সোডা লাইম কাঁচ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পুনরায় ব্যবহারযোগ্য সোডা লাইম কাঁচ নির্মিত দুধের বোতল
সোডা কাঁচে নির্মিত পুরোনো একটি জানালা, স্থানঃ জেনা (জার্মানি)

সোডা লাইম কাঁচ অথবা সোডা লাইম সিলিকা কাঁচ হচ্ছে সাধারণতম কাঁচ যা প্রধানত জানালার শার্সি ও বেভারেজের জন্য বোতল, জগসহ ইত্যাদি পণ্য নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত হয়। সাধারণত উৎপাদিত কাঁচসমূহের মধ্যে অধিকাংশই কাঁচই সোডা কাঁচ। তবে এর পাশাপাশি বোরো সিলিকেট কাঁচেরও প্রচলন রয়েছে। [১][২][৩]

সোডা লাইম গ্লাসসমূহ দামে সস্তা, রাসায়নিকভাবে স্থায়ী, মজবুত, শক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী। কারন এটিকে ব্যবহারের পরে আবার নরম ও গলানো যায়৷ কাঁচ রিসাইক্লিং এর জন্যে সোডা লাইম গ্লাস আদর্শ।[৪] কাঁচটিকে রাসায়নিকভাবে বিশুদ্ধ সিলিকার (সিলিকন ডাই অক্সাইড বা SiO₂) চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় যার অপর নাম নিলীন স্ফটিক (Fused quartz). বিশুদ্ধ সিলিকা কাঁচ তাপীয় শকরোধী এবং পানিতে নিমজ্জনের পরেও টিকে থাকতে পারে। গলনাংক যথেষ্ট উচ্চ (১৭২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস) আবার সান্দ্রতাও বেশি যার কারনে উক্ত কাঁচটি নিয়ে প্রক্রিয়াকরণ ও কাজ করা যথেষ্ট কঠিন। [৫] এজন্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য অন্যান্য আরো অনেক পদার্থ যোগ করা হয়। তন্মধ্যে একটি হলো সোডা বা সোডিয়াম কার্বোনেট (Na₂CO₃) যা কাঁচের রূপান্তর তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়। যা হোক, সোডা উপাদানটি কাঁচকে পানিতে দ্রবণীয় করে তোলে যা আশানুরূপ নয়। তাই কাঁচকে রাসায়নিকভাবে আরো স্থায়ী করতে লাইম যোগ করা হয় (ক্যালসিয়াম অক্সাইড, CaO) যা চুনাপাথর থেকে সংগ্রহ করা হয়। এর পাশাপাশি ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড (MgO) এবং এলুমিনিয়াম অক্সাইড (Al₂O₃) যোগে কাঁচের রাসায়নিক স্থায়ীত্ব আরো বৃদ্ধি পায়৷ পরবর্তীতে কাঁচটি যখন পূর্ণাঙ্গরূপে তৈরি হয় সেই কাঁচের ভরের ৭০-৭৪%ই থাকে সিলিকা

কাঁচ উৎপাদন কারখানায় সোডা লাইম কাঁচ উৎপাদন করা হয় প্রথমে কাঁচামালসমূহ গলিয়ে। এ কাঁচামালগুলোর মধ্যে রয়েছে সিলিকা, সোডা, লাইম বা ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড, ডলোমাইট (CaMg(CO₃)₂, ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড, এলুমিনিয়াম অক্সাইড ও অন্যান্য কিছু বিক্রিয়ক যা কাঁচকে মিহি করে (যেমনঃ সোডিয়াম সালফেট বা Na₂CO₃, সোডিয়াম ক্লোরাইড ইত্যাদি)। গলনের জন্য তাপমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১৬৭৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।[৬] তবে কারখানা ও কাঁচামালের উপর ভিত্তি করে এ তাপমাত্রায় পরিবর্তন আনা হয়৷ তুলনামূলকভাবে সস্তা খনিজ যেমন ট্রোনা, বালিফেল্ডস্পার সাধারণত বিশুদ্ধ রাসায়নিকের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়৷ সবুজ ও বাদামী রঙের বোতল তৈরি হয় আয়রন অক্সাইড সমৃদ্ধ কাঁচামাল থেকে। কাঁচ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের মিশ্রণকে ব্যাচ বলা হয়৷

সোডা লাইম কাঁচসমূহ নির্মাণ করা হয় প্রধানত জানালার কাঁচ ও কন্টেইনারের জন্য। জানালার জন্য নির্মিত সোডা লাইম কাঁচসমূহকে বলে সমতল কাঁচ (ফ্ল্যাট গ্লাস), আর কন্টেইনারের জন্য নির্মিত কাঁচকে বলা হয় কন্টেইনার কাঁচ। এই দুই ধরনের কাঁচ উৎপাদন প্রক্রিয়া, রাসায়নিক বিন্যাস ও প্রায়োগিক ক্ষেত্রের দিক দিয়ে একে অপরের থেকে ভিন্ন। সমতল কাঁচে কন্টেইনার কাঁচ থেকে অধিক ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইডসোডিয়াম অক্সাইড থাকে। অপরদিকে, কন্টেইনার কাঁচে সমতল কাঁচের চেয়ে অধিক সিলিকা, ক্যালসিয়াম অক্সাইডএলুমিনিয়াম অক্সাইড বিদ্যমান।[৭] এছাড়াও কন্টেইনার গ্লাসে পানিতে স্বল্পদ্রাব্য আয়ন (সোডিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম) থাকায় এটি পানির বিরুদ্ধে অধিক রাসায়নিকভাবে স্থায়ী যার ফলে এটি খাদ্য সংরক্ষণ ও বেভারেজের জন্য ব্যবহার করা হয়৷

সাধারণ গঠন ও বৈশিষ্ট্য[সম্পাদনা]

তাপমাত্রা কমার সাথে সাথে সোডা লাইম কাঁচের সান্দ্রতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। সান্দ্রতা যখন ১০^৪ পয়েজে উন্নিত হয় তখন কাঁচটি আকার ধারণ করে। সাধারণত ৯০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এরূপ হয়৷৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার দিকে সান্দ্রতা ১০^৮ পয়েজের কম হলে কাঁচটি নরম হওয়া শুরু করে। মোটামুটি শক্ত হয়ে যাবার পরেও কাঁচটিকে চাইলে ১৫ মিনিটের মধ্যে ১০^১৪ পয়েজ চাপ প্রয়োগ করে নরম করা যায় যেন কাঁচটির অভ্যন্তরীণ চাপ হ্রাস পায়। এর জন্য তাপমাত্রার দরকার হয় ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সান্দ্রতাতাপমাত্রার এর মধ্যে সম্পর্ক লগারিদমিক। সমগ্র গ্লাস উৎপাদন প্রক্রিয়া আরেনিয়াস সমীকরণ মেনে চলে এবং সক্রিয়ন শক্তি বৃদ্ধি পায় উচ্চ তাপমাত্রায়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Estes, Adam Clark (মার্চ ১৬, ২০১৯)। "The Pyrex Glass Controversy That Just Won't Die"Gizmodo (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৩-২২ 
  2. "Borosilicate Glass vs. Soda Lime Glass? - Rayotek News"rayotek.com। ২৩ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৩ এপ্রিল ২০১৭ 
  3. Robertson, Gordon L. (২২ সেপ্টেম্বর ২০০৫)। Food Packaging: Principles and Practice (Second সংস্করণ)। CRC Press। আইএসবিএন 978-0-8493-3775-8। ২ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  4. "Calcium Carbonate - Glass Manufacturing"congcal.com। congcal। সংগ্রহের তারিখ ৫ আগস্ট ২০১৩ 
  5. "Glass – Chemistry Encyclopedia"। ২ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১ এপ্রিল ২০১৫ 
  6. B. H. W. S. de Jong, "Glass"; in "Ullmann's Encyclopedia of Industrial Chemistry"; 5th edition, vol. A12, VCH Publishers, Weinheim, Germany, 1989, আইএসবিএন ৯৭৮-৩-৫২৭-২০১১২-৯, pp. 365–432.
  7. "High temperature glass melt property database for process modeling"; Eds.: Thomas P. Seward III and Terese Vascott; The American Ceramic Society, Westerville, Ohio, 2005, আইএসবিএন ১-৫৭৪৯৮-২২৫-৭