হাইপেশিয়া

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
হাইপেশিয়া
Hypatia portrait.png
হাইপেশিয়ার একটি আনুমানিক ছবি
জন্মআনু. 350–370
মৃত্যু৪১৫[১]
আলেকজান্দ্রিয়া
যুগAncient philosophy

হাইপেশিয়া (প্রাচীন গ্রিক ভাষায় Υπατία হুপাতিয়া) (৩৭০ - মার্চ ৪১৫) মিশরীয় নব্য প্লেটোবাদী দার্শনিক এবং গণিতজ্ঞ। মহিলাদের মধ্যে তিনিই প্রথম উল্লেখযোগ্য গণিতজ্ঞ। তিনি সবচেয়ে প্রসিদ্ধ আলেক্সান্দ্রিয়ান প্যাগান ও ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে তার সাফল্য উল্লেখ করার মতো।

জীবনকাল[সম্পাদনা]

হাইপেশিয়ার পিতার নাম থিওন। তিনিও একজন খ্যাতিমান গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক ছিলেন এবং হাইপেশিয়াকে মৌলিক শিক্ষায় শিক্ষিতকরণে তার ভূমিকাই ছিল সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। যাহোক ৪০০ সালের দিকে হাইপেশিয়া আলেক্সান্দ্রিয়ার নব্য প্লেটোবাদী দর্শনধারার মূল ব্যক্তিত্বে পরিণত হন এবং খ্যাতির চরম শিখরে আরোহণ করেন। তার মধ্যে অসাধারণ বাগ্মীতা, বিনয় এবং সৌন্দর্য্যের সার্থক সম্মিলন ঘটেছিল। এজন্য তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীর আকর্ষণ লাভ করতে সমর্থ হন। তাদের মধ্যে একজন হলেন সিরিনের সাইনেসিয়াস (Synesius) যিনি পরবর্তীতে (৪১০ খ্রিষ্টাব্দে) টলেমাইস নামক অঞ্চলের বিশপ হন। হাইপেশিয়ার কাছে সাইনেসিয়াসের লেখা কিছু চিঠি এখনও বর্তমান রয়েছে। তার কোন ছবি পাওয়া যায়নি, তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর লেখক ওসাহিত্যিকেরা তাকে সৌন্দর্য্যে দেবী এথেনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

হত্যা[সম্পাদনা]

সক্রেটিস স্কলাস্টিকাসের মতে, ৪১৫ সালের মার্চ মাসে লেন্টের খ্রিস্টান মরসুমে, পিটার নামে একজন বক্তার নেতৃত্বে খ্রিস্টানদের একটি ভিড় হাইপেশিয়ার গাড়িতে হামলা চালায় যখন সে বাড়ি যাচ্ছিল। তারা তাকে কাইসারিয়ন নামে পরিচিত একটি ভবনে টেনে নিয়ে যায়, যা আলেকজান্দ্রিয়ার একটি প্রাক্তন পৌত্তলিক মন্দির এবং রোমান সাম্রাজ্যবাদী ধর্মের কেন্দ্র ছিল যা একটি খ্রিস্টান গির্জায় রূপান্তরিত হয়েছিল। সেখানে, জনতা হাইপেশিয়াকে নগ্ন করে ওস্ট্রাকা ব্যবহার করে তাকে হত্যা করে, যেটিকে হয় "ছাদের টাইলস" বা "ঝিনুকের খোলস" হিসাবে অনুবাদ করা যেতে পারে। দামাসিয়াস যোগ করেছেন যে তারা তার চোখের বলও কেটে ফেলেছে। তারা তার শরীরকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে এবং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো শহরের মধ্যে দিয়ে টেনে নিয়ে যায় সিনারিয়ন নামক স্থানে, যেখানে তারা আগুন ধরিয়ে দেয়। ওয়াটসের মতে, এটি সেই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেভাবে আলেকজান্দ্রিয়ানরা শহরের সীমার বাইরে "সবচেয়ে খারাপ অপরাধীদের" মৃতদেহ বহন করত যাতে শহরটিকে প্রতীকীভাবে শুদ্ধ করার উপায় হিসেবে দাহ করা হয়। যদিও সক্রেটিস স্কলাস্টিকাস কখনোই স্পষ্টভাবে হাইপেশিয়ার হত্যাকারীদের শনাক্ত করেননি, তবে তারা সাধারণত অনুমান করা হয় যে তারা প্যারাবলনির সদস্য ছিল। ক্রিস্টোফার হাস এই শনাক্তকরণের বিরোধিতা করেছেন, যুক্তি দিয়েছিলেন যে হত্যাকারীরা সম্ভবত "আলেকজান্দ্রিয়ান সাধারণ মানুষের ভিড়"।

সক্রেটিস স্কলাস্টিকাস হাইপেশিয়ার হত্যাকাণ্ডকে সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসাবে উপস্থাপন করেন এবং হাইপেশিয়ার পৌত্তলিকতা তার মৃত্যুতে যে ভূমিকা পালন করতে পারে তার কোনো উল্লেখ করেননি। পরিবর্তে, তিনি যুক্তি দেন যে "তিনি রাজনৈতিক ঈর্ষার শিকার হয়েছিলেন যা সেই সময়ে প্রবল হয়েছিল৷ কারণ তিনি ওরেস্টেসের সাথে ঘন ঘন সাক্ষাত্কার নিয়েছিলেন, এটি খ্রিস্টান জনগণের মধ্যে নির্মমভাবে রিপোর্ট করা হয়েছিল যে তিনিই অরেস্টেসকে বিশপের সাথে পুনর্মিলন হতে বাধা দিয়েছিলেন৷ " সক্রেটিস স্কলাস্টিকাস দ্ব্যর্থহীনভাবে জনতার কর্মকাণ্ডের নিন্দা করেছেন, ঘোষণা করেছেন, "নিশ্চয়ই গণহত্যা, মারামারি এবং এই ধরণের লেনদেনের ভাতা ছাড়া খ্রিস্টধর্মের চেতনা থেকে দূরে আর কিছুই হতে পারে না।"

কানাডীয় গণিতবিদ আরি বেলেনকি যুক্তি দিয়েছেন যে হাইপেশিয়া ইস্টার ৪১৭ সালের খ্রিস্টীয় ছুটির তারিখ নিয়ে বিতর্কে জড়িত থাকতে পারে এবং জ্যোতির্বিদ্যা পর্যবেক্ষণ করার সময় তাকে ভার্নাল ইকুনোক্সে হত্যা করা হয়েছিল। ধ্রুপদী পণ্ডিত অ্যালান ক্যামেরন এবং এডওয়ার্ড জে. ওয়াটস উভয়েই এই অনুমানটিকে খারিজ করে দিয়েছেন, উল্লেখ করেছেন যে অনুমানের কোনো অংশকে সমর্থন করার জন্য কোনো প্রাচীন পাঠে একেবারেই কোনো প্রমাণ নেই।

অবদান[সম্পাদনা]

গণিত[সম্পাদনা]

  • তিনি শিক্ষা এবং বিজ্ঞানকে সঠিক উপমার মাধ্যমে প্রতিকায়িত করেন। তৎকালীন সময়ে এ ধরনের শিক্ষাকে প্যাগান রীতিনীতি ও সংস্কৃতির সাথে একীভূত মনে করা হত এবং এর ফলে জ্ঞানের বিকাশের পথে বাঁধার সৃষ্টি হয়, আর এ কারণেই তাকে অনেক প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়।
  • সুডা লেক্সিকন নামক দশম শতাব্দীর একটি বিশ্বকোষের বর্ণনামতে তিনি কয়েকটি পুস্তকের উপর ভাষ্য রচনা করেন। এর মধ্যে রয়েছে:

এই বইগুলো পরে আর পাওয়া যায়নি। তবে এরিথমেটিকা বইটির বর্ধিত আরবি সংস্করণে তার ভাষ্য সম্বন্ধে কিছু তথ্য পাওয়া যায়।

জ্যোতির্বিজ্ঞান[সম্পাদনা]

  • জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক একটি সারগ্রন্থের উপর তিনি ভাষ্য রচনা করেন। অনেকের মতে এটি ছিল টলেমি রচিত আলমাজেস্ট। যেমন তার পিতা থিওনের সূত্রে জানা যায় যে, হাইপেশিয়া আলমাজেস্টের উপর তার লেখা ভাষ্যটির পুনঃপরীক্ষণ করেছিলেন।
  • তার অধিকাংশ কীর্তি সম্বন্ধে যা জানা যায় তার প্রায় পুরো অংশেরই দলিল গৃহীত হয়েছে সাইনেসিয়াসের পত্রাবলী থেকে। সাইনেসিয়াস উল্লেখ করেন যে হাইপেশিয়া একটি অ্যাস্ট্রোল্যাব এবং একটি হাইড্রোস্কোপ তৈরিতে মনোনিবেশ করেছিলেন। উল্লেখ্য সপ্তদশ শতাব্দীতে পিয়ের দ্য ফের্মা হাইড্রোস্কোপকে হাইড্রোমিটার নামে নামাঙ্কিত করেন। যাহোক এ থেকে বুঝা যায় যে হাইপেশিয়া নিজেকে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং গণিতের চর্চায় উৎসর্গ করেছিলেন।

দর্শন[সম্পাদনা]

  • হাইপেশিয়া দুজন বিখ্যাত নব্য প্লেটোবাদী ব্যক্তিত্বের গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক শিক্ষা ও পদ্ধতির উপর ভাষণ প্রদান করতেন। এই দুজন হলেন প্লোটিনাস (২০৫-২৭০ খৃস্টপূর্বাব্দ) যিনি নব্য প্লেটোবাদের জনক হিসেবে খ্যাত এবং ল্যাম্বলিকাস (২৫০-৩৩০ খৃস্টপূর্বাব্দ) যিনি নব্য প্লেটোবাদের সিরিয় ধারায় উদ্ভাবক।
  • তার দর্শন ছিল তৎকালীন যুগের সাপেক্ষে অনেক পরিপক্ব ও বৈজ্ঞানিক এবং তার মাঝে পৌরাণিকতা ছিলনা বললেই চলে যদিও তার দর্শন সম্বন্ধে কোন সুস্পষ্ট দলিল বর্তমানে অবশিষ্ট নেই। দর্শনের ব্যাপারে তিনি আপোষহীনভাবে প্যাগান মতবাদের অনুসারী ছিলেন এবং তার এই চিন্তাধারার প্রকৃতি তৎকালীন অন্যান্য নব্য প্লেটোবাদী দর্শনধারা হতে স্বতন্ত্র ছিল।
  • তার দুটি বিখ্যাত উক্তি থেকে তার দর্শনের অকাট্যতা প্রতিভাত হয়:
    • তোমার চিন্তা করার অধিকার সংরক্ষণ কর। এমনকি ভুলভাবে চিন্তা করা একেবারে চিন্তা না করা থেকে উত্তম।
    • কুসংস্কারকে সত্য হিসেবে শিক্ষা দেয়া একটি ভয়ংকরতম বিষয়।

তার এই সকল চিন্তাধারাই হয়তোবা সিরিলকে এতোটা উত্তেজিত করে থাকবে যে সে খৃস্টান জনতাকে এতোটা উন্মত্ত করতে সমর্থ হয়েছিল। আর এরই পরিণতিতে নিহত হতে হয় হাইপেশিয়াকে।

সহায়ক পাঠ্য[সম্পাদনা]

  • হাইপেশিয়ার রূপ-সৌন্দর্য্য তার দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সাথে একীভূত হয়ে তাকে আপূর্ব মহিমা দান করেছিল। তাই তৎকালীন যুগে এতোটা বিখ্যাত হয়েছিলেন। এর সাথে তার করুণ মৃত্যু যোগ হয়ে তাকে অমরত্ব দান করেছে। তার জীবন তাই অনেক লেখককেই উৎসাহিত করেছে। তার জীবনী নিয়ে একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হল চার্লস কিংসলির লেখা "হাইপেশিয়া"

সূত্র[সম্পাদনা]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

বহিঃস্থ লিংক[সম্পাদনা]

  1. Petta, Adriano; Colavito, Antonino (২০০৯)। Hypatia, scientist of Alexandria, 8th March 415 A.D.। Lampi di stampa।