এবং তেজে যিনি সূর্যের (আদিত্য) মতো।
  • পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ: পাল ও সেন বংশীয় সম্রাটগণ (যেমন— ধর্মপাল, দেবপাল)। প্রেক্ষাপট: প্রাচীন বাংলায় সার্বভৌম শাসন এবং সাম্রাজ্যের বিস্তার বোঝাতে এই সুদীর্ঘ হিন্দু রাজকীয় উপাধি ব্যবহৃত হত (পরম পূজনীয় রাজাদের রাজা)।
  • পরম সৌগত: সম্রাট দেবপাল। প্রেক্ষাপট: বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি পাল রাজাদের অগাধ ভক্তি বোঝাতে এই উপাধি ব্যবহৃত হত ('সুগত' হলেন গৌতম বুদ্ধ, তাঁর পরম ভক্ত)।
  • অরিরাজ-মর্দন-শঙ্কর: রাজা লক্ষ্মণ সেন (দ্বাদশ শতক)। প্রেক্ষাপট: সেন বংশের রাজা লক্ষ্মণ সেন তাঁর সামরিক বিজয়ের অহংকারে এই উপাধি নেন, যার অর্থ 'যিনি শত্রু রাজাদের শিবের (শঙ্কর) মতো ধ্বংস করতে পারেন'।
  • ত্রিসমুদ্রতোয়পীতবাহন: গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী (সাতবাহন বংশ)। প্রেক্ষাপট: এই অদ্ভুত এবং কাব্যিক উপাধিটির অর্থ হল— 'যাঁর ঘোড়া বা বাহন তিনটি সমুদ্রের (আরব সাগর, বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর) জল পান করেছে'; অর্থাৎ সমগ্র দক্ষিণ ভারত তাঁর পদানত ছিল।

সুলতানি ও মুঘল যুগের রাজকীয় এবং প্রশাসনিক উপাধি

  • মসনদ-ই-আলা (Masnad-i-Ala): ঈশা খাঁ (ষোড়শ শতক)। প্রেক্ষাপট: মোঘল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলার স্বাধীন 'বারো ভূঁইয়া'-দের প্রধান হিসেবে তিনি এই উপাধি পান, যার অর্থ 'সর্বোচ্চ সিংহাসনের অধিকারী' বা 'উচ্চতর মর্যাদা সম্পন্ন'।
  • জগৎ শেঠ (Jagat Seth): ফতেহ চাঁদ (অষ্টাদশ শতক)। প্রেক্ষাপট: মুর্শিদাবাদের এই মাড়োয়ারি ব্যাংকার পরিবারের ধনসম্পদ এতই বিপুল ছিল যে, ১৭১৫ সালে মোঘল সম্রাট ফররুখশিয়ার তাঁকে 'জগতের ব্যাংকার' বা 'জগৎ শেঠ' উপাধি দেন।
  • আমীর-উল-উমারা (Amir-ul-Umara): শায়েস্তা খান। প্রেক্ষাপট: বাংলার এই বিখ্যাত সুবাদার এবং আওরঙ্গজেবের মামাকে মোঘল দরবারের সর্বোচ্চ অভিজাত বোঝাতে 'আমীরদের আমীর' উপাধি দেওয়া হয়েছিল।
  • রায় রায়াঁ (Ray Rayan): আলমচাঁদ এবং অন্যান্য হিন্দু দেওয়ান। প্রেক্ষাপট: মুর্শিদাবাদের নবাব মুর্শিদকুলি খান এবং সুজাউদ্দিনের আমলে রাজস্ব ও অর্থবিভাগের সর্বোচ্চ হিন্দু পদাধিকারীকে রাজকীয় সম্মান হিসেবে 'রাজাদের রাজা' বা রায় রায়াঁ বলা হত।
  • খান-ই-খানান (Khan-i-Khanan): বৈরাম খান এবং আবদুর রহিম। প্রেক্ষাপট: মোঘল সেনাবাহিনী এবং দরবারে সর্বোচ্চ সেনাপতি ও সম্মানিত ব্যক্তিকে এই তুর্কি উপাধি দেওয়া হত, যার অর্থ 'খানদের খান'।
  • সিকান্দার-ই-সানি (Sikandar-i-Sani): আলাউদ্দিন খলজি। প্রেক্ষাপট: নিজের সাম্রাজ্য বিস্তারের সামরিক ক্ষমতাকে গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের (সিকান্দার) সমতুল্য মনে করে তিনি মুদ্রায় নিজেকে 'দ্বিতীয় আলেকজান্ডার' হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
  • খলিফাতুল্লাহ (Khalifatullah): সম্রাট আকবর। প্রেক্ষাপট: ১৫৭৯ সালে 'মজহারনামা' জারির পর আকবর নিজেকে পৃথিবীতে 'আল্লাহর প্রতিনিধি' বা খলিফাতুল্লাহ হিসেবে ঘোষণা করে ধর্ম ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা নিজের হাতে নেন।
  • সুলতান-উস-সালাতীন: গিয়াসউদ্দীন ইওয়াজ খলজি। প্রেক্ষাপট: ত্রয়োদশ শতকে বাংলার এই স্বাধীন শাসক দিল্লির সুলতানের বশ্যতা অস্বীকার করে নিজেকে 'সুলতানদের সুলতান' বলে ঘোষণা করেন।
  • স্বর্গদেউ (Swargadeo): চুকাফা এবং অহম রাজাগণ। প্রেক্ষাপট: ত্রয়োদশ শতক থেকে আসাম শাসনকারী অহম রাজবংশের রাজারা নিজেদের স্বর্গের দেবতা বা ইন্দ্রের বংশধর মনে করতেন, তাই তাঁদের উপাধি ছিল স্বর্গদেউ।

মধ্যযুগের সুফি সন্ত ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব

  • গরীব নেওয়াজ (Gharib Nawaz): খাজা মইনুদ্দীন চিশতী। প্রেক্ষাপট: দ্বাদশ শতকে আজমিরে আগত এই মহান সুফি সন্তের আস্তানায় গরিব এবং অসহায় মানুষেরা আশ্রয় পেত। তাই তাঁকে 'গরিবের প্রতি অনুগ্রহকারী' বলা হয়।
  • মাহবুবে ইলাহী (Mehboob-e-Ilahi): হজরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া। প্রেক্ষাপট: দিল্লির এই শ্রেষ্ঠ সুফি সাধকের ঈশ্বরের প্রতি প্রেম এবং মানুষের প্রতি তাঁর অসীম ভালোবাসার কারণে অনুগামীরা তাঁকে 'আল্লাহর প্রেমাষ্পদ' আখ্যা দিয়েছিলেন।
  • চিরাগ-ই-দিল্লী (Chirag-e-Dilli): নাসিরুদ্দীন মাহমুদ। প্রেক্ষাপট: তিনি ছিলেন নিজামুদ্দীন আউলিয়ার আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারী। দিল্লির আধ্যাত্মিক অন্ধকারে তিনি ছিলেন আলোর পথপ্রদর্শক, তাই তাঁকে 'দিল্লির প্রদীপ' বলা হয়।
  • কুতুব-উল-আকতাব (Qutb-ul-Aqtab): কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকী। প্রেক্ষাপট: সুফি দর্শনে 'কুতুব' হল আধ্যাত্মিক জগতের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁকে সুফি সন্তদের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরের কুতুব বা 'কুতুবদের কুতুব' বলা হত।
  • মুজাররিদ (Mujarrid): হজরত শাহ জালাল (সিলেট)। প্রেক্ষাপট: চতুর্দশ শতকে সিলেটে ইসলাম প্রচারকারী এই মহান সন্ত আজীবন চিরকুমার ছিলেন এবং জাগতিক মোহ ত্যাগ করেছিলেন, তাই তাঁকে মুজাররিদ (সংসারত্যাগী বা কুমার) বলা হয়।
  • মুজাদ্দিদ-ই-আলফে-সানি: শেখ আহমদ সিরহিন্দি। প্রেক্ষাপট: মোঘল সম্রাট আকবরের 'দীন-ই-ইলাহি'-র বিরোধিতা করে ইসলাম ধর্মে সংস্কার আনার জন্য তাঁকে 'দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক' উপাধি দেওয়া হয়েছিল।

মুঘল ও সুলতানি যুগের শিল্পী ও সাহিত্যিক

  • তুতী-ই-হিন্দ (Tuti-e-Hind): আমির খসরু। প্রেক্ষাপট: চতুর্দশ শতকের এই কবি, সুরকার ও পণ্ডিতের ফার্সি এবং হিন্দি কবিতায় সুরের জাদু এতটাই মোহনীয় ছিল যে, তাঁকে 'ভারতের তোতাপাখি' বলা হত।
  • শিরিন কলম (Shirin Qalam): খাজা আবদুস সামাদ। প্রেক্ষাপট: সম্রাট হুমায়ুন এবং আকবরের দরবারের এই শ্রেষ্ঠ ক্যালিগ্রাফার বা লিপিকরের হস্তাক্ষর এতটাই সুন্দর ছিল যে, আকবর তাঁকে 'মিষ্টি কলমের অধিকারী' উপাধি দেন।
  • নাদির-উল-আসর (Nadir-ul-Asr): ওস্তাদ মনসুর। প্রেক্ষাপট: সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজসভার শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী, যিনি পশুপাখি ও প্রকৃতির নিখুঁত ছবি আঁকতে পারতেন। তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে জাহাঙ্গীর তাঁকে 'যুগের বিস্ময়' আখ্যা দেন।
  • নাদির-উজ-জামান (Nadir-uz-Zaman): আবুল হাসান। প্রেক্ষাপট: জাহাঙ্গীরের রাজসভার অপর এক বিখ্যাত পোর্ট্রেট (প্রতিকৃতি) চিত্রশিল্পীকে তাঁর অসামান্য কাজের জন্য 'সময়ের বিস্ময়' উপাধি দেওয়া হয়েছিল।
  • জরী কলম (Zarin Qalam): মুহম্মদ হোসেন আল-কাশ্মিরী। প্রেক্ষাপট: সম্রাট আকবরের রাজসভার শ্রেষ্ঠ ক্যালিগ্রাফার, যাঁর হাতের লেখা ছিল সোনার মতো উজ্জ্বল এবং নিখুঁত, তাই তাঁকে 'সোনার কলম' উপাধি দেওয়া হয়েছিল।

ধর্মীয় অভিধা

[সম্পাদনা]

হিন্দুধর্মে প্রচলিত অভিধা

[সম্পাদনা]

সর্বোচ্চ ধর্মীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও বেদান্তিক উপাধি

অষ্টম শতাব্দীতে আদি শংকরাচার্য এবং তৎপরবর্তী ধর্মগুরুদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মঠ ও আখড়াগুলোর সর্বোচ্চ পদাধিকারীদের উপাধি:

  • শংকরাচার্য: হিন্দুধর্মের (বিশেষত অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনের) সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক এবং আধ্যাত্মিক পদমর্যাদা। ভারতের চারটি প্রধান মঠের (পুরী, দ্বারকা, বদ্রীনাথ, শৃঙ্গেরি) প্রধানদের এই উপাধি দেওয়া হয়। সম্বোধনের রীতি: "অনন্তশ্রীবিভূষিত জগদ্গুরু শংকরাচার্য" (যিনি অনন্ত শ্রী বা ঐশ্বরিক সম্পদে বিভূষিত এবং জগতের গুরু)।
  • পীঠাধীশ্বর: কোনো শক্তিপীঠ বা প্রধান ধর্মীয় আসনের (পীঠ) সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক বা প্রধান ধর্মগুরু (যেমন— কামাখ্যা বা বিন্ধ্যবাসিনী পীঠের প্রধান)।
  • মহামণ্ডলেশ্বর: দশানামী সম্প্রদায় এবং নাগা সাধুদের আখড়াগুলোর (যেমন— জুনা আখড়া, নিরঞ্জনী আখড়া) সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বা মঠাধ্যক্ষ।
  • মণ্ডলেশ্বর: মহামণ্ডলেশ্বরের ঠিক নিচের পদের আখড়া-প্রধান বা বিশাল এলাকার (মণ্ডল) ধর্মীয় পরিচালক।

মঠ, মন্দির ও দেবালয়ের পদাধিকারী

বিখ্যাত তীর্থস্থান এবং দেবোত্তর সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ ও পূজার সাথে যুক্ত আইনি ও ঐতিহ্যবাহী পদবি:

  • মোহন্ত / মোহন্ত মহারাজ: তারকেশ্বর, বক্রেশ্বর বা প্রাচীন শৈব ও বৈষ্ণব মঠের প্রধান। আধুনিক যুগে এঁরা বিশাল দেবোত্তর সম্পত্তির আইনি রক্ষক ও প্রশাসক।
  • মঠাধ্যক্ষ: নির্দিষ্ট কোনো মঠের প্রশাসনিক ও আধ্যাত্মিক প্রধান (যেমন— বেলুড় মঠের মঠাধ্যক্ষ)।
  • সেবায়েত: আধুনিক আইনে সেবায়েত হলেন কোনো দেবদেবীর (Deity) সম্পত্তির ট্রাস্টি বা মানব-প্রতিনিধি। কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর বা তারাপীঠের মতো মন্দিরে বংশানুক্রমিক পূজারীরা এই অধিকার পান।
  • পাণ্ডা / তীর্থগুরু: পুরী, বারাণসী বা কালীঘাটে যে পুরোহিতরা নির্দিষ্ট তীর্থযাত্রীদের পূজা ও থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। ঐতিহাসিকভাবে এটি তীর্থগুরুর সম্মানজনক উপাধি।
  • প্রধান পূজারী / বড়ঠাকুর: বড় মন্দিরগুলোতে যিনি মূল বিগ্রহের দৈনন্দিন পূজা সম্পন্ন করেন।
  • ভাণ্ডারী / কোঠারী: বৃহৎ মঠ বা মন্দিরের (বিশেষত বৈষ্ণব ও স্বামীনারায়ণ সম্প্রদায়ে) কোষাধ্যক্ষ বা ভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রক সন্ন্যাসী।
  • অধিকারী: গ্রামীণ বাংলায় বা বৈষ্ণব সমাজে মন্দিরের সার্বিক তত্ত্বাবধায়ক।

বৈদিক যজমানি ও শাস্ত্রীয় পৌরোহিত্যের উপাধি

প্রাচীন বৈদিক যজ্ঞ (যেমন— অশ্বমেধ, রাজসূয় বা বৃহৎ দুর্গাপূজা) সম্পাদনের জন্য চার বেদের ওপর ভিত্তি করে পুরোহিতদের সুনির্দিষ্ট পদবি:

  • আচার্য: বৈদিক অনুষ্ঠান বা বৃহৎ পূজার (যেমন— দুর্গাপূজা বা অন্নপ্রাশন) প্রধান পুরোহিত, যিনি সমগ্র যজ্ঞ পরিচালনা করেন।
  • তন্ত্রধারক: বৃহৎ পূজায় মূল পুরোহিত বা আচার্যকে যিনি শাস্ত্র, পদ্ধতি এবং মন্ত্র পাঠে সাহায্য করেন (Prompter)।
  • হোতা / হোতৃ: ঋগ্বেদের মন্ত্র পাঠ করে যিনি যজ্ঞের আগুনে দেবতাদের আহ্বান করেন।
  • উদ্গাতা: সামবেদের মন্ত্রগুলোকে যিনি নির্দিষ্ট সুরে গান বা উদ্গীথ করেন।
  • অধ্বর্যু: যজুর্বেদের মন্ত্র পাঠ করে যিনি যজ্ঞের মূল ক্রিয়াকাণ্ড (আহুতি প্রদান) নিজ হাতে সম্পন্ন করেন।
  • ব্রহ্মা: যজ্ঞের সর্বোচ্চ পরিদর্শক। তিনি কোনো মন্ত্র পাঠ করেন না, কিন্তু যজ্ঞে কোনো ত্রুটি হচ্ছে কি না তা নীরবে পর্যবেক্ষণ করেন (অথর্ববেদের পন্ডিত)।
  • সদস্য: যজ্ঞসভায় উপস্থিত শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত, যিনি প্রয়োজনে বিধান বা পরামর্শ দেন।

দৈনন্দিন ও সামাজিক পৌরোহিত্যের সম্বোধন

বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে বিবাহ, শ্রাদ্ধ বা পূজা-পার্বণে ব্যবহৃত সাধারণ উপাধি:

  • শ্রীমৎ: আধ্যাত্মিক দীপ্তি বা কৃপায় পরিপূর্ণ আর্চবিশপ বা মঠাধ্যক্ষ।
  • শ্রীযুত: বিত্তবান ও অভিজাত পুরুষদের চিঠিপত্রে ব্যবহৃত অত্যন্ত সম্মানজনক উপসর্গ।
  • ঠাকুরমশাই: সাধারণ পুরোহিতদের সবচেয়ে প্রচলিত, সম্মানজনক এবং নৈকট্যসূচক ডাক।
  • পুরোহিত মশাই / ঠাকুর: যিনি যজমানের মঙ্গলের জন্য সম্মুখে (পুরঃ) অবস্থান করেন। এটি ঠাকুরমশাই-এর চেয়ে কিছুটা বেশি আনুষ্ঠানিক সম্বোধন।
  • দেবশর্মা / শর্মা / বর্মা / গুপ্তা / দাস / দেবী / দাসী: সংকল্প করার সময় ব্রাহ্মণ পুরোহিত নিজের বা তৎস্থলে যজমানের নামের শেষে এই শাস্ত্রীয় উপাধিটি ব্যবহার করেন (যেমন— শ্রীরামকৃষ্ণ দেবশর্মা)।
  • যজমান : যিনি যাজককে দিয়ে যজ্ঞ বা পূজা করাচ্ছেন। এটি পুরোহিতের উপাধি না হলেও পৌরোহিত্য ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য সামাজিক সম্বোধন।

সন্ন্যাস, তন্ত্র ও সম্প্রদায়ভিত্তিক আধ্যাত্মিক সম্বোধন

সনাতন ধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায়ে সন্ন্যাসী ও ধর্মগুরুদের সম্বোধনের রীতি:

  • পরমহংস: হিন্দু আধ্যাত্মিকতায় সন্ন্যাসীদের সর্বোচ্চ স্তর, যিনি জলের (মায়া) মধ্য থেকে দুধটুকু (ব্রহ্ম) ছেঁকে নিতে পারেন (যেমন— শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস, পরমহংস যোগানন্দ)।
  • স্বামীজি / মহারাজ: রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, ভারত সেবাশ্রম সংঘ বা প্রতিষ্ঠিত মঠের সন্ন্যাসীদের আধুনিক বাংলায় সর্বজনীন সম্বোধন। সারদা মঠে ব্যবহৃত স্ত্রীলিঙ্গ মাতাজি। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে সন্ন্যাসীদের মঠ প্রদত্ত সন্ন্যাসনামের পূর্বে স্বামী ও পিঠে আনন্দ যোগ হয় (স্বামী বিবেকানন্দ), এবং ব্রহ্মচারীদের নামের পূর্বে ব্রহ্মচারী ও পিঠে চৈতন্য (ব্রহ্মচারী অক্ষয়চৈতন্য) যোগ হয়। সারদা মঠে সন্ন্যাসিনীদের সন্ন্যাসনামের পূর্বে প্রব্রাজিকা ও পিঠে প্রাণা থাকে (প্রব্রাজিকা ভক্তিপ্রাণা), এবং ব্রহ্মচারিণীদের নামের সামনে ব্রহ্মচারিণীই থাকে (ব্রহ্মচারিণী রেণু)।
  • পরিব্রাজক: যে সন্ন্যাসী কোনো নির্দিষ্ট স্থানে আবদ্ধ না থেকে আজীবন পায়ে হেঁটে তীর্থভ্রমণ করেন (যেমন— পরিব্রাজক স্বামী বিবেকানন্দ)।
  • অবধূত: নাথ সম্প্রদায় বা তান্ত্রিক সাধনায় যিনি সমাজের সমস্ত জাগতিক নিয়মকানুনের ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন (যেমন— অবধূত নিত্যানন্দ বা 'মরুতীর্থ হিংলাজ'-এর লেখক অবধূত)।
  • ব্রহ্মচারী / ব্রহ্মচারিণী: সন্ন্যাস গ্রহণের পূর্ববর্তী ধাপে থাকা কঠোর সংযমী সাধক বা সাধিকা (সাদা বা গৈরিক বস্ত্র পরিহিত)।
  • ভৈরব / ভৈরবী: তান্ত্রিক সাধনায় সিদ্ধিলাভ করা পুরুষ ও নারী সাধকদের উপাধি।
  • মাতাজি / শ্রীমা / ভৈরবী মা: নারী সন্ন্যাসিনী বা নারী আধ্যাত্মিক গুরুদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাসূচক সম্বোধন।
  • প্রভুপাদ / গোস্বামী / গোঁসাই: গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ বা ইসকনে আধ্যাত্মিক গুরুদের নামের শেষে যুক্ত হওয়া পরম সম্মানীয় উপাধি।

আধ্যাত্মিক গুরু ও ব্যক্তিগত পথপ্রদর্শক

ব্যক্তিগত জীবনে ঈশ্বরলাভের পথ দেখানো আধ্যাত্মিক শিক্ষকদের সম্বোধন:

  • দীক্ষাগুরু: যিনি কানে বীজমন্ত্র প্রদান করে আধ্যাত্মিক দীক্ষা দেন। হিন্দু গৃহস্থের কাছে তিনি ভগবান সমতুল্য।
  • শিক্ষাগুরু: যিনি সরাসরি দীক্ষা না দিলেও শাস্ত্র, ধর্ম বা সাধনার পথ নির্দেশ করেন।
  • কুলগুরু: বনেদি বা রাজপরিবারে বংশানুক্রমিকভাবে যিনি পুরো বংশের দীক্ষাগুরু এবং আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হন (যেমন— বশিষ্ঠ মুনি ছিলেন রঘুবংশের কুলগুরু)।
  • গুরুভাই (গুরুভ্রাতা) / গুরুবোন (গুরুভগিনী): একই গরুর শিষ্যদের পরস্পর সম্বোধন।

পাণ্ডিত্য ও বিদ্যাভিত্তিক ঐতিহাসিক উপাধি

প্রাচীন ও মধ্যযুগের 'টোল' বা 'চতুষ্পাঠী' থেকে প্রাপ্ত পাণ্ডিত্যের উপাধি, যা পুরোহিত ও ব্রাহ্মণদের নামের সাথে যুক্ত হত (এবং বর্তমানে পদবি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়):

  • ভট্টাচার্য: আক্ষরিক অর্থে যিনি শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতদেরও গুরু। আধুনিক যুগে কোনো ভট্টাচার্য যখন পূজায় বসেন, তখন তাঁর পদবিটি তাঁর প্রাচীন পাণ্ডিত্যের ঐতিহ্যকেই বহন করে।
  • চক্রবর্তী: রাজকীয় যজ্ঞকারী ব্রাহ্মণ (বিশাল চক্র বা অঞ্চলের অধিকারী পণ্ডিত)।
  • উপাধ্যায় / ওঝা / ঝা: যিনি বেদ বা অন্যান্য শাস্ত্র অধ্যাপনা করেন। (ওঝা শব্দটি পরে লোকায়ত চিকিৎসায় ব্যবহৃত হলেও মূলে এটি উচ্চাঙ্গের ব্রাহ্মণ উপাধি)।
  • তর্কবাগীশ / তর্কচূড়ামণি: ন্যায় বা তর্কশাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ব্রাহ্মণদের উপাধি।
  • বিদ্যাবাগীশ / বিদ্যারত্ন / বিদ্যালংকার: ব্যাকরণ ও স্মৃতিশাস্ত্রে পারদর্শী পণ্ডিতদের টোল থেকে প্রাপ্ত সম্মান।
  • স্মৃতিতীর্থ / কাব্যতীর্থ: হিন্দু আইন (স্মৃতি) বা সংস্কৃত কাব্যে চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ পণ্ডিতদের উপাধি।
  • দীক্ষিত: যে ব্রাহ্মণ পরিবার ঐতিহ্যগতভাবে বিশেষ কোনো বৃহৎ যজ্ঞে দীক্ষিত হয়েছেন।
  • অগ্নিহোত্রী: যে বৈদিক ব্রাহ্মণ প্রতিদিন পবিত্র হোমাগ্নি বা গার্হপত্য অগ্নি সংরক্ষণ করেন এবং পূজা দেন।
  • পাঠক: যিনি মন্দিরে, রাজসভায় বা আসরে বসে সুমধুর স্বরে পুরাণ, ভাগবত বা চণ্ডী পাঠ করেন।

বাংলায় প্রচলিত ইসলামিক অভিধা

[সম্পাদনা]

ইসলামি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অভিধা

সুন্নি ও সাধারণ ইসলামি সর্বোচ্চ অভিধা

  • মুফতি-ই-আজম / গ্র্যান্ড মুফতি (Mufti-e-Azam / Grand Mufti): কোনো দেশ, অঞ্চল বা বৃহৎ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ইসলামি আইনজ্ঞ। তিনি ইসলামি আইন (শরিয়ত) অনুযায়ী চূড়ান্ত 'ফতোয়া' প্রদানের অধিকারী।
  • শাইখুল ইসলাম (Sheikh-ul-Islam): ইসলামি আইন ও ধর্মতত্ত্বে সর্বোচ্চ পাণ্ডিত্যের অধিকারী প্রবীণ আলেম। ঐতিহাসিকভাবে উসমানীয় (অটোমান) সাম্রাজ্যে এটি ছিল সর্বোচ্চ ধর্মীয় পদ, যা বর্তমানে বাংলার প্রখ্যাত আলেমদের সম্মানার্থে ব্যবহৃত হয়।
  • আমিরুল মুমিনিন (Amir al-Mu'minin): 'বিশ্বাসীদের নেতা' বা 'কমান্ডার অফ দ্য ফেইথফুল'। ঐতিহাসিকভাবে খলিফাদের উপাধি এবং বর্তমানে কিছু ইসলামি রাষ্ট্রে বা সংগঠনের সর্বোচ্চ নেতার সম্মানজনক অভিধা।
  • ইমাম-ই-আজম (Imam-e-Azam): 'সর্বশ্রেষ্ঠ ইমাম'। সাধারণত হানাফি মাজহাবের (আইনি স্কুল) প্রতিষ্ঠাতা ইমাম আবু হানিফাকে সম্মান জানিয়ে বৃহত্তর সুন্নি সমাজ এই সর্বোচ্চ অভিধায় ভূষিত করে।
  • খলিফা (Khalifa): সমগ্র মুসলিম উম্মাহর সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা (ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে)।

সুফি তরিকা ও আধ্যাত্মিক সর্বোচ্চ অভিধা

  • গাউস-ই-আজম (Gaus-e-Azam): সুফি দর্শনে আধ্যাত্মিক জগতের সর্বোচ্চ স্তরের সাধক বা রক্ষক, যাঁর কাছে মানুষ ত্রাণের জন্য আর্জি জানায়। (বিশেষ করে কাদেরিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা হজরত আবদুল কাদির জিলানীকে এই নামে ডাকা হয়)।
  • কুতুব-উল-আকতাব (Qutub-ul-Aqtab): 'কুতুবদের কুতুব'। সুফি সাধকদের মধ্যে যিনি সমগ্র বিশ্বের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রবিন্দু বা অক্ষ (Axis)।
  • পীর-ও-মুর্শিদ (Pir-o-Murshid): সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক বা গুরু, যিনি মুরিদ বা শিষ্যদের সরাসরি আধ্যাত্মিক তরিকা বা পথ পরিচালনা করেন।
  • সাজ্জাদানশীন / গদিনশিন (Sajjada Nashin): কোনো বৃহৎ সুফি দরবার, খানকাহ বা মাজারের প্রধান আধ্যাত্মিক ও প্রশাসনিক উত্তরাধিকারী (যিনি আক্ষরিক অর্থে পীরের 'জায়নামাজে' বা গদিতে বসেন)।

শিয়া সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ অভিধা

  • আয়াতুল্লাহ আল-উজমা / গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ (Ayatollah al-Uzma / Grand Ayatollah): শিয়া (ইশনা আশারিয়া বা দ্বাদশী) সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বা 'মারজা' (Marja—যাঁকে অনুসরণ করা সাধারণ শিয়াদের জন্য বাধ্যতামূলক)। আরবিতে এর অর্থ 'আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন'।
  • আয়াতুল্লাহ (Ayatollah): উচ্চপদস্থ শিয়া ধর্মীয় পণ্ডিত এবং ইসলামি আইনজ্ঞ (যিনি নিজের স্বাধীন রায় বা 'ইজতিহাদ' প্রদানে সক্ষম)।
  • হুজ্জাতুল ইসলাম (Hujjat-ul-Islam): 'ইসলামের প্রমাণ'। আয়াতুল্লাহর নিচের স্তরের কিন্তু অত্যন্ত সম্মানীয় শিয়া পণ্ডিত ও শিক্ষকদের উপাধি।
  • ইমাম (Imam): সাধারণ সুন্নি সমাজে ইমাম বলতে মসজিদের প্রার্থনার নেতাকে বোঝালেও, শিয়া বিশ্বাসে 'ইমাম' হলেন নবী মুহাম্মদের সরাসরি বংশধর এবং আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিকভাবে নিষ্পাপ (মাসুম) সর্বোচ্চ নেতা (যাঁদের সংখ্যা ঐতিহাসিকভাবে ১২ জন)।

ইসমাইলি, বোহরা এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ অভিধা (Ismaili, Bohra & Other Denominations)

  • আগা খান (Aga Khan): নিজারি ইসমাইলি (Nizari Ismaili) শিয়া সম্প্রদায়ের বর্তমান এবং বংশানুক্রমিক সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতার (যাঁকে তাঁরা 'হাজির ইমাম' বা উপস্থিত ইমাম বলেন) সর্বজনস্বীকৃত উপাধি।
  • দায়ী আল-মুতলাক (Da'i al-Mutlaq): দাউদি বোহরা (Dawoodi Bohra) সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও প্রশাসনিক নেতার উপাধি, যার অর্থ 'নিরঙ্কুশ প্রচারক বা প্রতিনিধি'। ইমামের অনুপস্থিতিতে তিনিই সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক।
  • খলিফাতুল মসীহ (Khalifatul Masih): আহমদিয়া (Ahmadiyya) মুসলিম সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতার উপাধি, যাঁর নির্দেশ সমগ্র বিশ্বের আহমদিয়া সম্প্রদায় মেনে চলে (অর্থ: মসীহের প্রতিনিধি)।

ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক সম্বোধন

যাঁরা ইসলামি শিক্ষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন, আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী বা ধর্মীয় ক্ষেত্রে বিশেষ কৃতিত্ব রেখেছেন, তাঁদের এই উপাধিগুলো দ্বারা সম্বোধন করা হয়:

  • মাওলানা (Maulana): উচ্চশিক্ষিত ও অত্যন্ত সম্মানীয় ইসলামি পণ্ডিত (যিনি 'দাওরায়ে হাদিস' সম্পন্ন করেছেন)। আরবিতে এর অর্থ "আমাদের প্রবর্তক, রক্ষক বা গুরু"।
  • মুফতি (Mufti): ইসলামি আইনজ্ঞ বা বিশেষজ্ঞ, যিনি শরিয়ত অনুযায়ী 'ফতোয়া' (আইনি রায় বা বিধান) প্রদানে পারদর্শী ও অধিকারী।
  • আল্লামা (Allama): অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ব্যক্তির জন্য সর্বোচ্চ সম্মানসূচক উপাধি। যিনি ইসলামি বিজ্ঞানের একাধিক শাখায় (বহুবিদ্যাবিশারদ) সর্বোচ্চ জ্ঞান অর্জন করেছেন।
  • হাফেজ (Hafiz / Hafez): যিনি পবিত্র কোরআন সম্পূর্ণ মুখস্থ করেছেন এবং স্মৃতিতে ধারণ করেন।
  • ক্বারী (Qari): পেশাদার এবং প্রশিক্ষিত কোরআন তিলাওয়াতকারী, যিনি 'তাজভিদ' (উচ্চারণ ও সুরের কঠোর নিয়ম) মেনে অত্যন্ত সুমধুর ও সঠিকভাবে কোরআন পাঠ করেন।
  • ইমাম (Imam): যিনি মসজিদে জামাতে নামাজের নেতৃত্ব দেন বা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নেতা।
  • খতিব (Khatib): যে আলেম শুক্রবার জুমার নামাজে বা ঈদের দিন মসজিদে 'খুতবা' (ধর্মীয় ভাষণ) প্রদান করেন।
  • পীর / পীর কেবলা (Pir / Pir Keibla): সুফি সাধক বা আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। 'কেবলা' বলতে বোঝায় যাঁর দিকে শিষ্যরা আধ্যাত্মিক নির্দেশনার জন্য মুখ ফেরায় (যেমন নামাজের সময় কাবার দিকে মুখ করা হয়)।
  • পীরজাদা / পীরজাদী (Pirzada / Pirzadi): পীরের পুত্র বা কন্যা, অর্থাৎ সুফি সাধকের সরাসরি উত্তরাধিকারী।
  • সাজ্জাদানশীন (Sajjada Nashin): পীরের দরবার বা মাজারের প্রধান আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারী (যিনি পীরের জায়নামাজে বসেন)।
  • হজরত (Hazrat): আরবি সম্মানসূচক শব্দ, যার অর্থ 'উপস্থিতি' বা 'সান্নিধ্য'। নবী, রাসুল, প্রখ্যাত সুফি সন্ত এবং উচ্চপদস্থ আলেমদের নামের আগে পরম সম্মান প্রদর্শনের জন্য এটি ব্যবহৃত হয়।
  • মখদুম (Makhdum): অর্থ 'যাঁকে সেবা করা হয়'। এটি ঐতিহাসিক উচ্চপদস্থ সুফি সাধকদের উপাধি, যাঁদের বিপুল সংখ্যক অনুসারী ছিল (যেমন— মখদুম শাহ জালাল)।
  • গাউস / কুতুব (Gaus / Qutub): সুফি দর্শনে আধ্যাত্মিক জগতের সর্বোচ্চ স্তরের সাধক ও ত্রাতা।
  • শায়খ / শেখ (Shaykh): ধর্মীয় গুরু, আধ্যাত্মিক নেতা বা অত্যন্ত প্রবীণ আলেমদের সম্মানজনক আরবি ডাক।
  • আলহাজ্ব / হাজী (Alhaj / Haji): নামের পূর্বে বসা সম্মানসূচক উপাধি, যা নির্দেশ করে যে উক্ত ব্যক্তি মক্কায় সফলভাবে পবিত্র হজ পালন করেছেন।
  • খাদেম (Khadem): মাজার, দরগাহ বা মসজিদের পবিত্র সেবক।

ঐতিহাসিক, প্রশাসনিক ও অভিজাত উপাধি

সুলতানি ও মোঘল যুগে বাংলার মুসলিমদের অনেক ফার্সি ও আরবি প্রশাসনিক উপাধি দেওয়া হয়েছিল। কালের বিবর্তনে এগুলো বর্তমানে বাঙালি মুসলিমদের পারিবারিক পদবি (Surnames) হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, এগুলো ঐতিহাসিক আভিজাত্যের পরিচয় বহন করে:

  • সৈয়দ / সৈয়দা (Syed / Syeda): মুসলিম সমাজে সর্বোচ্চ সামাজিক-ধর্মীয় সম্মানসূচক উপাধি, যা নবী মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমা ও জামাতা আলীর বংশধরদের নির্দেশ করে।
  • শেখ (Sheikh): ঐতিহাসিকভাবে আরব বংশোদ্ভূত অভিজাতদের উপাধি হলেও, বাংলায় এটি ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিজাত পদবিতে পরিণত হয়েছে (যেমন— শেখ মুজিবুর রহমান)।
  • খাঁ / খান (Khan): তুর্কি-মঙ্গোল সামরিক উপাধি, যার অর্থ 'সেনাপতি' বা 'শাসক'। মোঘল আমলে উচ্চপদস্থ সামরিক ও প্রশাসনিক কর্তাদের এই খেতাব দেওয়া হত।
  • মির্জা (Mirza): ফার্সি 'আমির-জাদা' (আমিরের সন্তান) থেকে আগত। এটি মোঘল রাজপুত্র এবং উচ্চপদস্থ অভিজাতদের রাজকীয় উপাধি ছিল।
  • মীর (Mir): 'আমির' (কমান্ডার/নেতা) শব্দ থেকে উদ্ভূত। সামরিক নেতা বা আরব অভিজাত বংশীয়দের বোঝাতে ব্যবহৃত (যেমন— মীর মশাররফ হোসেন)।
  • কাজী (Kazi / Qazi): ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী বিচারকার্য সম্পন্নকারী রাজকীয় বিচারক। আধুনিক যুগে গ্রামীণ বা শহরভিত্তিক বিবাহ নিবন্ধককে (Marriage Registrar) কাজী বলা হয়।
  • খন্দকার (Khondokar / Khandaker): ফার্সি 'খাওয়ান্দকার' থেকে আগত, যার অর্থ শিক্ষক বা পাঠক। ধর্মীয় শিক্ষক বা শিক্ষিত সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক উপাধি।
  • মুন্সী (Munshi): উচ্চশিক্ষিত করণিক, সচিব বা রাজদরবারের ফার্সি ও আরবি ভাষার শিক্ষক।
  • দেওয়ান (Dewan): বিশাল এস্টেটের প্রধান প্রশাসক বা অর্থমন্ত্রী। অনেক সময় বৃহৎ সুফি দরবার বা মাজারের প্রধান প্রশাসককেও দেওয়ান বলা হয়।
  • মোল্লা (Mullah): ঐতিহাসিকভাবে ইসলামি ধর্মশাস্ত্রে পণ্ডিত বা স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের সম্মানসূচক পদবি।
  • তালুকদার / চৌধুরী / মল্লিক / শিকদার: প্রশাসনিক ও জমিদারি কাঠামোর পদবি, যা বাংলার হিন্দু ও মুসলিম উভয় সমাজেই অভিজাত পদবি হিসেবে প্রচলিত।

প্রাত্যহিক সামাজিক ও সম্মানজনক সম্বোধন

দৈনন্দিন জীবনে আনুষ্ঠানিক (Formal) এবং আধা-আনুষ্ঠানিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত সম্বোধনের রীতি:

  • জনাব (Janab): "স্যার" (Sir) বা "মিস্টার" (Mr.)-এর অত্যন্ত সম্মানজনক ও মার্জিত সমকক্ষ রূপ। বিশেষত বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে, চিঠিপত্রে এবং প্রশাসনিক ভাষণে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত।
  • জনাবা (Janaba): জনাবের নারীবাচক রূপ (ম্যাডাম)। যদিও এখন দুই ক্ষেত্রেই জনাব বহুল প্রচলিত।
  • বেগম (Begum): বিবাহিত মুসলিম নারীদের সম্মানজনক উপাধি, যা ঐতিহাসিকভাবে রাজকীয় বা অভিজাত বংশীয় নারীদের (যেমন— বেগম রোকেয়া) বোঝাতো।
  • খাতুন (Khatun): মুসলিম নারীদের সম্মানসূচক ডাক। ঐতিহাসিকভাবে অভিজাত নারীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলেও, বর্তমানে বৈবাহিক অবস্থা নির্বিশেষে সম্মানের সাথে ব্যবহৃত হয়।
  • বিবি (Bibi): অভিজাত, প্রবীণ বা সম্মানিতা নারীর ঐতিহ্যবাহী ডাক।
  • হুজুর (Hujur / Huzur): অর্থ 'উপস্থিতি'। ধর্মীয় শিক্ষক, মাদ্রাসার শিক্ষক, ইমাম বা ক্ষেত্রবিশেষে বস বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পরম শ্রদ্ধায় সম্বোধন করতে ব্যবহৃত হয়।
  • সাহেব (Saheb): অর্থ 'মালিক', 'সঙ্গী' বা 'ভদ্রলোক'। সম্মান প্রদর্শনের জন্য নামের বা পেশার শেষে এটি যুক্ত করা হয় (যেমন— উকিল সাহেব, কাজী সাহেব, মাস্টার সাহেব)।
  • মিঞা / মিয়া (Miyan / Mia): মুসলিম ভদ্রলোকদের প্রতি একটি ঐতিহ্যবাহী ও সম্মানজনক সম্বোধন। গ্রামবাংলায় বয়োজ্যেষ্ঠরা ছোটদের স্নেহভরে ডাকতে বা সাধারণ সম্মানের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করেন।
  • মুরুব্বি (Murubbi): বয়োজ্যেষ্ঠ, অভিভাবক বা পৃষ্ঠপোষক। সমাজ বা পরিবারে যাঁর বয়স, প্রজ্ঞা এবং উপদেশ অত্যন্ত সম্মানজনক হিসেবে মান্য করা হয়।
  • মুহতারাম / মুহতারামা (Mohtaram / Mohtarama): অত্যন্ত সম্মানীয় পুরুষ বা নারী (শ্রদ্ধেয় / শ্রদ্ধেয়া অর্থে ব্যবহৃত)।
  • মরহুম: প্রয়াত ব্যক্তিদের নামের পূর্বে যোগ করা হয়, অমুসলিমরা প্রয়াত বা স্বর্গীয় / স্বর্গীয়া ব্যবহার করেন।

বৌদ্ধ ধর্মীয় সম্বোধন ও অভিধা

[সম্পাদনা]

বাংলা ভাষাভাষী বৌদ্ধ সমাজে (বিশেষ করে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং ত্রিপুরা অঞ্চলে) পালি ভাষার প্রভাবযুক্ত নিজস্ব অত্যন্ত সম্মানীয় সম্বোধন রীতি রয়েছে:

  • ভন্তে: বৌদ্ধ ভিক্ষু বা সন্ন্যাসীদের ডাকার সবচেয়ে সাধারণ ও সর্বজনীন সম্মানসূচক সম্বোধন (Reverend/Venerable)। এটি পালি শব্দ 'ভদন্ত' থেকে এসেছে।
  • শ্রমণ: নবীন বা শিক্ষানবিশ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, যিনি এখনও পূর্ণাঙ্গ ভিক্ষুত্ব লাভ করেননি।
  • ভিক্ষু: যিনি পূর্ণাঙ্গভাবে সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করেছেন (Fully ordained monk)।
  • ভিক্ষুণী: পূর্ণাঙ্গ সন্ন্যাসিনী বা নারী সাধিকা।
  • স্থবির / থের: প্রবীণ বৌদ্ধ ভিক্ষু (সাধারণত যিনি কমপক্ষে ১০ বছর ভিক্ষু জীবন অতিবাহিত করেছেন)
  • মহাস্থবির / মহাথের: অত্যন্ত প্রবীণ এবং জ্ঞানবৃদ্ধ বৌদ্ধ ভিক্ষু (সাধারণত যিনি ২০ বছরের বেশি সময় ভিক্ষু জীবনে আছেন)।
  • সংঘরাজ: বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বা মঠাধ্যক্ষ। (যেমন বাংলাদেশে 'বাংলাদেশ বৌদ্ধ ভিক্ষু মহাসভা'-র সর্বোচ্চ নেতাকে সংঘরাজ বলা হয়)।
  • উপাসক: বৌদ্ধ ধর্মের সাধারণ গৃহী পুরুষ ভক্ত বা অনুসারী।
  • উপাসিকা: বৌদ্ধ ধর্মের সাধারণ গৃহী নারী ভক্ত বা অনুসারী।
  • আবাসিক: কোনো নির্দিষ্ট বৌদ্ধ বিহার বা প্যাগোডার প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত ভিক্ষু।
  • অনাগরিক: যিনি গৃহত্যাগ করেছেন কিন্তু পূর্ণ ভিক্ষু হননি (সাদা বস্ত্র পরিধানকারী ব্রহ্মচারী)।
  • ত্রিপিটকাচার্য: যিনি বৌদ্ধ ধর্মের মূল ধর্মগ্রন্থ 'ত্রিপিটক'-এ অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন।
  • বোধিসত্ত্ব: যিনি বুদ্ধত্ব লাভের পথে অগ্রসর হয়েছেন এবং জগতের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করেছেন (ঐতিহাসিক বা আধ্যাত্মিক উপাধি)।

জৈন ধর্মীয় সম্বোধন ও অভিধা

[সম্পাদনা]

বাংলায় জৈনদের (বিশেষত শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর সম্প্রদায়ের মাড়োয়ারি ও গুজরাটি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, যাঁরা দীর্ঘকাল বাংলায় বসবাস করছেন) সম্বোধনগুলো সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষার ওপর নির্ভরশীল:

  • তীর্থংকর (Tirthankar): জৈন ধর্মের ২৪ জন সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক গুরু বা পথপ্রদর্শকের উপাধি (যেমন— মহাবীর জৈন)।
  • জিন (Jina): যিনি নিজের ইন্দ্রিয়, রাগ, দ্বেষ ও মোহ জয় করেছেন (বিজেতা)।
  • মুনি / জৈন মুনি (Muni): জৈন সন্ন্যাসীদের সাধারণ এবং সম্মানজনক সম্বোধন।
  • সাধু (Sadhu) / সাধ্বী (Sadhvi): জৈন সন্ন্যাসী এবং সন্ন্যাসিনীদের ব্যবহৃত উপাধি।
  • আচার্য (Acharya): জৈন সন্ন্যাসীদের সংঘ বা মঠের সর্বোচ্চ প্রধান।
  • উপাধ্যায় (Upadhyay): জৈন সংঘের শিক্ষক বা প্রবীণ সন্ন্যাসী, যিনি শাস্ত্র শিক্ষা দেন।
  • আর্যিকা (Aryika): দিগম্বর জৈন সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ স্তরের নারী সন্ন্যাসিনী।
  • শ্রাবক (Shravak) / শ্রাবিকা (Shravika): জৈন ধর্মের সাধারণ গৃহী পুরুষ ও নারী ভক্ত (যাঁরা সন্ন্যাসীদের বাণী শ্রবণ করেন)।
  • ক্ষুল্লক (Kshullak) / ক্ষুল্লিকা (Kshullika): দিগম্বর সম্প্রদায়ের নবীন বা জুনিয়র সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনী।
  • যতি (Yati): শ্বেতাম্বর সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক গুরু, যিনি মন্দিরের দেখাশোনা করেন কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সন্ন্যাসী নন।
  • ভট্টারক (Bhattarak): দিগম্বর জৈনদের ধর্মীয় মঠ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ধর্মাধ্যক্ষ।

খ্রিস্টান ধর্মীয় সম্বোধন ও অভিধা

[সম্পাদনা]

বাংলায় ক্যাথলিক (Catholic) এবং প্রোটেস্ট্যান্ট (Protestant) উভয় চার্চেই ইংরেজি পদের পাশাপাশি কিছু নিজস্ব বাংলা পরিভাষা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়:

  • ফাদার / পাদ্রি (Father): ক্যাথলিক বা অর্থোডক্স চার্চের যাজকদের সর্বজনীন ডাক। বাংলায় এঁদের অনেক সময় 'পাদ্রি' বা গ্রামবাংলায় 'ফাদারমশাই' বলেও ডাকা হয়।
  • সিস্টার / ধর্মভগিনী (Sister): সন্ন্যাসিনীদের (Nuns) সর্বজনীন সম্বোধন। ক্যাথলিক মিশনারি স্কুল ও হাসপাতালে এই ডাকটি অত্যন্ত সুপরিচিত।
  • ব্রাদার / ধর্মভ্রাতা (Brother): মঠবাসী বা চার্চের সেবায় নিয়োজিত সন্ন্যাসী, যিনি যাজক বা ফাদার নন।
  • মাদার / ধর্মমাতা (Mother): সন্ন্যাসিনীদের প্রধান বা অত্যন্ত সম্মানীয় প্রবীণ সিস্টার (যেমন— মাদার তেরেসা)।
  • রেভারেন্ড / রেভাঃ / শ্রদ্ধেয় যাজক (Reverend): প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চের যাজকদের সম্মানসূচক উপাধি (চিঠিপত্রে 'মাননীয় যাজক' বা 'Rev.'-এর বাংলা রূপ হিসেবে ব্যবহৃত)।
  • পাস্টর / পালক (Pastor): প্রোটেস্ট্যান্ট বা ব্যাপটিস্ট চার্চের প্রধান যাজক। বাংলায় এঁদের আক্ষরিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে 'পালক' (যিনি মণ্ডলীকে পালন করেন) বলা হয়।
  • বিশপ / ধর্মাধ্যক্ষ (Bishop): একটি নির্দিষ্ট ধর্মপ্রদেশের (Diocese) প্রধান ধর্মগুরু। বাংলায় সরকারি ও চার্চের নথিতে এঁদের 'ধর্মাধ্যক্ষ' বলা হয়।
  • আর্চবিশপ / মহাধর্মাধ্যক্ষ (Archbishop): বৃহত্তর ধর্মপ্রদেশের (Archdiocese) সর্বোচ্চ ধর্মগুরু। (যেমন— কলকাতার মহাধর্মাধ্যক্ষ)।
  • কার্ডিনাল / মহাযাজক বা সর্বোচ্চ যাজক (Cardinal): ক্যাথলিক চার্চে পোপের ঠিক নিচের স্তরের অত্যন্ত উচ্চপদস্থ ধর্মগুরু।
  • পোপ মহোদয় / পরম ধর্মগুরু (Pope): বিশ্ব ক্যাথলিক চার্চের সর্বোচ্চ নেতা। বাংলায় আনুষ্ঠানিক ভাষণে তাঁকে 'পরম ধর্মগুরু' বা 'মহামান্য পোপ' হিসেবে অভিহিত করা হয়।
  • মাদার সুপিরিয়র (মঠাধ্যক্ষা) / ফাদার সুপিরিয়র (মঠাধ্যক্ষ) (Mother/Father Superior): কোনো কনভেন্ট বা মঠের (Monastery) প্রধান মঠাধ্যক্ষা বা মঠাধ্যক্ষ।
  • ডিকন / সহযাজক বা যাজক-সহায়ক (Deacon): যাজক হওয়ার আগের ধাপের সহায়ক যাজক।
  • সাধু / সন্ত (Saint): খ্রিস্টান ধর্মে যাঁরা পুণ্যবান হিসেবে চার্চ দ্বারা স্বীকৃত। বাংলায় ক্যাথলিকরা সাধারণত 'সন্ত' (যেমন— সন্ত তেরেসা, সন্ত ফ্রান্সিস) এবং প্রোটেস্ট্যান্টরা 'সাধু' (যেমন— সাধু পল, সাধু জোহন) শব্দটি ব্যবহার করেন।

শিখ ধর্মের অভিধা ও সম্বোধন

[সম্পাদনা]

শিখ ধর্মে উপাধিগুলো মূলত আধ্যাত্মিক জ্ঞান, সামরিক শৌর্য এবং গুরুদ্বারের সেবার ওপর ভিত্তি করে প্রদান করা হয়।

  • গুরু (Guru): শিখ ধর্মের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক পদ। সংস্কৃত 'গুরু' শব্দ থেকে আগত, যার অর্থ যিনি অন্ধকার (গু) দূর করে আলো (রু) নিয়ে আসেন। শিখ ধর্মে ১০ জন মানব গুরু এবং চিরন্তন গুরু 'গুরু গ্রন্থ সাহিব'-এর ক্ষেত্রেই কেবল এই উপাধি ব্যবহৃত হয়।
  • গ্রন্থী (Granthi): গুরুদ্বার বা শিখ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বা রক্ষক, যাঁর মূল দায়িত্ব হল 'গুরু গ্রন্থ সাহিব' পাঠ করা এবং ধর্মীয় আচার পরিচালনা করা। 'গ্রন্থ' শব্দ থেকে এর উৎপত্তি।
  • জ্ঞানী (Giani / Gyani): শিখ ধর্মতত্ত্ব, ইতিহাস এবং গুরুমুখী লিপিতে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী সম্মানীয় ব্যক্তি। এটি শিখ সমাজে অত্যন্ত উচ্চমার্গের একটি একাডেমিক ও ধর্মীয় উপাধি।
  • জথেদার (Jathedar): 'জথা' (দল বা গোষ্ঠী) এবং 'দার' (অধিকারী) থেকে আগত। শিখদের ধর্মীয় ক্ষমতার পাঁচটি প্রধান কেন্দ্র বা 'তখত'-এর (যেমন অকাল তখত) সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও প্রশাসনিক নেতাকে জথেদার বলা হয়।
  • সিং (Singh): সংস্কৃত 'সিংহ' থেকে আগত। দশম গুরু গোবিন্দ সিং 'খালসা' পন্থ প্রবর্তনের সময় সমস্ত দীক্ষিত শিখ পুরুষের নামের শেষে এই বাধ্যতামূলক পদবি বা উপাধি যুক্ত করেন, যা নির্ভীকতা ও সাম্যের প্রতীক।
  • কৌর (Kaur): রাজপুত শব্দ 'কুনওয়ার' (রাজপুত্র) বা কৌর (রাজকুমারী) থেকে আগত। লিঙ্গসমতা এবং নারীদের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য সমস্ত দীক্ষিত শিখ নারীর নামের শেষে এটি বাধ্যতামূলক উপাধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
  • সরদার / সরদারনি (Sardar / Sardarni): ফার্সি শব্দ যার অর্থ 'নেতা' বা 'প্রধান'। সম্মানজনক সামাজিক সম্বোধন হিসেবে শিখ পুরুষদের নামের আগে 'সর্দার' এবং নারীদের ক্ষেত্রে 'সর্দারণী' ব্যবহৃত হয় (যেমন— মিস্টার এবং ম্যাডাম)।
  • ভাই / ভাই সাহিব (Bhai / Bhai Sahib): আক্ষরিক অর্থ 'ভাই'। শিখ সমাজে ধর্মীয় সঙ্গীত (কীর্তন) গায়ক, প্রচারক বা অত্যন্ত সম্মানীয় এবং ধার্মিক ব্যক্তিকে পরম শ্রদ্ধায় এই উপাধি দেওয়া হয় (যেমন— ভাই বীর সিং)।
  • সন্ত (Sant): সনাতন ধর্মের মতোই শিখ ধর্মেও পবিত্র জীবনযাপনকারী, ধর্মপ্রচারক এবং ঈশ্বর-উপলব্ধিকারী আধ্যাত্মিক ব্যক্তিদের 'সন্ত' আখ্যা দেওয়া হয়।
  • নিহঙ্গ (Nihang): ফার্সি শব্দ যার অর্থ কুমির বা পৌরাণিক জলজ প্রাণী, রূপকার্থে মৃত্যুভয়হীন যোদ্ধা। এটি দশম গুরু গোবিন্দ সিং দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শিখদের নীল বস্ত্র পরিহিত সশস্ত্র ও সামরিক সাধক সম্প্রদায়ের উপাধি।
  • পঞ্জ পিয়ারে (Panj Pyare): 'পাঁচজন প্রিয়জন'। ১৬৯৯ সালে গুরু গোবিন্দ সিং যাঁদের প্রথম দীক্ষা দিয়েছিলেন, তাঁদের ঐতিহাসিক উপাধি। বর্তমানে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার পরিচালনাকারী পাঁচজন দীক্ষিত শিখকে এই সম্মানীয় নামে ডাকা হয়।

পার্সি বা জরাথুষ্ট্রীয় ধর্মের অভিধা

[সম্পাদনা]

পার্সিদের উপাধিগুলো মূলত প্রাচীন পারস্যের আবেস্তা (Avestan) এবং পাহলভি (Pahlavi) ভাষা থেকে উদ্ভূত। এগুলো তাঁদের অগ্নিকেন্দ্রিক ধর্মীয় আচার এবং যাজকতন্ত্রের স্তর নির্দেশ করে:

  • দস্তুর (Dastur): পার্সি ধর্মীয় কাঠামোতে সর্বোচ্চ স্তরের যাজক বা প্রধান পুরোহিত। পাহলভি শব্দ 'দস্তুর'-এর অর্থ হল 'যিনি নির্দেশ বা বিধান দেন'। একটি বড় অগ্নীমন্দির (Fire Temple) বা সম্পূর্ণ অঞ্চলের প্রধান যাজককে এই উপাধি দেওয়া হয় (যেমন দস্তুরজি)।
  • মোবেদ / মবেদ (Mobed): পূর্ণাঙ্গ যাজক, যিনি সমস্ত প্রকার পবিত্র ধর্মীয় আচার (যেমন ইয়াসনা বা উচ্চাঙ্গের প্রার্থনা) পরিচালনা করতে পারেন। শব্দটির উৎপত্তি মধ্য ফার্সি 'মগুপাত' (Magupat) থেকে, যার অর্থ 'ম্যাগি বা যাজকদের প্রধান'।
  • এরভাদ (Ervad): পার্সি যাজকতন্ত্রের প্রাথমিক স্তর। নবদ্বীপ সমতুল্য 'নাভার' (Navar) দীক্ষা সম্পন্ন করার পর একজন তরুণ যাজককে এই উপাধি দেওয়া হয়। আবেস্তান শব্দ 'আএথ্রাপাইতি' (Aethrapaiti) থেকে এর উৎপত্তি, যার অর্থ শিক্ষক বা শাস্ত্রজ্ঞ।
  • পনথাকি (Panthaki): একটি নির্দিষ্ট অগ্নীমন্দির (Agiary) পরিচালনার দায়িত্বে থাকা প্রধান মোবেদ বা ম্যানেজার। 'পনথ' অর্থাৎ নির্দিষ্ট ধর্মীয় পথ বা এলাকার রক্ষক।
  • বেহদিন (Behdin): সাধারণ পার্সি গৃহী বা অনুসারী (যাঁরা যাজক নন)। এর আক্ষরিক অর্থ হল 'উত্তম ধর্মের অনুসারী' (Follower of the Good Religion)।
  • জরাথুশত্রোতেমা (Zarathushtrotéma): প্রাচীন জরাথুষ্ট্রীয় ধর্মতত্ত্বে সর্বোচ্চ প্রধান যাজকের উপাধি, যাঁকে স্বয়ং নবী জরাথুষ্ট্রের আধ্যাত্মিক উত্তরসূরি মনে করা হত।
  • আশো (Asho): আবেস্তান শব্দ 'আশা' (Asha - সত্য বা পরম পবিত্রতা) থেকে উদ্ভূত। যিনি অত্যন্ত ধার্মিক এবং সত্যের পথে চলেন, এমন আধ্যাত্মিক সাধককে 'আশো' বা 'আশাভান' উপাধি দেওয়া হয়।

ইহুদি ধর্মের উপাধি ও সম্বোধন

[সম্পাদনা]

ইহুদি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উপাধিগুলো মূলত হিব্রু (Hebrew) এবং আরামীয় (Aramaic) ভাষা থেকে এসেছে, যা ধর্মীয় শিক্ষা, বিচার এবং সিনাগগের সেবার সাথে যুক্ত:

  • রাব্বি / রব্বি (Rabbi): ইহুদি ধর্মের সর্বোচ্চ শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা এবং তোরাহ (Torah) শাস্ত্রের ব্যাখ্যাকার। হিব্রু শব্দ 'রাভ' (Rav) বা 'মহান/গুরু' থেকে এর উৎপত্তি। 'রাব্বি' অর্থ 'আমার গুরু'।
  • প্রধান রাব্বি (Chief Rabbi): কোনো দেশ বা শহরের ইহুদি সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক ও আইনি নেতা (যেমন— কলকাতার প্রধান রাব্বি)।
  • রেব্বে (Rebbe): হাসিদিক ইহুদি (Hasidic Judaism) সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক গুরু এবং রাজবংশীয় নেতার উপাধি। এটি রাব্বি শব্দেরই একটি য়িদিশ (Yiddish) রূপ, তবে এটি আরও গভীর আধ্যাত্মিক আনুগত্য নির্দেশ করে।
  • কোহেন (Kohen / Cohen): ইহুদি যাজক সম্প্রদায়ের উপাধি, যাঁরা ঐতিহাসিকভাবে মুসার (Moses) ভাই অ্যারন (Aaron)-এর সরাসরি বংশধর। প্রাচীনকালে জেরুসালেমের পবিত্র উপাসনালয়ে (Temple) এঁরাই সর্বোচ্চ বলিদানের দায়িত্ব পালন করতেন।
  • লেভি (Levi): ইহুদিদের বারোটি উপজাতির একটি। লেভি উপজাতির পুরুষদের ঐতিহাসিক উপাধি, যাঁরা মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ এবং কোহেনদের সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করতেন।
  • হাজ্জান / ক্যান্টর (Hazzan / Cantor): সিনাগগে (ইহুদি উপাসনালয়) যিনি সুমধুর কণ্ঠে হিব্রু প্রার্থনা পাঠ করেন এবং প্রার্থনাসভাকে নেতৃত্ব দেন।
  • দায়ান (Dayan): ইহুদি ধর্মীয় আদালত বা 'বেথ দিন' (Beth Din)-এর বিচারক। হিব্রু ভাষায় দায়ান অর্থ 'যিনি বিচার করেন'। তিনি ইহুদি আইন (Halakha) অনুযায়ী বিবাদ মীমাংসা করেন।
  • শোখেট (Shochet): ইহুদি ধর্মীয় আইন (কোশার / Kosher) অনুযায়ী প্রাণী জবাই করার জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত এবং ছাড়পত্রপ্রাপ্ত ব্যক্তি।
  • মোয়েল / মোহেল (Mohel): ইহুদি ঐতিহ্যে সদ্যোজাত পুত্রসন্তানদের ধর্মীয় নিয়মানুযায়ী খতনা (Brit milah) করানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ।
  • গাব্বাই (Gabbai): সিনাগগের প্রশাসক বা ওয়ার্ডেন, যিনি উপাসনালয়ের প্রাত্যহিক কার্যাবলি এবং তোরাহ পাঠের সময় কে কখন পড়বেন তা নির্ধারণ করেন।
  • রোশ ইয়েশিভা (Rosh Yeshiva): 'ইয়েশিভা' হল ইহুদিদের ধর্মতাত্ত্বিক একাডেমি বা তালমুদ (Talmud) অধ্যয়নের মাদ্রাসা। এই প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ডিন বা প্রধান শিক্ষককে 'রোশ ইয়েশিভা' (একাডেমির প্রধান) বলা হয়।
  • ৎসাদিক / জাদিক (Tzadik): হিব্রু শব্দ, যার অর্থ 'পবিত্র' বা 'ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি'। ইহুদি ঐতিহ্যে অত্যন্ত ধার্মিক, সৎ এবং আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিকে এই উপাধি দেওয়া হয়।

ব্রিটিশ রাজতন্ত্র এবং ঔপনিবেশিক আমলের অভিধা ও সম্বোধন

[সম্পাদনা]

ব্রিটিশ রাজপরিবার ও সর্বোচ্চ পদাধিকারী

  • ভারতসম্রাট / ভারতসম্রাজ্ঞী (Emperor / Empress of India): ১৮৭৬ সালের 'রয়্যাল টাইটেলস অ্যাক্ট' অনুযায়ী রানি ভিক্টোরিয়া এবং তাঁর উত্তরসূরি ব্রিটিশ রাজাদের (যেমন— পঞ্চম জর্জ) ভারতের সার্বভৌম শাসক হিসেবে এই আনুষ্ঠানিক রাজকীয় অভিধা দেওয়া হয়।
  • কায়সার-ই-হিন্দ (Kaisar-i-Hind): 'ভারতের সম্রাট' শব্দটির সরকারি হিন্দুস্তানি ও ফার্সি রূপ, যা ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যদের এবং ভারতীয়দের জনসেবার জন্য পদক (Kaisar-i-Hind Medal) হিসেবেও প্রদান করা হত।
  • মহামহিম (His/Her Imperial Majesty): চিঠিপত্র, সরকারি ঘোষণা বা আনুষ্ঠানিক ভাষণে ব্রিটিশ সম্রাট বা সম্রাজ্ঞীকে উল্লেখ করার অত্যন্ত রাজকীয় এবং বিধিবদ্ধ বাংলা পরিভাষা।
  • রাজপ্রতিনিধি / ভাইসরয় (Viceroy): ১৮৫৮ সালের পর ব্রিটিশ সম্রাটের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি হিসেবে যিনি ভারত শাসন করতেন। বিধিবদ্ধভাবে তিনি ছিলেন 'Viceroy and Governor-General of India'।

ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক ও সামরিক পদাধিকারী

  • বড়লাট: 'লর্ড' (Lord) শব্দটি লোকমুখে বিকৃত হয়ে 'লাট'-এ পরিণত হয়। ভারতের ভাইসরয় বা গভর্নর জেনারেলকে সমগ্র ভারত এবং বাংলার মানুষ পরম সমীহে 'বড়লাট' বা 'বড়লাটসাহেব' বলে ডাকত।
  • ছোটলাট: ব্রিটিশ ভারতের প্রদেশগুলোর (যেমন বাংলা প্রেসিডেন্সি) লেফটেন্যান্ট গভর্নর (Lieutenant-Governor) বা রাজ্যপালদের সাধারণ মানুষের দেওয়া উপাধি।
  • জঙ্গিলাট: 'জঙ্গি' ফার্সি শব্দ, যার অর্থ যুদ্ধ বা সামরিক। ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক বা 'কমান্ডার-ইন-চিফ' (Commander-in-Chief)-কে এই নামে সম্বোধন করা হত।
  • বড়সাহেব: কোনো জেলা, বিশাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান (যেমন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা চা বাগান), বা সরকারি দপ্তরের সর্বোচ্চ ইংরেজ কর্তাকে দেশীয় কর্মচারী ও প্রজারা এই নামে ডাকত।
  • ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব / কালেক্টর সাহেব: জেলার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও রাজস্ব কর্মকর্তা। গ্রামবাংলার মানুষের কাছে এঁরা ছিলেন ব্রিটিশ শক্তির প্রত্যক্ষ রূপ।
  • রেসিডেন্ট (Resident): দেশীয় বা করদ রাজ্যগুলোতে (Princely States) ব্রিটিশ সরকারের স্থায়ী কূটনৈতিক প্রতিনিধি এবং পরোক্ষ নিয়ন্ত্রক।

ব্রিটিশ প্রদত্ত খেতাব ও সম্মাননা

ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় প্রজাদের আনুগত্য, জনসেবা বা প্রশাসনিক দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ বেশ কিছু খেতাব প্রদান করত:

  • স্যার / নাইট (Sir / Knight): ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্মান (Knighthood)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র বসু, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট বাঙালিরা এই খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন।
  • রায় বাহাদুর (Rai Bahadur / Roy Bahadur): হিন্দু ও পার্সি ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তি, জমিদার বা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারীদের দেওয়া প্রথম শ্রেণির ব্রিটিশ সম্মান।
  • রায় সাহেব (Rai Saheb / Roy Saheb): হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের দেওয়া দ্বিতীয় শ্রেণির সম্মান (রায় বাহাদুরের এক ধাপ নিচে)।
  • খান বাহাদুর (Khan Bahadur): মুসলিম ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তি বা জমিদারদের প্রদত্ত প্রথম শ্রেণির সম্মান। (যেমন— খান বাহাদুর আহ্‌ছানউল্লা)।
  • খান সাহেব (Khan Saheb): মুসলিম সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের প্রদত্ত দ্বিতীয় শ্রেণির সম্মান।
  • মহারাজা বাহাদুর / নবাব বাহাদুর (Maharaja Bahadur / Nawab Bahadur): অত্যন্ত বশংবদ এবং বিশাল এস্টেটের অধিকারী দেশীয় হিন্দু রাজাদের 'মহারাজা বাহাদুর' এবং মুসলিম শাসকদের 'নবাব বাহাদুর' উপাধিতে উন্নীত করে ব্রিটিশরা স্বীকৃতি প্রদান করত।
  • সি.আই.ই (C.I.E - Companion of the Order of the Indian Empire): ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক বা সেবামূলক কাজে বিশেষ অবদানের জন্য প্রদত্ত একটি উচ্চপদস্থ রাজকীয় অর্ডার বা খেতাব।
  • সি.এস.আই (C.S.I - Companion of the Order of the Star of India): ভারতীয় রাজন্যবর্গ এবং উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ ও ভারতীয় কর্মকর্তাদের দেওয়া অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ খেতাব।

দৈনন্দিন ঔপনিবেশিক ও বিচারবিভাগীয় সম্বোধন

  • সাহেব (Saheb / Sahib): যেকোনো শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয় পুরুষকে অত্যন্ত সম্ভ্রমের সাথে ডাকার সর্বজনীন শব্দ। পরে এটি ভারতীয় উচ্চপদস্থ কর্তাদের নামের শেষেও যুক্ত হতে শুরু করে।
  • মেমসাহেব (Memsaheb): 'ম্যাডাম সাহেব' থেকে উদ্ভূত। ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ নারী বা বড়সাহেবের স্ত্রীকে দেশীয় ভৃত্য এবং সাধারণ মানুষ এই নামে সম্বোধন করত।
  • ধর্মাবতার (Dharmabatar): ব্রিটিশ আমলের আদালতে দেশীয় প্রজা বা আসামিরা ইংরেজ বিচারককে ন্যায়ের প্রতীক বা ধর্মের অবতার হিসেবে এই নামে সম্বোধন করত (যা 'Your Honor'-এর সমতুল্য)।
  • হুজুর / মাইবাপ (Huzur / Mai-baap): ব্রিটিশ কর্মকর্তা বা প্রবল পরাক্রমশালী জমিদারদের কাছে নিজেদের অসহায়তা প্রকাশ এবং চরম আনুগত্য দেখাতে প্রজারা "আপনারাই আমার মা-বাপ" অর্থে এই সম্বোধন করত।
  • ইওর অনার (Your Honor) / ইওর লর্ডশিপ (Your Lordship): ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থায় বিধিবদ্ধ আইনি সম্বোধন, যা উচ্চ আদালতের (High Court) বিচারকদের ক্ষেত্রে আজও সরাসরি ব্যবহৃত হয়।
  • বরকন্দাজ সাহেব / সার্জেন্ট সাহেব (Sergeant Saheb): ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনীর শ্বেতাঙ্গ বা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান অফিসারদের কলকাতার রাস্তায় বা পাড়ায় সম্মান ও ভয়ের মিশ্রণে এই নামে ডাকা হত।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Park, Innhwa (৩০ ডিসেম্বর ২০০৮)। "& Study of Language</em> (3rd ed.) by George Yule. Cambridge: Cambridge University Press, 2006, x+273 pp."ডিওআই:10.5070/l4162005099আইএসএসএন 2379-4542 {{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি journal এর জন্য |journal= প্রয়োজন (সাহায্য)
  2. "style: meaning and definitions"Random House Unabridged Dictionary। Infoplease। ১৯৯৭। সংগ্রহের তারিখ ৪ জানুয়ারি ২০১১
  3. "Definition of style"Oxford Dictionaries Online। Oxford University Press। ২০১০। ৯ সেপ্টেম্বর ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৪ জানুয়ারি ২০১১
  4. International Journal of Humanities and Social Science Invention। Quest Journals।

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]