দয়ানন্দ সরস্বতী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী থেকে পুনর্নির্দেশিত)
দয়ানন্দ সরস্বতী
Dayananda Saraswati.jpg
জন্মমূলশঙ্কর তিওয়ারি বা মূলশঙ্কর কর্ষনদাস তিওয়ারি/ব্রহ্মচর্যের সময় শুদ্ধ চৈতন্য
(১৮২৪-০২-১২)১২ ফেব্রুয়ারি ১৮২৪
টঙ্কর, কোম্পানি রাজ (অধুনা গুজরাট, ভারত)
মৃত্যু৩০ অক্টোবর ১৮৮৩(1883-10-30) (বয়স ৫৯)
আজমির, ব্রিটিশ ভারত (অধুনা রাজস্থান, ভারত)
জাতীয়তাব্রিটিশ ভারতীয়
আখ্যাSindhi Marhu
প্রতিষ্ঠাতাআর্য সমাজ
গুরুবিরজানন্দ দন্দীশা
দর্শনচার বেদ সংহিতার উপর গড়ে ওঠা ত্রৈতবাদী বৈদিক দর্শন এবং এটি ষড় দর্শনের পাশাপাশি নিরুক্ত ও নিঘণ্টুতেও পাওয়া যায় যা পাণিনিয় ব্যাকরণ সমর্থিত।
সাহিত্য কর্মসত্যার্থ প্রকাশ (১৮৭৫), "সংস্কার বিধি"
উদ্ধৃতি"ওঁ বিশ্বানি দেব সবিতর্দুরিতানি পরা সুব। য়দ্ভদ্রং তন্ন আ সুব।।"

দয়ানন্দ সরস্বতী (গুজরাটি દયાનંદ સરસ્વતી) (এই শব্দ সম্পর্কেশুনুন ) (১২ ফেব্রুয়ারি ১৮২৪, টঙ্কর[১] -৩০ অক্টোবর ১৮৮৩, আজমির)[২] একজন গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু ধর্ম গুরু ও সমাজ সংস্কারক এবং আর্যসমাজের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন । পশ্চিম ভারতের কাথিয়াওয়াড়ের মোরভি শহরে এক ধনাঢ্য নিষ্ঠাবান সামবেদী ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তার গার্হস্থ্যাশ্রমের নাম মূলশংকর । বাল্যশিক্ষা পিতার কাছেই লাভ করেন । ইংরাজি শিক্ষার সুযোগ না হওয়ায় প্রথম থেকেই তিনি সংস্কৃতশাস্ত্র উত্তমরূপে আয়ত্ত্ব করেন এবং ধীরে ধীরে সমগ্র যজুবেদ ও আংশিকভাবে অপর তিন বেদ, ব্যাকরণ, তর্ক ও দর্শনশাস্ত্র, কাব্য, অলংকার, স্মৃতি প্রভৃতিতে যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন । ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে বিখ্যাত কাশী শাস্ত্রার্থে তিনি তৎকালীন পন্ডিতবর্গকে পরাজিত করে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছিলেন।

যারা দয়ানন্দের দ্বারা প্রভাবিত ও অনুসরণ করেছিলেন তাদের মধ্যে রাই সাহেব পুরান চাঁদ, ম্যাডাম কামা, পণ্ডিত লেখ রাম, স্বামী শ্রদ্ধানন্দ, [৩] শ্যামজি কৃষ্ণ বর্মা, কিষান সিং, ভগত সিং, বিনায়ক দামোদর সাভারকর, ভাই পরমানন্দ, লালা হরদয়াল, মদন লাল ধিংরা, রাম প্রসাদ বিসমিল, মহাদেব গোবিন্দ রণাদে, আশফাক উল্লাহ খান, [৪] মহাত্মা হংসরাজ, লালা লাজপত রায়, [৫] [৬] এবং যোগমায়া নৃপানে । [৭]

প্রথম জীবন[সম্পাদনা]

দয়ানন্দ সরস্বতী ১২ ফেব্রুয়ারি ১৮২৪ সাল একটি হিন্দু সভ্রান্ত পরিবারে কাথিয়াবাড় অঞ্চলে (বর্তমানে গুজরাটের মর্ভি জেলা) জন্মগ্রহণ করেছিলেন।[৮][৯][১০] তার আসল নাম ছিল মূলশঙ্কর তিওয়ারী । তাঁর পিতার নাম কর্ষণজী লাল তিওয়ারী, এবং মাতার নাম যশোদাবাই।

আট বছর বয়সে, যজ্ঞোপবিত সংস্করণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রবেশের সূচনা করেন। তার পিতা শিবের ভক্ত ছিলেন বলে পিতার ইচ্ছায় তিনি শিবরাত্রি ব্রত পালন করতেন। একবার শিবরাত্রি উপলক্ষে উপবাস থেকে মূলশঙ্কর সারা রাত জেগে বসেছিলেন। এমন সময় তিনি কিছু ইঁদুরকে ভক্তের দেওয়া নৈবেদ্য খেতে দেখেন এবং প্রতিমার উপর দিয়ে দৌড়াতে দেখেন। এটি দেখার পর, তার মনে রেখাপাত হয়, শিব যদি ইঁদুরের বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করতে না পারেন, তাহলে তিনি কীভাবে পৃথিবীর ত্রাণকর্তা হতে পারেন? [১১]

তার ছোট বোন ও কাকা কলেরায় মৃত্যুবরণ করেন। তখন তিনি মৃত্যুচিন্তা এবং অমরত্ব লাভের উপায় অনুসন্ধান করতে লাগলেন যা মূলশঙ্করকে বৈরাগ্যের পথে পরিচালিত করেছিল। তার এই অবস্থা দেখে তার বাবা মা চিন্তিত হন। তার পরিবার তাকে বিয়ে দেওয়ার চিন্তা করে, কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে বিয়ে তার জন্য নয় এবং ১৮৪৬ সালে ২২ বছর বয়েসে বিয়ের দিন তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। [১২] [১৩]

দয়ানন্দ সরস্বতী ১৮৪৫ থেকে ১৮৬৯ সাল পর্যন্ত একজন ভ্রমনকারী সন্যাসী হিসাবে ও সত্যের সন্ধানে প্রায় পঁচিশ বছর কাটান। তিনি ভোগ্য দ্রব্য ত্যাগ করেন এবং আত্মত্যাগপূর্ণ জীবন যাপন করতেন। আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য তিনি বনে, হিমালয়ে পাদদেশে এবং উত্তর ভারতে তীর্থস্থানগুলিতে ভ্রমণ করেন। এ সময়ে তার সাথে বিভিন্ন সাধু-সন্যাসীর পরিচয় হয়। তিনি জোয়ালানন্দ পুরী ও শিবানন্দ গিরির নিকট যোগবিদ্যা শিক্ষা নেন। তিনি পূর্ণনন্দ সরস্বতী নামক সন্যাসীর নিকট হতে সন্যাস গ্রহণ করেন, তখন তার নাম হয় দয়ানন্দ সরস্বতী। মথুরায় তিনি বিরজানন্দ দন্দীশা নামে একজন গুরুর শিষ্য হন। বিরজানন্দ বিশ্বাস করতেন যে হিন্দুধর্ম তার মূল ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং এর অনেক অনুশীলন অশুদ্ধ হয়ে গেছে। অধ্যয়ন শেষে দয়ানন্দ সরস্বতী বিরজানন্দকে দক্ষিণাস্বরূপ প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি হিন্দু বিশ্বাসে বেদের যথাযথ স্থান পুনরুদ্ধারে তার জীবন উৎসর্গ করবেন। [১৪]

দয়ানন্দের প্রচারণা[সম্পাদনা]

অ৩ম্ বা ওঁ কে আর্য সমাজ ঈশ্বরের সর্বোচ্চ এবং শ্রেষ্ঠ নাম বলে গ্রহণ করে।

তিনি বিশ্বাস করতেন যে হিন্দু ধর্ম বেদের নীতি হতে বিচ্যুত হয়ে দূষিত হয়েছে এবং ব্যাক্তিস্বার্থের জন্য হিন্দু পুরোহিতদের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছে । এজন্য তিনি আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠা করেন, যা দশটি প্রধান মূলনীতিতে প্রতিষ্ঠত, যাকে সার্বজনীন সংকেত হসাবে “কৃণ্বান্তো বিশ্বমার্যম” বলা হয়। এই নীতিগুলির সাথে, তিনি গোটা বিশ্বকে আর্যদের আবাসস্থল হিসাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

দয়ানন্দ সরস্বতী ছিলেন নিরাকারবাদী ও একেশ্বরবাদী। তিনি বেদ ভিত্তিক বৈদিক সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল হিন্দুধর্মে সংস্কার করা। তিনি ধর্মীয় পণ্ডিত এবং পুরোহিতদের সাথে বিতর্কের জন্য দেশ ভ্রমণ করেছিলেন এবং তাঁর যুক্তি এবং সংস্কৃত ও বেদ জ্ঞানের শক্তির দ্বারা বারবার জিতেছিলেন। [১৫] তৎকালিন কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু পণ্ডিতেরা বৈদিক শাস্ত্র পাঠ হতে সাধারণ মানুষকে নিরুৎসাহিত করত এবং গঙ্গা নদীতে স্নান ও বার্ষিকীতে পুরোহিতদের খাওয়ানোর মতো আচার-অনুষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করত , যা দয়ানন্দ কুসংস্কার বা স্ব-পরিচর্যা প্রথা বলে প্রতিবাদ করেছিলেন। জাতিকে এই ধরনের কুসংস্কারমূলক ধারণা প্রত্যাখ্যান করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। জাতিকে বৈদিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা এবং বৈদিক জীবনধারা অনুসরণ করানো ছিল তার লক্ষ। তিনি নারীদের সমান অধিকার ও সম্মানের কথা বলেন। লিঙ্গ, বর্ণ নির্বিশেষে সকল শিশুর বেদ শিক্ষার পক্ষে মত দিয়েছেন। বলিপ্রথা, বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধেও তিনি কথা বলেছেন। তিনি সকলকে মাংস ভক্ষণ করতে নিষেধ করেন। তিনি হিন্দু জাতিকে জাতীয় সমৃদ্ধির জন্য গরুর গুরুত্ব এবং জাতীয় সংহতি স্থাপনের জন্য হিন্দিকে জাতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণসহ বিভিন্ন সামাজিক সংস্কার গ্রহণের আহ্বান জানান। তাঁর দৈনন্দিন জীবন যোগব্যায়াম, আসন, শিক্ষা, প্রচার, উপদেশ এবং লেখার মাধ্যমে তিনি হিন্দু জাতিকে স্বরাজ্য , জাতীয়তাবাদ এবং আধ্যাত্মিকতার আকাঙ্ক্ষায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন।

১৯৬২ সালের ভারতের ডাকটিকিটে দয়ানন্দ সরস্বতী

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Maharashi Dayanand Saraswati Samark Trust,Tankara . Gujrat
  2. Vedic Cultural Centre (VCC)
  3. "Gurudatta Vidyarthi"। Aryasamaj। সংগ্রহের তারিখ ১৯ ডিসেম্বর ২০১২ 
  4. "Mahadev Govind Ranade: Emancipation of women"। Isrj.net। ১৭ মে ১৯৯৬। সংগ্রহের তারিখ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১২ 
  5. "Lala Lajpat Rai"culturalindia.net। সংগ্রহের তারিখ ১৪ জানুয়ারি ২০১৬ 
  6. Lala Lajpat Rai (Indian writer, politician and Escort)Britannica Online Encyclopedia
  7. Neupane, Dr. Kedar (২০১৪)। बहुमुखी व्यक्तित्वकी धनी योगमाया by Pawan Alok। Nepal Shrastha Samaj। পৃষ্ঠা 15–21। আইএসবিএন 978-9937-2-6977-3 
  8. Robin Rinehart (২০০৪)। Contemporary Hinduism: Ritual, Culture, and Practice। ABC-CLIO। পৃষ্ঠা 58–। আইএসবিএন 978-1-57607-905-8 
  9. "Devdutt Pattanaik: Dayanand & Vivekanand"। ১৫ জানুয়ারি ২০১৭। 
  10. ઝંડાધારી – મહર્ષિ દયાનંદ – Gujarati Wikisource
  11. "History of India"indiansaga.com। সংগ্রহের তারিখ ৫ অক্টোবর ২০১৮ 
  12. "Dayanand Saraswati"iloveindia.com। সংগ্রহের তারিখ ১৪ জানুয়ারি ২০১৬ 
  13. "Swami Dayanand Saraswati"culturalindia.net। সংগ্রহের তারিখ ১৪ জানুয়ারি ২০১৬ 
  14. "Sarasvati, Dayananda – World Religions Reference Library"। World Religions Reference Library  – via HighBeam Research (সদস্যতা প্রয়োজনীয়)। ১ জানুয়ারি ২০০৭। ১০ জুন ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৫ সেপ্টেম্বর ২০১২ 
  15. "Swami Dayananda Sarasvati by V. Sundaram"Boloji। সংগ্রহের তারিখ ১৪ জানুয়ারি ২০১৬ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]