বিষয়বস্তুতে চলুন

সুমিত্রা দেবী (অভিনেত্রী)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সুমিত্রা দেবী
সুমিত্রা দেবী
জন্ম
নীলিমা চট্টোপাধ্যায়[]

(১৯২৩-০৭-২২)২২ জুলাই ১৯২৩[][]
মৃত্যু২৮ আগস্ট ১৯৯০(1990-08-28) (বয়স ৬৭) []
জাতীয়তাভারতীয়
পেশাঅভিনেত্রী
কর্মজীবন
  • ১৯৪৪—৬৪
  • ১৯৭৪—৭৭
দাম্পত্য সঙ্গী
সন্তান[]
পিতা-মাতা
  • মুরলীধর চট্টোপাধ্যায়[] (পিতা)
আত্মীয়তরুণ চট্টোপাধ্যায় (খুড়তুতো ভাই)

সুমিত্রা দেবী (শুনুন; ২২ জুলাই ১৯২৩ - ২৮ আগস্ট ১৯৯০) হলেন একজন ভারতীয় অভিনেত্রী, যিনি ১৯৪০, ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে হিন্দি ও বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।[][][] তিনি তিন বার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে বিএফজেএ পুরস্কার লাভ করেছেন।[][] ১৯৪০-এর দশকে, ভারতীয় গণমাধ্যমে তাকে ভারতের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী অভিনেত্রী হিসাবে আখ্যায়িত করা হতো।[][][১০]

অপূর্ব মিত্র পরিচালিত সন্ধি (১৯৪৪) ছবিতে সুমিত্রা দেবীর অভিনয় জীবনের শুরু। এরপরে দেবী মুখোপাধ্যায়ের আপত্তি থাকায় দশের অধিক হিন্দি ও বাংলা ছবির প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন সুমিত্রা। চল্লিশের দশকের শেষার্ধে তাকে মোট ছয়টি বাংলা ছবিতে অভিনয় করতে দেখা যায়।[১১] অভিযোগ (১৯৪৬), পথের দাবী (১৯৪৭), প্রতিবাদ (১৯৪৮), জয়যাত্রা (১৯৪৮), স্বামী (১৯৪৯), দেবী চৌধুরানী (১৯৪৯) ⸺ টানা ছয়টি ছবিই ব্যবসায়িক সাফল্যের মুখ দেখায়, এক নম্বর নায়িকার আসন তার হাতের মুঠোয় চলে আসে।[১০][১২] নীতিন বসুর পরিচালনায় মশাল (১৯৫০) ছবির সাফল্যের পর মূলত হিন্দি ছবিতেই অভিনয় করতে শুরু করেন সুমিত্রা। তালিকায় রয়েছে মমতা (১৯৫২), দীওয়ানা (১৯৫২), রাজা হরিশচন্দ্র (১৯৫২), ময়ূরপঙ্খ (১৯৫৪), চোরবাজার (১৯৫৪), রাজযোগী ভার্তারী (১৯৫৪), চীরাগ-এ-চীন (১৯৫৫), দিল্লি দরবার (১৯৫৬), জাগতে রহো (১৯৫৬) ইত্যাদি। দস্যু মোহন (১৯৫৫) ছবিতে তার বাংলা চলচ্চিত্রে প্রত্যাবর্তন। তার পরবর্তী অভিনীত বাংলা ছবিগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো একদিন রাত্রে (১৯৫৬), সাহেব বিবি গোলাম (১৯৫৬), নীলাচলে মহাপ্রভু (১৯৫৭), আধারে আলো (১৯৫৭), খেলা ভাঙার খেলা (১৯৫৭) এবং যৌতুক (১৯৫৮)। চন্দ্রকান্ত গৌড়ের পরিচালনায় বীর ভীমসেন (১৯৬৪) ছবিতে অভিনয় করার পর অভিনয় জগত থেকে দীর্ঘ বিরতি নেন সুমিত্রা। ফিরে আসেন আবারো সেই চন্দ্রকান্ত গৌড়ের পরিচালনায় হর হর মহাদেব (১৯৭৪) ছবিতে। সুমিত্রা দেবী অভিনীত শেষ ছবি বলো হে চক্রধারী (১৯৭৭)।[১২]

বংশ পরিচিতি ও প্রাথমিক জীবন

[সম্পাদনা]

১৯২৩ সালের ২২শে জুলাই, অবিভক্ত ভারতের বীরভূমের শিউড়িতে তার মাতুলালয়ে সুমিত্রা দেবীর জন্ম।[] তার পিতা মুরলীধর চট্টোপাধ্যায় ছিলেন পেশায় উকিল। তার পিতামহ পীতাম্বর চট্টোপাধ্যায় ছিলেন পাটনা হাই কোর্টের উকিল। পীতাম্বর চট্টোপাধ্যায়ের ভাই দিগম্বর চট্টোপাধ্যায় ছিলেন স্বদেশী যুগের বিখ্যাত উকিল।[১০] তাদের আদি নিবাস বাঁকুড়া জেলার অন্তর্গত মালিয়াড়া গ্রাম। সুমিত্রা দেবীর ছোটবেলা কেটেছিল বিহারের মজঃফরপুরে। ১৯৩৪ সালের ভূমিকম্পে, মজঃফরপুরের বসত বাড়িটি ধবংস হয়ে গেলে, মুরলীধর চট্টোপাধ্যায় তার পরিবার পরিজনকে নিয়ে মালিয়াড়া গ্রামে ফিরে আসেন। সুমিত্রা দেবীর বিয়ে হয় বিহারের ভাগলপুরে। তার বৈবাহিক জীবন সুখের ছিলনা। পরবর্তীতে অভিনয়ের তাড়নায়, ভাগলপুরের শশুরবাড়ি ত্যাগ করে তিনি কলকাতায় চলে আসেন।[১১]

কর্মজীবন

[সম্পাদনা]

কিশোরী বয়স থেকেই কানন দেবী, চন্দ্রাবতী দেবী, লীলা দেশাইয়ের মতো তৎকালীন বিখ্যাত অভিনেত্রীদের সৌন্দর্যে এবং খ্যাতিতে অত্যন্ত প্রভাবিত হন সুমিত্রা এবং মনে মনে অভিনেত্রী হওয়ার বাসনা পোষণ করতেন।[][১৩] ১৯৪৩ সালে তাঁকে নিউ থিয়েটার্সের অফিসে একটি সাক্ষাতকার এবং পর্দায় চেহারা পরীক্ষার জন্য ডেকে পাঠানো হয়েছিল এবং শেষ অবধি হেমচন্দ্র চন্দরের মেরি বহেন (১৯৪৪) ছবিতে কুন্দন লাল সায়গলের বিপরীতে অভিনয়ের জন্য তাঁকে নির্বাচন করা হয়েছিল। এই ছবির শুটিং চলাকালীন, প্রখ্যাত পরিচালক দেবকী কুমার বসুর নজরে পড়েন সুমিত্রা দেবী। দেবকী কুমার বসু তাঁকে, তাঁর ভাগ্নে অপূর্ব মিত্রের সন্ধি (১৯৪৪) ছবিতে বিমান বন্দোপাধ্যায়ের বিপরীতে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করার প্রস্তাব দেন। সুমিত্রা দেবী অভিনীত প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি সন্ধি। ছবির কাহিনীকার শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। ছবির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন দেবকী কুমার বসু।[১৪] মেরি বহেন সুমিত্রা দেবীর দ্বিতীয় ছবি। এই দুটি ছবিই উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক সাফল্য লাভ করায় প্রথম সারিতে চলে আসেন সুমিত্রা। ক্যামেরার সামনে প্রথম বার দাড়িয়েও তার অভিনয় ছিল সাবলীল ও সুললিত। সন্ধি ছবিতে তার অভিনীত চরিত্রের নাম রেখা। ধনী রায় বাহাদুরের একরোখা কন্যা রেখা হয়ে ওঠে নায়ক সুরেশের প্রেমাস্পদা। সন্ধি ছবির দৌলতে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে বিএফজেএ পুরস্কার জিতে নেন সুমিত্রা দেবী।[]

মেরি বহেন ছবিতে অভিনয় করার সময় দেবী মুখোপাধ্যায়ের সাথে আলাপ সুমিত্রা দেবীর। দেবী মুখোপাধ্যায়ের আপত্তি থাকায় একের পর এক হিন্দি ও বাংলা ছবির প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন সুমিত্রা। এমনকি দিলীপ কুমারের বিপরীতে মিলন ছবির প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। দেবী মুখোপাধ্যায়ের দাবী ছিল, সুমিত্রা শুধুমাত্র তার বিপরীতেই অভিনয় করবেন। চল্লিশের দশকের শেষার্ধে তাকে মোট ছয়টি বাংলা ছবিতে অভিনয় করতে দেখা যায়।[১১] অভিযোগ (১৯৪৬), পথের দাবী (১৯৪৭), প্রতিবাদ (১৯৪৮), জয়যাত্রা (১৯৪৮), স্বামী (১৯৪৯), দেবী চৌধুরানী (১৯৪৯) ⸺ টানা ছয়টি ছবিই ব্যবসায়িক সাফল্যের মুখ দেখায়, এক নম্বর নায়িকার আসন তার হাতের মুঠোয় চলে আসে।[][১৫]

নীতিন বসুর পরিচালনায় মশাল (১৯৫০) ছবির সাফল্যের পর বেশি পারিশ্রমিকের আকাঙ্ক্ষায় বম্বেতে গিয়ে একের পর এক হিন্দি ছবিতে অভিনয় করতে শুরু করেন সুমিত্রা। তালিকায় রয়েছে মমতা (১৯৫২), দীওয়ানা (১৯৫২), রাজা হরিশচন্দ্র (১৯৫২), ময়ূরপঙ্খ (১৯৫৪), চোরবাজার (১৯৫৪), রাজযোগী ভার্তারী (১৯৫৪), চীরাগ-এ-চীন (১৯৫৫), দিল্লি দরবার (১৯৫৬), জাগতে রহো (১৯৫৬) ইত্যাদি।

দস্যু মোহন (১৯৫৫) ছবিতে তার বাংলা চলচ্চিত্রে প্রত্যাবর্তন। তার পরবর্তী অভিনীত বাংলা ছবিগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো একদিন রাত্রে (১৯৫৬), সাহেব বিবি গোলাম (১৯৫৬), নীলাচলে মহাপ্রভু (১৯৫৭), আধারে আলো (১৯৫৭), খেলা ভাঙার খেলা (১৯৫৭) এবং যৌতুক (১৯৫৮)।

চন্দ্রকান্ত গৌড়ের পরিচালনায় বীর ভীমসেন (১৯৬৪) ছবিতে অভিনয় করার পর অভিনয় জগত থেকে দীর্ঘ বিরতি নেন সুমিত্রা। ফিরে আসেন আবারো সেই চন্দ্রকান্ত গৌড়ের পরিচালনায় হর হর মহাদেব (১৯৭৪) ছবিতে। সুমিত্রা দেবী অভিনীত শেষ ছবি বলো হে চক্রধারী (১৯৭৭)।[১৩][১৬]

ব্যক্তিগত জীবন

[সম্পাদনা]

অভিনয় করবেন বলে, ভাগলপুরের শশুরবাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিলেন সুমিত্রা। অভিনয় জগতে পা রেখেই দেবী মুখোপাধ্যায়ের ব্যাক্তিত্বে আকৃষ্ট হন তিনি।[১৭] দেবী মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী ও সন্তান থাকায় তার বিবাহ প্রস্তাবে অসম্মত হন সুমিত্রা। এমতাবস্থায় দেবী মুখোপাধ্যায় একদিন বলপূর্বক সুমিত্রা দেবীর মেক-আপ রুমে ঢুকে তাকে বিবাহ করতে বাধ্য করেন।[১৭][১১] ২১শে অক্টোবর ১৯৪৬ সালে দেবী মুখোপাধ্যায়কে বিবাহ করেন সুমিত্রা। সময়ের সাথে, দুজনের মধ্যে সাংসারিক মনোমালিন্য শুরু হয়। দেবী বাবুর দাবী ছিল, সুমিত্রা দেবী, দেবী বাবু ব্যতীত অন্য কোন অভিনেতার বিপরীতে অভিনয় করবেন না। সুমিত্রা, প্রদীপ কুমারের বিপরীতে স্বামী (১৯৪৯) ও দেবী চৌধুরানী (১৯৪৯) ছবির প্রস্তাব গ্রহণ করলে দেবী মুখোপাধ্যায় ক্ষুব্ধ হন।[১৮] ১ ডিসেম্বর ১৯৪৭ সালে, তাদের এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। ১১ ডিসেম্বর ১৯৪৭, দেবী মুখোপাধ্যায় আত্মহত্যা করেন।[১২]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 "Sumitra Devi – Interview (1952)"cineplot.com (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
  2. "Sumitra Devi"Friday Moviez। ২৪ আগস্ট ২০১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৪ আগস্ট ২০১৮
  3. Gooptu, Sharmistha (১ নভেম্বর ২০১০)। Bengali Cinema: 'An Other Nation' (ইংরেজি ভাষায়)। Routledge। আইএসবিএন ৯৭৮১১৩৬৯১২১৬০
  4. "Sumitra Devi movies, filmography, biography and songs - Cinestaan.com"Cinestaan। ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
  5. "Sumitra Devi"www.gomolo.com। ৩১ মার্চ ২০১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১০ মার্চ ২০১৯
  6. lyricstashan.com। "Best Sumitra Devi song lyrics collection - LyricsTashan"lyricstashan.com। ১৫ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জানুয়ারি ২০১৮
  7. "10 Greatest Bengali Actresses of All Time"The Cinemaholic (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ৩ ডিসেম্বর ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ১১ ডিসেম্বর ২০১৭
  8. রবি বসু ১৯৯৬, পৃ. ৩০৯।
  9. 1 2 "Ten Most Beautiful Actresses of Bengali Cinema"filmsack.jimdo.com (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ৬ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৮ মার্চ ২০১৭
  10. 1 2 3 "Sumitra Devi – The sedative and gorgeous Indian actress of 1940s to 1960s"My Words & Thoughts (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ১৮ জুন ২০১৯। ১৬ জুন ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৩ জুলাই ২০১৯
  11. 1 2 3 4 সুজয় ঘোষ ২০২১, পৃ. ১৮৬।
  12. 1 2 3 "পটেশ্বরী সুমিত্রা, নিজের জীবনেও হারান স্বামীকে, ছেলের জন্মের চারদিন পরেই বর আত্মহত্যা করেন - The mysterious life story of Sumitra Devi, the dreamy heroine of the Golden Age"TheWall। ২৩ জুলাই ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ২০ জুলাই ২০২৬
  13. 1 2 "Sumitra Devi : An Unsurpassable beauty of Bengali cinema"filmsack.jimdo.com (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ৭ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৬ জুলাই ২০১৭
  14. "সন্ধি (১৯৪৪)"banglacinema100.com। সংগ্রহের তারিখ ২১ জুলাই ২০২৬
  15. "Best Bengali Actresses Of All Times, Who Have Created Ripples!"What's Up Kolkata (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ২০ আগস্ট ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৯ আগস্ট ২০১৮
  16. Indian cinema (ইংরেজি ভাষায়)। Publication Division, Ministry of Information and Broadcasting, Government of India। ১ জানুয়ারি ১৯৯৮। আইএসবিএন ৯৭৮৮১২৩০০৬৪৬৮
  17. 1 2 রবি বসু ১৯৯৬, পৃ. ৩১৬।
  18. সুজয় ঘোষ ২০২১, পৃ. ১৮৭।

গ্রন্থপঞ্জী

[সম্পাদনা]
  • রবি বসু (১৯৯৬)। সাতরঙ। খণ্ড ১। দীপ প্রকাশন। সংগ্রহের তারিখ ২০ জুলাই ২০২৬

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]