বিষয়বস্তুতে চলুন

মানব করোটি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(Human skull থেকে পুনর্নির্দেশিত)
মানব করোটির সম্মুখ দৃশ্য: করোটিকা (লাল) এবং মুখমণ্ডলের অস্থিসমূহ (হলুদ)।

মানব করোটি

মানবদেহের পরিণত করোটি সাধারণত ২২টি অস্থি নিয়ে গঠিত (কর্ণাস্থিসহ ২৮টি)। ম্যান্ডিবল ব্যতীত করোটির অন্যান্য অস্থি সিউচার নামক তন্তুময় সংযোগস্থলের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এই অনড় সংযোগগুলো অস্থিকরণের মাধ্যমে গঠিত হয় এবং শার্পির তন্তু এদের সামান্য নমনীয়তা প্রদান করে।

আটটি অস্থি নিয়ে করোটিকা বা স্নায়ু-করোটিকা গঠিত হয়, যা মস্তিষ্ক ও এর সংবেদনশীল অংশগুলোর জন্য একটি শক্ত সুরক্ষাবর্ম হিসেবে কাজ করে। অপরদিকে চৌদ্দটি অস্থি নিয়ে মুখমণ্ডল বা মুখ-করোটিকা গঠিত হয়। টেম্পোরাল অস্থির অভ্যন্তরে আবৃত অবস্থায় ছয়টি শ্রবণ অস্থিকল বিদ্যমান থাকে।

ল্যারিংসকে সমর্থনকারী হাইঅয়েড অস্থিকে সাধারণত করোটির অংশ হিসেবে গণ্য করা হয় না, কারণ এটি করোটির অন্যান্য অস্থির মতো সরাসরি কোনো অস্থির সঙ্গে যুক্ত নয়।

করোটিতে বিভিন্ন সাইনাস গহ্বর বিদ্যমান, যেগুলো শ্বাসতন্ত্রীয় উপকলার সঙ্গে সংযুক্ত। সাইনাসের সুনির্দিষ্ট কার্যাবলি নিয়ে কিছু মতভেদ থাকলেও সাধারণভাবে মনে করা হয় যে এগুলো করোটির ওজন হ্রাস করে, কণ্ঠস্বরের অনুরণন বৃদ্ধি করে এবং নাসাপথ দিয়ে প্রবেশকারী বায়ুকে উষ্ণ ও আর্দ্র করতে সাহায্য করে।

মেনিঞ্জেস হলো তিন স্তরবিশিষ্ট যোজক কলার আবরণ, যা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে পরিবেষ্টন করে। বাইরে থেকে ভেতরের দিকে স্তরগুলো যথাক্রমে ডুরা মেটার, আরাকনয়েড মেটার এবং পিয়া মেটার নামে পরিচিত। এগুলো মস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জুকে সুরক্ষা প্রদান এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কার্য সম্পাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


করোটির অংশ

[সম্পাদনা]

মানব করোটির প্রধান দুটি অংশ রয়েছে। যথা—

  1. করোটিকা
  2. মুখমণ্ডলের অস্থিসমূহ

করোটিকা

[সম্পাদনা]
মানব করোটির পার্শ্ব দৃশ্য (করোটিকার বিভিন্ন অংশ চিহ্নিত)।

মানবদেহের করোটির গম্বুজাকৃতির অংশকে করোটিকা বলা হয়। করোটিকা ছয় প্রকার অস্থির সমন্বয়ে গঠিত।

অস্থির নামসংখ্যা
স্ফেনয়েড অস্থি১টি
টেম্পোরাল অস্থি১ জোড়া (২টি)
এথময়েড অস্থি১টি
প্যারাইটাল অস্থি১ জোড়া (২টি)
অক্সিপিটাল অস্থি১টি
ফ্রন্টাল অস্থি১টি

অতএব করোটিকার মোট অস্থির সংখ্যা ৮টি।

১. ফ্রন্টাল অস্থি

[সম্পাদনা]

ফ্রন্টাল অস্থি করোটির সম্মুখভাগে অবস্থিত এবং কপাল গঠন করে। এটি চক্ষুকোটরের ছাদ গঠনে অংশগ্রহণ করে। ফ্রন্টাল সাইনাস এই অস্থির অভ্যন্তরে অবস্থিত। জন্মের সময় ফ্রন্টাল অস্থি দুটি অংশে বিভক্ত থাকে এবং সাধারণত ছয় বছরের মধ্যে মেটোপিক সিউচার বন্ধ হয়ে উভয় অংশ একীভূত হয়।

২. প্যারাইটাল অস্থি

[সম্পাদনা]

প্যারাইটাল অস্থি দুটি (একজোড়া) করোটির উপরের ও পার্শ্বীয় অংশের অধিকাংশ গঠন করে। উভয় অস্থি মধ্যরেখা বরাবর স্যাজিটাল সিউচারের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। সামনের দিকে করোনাল সিউচার এবং পিছনের দিকে ল্যাম্বডয়েড সিউচারের মাধ্যমে অন্যান্য অস্থির সঙ্গে সংযুক্ত হয়।

৩. টেম্পোরাল অস্থি

[সম্পাদনা]

টেম্পোরাল অস্থি দুটি করোটির পার্শ্বীয় অংশে অবস্থিত। শ্রবণ ও ভারসাম্য রক্ষাকারী অঙ্গসমূহ এই অস্থির অভ্যন্তরে অবস্থিত। এর ভেতরে ছয়টি শ্রবণ অস্থিকল অবস্থান করে। ম্যান্ডিবলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এটি টেম্পোরোম্যান্ডিবুলার সন্ধি গঠন করে।

৪. অক্সিপিটাল অস্থি

[সম্পাদনা]

অক্সিপিটাল অস্থি করোটির পশ্চাৎ ও নিম্নাংশে অবস্থিত। এতে ফোরামেন ম্যাগনাম নামক বৃহৎ ছিদ্র থাকে, যার মধ্য দিয়ে মেডুলা অবলংগাটা মেরুরজ্জুর সঙ্গে সংযুক্ত হয়। অক্সিপিটাল কনডাইল এই অস্থিতে অবস্থিত এবং এটি প্রথম সার্ভিকাল কশেরুকা (অ্যাটলাস)-এর সঙ্গে সন্ধি গঠন করে।

৫. স্ফেনয়েড অস্থি

[সম্পাদনা]

স্ফেনয়েড অস্থি প্রজাপতি বা বাদুড়ের ন্যায় আকৃতিবিশিষ্ট এবং করোটির ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর একটি বিশেষ অংশ সেলা টার্সিকা, যেখানে পিটুইটারি গ্রন্থি অবস্থান করে। স্ফেনয়েড সাইনাসও এই অস্থির মধ্যে অবস্থিত। করোটির কেন্দ্রীয় অস্থি হিসেবে এটি পরিচিত, কারণ এটি প্রায় সকল করোটীয় অস্থির সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।

৬. এথময়েড অস্থি

[সম্পাদনা]

এথময়েড অস্থি একটি ছিদ্রযুক্ত অস্থি, যা নাসাগহ্বর ও চক্ষুকোটরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এর ক্রিব্রিফর্ম প্লেট অংশের মধ্য দিয়ে ঘ্রাণ স্নায়ুর তন্তুগুলো মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। এথময়েড অস্থি নাসা সেপ্টামের উপরের অংশ এবং ঊর্ধ্ব ও মধ্য নাসাল কনকা গঠনে অংশগ্রহণ করে।


মুখমণ্ডলের অস্থিসমূহ

[সম্পাদনা]

মুখমণ্ডলের অস্থি ৮ প্রকার (মোট ১৪টি)। যথাঃ

অস্থির নামসংখ্যা
ম্যাক্সিলা বা ঊর্ধ্বচোয়াল১ জোড়া (২টি)
ম্যান্ডিবল১টি
জাইগোম্যাটিক অস্থি১ জোড়া (২টি)
ন্যাসাল অস্থি১ জোড়া (২টি)
ল্যাক্রিমাল অস্থি১ জোড়া (২টি)
ভোমার১টি
প্যালেটাইন অস্থি১ জোড়া (২টি)
ইনফেরিয়র ন্যাসাল কনকা১ জোড়া (২টি)

অতএব মুখমণ্ডলের মোট অস্থির সংখ্যা ১৪টি। কাজেই মানব করোটির মোট অস্থির সংখ্যা (৮ + ১৪) = ২২টি।

১. ম্যাক্সিলা বা ঊর্ধ্বচোয়াল

[সম্পাদনা]

ম্যাক্সিলা মুখমণ্ডলের কেন্দ্রীয় অস্থি। এটি ঊর্ধ্বচোয়াল গঠন করে, উপরের দাঁত ধারণ করে, শক্ত তালুর সামনের অংশ নির্মাণ করে এবং নাসাগহ্বর ও চক্ষুকোটরের মেঝের অংশ গঠনে অংশগ্রহণ করে। ম্যাক্সিলারি সাইনাস এই অস্থির অভ্যন্তরে অবস্থিত, যা মানবদেহের বৃহত্তম প্যারান্যাসাল সাইনাস।

২. ম্যান্ডিবল

[সম্পাদনা]

ম্যান্ডিবল বা নিম্নচোয়াল মুখমণ্ডলের একমাত্র চলনক্ষম অস্থি। এতে নিচের দাঁত সংযুক্ত থাকে। টেম্পোরোম্যান্ডিবুলার সন্ধির মাধ্যমে এটি টেম্পোরাল অস্থির সঙ্গে যুক্ত থাকে। চর্বণ, বাক্‌উৎপাদন এবং মুখ খোলা-বন্ধ করার ক্ষেত্রে ম্যান্ডিবলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

৩. জাইগোম্যাটিক অস্থি

[সম্পাদনা]

জাইগোম্যাটিক অস্থি গালের অস্থি নামেও পরিচিত। এটি গালের উঁচু অংশ গঠন করে এবং চক্ষুকোটরের পার্শ্বীয় ও নিম্ন প্রাচীর নির্মাণে অংশগ্রহণ করে। মুখমণ্ডলের আকৃতি নির্ধারণে এর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

৪. ন্যাসাল অস্থি

[সম্পাদনা]

দুটি ন্যাসাল অস্থি একত্রে নাকের সেতু গঠন করে। এগুলো আকারে ছোট ও আয়তাকার। নাকের উপরের দৃঢ় অংশ এই অস্থি দ্বারা গঠিত, আর নিম্নাংশ প্রধানত তরুণাস্থি দ্বারা নির্মিত।

৫. ল্যাক্রিমাল অস্থি

[সম্পাদনা]

ল্যাক্রিমাল অস্থি করোটির ক্ষুদ্রতম ও সূক্ষ্মতম অস্থিগুলোর অন্যতম। এটি চক্ষুকোটরের অভ্যন্তরীণ প্রাচীরে অবস্থিত এবং ন্যাসোল্যাক্রিমাল নালি গঠনে অংশগ্রহণ করে, যার মাধ্যমে অশ্রু নাসাগহ্বরে প্রবাহিত হয়।

৬. ভোমার

[সম্পাদনা]

ভোমার একটি একক অস্থি, যা নাসা সেপ্টামের নিম্ন ও পশ্চাৎ অংশ গঠন করে। এর আকৃতি লাঙলের ফলার অনুরূপ। নাসাগহ্বরকে ডান ও বাম অংশে বিভক্ত করতে এই অস্থির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

৭. প্যালেটাইন অস্থি

[সম্পাদনা]

প্যালেটাইন অস্থি দুটি একত্রে শক্ত তালুর পশ্চাৎ অংশ এবং নাসাগহ্বরের মেঝের পশ্চাৎ অংশ গঠন করে। এগুলো ইংরেজি L অক্ষরের মতো আকৃতিবিশিষ্ট এবং চক্ষুকোটরের মেঝের সামান্য অংশও গঠন করে।

৮. ইনফেরিয়র ন্যাসাল কনকা

[সম্পাদনা]

ইনফেরিয়র ন্যাসাল কনকা একজোড়া বাঁকানো পাতার মতো অস্থি, যা নাসাগহ্বরের পার্শ্বীয় প্রাচীর থেকে ঝুলে থাকে। এগুলো শ্বাসগ্রহণকৃত বায়ুকে ঘূর্ণায়িত করে, উষ্ণ ও আর্দ্র করে এবং ধূলিকণা পরিশোধনে সহায়তা করে। ঊর্ধ্ব ও মধ্য নাসাল কনকা এথময়েড অস্থির অংশ হলেও ইনফেরিয়র ন্যাসাল কনকা একটি স্বতন্ত্র অস্থি।


কর্ণাস্থি

[সম্পাদনা]
মধ্যকর্ণের তিনটি প্রধান অস্থি: ম্যালিয়াস, ইনকাস ও স্টেপিস।

কর্ণাস্থি বা শ্রবণ অস্থিকল মধ্যকর্ণে অবস্থিত ক্ষুদ্র অস্থিসমূহ। প্রতিটি কানে তিনটি করে এবং উভয় কানে মোট ছয়টি অস্থি থাকে। যদিও এগুলো করোটির প্রধান কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত নয়, তবুও করোটির অস্থিসংখ্যা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে প্রায়ই উল্লেখ করা হয়।

অস্থির নামসংখ্যাকাজ
ম্যালিয়াস২টিকর্ণপটহ থেকে কম্পন গ্রহণ করে
ইনকাস২টিম্যালিয়াস থেকে স্টেপিসে কম্পন সঞ্চালন করে
স্টেপিস২টিডিম্বাকৃতি জানালায় কম্পন প্রেরণ করে

প্রত্যেক কানে তিনটি করে মোট ছয়টি কর্ণাস্থি থাকে। স্টেপিস মানবদেহের ক্ষুদ্রতম অস্থি।


সিউচার বা সংযোগস্থল

[সম্পাদনা]
উপর থেকে দেখা করোটির প্রধান সিউচারসমূহ।

সিউচার হলো করোটির অস্থিগুলোর মধ্যকার দৃঢ় তন্তুময় সংযোগস্থল। শৈশবে এগুলো অপেক্ষাকৃত নমনীয় থাকে এবং বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অধিক দৃঢ় ও অস্থিময় হয়ে ওঠে।

প্রধান সিউচারসমূহ:

সিউচারের নামঅবস্থানসংযুক্ত অস্থি
করোনাল সিউচারকপালের পশ্চাতেফ্রন্টাল ও প্যারাইটাল অস্থি
স্যাজিটাল সিউচারমাথার মধ্যরেখা বরাবরদুই প্যারাইটাল অস্থি
ল্যাম্বডয়েড সিউচারমাথার পশ্চাতেপ্যারাইটাল ও অক্সিপিটাল অস্থি
স্কোয়ামাস সিউচারকানের উপরেটেম্পোরাল ও প্যারাইটাল অস্থি
মেটোপিক সিউচারকপালের মধ্যভাগেদুই ফ্রন্টাল অস্থি (শৈশবে)
স্ফেনো-প্যারাইটাল সিউচারকানের সম্মুখেস্ফেনয়েড ও প্যারাইটাল অস্থি

ফন্টানেল

[সম্পাদনা]
নবজাতকের করোটির ফন্টানেলসমূহ (উপরের দৃশ্য)।

নবজাতক শিশুর করোটি জন্মের সময় সম্পূর্ণরূপে অস্থিময় থাকে না। বিভিন্ন অস্থির মধ্যবর্তী স্থানে ঝিল্লিময় নরম অঞ্চল বিদ্যমান থাকে, যেগুলোকে ফন্টানেল বা নরম স্থান বলা হয়। এগুলো প্রসবকালে শিশুর মাথাকে জন্মপথের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে এবং জন্মের পর মস্তিষ্কের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত স্থান প্রদান করে।

প্রধান ফন্টানেলসমূহ

[সম্পাদনা]

১. অ্যান্টেরিয়র ফন্টানেল

এটি করোনাল ও স্যাজিটাল সিউচারের মিলনস্থলে অবস্থিত। আকৃতিতে হীরকের মতো এবং সাধারণত ১৮–২৪ মাস বয়সে বন্ধ হয়ে যায়। এটি সবচেয়ে বৃহৎ ফন্টানেল।

২. পোস্টেরিয়র ফন্টানেল

স্যাজিটাল ও ল্যাম্বডয়েড সিউচারের মিলনস্থলে অবস্থিত। এটি ত্রিভুজাকার এবং সাধারণত জন্মের ৬–৮ সপ্তাহের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়।

৩. স্ফেনয়েড ফন্টানেল

এটিকে অ্যান্টেরোল্যাটেরাল ফন্টানেলও বলা হয়। স্ফেনয়েড অস্থির নিকটে অবস্থিত এবং সাধারণত ছয় মাসের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়।

৪. ম্যাস্টয়েড ফন্টানেল

এটিকে পোস্টেরোল্যাটেরাল ফন্টানেলও বলা হয়। টেম্পোরাল অস্থির পশ্চাৎ অংশে অবস্থিত এবং সাধারণত ১২–১৮ মাসের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়।

চিকিৎসাবিদ্যাগত গুরুত্ব: ফন্টানেল অস্বাভাবিকভাবে স্ফীত হলে করোটির অভ্যন্তরীণ চাপ বৃদ্ধি, যেমন মেনিনজাইটিস বা হাইড্রোসেফালাসের ইঙ্গিত দিতে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত অবনমিত ফন্টানেল পানিশূন্যতার লক্ষণ নির্দেশ করতে পারে।


করোটির প্রধান ফোরামিনা

[সম্পাদনা]
করোটির ভিত্তিতে অবস্থিত প্রধান ফোরামিনাসমূহ।

করোটিতে বহু ছিদ্র বা ফোরামেন বিদ্যমান, যেগুলোর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন স্নায়ু, ধমনী, শিরা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো যাতায়াত করে।

ফোরামেনের নামঅবস্থানঅতিক্রমকারী কাঠামো
ফোরামেন ম্যাগনামঅক্সিপিটাল অস্থিমেডুলা অবলংগাটা, ভার্টিব্রাল ধমনী
অপটিক ক্যানালস্ফেনয়েড অস্থিঅপটিক স্নায়ু (II), অপথ্যালমিক ধমনী
ফোরামেন ওভালেস্ফেনয়েড অস্থিম্যান্ডিবুলার স্নায়ু (V₃)
ফোরামেন রোটান্ডামস্ফেনয়েড অস্থিম্যাক্সিলারি স্নায়ু (V₂)
ফোরামেন স্পিনোসামস্ফেনয়েড অস্থিমধ্য মেনিঞ্জিয়াল ধমনী
জুগুলার ফোরামেনঅক্সিপিটাল ও টেম্পোরাল অস্থিঅভ্যন্তরীণ জুগুলার শিরা, IX, X ও XI করোটীয় স্নায়ু
ক্রিব্রিফর্ম প্লেটএথময়েড অস্থিঘ্রাণ স্নায়ু (I)
অভ্যন্তরীণ শ্রবণ পথটেম্পোরাল অস্থিফেসিয়াল স্নায়ু (VII), ভেস্টিবিউলোকক্লিয়ার স্নায়ু (VIII)
হাইপোগ্লোসাল ক্যানালঅক্সিপিটাল অস্থিহাইপোগ্লোসাল স্নায়ু (XII)
স্টাইলোম্যাস্টয়েড ফোরামেনটেম্পোরাল অস্থিফেসিয়াল স্নায়ুর বহির্গমন পথ

প্যারান্যাসাল সাইনাস

[সম্পাদনা]
প্যারান্যাসাল সাইনাসসমূহের অবস্থান।

প্যারান্যাসাল সাইনাস হলো নাসাগহ্বরের সঙ্গে সংযুক্ত বায়ুপূর্ণ গহ্বরসমূহ। এগুলো শ্বাসতন্ত্রীয় শ্লৈষ্মিক ঝিল্লি দ্বারা আবৃত থাকে।

সাইনাসের নামঅবস্থানবৈশিষ্ট্য
ম্যাক্সিলারি সাইনাসম্যাক্সিলা অস্থিবৃহত্তম; সাইনোসাইটিসে অধিক আক্রান্ত
ফ্রন্টাল সাইনাসফ্রন্টাল অস্থিকপালের অভ্যন্তরে অবস্থিত
এথময়েড সাইনাসএথময়েড অস্থিবহু ক্ষুদ্র বায়ুকোষের সমষ্টি
স্ফেনয়েড সাইনাসস্ফেনয়েড অস্থিকরোটির গভীরতম স্থানে অবস্থিত

সাইনাসের কার্যাবলি

[সম্পাদনা]
  • করোটির মোট ওজন হ্রাস করে
  • কণ্ঠস্বরের অনুরণন বৃদ্ধি করে
  • শ্বাসগ্রহণকৃত বায়ুকে আর্দ্র, উষ্ণ ও পরিশোধিত করে
  • আঘাতের অভিঘাত আংশিক শোষণ করে মস্তিষ্ককে সুরক্ষা প্রদান করে

মেনিঞ্জেস

[সম্পাদনা]

মেনিঞ্জেস হলো তিন স্তরবিশিষ্ট যোজক কলার আবরণ, যা মস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জুসহ সমগ্র কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে পরিবেষ্টন করে এবং সুরক্ষা প্রদান করে।

স্তরের নামবৈশিষ্ট্যকাজ
ডুরা মেটারবহিঃস্তর; পুরু ও দৃঢ়সুরক্ষা প্রদান এবং শিরাস্থ সাইনাস গঠন
আরাকনয়েড মেটারমধ্যস্তর; মাকড়সার জালের ন্যায়সাবআরাকনয়েড স্থানে সেরিব্রোস্পাইনাল তরল ধারণ
পিয়া মেটারঅন্তঃস্তর; অত্যন্ত পাতলামস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জুকে ঘনিষ্ঠভাবে আবৃত করে

আরাকনয়েড ও পিয়া মেটারের মধ্যবর্তী সাবআরাকনয়েড স্থানে সেরিব্রোস্পাইনাল তরল (CSF) অবস্থান করে। এই তরল মস্তিষ্ককে আঘাত থেকে রক্ষা করে, পুষ্টি পরিবহন করে এবং বিপাকীয় বর্জ্য অপসারণে সহায়তা করে।


করোটির বিকাশ

[সম্পাদনা]

ভ্রূণীয় বিকাশ

[সম্পাদনা]

করোটির অস্থিগুলো প্রধানত দুটি পৃথক প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়।

১. ঝিল্লিগত অস্থিকরণ

ফ্রন্টাল, প্যারাইটাল এবং অক্সিপিটাল অস্থির কিছু অংশ সরাসরি ভ্রূণীয় মেসেনকাইম থেকে অস্থিতে রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় কোনো তরুণাস্থীয় মধ্যবর্তী ধাপ থাকে না।

২. তরুণাস্থিজাত অস্থিকরণ

করোটির ভিত্তির অধিকাংশ অস্থি, যেমন স্ফেনয়েড, এথময়েড, টেম্পোরাল এবং অক্সিপিটালের কিছু অংশ প্রথমে তরুণাস্থি হিসেবে গঠিত হয় এবং পরবর্তীতে অস্থিতে পরিণত হয়।

জন্মোত্তর পরিবর্তন

[সম্পাদনা]
  • নবজাতকের করোটিতে ফন্টানেলগুলো নরম ও নমনীয় থাকে।
  • জীবনের প্রথম দুই বছরে মস্তিষ্ক দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং করোটিও প্রসারিত হয়।
  • অধিকাংশ ফন্টানেল দুই বছরের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়।
  • বয়ঃসন্ধিকালে করোটির চূড়ান্ত আকৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় সিউচারগুলো ধীরে ধীরে অধিক অস্থিময় হয়ে ওঠে।

যৌন দ্বিরূপতা

[সম্পাদনা]

প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও নারীর করোটির মধ্যে কিছু গঠনগত পার্থক্য দেখা যায়।

বৈশিষ্ট্যপুরুষনারী
আকার ও ওজনতুলনামূলকভাবে বড় ও ভারীতুলনামূলকভাবে ছোট ও হালকা
কপালকিছুটা পশ্চাৎমুখী ঢালযুক্তঅধিক সোজা ও মসৃণ
ভ্রু তোরণঅধিক প্রকটঅপেক্ষাকৃত কম প্রকট
ম্যান্ডিবলভারী ও চতুষ্কোণাকারসূক্ষ্ম ও অপেক্ষাকৃত গোলাকার
ম্যাস্টয়েড প্রসেসবৃহৎক্ষুদ্র
অক্সিপিটাল প্রোটুবারেন্সসুস্পষ্টকম সুস্পষ্ট
চক্ষুকোটরঅপেক্ষাকৃত চতুষ্কোণাকারঅধিক গোলাকার
নাসিকাসাধারণত বৃহৎ ও প্রশস্তঅপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ও সরু

করোটির কার্যাবলি

[সম্পাদনা]

করোটি মানবদেহে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্য সম্পাদন করে।

১. মস্তিষ্কের সুরক্ষা

করোটির প্রধান কাজ হলো মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের সংবেদনশীল অংশসমূহকে বাহ্যিক আঘাত থেকে সুরক্ষা প্রদান করা।

২. ইন্দ্রিয় অঙ্গের ধারণ ও সুরক্ষা

চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা এবং স্বাদগ্রহণ-সংক্রান্ত কাঠামো করোটির বিশেষ গহ্বর ও কুঠুরির মধ্যে সুরক্ষিত অবস্থায় থাকে।

৩. পেশি সংযুক্তির স্থান প্রদান

মুখ, চোয়াল, ঘাড় এবং চক্ষুর বিভিন্ন পেশি করোটির বিভিন্ন অংশে সংযুক্ত থাকে।

৪. চর্বণ ও বাক্‌উৎপাদন

ম্যান্ডিবল ও সংশ্লিষ্ট কাঠামো খাদ্য চর্বণ, গেলা এবং বাক্‌উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৫. শ্বাসপ্রশ্বাসে সহায়তা

নাসাগহ্বর ও প্যারান্যাসাল সাইনাস বায়ু চলাচলের পথ সৃষ্টি করে এবং শ্বাসগ্রহণকৃত বায়ুকে উষ্ণ, আর্দ্র ও পরিশোধিত করতে সাহায্য করে।

৬. রক্ত ও তরল পরিবহনে সহায়তা

করোটির বিভিন্ন ফোরামেন, নালি ও শিরাস্থ সাইনাসের মাধ্যমে মস্তিষ্কে রক্ত ও অন্যান্য তরলের চলাচল সম্পন্ন হয়।


চিকিৎসাবিদ্যাগত গুরুত্ব

[সম্পাদনা]

সাধারণ রোগসমূহ

[সম্পাদনা]

১. করোটি ভঙ্গ (Skull Fracture)

মাথায় তীব্র আঘাতের ফলে করোটির অস্থি ভেঙে যেতে পারে। প্রধান ধরনগুলো হলো—

  • রৈখিক ভঙ্গ: সরলরেখার ন্যায় ফাটল সৃষ্টি হয়।
  • অবনমিত ভঙ্গ: অস্থির একটি অংশ ভেতরের দিকে দেবে যায়।
  • সিউচারীয় ভঙ্গ: সিউচার বরাবর বিচ্ছেদ বা ফাটল দেখা যায়।
  • ভিত্তিগত ভঙ্গ: করোটির ভিত্তি অংশে ভঙ্গ সৃষ্টি হয়।

২. ক্র্যানিওসাইনোস্টোসিস

এক বা একাধিক সিউচার অকালেই বন্ধ হয়ে গেলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে এবং মাথার অস্বাভাবিক আকৃতি সৃষ্টি হয়। প্রয়োজনে শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে এর সংশোধন করা হয়।

৩. সাইনোসাইটিস

প্যারান্যাসাল সাইনাসের প্রদাহকে সাইনোসাইটিস বলে। এর ফলে মাথাব্যথা, নাসাবন্ধতা, মুখমণ্ডলে ব্যথা এবং জ্বর দেখা দিতে পারে।

৪. মেনিনজাইটিস

মেনিঞ্জেসের প্রদাহকে মেনিনজাইটিস বলা হয়। এটি ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস অথবা ছত্রাকজনিত হতে পারে। এর সাধারণ লক্ষণ হলো তীব্র মাথাব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, জ্বর এবং আলোতে অস্বস্তি। এটি একটি গুরুতর ও জীবন-সংশয়ী অবস্থা।

৫. টেম্পোরোম্যান্ডিবুলার সন্ধি বিকার

চোয়ালের সন্ধিতে সমস্যা দেখা দিলে ব্যথা, চর্বণে অসুবিধা, সন্ধিতে শব্দ হওয়া এবং মুখ খুলতে সমস্যা হতে পারে।

৬. হাইড্রোসেফালাস

মস্তিষ্কে অতিরিক্ত সেরিব্রোস্পাইনাল তরল জমা হলে করোটির অভ্যন্তরীণ চাপ বৃদ্ধি পায়। নবজাতক ও শিশুদের ক্ষেত্রে এর ফলে মাথার আকার অস্বাভাবিকভাবে বড় হতে পারে।

৭. পিটুইটারি অ্যাডেনোমা

পিটুইটারি গ্রন্থিতে টিউমার সৃষ্টি হলে তা দৃষ্টিজনিত সমস্যা এবং বিভিন্ন হরমোনীয় অসামঞ্জস্যের কারণ হতে পারে।


ফরেনসিক গুরুত্ব

[সম্পাদনা]

করোটির গঠন বিশ্লেষণ করে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নির্ণয় করতে পারেন।

  • বয়স নির্ধারণ: দাঁতের বিকাশ, ক্ষয়, সিউচারের সংযোজন এবং অস্থির ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ করে।
  • লিঙ্গ নির্ধারণ: করোটির যৌন দ্বিরূপতার বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে।
  • বংশগত বা জনসংখ্যাগত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ: করোটির আকৃতি, পরিমাপ এবং গঠনগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে।
  • মৃত্যুর কারণ নির্ণয়: আঘাত, ভঙ্গ, গুলিবিদ্ধ ক্ষত বা অন্যান্য চিহ্ন বিশ্লেষণের মাধ্যমে।

বিবর্তন

[সম্পাদনা]

আধুনিক মানব (হোমো স্যাপিয়েন্স)-এর করোটি আদি হোমিনিন প্রজাতিগুলোর তুলনায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে।

  • মস্তিষ্কের আয়তন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে; অস্ট্রালোপিথেকাসে প্রায় ৪৫০ ঘন সেন্টিমিটার থেকে আধুনিক মানুষের ক্ষেত্রে প্রায় ১৩৫০ ঘন সেন্টিমিটার।
  • মুখমণ্ডল তুলনামূলকভাবে ছোট হয়েছে এবং থুতনি সুস্পষ্টভাবে বিকশিত হয়েছে।
  • ভ্রু তোরণ ক্রমশ কম প্রকট হয়েছে।
  • করোটির গোলাকারতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
  • চোয়ালের আকার হ্রাসের পাশাপাশি বাক্‌উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত কাঠামোসমূহ অধিক উন্নত হয়েছে।

সারসংক্ষেপ: মানব করোটির অস্থিসমূহ

[সম্পাদনা]
বিভাগঅস্থির নামসংখ্যা
করোটিকাফ্রন্টাল, প্যারাইটাল (২টি), টেম্পোরাল (২টি), অক্সিপিটাল, স্ফেনয়েড ও এথময়েড৮টি
মুখমণ্ডলম্যাক্সিলা (২টি), ম্যান্ডিবল, জাইগোম্যাটিক (২টি), ন্যাসাল (২টি), ল্যাক্রিমাল (২টি), ভোমার, প্যালেটাইন (২টি), ইনফেরিয়র ন্যাসাল কনকা (২টি)১৪টি
কর্ণাস্থিম্যালিয়াস (২টি), ইনকাস (২টি), স্টেপিস (২টি)৬টি
মোট২৮টি

(কর্ণাস্থি বাদ দিলে মোট ২২টি অস্থি)


তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Gray's Anatomy: The Anatomical Basis of Clinical Practice, ৪১তম সংস্করণ, Elsevier, 2016।
  2. Moore, K. L., Dalley, A. F. এবং Agur, A. M. R. — Clinically Oriented Anatomy, ৮ম সংস্করণ।
  3. Drake, R. L., Vogl, A. W. এবং Mitchell, A. W. M. — Gray's Anatomy for Students, ৩য় সংস্করণ।
  4. Standring, S. (সম্পা.) — Gray's Anatomy, ৪০তম সংস্করণ।
  5. National Institutes of Health (NIH) — MedlinePlus: Skull।
  6. Encyclopaedia Britannica — Human Skull।
  7. বাংলা উইকিপিডিয়া — মানব করোটি।

নিবন্ধটি ধারাবাহিকভাবে হালনাগাদ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে আপনি তথ্য সংযোজন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলা উইকিপিডিয়াকে সমৃদ্ধ করতে পারেন।