বিষয়বস্তুতে চলুন

২০২৪ সালের পূর্ব জাজিরা রাজ্য গণহত্যা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
২০২৪ সালের পূর্ব জাজিরা রাজ্য গণহত্যা
সুদানের গৃহযুদ্ধ চলাকালীন যুদ্ধাপরাধ (২০২৩-বর্তমান) অংশ
স্থানপূর্ব জাজিরা স্টেট, সুদান
তারিখঅক্টোবর ২০২৪ – ডিসেম্বর ২০২৪
হামলার ধরনগণহত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, ব্যাপক ধর্ষণ
নিহত8,000+
অপরাধী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস
কারণজাজিরা রাজ্যের কমান্ডার আবু আকলা কিকাল কর্তৃক সুদানি সশস্ত্র বাহিনীতে দলত্যাগের প্রতিশোধ
অন্তত ২৪টি গ্রাম থেকে হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক বাস্তুচ্যুত

২০২৪ সালের পূর্ব জাজিরা স্টেট গণহত্যা বলতে ২০২০ সালের ২০ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF) কর্তৃক জাজিরা স্টেট অত্যন্ত ত্রিশটি সুদানি গ্রামে বেসামরিক নাগরিকদের উপর প্রতিশোধমূলক গণহত্যার ঘটনাকে বোঝানো হয়, যেখানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত বসতিগুলোর মধ্যে আল-সিরিহা, সাফিতা আল-গুনোমাব, জুরকা, ডেইম ইলিয়াস, তাম্বুল, এবং সাকিয়াহ-তে ব্যাপক যৌন সহিংসতা, সম্পত্তির ব্যাপক লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ, এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ধ্বংসের ঘটনাও ঘটে, যার ফলে হাজার হাজার গ্রামবাসী বাস্তুচ্যুত হয়।

প্রেক্ষাপট

[সম্পাদনা]

২০২৩ সালে সুদানের গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আরএসএফ (RSF) কর্তৃক বেসামরিক জনগণের উপর বেশ কয়েকটি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৫ জুন ২০২৪ তারিখে জাজিরা স্টেটের ওয়াদ আল-নূরা গ্রামে দীর্ঘ অবরোধের পর চালানো দুটি আক্রমণ, যার ফলে ১০০ থেকে ২০০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়।[][]

পরবর্তীতে আরএসএফ গালগানি গণহত্যা ঘটায়, যেখানে ১৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে মধ্য সুদানের সেন্নার রাজ্যের একটি গ্রামে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে চালানো একাধিক হামলার পর অন্তত ১০৮ জন নিহত হন,[] যার মধ্যে কমপক্ষে ২৪ জন নারী ও শিশু ছিল।[]

গণহত্যাসমূহ

[সম্পাদনা]

২০২৪ সালের অক্টোবরে, আল-জাজিরা রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া শীর্ষ আরএসএফ (RSF) কমান্ডার আবু আকলা কিকাল সুদানি সশস্ত্র বাহিনীতে দলত্যাগ করেন। এর প্রতিশোধ হিসেবে, বেশ কিছু আরএসএফ জঙ্গি ২০ অক্টোবর ২০২৪ থেকে শুরু করে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে উত্তর ও পূর্ব জাজিরা স্টেট জুড়ে অগ্রসর হতে শুরু করে।[] আর তাদের পথে থাকা বেশ কয়েকটি গ্রাম ও শহর ধ্বংস ও লুণ্ঠন করে। সুদানি ডক্টরস ইউনিয়ন জানিয়েছে যে এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক ধর্ষণ, ভবন ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র লুণ্ঠন এবং একাধিক স্থাপনা পুড়িয়ে দেওয়া ও ধ্বংস করা।[][]

২৪ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে, আরএসএফ জঙ্গিরা জাজিরা রাজ্যের আল-সিরিহা গ্রামে আক্রমণ শুরু করে এবং তিন দিন ধরে হামলা চালিয়ে যায়। ২৯ অক্টোবরের মধ্যে কমপক্ষে ১৪১ জন নিহত হন।[] যার মধ্যে শুধুমাত্র ২৫ অক্টোবরেই পঞ্চাশের বেশি মানুষ মারা যান। শুধু আল-সিরিহা গ্রামেই আরও ২০০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। প্রতিরোধ কমিটিগুলো জানিয়েছে যে সাকিয়াহ গ্রামে অন্তত আরও বারো জন নিহত হয়েছেন এবং আরএসএফ জঙ্গিদের স্নাইপার ফায়ার ও বোমাবর্ষণের কারণে উদ্ধারকর্মী ও চিকিৎসা কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছাতে পারেননি।[][]

জাজিরা সম্মেলন জানিয়েছে যে ত্রিশটি বসতি জুড়ে ৩০০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং চলমান তল্লাশি অভিযান ও টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে মৃতের সংখ্যা অসম্পূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। জুরকাতে আটজন, সাফিতা আল-গুনোমাব-এ চৌদ্দজন এবং মাকনুন-এ তেরো জন, তাম্বুল-এ বারো জন এবং ডেইম ইলিয়াস-এ দুজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। আদ আল-খদ্র গ্রামের একজন জীবিত গ্রামবাসী জানান যে আরএসএফ জঙ্গিরা একজন গ্রামবাসীকে হত্যা করেছে, নির্বিচারে গ্রামে গুলি চালিয়েছে এবং তারপর ফসলের জমিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। অন্তত ২৪টি গ্রাম তাদের জনসংখ্যা সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে, যার ফলস্বরূপ হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।[] ওয়াদ আল-ফাদল-এ ছয়জন এবং আল-ফজ আল-বাশির-এ আটজন মারা যান। আল-ফাওলা আল-আফসা এবং আল-নাসরাব-এও দুজন করে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।[১০] জাতিসংঘ জানিয়েছে যে এই গণহত্যায় অন্তত দশজন শিশু নিহত হয়েছে।[১১]

৬ নভেম্বর, আরএসএফ-এর বিরুদ্ধে আল হিলালিয়া শহরে অন্তত ৮৬ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়, যেখানে তারা ১৩ জনকে গুলি করে হত্যা করে এবং ৭৩ জনকে ইউরিয়া সার মিশ্রিত দূষিত খাবার খাইয়ে বিষক্রিয়ার মাধ্যমে হত্যা করে।[১২][১৩] ১৭ নভেম্বরের মধ্যে শহরটিতে মৃতের সংখ্যা ৫২৭-এ পৌঁছায়।[১৪]

২৭ নভেম্বরের মধ্যে জাজিরা সম্মেলন অনুমান করে যে আরএসএফ-এর গণহত্যায় কমপক্ষে ১,০০০ মানুষ নিহত হয়েছেন।[১৫] ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে এই সংখ্যা ৭,০০০ ছাড়িয়ে যায় (ডিসেম্বর ২০২৩ থেকে সমগ্র জাজিরা রাজ্যে)।[১৬]

প্রভাব

[সম্পাদনা]

গণহত্যা ছাড়াও, জাজিরা স্টেট জুড়ে একাত্তরটি ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার জন্য আরএসএফ-কে দায়ী করা হয়েছে। এর মধ্যে কমপক্ষে তিনজন নাবালক বা নাবালিকা ছিল, যাদের মধ্যে দুজন পরবর্তীতে আঘাতের কারণে মারা যায়।[১৭][১৮] শুধুমাত্র রুফা শহরেই ২১ থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত আরএসএফ-এর হামলার সময় ৩৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।[১৯]

জাতিসংঘ জানিয়েছে যে আরএসএফ-এর হামলার কারণে ২০ অক্টোবর থেকে জাজিরা রাজ্যে অন্তত ১,৩৫,৪০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।[২০] জাজিরা সম্মেলন জানিয়েছে যে ৪০০ গ্রাম সম্পূর্ণভাবে জনশূন্য হয়ে গেছে এবং আরও ১১৫ গ্রাম আংশিকভাবে খালি হয়েছে।[২১]

তদন্ত

[সম্পাদনা]

ট্রানজিশনাল সোভেরেনটি কাউন্সিল অ্যাটর্নি জেনারেল মোহামেদ ইসা তাইফুর-কে গণহত্যাগুলোর বিষয়ে তদন্ত পরিচালনা করার নির্দেশ দিয়েছে।[২২]

প্রতিক্রিয়া

[সম্পাদনা]
  •  জাতিসংঘ: সুদানের সমন্বয়কারী ক্লেমেন্টিন এনকভেটা-সালামি গণহত্যাগুলোর নিন্দা করেছেন এবং বলেছেন, "এগুলো জঘন্য অপরাধ।"[২৩]
  •  মিশর: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং বলেছে যে এটি বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে করা হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করছে।[২৪]
  •  সৌদি আরব: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে আরএসএফ হত্যা ও জখমের কারণ হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। তারা উভয় পক্ষকে জেদ্দা চুক্তি মেনে চলার জন্য অনুরোধ করেছে।[২৫]
  •  কাতার: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে এই হামলাগুলোর মধ্যে নির্মম লঙ্ঘন রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সুদানের সংকটকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন বলে জোর দিয়েছে।[২৫]
  •  যুক্তরাষ্ট্র: স্টেট ডিপার্টমেন্ট-এর মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার বলেছেন "সুদানে নৃশংসতাকে ইন্ধন যোগানকারীদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র তার জরিমানা আরোপ অব্যাহত রাখবে।"[২৬]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. "ماذا حدث في ود النورة بولاية الجزيرة؟.. التفاصيل الكاملة" (আরবি ভাষায়)। ৫ জুন ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ৫ জুন ২০২৪
  2. "إدانات واسعة لـ «الدعم السريع» ..ارتفاع ضحايا مجزرة «ود النورة» بولاية الجزيرة إلى حوالي «200» قتيلاً من المدنيين – صحيفة التغيير السودانية , اخبار السودان" (আরবি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৬ জুন ২০২৪
  3. "More than 100 killed in RSF revenge attack on Sudan village"Radio Dabanga (ইংরেজি ভাষায়)। ১৯ আগস্ট ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ১৯ আগস্ট ২০২৪
  4. "Sudan's paramilitary fighters killed 85 people in an attack on a central village, residents say"AP News (ইংরেজি ভাষায়)। ১৭ আগস্ট ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ১৭ আগস্ট ২০২৪
  5. "Statement by the UN Resident and Humanitarian Coordinator in Sudan, Clementine Nkweta-Salami, on the attacks in Aj Jazirah State - Sudan"ReliefWeb (ইংরেজি ভাষায়)। ২৬ অক্টোবর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ২৬ অক্টোবর ২০২৪
  6. 1 2 "UN official calls for more attention to Sudan's 'forgotten' war amid fresh atrocities"Arab News (ইংরেজি ভাষায়)। ২৬ অক্টোবর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ২৬ অক্টোবর ২০২৪
  7. 1 2 "RSF kill 49 in retaliatory attack on east Al Jazirah villages"Sudan Tribune (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ২৪ অক্টোবর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ২৬ অক্টোবর ২০২৪
  8. "Death toll in Al-Sreiha massacre rises to 141"Sudan Tribune (ইংরেজি ভাষায়)। ২৮ অক্টোবর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ২৯ অক্টোবর ২০২৪
  9. "Dozens killed by paramilitary RSF in Sudan's Gezira, aid groups say"Al Jazeera (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২৬ অক্টোবর ২০২৪
  10. "Death toll mounts in Sudan's Al-Jazirah after RSF fresh retaliatory attacks"Sudan Tribune (ইংরেজি ভাষায়)। ১ নভেম্বর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ১ নভেম্বর ২০২৪
  11. "10 children killed in Sudan's Al Jazirah state violence: UNICEF"Sudan Tribune (ইংরেজি ভাষায়)। ২৮ অক্টোবর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ২৯ অক্টোবর ২০২৪
  12. "Dozens die of mysterious illness in besieged Sudan town" (ইংরেজি ভাষায়)। রয়টার্স। ৭ নভেম্বর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ৭ নভেম্বর ২০২৪
  13. "RSF siege of Sudan's Al-Hilaliya leaves dozens dead"Sudan Tribune (ইংরেজি ভাষায়)। ৬ নভেম্বর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ৭ নভেম্বর ২০২৪
  14. "Death toll in Al Jazirah's village tops 500, over 1 million displaced"Sudan Tribune (ইংরেজি ভাষায়)। ৬ নভেম্বর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ১৯ নভেম্বর ২০২৪
  15. "Death toll in East Al Jazirah exceeds 1,000, says monitoring group"Sudan Tribune (ইংরেজি ভাষায়)। ২৭ নভেম্বর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ২৭ নভেম্বর ২০২৪
  16. "Death toll in Al Jazirah reaches 7,000 as RSF violence continues"Sudan Tribune। ১১ ডিসেম্বর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ১২ ডিসেম্বর ২০২৪
  17. "47 rapes reported in Sudan's Al Jazirah; 11-year-old girl dies"Sudan Tribune (ইংরেজি ভাষায়)। ২ নভেম্বর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ৩ নভেম্বর ২০২৪
  18. "Dozens raped in Sudan's Al Jazirah, child Killed"Sudan Tribune (ইংরেজি ভাষায়)। ১১ নভেম্বর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ১২ নভেম্বর ২০২৪
  19. "37 rapes reported in Sudan's Rufaa amid RSF rampage"Sudan Tribune (ইংরেজি ভাষায়)। ২৬ অক্টোবর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ২৭ অক্টোবর ২০২৪
  20. "Over 135,000 people displaced by violence in Al Jazirah State: OCHA"Sudan Tribune (ইংরেজি ভাষায়)। ৫ নভেম্বর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ৫ নভেম্বর ২০২৪
  21. "RSF Attacks Empty Hundreds of Villages in Sudan's Al Jazirah State"Sudan Tribune (ইংরেজি ভাষায়)। ৬ নভেম্বর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ৬ নভেম্বর ২০২৪
  22. "Sudan orders prosecution of RSF for East Al Jazirah abuses"Sudan Tribune (ইংরেজি ভাষায়)। ২৭ অক্টোবর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ২৮ অক্টোবর ২০২৪
  23. "UN condemns 'horrific' crimes by Sudanese paramilitary force"। ২৬ অক্টোবর ২০২৪।
  24. "Egypt condemns RSF attacks in Sudan's al Jazirah"। ৩০ অক্টোবর ২০২৪।
  25. 1 2 "Saudi Saudi Arabia, Qatar condemn violence against civilians in Sudan's Al Jazirah State"Sudan Tribune। ২ নভেম্বর ২০২৪।
  26. "US condemns attacks on civilians by Sudan's RSF, calls for them to stop"The Star (ইংরেজি ভাষায়)। ৩০ অক্টোবর ২০২৪।