হাব্বা খাতুন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

হাব্বা খাতুন (অথবা খাতুন) (১৫৫৪-১৬০৯) ছিলেন একজন গুরুত্বপূর্ণ কাশ্মীরি মুসলিম কবি ও তপস্বী, যিনি জুন এবং কাশ্মীরের বুলবুল (নাইটিংগেল অব কাশ্মীর) নামেও পরিচিত ছিলেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন কাশ্মীরের শাসক ইউসুফ শাহ চাকের স্ত্রী।

গুরেজ কাশ্মীরে অবস্থিত পিরামিড আকৃতির পর্বতটিকে তার নামানুসারে হাব্বা খাতুন পর্বত নামকরণ করা হয়।

জন্ম[সম্পাদনা]

তিনি ১৫৫৪ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের শ্রীনগরের উপকণ্ঠে পাম্পোরের কাছে চন্দহার নামক একটি ছোট্ট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

জীবনবৃত্তান্ত[সম্পাদনা]

তিনি মূলত জুউন বা জুন (চাঁদ) নামে পরিচিত ছিলেন। এখনকার দিনেও নামটি সাধারণ কাশ্মীরিদের নামের প্রথম অংশ হিসেবে বেশ জনপ্রিয়।[১] লোককথা অনুযায়ী তার অসাধারণ সৌন্দর্যের কারণে তাকে জুন বলা হতো। সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম হলেও তিনি গ্রামের মৌলভীর কাছে থেকে পড়তে এবং লিখতে শেখেন। অল্প বয়সেই তার বাবা তাঁকে আজিজ লোনি[২] নামধারী একজন কৃষক ছেলের সাথে বিয়ে দেন। তবে প্রথম বিবাহটি স্থায়ীরূপ লাভ করেনি এবং সম্ভবত বিবাহবিচ্ছেদের মাধ্যমে তার সমাপ্তি ঘটে।

কিংবদন্তি অনুসারে, একদিন ইউসুফ শাহ চাক ঘোড়ার পিঠে কোন এক পথে শিকার করতে বেরিয়েছিলেন। পথে একটি চিনার গাছের ছায়ায় জুন গান করছিল এবং তিনি সেই গান শুনতে পেলেন। এরপর তাঁদের সাক্ষাৎ হলো এবং তিনি তাঁর প্রেমে পড়লেন। লোককথা অনুসারে জুনকে ইউসুফ শাহের সম্রাজ্ঞী হিসাবে বর্ণনা করা হয়, যদিও বাস্তবে তিনি ইউসুফ শাহ চাকের উপপত্নী বা তার হারেমের সদস্য ছিলেন কিনা তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।[৩] তিনি ১৫৭০ সালের কাছাকাছি সময়ে প্রাসাদে প্রবেশ করেন এবং এক পর্যায়ে তাঁর নাম পরিবর্তন করে হাব্বা খাতুনে পরিণত হন।

হাব্বা খাতুন ইউসুফ শাহকে তাঁর নিয়ন্ত্রণে রাখেন। জনশ্রুতি অনুযায়ী এই দম্পতি ছিল বেশ সুখী এবং পরবর্তীতে ইউসুফ শাহ কাশ্মীরের শাসক হন। তবে মুঘল সম্রাট আকবর ইউসুফ শাহকে বিহারে গ্রেপ্তার করে কারাবন্দী করেন। এরপর তিনি আর ফিরে আসেননি। তাঁকে হত্যা করা হয়। ফলশ্রুতিতে ১৫৭৯ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এর পরে ব্যথিত হাব্বা খাতুন প্রাসাদ ছেড়ে ঝিলম নদীর তীরে এটি কুটিরে আশ্রয় নেন এবং একজন তপস্বী হয়ে ওঠেন,[৪] এবং আমৃত্যু উপত্যকায় ঘুরে ঘুরে বিরহ-বেদনা যন্ত্রণার গীত রচনা করেন, সুর দেন এবং গেয়ে যান।

লোকগাঁথায় তাঁর অসামান্য উপস্থিতি রয়েছে এবং কাশ্মীরের সর্বশেষ স্বাধীন কবি রাণী হিসেবে তিনি যথেষ্ট প্রশংসিত হয়েছেন।

সঙ্গীত-সাধনা[সম্পাদনা]

হাব্বা খাতুন কাশ্মীরি ভাষায় গান রচনা করেছিলেন। দাবি করা হয় যে তিনি কাশ্মীরি কাব্য়ে "লোল" এর প্রবর্তন করেছিলেন, "লোল" মোটামুটি ইংরেজি 'Lyric' এবং বাংলা "গীতিকবিতা" এর মতই। এ ধরনের কবিতা যেকোন চিন্তাধারাকে সংক্ষিপ্তরূপে প্রকাশ করে। ব্রজ কচ্রু বলেছিলেন, "হাব্বা খাতুন এবং অর্ণিমল (একজন প্রসিদ্ধ কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ কবি) কাশ্মীরি কাব্যে লোলকে পরিপূর্ণ রূপ দান করেছিলেন"।[১]

হাব্বা খাতুনের জীবনীর ঐতিহাসিক সত্যতা সম্পর্কে কিছু বিতর্ক রয়েছে, তবে তাঁর গানগুলি (মে হা কার চেই কিট এবং চে কামিউ সোনেই মায়ানি সহ ) সমগ্র কাশ্মীর জুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়। তার গানগুলির বেশিরভাগই শোকসূচক এবং বিচ্ছেদের দুঃখপূর্ণ।

কবিতা[সম্পাদনা]

"বন্ধু এই যৌবন ফুরিয়ে যাবার

আমি পথেই ফুরিয়েছি সমস্ত দিন

কোথায় আমাদের জন্ম?

আমাদের মৃত্যু হয়নি কেন?

কেন আমাদের এত শ্রুতিমধুর নাম

এখন আমাদের অপেক্ষা—শেষ বিচারের দিন

আর আমি পথেই ফুরিয়েছি সমস্ত দিন

পৃথিবীর পদ্ধতিটিই অর্থহীন ঝঞ্ঝা

আমি জটিল নিয়তি আহ্বান করেছিলাম

আর আমি পথেই ফুরিয়েছি সমস্ত দিন।"[৫]

মৃত্যু[সম্পাদনা]

১৬০৯ সালে ৫৫ বছর বয়সে আজওয়ান নামক স্থানে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর সমাধি জম্মু-শ্রীনগর জাতীয় মহাসড়কের আজওয়ানের (ইংরেজি ভাষায়: Handful of Rings) কাছে অবস্থিত।[৪]

সম্মাননা[সম্পাদনা]

লাহোরের মুঘালপুরায় হাব্বা খাতুনের নামে একটি আন্ডারপাসের নামকরণ করা হয়েছে।

ভারতীয় কোস্ট গার্ড তার নামানুযায়ী একটি জাহাজের নামকরণ করেছে সিজিএস হাব্বা খাতুন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Kachru, Braj Behari (১৯৮১)। Kashmiri literature। Harrassowitz। আইএসবিএন 3447021292ওসিএলসি 1014524295 
  2. রাশদী, আন্দালিব। "কাশ্মীরের কবিতা"কালের কন্ঠসৌন্দর্য ও প্রতিভা তাঁর স্বামী আজিজ লোনিকে আকৃষ্ট করতে পারেনি [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  3. Sadhu, S. L.। Haba Khatoonআইএসবিএন 9788126019540ওসিএলসি 1007839629 
  4. "A grave mistake"। The Tribune। জুন ৩, ২০০০। সংগ্রহের তারিখ মার্চ ১০, ২০১৩ 
  5. রাশদী, আন্দালিব। "কাশ্মীরের কবিতা"কালের কন্ঠহাব্বা খাতুনের কবিতা থেকে উদ্ধৃতি— [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]