দয়ানন্দ সরস্বতী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী থেকে পুনর্নির্দেশিত)
দয়ানন্দ সরস্বতী
Dayananda Saraswati.jpg
জন্মমূলশঙ্কর তিওয়ারি বা মূলশঙ্কর কর্ষনদাস তিওয়ারি/ব্রহ্মচর্যের সময় শুদ্ধ চৈতন্য
(১৮২৪-০২-১২)১২ ফেব্রুয়ারি ১৮২৪
টঙ্কর, কোম্পানি রাজ (অধুনা গুজরাট, ভারত)
মৃত্যু৩০ অক্টোবর ১৮৮৩(1883-10-30) (বয়স ৫৯)
আজমির, ব্রিটিশ ভারত (অধুনা রাজস্থান, ভারত)
জাতীয়তাব্রিটিশ ভারতীয়
আখ্যাSindhi Marhu
প্রতিষ্ঠাতাআর্য সমাজ
গুরুবিরজানন্দ দন্ডী
দর্শনচার বেদ সংহিতার উপর গড়ে ওঠা ত্রৈতবাদী বৈদিক দর্শন এবং এটি ষড় দর্শনের পাশাপাশি নিরুক্ত ও নিঘণ্টুতেও পাওয়া যায় যা পাণিনিয় ব্যাকরণ সমর্থিত।
সাহিত্য কর্মসত্যার্থ প্রকাশ (১৮৭৫), "সংস্কার বিধি"
উদ্ধৃতি"ওঁ বিশ্বানি দেব সবিতর্দুরিতানি পরা সুব। য়দ্ভদ্রং তন্ন আ সুব।।"

দয়ানন্দ সরস্বতী (গুজরাটি દયાનંદ સરસ્વતી; এই শব্দ সম্পর্কেশুনুন ; ১২ ফেব্রুয়ারি ১৮২৪, টঙ্কর[১] – ৩০ অক্টোবর ১৮৮৩, আজমির[২]) একজন গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু ধর্মগুরু, সমাজ সংস্কারক এবং আর্যসমাজের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। পশ্চিম ভারতের কাথিয়াওয়াড়ের মোরভি শহরে এক ধনাঢ্য নিষ্ঠাবান সামবেদী ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার গার্হস্থ্যাশ্রমের নাম মূলশংকর। বাল্যশিক্ষা পিতার কাছেই লাভ করেন। ইংরেজি শিক্ষার সুযোগ না হওয়ায় প্রথম থেকেই তিনি সংস্কৃতশাস্ত্র উত্তমরূপে আয়ত্ত্ব করেন এবং ধীরে ধীরে সমগ্র যজুবেদ ও আংশিকভাবে অপর তিন বেদ, ব্যাকরণ, তর্ক ও দর্শনশাস্ত্র, কাব্য, অলংকার, স্মৃতি প্রভৃতিতে যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে বিখ্যাত কাশী শাস্ত্রার্থে তিনি তৎকালীন পন্ডিতবর্গকে পরাজিত করে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছিলেন।

যারা দয়ানন্দের দ্বারা প্রভাবিত ও অনুসরণ করেছিলেন তাদের মধ্যে রাই সাহেব পুরান চাঁদ, ম্যাডাম কামা, পণ্ডিত লেখ রাম, স্বামী শ্রদ্ধানন্দ,[৩] শ্যামজি কৃষ্ণ বর্মা, কিষান সিং, ভগত সিং, বিনায়ক দামোদর সাভারকর, ভাই পরমানন্দ, লালা হরদয়াল, মদন লাল ধিংরা, রাম প্রসাদ বিসমিল, মহাদেব গোবিন্দ রণাদে, আশফাক উল্লাহ খান,[৪] মহাত্মা হংসরাজ, লালা লাজপত রায়,[৫][৬] এবং যোগমায়া নৃপানে।[৭]

প্রাথমিক জীবন (২২বছর; ১৮৪৬ পর্যন্ত)[সম্পাদনা]

দয়ানন্দ সরস্বতী ১২ ফেব্রুয়ারি ১৮২৪ সাল একটি সভ্রান্ত হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে কাথিয়াবাড় অঞ্চলে (বর্তমানে গুজরাটের মর্ভি জেলা) জন্মগ্রহণ করেছিলেন।[৮][৯][১০] তার আসল নাম ছিল মূলশঙ্কর তিওয়ারী । তাঁর পিতার নাম কর্ষণজী লাল তিওয়ারী, এবং মাতার নাম যশোদাবাই।

আট বছর বয়সে, যজ্ঞোপবিত সংস্করণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রবেশের সূচনা করেন। বাল্যশিক্ষা পিতার কাছেই লাভ করেন। ইংরেজি শিক্ষার সুযোগ না হওয়ায় প্রথম থেকেই তিনি সংস্কৃতশাস্ত্র উত্তমরূপে আয়ত্ত্ব করেন এবং ধীরে ধীরে সমগ্র যজুবেদ ও আংশিকভাবে অপর তিন বেদ, ব্যাকরণ, তর্ক ও দর্শনশাস্ত্র, কাব্য, অলংকার, স্মৃতি প্রভৃতিতে যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। শিবভক্ত পিতার মতো বাল্যকালে তিনিও শিবভক্ত ছিলেন। একবার শিবরাত্রির উপবাস থাকাকালে তিনি কিছু ইঁদুরকে শিবমূর্তির উপর দিয়ে দৌড়াতে ও ভক্তের দেওয়া নৈবদ্য খেতে দেখে তার মনে সংশয় হয়। শিব যদি ইঁদুরের বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করতে না পারেন, তাহলে তিনি কীভাবে পৃথিবীর ত্রাণকর্তা হতে পারেন?[১১]

তার ছোট বোন ও কাকা কলেরায় মৃত্যুবরণ করেন। তখন তিনি মৃত্যুচিন্তা এবং অমরত্ব লাভের উপায় অনুসন্ধান করতে লাগলেন যা মূলশঙ্করকে বৈরাগ্যের পথে পরিচালিত করেছিল। তার এই অবস্থা দেখে তার বাবা মা চিন্তিত হন। তার পরিবার তাকে বিয়ে দেওয়ার চিন্তা করে, কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে বিয়ে তার জন্য নয় এবং ১৮৪৬ সালে ২২ বছর বয়েসে বিয়ের দিন তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে যান।[১২] [১৩]

জীবনের দ্বিতীয়াংশ (৪২বছর; ১৮৬৬ পর্যন্ত)[সম্পাদনা]

গুরু বিরজানন্দ দণ্ডিশ

দয়ানন্দ সরস্বতী ১৮৪৬ থেকে ১৮৬০ সাল পর্যন্ত সত্যেন্বাষণ ও অমৃতের সন্ধানে প্রায় ১৫ বছর নর্মদা নদীর অরণ্য সঙ্কুল তীরভূমি হতে আরম্ভ করে হিমালয়ের বরফাচ্ছন্ন শিখর দেশ পর্যন্ত বিভিন্ন মঠে, মন্দিরে সাধুসঙ্গে ও যোগসাধনায় অতিবাহিত করেন। এ সময়ে তার সাথে বিভিন্ন সাধু-সন্যাসীর পরিচয় হয়। তিনি জোয়ালানন্দ পুরী ও শিবানন্দ গিরির নিকট যোগবিদ্যা শিক্ষা নেন। তিনি পূর্ণনন্দ সরস্বতী নামক সন্যাসীর নিকট হতে সন্যাস গ্রহণ করেন, তখন তার নাম হয় দয়ানন্দ সরস্বতী। মথুরায় তিনি বিরজানন্দ দন্দীশা নামে একজন গুরুর শিষ্য হন। বিরজানন্দ বিশ্বাস করতেন যে হিন্দুধর্ম তার মূল ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং এর অনেক অনুশীলন অশুদ্ধ হয়ে গেছে। ১৯৬৫ সালে তাহার নিকট ছয়বছর অধ্যয়ন শেষে দয়ানন্দ সরস্বতী বিরজানন্দকে দক্ষিণাস্বরূপ প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি হিন্দু বিশ্বাসে বেদের যথাযথ স্থান পুনরুদ্ধারে তার জীবন উৎসর্গ করবেন। [১৪]

মতবাদ প্রচার (৫৯বছর; ১৮৮৩ পর্যন্ত)[সম্পাদনা]

১৯৬২ সালের ভারতের ডাকটিকিটে দয়ানন্দ সরস্বতী

বিরজানন্দের নিকট শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি বৈদিক মত প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান। এ সময় বহু পণ্ডিতের সাথে তার ধর্মীয় বিতর্ক হয়। তাঁর যুক্তি এবং সংস্কৃত ও বেদ জ্ঞানের শক্তির দ্বারা তিনি বারবার বিজয়ী হন।[১৫]১৮৬৯ সালে ১৭ই নভেম্বর বারাণসীর কাশীতে অবস্থান কালে ২৭ জন বিদ্যান এবং ১২ জন বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতের সাথে তার বিতর্কের আয়োজন হয়। বিতর্কের মূল বিষয় ছিল, ”বেদ মূর্তিপূজা সমর্থন করে?”[১৬] বিতর্কে ৫০,০০০ এরও বেশি লোকের উপস্থিতি হয়েছিল বলে জানা যায়। বিতর্ক ছাড়াও তিনি বহু সমাবেশে বক্তৃতা রাখতেন, এবং তার ব্যাখ্যা শুনতে বহু লোকের সমাগম হতো, যার ফলে বহু লোক বৈদিক মতবাদে প্রভাবিত হয়।[১৬] তৎকালিন কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু পণ্ডিতেরা বৈদিক শাস্ত্র পাঠ হতে সাধারণ মানুষকে নিরুৎসাহিত করত এবং গঙ্গা নদীতে স্নান ও বার্ষিকীতে পুরোহিতদের খাওয়ানোর মতো আচার-অনুষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করত, যা দয়ানন্দ কুসংস্কার বা স্ব-পরিচর্যা প্রথা বলে প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি বামমার্গী, শৈব ও বৈষ্ণব মতকে ভ্রান্ত বলে তাদের কুসংস্কারমূলক ধরাণা প্রত্যাখ্যান করার পরামর্শ দিতেন। তাদের ভস্মলেপন, রুদ্রাক্ষ, তিলক ধারণ করাকে অপ্রয়েজনীয় মনে করতেন। তার মতে সাধনার জন্য বাহ্যিক চিহ্ন ধারণ করার প্রয়োজন নেই। ইহা পশুবৎ মানুষের কর্ম।[১৭] দয়ানন্দ সরস্বতী নিরাকার একেশ্বরবাদের মত প্রচার করেছিলেন। তিনি বেদ ভিত্তিক বৈদিক সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন।[১৭] বৈদিক শাস্ত্রের প্রতি মানুষের বিমূখতার জন্য তিনি বৈদিক বিদ্যালয়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং বিভিন্ন স্থানে বৈদিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।[১৬] জাতিকে বৈদিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা এবং বৈদিক জীবনধারা অনুসরণ করানো ছিল তার লক্ষ। এর জন্য তিনি একটি সংগঠন তৈরির গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। তিনি নারীদের সমান অধিকার ও সম্মানের কথা বলেন। লিঙ্গ, বর্ণ নির্বিশেষে সকল শিশুর বেদ শিক্ষার পক্ষে মত দিয়েছেন। বলিপ্রথা, বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধেও তিনি কথা বলেছেন।[১৮][১৭] তিনি সকলকে মাংস ভক্ষণ করতে নিষেধ করেন। তিনি হিন্দু জাতিকে জাতীয় সমৃদ্ধির জন্য গরুর গুরুত্ব এবং জাতীয় সংহতি স্থাপনের জন্য হিন্দিকে জাতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণসহ বিভিন্ন সামাজিক সংস্কার গ্রহণের আহ্বান জানান। যোগব্যায়াম, আসন, শিক্ষা, প্রচার, উপদেশ এবং লেখার মাধ্যমে তিনি হিন্দু জাতিকে স্বরাজ্য , জাতীয়তাবাদ এবং আধ্যাত্মিকতার আকাঙ্ক্ষায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে প্রভাবিত করার জন্য দয়ানন্দ সরস্বতী সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। তাঁর মতামত এবং লেখা বিভিন্ন লেখক ব্যবহার করেছেন। শ্যামজী কৃষ্ণ বর্মা সহ সুভাষ চন্দ্র বসু ; লালা লাজপত রায় ; ম্যাডাম কামা ; বিনায়ক দামোদর সাভারকর ; লালা হরদয়াল ; মদন লাল ধিংরা ; রাম প্রসাদ বিসমিল ; মহাদেব গোবিন্দ রণাদে ;  স্বামী শ্রদ্ধানন্দ ; এস সত্যমূর্তি ; পণ্ডিত লেখ রাম ; মহাত্মা হংসরাজ ; এবং অন্যদের প্রভাবিত করেছিলেন।

আর্যসমাজ প্রতিষ্ঠা[সম্পাদনা]

ও৩ম্ বা ওঁ কে আর্য সমাজ ঈশ্বরের সর্বোচ্চ এবং শ্রেষ্ঠ নাম হিসাবে প্রচার করে।

বোম্বায়ে অবস্থান কালে প্রার্থনা সমাজের সাথে দয়ানন্দের পরিচয় হয়। দয়ানন্দের মতের সাথে প্রার্থনা সমাজের বিশেষ বিরোধ না থাকায় তিনি এই সভার নাম পরিবর্তন করে আর্যসমাজ রাখার প্রস্তাব দেন। কিন্তু প্রস্তাব গ্রহণ না হলেও তিনি আর্যসমাজ প্রতিষ্ঠায় পিছু পা হন না। ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দের ৭মার্চ তারিখে ২৩ জন সদস্য় নিয়ে বোম্বায়ে তিনি প্রথম আর্যসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। গিরিধারীলাল দয়ালদাস ছিলেন বোম্বাই আর্যসমাজের সভাপতি, এবং কর্শনদাস সম্পাদক পদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রথমে ২৮টি মূলনীতির উপর এবং পরে ১০টি মূলনীতিতে আর্যসমাজ প্রতিষ্ঠত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৭৭ সালে লাহোরে, ১৮৭৮ সালে মুলতানে ও মিরাটে, ১৮৮১ সালে আগ্রা ইত্যাদি স্থানে আর্যসমাজ প্রতিষ্ঠিত করেন। ব্রাহ্ম সমাজের অনেক অনুসারীই সেসময় আর্য সমাজে যোগ দান করে।

বেদ ভাষ্য প্রণয়ন[সম্পাদনা]

তিনি মনে করতেন ব্রাহ্মণরা বেদ হতে বিচ্যুত হয়ে পড়ায় হিন্দু সমাজ ধ্বংশ হয়ে পড়ছে। সায়ান, মহীধর, উবট, ম্যাক্স মুলার প্রভৃতি বেদ ভাষ্যকাররা বেদের যথার্থ অর্থ নিরূপন করতে সমর্থ হননি।[১৬][১৯] তাই তিনি ১৮৭৬ সালে (১৯৩৩ বিক্রমাব্দ, ভাদ্রমাসের শুক্ল প্রতিপদ তিথি, রবিবার) বেদ ভাষ্য প্রণয়ন করার সংকল্প নিয়ে “ঋগ্বেদাদিভাষ্য ভূমিকা” রচনা শুরু করেন।[১৯] তার জিবদ্দশায় তিনি সম্পূর্ণ যজুর্বেদ ও ঋগ্বেদের(৭/৬১/১,২ পর্যন্ত) ভাষ্য রচনা করেছিলেন। তিনি সেই ভাষ্যে কোনো প্রকার স্বকপোলকল্পিত বক্তব্য সংযুক্ত না করে, প্রাচীন আর্ষ শাস্ত্র অনুসারেই বেদের ভাষ্য প্রণয়ন করেন।[১৯] তথাপি তার ভাষ্য তৎকালীন পৌরাণিক ব্রাহ্মণদের মাঝে গৃহিত হয়নি।[১৬]

হত্যার চেষ্টা[সম্পাদনা]

দয়ানন্দ তার জীবনে অনেক ব্যর্থ হত্যার চেষ্টার শিকার হন। পৌরাণিক পণ্ডিতদের ও মূর্তীপূজার বিরোধিতা করায় তার উপর বহুবার আক্রমণের চেষ্টা করা হয়। তার অনুসারীদের মতে, কয়েকবার তাকে বিষ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তার নিয়মিত যোগাভ্যাসের কারণে তিনি এই ধরনের সব প্রচেষ্টা থেকে বেঁচে যান। হামলাকারীরা একবার তাকে একটি নদীতে ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু দয়ানন্দ হামলাকারীদের নদীতে টেনে নিয়ে যায়, যদিও তারা তাদের ডুবে যাওয়ার আগে ছেড়ে দেয়।

আরেকটি ঘটনায় জানা যায়, গঙ্গা নদীর তীরে ধ্যান করার সময় ইসলামের সমালোচনায় ক্ষুব্ধ মুসলমানদের দ্বারা তিনি আক্রান্ত হন। তারা তাকে পানিতে ফেলে দেয় কিন্তু দাবি করা হয় যে সে নিজেকে বাঁচিয়েছে কারণ তার প্রাণায়াম অনুশীলন তাকে আক্রমণকারীদের চলে যাওয়া পর্যন্ত পানির নিচে থাকতে দেয়।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

১৮৮৩ সালে যোধপুরের মহারাজা দ্বিতীয় যশবন্ত সিং দয়ানন্দজীকে তাঁর প্রাসাদে থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানান। তিনি দয়ানন্দের শিষ্য হতে আগ্রহী ছিলেন। দয়ানন্দ থাকাকালীন সময়ে একদিন মহারাজার বিশ্রামাগারে গিয়ে তাকে নানহী জান নামে এক নৃত্যশিল্পীর সাথে দেখেছিলেন। দয়ানন্দ মহারাজাকে নারী ও সমস্ত অনৈতিক কাজ ত্যাগ করতে বলেন এবং প্রকৃত আর্যের মত আচরণ করতে বলেন। দয়ানন্দের এই পরামর্শ নানহীকে ক্ষুব্ধ করেছিল, যিনি প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ১৮৮৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর, তিনি দয়ানন্দের রাঁধুনি জগন্নাথকে ঘুষ দিয়েছিলেন তার কাঁচের ছোট টুকরো তার রাতের দুধে মেশানোর জন্য। দয়ানন্দকে ঘুমানোর আগে দুধ পরিবেশন করা হয়েছিল, যা তিনি পান করেছিলেন। যার কারণে বেশ কয়েক দিন শয্যাশায়ী হয়ে তীব্র যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। মহারাজা দ্রুত তার জন্য চিকিৎসকের সেবার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু ডাক্তাররা আসার সময়, তার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়, এবং তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছিল। দয়ানন্দের কষ্ট দেখে রাঁধুনি জগন্নাথ অপরাধবোধ করেন এবং দয়ানন্দের কাছে তার অপরাধ স্বীকার করেন। মৃত্যুশয্যায় থাকা দয়ানন্দ তাকে ক্ষমা করে দেন, এবং তাকে এক ব্যাগ অর্থ দেন যাতে মহারাজার লোকেরা তাকে পাওয়ার আগে সে রাজ্য থেকে পালিয়ে যেতে পারে।

পরবর্তীতে, মহারাজা তাকে রেসিডেন্সির পরামর্শ অনুযায়ী মাউন্ট আবুতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। আবুতে কিছু সময় থাকার পর, ১৮৮৩ সালের ২৬ অক্টোবর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য আজমির পাঠানো হয়।  তার স্বাস্থ্যের কোন উন্নতি হয়নি এবং তিনি ৩০ অক্টোবর দীপাবলির দিনে মন্ত্র জপ করে মারা যান।

রচিত গ্রন্থের তালিকা[সম্পাদনা]

দয়ানন্দ সরস্বতী সব মিলিয়ে ৬০ টিরও বেশি কাজ লিখেছিলেন। দয়ানন্দ সরস্বতী রচিত গ্রন্থাদির বিস্তৃত একটি তালিকা এখানে উল্লেখ করা হলোঃ

  • সন্ধ্যা (অনুপলব্ধ) - ১৮৬৩
  • ভাগবত খণ্ডনম্ বা পাখণ্ড খণ্ডনম্
  • ম বা বৈষ্ণবমত খণ্ডনম্ (১৮৬৬)[২০]
  • অদ্বৈতমত খণ্ডনম্
  • পঞ্চমহাযজ্ঞ বিধি (১৮৭৪ - ১৮৭৭)
  • সত্যার্থ প্রকাশ (১৮৭৫ ও ১৮৮৪)
  • বেদান্তিধবন্ত নিবারণ (১৮৭৫)
  • বেদবীরুদ্দিন মাত খানদান বা বল্লভাচার্য মাত খানদান (১৮৭৫)
  • শিক্ষাপত্র ধবন্ত নিবারণ বা স্বামীনারায়ণ মাত খানদান (১৮৭৫)
  • বেদভাষ্যম নমুনে কা প্রথমাঙ্ক (১৮৭৫)
  • বেদভাষ্যম নমুনে কা দ্বিতীয়াঙ্ক (১৮৭৬)
  • আর্যভাববিনয় (অসম্পূর্ণ) (১৮৭৬)
  • সংস্কারবিধি (১৮৭৭ ও ১৮৮৪)
  • আর্যোদ্দেশ্যরত্নমালা (১৮৭৭)
  • ঋগ্বেদাদিভাষ্যভূমিকা (১৮৭৮)
  • ঋগ্বেদভাষ্য (শুধুমাত্র ৭/৬১/১,২) (অসম্পূর্ণ) (১৮৭৭ থেকে ১৮৯৯)
  • যজুর্বেদভাষ্য (সম্পূর্ণ) (১৮৭৮ থেকে ১৮৮৯)
  • অষ্টাধ্যায়ী ভাষ্য (২ অংশ) (অসম্পূর্ণ) (১৮৭৮ থেকে ১৮৭৯)
  • বেদাঙ্গ প্রকাশ (১৬ টি বইয়ের সেট)
    • বর্ণোচ্চারণ শিক্ষা (১৮৭৯)
    • সংস্কৃত বাক্যপ্রবোধিনী (১৮৭৯)
    • ব্যাব্যাহারভানু (১৮৭৯)
    • সান্ধী বিশাই
    • নামিক
    • কারাক
    • সামসিক
    • তাদ্দিত
    • অব্যার্থ
    • আখযাতিক
    • সাউভার
    • প্যারিভাসিক
    • ধাতুপথ
    • গণপথ
    • উনাদিকোশ
    • নিঘর্ন্টু
  • গৌতম অহল্যা কি কথা (অনুপলব্ধ) (১৮৭৯)
  • ভ্রান্তিনিবারণ (১৮৮০)
  • ভ্রমোচ্ছেদন (১৮৮০)
  • অনুভ্রমোচ্ছেদন (১৮৮০)
  • গোকরুণানিধি (১৮৮০)
  • চতুর্বেদ বিষয় সুচি (১৯৭১)
  • গদরভ তপনী উন্নিশাদ (বাবু দেবদেবনাথ মুখোপাধ্যায় অনুসারে) (অনুপলব্ধ)
  • হুগ্লি শাস্ত্রার্থ তাথা প্রতিমা পূজন বিচার (১৮৭৩)
  • জযালন্ধর শাস্ত্রার্থ (১৮৭৭)
  • সত্যসত্য বিবেক (বারেলি শাস্ত্র) (১৮৭৯)
  • সত্যধর্ম বিচার (মেলা চন্দপুর) (১৮৮০)
  • কাশী শাস্ত্রার্থ (১৮৮০) দ্রষ্টব্য:- অন্যান্য বিবিধ শাস্ত্রার্থের জন্য দয়া করে পড়ুন
  • আর্য সমাজ কে নিয়ম অউর উপনিয়ম (৩০ নভেম্বর ১৮৭৪)
  • উপদেশ মঞ্জুরী (পুনা প্রবচন) (৪ জুলাই ১৮৭৫)
  • স্বামী দয়ানন্দ দ্বার স্বকাথিত জনম চরিত (পুনা প্রবচনের সময়) (৪ আগস্ট ১৮৭৫)
  • মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী জীবন চরিতা ফটো গ্যালারী[২১]
  • থিওসোফিস্ট সোসাইটির মাসিক জার্নালের জন্য স্বামী দয়ানন্দ দ্বার স্বকাথিত জনম চরিতা: নভেম্বর ও ১লা ডিসেম্বর
  • ঋষি দয়ানন্দ কে পাত্র অউর বিজ্ঞানপান

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Tankara"www.tankara.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১০-২৯ 
  2. "Maharishi Swami Dayanand Saraswati - VCC"www.vedicculturalcentre.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১০-২৯ 
  3. "Gurudatta Vidyarthi"। Aryasamaj। সংগ্রহের তারিখ ১৯ ডিসেম্বর ২০১২ 
  4. "Mahadev Govind Ranade: Emancipation of women"। Isrj.net। ১৭ মে ১৯৯৬। সংগ্রহের তারিখ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১২ 
  5. "Life History of Lala Lajpat Rai"www.culturalindia.net (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১০-২৯ 
  6. Lala Lajpat Rai (Indian writer, politician and Escort)Britannica Online Encyclopedia
  7. Neupane, Dr. Kedar (২০১৪)। बहुमुखी व्यक्तित्वकी धनी योगमाया by Pawan Alok। Nepal Shrastha Samaj। পৃষ্ঠা 15–21। আইএসবিএন 978-9937-2-6977-3 
  8. Robin Rinehart (২০০৪)। Contemporary Hinduism: Ritual, Culture, and Practice। ABC-CLIO। পৃষ্ঠা 58–। আইএসবিএন 978-1-57607-905-8 
  9. "Devdutt Pattanaik: Dayanand & Vivekanand"। ১৫ জানুয়ারি ২০১৭। 
  10. ઝંડાધારી – મહર્ષિ દયાનંદ – Gujarati Wikisource
  11. "History of India"indiansaga.com। সংগ্রহের তারিখ ৫ অক্টোবর ২০১৮ 
  12. "Dayanand Saraswati"iloveindia.com। সংগ্রহের তারিখ ১৪ জানুয়ারি ২০১৬ 
  13. "Swami Dayanand Saraswati"culturalindia.net। সংগ্রহের তারিখ ১৪ জানুয়ারি ২০১৬ 
  14. "Sarasvati, Dayananda – World Religions Reference Library"। World Religions Reference Library  – via HighBeam Research (সদস্যতা প্রয়োজনীয়)। ১ জানুয়ারি ২০০৭। ১০ জুন ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৫ সেপ্টেম্বর ২০১২ 
  15. "Swami Dayananda Sarasvati by V. Sundaram"Boloji। সংগ্রহের তারিখ ১৪ জানুয়ারি ২০১৬ 
  16. দয়ানন্দচরিত। শ্রীদেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। 
  17. সত্যার্থ প্রকাশ। দয়ানন্দ সরস্বতী। 
  18. সংস্কারবিধি। দয়ানন্দ সরস্বতী। 
  19. ঋগ্বেদাদিভাষ্য ভূমিকা। দয়ানন্দ সরস্বতী। 
  20. Swami Dayanand Saraswati। Bhagwat Khandan - Swami Dayanand Saraswati 
  21. "Maharshi Dayanand Jivan Charitra"www.aryasamajjamnagar.org। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-১১-০৭ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]