হরমুজ দ্বীপ
| হরমুজ দ্বীপ | |
|---|---|
| দ্বীপ | |
হরমুজ দ্বীপের স্যাটেলাইট ছবি | |
![]() | |
| ইরানে অবস্থান | |
| স্থানাঙ্ক: ২৭°০৪′০৩″ উত্তর ৫৬°২৭′৩৬″ পূর্ব / ২৭.০৬৭৫০° উত্তর ৫৬.৪৬০০০° পূর্ব | |
| দেশ | |
| প্রদেশ | হরমোজগান |
| আয়তন | |
| • স্থলভাগ | ৪২ বর্গকিমি (১৬.২ বর্গমাইল) |
| উচ্চতা | ১৮৬ মিটার (৬১০ ফুট) |
| জনসংখ্যা | |
| • মোট | প্রায় ৬,০০০ |
| সময় অঞ্চল | IRST (ইউটিসি+৩:৩০) |


হরমুজ দ্বীপ (ফার্সি: جزیره هرمز, রোমানাইজড: জাজিরেহ-য়ে হরমুজ) নামে পরিচিত, যা হরমুজ, ওরমুজ বা ওরমুস নামেও লেখা হয়, এটি পারস্য উপসাগরে অবস্থিত একটি ইরানি দ্বীপ।
ভৌগোলিক অবস্থান
[সম্পাদনা]হরমুজ দ্বীপের আয়তন ৪২ বর্গ কিলোমিটার। এটি হরমুজ প্রণালীতে ইরানের উপকূল থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং হরমুজগাণ প্রদেশের একটি অংশ। দ্বীপটিতে জনবসতি খুব কম, তবে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিক থেকে কিছু উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে।
ভূতত্ত্ব
[সম্পাদনা]দ্বীপ এবং এর সৈকতে পাওয়া লালচে গিরিমাটি, যা স্থানীয়দের কাছে 'গোলাক' নামে পরিচিত, তা শৈল্পিক ও রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয় এবং এটি পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে। গিরিমাটির অত্যধিক ব্যবহারের কারণে পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা রোধ করতে পরিবেশ বিভাগ এটিকে রক্ষার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছে।[১]
উপগ্রহ চিত্রে পাথরের কেন্দ্রমুখী বিন্যাস দেখে বোঝা যায় যে, হরমুজ দ্বীপটি আসলে একটি সল্ট ডায়াপির । এটি প্রাচীন সমুদ্রের লবণ জমা হয়ে গঠিত হয়েছে। যেহেতু এখানে লবণ দ্রবীভূত করার মতো ভূগর্ভস্থ জল বা বৃষ্টির অভাব রয়েছে এবং লবণের নমনীয়তার কারণে এটি বরফের মতো প্রবাহিত ও সংকুচিত হতে পারে, তাই উপরের অন্যান্য পলির চাপের কারণে লবণ হাজার হাজার বছর ধরে পৃষ্ঠের উপরে উঠে এসেছে। এই দীর্ঘ সময়ে এটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বিভিন্ন আকার ধারণ করেছে। হরমুজ দ্বীপের ভূতাত্ত্বিক বয়স প্রায় ৬০০ মিলিয়ন বছর এবং এটি পানির উপরে এসেছে প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে।[২]
পরিবেশ
[সম্পাদনা]ইরানের দক্ষিণ উপকূল তার শুষ্ক আবহাওয়া এবং নোনা জলের জন্য পরিচিত। হরমুজ দ্বীপের জলপথ এবং বুনো পাখিরা বহু পর্যটককে আকর্ষণ করে। এই দ্বীপে আছে ম্যানগ্রোভ গাছের বন, যা 'সি ফরেস্ট' নামে পরিচিত। এই গাছগুলো নোনা জলের জোয়ারভাটার এলাকায় বেঁচে থাকে। মাঝে মাঝে এদের বেশিরভাগই সমুদ্রের জলে ডুবে যায়, কিন্তু তা সত্ত্বেও এরা টিকে থাকে।[৩]
এখানে এক ধরনের ঘাসও জন্মায়, যার বেঁচে থাকার জন্য মিষ্টি জলের প্রয়োজন হয় না। একটি লোককাহিনী অনুসারে, এই কিংবদন্তি ঘাসটি নাকি আদম (আ.)-এর চোখের জল থেকে জন্মেছিল। দ্বীপটিকে বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনাল একটি গুরুত্বপূর্ণ পাখির এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে। কারণ এটি সন্ডার্সের ট্যার্ন , গ্রেট থিক-নি এবং সুটি গাল -এর মতো পাখিদের আবাসস্থল।[৪]
ইতিহাস
[সম্পাদনা](মূল নিবন্ধ: ওরমুজ)
প্রারম্ভিক ইতিহাস
হরমুজ দ্বীপে মানুষের উপস্থিতির সবচেয়ে পুরোনো প্রমাণ হলো কিছু পাথরের জিনিসপত্র, যা দ্বীপের পূর্ব উপকূল থেকে খুঁজে পাওয়া গেছে। 'চাঁদ-দেরাখত' নামে একটি জায়গায়, যা একটি উঁচু সামুদ্রিক প্লেইস্টোসিন সোপান, সেখানে পাথরের তৈরি নানা সামগ্রী পাওয়া গিয়েছিল। এই জায়গাটিতে মধ্য প্যালিওলিথিক যুগের পাথরের জিনিসপত্র পাওয়া গেছে, যা লেভালোইস পদ্ধতি (Levallois methods) দ্বারা চিহ্নিত এবং এর সময়কাল ৪০,০০০ বছরেরও বেশি পুরোনো।[৫]
মধ্যযুগীয় ইতিহাস
[সম্পাদনা]প্রাচীন গ্রিকদের কাছে এই দ্বীপটি 'অর্গানা' এবং ইসলামিক যুগে 'জারুন' নামে পরিচিত ছিল। এটি মূল ভূখণ্ড থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী 'হরমুজ' (ওরমুজ) থেকে এর বর্তমান নামটি পেয়েছে। সেই বন্দরটি ছিল প্রণালীর দুই পাশ জুড়ে বিস্তৃত একটি ছোট রাজ্যের কেন্দ্র। এই রাজ্যটি মোঙ্গল শাসিত ইলখানাতকে কর দিত এবং এটি সামুদ্রিক বাণিজ্য থেকে আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল।[৬]
১৩০০ সালের দিকে, শাসক অভ্যন্তরীণ মঙ্গোলিয়ান ও তুর্কি গোষ্ঠীর আক্রমণ এড়াতে তার বাসস্থান দ্বীপে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। পরে তিনি ইলখানদের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করেন।[৭]
বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতাও এই দ্বীপ এবং নতুন হরমুজ পরিদর্শন করেছিলেন।[৮]
প্রারম্ভিক আধুনিক যুগ
[সম্পাদনা]লাজারো লুইসের ১৫৬৩ সালের আরব এবং পারস্য উপসাগরের মানচিত্রে সিদাদে দে ওরমুজের চিত্র ছিল।১৫০৫ সালে পর্তুগালের রাজা প্রথম ম্যানুয়েল আফ্রিকা এবং পশ্চিম এশিয়ায় সাম্রাজ্য বিস্তারের নীতি গ্রহণ করেন। ভারত মহাসাগরে পর্তুগিজ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার সময়, পর্তুগিজ ডিউক আফনসো দে আলবুকের্ক ১৫০৭ সালে দ্বীপটি দখল করেন এবং এটি বৃহত্তর পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। পর্তুগিজরা সম্ভাব্য আক্রমণকারীদের প্রতিহত করতে দ্বীপটিতে একটি দুর্গ নির্মাণ করে, যার নাম দেয় 'ফোর্ট অফ আওয়ার লেডি অফ দ্য কনসেপশন'। এই দ্বীপটি গোয়া, গুজরাট এবং কাছাকাছি কিশম দ্বীপে যাতায়াতকারী পর্তুগিজ জাহাজগুলোর জন্য একটি জরুরি যাত্রাবিরতির স্থানে পরিণত হয়। ১৫৫২ সালে অ্যাডমিরাল এবং মানচিত্রকর পিরি রেইসের নেতৃত্বে অটোমানরা দ্বীপটি অবরোধ করে। ১৫৭৫ সালে একদল অগাস্টিনিয়ান হারমিট (ধর্মযাজক) দ্বীপে বসতি স্থাপন করে এবং ১৬০২ সালে এখান থেকে ইসফাহানে একটি মিশন প্রতিষ্ঠা করে।[৯][১০]
পারস্যের শাহ প্রথম আব্বাস স্থানীয় লোকদের বিশ্বাস করতেন না এবং তিনি দ্বীপটিকে বাণিজ্যিক কেন্দ্র বা সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ধরে রাখতে আগ্রহী ছিলেন না। এর পরিবর্তে তিনি কাছাকাছি মূল ভূখণ্ডের বন্দর আব্বাসকে উন্নত করেন। এরপর হরমুজ দ্বীপের গুরুত্ব কমতে থাকে। এর অনেক বাসিন্দা বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মূল ভূখণ্ডের পুরনো হরমুজের আশেপাশের খেত ও বাগানে চলে যেতেন, কেবল জেলেরা স্থায়ীভাবে সেখানে থাকত। দ্বীপটি থেকে তখনো সামান্য পরিমাণে শিলা লবণ এবং লোহার অক্সাইডের ডেলা রপ্তানি হতো, যা পালতোলা জাহাজের জন্য ভারি পাথর হিসেবে ব্যবহার করা হতো।[১১]
দর্শনীয় স্থান
[সম্পাদনা]লাল সৈকত
[সম্পাদনা]
পাহাড়টি সমুদ্রের একেবারে পাশেই থাকায় এখানে লাল রঙের সৈকত এবং লাল ঢেউ এক অসাধারণ দৃশ্যের জন্ম দেয়। সৈকত ধরে হাঁটলে এমন কিছু জায়গা দেখতে পাবেন যেখানে বালুকারাশি ধাতব যৌগ থাকার কারণে চকচক করে।[১২]
ড. নাদালিয়ান জাদুঘর
[সম্পাদনা]হরমুজ দ্বীপে অবস্থিত ড. নাদালিয়ানের জাদুঘর এবং গ্যালারিটি শিল্পী আহমাদ নাদালিয়ানের (জন্ম ১৯৬৩) কাজ প্রদর্শন করে।[১৩] তাঁর শিল্পকর্ম আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন গ্যালারিতে প্রদর্শিত হয়েছে। তাঁর পরিবেশ বিষয়ক শিল্প প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে পাথরের খোদাই করা শিল্পকর্ম।[১৪] এই জাদুঘরে স্থানীয় আদিবাসী মহিলাদের তৈরি শিল্পকর্ম, সামুদ্রিক প্রাণীর হাড় এবং পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ দিয়ে তৈরি পুতুলও দেখতে পাওয়া যায়।[১৫][১৬]
এই জাদুঘরটি ২০০৯ সালের মার্চ মাসে 'প্যারাডাইস আর্ট সেন্টার' নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং ২০১২ সালে এর বর্তমান নাম রাখা হয়। এই সময়েই স্থানীয় স্থাপত্যশৈলীর অনুপ্রেরণায় এর প্রবেশদ্বার নতুন করে ডিজাইন করা হয়েছিল।[১৭]
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]সূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "Hormuz, the rainbow island of Iran"। Tehran Times (ইংরেজি ভাষায়)। ১৪ অক্টোবর ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
- ↑ hormuz (২৫ মে ২০২৫)। "تفریحات ساحلی جزیره هرمز + چند فیلم"। هتل 🏝 تور 🏝 رستوران 🏝 در هرمز (ফার্সি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
- ↑ "هتل تور اقامتگاه و رستوران در جزیره هرمز"। هتل 🏝 تور 🏝 رستوران 🏝 در هرمز (ফার্সি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
- ↑ "Hormoz Island, Iran, Islamic Republic Of, Middle East Factsheet"। BirdLife DataZone (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
- ↑ জারেই, সেপেহর, (২০২১) হরমুজ দ্বীপে প্লাইস্টোসিন দখলের প্রথম প্রমাণ: একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন, মিহো জাদুঘরের বুলেটিন ২১:১০১-১১০।
- ↑ ভারতের কেমব্রিজ ইতিহাস, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৪৭
- ↑
এইচ. ইয়ুল, 'দ্য বুক অফ স্যার মার্কো পোলো', ১৯০৩, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১০-তে আবুলফিদা এবং ওডোরিককে উদ্ধৃত করে বলেছেন: "তাতারদের আক্রমণের কারণে হরমুজ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, এবং এর বাসিন্দারা মূল ভূখণ্ডের কাছে জারুন (Zarun) নামে একটি দ্বীপে তাদের বাসস্থান স্থানান্তরিত করেছিল, যা পুরোনো শহরের পশ্চিমে অবস্থিত।" - ↑ বতুতাহ, ইবনে (২০০২)। ইবনে বতুতার ভ্রমণ। লন্ডন: পিকাডর। পিপি ৯৮-৯৯, ৩০৮. আইএসবিএন ৯৭৮০৩৩০৪১৮৭৯৯
- ↑ "Wayback Machine" (পিডিএফ)। dergiler.ankara.edu.tr। ১৩ জুন ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত (পিডিএফ)। সংগ্রহের তারিখ ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
- ↑ Gorder, Christian A. Van (৫ জানুয়ারি ২০১০)। Christianity in Persia and the Status of Non-Muslims in Modern Iran (ইংরেজি ভাষায়)। Rowman & Littlefield। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৭৩৯১-৩৬১১-৯।
- ↑ "HORMUZ ii. ISLAMIC PERIOD"। Encyclopaedia Iranica (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
- ↑ "Hotel and Tours in Hormuz island"। هتل 🏝 تور 🏝 رستوران 🏝 در هرمز (ফার্সি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
- ↑ "About - Dr. Nadalian"। Dr. Nadalian (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
- ↑ "The Museum and Gallery of Dr. Ahamd Nadalian in Hormuz Island"। احمد نادعلیان (ফার্সি ভাষায়)। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
- ↑ "The Museum of Dr. Ahmad Nadalian in Hormuz| Travel to Iran"। alaedin.travel (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
- ↑ www.sirang.com, Sirang Rasaneh। "Dr. Ahmad Nadalian Museum & Gallery 2025 | Hormoz Island, Hormozgan | Sights - ITTO"। itto.org | Iran Tourism & Touring। সংগ্রহের তারিখ ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
- ↑ "WWW.RiverArt.Net- Environmental Works by A. Nadalian هنر رودخانه: آثار دكتر احمد نادعليان"। www.riverart.net। ১ মার্চ ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
