বিষয়বস্তুতে চলুন

হিমাচল প্রদেশের ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্যের তালিকা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

হিমাচল প্রদেশের ঐতিহ্যবাহী লোক নৃত্যগুলি অতন্ত্য জটিল। নৃত্যগুলি হিমাচলের উপজাতি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই নৃত্যকলা সমূহ হিমাচলের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে। হিমাচলে প্রদেশে নৃত্য ছাড়া সাধারন্ত কোন উতসবই পালিত হয়না। হিমাচলে নাটি ইত্যদি নৃত্যকলা আঞ্চলিকভাবে পরিবেশিত হয়।

দেব নাটি হল ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিম ও মধ্য পাহাড়ে প্রচলিত একটি ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য। [১] এটি মূলত হিমাচল প্রদেশ রাজ্যের স্থানীয় নৃত্যকলা। নাটি হিমাচল প্রদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত নৃত্য। এটি গিনেস বিশ্ব রেকর্ড বইয়ে বৃহত্তম লোকনৃত্য হিসেবে তালিকাভুক্ত। মূলত সিমলা, মান্ডি, সোলান, সিরমৌর, কিন্নৌর এবং কুলু অঞ্চলে এই নৃত্যকলার উতপত্তি। সমগ্র রাজ্য জুড়ে এবং চণ্ডীগড়েও এই নৃত্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেখানে হিমাচলের তরুণরা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এটি পরিবেশন করত। নাটি নৃত্য বিবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয়। হিমাচল প্রদেশ (এইচপি) -এর বিবাহ এবং মেলার সময় এই নৃত্য পরিবেশিত হয় ।

ইতিহাস

[সম্পাদনা]

হিমাচলী এক বিশেষ নৃত্যধারা রাসলীলার অনুরূপ। এটি কৃষ্ণ এবং তাঁর গোপীদের সম্মানে বিকশিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া, এটি চন্দ্রাবলীর বিনোদনমূলক নাটকগুলিরও প্রতীক। ঐতিহ্য অনুসারে, এই নৃত্য শুধুমাত্র পুরুষদের দ্বারা পরিবেশন করার প্রথা রয়েছে।

নাটি লোকনৃত্যে ব্যবহৃত পোশাক

[সম্পাদনা]

যদিও ঐতিহ্যগতভাবে নাটি নৃত্যশৈলী পুরুষ প্রধান, তবে আজকাল এটি মহিলারা এই নৃত্য পরিবেশন করেন। তাই নৃত্যকরদের পরিধানের পোশাক সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়:

পুরুষদের জন্য ব্যবহৃত পোশাকের মধ্যে প্রধানত সজ্জিত টুপি, স্যাশ, চুড়িদার এবং চোল নামক ঘূর্ণায়মান বস্ত্রাংশ অন্তর্ভুক্ত থাকে।

মহিলাদের পোশাক হিসেবে কিছু অঞ্চলে চুড়িদার পায়জামা, ঘাগরা এবং ছোলা, যা জনপ্রিয়ভাবে রেজতা বা পেটিকোট নামে পরিচিত, এবং আলংকারিক টুপি সহ একটি পোশাক পরিধান করা হয়। তারা চাঙ্কি এবং টুঙ্কি নামে পরিচিত সোনা এবং রূপার অলঙ্কারও পরিধান করে। কুল্লুর মতো অন্যান্য অঞ্চলে চুড়িদার এবং পায়জামার সাথে পাট্টু পরিধান করা হয়। মহিলা নৃত্যশিল্পীরা চন্দ্র হারের মতো গহনা, রূপার নেকলেস, বুমনি এবং পায়েল বা ঝাঁঝর পরিধান করেন।

নাটি লোকনৃত্যে জড়িত সঙ্গীত

[সম্পাদনা]

এই নৃত্যশৈলীতে ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রগুলির মধ্যে রয়েছে নরসিংহ, কর্ণাল, শেন্নাই, ঢোল এবং নাগরা।

নাটি লোকনৃত্যে জড়িত প্রশিক্ষণের প্রাপ্যতা এবং নৃত্য কৌশল

এই নৃত্যধারায়, ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিহিত পুরুষ ও মহিলাদের একটি দল নিজেদেরকে একটি বৃত্তকার সমূহে সাজিয়ে, ঢোল, নরসিংহ ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রের সুরে নৃত্য পরিবেশন করে। সারা দেশে এই নৃত্যধারার সেরকম কোনও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা বিদ্যালয় নেই, কারণ এই লোকনৃত্যটি মূলত হিমাচল প্রদেশের "কুল্লু" অঞ্চলে বিকশিত হয়েছে এবং এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বিকশিত হয়ে আসছে।

কায়াং মালা (মালা)

[সম্পাদনা]

কায়াং মালা হলো এমন একটি নৃত্যধারা যেখানে নৃত্যশিল্পীরা একে অপরের হাত ধরে পুঁতির মালার মালার মতো এক সমূহ রচনা করে। শিল্পীরা সুন্দর পোশাক এবং অলংকারে সজ্জিত হয়ে নৃত্য পরিবেশন করেন। নৃত্য শুরু করার আগে ছাং নামক স্থানীয় পানীয় পান করার রীত আছে। কায়াং মালা হিমাচল প্রদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী নৃত্য।[১]

রাক্ষস

[সম্পাদনা]

কিন্নৌর এবং আশেপাশের অঞ্চলের প্রচলিত এই রাক্ষস নৃত্য ঐতিহাসিক সময়ের প্রতিচ্ছবি। কিন্নরদের হরিণের সাথে তুলনা করা হয়। নৃত্যটি রাক্ষসের মুখোশ পরে পরিবেশিত হয়। নৃত্যের মাধ্যমে শস্যের উপর রাক্ষসদের আক্রমণ এবং শুভ শক্তি দ্বারা তাদের প্রতারিত করার রীতিনীতি এই নৃত্যের মাধ্যমে পরিবেশিত হয়। [১] [২]

ছাম্ব নৃত্যের সাথে পাঞ্জাবি নৃত্য ভাংড়ার কমবেশি মিল দেখা যায়। সাধারণত ঘনবসতিপূর্ন এলাকায় এই নৃত্যের প্রচার বেশি। স্থানীয় উৎসব যেমন চৈতোল ও বিশুর সময় এই ধরনের সম্প্রদায়ভিত্তিক নৃত্য পরিবেশিত হয়, যেখানে পুরুষ ও মহিলারা হাতে হাত রেখে একসঙ্গে নাচে।

এই নৃত্যধারা ছাম্ব বা রাক্ষস নৃত্য নামে পরিচিত। এই নৃত্য হিমাচল প্রদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি এবং সরল জীবনধারার প্রতিফলন ঘটায়। হাজার বছরের পুরনো এই নৃত্যের উৎপত্তি কিন্নৌর অঞ্চলে বলে মনে করা হয়। রাক্ষসের মুখোশ পরে দলবদ্ধভাবে পুরুষ-মহিলারা একত্রে নাচ করে, এবং এই দলটি একজন নেতা দ্বারা পরিচালিত হয়।এই নৃত্যের মাধ্যমে শস্য আক্রমণকারী রাক্ষসদের চিত্রায়ণ করা হয়, যেখানে দেবতারা ফসল রক্ষা করেন। হিমাচল প্রদেশে ভ্রমণকালীন এই মনোমুগ্ধকর উদযাপন প্রত্যক্ষ করা এক অনন্য অভিজ্ঞতা হতে পারে। [১]

লুড্ডি

[সম্পাদনা]

লুড্ডি হিমাচল প্রদেশের মান্ডি জেলার একটি জনপ্রিয় নৃত্যধারা, যা রাজাদের শাসনকালে রাজ্যের অন্যান্য অংশ এবং সংলগ্ন অঞ্চলে পরিবেশিত হত। এটি মূলত রাজদরবারে উপস্থাপিত হলেও বর্তমানে সামাজিক সমাবেশ এবং উৎসবেও পরিবেশিত হয়।

এই নৃত্য অত্যন্ত পরিশ্রমের নৃত্য। এতে পুরুষ ও মহিলা উভয়েই অংশ নেন। লুডি নৃত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো পায়ের দ্রুত এবং বৃত্তাকার নড়াচড়া, ছন্দবদ্ধ হাততালি এবং মন্ত্রোচ্চারণ। শিল্পীরা রঙিন ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করেন, যা নৃত্যের প্রাণবন্ততাকে আরও বৃদ্ধি করে।

ডালশোন এবং চোলাম্বা

[সম্পাদনা]

ডালশোন এবং চোলাম্বা নৃত্যধারা রোপা উপত্যকা অঞ্চলের অন্তর্গত নৃত্যধারা। নৃত্যশিল্পীরা নাচের সময় সংঘবদ্ধ হয়ে কুণ্ডলীকৃত সর্পের ন্যায় এক সমুহ তৈরি করে। সাধারণত বাঘ মারার সময় চোলাম্বা নৃত্য পরিবেশন করা হয়। মৃত পশুর চামড়া সংরক্ষন করে হয় এবং একটি তাতে সোনার অলঙ্কার পরানো হয় [১]

চোলাম্বা নৃত্য রাজ্যের প্রাচীনতম পরিচিত নৃত্যের মধ্যে একটি। স্থানীয়দের মতে বহু শতাব্দী ধরে এই নৃত্যের প্রচলন।

শ্যান্ড এবং শাবু

[সম্পাদনা]

এগুলি লাহৌল উপত্যকার সবচেয়ে জনপ্রিয় নৃত্য এবং সাধারণত বৌদ্ধ গোম্পাসে বুদ্ধের স্মরণে এই নৃত্য করা হয়।

হিমাচল প্রদেশের দুটি জনপ্রিয় নৃত্যধারা হল শান্দ এবং শাবু, যা সাধারণত বৌদ্ধ বিহারগুলিতে বুদ্ধের প্রেমময় স্মৃতিতে পরিবেশিত হয়। কথিত আছে যে র লাহুল এবং স্পিতি জেলায় এই নৃত্যের উৎপত্তি হয়েছিল।

হিমাচল প্রদেশের উপজাতীয় নৃত্য

[সম্পাদনা]

কিকলি নৃত্য হল হিমাচলী তরুণীদের মধ্যে প্রচলিত একটি নৃত্য। মেয়েরা একে অপরের হাত আড়াআড়িভাবে ধরে এবং দ্রুত পায়ের আঙ্গুলের উপর ঘুরে নৃত্য পরিবেশন করে। ভাঙড়া হল একটি পুরুষ নৃত্য যা পাঞ্জাবে উৎপত্তি লাভ করে এবং উনার কিছু অঞ্চলে এই নৃত্য পরিবেশিত হয়।হিমালয় -পারবর্তী অঞ্চলের নৃত্যধারাগুলি বিষয়বস্তু এবং সঙ্গীতের দিক থেকে ভিন্ন। এই অঞ্চলের গান এবং নৃত্যের প্রাচীন ঐতিহ্য শহুরে প্রভাব থেকে সংরক্ষিত। কিন্নৌর, লাহৌল ও স্পিতি এবং চাম্বার পাঙ্গি ও ভরমৌর তহসিল অঞ্চলে অনেক বিশেষ সাংস্কৃতিক নৃত্যধারার প্রচলন দেখা যায়। এখানকার বাসিন্দারা কিন্নৌরা, লাহৌলা, স্পিতিয়ান, পাঙ্গওয়াল এবং গাদ্দি নামে পরিচিত। গুজ্জর এবং এই উপজাতিদের লোকনৃত্য, গান, পোশাক এবং অলঙ্কারের নিজস্ব স্বতন্ত্র ঐতিহ্য বহাল রয়েছে।

হিমাচলের বৌদ্ধ লামারা উৎসব উপলক্ষে অনেক ধর্মীয় নৃত্য পরিবেশন করেন। এক বিশেষ মুখোশধারী নৃত্যধারা মূলত হিমালয় বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তুলে ধরে যখন লামারা রাজা লঙ্গধর্মকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করেছিলেন। মুখোশধারী নৃত্যের জন্য একটি বিশেষ অনুষ্ঠান হল পদ্ম সম্ভবের (যিনি তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের বার্তা বহন করেছিলেন) জন্ম উদযাপন। [৩]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 3 4 5 https://www.tripbeam.com/blog/hues-of-tradition-6-traditional-folk-dances-of-himachal-pradesh
  2. ↑ https://www.webindia123.com/himachal/Art/dance.htm
  3. ↑ Details on Keekli and bhangra danceforms