বিষয়বস্তুতে চলুন

স্ববিরোধী ধারণা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

স্ববিরোধী ধারণা বা স্ববিনাশী ধারণা হলো এমন একটি ধারণা বা বক্তব্য, যার মিথ্যাচার হল তাদের সত্য বলে ধরে নেওয়ার কাজ বা পরিস্থিতির একটি যৌক্তিক পরিণতি। সমালোচকরা প্রায়ই কোনো কোনো ধারণাকে স্ববিরোধী বলে দাবি করেন, তবে এমন অভিযোগ প্রায় সব সময়ই বিতর্কিত হয়। কারণ, সমর্থকেরা সাধারণত বলেন যে ধারণাটিকে ভুলভাবে বোঝানো হয়েছে, অথবা উত্থাপিত যুক্তিটি সঠিক নয়। এই কারণেই নিচে উল্লেখিত কোনো ধারণাকেই স্পষ্টভাবে বা অকাট্যভাবে স্ববিরোধী বলা যায় না। এই ধরনের ধারণা প্রায়ই স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যেগুলোকে সত্য ধরা হয় (স্বরূপ পুনরুক্তি-ভিত্তিক অনুমান), এবং এগুলোকে নিজেদের মাধ্যমেই যাচাই করা যায় না। কারণ, তা করলে কেবল দুটি ফলাফল হতে পারে—সামঞ্জস্য (চক্রাকার যুক্তি) বা ব্যতিক্রম (স্ব-বিরোধ )।

ভিন্নতা

[সম্পাদনা]

সরাসরি স্ব-অস্বীকারমূলক বক্তব্য

[সম্পাদনা]

সরাসরি স্ব-অস্বীকারমূলক বক্তব্য এমন ধরনের বক্তব্য, যা অবশ্যই (বা স্বভাবগতভাবেই) মিথ্যা।[] এপিমেনিদেসের প্যারাডক্স হলো এরকম এক বক্তব্য—“এই বক্তব্যটি মিথ্যা।” এই ধরনের বক্তব্য দার্শনিকদের বিভ্রান্ত করেছিল, বিশেষ করে যখন যুক্তির ভিত্তি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করার চেষ্টা চলছিল। বারট্রান্ড রাসেল তার "টাইপ তত্ত্ব" প্রণয়ন করেন, যাতে প্রতীকী যুক্তিতে এই ধরনের বক্তব্য (আনুষ্ঠানিকভাবে রাসেলের প্যারাডক্স) এড়ানো যায়।[] এই কাজ থেকেই আধুনিক স্বতঃসিদ্ধ সেট তত্ত্বের ধারণা গড়ে ওঠে। রাসেলের এই আনুষ্ঠানিকীকরণে যদিও প্যারাডক্স দেখা যায়নি, কুর্ট গ্যোডেল প্রমাণ করেন যে তাতে অবশ্যই কিছু স্বাধীন বক্তব্য থাকবে। যে কোনো যুক্তিতাত্ত্বিক ব্যবস্থা যা প্রাথমিক গণিতকে ধারণ করতে যথেষ্ট সমৃদ্ধ, সেখানে অন্তত একটি প্রস্তাবনা থাকবে যার ব্যাখ্যা দাঁড়ায়—“এই প্রস্তাবনাটি অপরীক্ষণযোগ্য” (সেই যুক্তিতাত্ত্বিক ব্যবস্থার ভেতর থেকেই)। ফলে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা একই সঙ্গে সম্পূর্ণ এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না।

পরোক্ষভাবে আত্ম-অস্বীকারমূলক বিবৃতি

[সম্পাদনা]

পরোক্ষ স্ব-অস্বীকারমূলক বক্তব্যের একটি রূপ হলো "চুরি করা ধারণা": অর্থাৎ এমন কোনো ধারণা ব্যবহার করা, যার যৌক্তিক ও/অথবা মৌলিক ভিত্তি গঠনকারী ধারণাগুলোর বৈধতাকে উপেক্ষা করা, অস্বীকার করা বা তাদের সঙ্গে বিরোধে জড়ানো। "চুরি করা ধারণা" প্রসঙ্গটি প্রথমে আইন র‍্যান্ড লক্ষ্য করেছিলেন বলে মনে করা হয়, পরে অবজেক্টিভিজম মতবাদের অনুসারীরা এটি সমর্থন করেন। তবে অবজেক্টিভিজমের মতোই "চুরি করা ধারণা" বিষয়টিও একাডেমিক মহলে মূলধারার স্বীকৃতি পায়নি।[] "চুরি করা ধারণা" ভ্রান্তির একটি উদাহরণ হলো নৈরাজ্যবাদী পিয়ের-জোসেফ প্রুদোঁর উক্তি: "সব সম্পত্তিই চুরি"

জ্ঞান কাঠামোর স্তরবিন্যাস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ন্যাথানিয়েল ব্র্যান্ডেন বলেন: “চুরি” এমন একটি ধারণা, যা যৌক্তিকভাবে এবং উৎপত্তিগতভাবে “ন্যায়সঙ্গত মালিকানা” ধারণার ওপর নির্ভরশীল—এবং বোঝায় মালিকের সম্মতি ছাড়া তার সম্পত্তি গ্রহণের কাজকে। যদি কোনো সম্পত্তিই ন্যায়সঙ্গতভাবে মালিকানাধীন না হয়, অর্থাৎ কিছুই যদি প্রকৃত অর্থে সম্পত্তি না হয়, তাহলে “চুরি” নামের কোনো ধারণাই থাকতে পারে না। সুতরাং, “সব সম্পত্তিই চুরি” বক্তব্যের ভেতরেই একটি স্ববিরোধিতা রয়েছে: এখানে “সম্পত্তি” ধারণার বৈধতা অস্বীকার করেও “চুরি” ধারণা ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে এটি “চুরি” ধারণার এমন এক ব্যবহার, যার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই—অর্থাৎ এটি এক ধরনের চুরি করা ধারণা।[]

তবে অন্যরা বলেন, প্রুদোঁর বক্তব্যকে ভ্রান্ত বলা যায় কেবল প্রসঙ্গহীন, পৃষ্ঠস্থ পাঠে। প্রুদোঁ “সম্পত্তি” শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন জমি, কারখানা ইত্যাদির দাবি করা মালিকানার প্রসঙ্গে। তিনি মনে করতেন, এ ধরনের দাবি বৈধ নয় এবং এগুলো আসলে সামষ্টিক সম্পদ থেকে চুরির সমতুল্য।[] প্রুদোঁ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, “সম্পত্তি হলো চুরি” বাক্যটি “দাসত্ব হলো হত্যাকাণ্ড” বাক্যের অনুরূপ। তার মতে, দাস শারীরবৃত্তীয়ভাবে জীবিত থাকলেও এক অর্থে “হত্যাকাণ্ডের শিকার”। তার ব্যবহৃত “চুরি” শব্দটি যেমন সরাসরি মালিকানার অর্থে নয়, তেমনি “হত্যা” শব্দটিও কেবল শারীরবৃত্তীয় মৃত্যুর অর্থে নয়। বরং উভয় শব্দই নির্দিষ্ট অধিকার অস্বীকার করার প্রতীকী প্রকাশ।[]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Moreland, J.P. (৩ অক্টোবর ২০১৮)। "Why Strong Scientism is Self-Refuting"jpmoreland.com (ইংরেজি ভাষায়)। J.P. Moreland। সংগ্রহের তারিখ ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  2. রাসেল, বারট্রান্ড; হোয়াইটহেড, আলফ্রেড নর্থপ্রিন্সিপিয়া ম্যাথেম্যাটিকা
  3. Kraft, Rory E. (২০১৯)। "Stolen Concept"। Arp, Robert; Barbone, Steven; Bruce, Michael (সম্পাদকগণ)। Bad Arguments: 100 of the Most Important Fallacies in Western Philosophy (1st সংস্করণ)। WILEY Blackwell। পৃ. ৩৮৮–৩৯১। আইএসবিএন ৯৭৮১১১৯১৬৭৯০৭
  4. The Stolen Concept ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০০৭-০৫-০১ তারিখে by Nathaniel Branden - originally published in The Objectivist Newsletter in January 1963.
  5. Rockwell, L. Performative Contradictions and Subtle Misunderstandings
  6. Proudhon। "What is Property? Proudhon 1840"www.marxists.org। সংগ্রহের তারিখ ১১ মার্চ ২০১৮

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]