হাওসারা ইবনে সুহাইল
হাওসারা ইবনে সুহাইল حوثرة بن سهيل الباهلي | |
|---|---|
| মিশরের গভর্নর | |
| কাজের মেয়াদ ৭৪৫ – ৭৪৯ | |
| সার্বভৌম শাসক | দ্বিতীয় মারওয়ান |
| পূর্বসূরী | হারিস ইবনুল ওয়ালিদ ইবনে ইউসুফ |
| উত্তরসূরী | মুগিরা ইবনে উবায়দুললাহ |
| ব্যক্তিগত বিবরণ | |
| মৃত্যু | ৭৫০ ওয়াসিত, ইরাক |
| পিতামাতা | সুহাইল (পিতা) |
হাওসারা ইবনে সুহাইল আল-বাহিলি ( আরবি: حوثرة بن سهيل; মৃ.: ৭৫০) উমাইয়া খিলাফতের শেষ যুগে একজন বেদুইন আরব প্রশাসক ও সামরিক নেতা ছিলেন। দার্শনিক আল-কিন্দি তাকে তার অসাধারণ বাগ্মিতা বা বাকপটুতার জন্য বিখ্যাত বলে উল্লেখ করেছেন।[১]
জীবনী
[সম্পাদনা]হাওসারা ৭৪৫ খ্রিস্টাব্দে (হিজরি ১২৮) দ্বিতীয় মারওয়ানের আমলে মিশরের ওয়ালি (গভর্নর) হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। সেখানে তাঁকে সিরীয় অঞ্চল (শাম) থেকে সংগৃহীত একটি বড় সেনাদলসহ পাঠানো হয়। সে সময় মিশর কার্যত হাফস ইবনুল ওয়ালিদের অধীনে ছিল। তিনি পূর্বে গভর্নর ছিলেন এবং দ্বিতীয় মারওয়ান ক্ষমতায় আসার পর তিনি পদত্যাগ করেন। কিন্তু হাফসিয়া নামে পরিচিতিত তাঁর অধীনস্থ অনারব সৈন্যদের একটি দল তাঁকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসতে বাধ্য করে। তবে হাফস ইবনুল ওয়ালিদ হাওসারার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রাজি হননি। এরপর উভয়ের মাঝে কিছু আলোচনা পর হাওসারা মিশরের রাজধানী ফুস্তাতে প্রবেশ করেন এবং সেখানেই তিনি কার্যত ক্ষমতা গ্রহণ করেন।[১]
ক্ষমতা গ্রহণের পর হাওসারা প্রথমেই হাফসিয়ার নেতৃত্বকে নির্মমভাবে দমন করেন; তাদের শীর্ষ নেতাদের অপসারণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত হাফস ইবনুল ওয়ালিদকেও মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপর তিনি উমাইয়া খিলাফতের অনুগত মাওয়ালি (অনারব মুসলিম মিত্রগোষ্ঠী) ও আরব গোত্রসমূহের মধ্যে শক্তিশালী কায়েস গোত্র থেকে প্রায় ২,৩০০ সৈন্য নিয়োগ করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, তাঁর মিশরের ক্ষমতা দখলের ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত সহিংস ও রক্তাক্ত।[১]
এরপর হাওসারাকে উত্তর মিশরের বাশ্মুর অঞ্চলে কিবতীয় খ্রিস্টানদের এক বড় বিদ্রোহের মুখোমুখি হতে হয়। কিবতীয় ঐতিহাসিক সাওইরুস ইবনুল মুকাফফার বর্ণনা অনুযায়ী, হাওসারা বিদ্রোহীদের দমন করতে স্থল ও নৌ—উভয় দিক থেকে একাধিকবার আক্রমণ চালান; কিন্তু তবুও তাদের সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করতে পারেননি। ৭৪৯ সালে দ্বিতীয় মারওয়ান নিজেই একটি সিরীয় সেনাবাহিনী নিয়ে মিশরে আসেন। তিনি বিদ্রোহীদের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেন, কিন্তু বিদ্রোহীরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এই অচলাবস্থা ভাঙার উদ্দেশ্যে হাওসারা একটি কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি কিবতীয় গির্জার প্যাট্রিয়ার্ক প্রথম খাইলকে গ্রেপ্তার করে রাশিদ শহরে বন্দি রাখেন এবং হুমকি দেন যে, বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ না করলে তাকে হত্যা করা হবে। কিন্তু তাঁর এই কৌশলও সফল হয়নি। বরং বিদ্রোহীরা পাল্টা আক্রমণ করে রাশিদ শহর লুট করে। হাওসারা প্যাট্রিয়ার্ক খাইলকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দিলেও শেষ মুহূর্তে তিনি সেই আদেশ প্রত্যাহার করেন এবং তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি।[২][৩]
৭৪৯ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে আব্বাসীয় বিদ্রোহের সময় তাঁকে ইবনে হুবাইরার বাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য পাঠানো হয়। এই বিদ্রোহটি মূলত আব্বাসীয় বিপ্লবের অংশ ছিল, যার ফলে শেষ পর্যন্ত উমাইয়া খেলাফতের পতন ঘটে।[১] ইতিহাসবিদ তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী, হাওসারা তার সঙ্গে প্রায় ২০,০০০ সিরীয় সৈন্য নিয়ে ফালুজায় পৌঁছান। এই বাহিনীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অশ্বারোহী সেনাও ছিল।
তখন আব্বাসীয় বাহিনীর প্রধান সেনাপতি কাহতাবা ইবনে শাবিব কুফা নগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি ইবনে হুবাইরাকে একটি কৌশলগত পরামর্শ দেন। তিনি বলেন যে, ইবনে হুবাইরার খোরাসানের দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত। এতে হয়তো কাহতাবা তাকে অনুসরণ করতে বাধ্য হবে, নয়তো কুফায় অবস্থানরত উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় মারওয়ানের হাতে পরাজিত হবে।[৪] কিন্তু ইবনে হুবাইরা এই পরামর্শ গ্রহণ করেননি; বরং তিনি হাওসারাকে অগ্রবর্তী বাহিনীর নেতৃত্ব দেন এবং নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন কাহতাবার আগেই কুফায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। ৭৪৯ সালের ২৮ আগস্ট কুফা শহরের নিকটবর্তী এলাকায় একটি বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে কাহতাবা ইবনে শাবিব নিহত হন। তবে উমাইয়া বাহিনীকে শেষ পর্যন্ত পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হতে হয়। হাওসারা তার বাহিনী নিয়ে সরে গিয়ে কসর ইবনে হুবাইরা নামক স্থানে আশ্রয় নেন এবং সেখান থেকে তিনি আবার কুফার দিকে অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনা করেন। কারণ কুফার তৎকালীন গভর্নর মুহাম্মদ ইবনে খালিদ আল-কাসরি বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু সৈন্যরা ধীরে ধীরে তাকে ত্যাগ করতে শুরু করলে তিনি পরিকল্পনা পরিবর্তন করেন এবং শেষ পর্যন্ত ইবনে হুবাইরার কাছে ওয়াসিত শহরে যোগ দেন।[৫]
ওয়াসিতে পৌঁছে হাওসারা পুনরায় ইবন হুবাইরাকে পরামর্শ দেন, যেন তিনি সেখানে অবস্থান না করেন। কারণ শহরটি শত্রুদের দ্বারা অবরুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। [৫] কিন্তু তার এই পরামর্শও উপেক্ষিত হয়। ফলে ওয়াসিত প্রায় এগারো মাস ধরে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকে। এই অবরোধের সময় হাওসারা শহরের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।[৬]
অবশেষে শহরটি আত্মসমর্পণ করলে ইতিহাসবিদ তাবারির মতে, আব্বাসীয় নেতা আবু জাফর আল-মনসুরের নির্দেশে হাওসারাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।[৭] তবে সাওইরুস ইবনুল মুকাফফা ভিন্ন তথ্য প্রদান করেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, হাওসারাকে মিশরে নিয়ে গিয়ে খলিফা দ্বিতীয় মারওয়ানের আদেশেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।[৬]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 3 4 Kennedy 1998, পৃ. 75–76।
- ↑ Megally 1991।
- ↑ Swanson 2010, পৃ. 23।
- ↑ al-Ṭabarī 1985, পৃ. 135–137।
- 1 2 al-Ṭabarī 1985, পৃ. 141।
- 1 2 Crone 1980, পৃ. 143।
- ↑ al-Ṭabarī 1985, পৃ. 191–192।
গ্রন্থপঞ্জি
[সম্পাদনা]- Crone, Patricia (১৯৮০)। Slaves on Horses: The Evolution of the Islamic Polity। Cambridge: Cambridge University Press। আইএসবিএন ০-৫২১-৫২৯৪০-৯।
- Kennedy, Hugh (১৯৯৮)। "Egypt as a Province in the Islamic Caliphate, 641–868"। Carl F. Petry (সম্পাদক)। The Cambridge History of Egypt, Volume 1: Islamic Egypt, 640–1517। Cambridge: Cambridge University Press। পৃ. ৬২–৮৫।
- Megally, Mounir (১৯৯১)। "Bashmuric Revolts"। Aziz Suryal Atiya (সম্পাদক)। The Coptic Encyclopedia। খণ্ড ২। New York: Macmillan Publishers। cols. 349b–351b।
- Swanson, Mark N. (২০১০)। The Coptic Papacy in Islamic Egypt (641–1517)। Cairo: American University in Cairo Press।
- Williams, John Alden, সম্পাদক (১৯৮৫)। The History of al-Ṭabarī, Volume XXVII: The ʿAbbāsid Revolution, A.D. 743–750/A.H. 126–132। SUNY Series in Near Eastern Studies.। Albany, New York: State University of New York Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮৭৩৯৫-৮৮৪-৪।