বিষয়বস্তুতে চলুন

সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন থেকে পুনর্নির্দেশিত)
সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩তম উপাচার্য
কাজের মেয়াদ
১৮ জুলাই ১৯৭১  জানুয়ারী ১৯৭২
পূর্বসূরীআবু সাঈদ চৌধুরী
উত্তরসূরীমুজাফফর আহমেদ চৌধুরী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ উপাচার্য
পূর্বসূরীমুহম্মদ শামসউল হক
উত্তরসূরীমুহাম্মদ আবদুল বারী
ব্যক্তিগত বিবরণ
জন্ম(১৯২০-০১-১৪)১৪ জানুয়ারি ১৯২০
আলোকদিয়া, মাগুরা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি
মৃত্যু১২ জানুয়ারি ১৯৯৫(1995-01-12) (বয়স ৭৪)
ঢাকা, বাংলাদেশ
জাতীয়তা
আত্মীয়স্বজনসৈয়দ আলী আহসান (চাচাতো ভাই)
সৈয়দ আলী আশরাফ (চাচাতো ভাই)
প্রাক্তন শিক্ষার্থী
পেশাএকাডেমিক

সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন (১৪ জানুয়ারী ১৯২০ - ১২ জানুয়ারী ১৯৯৫) একজন বাংলাদেশী শিক্ষাবিদ এবং লেখক ছিলেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।[][]

জীবনের প্রথমার্ধ

[সম্পাদনা]

১৯২০ সালের ১৪ জানুয়ারী বাংলা প্রদেশের মাগুরার (পূর্বে যশোর জেলার অন্তর্গত ) আলোকদিয়া গ্রামে সৈয়দ আহমদ হুসেন এবং খুরশিদা তালাত বানুর ঘরে এক বাঙালি মুসলিম সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। হুসেনের বয়স যখন পাঁচ বছর তখন তাঁর বাবা-মা মারা যান। তাঁর বয়স যখন চার বছর, তখন তাঁর বাবা-মা ঢাকা জেলায় চলে আসেন ।[][]

শিক্ষা

[সম্পাদনা]

সৈয়দ সাজ্জাদ হুসেন ১৯৪২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন; এর এক বছর আগে একই বিষয়েই তিনি স্নাতক (বিএ) ডিগ্রি লাভ করেন।[] স্নাতকোত্তর অধ্যয়নের সময় হুসেনের উদ্যোগে এবং তাঁর সভাপতিত্বে ইস্ট পাকিস্তান লিটারারি সোসাইটি (EPLS) প্রতিষ্ঠিত হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের আদর্শ প্রচার করা এবং একটি স্বতন্ত্র বাঙালি মুসলিম সাহিত্যিক ধারা গড়ে তোলা। এই সংগঠন ১৯৪৩ সালে একটি সফল সম্মেলনের আয়োজন করে এবং ১৯৪৪ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত EPLS-এর এক সম্মেলনে হুসেন সভাপতিত্ব করেন। তিনি ‘পাকিস্তান’ নামে একটি বাংলা পাক্ষিক পত্রিকায় এবং আবুল কালাম শামসুদ্দিনের আমন্ত্রণে ‘আজাদ’সহ অন্যান্য পত্রিকাতেও লিখতেন।[] ১৯৫২ সালে তিনি নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। সেখানে তিনি কিপলিং ও ভারত বিষয়ক একটি অভিসন্দর্ভ (থিসিস) রচনা করেন, যা পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।[]

কর্মজীবন

[সম্পাদনা]

হুসেন ১৯৪৪ সালে কলকাতা ইসলামিক কলেজে শিক্ষকতা পেশায় আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি সিলেটের এম. সি. কলেজে বদলি হন, যেখানে তিনি এক বছর শিক্ষকতা করেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এরপর ১৯৬৯ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়া পর্যন্ত তিনি ওই পদে দায়িত্ব পালন করেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

১৯৭৫ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি সৌদি আরবের মক্কায় অবস্থিত উম্ম আল-কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। অবসর জীবনে তিনি ঢাকায় প্রকাশিত ইংরেজি ও বাংলা পত্রিকায় লেখালেখি করেন, লেস্টার থেকে প্রকাশিত Muslim World Book Review-এর জন্য বই পর্যালোচনা লিখতেন এবং ড. মতিউর রহমানের সঙ্গে যৌথভাবে রচিত গ্রন্থসহ তাঁর বহু বই প্রকাশ করেন। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঢাকাতেই বসবাস করেন। ১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে তাঁর মৃত্যু হয়, সে সময় তিনি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী রচনায় নিয়োজিত ছিলেন।[][]

হুসেন তাঁর কর্মজীবনে বিশ্বের নানা দেশ ভ্রমণ করেন। ১৯৫৪ সালে তিনি একটি ছাত্র প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) সফর করেন। একই বছরে তিনি হল্যান্ডে একটি পেন (PEN) সম্মেলনে যোগ দেন এবং পরের বছর ঢাকা শহরে একটি পেন সম্মেলনের আয়োজন করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি একটি লিডারশিপ গ্র্যান্টের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। ১৯৬২ সালে তিনি কমনওয়েলথ শিক্ষা সম্মেলনে পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে ভারত সফর করেন। তিনি চীনের অক্টোবর ডে উদযাপন উপলক্ষে একটি পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলেরও সদস্য ছিলেন। ১৯৭০ সালে তিনি ধর্ম বিষয়ক একটি সম্মেলনে যোগ দিতে জাপান সফর করেন। তিনি ইরান দু’বার সফর করেন—প্রথমবার ১৯৭০ সালে আরসিডি (RCD) দলের নেতা হিসেবে এবং ১৯৭১ সালে ইরানের রাজতন্ত্রের ২৫০০ বছর পূর্তি উদযাপন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। ১৯৭১ সালে তিনি পোজনিয়াকে অনুষ্ঠিত ইংরেজি অধ্যাপকদের সম্মেলনে প্রতিনিধি হিসেবে পোল্যান্ড সফর করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি সৌদি আরবের মক্কায় অনুষ্ঠিত শিক্ষা বিষয়ক একটি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।[]

হুসেন এশিয়াটিক সোসাইটি অব পাকিস্তানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন এবং তিনি এক মেয়াদে এর সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।[]

বিতর্ক

[সম্পাদনা]

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় হুসেন পূর্ব পাকিস্তানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার বিরোধিতা করেন।[] ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে, তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে দুই ছাত্র নিহত হওয়ার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন।[] পাকিস্তান সরকার তৎক্ষণাৎ শূন্য পদে হুসেনকে নিয়োগ দেয়।[] ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার পতনের পর হুসেনকে গেরিলারা আটক করে। তবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান, যদিও তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর নির্দেশে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।[] বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তাঁকে কারাবন্দি করা হয়, কিন্তু ৫ ডিসেম্বর ১৯৭৩ সালে তিনি মুক্তি পান।[] কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি তাঁর স্মৃতিকথা রচনা করেন, যা পরে ১৯৯৫ সালে The Wastes of Time: Reflections on the Decline and Fall of East Pakistan শিরোনামে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে পূর্ব পাকিস্তানের পতনের বিস্তারিত বিবরণ ও পটভূমি তুলে ধরা হয়েছে।[] মুক্তি লাভের পর তিনি ইংল্যান্ডে চলে যান, যেখানে তিনি স্বল্প সময়ের জন্য কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেলো হিসেবে যুক্ত ছিলেন।[]

দৃষ্টিভঙ্গি

[সম্পাদনা]

হুসেন তাঁর যৌবনে পাকিস্তান আন্দোলনের একজন সক্রিয় সমর্থক ছিলেন এবং ১৯৪০-এর দশকের তরুণ সমাজের আদর্শবাদিতাকে তিনি ধারণ করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, ১৯৩৬ সালের শীতকালে মুসলিম লীগ পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা সফরে এলে হুসেন প্রথমবার তাঁর বক্তব্য শোনার সুযোগ পান এবং সঙ্গে সঙ্গেই মুসলিম জাতীয়তাবাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন। ১৯৪১ সালের জুন মাসে কলকাতার স্টেটসম্যান পত্রিকায় এক চিঠির মাধ্যমে পাকিস্তান পরিকল্পনাকে স্বাগত জানানো ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রথম। হুসেন সারা জীবন পাকিস্তানের ধারণা ও আদর্শের প্রতি নিষ্ঠাবান ছিলেন।[]

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে

[সম্পাদনা]

২০২১ সালে পাকিস্তানের হাম টিভি হুসেনের গ্রন্থ Wastes of Times অবলম্বনে একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিক নাট্যধারা নির্মাণ করে। এই মিনি সিরিজটির নাম ছিল “খাব টুট জাতে হ্যায়”।

সৃষ্টকর্ম

[সম্পাদনা]

ইংরেজি

[সম্পাদনা]
  • ডেসক্রিপটিভ ক্যাটালগ অব বেঙ্গল মুসলিম (ঢাকা: এশিয়াটিক সোসাইটি ১৯৬০)
  • ইস্ট পাকিস্তান: এ প্রোফাইল (ওরিয়েন্ট লংম্যান্স, ১৯৬২)
  • নিক্সড গ্রিল: এ কালেকশন অব এসেজস অন রিলিজিওন অ্যান্ড কালচার (ওরিয়েন্ট লংম্যান্স, ১৯৬৩)
  • কিপলিং অ্যান্ড ইন্ডিয়া: এন ইনকরি ইনটু দ্যা ন্যাচার অ্যান্ড এক্সটেন্ড অফ কিপলিঙকস নলেজ অব দি ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্ট (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬৫)
  • হোমেজ টু শেক্সপিয়ার (ডিপার্টমেন্ট অব ইংলিশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬৫)
  • সিভিলাইজেশন অ্যান্ড সোসাইটি (বাংলাদেশ ইন্টিটিউট অব ইসলামিক থট, ১৯৯৪);
  • দি ওয়াস্ট অব টাইম: রিফ্লেকশন অন দ্যা ডিক্লাইন অ্যান্ড ফল অব ইস্ট পাকিস্তান (লাহোর: ইন্সিটিটিউট অব ইসলামিক কালচার, ১৯৯৬)
  • এ ইয়াং মুসলিমস গাইড টু রিলিজিয়নস ইন দি ওয়ার্ল্ড (বিআইআইটি, ১৯৯২)
  • এন এসে অন পাকিস্তানি রাইটিং ইন ইংলিশ (কর্নেল ইউনিভার্সিটি প্রেস, ইউএসএ ১৯৬১)
  • ড্রামা ইন ডেভেলপিং সোসাইটি (১৯৬৯)
  • বুকস অন দি কায়েদে আযম: এ বিবলিওগ্রাফি (ঢাকা সোসাইট ফর পাকিস্তান স্টাডিজ, ১৯৬৯)

বাংলা

[সম্পাদনা]
  • নির্ঘণ্ট অভিধান (১৯৭০);
  • ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস ২ খন্ড (১৯৮৪ ও ১৯৮৯);
  • একাত্তরের স্মৃতি (১৯৯৩)
  • আরবি সাহিত্যের ইতিহাস

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. "List of former Vice Chancellor"ru.ac.bd (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১ আগস্ট ২০২৩
  2. 1 2 3 4 ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর, সম্পাদকগণ (২০১২)। "বাংলাদেশ"বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১ওসিএলসি 883871743ওএল 30677644M
  3. 1 2 3 4 5 6 Hussain, Syed Sajjad (১৯৯৫)। The Wastes of Time: Reflections on the Decline and Fall of East Pakistan। Dhaka: Muslim Renaissance Movement and Notun Safar Prokashani। পৃ. ২১৬–২১৯।
  4. "The Wastes of Time" (পিডিএফ)। sanipanhwar.com। ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে মূল থেকে (পিডিএফ) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৭ এপ্রিল ২০২০
  5. 1 2 Hussain, Syed Sajjad (১৯৯৫)। The Wastes of Time: Reflections on the Decline and Fall of East Pakistan। Dhaka: Muslim Renaissance Movement and Notun Safar Prokashani। পৃ. ২১৬–২১৯।
  6. ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর, সম্পাদকগণ (২০১২)। "বাংলাদেশ"বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিআইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১ওসিএলসি 883871743ওএল 30677644M
  7. Abdul Matin (১৯৮৯)। Role of Overseas: Bengalees in the Liberation Struggle of Bangladesh। Radical Asia Publications। আইএসবিএন ০-৯০৭৫৪৬-০৯-৯
  8. Dainik Bangla:3 October 1971
  9. 1 2 "Professor Syed Sajjad Husain" (পিডিএফ)। Bengal Muslim Research Institute UK। সংগ্রহের তারিখ ২৮ জুলাই ২০১৬

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]