বিষয়বস্তুতে চলুন

উচ্চতাপসহ ধাতু

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(Refractory metals থেকে পুনর্নির্দেশিত)
H He
LiBe BCNOFNe
NaMg AlSiPSClAr
KCaScTiVCrMnFeCoNiCuZnGaGeAsSeBrKr
RbSrYZrNbMoTcRuRhPdAgCdInSnSbTeIXe
CsBa*LuHfTaWReOsIrPtAuHgTlPbBiPoAtRn
FrRa**LrRfDbSgBhHsMtDsRgCnNhFlMcLvTsOg
 
 *LaCePrNdPmSmEuGdTbDyHoErTmYb
 **AcThPaUNpPuAmCmBkCfEsFmMdNo
  উচ্চতাপসহ ধাতু
  ব্যাপকতর সংজ্ঞানুযায়ী উচ্চতাপসহ ধাতু[]

উচ্চতাপসহ ধাতু বলতে ধাতুসমূহের একটি শ্রেণিকে বোঝায় যেগুলি অস্বাভাবিক উচ্চতাপক্ষয় প্রতিরোধী ধর্ম প্রদর্শন করে। উচ্চতাপসহ ধাতু পরিভাষাটি মূলত উপাদান বিজ্ঞান, ধাতুবিজ্ঞানপ্রকৌশলের প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা হয়। কোন্‌ কোন্‌ মৌলিক পদার্থ এই দলটির সদস্য, তা নিয়ে মতভেদ আছে। সবচেয়ে সাধারণ সংজ্ঞাটিতে ৫টি মৌলিক পদার্থ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে দুইটি পঞ্চম পর্যায়ের (নাইওবিয়ামমলিবডেনাম) এবং তিনটি ষষ্ঠ পর্যায়ের (ট্যানটালাম, টাংস্টেনরেনিয়াম) মৌল। এই দলের সবগুলি ধাতুরই কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। এগুলির প্রতিটির গলনাংক ২০০০° সেলসিয়াসের বেশি এবং কক্ষ তাপমাত্রায় এগুলির কাঠিন্য সুউচ্চ। এগুলি রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় এবং তুলনামূলকভাবে এগুলির ঘনত্ব বেশ উচ্চ। যেহেতু এগুলির গলনাংক উচ্চ, তাই গুঁড়া ধাতুবিজ্ঞানের পদ্ধতি ব্যবহার করে এগুলি থেকে বিভিন্ন উপাদান নির্মাণ করা হয়। উচ্চ তাপমাত্রায় ধাতু নিয়ে কাজকর্ম করার উপকরণ বানাতে, তারের সূত্র বা ফিলামেন্ট, ঢালাইয়ের ছাঁচ এবং মরিচা-উৎপাদী পরিবেশে রাসায়নিক বিক্রিয়ার বাহক হিসেবে এগুলির ব্যবহার আছে। উচ্চতাপসহ ধাতুগুলি অংশত উচ্চ গলনাংকের কারণে অতি উচ্চ তাপমাত্রাজনিত ক্রমবিকৃতির (ক্রিপ Creep) বিরুদ্ধে স্থিতিশীল থাকে।

সংজ্ঞা

[সম্পাদনা]

উচ্চতাপসহ ধাতুর বেশির ভাগ সংজ্ঞাতে অস্বাভাবিক রকম উচ্চ গলনাংককে এই দলের অন্তর্ভুক্তির প্রধানতম আবশ্যকীয় শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একটি সংজ্ঞা অনুযায়ী এই দলের অন্তর্ভুক্ত হতে হলে ধাতুটির গলনাংক ৪০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হওয়া আবশ্যক।[] সবগুলি সংজ্ঞাতেই নাইওবিয়াম, মলিবডেনাম, ট্যানটালাম, টাংস্টেন ও রেনিয়াম এই ৫টি মৌলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।[] এর বিপরীতে আরেকটি ব্যাপকতর সংজ্ঞা আছে, যেটিতে ন্যূনতম গলনাংক ২,১২৩ kelvin (১,৮৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ধরা হয়; এই সংজ্ঞানুযায়ী উপরের পাঁচটি ছাড়াও আরও নয়টি অতিরিক্ত মৌলকে উচ্চতাপসহ ধাতু বলে গণ্য করা হয়; এগুলি হল টাইটানিয়াম, ভ্যানাডিয়াম, ক্রোমিয়াম, জির্কোনিয়াম, হ্যাফনিয়াম, রুথেনিয়াম, রোডিয়াম, অসমিয়ামইরিডিয়াম। কৃত্রিমভাবে প্রস্তুতকৃত মৌলিক পদার্থগুলি তেজস্ক্রিয় বিধায় এগুলিকে কখনোই উচ্চতাপসহ ধাতু হিসেবে গণ্য করা হয় না, যদিও টেকনিশিয়াম মৌলটির গলনাংক ২১৫৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাদার্ফোর্ডিয়ামের সম্ভাব্য গলনাংক ২১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।[]

উচ্চতাপসহ ধাতুসমূহের ধর্মসমূহ
নাম নাইওবিয়াম মলিবডেনাম ট্যানটালাম টাংস্টেন রেনিয়াম
পর্যায়
গলনাংক (কেলভিন)[prop ১] ২৭৫০২৮৯৬৩২৯০৩৬৯৫৩৪৫৯
স্ফুটনাংক (কেলভিন)[prop ২] ৫০১৭৪৯১২৫৭৩১৬২০৩৫৮৬৯
গলনাংক °সে[prop ১] ২৪৭৭২৬২৩৩০১৭৩৪২২৩১৮৬
স্ফুটনাংক °সে[prop ২] ৪৭৪৪৪৬৩৯৫৪৫৮৫৯৩০৫৫৯৬
ঘনত্ব গ্রাম·সেমি−3[prop ৩] ৮.৫৭১০.২৮১৬.৬৯১৯.২৫২১.০২
ইয়ংয়ের গুণাংক গিগাপাস্কাল ১০৫৩২৯১৮৬৪১১৪৬৩
ভিকার্স কাঠিন্য মেগাপাস্কাল ১৩২০১৫৩০৮৭৩৩৪৩০২৪৫০
  1. 1 2 একাধিক তথ্যসূত্র থেকে গৃহীত মৌলসমূহের গলনাংকের ঐকমত্য মান
  2. 1 2 একাধিক তথ্যসূত্র থেকে গৃহীত মৌলসমূহের স্ফুটনাংকের ঐকমত্য মান। টাংস্টেনের স্ফুটনাংকের মানের বিষয়ে ব্যাপক অনৈক্য আছে; দুইটি প্রাথমিক উৎসে ৫৫৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বলে বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
  3. একাধিক তথ্যসূত্র থেকে গৃহীত মৌলসমূহের ঘনত্বের ঐকমত্য মান

উচ্চতাপসহ ধাতুগুলির গলনাংক উচ্চ। টাংস্টেন ও রেনিয়ামের গলনাংক সব ধাতুর মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যগুলির গলনাংক কেবলমাত্র অসমিয়াম ও ইরিডিয়াম অপেক্ষা এবং কার্বনের ঊর্ধ্বপাতন বিন্দু অপেক্ষা কম। এই উচ্চ গলনাংকগুলি দ্বারা এগুলির বেশিরভাগ প্রয়োগ সংজ্ঞায়িত। রেনিয়াম ব্যতীত সবগুলি ধাতুই দেহ-কেন্দ্রিক ঘনক প্রকৃতির; রেনিয়াম ষড়ভুজাকৃতির ঘনসন্নিবিশিষ্ট প্রকৃতির। এই দলের মৌলগুলির বেশির ভাগ ভৌত ধর্ম তাৎপর্যপূর্ণরূপে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে, কেননা এগুলি পর্যায় সারণীর ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীতে অবস্থান করে।[][]

ক্রমবিকৃতি রোধ উচ্চতাপসহ ধাতুগুলির আরেকটি প্রধান ধর্ম। সাধারণত কোনও ধাতুর গলনাংকের সাথে এর ক্রমবিকৃতি সহসম্পর্কিত। যেমন অ্যালুমিনিয়ামের সংকরগুলির ক্রমবিকৃতি ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে শুরু হয়। এর বিপরীতে উচ্চতাপসহ ধাতুগুলির জন্য ক্রমবিকৃতি শুরু করতে কমপক্ষে ১৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আবশ্যক। উচ্চ তাপমাত্রায় বিকৃতির বিরুদ্ধে এইরূপ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে উচ্চতাপসহ ধাতুগুলিকে উচ্চ তাপমাত্রায় শক্তিশালী বলবিশিষ্ট পরিবেশে ব্যবহারের জন্য সুবিধাজনক মনে করা হয়। যেমন জেট ইঞ্জিন কিংবা ধাতুগলন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত উপকরণে।[][]

রাসায়নিক

[সম্পাদনা]

উচ্চতাপসহ ধাতুগুলি বহুবিভিন্ন রাসায়নিক ধর্ম প্রকাশ করে, কেননা এগুলি পর্যায় সারণীর তিনটি স্বতন্ত্র শ্রেণীতে অবস্থান করে। এগুলি সহজেই জারিত হয়ে অক্সাইডে পরিণত হয়। কিন্তু বৃহৎ পরিমাণের ধাতুর ক্ষেত্রে ধাতুর পৃষ্ঠতলে স্থিতিশীল অক্সাইড স্তর গঠিত হয় বলে জারণ বিক্রিয়াটি ধীর হয়ে যায়। তবে রেনিয়ামের অক্সাইডটি ধাতু অপেক্ষা বেশি উদ্বায়ী, তাই উচ্চ তাপমাত্রায় অক্সিজেনের আক্রমণ থেকে স্থিতিশীলতা লোপ পায়, কেননা ঐ তাপমাত্রায় অক্সাইড স্তরটি উবে যায়। সবগুলি ধাতুই অম্ল বা অ্যাসিডের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল।[]

প্রয়োগ

[সম্পাদনা]

উচ্চতাপসহ ধাতুগুলিকে বাতি জ্বালানো, উপকরণ, পিচ্ছিলকারক, পারমাণবিক বিক্রিয়ার নিয়ন্ত্রক দণ্ড, রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রভাবক হিসেবে এবং বিভিন্ন রাসায়নিক ও বৈদ্যুতিক ধর্মের জন্য ব্যবহার করা হয়। যেহেতু এগুলির গলনাংক উচ্চ, তাই এগুলিকে কখনোই ঢালাই পদ্ধতিতে উৎপাদন করা হয় না। এর পরিবর্তে গুঁড়া ধাতুনির্মাণ কৌশল ব্যবহার করা হয়। বিশুদ্ধ ধাতুর গুঁড়াগুলিকে ঠেসে বিদ্যুৎপ্রবাহের সাহায্যে উত্তপ্ত করা হয় এবং এরপরে এগুলির উপরে কোমলায়ন ধাপযুক্ত তাপহীন ধাতুর কাজের মাধ্যমে নির্দিষ্ট রূপদান করা হয়। উচ্চতাপসহ ধাতুগুলিকে তার, পিণ্ড (ইংগট), বলবর্ধক দণ্ড (রিবার), পাত (শিট), পত্রী (ফয়েল), ইত্যাদি রূপ দেওয়া সম্ভব।

মলিবডেনামের সংকরসমূহ

[সম্পাদনা]
মলিবডেনামের কেলাস

টাংস্টেন ও এর সংকরসমূহ

[সম্পাদনা]

নাইওবিয়ামের সংকরসমূহ

[সম্পাদনা]

ট্যান্টালাম ও এর সংকরসমূহ

[সম্পাদনা]

রেনিয়াম সংকরসমূহ

[সম্পাদনা]

সুবিধা ও অসুবিধা

[সম্পাদনা]

উচ্চতাপসহ ধাতু ও সংকরগুলি এগুলির অস্বাভাবিক ধর্মাবলি ও সম্ভাব্য ব্যবহারিক উপযোগিতার কারণে গবেষকদের জন্য খুবই আকর্ষণীয় কেননা

উচ্চতাপসহ ধাতুগুলির (যেমন মলিবডেনাম, ট্যান্টালাম ও টাংস্টেন) ভৌত ধর্মাবলি যেমন তাদের সহতামাত্রা ও উচ্চ তাপমাত্রায় স্থিতিশীলতার কারণে এগুলিকে উত্তপ্ত ধাতুকর্ম ও বায়ুশূন্য চুল্লী প্রযুক্তিতে ব্যবহারোপযোগী উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ধর্মগুলিকে অনেকগুলি বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, যেমন বৈদ্যুতিক বাতিতে ব্যবহৃত টাংস্টেনের সূত্র বা ফিলামেন্ট ৩০৭৩ কেলভিন তাপমাত্রা পর্যন্ত কর্মক্ষম থাকে, আর মলিবডেনাম চুল্লির বেষ্টকগুলি ২২৭৩ কেলভিন পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে।

তবে এর বিপরীতে এগুলিকে নিম্নতাপমাত্রায় উৎপাদন করা দুরূহ এবং উচ্চ তাপমাত্রায় এগুলির জারণযোগ্যতা অত্যুচ্চ। পরিবেশের সাথে আন্তঃক্রিয়া এগুলির উচ্চ-তাপমাত্রায় ক্রমবিকৃতি সহনমাত্রার উপরে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই ধাতুগুলিকে ব্যবহার করার সময় এগুলিকে ঘিরে সুরক্ষামূলক পরিবেশ বা প্রলেপ আবশ্যক।

মলিবডেনাম, নাইওবিয়াম, ট্যান্টালাম ও টাংস্টেনের উচ্চতাপসহ সংকরগুলিকে মহাকাশ পারমাণবিক শক্তি উৎপাদক ব্যবস্থায় প্রয়োগ করা হয়েছে। এই ব্যবস্থাগুলিকে ১৩৫০ কেলভিন থেকে ১৯০০ কেলভিন পরিসীমার তাপমাত্রায় কর্মক্ষম থাকার উদ্দেশ্যে নকশা করা হয়। কোনও অবস্থাতেই পরিবেশের সাথে এই ধাতুগুলির আন্তঃক্রিয়া হতে দেওয়া যাবে না। এ উদ্দেশ্যে তাপ পরিবাহী প্রবাহী হিসেবে তরল ক্ষার ধাতুর পাশাপাশি অত্যধিক বায়ুশূন্য স্থান ব্যবহার করা হয়।

সংকরগুলি যেন সঠিকভাবে কাজ করতে পারে, এজন্য উচ্চ তাপমাত্রায় এগুলির ক্রমবিকৃতি যথাসম্ভব সীমিত রাখা আবশ্যক। ক্রমবিকৃতি ১% থেকে ২% সীমা অতিক্রম করা নিষেধ। উচ্চতাপসহ ধাতুগুলির ক্রমবিকৃতিমূলক আচরণ গবেষণার ক্ষেত্রে একটি অতিরিক্ত জটিলতা বিদ্যমান, যা হল আশেপাশের পরিবেশের সাথে ধাতুগুলির আন্তঃক্রিয়া, যা কিনা তাৎপর্যপূর্ণভাবে ধাতুগুলির ক্রমবিকৃতির উপরে প্রভাব ফেলতে পারে।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. "International Journal of Refractory Metals and Hard Materials"। Elsevier। সংগ্রহের তারিখ ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০
  2. Bauccio, Michael; American Society for Metals (১৯৯৩)। "Refractory metals"। ASM metals reference book। ASM International। পৃ. ১২০–১২২। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮৭১৭০-৪৭৮-৮
  3. Metals, Behavior Of; Wilson, J. W (১ জুন ১৯৬৫)। "General Behaviour of Refractory Metals"। Behavior and Properties of Refractory Metals। পৃ. ১–২৮। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮০৪৭-০১৬২-৪
  4. Davis, Joseph R (২০০১)। Alloying: understanding the basics। পৃ. ৩০৮–৩৩৩। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮৭১৭০-৭৪৪-৪
  5. 1 2 Borisenko, V. A. (১৯৬৩)। "Investigation of the temperature dependence of the hardness of molybdenum in the range of 20–2500 °C"। Soviet Powder Metallurgy and Metal Ceramics (3): ১৮২। ডিওআই:10.1007/BF00775076
  6. Fathi, Habashi (২০০১)। "Historical Introduction to Refractory Metals"। Mineral Processing and Extractive Metallurgy Review২২ (1): ২৫–৫৩। ডিওআই:10.1080/08827509808962488
  7. Schmid, Kalpakjian (২০০৬)। "Creep"। Manufacturing engineering and technology। Pearson Prentice Hall। পৃ. ৮৬–৯৩। আইএসবিএন ৯৭৮-৭-৩০২-১২৫৩৫-৮
  8. Weroński, Andrzej; Hejwowski, Tadeusz (১৯৯১)। "Creep-Resisting Materials"। Thermal fatigue of metals। CRC Press। পৃ. ৮১–৯৩। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮২৪৭-৭৭২৬-৫

আরও পড়ুন

[সম্পাদনা]