বিষয়বস্তুতে চলুন

হালিওয়াহ বাজার

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
হালিওয়াহ বাজার

হালিওয়াহ বাজার (আরবি: سوق حليوة, ইংরেজি: Haliwah Market; বা সুক হালিওয়াহ) হলো সৌদি আরবের রিয়াদ প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ঐতিহাসিক শাকরা গভর্নরেটের অন্যতম বৃহৎ, প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী বাজার। এই বাজারের সংলগ্ন 'হালিওয়াহ' নামক একটি প্রাচীন পাম বা খেজুর বাগানের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। নজদ অঞ্চলের প্রাচীন বাণিজ্যিক ঐতিহ্য এবং স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে এই বাজারটি আজ অবধি সগর্বে টিকে আছে।

অবস্থান ও ভৌগোলিক গুরুত্ব

[সম্পাদনা]

হালিওয়াহ বাজারটি শাকরা গভর্নরেটের একেবারে পুরনো শহরের (ওল্ড সিটি) প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত, যা রাজধানী রিয়াদ থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

ঐতিহাসিকভাবে শাকরা শহরটি 'আল-ওয়াশম' অঞ্চলের রাজধানী এবং আরব উপদ্বীপের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল ছিল। হেজাজ (মক্কা-মদিনা), ইয়েমেন এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের (গালফ) মধ্যকার প্রাচীন বাণিজ্য পথটি শাকরার ওপর দিয়ে অতিক্রম করত। ফলে বাণিজ্য কাফেলা এবং হজ যাত্রীদের জন্য এই শহরটি একটি আদর্শ বিশ্রামস্থল ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এই ভৌগোলিক সুবিধাই হালিওয়াহ বাজারকে একটি জমজমাট আন্তর্জাতিক বাজারে রূপান্তর করতে সহায়তা করেছিল।

ঐতিহাসিক পটভূমি

[সম্পাদনা]

বাজারটি আনুমানিক ১৩৫০ হিজরি সনে (খ্রিস্টীয় ১৯৩১-১৯৩২ সাল) নির্মিত হয়েছিল। এটি এমন এক সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা রাজা আবদুল আজিজ আল সৌদ আরব উপদ্বীপকে একত্রিত করছিলেন এবং পুরো অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসছিল।

প্রায় শতাধিক দোকান নিয়ে এটি একটি বিশাল ও বিস্তৃত বাজার। এখানে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক—উভয় ধরনের বাণিজ্য পরিচালিত হতো। আরব উপদ্বীপে শাকরার বাণিজ্যিক গুরুত্বের প্রমাণ বহন করে এই বাজারটি। এটি কেবল শাকরার মানুষের কাছেই নয়, বরং পার্শ্ববর্তী সব অঞ্চলেও (যেমন- আল-কাসিম, সুদায়ির এবং রিয়াদ) অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। সময়ের সাথে সাথে এটি এতটাই সুপরিচিত হয়ে ওঠে যে মানুষ একে শুধু 'বাজার' নামেই চিনত। অপেক্ষাকৃত নতুন হওয়া সত্ত্বেও এর জনপ্রিয়তা পূর্ববর্তী অনেক বাজারকে ছাপিয়ে গিয়েছিল।

বাজারের সচল বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ফলে এখানকার অন্যান্য পুরনো বাজারগুলো ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে থাকে। মূলত খুচরা ব্যবসার আধিপত্য এবং হরেক রকম পণ্যের সমারোহের কারণে এটি সবার শীর্ষে চলে আসে। এখানে গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, তৈজসপত্র, শাকসবজি, ফলমূল এবং গবাদি পশুর মতো স্থানীয় পণ্য বিক্রি হতো। এছাড়া এর পাশেই আটা ভাঙানোর কল এবং সাধারণ ওজন মাপার যন্ত্রের (দাঁড়িপাল্লা) মতো নাগরিক সুযোগ-সুবিধাও বিদ্যমান ছিল।[]

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব

[সম্পাদনা]

হালিওয়াহ বাজার শুধু একটি কেনাবেচার স্থানই ছিল না, বরং এটি ছিল শাকরা শহরের সামাজিক মিলনমেলা। প্রতিদিন সকালে এবং আসরের পর এখানে মানুষের ঢল নামত। বেদুইনরা মরুভূমি থেকে তাদের গবাদি পশু, পশম এবং ঘি (সামনা) নিয়ে আসত এবং এর বিনিময়ে শহর থেকে খেজুর, গম, কফি বিচি, মশলা এবং কাপড় কিনে নিয়ে যেত।

ভারত, কুয়েত এবং ইয়েমেন থেকে আগত রেশমি কাপড়, সুগন্ধি, তলোয়ার এবং উন্নত মানের মশলা এই বাজারে পাওয়া যেত। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এখানে বড় বড় গুদামঘর তৈরি করেছিলেন। বাজারের কেন্দ্রস্থলে একটি উন্মুক্ত চত্বর ছিল, যেখানে নিলামের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করা হতো এবং বয়স্করা বসে খবরাখবর আদান-প্রদান করতেন।

স্থাপত্য শৈলী ও নির্মাণ কৌশল

[সম্পাদনা]

বাজারের স্থাপত্য সম্পূর্ণভাবে ঐতিহ্যবাহী 'নজদি স্থাপত্যশৈলী' অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে। মরুভূমির চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে এটি নির্মিত।

বাজারের দোকানগুলো আয়তাকার আকৃতির এবং সারিবদ্ধভাবে একটি বিশাল উন্মুক্ত চত্বরকে ঘিরে তৈরি। এগুলো কাদা ও রোদে শুকানো কাঁচা ইট (লিবন) দিয়ে নির্মিত এবং এর ভিত্তি মজবুত প্রাকৃতিক পাথরের তৈরি, যা ভবনকে মাটির আর্দ্রতা থেকে রক্ষা করে। ছাদগুলো স্থানীয় 'আথল' বা ঝাউ জাতীয় গাছের কাঠ এবং তালপাতা দিয়ে অত্যন্ত নিপুণভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা নলাকার পাথরের স্তম্ভের ওপর টিকে আছে। দোকানগুলোতে সাদা প্লাস্টার (জিপসাম বা নূরা) ও কাদা ব্যবহার করে বিভিন্ন জ্যামিতিক অলংকরণ করা হয়েছে, বিশেষ করে বারান্দা, দরজা এবং প্রধান সম্মুখভাগে ঐতিহ্যবাহী শৈল্পিক কারুকাজ ফুটে উঠেছে।[]

কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যসমূহ

[সম্পাদনা]

হালিওয়াহ বাজারের প্রধান কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • মাটির আর্দ্রতা প্রতিরোধের জন্য মজবুত পাথরের ভিত্তি।
  • কাদা ও কাঁচা ইটের (লিবন) তৈরি প্রশস্ত দেয়াল, যা প্রাকৃতিকভাবে তাপ নিরোধক।
  • ভবনের বহির্ভাগ কাদা ও খড়ের মসৃণ লেপন বা প্লাস্টার করা।
  • ছাদের ভার বহনের জন্য নলাকার পাথরের স্তম্ভ ও খিলান।
  • আথল কাঠ, খেজুর পাতা এবং খড়-কাদার পুরু প্রলেপ দিয়ে তৈরি জলরোধী ছাদ।
  • ভবনে বায়ু চলাচলের জন্য দেয়ালের ওপরের দিকে ত্রিকোণাকার বা আয়তাকার ছিদ্র (ভেন্টিলেশন বা 'খুলাল') রয়েছে।
  • বাজার এলাকার ভবনগুলো প্রধানত একতলা বিশিষ্ট।[]

বর্তমান অবস্থা ও সংরক্ষণ উদ্যোগ

[সম্পাদনা]

বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আধুনিক নগরায়নের ফলে বাজারটি তার আদি জৌলুস হারিয়ে ফেলে এবং জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। তবে, সৌদি আরবের 'ভিশন ২০৩০' এর অধীনে দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের অংশ হিসেবে এই ঐতিহাসিক বাজারটিকে পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সৌদি পর্যটন ও জাতীয় ঐতিহ্য কমিশন এবং স্থানীয় শাকরা পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে বাজারটিকে এর আদি স্থাপত্যশৈলী অবিকৃত রেখে ব্যাপকভাবে সংস্কার করা হয়েছে। বর্তমানে এটি একটি উন্মুক্ত হেরিটেজ মিউজিয়াম এবং পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর এখানে 'শাকরা হেরিটেজ ফেস্টিভ্যাল' অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, স্থানীয় খাবার এবং প্রাচীন সংস্কৃতির প্রদর্শনী হয়, যা দেশি-বিদেশি অসংখ্য পর্যটককে আকর্ষণ করে।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]
  • রিয়াদ অঞ্চলের স্থাপত্য ঐতিহ্য ও স্থান শুমারি প্রকল্প (পৌর ও পল্লী বিষয়ক মন্ত্রণালয়)।
  • শাকরা শহর ও ইতিহাস, মুহাম্মদ আল-শুয়াইর, ২০০৩।
  • "শাকরা: ইতিহাস ও ঐতিহ্য", রিয়াদ পর্যটন বোর্ড প্রকাশনা।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. মুহাম্মদ আল-শুয়াইর (২০০৩)। শাকরা শহর ও ইতিহাস
  2. ঐতিহ্য কর্তৃপক্ষ (Heritage Commission)। سجل التراث العمراني (ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের রেকর্ড) (আরবি ভাষায়)। সৌদি আরব।
  3. "حصر المواقع والمباني التاريخية (ঐতিহ্যবাহী স্থান ও ভবন শুমারি প্রকল্প)"রিয়াদ গভর্নরেটসমূহ (আরবি ভাষায়)। রিয়াদ অঞ্চল পৌরসভা। ১৪৩৭ হিজরি। {{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: |date= এর মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য)