১৯৯০-এর বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান

১৯৯০ সালে অক্টোবরের শেষে এবং নভেম্বরের প্রথম দিকে ভারতের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে এই গুজব ছড়িয়ে বাংলাদেশে বাঙালি হিন্দুদের বিরুদ্ধে  একটি ধারাবাহিক আক্রমণ ও নৃশংসতার সূচনা করে মুসলিমরা।হিন্দুদের উপর ৩০ অক্টোবর থেকে নির্মম নৃশংসতা শুরু হয় এবং বিরতিহীন ভাবে ২ নভেম্বর পর্যন্ত চলতে থাকে।[১]

পটভূমি[সম্পাদনা]

১৯৭১ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে কয়েক বছরের মধ্যেই ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি ক্রমেই দুর্বল হতে শুরু করে। ১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামিক রাষ্ট্রসংস্থার সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের যোগদান থেকেই এই প্রক্রিয়ার সূচনা।[২] কিন্তু এক্ষেত্রে প্রথম মৌলিক পরিবর্তন ঘটে সামরিক বাহিনীর প্রধান এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে (১৯৭৭-১৯৮১), যখন বাংলাদেশের সংবিধানে কোরআনের বাণী ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ সংযোজন করা হয় এবং সকল রাষ্ট্রীয় কার্যের শুরুতেই এই বাণী পাঠের বিধান চালু হয়। [২] জিয়াউর রহমানের ইসলামী ব্যবস্থা আরও এগিয়ে যায় যখন সামরিক শাসিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮৮ সালে একটি সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন।[২][৩][৪] এই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে মুসলমান কর্তৃক বাঙ্গালী হিন্দু সহ অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর উপর পীড়ন মাত্রা তীব্রতর হয়।ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যার 'রাম মন্দির' বিতর্ককে কেন্দ্র করে ১৯৮৯ সালে একটি হিন্দু বিরোধী প্রোগ্রাম শুরু হয় যার ফলশ্রুতিতে অত্যন্ত বৃহৎ পরিসরে হিন্দুদের মন্দির ধ্বংস ও হিন্দুদের উপর নির্যাতন শুরু হয়।

১৯৯০ সালের ২৯ অক্টোবর,বাংলাদেশের ইসলামী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী অর্থায়িত সংবাদপত্র 'দৈনিক ইনকিলাবের' শিরোনাম ছাপায় 'বাবরী মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে'।[৫] ফলে সমগ্র বাংলাদেশ ব্যাপী বাবরী মসজিদ ধ্বংসের গুজব রটানো হয়। আর এতেই সবার দুশ্চিন্তার পারদ সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছে যায়।

আক্রমণ [সম্পাদনা]

ঢাকা [সম্পাদনা]

চট্টগ্রাম[সম্পাদনা]

অন্যান্য জায়গা[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ছাড়াও কমপক্ষে ১২ টি শহরের হিন্দুরা সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার হয়ে।[৬]যশোর,নড়াইল,গাইবান্ধা,ময়মনসিংহ,সুনামগঞ্জ,সিলেটের হিন্দুদের উপর মারাত্মক নির্যাতনের সংবাদ দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।[৭]

ফলাফল[সম্পাদনা]

১৯৯০ সালে বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচারের ফলে অনেক জায়গা হিন্দু শুন্য হয়ে যায় এবং বহুস্থানের হিন্দুরা বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ে।চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর হিন্দুরা সহায়-সম্বল,বাড়ি-ঘর সব হারিয়ে পাহাড়ের উপর কৈবল্যধাম মন্দিরের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহন করে।সেখানে কমপক্ষে ৫০০ টি হিন্দু পরিবার আশ্রয় নিয়ে তাদের জীবন রক্ষা করে।ভোলা জেলার দৌলতখান উপজেলার চরপাতা ইউনিয়নের নলগোড়া গ্রামের সাধু সিংয়ের বাড়িতে ছয়টি পরিবার ছিল যারা সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ভারতে পাড়ি দিয়ে জীবন ও সম্মান রক্ষা করে।১৯৯০ ও ১৯৯২ সালের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ভোলা জেলার হাজার হাজার হিন্দু বাস্তুচ্যুত হয় এবং পালিয়ে চলে যায়।ফলে হিন্দু অধ্যুষিত ভোলা জেলা প্রায় হিন্দুশূন্য বর্তমানে।[৮]বাংলাদশের প্রতিটি হিন্দু প্রধান অঞ্চলে হত্যা,ধর্ষণ,হিন্দুদের বাড়ি-ঘর-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লুটপাট,মন্দির-ধর্মস্থান ধ্বংসসহ সকল ধরণের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস করে মুসলিমরা।ফলে সারা দেশ ব্যাপী অনেক হিন্দু জীবনের নিরাপত্তার জন্য তাদের জায়গা,সম্পত্তি,বাড়ি-ঘর ছেড়ে ভারতে আশ্রয়ের জন্য পালিয়ে চলে যায়।১৯৪৬,১৯৫০,১৯৬৪,১৯৭১ সালের পর আবারো একটি বড় ধরণের বাঙালি হিন্দু শরণার্থীর স্রোত আছড়ে পড়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে।[৯][১০]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Azad, Salam (২০০১)। হিন্দু সম্প্রদায় কেন বাংলাদেশ ত্যাগ করছে? [Why Are The Hindus Migrating From Bangladesh] (Bengali ভাষায়) (1st সংস্করণ)। Kolkata: Punascha। পৃ: 60–64। 
  2. রাষ্ট্র ও ধর্মঃবাংলাপিডিয়া
  3. তবু কেন রাষ্ট্রধর্ম-প্রথম আলো
  4. ধর্মীয় রাষ্ট্রই হোক বাংলাদেশ
  5. Roy, Debajyoti (2005) [2001]. Kena udbāstu hate hala কেন উদ্বাস্তু হতে হল [Why Did We Become Refugees] (in Bengali). Kolkata: Shyamaprasad De Pal. p. 93. OCLC 924172721.
  6. Hossain, Farid (2 November 1990). "Two Killed, 350 Injured in Anti-Hindu Violence". Associated Press. Retrieved 16 November 2012.
  7. Hossain, Farid (1 November 1990). "Anti-Hindu Violence in Bangladesh Leaves One Dead". Associated Press. Retrieved 16 November 2012.
  8. ১০ বছরে ৯ লাখ হিন্দু কমেছে-দৈনিক প্রথমআলো
  9. সংখ্যালঘুদের স্বার্থ দেখবে কে?-দৈনিক যুগান্তর
  10. সংখ্যালঘুরা দেশ ছাড়বে, কেন ছাড়বে?-দৈনিক প্রথমআলো