হেরম্বগণেশ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
হেরম্বগণেশ
Heramba Ganapati.JPG
হেরম্বগণেশ, দ্য প্রিন্স অফ ওয়েলস মিউজিয়াম, মুম্বই। এই মূর্তিটি খ্রিস্টীয় ১৯শ শতাব্দীতে নেপালে নির্মিত হয়েছিল
দেবনাগরীहेरम्बा गणपति
হেরম্বগণেশ ও তাঁর পত্নী, নেপাল (১৯শ শতাব্দী)।

হেরম্বগণেশ বা হেরম্ব (সংস্কৃত: हेरम्ब, Heraṃba) হলেন হিন্দু দেবতা গণেশের (গণপতি) পঞ্চমুণ্ডবিশিষ্ট মূর্তি। ইনি হেরম্বগণপতি নামেও পরিচিত। নেপাল রাষ্ট্রে এই মূর্তিটি বিশেষ জনপ্রিয়।[১] গণেশের তান্ত্রিক উপাসনায় এই মূর্তিটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। হেরম্বগণেশ হলেন গণেশের ৩২টি জনপ্রিয়তম রূপের অন্যতম।

বিশেষণ[সম্পাদনা]

মুদ্গলপুরাণ গ্রন্থে ‘হেরম্বগণপতি’ নামটি হল গণেশের ৩২টি নামের অন্যতম। স্কন্দপুরাণ গ্রন্থে হেরম্ববিনায়ককে বারাণসীর নিকটস্থ ৫৬ জন বিনায়কের অন্যতম বলা হয়েছে। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ (৮টি নাম), পদ্মপুরাণ (১২টি নাম) ও চিন্ত্যাগম (১৬ গণপতি) গ্রন্থে গণেশের যে নামের তালিকা পাওয়া যায়, তাতে হেরম্ব নামটি অন্যতম।[২] গণেশপুরাণ গ্রন্থেও গণেশের একটি বিশেষণ হল হেরম্ব।[৩]

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ গ্রন্থে ‘হেরম্ব’ শব্দটির অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ‘হে’ অক্ষরের মাধ্যমে অসহায়তা বা দুর্বলতা বোঝায় এবং ‘রম্ব’ শব্দটির মাধ্যমে দুর্বলকে রক্ষা করা ও তাদের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা বোঝায়। অর্থাৎ ‘হেরম্ব’ শব্দের অর্থ ‘দুর্বলের রক্ষাকর্তা’।[৪]

মূর্তিতত্ত্ব[সম্পাদনা]

হেরম্বগণেশ, শ্রীতত্ত্বনিধি গ্রন্থের পুথিচিত্র (১৯শ শতাব্দী)।
১৮শ শতাব্দীর পূর্বভাগের মেওয়ার চিত্রকলায় হেরম্বগণেশ

হেরম্বগণেশের মূর্তিতে পাঁচটি হস্তিমুণ্ড দেখা যায়। চারটি চার প্রধান দিকে মুখ করা এবং পঞ্চম মস্তকটি উপরের দিকে মুখ করা অবস্থায় থাকে।[৪] হেরম্বগণেশের পাঁচটি মস্তকের বর্ণ তার পিতা শিবের পাঁচ রূপভেদ ঈশান, তৎপুরুষ, অঘোর, বামদেব ও সদ্যোজাতের গাত্রবর্ণের অনুরূপ। এই পাঁচটি মস্তক শক্তির প্রতীক।[১] তার গাত্রবর্ণ স্বর্ণাভ হলুদ।[৪] কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার গায়ের রং সাদা।[৫]

হেরম্বগণেশের বাহন সিংহ।[৪] সিংহবাহন হেরম্বগণেশের রাজকীয় সত্ত্বা ও দুর্ধর্ষ প্রকৃতির প্রতীক।[১] কথিত আছে, এই বাহনটি তার মা পার্বতীর বাহন। পার্বতীর থেকেই তিনি এই বাহনটি পেয়েছেন।[১][৬] সিংহ বাহন হলেও, কোনো কোনো মূর্তিতে গণেশের নিজস্ব বাহন মুষিককেও (ইঁদুর) সঙ্গে দেখা যায়। ১১শ-১৩শ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে ওড়িশায় নির্মিত একটি মূর্তিতে হেরম্বগণেশের আসনের পাশে একটি ইঁদুর দেখা যায়। নেপালের ভক্তপুরে নির্মিত একটি মূর্তিতে দেখা যায়, হেরম্বগণেশ দুটি ইঁদুরের উপর দাঁড়িয়ে আছেন। নেপালে হেরম্বগণেশকে সাধারণত সিংহ ও ইঁদুরের সঙ্গে দেখা যায়।[৬]

মূর্তিতত্ত্ব-সংক্রান্ত শাস্ত্রগুলিতে হেরম্বগণেশের দশটি হাতের উল্লেখ আছে। তিনি একটি পাশ, দন্ত (নিজের ভগ্নদন্ত), অক্ষমালা, একটি পরশু (যুদ্ধের কুঠার), তিনমাথাওয়ালা মুগুর ও একটি মোদক ধরে থাকেন। দুটি হাত দেখা যায় বরদামুদ্রা (বরদানকারী ভঙ্গিমা) ও অভয়মুদ্রায় (অভয়দানকারী ভঙ্গিমা)।[৪] অন্যান্য বিবরণ অনুসারে, তার হাতে একটি মালা ও একটি ফল থাকে।[৫] কোনো কোনো মূর্তিতে তার হাতে একটি অঙ্কুশ থাকে।[৪] কোনো কোনো মূর্তিতে আবার দেখা যায়, হেরম্বগণেশের কোলে তার স্ত্রী বসে আছেন এবং হেরম্বগণেশ তাকে আদর করছেন।[১]

পূজা[সম্পাদনা]

হেরম্বগণেশ হলেন দুর্বলের রক্ষাকর্তা। তিনি নির্ভীকতা ও শত্রুকে জয় বা ধ্বংস করার শক্তি প্রদান করতে পারেন।[৭][৮]

গণেশের তান্ত্রিক পূজায় হেরম্বগণেশ জনপ্রিয়। হৈরম্ভ বা হেরুম্ব সম্প্রদায় নামে একটি তান্ত্রিক সম্প্রদায়ে একজন দেবী বা শক্তি সহ হেরম্বগণেশ পূজিত হন। এই দেবীকে তার স্ত্রী মনে করা হলেও সাধারণভাবে তাকে তার মা পার্বতীই মনে করা হয়।[৯] হেরম্বগণেশ ছয়টি অভিচার ক্রিয়ার (অশুভ উদ্দেশ্যে মন্ত্রের প্রয়োগ) সঙ্গে যুক্ত। মনে করা হয়, তার মন্ত্র উচ্চারণ করে মন্ত্র-উচ্চারণকারী নিজের শত্রুকে মোহগ্রস্থ করতে পারেন, আকর্ষণ করতে পারেন, ঈর্ষান্বিত করতে পারেন, বশ করতে পারেন, অসার করতে পারেন বা হত্যা করতে পারেন।[১]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Royina Grewal (২০০৯)। Book of Ganesha। Penguin Books Limited। পৃষ্ঠা 67–8। আইএসবিএন 978-93-5118-091-3 
  2. Grimes, John A. (১৯৯৫), Ganapati: Song of the Self, SUNY Series in Religious Studies, Albany: State University of New York Press, পৃষ্ঠা 52–59, আইএসবিএন 0-7914-2440-5 
  3. Greg Bailey (২০০৮)। Gaṇeśapurāṇa: Krīḍākhaṇḍa। Otto Harrassowitz Verlag। পৃষ্ঠা 656। আইএসবিএন 978-3-447-05472-0 
  4. Rao, T.A. Gopinatha (১৯১৬)। Elements of Hindu Iconography। 1: Part I। Madras: Law Printing House। পৃষ্ঠা 46–7, 57, 65। 
  5. Satguru Sivaya Subramuniyaswami। Loving Ganesha। Himalayan Academy Publications। পৃষ্ঠা 69। আইএসবিএন 978-1-934145-17-3 
  6. Alexandra Anna Enrica van der Geer (২০০৮)। Animals in Stone: Indian Mammals , Sculptured Through Time। BRILL। পৃষ্ঠা 78, 81, 335, 345। আইএসবিএন 90-04-16819-2 
  7. T.K.Jagannathan। Sri Ganesha। Pustak Mahal। পৃষ্ঠা 104। আইএসবিএন 978-81-223-1054-2 
  8. Martin-Dubost, Paul (১৯৯৭), Gaņeśa: The Enchanter of the Three Worlds, Mumbai: Project for Indian Cultural Studies, পৃষ্ঠা 158, আইএসবিএন 81-900184-3-4 
  9. Roshen Dalal (২০১৪)। Hinduism: An Alphabetical Guide। Penguin Books Limited। পৃষ্ঠা 470। আইএসবিএন 978-81-8475-277-9