হালিমা বশির
হালিমা বশির | |
|---|---|
২০০৮ সালে হালিমা মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সাথে সাক্ষাৎ করছেন। | |
| ছদ্মনাম | হালিমা বশির |
| পেশা | চিকিৎসক, লেখক |
| ভাষা | ইংরেজি |
| জাতীয়তা | সুদানীয় |
| ধরন | আত্মজীবনী |
| উল্লেখযোগ্য রচনা | টিয়ার্স অফ দ্য ডেজার্ট |
| উল্লেখযোগ্য পুরস্কার | আনা পলিটকভস্কায়া পুরস্কার (২০১০) |
| দাম্পত্যসঙ্গী | শরীফ বশির |
| সন্তান | ২ |
হালিমা বশির ( আরবি: حليمة بشير) হলো একজন সুদানী চিকিৎসকের কাল্পনিক নাম, যিনি "টিয়ার্স অফ দ্য ডেজার্ট" গ্রন্থের লেখক, যা দারফুর গণহত্যা ও যুদ্ধে সুদানি নারীদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে রচিত একটি স্মৃতিকথা। তিনি সুদানের গ্রামাঞ্চলে একজন চিকিৎসক হিসেবে কাজ করতেন এবং পরবর্তীকালে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা পুলিশের হাতে নির্যাতনের শিকার হন। কারণ তিনি নিকটবর্তী একটি স্কুলে জানজাবিদ মিলিশিয়াদের আক্রমণ সম্পর্কে সুদানে নিযুক্ত জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের কাছে সঠিক তথ্য প্রদান করেছিলেন। এরপর তিনি দেশত্যাগ করে যুক্তরাজ্যে চলে যান এবং সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
জীবনী
[সম্পাদনা]হালিমা বশির একটি ছদ্মনাম, যা পরবর্তীতে তাকে সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। তিনি পশ্চিম সুদানের দারফুর অঞ্চলের গ্রামীণ এলাকায় বেড়ে ওঠেন।[১] তিনি নিজের পিতামাতার চার সন্তানের মধ্যে বড় এবং স্কুলে খুব ভালো ছাত্রী ছিলেন। মাত্র আট বছর বয়সে তার খৎনা করা হয়। এই উপলক্ষে বিশেষভাবে একটি খাবারের আয়োজন করা হয় এবং উপহার হিসেবে তাকে কিছু টাকা দেওয়া হয়। এরপর তাকে তার দাদীর কুটিরঘরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কোনো ব্যথানাশক ব্যবহার না করেই রেজারের মাধ্যমে তার বাইরের যৌনাঙ্গ কেটে ফেলা হয়।[১]
তার বাবা তাকে ডাক্তারি প্রশিক্ষণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সমর্থন করেছিলেন। তার বাবা যথেষ্ট ধনী ছিলেন, তাই তিনি তাকে শহরের একটি স্কুলে পাঠান, যেখানে তিনি মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি দারফুর গণহত্যা ও যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে নিজের প্রশিক্ষণ শেষ করেন। ক্লিনিকে কাজ করার সময় এক সাক্ষাৎকারে সে সুদানের সরকারি অবস্থানের সঙ্গে একমত হয়নি। এর ফলে তাকে কর্তৃপক্ষ আটক করার হুমকি দেয় এবং এর শাস্তিস্বরূপ পরবর্তীতে তাকে উত্তর দারফুরের একটি গ্রামীণ ক্লিনিকে পাঠানো হয়। তখন তাকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয় যে, তিনি যেন কোনো পশ্চিমা সাংবাদিকের সঙ্গে কথা না বলেন।[১]
নতুন চিকিৎসালয়ে যোগদান করার পর তিনি জানজাবিদ মিলিশিয়াদের হাতে আক্রান্ত মানুষদের চিকিৎসা করতে থাকেন, যাদের মধ্যে ৪২ জন স্কুলছাত্রী ছিলেন এবং তারা সরকার সমর্থিত এক হামলায় বন্দী হয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি আফসোস করে বলেছিলেন যে, “আমার শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে আমাকে শেখানো হয়নি, কীভাবে একটি গ্রামীণ চিকিৎসালয়ে ৮ বছর বয়সী ধর্ষণের শিকার শিশুদের চিকিৎসা করতে হয়, যেখানে সেলাই করার জন্য পর্যাপ্ত সরঞ্জামও মজুদ ছিল না"।
পরবর্তীতে যখন জাতিসংঘের দুই কর্মকর্তা এই হামলার তথ্য সংগ্রহ করতে আসেন, তখন হালিমা তাদের সত্যটা জানিয়ে দেন। এর ফলে তাকে "জাতীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা পরিষেবা" বাহিনী কর্তৃক আটক করা হয়।[১] তাকে আটক করে গণধর্ষণ করা হয় এবং তার নীরব থেকে সহ্য করে যাওয়া ব্যতীত অন্য কোনো উপায় ছিল না। তার সারা শরীর ছুরি দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছিল এবং সেই সব ক্ষতস্থানে লাগাতার কয়েকদিন ধরে সিগারেটের আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।[২] পরে তাকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং তিনি তার গ্রামে ফিরে আসেন। এরপর তার পিতার কথা মতে তাকে তার চাচাতো ভাই শরীফ বশিরের সঙ্গে বিবাহ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিয়ের পূর্বে তিনি শরীফকে মাত্র একবার দেখেছিলেন। মেয়ের বর হিসেবে তার পিতা শরীফ বশিরকে বেছে নিয়েছিলেন; কারণ গ্রামে তাকে উচ্চশিক্ষিত হিসেবে গণ্য করা হতো। এর কিছুদিনের মধ্যে গ্রামে আক্রমণ ঘটে, যার ফলে তার পিতা নিহত হন এবং তার ভাইবোনরা হারিয়ে যান।[১]
হামলার ব্যাপারে জাতিসংঘের তদন্তকারীদের কাছে সঠিক তথ্য প্রদানের কারণে হালিমাকে বর্বরভাবে নির্যাতন করা হয় এবং তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। মুক্তি পেয়ে যখন তিনি নিজের গ্রামে ফিরে আসেন, তখন দেখেন যে, গ্রামটি সরকারী হেলিকপ্টার ও জানজাবিদ মিলিশিয়ারা ধ্বংস করে দিয়েছে। এর কিছুদিন পর হালিমা দেশের বাইরে চলে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করেন। কারণ তিনি তখনো সরকারি বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপারে আতংকিত ছিলেন।[৩]
বিদেশ যাত্রা ও লেখালেখি
[সম্পাদনা]অবশেষে হালিমা নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে সুদান ছেড়ে যুক্তরাজ্যে যাত্রা করেন।[১] যুক্তরাজ্যে যাত্রার জন্য হালিমা একজন মানব পাচারকারীকে গহনার মাধ্যমে বিপুল অর্থ পরিশোধ করেছিলেন। যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে তিনি সুদানের বিরুদ্ধে দেশটির যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন এবং ব্রিটিশ সরকারের আফ্রিকা বিষয়ক মন্ত্রী লর্ড ডেভিড ট্রাইসম্যানকে ব্যক্তিগতভাবে একটি চিঠি হস্তান্তর করেন।[২] তিনি ডেমিয়ান লুইসের সহযোগিতায় একটি আত্মজীবনী লিখেছিলেন, যার নাম ছিল "টিয়ার্স অফ দ্য ডেজার্ট" ( ইংরেজি: Tears of the Desert)। বইটি ২০০৮ সালে নিউইয়র্কে প্রকাশিত হয়।[৪]
টিয়ার্স অফ দ্য ডেজার্ট
[সম্পাদনা]| লেখক | হালিমা বশির ও ডেমিয়েন লুইস |
|---|---|
| বিষয় | দারফুর গণহত্যা |
| ধরন | স্মৃতিকথা |
| প্রকাশক | ওয়ানওয়ার্ল্ড পাবলিকেশন্স ও ব্যালান্টাইন বুকস |
প্রকাশনার তারিখ | ৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৮ |
| আইএসবিএন | ৯৭৮-০-৩৪৫-৫০৬২৫-২ |
“টিয়ার্স অফ দ্য ডেজার্ট: এ মেমোয়ার অব সারভাইভাল ইন দারফুর" হলো একটি আত্মজীবনীমূলক বই, যা হালিমা বশির ও ইংরেজ সাংবাদিক ডেমিয়ান লুইসের যৌথ প্রচেষ্টায় রচিত হয়েছে। এই আত্মজীবনীতে হালিমা সুদানের দারফুর অঞ্চলে কাটানো নিজের জীবনকে বর্ণনা করেছেন, যেখানে তিনি ব্যক্তিগতভাবে দুর্বিষহ গৃহযুদ্ধ, গণহত্যা, যৌন সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন ।[৪] জানজাবিদ মিলিশিয়া কর্তৃক দেশপ্রেমিক মানুষদের উপর চালানো নির্যাতনের কথা প্রকাশ করার কারণে হালিমাকে সুদান ত্যাগ করে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করতে হয়েছিল।[৫]
তার বইতে তিনি নাম ও স্থান পরিবর্তন করেছেন। তবে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের স্বতন্ত্র তদন্ত অনুযায়ী, বইয়ে বর্ণিত ঘটনাবলী কোনো অতিরঞ্জন ছাড়া সত্যই ঘটেছে বলে দেখা গেছে।[১] সংবাদপত্রটি হালিমা বশিরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য ভিসা প্রদানের পক্ষেও প্রচারণা চালিয়েছিল। [৬] ২০১০ সালে তিনি দারফুরের স্কুল ছাত্রীদের উপর জানজাবিদ মিলিশিয়াদের সহিংস হামলার বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য "আনা পলিতকভস্কায়া পুরস্কারে" সম্মানিত হন। [৭]
সারসংক্ষেপ
[সম্পাদনা]যখন হালিমা শহরের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়তে যান, তখন তিনি দারফুরের কালো আফ্রিকীয় সম্প্রদায় ও সংখ্যালঘু আরব অভিজাতদের মধ্যে প্রথাগত বৈষম্য ও শত্রুতার মুখোমুখি হন। স্কুলের শিক্ষকরা ছাত্রীদের মধ্যে শারীরিক দ্বন্দ্বে কোনো সমর্থন দিতেন না। কারণ তাদের পূর্বধারণা ও পক্ষপাতের কারণে কালো আফ্রিকীয় স্কুলছাত্রীদের সাহায্য করা হতো না। এর ফলে হালিমা শেষ পর্যন্ত বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার হন। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই তিনি জীবনে প্রথমবার প্রকৃত অসহায়তা উপলব্ধি করেন। [৮]
উপন্যাসের উদ্দেশ্য
[সম্পাদনা]বইটির সহ-লেখক ড্যামিয়েন লুইস উল্লেখ করেন যে, বইটি রচনার ক্ষেত্রে তার অন্যতম একটি লক্ষ্য ছিল, "এই বইটি এমনভাবে উপস্থাপন করা যে আপনি, আমি বা পশ্চিমের যে কেউ যেন অনুভব করতে পারি যে, এটি তাদের সাথেই ঘটতে পারত(…)। যদি এটি তাদের সাথে ঘটত, তবে এটি তাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে ভাবতে বাধ্য করত এবং তাদের নিজের পরিবার, সন্তান, বাবা, দাদা-দাদি বা নিজের গ্রামের মানুষদের উপর কেমন প্রভাব পড়ত (...)। তাই এমনটি মনে হয় না যে, এটি হাজারো মাইল দূরে অন্য এমন সংস্কৃতি বা জায়গায় ঘটেছে, যা আমরা বুঝি না"।[৯]
সমালোচনামূলক প্রতিক্রিয়া
[সম্পাদনা]কারকার্স রিভিউস "টিয়ার্স অফ দ্য ডেজার্ট" বইটিকে “হৃদয়বিদারক ও ভীতিকর” হিসেবে বর্ণনা করেছে।[১০] মার্কিন প্রকাশনা সম্পর্কিত সাপ্তাহিক পত্রিকা পাবলিশার্স উইকলি আরো বিস্তারিতভাবে মন্তব্য করে বলেছে যে, বইটি লেখকের সুদানের দারফুর অঞ্চলের জীবনকে বিপর্যয়ের আগের সময় থেকে ব্যক্তিগত ও প্রাণবন্তভাবে তুলে ধরেছে এবং লেখক যেভাবে সহিংসতার গল্প বলেছেন তা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর।[১১]
বুকলিস্টও টিয়ার্স অফ দ্য ডেজার্ট বইটির সমালোচনা করে।[১২]
আরো দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 3 4 5 6 7 Kristof, Nicholas (৩১ আগস্ট ২০০৮)। "Tortured, but Not Silenced"। The New York Times। সংগ্রহের তারিখ ২২ অক্টোবর ২০১৬।
- 1 2 Woolfe, Marie (১০ ডিসেম্বর ২০০৬)। "The rape of Darfur: a crime that is shaming the world"। The Independent। সংগ্রহের তারিখ ২২ অক্টোবর ২০১৬।
- ↑ "One Woman's True Story of Surviving the Horrors of Darfur" ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৮ অক্টোবর ২০১২ তারিখে. The Scotsman. Review by Lesley McDowell, 9 August 2008
- 1 2 Bashir, Halima; Lewis, Damien (২০০৮)। Tears of the desert : a memoir of survival in Darfur। New York: One World Ballantine Books। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৩৪৫-৫০৬২৫-২। ওসিএলসি 191922835।
- ↑ Kristof, Nicholas (৩১ আগস্ট ২০০৮)। "Opinion | Tortured, but Not Silenced"। The New York Times (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। আইএসএসএন 0362-4331। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৬ জুন ২০২১।
- ↑ Yefimov, Natasha (৪ সেপ্টেম্বর ২০০৮)। "Helping Dr. Halima Bashir"। The New York Times। সংগ্রহের তারিখ ২২ অক্টোবর ২০১৬।
- ↑ "Halima Bashir Wins 2010 Anna Politkovskaya Award"। Nobel Women's Initiative। ২১ অক্টোবর ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১১ এপ্রিল ২০১২।
- ↑ "Book review: Tears of the Desert: One Woman's True Story of Surviving…"। archive.ph। ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৬ জুন ২০২১।
- ↑ "HALIMA BASHIR, AUTHOR, "TEARS OF THE DESERT""। transcripts.cnn.com। ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৫। ২২ মে ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৬ জুন ২০২১।
- ↑ "Tears of the Desert"। Kirkus Reviews। ২০ অক্টোবর ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১ জুলাই ২০২৩।
- ↑ "Tears of the Desert: A Memoir of Survival in Darfur by Halima Bashir"। Publishers Weekly। ২ জুন ২০০৮। ২ জুলাই ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২ জুলাই ২০২৩।
- ↑ "Tears of the Desert: A Memoir of Survival in Darfur"। Booklist। আগস্ট ২০০৮। ২ জুলাই ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১ জুলাই ২০২৩।