বিষয়বস্তুতে চলুন

হানাফী (মাযহাব)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(Hanafi থেকে পুনর্নির্দেশিত)


হানাফি বা আহনাফ বা হানাফি মাযহাব বা ফিকহে হানাফি মাযহাবটিকে তাবেয়ী ইমাম আবু হানিফার (৮০-১৫০ হিজরি) নামের সাথে সম্পর্কিত করা হয়। এটি আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের অন্যান্য মাযহাবের মধ্যে সর্বপ্রাচীন ও সুসংগঠিত মাযহাব।[][][]

হানাফি মাযহাবকে ইসলামের অন্যতম প্রধান প্রচলিত ধারা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মুসলিম বিশ্বে এটিই সবচেয়ে বেশি অনুসৃত মাযহাব। একে 'বিচারকদের মাযহাব'-ও বলা হয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত এবং চার মাযহাবের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন। এই মাযহাবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কেবল ইমাম আবু হানিফার একক মতামতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি, বরং এতে সাহাবিদের মতামতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হানাফি মাযহাবের চিন্তাধারাকে এমন একটি ধারা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা ইসলামী আইনশাস্ত্রের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান এবং সেগুলোকে সুবিন্যস্ত অধ্যায়ে সাজানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে। ইমাম আবু হানিফাই সর্বপ্রথম শরিয়তের জ্ঞানকে বিধিবদ্ধ করেন এবং বিভিন্ন অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেন। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই পরবর্তীতে ইমাম মালিক বিন আনাস তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-মুয়াত্তা সংকলন করেন। ইমাম আবু হানিফার পূর্বে কেউ এই কাজে হাত দেননি। কারণ সাহাবিতাবেয়িগণ শরিয়তের বিধিবিধানগুলো এভাবে অধ্যায়ভিত্তিক শ্রেণীবদ্ধ বা গ্রন্থবদ্ধ করে যাননি; বরং তারা মুখস্থ রাখার ওপরই বেশি নির্ভর করতেন। ইসলামী সভ্যতার বিস্তৃতির সাথে সাথে যখন জ্ঞানের পরিধি চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল, তখন ইমাম আবু হানিফা আশঙ্কা করলেন যে পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো শরিয়তের বিধিবিধান বিকৃত করে ফেলতে পারে। এই আশঙ্কা থেকে তিনি দ্রুত এই শাস্ত্রকে সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেন এবং অধ্যায়ভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ সংকলনে মনোনিবেশ করেন। তিনি প্রথমে পবিত্রতা (তাহারাত) দিয়ে শুরু করেন; এরপর পর্যায়ক্রমে সালাত (নামাজ), অন্যান্য ইবাদত, পারস্পরিক লেনদেন এবং সবশেষে উত্তরাধিকার আইনের আলোচনার মাধ্যমে গ্রন্থটি সমাপ্ত করেন। পরবর্তীকালের ফকিহগণও এই বিন্যাসটি গ্রহণ করেছেন।[][]

ঐতিহাসিকভাবে যেসব দেশে হানাফি মতবাদের অনুসারীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ইরাক, সিরিয়া, সুদান, মিশর, জর্দান, তুরস্ক, আজারবাইজান, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তুর্কিস্তান, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, আলবেনিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা[][][] এছাড়া অন্যান্য আরব ও অনারব দেশেও প্রচুর হানাফি অনুসারী রয়েছেন, তবে সেসব দেশে অন্যান্য মাযহাবের তুলনায় তাদের সংখ্যা কিছুটা কম।

উৎপত্তি ও প্রতিষ্ঠা পর্যায়

[সম্পাদনা]

সময়কাল

[সম্পাদনা]

এই পর্যায়ের সূচনা ইমাম আবু হানিফার যুগ থেকে শুরু হয়ে তার জ্যেষ্ঠ শিষ্য হাসান বিন যিয়াদ আল-লuঅলুয়ির মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয়।

কর্মগুলি

[সম্পাদনা]

এই পর্যায়টি মূলত মাযহাবের ভিত্তি স্থাপন, উসুল (মূলনীতি) নির্ধারণ এবং এর নীতিমালার চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার সময়কাল। এই ভিত্তির ওপর নির্ভর করেই শরিয়তের বিভিন্ন হুকুম-আহকাম ও শাখা-প্রশাখার মাসআলাগুলো বের করা হতো। এই প্রক্রিয়ার অধিকাংশ কাজই ইমামের নিজের হাতে এবং তার প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় সম্পাদিত হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত আইনজ্ঞ শেখ মুহাম্মদ আবু জাহরা এই মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এই কাজে ইমামের পাশাপাশি তার জ্যেষ্ঠ শিষ্যদেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। যেমন, সে যুগে পাঠদানের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফার একটি অনন্য পদ্ধতি ছিল, যা 'সংলাপ ও বিতর্ক পদ্ধতি' নামে পরিচিত। এই পদ্ধতিতে কোনো ফিকহি সমস্যার (মাসআলা) ব্যাপারে প্রথমে পারস্পরিক আলোচনা এবং পরে বহুপক্ষীয় বিতর্ক করা হতো। যতক্ষণ না কোনো একটি বিষয়ে সবাই একমত হতেন, আলোচনা চলত। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে তিনি ইমাম আবু ইউসুফকে তা লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দিতেন।

ইমাম আবু হানিফার পাঠদান পদ্ধতি সম্পর্কে চতুর্দশ শতাব্দীর আইনবিদ ও সাহিত্যিক মুয়াফ্ফিক আল-মাক্কি বলেন: "আবু হানিফা পারস্পরিক পরামর্শের (শূরা) মাধ্যমে তার মাযহাবের ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন। শিষ্যদের বাদ দিয়ে তিনি একাকী কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতেন না। তিনি আল্লাহ, তার রাসুল এবং মুমিনদের কল্যাণ কামনায় সর্বদা নিবেদিত ছিলেন। তিনি একটি একটি করে মাসআলা নির্বাচন করে পরামর্শ সভায় উপস্থাপন করতেন। সবার মতামত শোনার পর নিজের বক্তব্য পেশ করতেন। কখনও কখনও একটি জটিল মাসআলার সমাধান বের করতে এক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেত, যতক্ষণ না সবাই একটি একক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতেন। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে কাজী আবু ইউসুফ তা মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত করতেন। এভাবেই তিনি সমস্ত উসুল বা মূলনীতি লিপিবদ্ধ করেন।" এর ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, আবু হানিফার শিষ্যরা এই আইনগত ভিত্তি স্থাপনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন; তারা কেবল নিষ্ক্রিয় শ্রোতা বা প্রস্তাবের অন্ধ অনুসারী ছিলেন না। তাছাড়া আবু ইউসুফই একমাত্র লিপিকার ছিলেন না, বরং ইমামের মজলিসে দশজন সদস্য নথিভুক্তকরণের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রধান ছিলেন চার শীর্ষ মুজতাহিদ: আবু ইউসুফ, মুহাম্মদ বিন হাসান আশ-শায়বানী, যুফার বিন আল-হুজাইল এবং হাসান বিন যিয়াদ আল-লুঅলুয়ি।

ইমামের মৃত্যুর পর তার এই শিষ্যরা—বিশেষ করে তার দুই প্রধান সহযোগী আবু ইউসুফ ও শায়বানী—মাযহাবের বিকাশ ও পরিমার্জনে ব্যাপক অবদান রাখেন। ইমামের জীবদ্দশায় যেসব মতামতের ওপর তারা নির্ভর করেছিলেন, পরবর্তীতে নতুন দলিল-প্রমাণ এবং জনজীবনের বাস্তব পরিবর্তনের আলোকে তারা সেগুলো পুনঃনিরীক্ষণ ও পুনঃমূল্যায়ন করেন। এই কারণে দেখা যায়, হেজাজ অঞ্চলের আলেমদের কাছে থাকা হাদিস ও আছার সম্পর্কে জানার পর আবু ইউসুফ ও শায়বানী ইমামের পূর্ববর্তী অনেক মতামত থেকে সরে এসেছিলেন। এর ফলে তারা অনেক মৌলিক ও গৌণ মাসআলায় ইমামের মতের ভিন্নতা পোষণ করেছেন। তারা নিজেরাও মুজতাহিদ ছিলেন এবং ইমামের মূলনীতি অনুসরণ করেই ইজতিহাদ করতেন। এ কারণে তাঁদের মতামতকেও আবু হানিফার মতামতের সাথে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এবং এই সমস্ত মতামতই হানাফি মাযহাবের অংশ হিসেবে গণ্য হয়। পরিস্থিতিভেদে কখনও ইমাম আবু হানিফার রায়ের ওপর ভিত্তি করে ফতোয়া দেওয়া হয়, আবার কখনও 'সাহেবাইন' (আবু ইউসুফ ও শায়বানী) বা অন্যদের রায়ের ওপর ভিত্তি করে ফতোয়া দেওয়া হয়।

সম্প্রসারণ, বিকাশ ও প্রসার পর্যায়

[সম্পাদনা]

সময়কাল

[সম্পাদনা]

এই পর্যায়টি ইমাম আল-হাসান বিন জিয়াদ আল-লুঅলুঈর ওফাতের (২০৪ হিজরি) পর থেকে শুরু হয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ কানযুদ দাকাইকের রচয়িতা ইমাম আবুল বারাকাত আন-নাসাফির (মৃত্যু ৭১০ হিজরি) মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয়। অর্থাৎ, এই পর্যায়ের সময়কাল তৃতীয় শতাব্দীর শুরু থেকে সপ্তম শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত।[]

কর্মগুলি

[সম্পাদনা]

হানাফি আইনশাস্ত্রের বিস্তার, প্রসার এবং ইজতিহাদের ব্যাপকতার দিক থেকে এই পর্যায়টি সবচেয়ে উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ সময়। এই পর্যায়ের শুরুতে মাযহাবের এমন অনেক বড় আলেম ও ফকিহের আবির্ভাব ঘটে, যাঁরা মাযহাবের বিভিন্ন মাসআলা সম্পাদনা, পরিভাষা নির্ধারণ এবং 'তারজিহ' (অগ্রাধিকার প্রদান) ও 'তাখরিজ' (উপপাদন) এর নীতিমালা স্পষ্ট করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাছাড়া মুহাম্মদ বিন হাসান শাইবানীর গ্রন্থসমূহ—যা 'জাহিরুর রিওয়ায়াত' নামে পরিচিত—হলো এই মাযহাবের মূল ভিত্তি এবং ইমাম আবু হানিফার মতামতের প্রধান উৎস।[১০]

এই পর্যায়ে যেমন গ্রন্থ রচনা ও সংকলনের কাজ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, তেমনি নতুন নতুন আইনি সমস্যার সমাধান ও ফতোয়া প্রদানের পথও উন্মুক্ত হয়। এই যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো 'মতন' বা 'মুখতাসার' (সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ) জাতীয় গ্রন্থ রচনার সূচনা। যেমন: মুখতাসার আল-তাহাভী, মুখতাসার আল-কারখী, মুখতাসার আল-কুদুরী, বুরহান আল-দীন আল-মারগিনানির 'বিদায়াতুল মুবতাদি' ইত্যাদি। একই সাথে বিস্তারিত ব্যাখ্যাগ্রন্থ (শরাহ ও মুতাওয়িলাত) রচনাও শুরু হয়। যেমন: শামসুল আইম্মাহ সারাখসির আল-মাবসুত, আলাউদ্দিন আল-কাসানীর 'বাদাইউস সানাই', ইমাম মারগিনানির 'হেদায়া' এবং অন্যান্য বৃহৎ গ্রন্থসমূহ। এছাড়াও এ সময় সমসাময়িক সমস্যার সমাধানকল্পে ফতোয়া ও 'নাওয়াজিল' (নতুন উদ্ভূত সমস্যা) বিষয়ক গ্রন্থ রচিত হয়। যেমন: ফকিহ আবুল লাইস সমরকন্দীর 'ফতোয়া আন-নাওয়াজিল', হাসান বিন আলী আল-হালওয়ানির 'আল-ফতোয়া', সদর শহীদের 'আল-ফতোয়া', ইমাম কাজিখানের 'ফতোয়া-ই কাজিখান' ইত্যাদি। এগুলোকে হানাফি ঐতিহ্যের অমূল্য শাস্ত্রীয় সম্পদ মনে করা হয়।[১১]

এ পর্যায়ে, বিশেষ করে চতুর্থ হিজরি শতাব্দীতে, হানাফি মাযহাবের সপক্ষে হাদিসভিত্তিক প্রমাণাদি সংবলিত কিছু গ্রন্থের আবির্ভাব ঘটে, যা 'তা'সিলুল হাদিসি' নামে পরিচিত। যেমন: ইমাম তাহাবীর হাদিস গ্রন্থসমূহ—'শরহু মাআনিল আসার' এবং 'মুশকিলুল আসার'।[১২]

এই যুগে হানাফি মাযহাবের দুটি প্রধান ধারা বা কেন্দ্রের উত্থান ঘটে, যাদের নিজস্ব কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল:

  1. ইরাকি ধারা (মাদরাসাতুল ইরাকিঈন): এর প্রধান ছিলেন আবুল হাসান আল-কারখী। মনে করা হয়, এই ধারাটি ইমাম আবু হানিফা ও তার প্রাথমিক যুগের সঙ্গীদের অনুসৃত পদ্ধতিরই সরাসরি সম্প্রসারিত রূপ।
  2. সমরকন্দ ধারা (মাদরাসাতু সমরকন্দ): এর প্রধান ছিলেন আবু মনসুর আল-মাতুরিদি। এই ধারার বিশেষত্ব হলো, এটি ফিকহের মূলনীতিগুলোকে (উসুল) আকিদার সাথে সম্পর্কিত করে আলোচনা করত, যা একে ইরাকি ধারা থেকে কিছুটা স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছিল।[১২]

স্থিতি পর্যায়

[সম্পাদনা]

সময়কাল

[সম্পাদনা]

এই পর্যায়টি ইমাম নাসাফির মৃত্যুর পর থেকে (৭২০ হিজরি বা অষ্টম হিজরি শতাব্দী) শুরু হয়ে বর্তমান সময় পর্যন্ত চলমান।[১৩]

এই পর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, পূর্ববর্তী যুগের তুলনায় এ সময় ফিকহি চিন্তাভাবনায় কিছুটা স্থবিরতা ও রক্ষণশীলতার প্রাধান্য দেখা যায়। এ যুগের হানাফি ফকিহগণ নতুন কোনো ব্যাখ্যার দিকে না গিয়ে মূলত মাযহাবের প্রাথমিক যুগের মতামত ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। ফলে এ সময়ের অধিকাংশ কাজই ছিল পূর্ববর্তী কাজের অনুকরণ ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ।

এর ফলে মাযহাবের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা, আলোচনা ও স্পষ্টীকরণের কাজ সম্পন্ন হয়, যার মাধ্যমে মাযহাবের ভেতরের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মতামতগুলো স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।[১৪] এই যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল: কোনো মুজতাহিদ ইজতিহাদের যোগ্যতা অর্জন করলেও বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া মাযহাবের প্রতিষ্ঠিত মতের বাইরে যেতেন না; এমনকি তার নিজস্ব ইজতিহাদ যদি মাযহাবের মতের চেয়ে শক্তিশালী দলিলের ওপর ভিত্তি করেও হতো, তবুও তিনি মাযহাবের মতকে প্রাধান্য দিতেন। ইমাম ইবনে আবেদিন শামী ইমাম আবু হানিফার বিখ্যাত উক্তি—'হাদিস যদি সহিহ হয়, তবে সেটিই আমার মাযহাব'—এর ব্যাখ্যায় বলেন: "ইমামের এই শর্তটিকে কেবল তখনই প্রয়োগ করা উচিত যখন মাযহাবের কোনো বক্তব্য সহিহ হাদিসের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়। অন্যথায় মাযহাবের প্রতিষ্ঠিত মত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত হয়ে নতুন ইজতিহাদ করার অনুমতি নেই। আমাদের ইমামগণ এ বিষয়ে একমত, কারণ পূর্ববর্তীদের ইজতিহাদ করার যোগ্যতা পরবর্তীকালের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল।"[১৫]

এর ওপর ভিত্তি করেই হানাফি ফকিহগণ ইমাম কামাল ইবনুল হুমামের কিছু ব্যক্তিগত অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত সিদ্ধান্ত (তারজিহাত) প্রত্যাখ্যান করেন, যাঁকে ইবনে আবেদিন 'মুহাক্কিকদের শিরোমণি' বলে প্রশংসা করেছিলেন। মাযহাবের আলেমগণ তার এমন কিছু মতের ওপর আমল করেননি। এমনকি তার ছাত্র আল্লামা কাসিম বলেছিলেন: "আমাদের শাইখের (ইবনুল হুমাম) এমন সব গবেষণার ওপর আমল করা যাবে না, যা মাযহাবের প্রতিষ্ঠিত মতের সাথে সাংঘর্ষিক।"[১৬]

মাযহাবের মূলনীতি (উসুল)

[সম্পাদনা]

হানাফি মাযহাবে শরিয়তের বিধান নির্ণয়ের প্রধান মূলনীতি তিনটি:[১৭] কিতাবুল্লাহ (কুরআন), সুন্নাহ এবং উম্মতের ইজমা (ঐক্যমত)। আর চতুর্থ নীতিটি হলো কিয়াস (অনুমান)। [১৭] মাওয়ারাউন নাহরের বিখ্যাত আইনবিদ ফখরুল ইসলাম আল্লামা বাযদভী এবং ইমাম হুসামুদ্দিন আল-আখসিখিসি এভাবেই মূলনীতিগুলো নির্ধারণ করেছেন।[১৮]

যদিও ইমাম আবু হানিফা তার মাযহাবের ফতোয়া ও ইজতিহাদের ক্ষেত্রে অনুসৃত বিশদ নিয়মাবলি নিজে গ্রন্থবদ্ধ করে যাননি, তবুও তার বিভিন্ন উক্তি ও বর্ণনা থেকে তার অনুসৃত পদ্ধতি ও সাধারণ মানহাজ (নীতিমালা) স্পষ্টভাবে জানা যায়।[১৯] ইমাম সায়মারি ও খতিব বাগদাদি ইয়াহইয়া বিন দুরাইসের সূত্রে এমন একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন:

আমি সুফিয়ান সাওরিকে দেখলাম, এক ব্যক্তি তার কাছে এসে বলল, 'আপনি কেন আবু হানিফার সমালোচনা করছেন?' তিনি বললেন, 'তার ব্যাপারে আপত্তি কোথায়?' লোকটি বলল, 'আমি তাকে বলতে শুনেছি: আমি প্রথমে আল্লাহর কিতাব (কুরআন) অনুযায়ী সমাধান করি। যদি সেখানে সমাধান না পাই, তবে রাসুলের সুন্নাহর সাহায্য নিই। যদি আল্লাহর কিতাব বা রাসুলের সুন্নাহ—কোনোটিতেই সমাধান না পাই, তবে সাহাবিদের বক্তব্য গ্রহণ করি। সাহাবিদের মধ্যে যার বক্তব্য ইচ্ছা গ্রহণ করি এবং যার ইচ্ছা বর্জন করি, কিন্তু তাঁদের মতামত ছেড়ে অন্য কারও মত গ্রহণ করি না। তবে বিষয়টি যখন ইব্রাহিম নাখয়ী, আমের আশ-শাবি, ইবনে সিরিন, হাসান বসরি, আতা, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের মতো তাবেয়িদের পর্যন্ত পৌঁছায়, তখন তারা যেভাবে ইজতিহাদ করেছেন, আমিও তাঁদের মতোই ইজতিহাদ করি।'

ইয়াহইয়া বিন দুরাইস, আখবার আবি হানিফা ওয়া আসহাবিহ, পৃ. ২৪; তারিখে বাগদাদ, খ. ১৫, পৃ. ৫০২; তাহযিবুল কামাল, ২৯/৪৪৩; আল-ইন্তিকা, পৃ. ১৪২

মুওয়াফ্ফাক আল-মাক্কী তার 'মানাকিবুল ইমাম আবি হানিফা' গ্রন্থে তার পিতার সূত্রে আবদ আল-করিম ইবনে হিলাল থেকে বর্ণনা করেছেন: "আমি আবু হানিফাকে বলতে শুনেছি—যদি আমি কোনো সমাধান আল্লাহর কিতাব বা রাসুলুল্লাহর সুন্নাহে পাই, তবে তা সানন্দে গ্রহণ করি এবং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিই না। আর যখন সাহাবিদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতভেদ হয়, তখন আমি তাঁদের মধ্য থেকে যেকোনো একজনের বক্তব্য বেছে নিই। কিন্তু সাহাবিদের পরবর্তী স্তরের (তাবেয়িদের) ক্ষেত্রে আমি নিজের ইজতিহাদ প্রয়োগ করি।"[২০] ইবনুল মাক্কী সাহল বিন মুজাহিমের সূত্রে আরও বর্ণনা করেন: "আবু হানিফার অনুসৃত পথ ছিল অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও ত্রুটিমুক্ত। তিনি মানুষের কল্যাণ ও প্রচলিত রীতিনীতির প্রতি লক্ষ রাখতেন। কোনো বিষয়ে কিয়াস (সাদৃশ্য) করা হলে এবং তা যদি অনুপযোগী মনে হতো, তবে তিনি ইস্তিহসানের (উত্তম বিকল্প) আশ্রয় নিতেন। ইস্তিহসানও সম্ভব না হলে তিনি মুসলমানদের প্রচলিত সামাজিক লেনদেনের (মুআমালাত) দিকে ফিরে যেতেন। তিনি সুপরিচিত ও সর্বসম্মত হাদিসের ওপর আমল করতেন। এরপর কিয়াস করতেন এবং প্রয়োজনবোধে ইস্তিহসানের দিকে যেতেন। এই দুটির মধ্যে যেটি মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি কল্যাণকর হতো, তিনি সেটিই গ্রহণ করতেন। সাহল বলেন, 'এটাই ছিল আবু হানিফার গভীর জ্ঞান ও কর্মপদ্ধতি।'" [২১] হাসান বিন সালেহ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: "আবু হানিফা নাসিখ ও মানসুখ (রহিতকারী ও রহিত) হাদিসগুলো অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তার সাহাবিদের থেকে প্রমাণিত হাদিসের ওপরই তিনি আমল করতেন। তিনি কুফাবাসীদের মধ্যে হাদিস ও ফিকহের গভীর পণ্ডিত হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং তার অঞ্চলের আলেমদের অনুসৃত নির্ভরযোগ্য মতগুলো কঠোরভাবে মেনে চলতেন।"[২২]

ইমাম আবু হানিফার দৃষ্টিভঙ্গি ও বিধান আহরণের (ইস্তিনবাত) পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীকালের হানাফি ইমামগণ এই মাযহাবের মূলনীতিগুলোকে সুনির্দিষ্ট ও সংজ্ঞায়িত করেছেন। ইমামের অনুসৃত সেই মূলনীতিগুলো নিম্নরূপ:

এটি সমস্ত মূলনীতির মূল এবং সব উৎসের উৎস। শরিয়তের এমন কোনো উৎস নেই, যা প্রমাণিত হওয়ার জন্য কুরআনের দিকে ফিরে আসে না। এটি শরিয়তের প্রধান আলোকবর্তিকা।[২৩] ফিকহের পরিভাষায় 'কিতাব' বলতে কুরআনের সেই আয়াতগুলোকে বোঝায়, যা বিভিন্ন হুকুম-আহকাম এবং হালাল-হারামের সাথে সংশ্লিষ্ট। প্রচলিত মতে, এমন আয়াতের সংখ্যা প্রায় পাঁচশত। কারণ কুরআনের অন্যান্য আয়াতগুলো আকিদা, ইতিহাস (কাসাস) ও উপদেশমূলক বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত।[২৪]

কিতাবের সাথে সম্পৃক্ত

[সম্পাদনা]
  • পূর্ববর্তী উম্মতদের শরিয়ত: আল্লাহ তায়ালা পূর্ববর্তী উম্মতদের যেসব বিধান কুরআনে বর্ণনা করেছেন এবং এই উম্মতের জন্যও তা বহাল রেখেছেন, সেগুলোও কিতাবুল্লাহর অংশ ও মূলনীতি হিসেবে বিবেচিত হয়। যেমন: সুরা মায়েদার ৪৫ নম্বর আয়াত।

এটি শরিয়তের দ্বিতীয় প্রধান উৎস, যা কুরআনের আয়াতসমূহের ব্যাখ্যা ও বিশদ বিবরণ প্রদান করে। ইমাম আবু হানিফা রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে প্রমাণিত সুন্নাহকে সানন্দে গ্রহণ করতেন।[২৫] এর মধ্যে মুতাওয়াতির (বহুল বর্ণিত) ও মশহুর (সুপরিচিত) সুন্নাহর পাশাপাশি 'খবরে ওয়াহিদ' (একক বর্ণনা)-ও অন্তর্ভুক্ত। তবে খবরে ওয়াহিদ যদি কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত সাধারণ নিয়মের (কিয়াস) পরিপন্থী হয়, তবে সতর্কতাবশত কিয়াসকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। হানাফি মাযহাবে কিয়াস হলো এমন সাধারণ নীতি, যার সত্যতা প্রমাণিত এবং শাখা-প্রশাখায় এর প্রয়োগ সুনির্দিষ্ট। এটি কোনো সহিহ হাদিসকে প্রত্যাখ্যান করা নয়, বরং হাদিস গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন মাত্র।[২৬] ইমাম আবু হানিফা হাদিস গ্রহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর শর্ত আরোপ করতেন। কোনো একক বর্ণনা (খবরে ওয়াহিদ) যদি শরিয়তের কোনো সুনিশ্চিত ও সাধারণ নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক হতো, তবে তিনি সেই নিয়মের ওপরই আমল করতেন, যাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ না থাকে।[২৭] তবে সাধারণ নিয়ম হলো, কিয়াসের চেয়ে খবরে ওয়াহিদকেই প্রাধান্য দেওয়া হতো। যেমন আবু যায়েদ আল-দাবুসি বলেছেন: "আমাদের তিন ইমাম—আবু হানিফা, আবু ইউসুফমুহাম্মদ বিন হাসান শাইবানী—এর মূলনীতি হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত খবরে ওয়াহিদ সঠিক কিয়াসের চেয়েও অগ্রাধিকার পাবে।"[২৮]

তবে কোনো হাদিসের যৌক্তিক ব্যাখ্যা (তাওয়িল) থাকলে তিনি বাহ্যিক অর্থ থেকে সরে আসতেন। যেমন ইবনে আবদুল বার বলেছেন: "খবরে ওয়াহিদের ক্ষেত্রে তার ভিন্নমত ছিল মূলত ব্যাখ্যার পার্থক্যের কারণে। তার পূর্বেও অনেকে এমনটি করেছেন, যেমন ইব্রহিম নাখায়ী এবং ইবনে মাসউদের শিষ্যরা।" তিনি আরও বলেন: "উম্মতের কোনো আলেমই রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কোনো প্রমাণিত হাদিসকে বিনা কারণে প্রত্যাখ্যান করেন না। তারা কেবল তখনই তা করেন, যখন হাদিসটি রহিত (মানসুখ) হওয়ার প্রমাণ থাকে, অথবা তার বিপরীতে কোনো ইজমা (ঐক্যমত) থাকে, কিংবা হাদিসের বর্ণনাসূত্রে কোনো ত্রুটি থাকে। কোনো कारण ছাড়া কেউ এমন করলে তার গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হবে।"[২৯]

সুন্নাহর সাথে সম্পৃক্ত

[সম্পাদনা]
  • পূর্ববর্তী উম্মতদের অবিকৃত বিধান: রাসুলুল্লাহ (সা.) যেসব বিধানকে বাতিল করেননি, সেগুলোও সুন্নাহর আলোকে গ্রহণযোগ্য।[২৪]
  • সাহাবায়ে কেরামের মতামত: যেসব বিষয়ে কিয়াসের সুযোগ নেই, সেসব ক্ষেত্রে সাহাবিদের বক্তব্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। সাহাবিদের মধ্যে মতভেদ থাকলে তিনি শরিয়তের মূল চেতনার সবচেয়ে কাছাকাছি মতটি বেছে নিতেন, কিন্তু সাহাবিদের মতের বাইরে যেতেন না। কারণ সম্ভাবনা রয়েছে যে, সাহাবিগণ সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে তা শুনেছিলেন।[৩০]

যদি কোনো বিষয়ে কুরআন বা সুন্নাহতে সরাসরি কোনো সমাধান না পাওয়া যায়, কিন্তু সে বিষয়ে উম্মতের ইজমা (ঐক্যমত) থাকে, তবে তা গ্রহণ করা ওয়াজিব।[৩১] ইমাম আবু হানিফা কিয়াসের চেয়ে ইজমাকে অগ্রাধিকার দিতেন। তিনি বলতেন: "আমরা কিয়াস করি ঠিকই, তবে আমল হবে কিতাব, সুন্নাহ এবং ইজমার ওপর ভিত্তি করেই।"[৩২]

ইজমার সাথে সম্পৃক্ত

[সম্পাদনা]
  • উরফ বা সামাজিক প্রচলন: যখন কুরআন-সুন্নাহর কোনো স্পষ্ট নির্দেশ (নস) বা ইজমা পাওয়া যায় না, এবং কিয়াস বা ইস্তিহসান করাও সম্ভব হয় না, তখন মুসলমানদের প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি ও অভ্যাসের (উরফ) ওপর ভিত্তি করে বিধান দেওয়া হয়। মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাসের মাধ্যমে গড়ে ওঠা রীতির ভিত্তিতে ইস্তিহসান করা বৈধ হলেও কিয়াস করা বৈধ নয়।[৩৩]

যদি পূর্ববর্তী কোনো উৎসে সমাধান না পাওয়া যায়, তবে মুজতাহিদ ইজতিহাদের মাধ্যমে কিয়াস (সাদৃশ্যমূলক অনুমান) করবেন। তবে কিয়াসকে কখনোই কুরআন, সুন্নাহ বা ইজমার ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে না। কোনো বিষয়ে স্পষ্ট হাদিস থাকলে কিয়াস বর্জন করা আবশ্যক। যেমন: রোজা রেখে ভুলে পানাহার করার বিষয়ে আবু হুরায়রা বর্ণিত হাদিসটি কিয়াসের নিয়মের পরিপন্থী হওয়া সত্ত্বেও ইমাম আবু হানিফা হাদিসের ওপরই আমল করেছেন। তিনি বলেছিলেন: "যদি এই হাদিসটি না থাকত, তবে আমি কিয়াস অনুযায়ী ফতোয়া দিতাম।"[৩৪]

কিয়াসের সাথে সম্পৃক্ত

[সম্পাদনা]
  • ইস্তিহসান: এটি এমন এক সূক্ষ্ম প্রমাণ, যা সাধারণ কিয়াসের চেয়ে বেশি শক্তিশালী ও কল্যাণকর। কিয়াস প্রয়োগ করলে যদি মানুষের কষ্ট হয় বা শরিয়তের মূল উদ্দেশ্যের ব্যাঘাত ঘটে, তখন ইস্তিহসান প্রয়োগ করা হয়। ইমামের নিকট ইস্তিহসান কোনো মনগড়া মতবাদ ছিল না, বরং এটি ছিল শরিয়তের মূল চেতনার গভীর প্রয়োগ। আবুল হাসান আল-কারখীর মতে: "কোনো মাসআলায় সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে অধিকতর শক্তিশালী প্রমাণের ভিত্তিতে বিশেষ সমাধান গ্রহণ করাই হলো ইস্তিহসান।"[৩৫]
  • সাহাবিদের যৌক্তিক বক্তব্য: এটিও কিয়াসের সাথে সম্পৃক্ত এবং হানাফি মাযহাবের অন্যতম উৎস হিসেবে গণ্য।

প্রসিদ্ধ হানাফি গ্রন্থসঙ্কলন

[সম্পাদনা]
কিতাব আল-আসার
'কিতাবুল আসার'—মুহাম্মদ বিন হাসান শায়বানী সংকলিত হানাফি মাযহাবের অন্যতম প্রাচীন ও মৌলিক গ্রন্থ।
ফতোয়ায়ে আলমগিরি (যা ফতোয়ায়ে হিন্দিয়্যাহ নামেও পরিচিত)। এটি হানাফি ফিকহের একটি সুবিশাল বিশ্বকোষ। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে শেখ নিজামুদ্দিনের নেতৃত্বে প্রায় ৫০০ ফকিহ এটি সংকলন করেন।
খুলাসাতুল বাহিয়্যাহ
আল-খুলাসাতুল বাহিয়্যাহ ফি মাযহাবিল হানাফিয়্যাহ। হানাফি ফিকহ চর্চায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ, যাতে মাযহাবের ইতিহাস, ইমামদের জীবনী, নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাবলি এবং পরিভাষাসমূহ সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে।
তাতারখানি
ফতোয়ায়ে তাতারখানিয়া। প্রায় ৩০টিরও বেশি গ্রন্থের সমন্বয়ে এটি সংকলিত হয়। এর পৃষ্ঠপোষক তাতার খান ছিলেন অষ্টম হিজরি শতকের ভারতের একজন বিশিষ্ট আমির।

হানাফি মাযহাব বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত ও সর্বাধিক অনুসৃত মাযহাব হওয়ায় এর মতন, মুখতাসার, shরাহ, হাশিয়া ও ফতোয়া গ্রন্থের সংখ্যা অনেক বেশি। এর মধ্যে কিছু গ্রন্থ অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং নির্ভরযোগ্য হিসেবে স্বীকৃত। মাযহাবের আলেমগণ ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে এগুলোর ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেন। হানাফি মাযহাবের পরবর্তীকালের গবেষকগণ, যেমন ইবনে আবেদিন শামী এবং আবদুল হাই লাখনভী, মাযহাবের গ্রন্থগুলোকে নির্ভরযোগ্য, অনির্ভরযোগ্য এবং ফতোয়ার অনুপযোগী—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করেছেন।[৩৬] কোনো কোনো গ্রন্থ অনির্ভরযোগ্য হওয়ার কারণ হলো, সেগুলোতে দুর্বল মতামত (কওলে যয়ীф) ও বিরল মাসআলা (শায) সংকলন করা হয়েছে, যদিও সংকলক নিজে একজন বড় ফকিহ ছিলেন। যেমন: আল-জাহিদী রচিত 'আল-কুনিয়াহ', আবু বকর আল-হাদাদি রচিত 'আস-সিরাজুল ওয়াহহাজ' এবং আলাউদ্দিন আল-হাসকাফি রচিত 'আদ-দুররুল মুখতার'। আবার কিছু গ্রন্থের সংকলকদের নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় সেগুলো নির্ভরযোগ্য হিসেবে গণ্য হয় না। যেমন: 'জামি'উর রামূজ' এর লেখক শামসুদ্দিন আল-কুহেস্তানি এবং 'শরহে কানযুদ দাকাইক' এর লেখক মোল্লা মিসকিন। এছাড়া মাযহাবের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের অনীহাও কোনো কোনো গ্রন্থের গ্রহণযোগ্যতা না থাকার অন্যতম কারণ।[৩৭]

হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থের সংখ্যা অনেক। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো 'জাহিরুর রিওয়ায়াহ' বা মূল canটি গ্রন্থ। হানাফি মাযহাবে এগুলোর মর্যাদা হাদিস শাস্ত্রে বুখারি ও মুসলিমের মতো। কারণ এগুলোই ইমাম আবু হানিফা ও তার প্রধান শিষ্যদের ফিকহি মতামতের মূল উৎস। পরবর্তীকালে ইমাম হাকিম আশ-শাহিদ (মৃ. ৩৩৪ হি.) এই গ্রন্থগুলোকে সংক্ষেপ করে 'আল-কাফি' নামে একটি গ্রন্থ সংকলন করেন।[৩৮]

ইবনে আবেদিন শামী আল্লামা ইমাদুদ্দিন তারতুসির একটি উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন: "সারাখসির মাবসুত গ্রন্থটি যদি জাহিরুর রিওয়ায়াতের পরিপন্থী হয়, তবে তার ওপর আমল করা যাবে না এবং ফতোয়াও দেওয়া যাবে না।"[৩৯]

দ্বিতীয়ত: নির্ভরযোগ্য 'মতন' বা মূল পাঠ্যসমূহ। এগুলো দুই ভাগে বিভক্ত:

  1. মুতাকাদ্দিমিনদের মতনে মুতামাদ।
  2. মুতাআখখিরিনদের মতনে মুতামাদ।

সাধারণত হানাফি মাযহাবের প্রথম তিন ইমামের (আবু হানিফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ) সমসাময়িক আলেমদের 'মুতাকাদ্দিমিন' (পূর্বসূরি) এবং তাঁদের পরবর্তী আলেমদের 'মুতাআখখিরিন' (উত্তরসূরি) বলা হয়। অন্য মতে, হিজরি তৃতীয় শতাব্দীর পূর্বের আলেমগণ মুতাকাদ্দিমিন এবং পরের আলেমগণ মুতাআখখিরিন হিসেবে পরিচিত।

মুতাকাদ্দিমিনদের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে আবু বকর আল-খাসসাফ, ইমাম তাহাবী, হাকিম শহীদ, আবুল হাসান আল-কারখী এবং আবু বকর আল-জাসসাসের সংকলনসমূহ।[৪০] আল্লামা মুতিয়ী বলেন: "ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে প্রথমে জাহিরুর রিওয়ায়াহ এবং এরপর নির্ভরযোগ্য মুখতাসার গ্রন্থগুলোর (যেমন: মুখতাসার আল-তাহাবী, মুখতাসার আল-কারখী) ওপর নির্ভর করা আবশ্যক। কারণ এগুলো অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সংকলন।"[৪১]

মুতাআখখিরিনদের নির্ভরযোগ্য মতনগুলোর ব্যাপারে ইবনে আবেদিন শামী বলেন: "এগুলো হলো বিদায়াতুল মুবতাদি, মুখতাসার আল-কুদুরী, আল-মুখতার, আন-নুকায়াহ, আল-উইকায়াহ, কানযুদ দাকাইক এবং মুলতাকাল আবহুরের মতো নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহ। কারণ এগুলো জাহিরুর রিওয়ায়াহর ওপর ভিত্তি করেই সংকলিত হয়েছে।"[৪২]

মাযহাববিদদের জীবনচরিত পুস্তকাবলি

[সম্পাদনা]

হানাফি মাযহাবের আলেমদের জীবনী ও ইতিহাস নিয়ে রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হলো:

  • আখবার আবি হানিফা ওয়া আসহাবিহ — হুসাইন বিন আলী আল-সায়মারি
  • ওয়াফিয়াতুল আ'য়ান মিন মাযহাবিল নু'মান — নাজমুদ্দিন তারতুসি।
  • তাবাকাতুল ফুকাহাইল হানাফীয়াহ — সালাহুদ্দিন আবদুল্লাহ ইবনুল মুহান্দিস।
  • আল-তাযকিরা — তাকিউদ্দিন আল-মাকরিজি
  • নাযমুল জুমান ফি তাবাকাতি আসহাবি ইমামিনা আল-নু'মান — ইবনে দুকমাক
  • আল-জাওয়াহিরুল মুদ্বিয়াহ ফি তাবাকাতিল হানাফিয়্যাহ — আব্দুল কাদির বিন আবিল ওয়াফা আল-কুরাশি।
  • আল-মিরকাতুল ওয়াফিয়্যাহ ফি তাবাকাতিল হানাফিয়্যাহ — মাজদুদ্দিন ফিরোজাবাদী
  • তাবাকাতুল হানাফিয়্যাহ— ইবনে কাজী শুহবাহ
  • তাবাকাতুল হানাফিয়্যাহ — বদরুদ্দিন আইনি
  • তাবাকাতুল হানাফিয়্যাহ — ইমাম শামসুদ্দিন সাখাভি
  • তাবাকাতুল হানাফিয়্যাহ — আফিফুদ্দিন আল-শারওয়ানি।
  • তাবাকাতুল হানাফিয়্যাহ — শামসুদ্দিন আল-কুনুভী, যিনি ইবনে আজা নামে বেশি পরিচিত।
  • তাবাকাতুল হানাফিয়্যাহ — মুহাম্মদ আল-সাকাফি আল-হালাবি, যিনি ইবনে শিহনাহ সগীর নামে পরিচিত।
  • তাজ আল-তারাজিম ফি তাবাকাতিল হানাফিয়্যাহ — কাসিম বিন কুতলুবুগো
  • আল-তাবাকাতুল সুন্নিয়্যাহ ফি তারাজিমিল হানাফিয়্যাহ — তাকিউদ্দিন আল-গাযযী।
  • আল-আসমার আল-জানিয়্যাহ ফিল আসমাইল হানাফিয়্যাহ — মোল্লা আলী আল-কারী
  • খুলাসাতুল জাওয়াহির ফি তাবাকাতিল আইম্মাতিল হানাফিয়্যাহ আল-আকাবির — শামসুদ্দিন আল-দাগেস্তানি।
  • আল-ফাওয়াইদুল বাহিয়্যাহ ফি তারাজিমিল হানাফিয়্যাহ — আব্দুল হাই লাখনভী

মাযহাবের প্রসিদ্ধ পরিভাষাসমূহ

[সম্পাদনা]

ওলামা সংশ্লিষ্ট পরিভাষাসমূহ

[সম্পাদনা]

এগুলো মূলত দুই প্রকার— শব্দভিত্তিক ও বর্ণভিত্তিক।

শব্দীয় পরিভাষা

[সম্পাদনা]
  1. ইমাম বা ইমামে আজম: এর দ্বারা ইমাম আবু হানিফাকে বোঝানো হয়।
  2. ইমামে সানি: এর দ্বারা ইমাম আবু ইউসুফকে বোঝানো হয়।
  3. ইমামে রব্বানি: ইমাম মুহাম্মদ আল-শায়বানী।
  4. শাইখাইন: এর দ্বারা ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফকে বোঝানো হয়।
  5. তরফাইন: এর দ্বারা ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ আল-শায়বানীকে বোঝানো হয়।
  6. সাহেবাইন: এর দ্বারা ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ আল-শায়বানীকে বোঝানো হয়।
  7. আইম্মায়ে সালাসা: এর দ্বারা তিন ইমাম—আবু হানিফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ আল-শায়বানীকে বোঝানো হয়।
  8. আল-হাসান: ফিকহের গ্রন্থে এর দ্বারা হাসান বিন যিয়াদ লু'লুঈ এবং তাফসির গ্রন্থে হাসান বসরিকে বোঝানো হয়।
  9. সালাফ: ইমাম আবু হানিফা থেকে শুরু করে ইমাম মুহাম্মদের মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের হানাফি আলেমগণ।
  10. খালাফ: ইমাম মুহাম্মদের পর থেকে আল-হালওয়ানি (মৃ. ৪৪৮ হি.) পর্যন্ত সময়ের হানাফি আলেমগণ।
  11. শাইখুনা: 'আদ-দুররুল মুখতার' গ্রন্থে এই শব্দ দ্বারা খাইরুদ্দিন আল-রামলিকে বোঝানো হয়।
  12. আস-সদরুল আওয়াল: ইসলামের প্রথম তিন শতাব্দী।
  13. আল-হাকিম আশ-শাহিদ: 'আল-কাফি' গ্রন্থের প্রণেতা মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ আল-মারওয়াযী (মৃ. ৩৩৪ হি.)।
  14. আল-উস্তায: আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মদ আল-হারেসী (মৃ. ৩৪০ হি.)।
  15. ইমামুল হুদা: 'বাহরুল উলুম' তাফসিরের লেখক ফকিহ আবুল লাইস সমরকন্দী (মৃ. ৩৭৩ হি.)।
  16. ফখরুল ইসলাম: ইমাম আলী বিন মুহাম্মদ আল-বাযদভী (মৃ. ৪৮২ হি.)।
  17. শামসুল আইম্মাহ: 'আল-মাবসুত' গ্রন্থের লেখক শামসুদ্দিন সারাখসী (মৃ. ৪৯০ হি.)।
  18. আস-সদরুশ শহীদ: উমর বিন আবদুল আজিজ বিন মাযাহ (মৃ. ৫৩৬ হি.)।
  19. মুফতিউস সাকালাইন: আবু হাফস উমর বিন মুহাম্মদ আন-নাসাফি (মৃ. ৫৩৭ হি.)।
  20. বুরহানুল ইসলাম: রাজিউদ্দিন আল-সারাখসি (মৃ. ৫৪৪ হি.)।
  21. ইমামযাদা: 'শারআতুল ইসলাম' গ্রন্থের লেখক মুহাম্মদ বিন আবু বকর (মৃ. ৫৭৩ হি.)।
  22. মালিকুল উলামা: 'বাদাইউস সানাই' গ্রন্থের লেখক আলাউদ্দিন আল-কাসানী (মৃ. ৫৮৭ হি.)।
  23. আল-হিসাম আল-আখসীকাসী: 'আল-মুন্তাখাব ফিল উসুল' গ্রন্থের প্রণেতা মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ আল-আখসীকাসী (মৃ. ৬৪৪ হি.)।
  24. তাজুশ শরিয়াহ: 'আল-উইকায়াহ' গ্রন্থের প্রণেতা মাহমুদ বিন আহমদ আল-মাহবুবি (মৃ. ৬৭৩ হি.)।
  25. মুতাআখখিরিন: শামসুদ্দিন আল-হালওয়ানি থেকে শুরু করে হাফিজুদ্দিন আল-বুখারি (মৃ. ৬৯৩ হি.) পর্যন্ত সময়ের আলেমগণ।
  26. সদরুশ শরিয়াহ: 'শরহে উইকায়াহ' গ্রন্থের লেখক উবাইদুল্লাহ বিন মাসউদ আল-মাহবুবি (মৃ. ৭৪৫ হি.)।
  27. আস-সদরুল আকবর বা বুরহানুল আইম্মাহ: আবদুল আজিজ বিন উমর বিন মাযাহ।
  28. আস-সদরুস সাঈদ: তাজুদ্দিন আহমদ বিন আবদুল আজিজ বিন মাযাহ।
  29. আল-মুহাক্কিক: কামাল ইবনুল হুমাম (মৃ. ৮৬১ হি.)।
  30. ইমামুল হারামাইন: এটি দুজন ভিন্ন মাযহাবের ইমামের উপাধি। হানাফি আলেমদের মধ্যে আবুল মুজাফফর ইউসুফ আল-জুরজানি এবং শাফেয়ী আলেমদের মধ্যে আবুল মাআলি আবদুল মালিক আল-জুয়াইনি এই উপাধিতে পরিচিত।

বর্ণীয় পরিভাষা

[সম্পাদনা]
  1. (س): এর দ্বারা ইমাম আবু ইউসুফকে বোঝানো হয়।[৪৩]
  2. (ز): এর দ্বারা ইমাম যুফারকে বোঝানো হয়।[৪৩]
  3. (م): এর দ্বারা মুহাম্মদ বিন হাসান শাইবানীকে বোঝানো হয়।[৪৪]
  4. (سم): এর দ্বারা ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ উভয়কে একসাথে বোঝানো হয়।[৪৩]
  5. (ح): ইবনে আবেদিন শামী তার 'আদ-দুররুল মুখতার' এর হাশিয়ায় আল্লামা আল-হালাবিকে বোঝাতে এই প্রতীক ব্যবহার করেছেন।[৪৫]
  6. (ط): আল্লামা আহমদ বিন মুহাম্মদ আল-তাহতাভীকে বোঝাতে ইবনে আবেদিন এই প্রতীক ব্যবহার করেছেন।[৪৪]

কিতাব ও গ্রন্থনা সম্পর্কিত পরিভাষাসমূহ

[সম্পাদনা]

সবচেয়ে প্রসিদ্ধ পরিভাষাগুলো নিম্নরূপ:

  • মাসাইলুল উসুল বা যাহিরুর রিওয়ায়াহ: এর দ্বারা ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ এবং ইমাম মুহাম্মদ বিন হাসান শাইবানীর থেকে বর্ণিত মৌলিক মাসআলাগুলোকে বোঝায়। ইমাম মুহাম্মদ তার ছয়টি গ্রন্থে এগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন: আল-আসল, আজ-জিয়াদাত, আল-জামেউস সাগির, আল-জামেউল কাবির, আস-সিয়ারুস সাগির এবং আস-সিয়ারুল কাবির। এগুলো নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হওয়ায় এগুলোকে 'জাহিরুর রিওয়ায়াহ' বলা হয়।[৪৬]
  • নাওয়াদির: জাহিরুর রিওয়ায়াহর বাইরে ইমাম আবু হানিফা ও তার শিষ্যদের থেকে বর্ণিত অন্যান্য মাসআলাসমূহ। এগুলো ইমাম মুহাম্মদের অন্যান্য গ্রন্থ (যেমন: কায়সানিয়াত, রুকাইয়াত, হারুনিয়াত) অথবা ইমাম আবু ইউসুফের 'আমালি' ও হাসান বিন যিয়ার 'মুজাররাদ' গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।[৪৭]
  • ফতোয়া, নাওয়াজিল বা ওয়াকিয়াত: পরবর্তীকালের মুজতাহিদগণ সমসাময়িক বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে যেসব ফতোয়া দিয়েছেন, সেগুলোই এই নামে পরিচিত। এতে পূর্বসূরিদের সরাসরি কোনো বর্ণনা থাকে না।[৪৮]
  • আসল: এককভাবে 'আসল' বলা হলে ইমাম মুহাম্মদ বিন হাসান শাইবানীর 'আল-মাবসুত' গ্রন্থটিকে বোঝায়।[৪৯]
  • আল-কিতাব: হানাফি ফকিহদের পরিভাষায় এটি দ্বারা 'মুখতাসারুল কুদুরী' গ্রন্থটিকে বোঝানো হয়।[৫০]
  • আল-মুহিত: সাধারণত বুরহানুদ্দিন আল-বুখারির 'আল-মুহিতুল বুরহানি' গ্রন্থটিকে বোঝায়।[৫১]
  • আল-মাবসুত: এটি দ্বারা ইমাম সারাখসির বিখ্যাত 'আল-মাবসুত' গ্রন্থটিকে বোঝানো হয়।[৫২]
  • আল-মুতুনুস সালাসা (তিনটি মতন): এর দ্বারা তিনটি মৌলিক গ্রন্থকে বোঝায়—'মুখতাসারুল কুদুরী', 'আল-উইকায়াহ' এবং 'কানযুদ দাকাইক'।[৫৩]
  • আল-মুতুনুল আরবাআ (চারটি মতন): পূর্বোক্ত তিনটি গ্রন্থের সাথে 'আল-মুখতার' অথবা 'মাজমাউল বাহরাইন' যুক্ত হয়ে এই চারটিকে একসাথে 'আল-মুতুনুল আরবাআ' বলা হয়।[৫৩]

উল্লেখযোগ্য হানাফি ওলামা

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Hisham M. Ramadan (2006), Understanding Islamic Law: From Classical to Contemporary, Rowman Altamira, আইএসবিএন ৯৭৮-০৭৫৯১০৯৯১৯, pp. 24–29
  2. Gregory Mack, Jurisprudence, in Gerhard Böwering et al (2012), The Princeton Encyclopedia of Islamic Political Thought, Princeton University Press, আইএসবিএন ৯৭৮-০৬৯১১৩৪৮৪০, p. 289
  3. Sunnite Encyclopædia Britannica (2014)
  4. "المذهب الحنفي… المذهب الأكثر انتشاراً في العالم"। مسجد صلاح الدين। ৫ জুন ২০১৫। ৭ মে ২০১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  5. "المذهب الحنفي.. المذهب الأكثر انتشاراً"। بوابة الحركات الإسلامية। ১৭ নভেম্বর ২০১৪। ৭ মে ২০১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  6. Jurisprudence and Law – Islam Reorienting the Veil, University of North Carolina (2009)
  7. Siegbert Uhlig (2005), "Hanafism" in Encyclopaedia Aethiopica: D-Ha, Vol 2, Otto Harrassowitz Verlag, আইএসবিএন ৯৭৮-৩৪৪৭০৫২৩৮২, pp. 997–99
  8. Abu Umar Faruq Ahmad (2010), Theory and Practice of Modern Islamic Finance, আইএসবিএন ৯৭৮-১৫৯৯৪২৫১৭৭, pp. 77–78
  9. আহমদ আলি, ড. মুহাম্মদ ইবরাহিম; ইবনে আবদুল আজিজ আল-হিন্দী, আলি বিন মুহাম্মদ; এবং অন্যান্য (তুর্কি মুহাম্মদ হামিদ আল-নাসর) (২০১২)। "১"। المذهب عند الحنفية والمالكية والشافعية والحنابلة। কুয়েত: আল-ওয়াঈ আল-ইসলামি। পৃ. ৩৬-৬১।
  10. আহমদ আলি, ড. মুহাম্মদ ইবরাহিম; ইবনে আবদুল আজিজ আল-হিন্দী, আলি বিন মুহাম্মদ; এবং অন্যান্য (তুর্কি মুহাম্মদ হামিদ আল-নাসর) (২০১২)। "১"। المذهب عند الحنفية والمالكية والشافعية والحنابلة। কুয়েত: আল-ওয়াঈ আল-ইসলামি। পৃ. ৬২।
  11. انظر: المذهب عن الحنفية، ص: 66 وما بعدها.
  12. 1 2 انظر: المدخل إلى مذهب الإمام أبي حنيفة، ص: 106.
  13. انظر: المذهب عن الحنفية، ص: 37.
  14. انظر: المذهب عن الحنفية، ص: 85.
  15. شرح منظومة عقود رسم المفتي - ضمن رسائل ابن عابدين 24/1.
  16. انظر: شرح منظومة عقود رسم المفتي 24/1، وانظر: المذهب عند الحنفية، ص: 87-88.
  17. 1 2 انظر: المنار للنسفي، ص:١، ونور الانوار للملأ احمد جيون، ص:٧.
  18. انظر: قمر الاقمار حاشية نور الانوار لمحمد عبد الحليم، ص: ٨، حاشية:٤.
  19. انظر: أبو حنيفة: آراؤه وفقهه، ص: 265، المدخل لدراسة الشريعة الإسلامية، ص: 158.
  20. مناقب الإمام الأعظم 80/1.
  21. مناقب الإمام الأعظم 82/1.
  22. مناقب الإمام الأعظم 89/1، 90.
  23. انظر: تاريخ المذاهب الإسلامية، ص: 355.
  24. 1 2 نور الانوار في شرح المنار (আরবি ভাষায়)। حاشية: محمد عبد الحليم। পৃ. ٧।{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: অন্যান্য (লিঙ্ক)
  25. انظر: المدخل إلى مذهب الإمام أبي حنيفة، ص: 118.
  26. انظر: المذهب عن الحنفية، ص: 45.
  27. انظر: أبو حنيفة: آراؤه وفقهه، ص: 337.
  28. تأسيس النظر، ص: 99.
  29. جامع بيان العلم وفضله لابن عبد البر 1080/2. وانظر: تاريخ الفقه الإسلامي لإلياس دردور، ص: 371.
  30. قمر الاقمار حاشية نور الانوار لمحمد عبد الحليم،ص:٩، حاشية:١١.
  31. انظر: المذهب عن الحنفية، ص: 42، والمدخل إلى مذهب أبي حنيفة، ص: 118، وأبو حنيفة: آراؤه وفقهه، ص: 350.
  32. الطبقات السنية في تراجم الحنفية، ص: 146.
  33. المرغيناني: كتاب الهداية في شرح بداية المبتدي، ج:٣، ص:٧٧.
  34. كشف الأسرار للبخاري 559/2، طبقات الحنفية 417/2، الإنصاف للدّهلوي، ص: 91.
  35. انظر: كشف الأسرار 4/4.
  36. رسم المفتي ১৩/১, والنافع الكبير لمن يطالع الجامع الصغير للكنوي، পৃ: ১১.
  37. انظر: النافع الكبير، ص: 11.
  38. رسم المفتي ১/২০, ২১
  39. انظر: رسم المفتي 20/1.
  40. انظر: التعليقات السنية على الفوائد البهية للكنوي، ص: 107.
  41. إرشاد أهل الملة، ص: 351.
  42. رسم المفتي 1/ 36، 37.
  43. 1 2 3 انظر: المذهب الحنفي 1/ 330.
  44. 1 2 انظر: المذهب الحنفي 1/ 331.
  45. انظر: الفتح المبين، ص: 16، والمذهب الحنفي 1/ 329.
  46. انظر: شرح منظومة عقود رسم المفتي 1/ 16.
  47. انظر: رسم المفتي 1/ 16، 17، ومقدمة (عمدة الرعاية في حل شرح الوقاية)، ص: 9.
  48. انظر: الفتح المبين، ص: 12.
  49. انظر: رسم المفتي 1/ 19، مقدمة (عمدة الرعاية)، ص: 9.
  50. انظر: قواعد الفقه لمحمد عميم الإحسان المجدّدي البركتي، ص: 439.
  51. انظر: المذهب الحنفي 1/ 341.
  52. انظر: رسم المفتي 1/ 21.
  53. 1 2 انظر: مقدمة (عمدة الرعاية)، ص: 10.