বিষয়বস্তুতে চলুন

সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স বা শ্রেষ্ঠত্বের ভান হলো একটি প্রতিরক্ষা-প্রক্রিয়া, যা সময়ের সাথে সাথে গড়ে ওঠে এবং একজন মানুষকে তার হীনমন্যতার অনুভূতির সঙ্গে সামঞ্জস্য স্থাপন বা তা মোকাবিলা করতে সাহায্য করে।[১][২] এই পরিভাষাটি বিশ শতকের সূচনালগ্নে (প্রায় ১৯০০-এর দশকে) আলফ্রেড এ্যাডলার (১৮৭০–১৯৩৭) প্রবর্তন করেন এবং এটি তার প্রতিষ্ঠিত স্বতন্ত্র মনোবিজ্ঞান শাখার অংশ।

সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভোগা ব্যক্তিরা সাধারণত অন্যদের প্রতি উদ্ধত, অহংকারী ও তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করে থাকেন। তারা অন্যদের সঙ্গে কর্তৃত্বপরায়ণ, দমনমূলক, এমনকি আগ্রাসী ভঙ্গিতেও আচরণ করতে পারে।[৩][৪]

প্রাত্যহিক জীবনে, এ পরিভাষাটি প্রায়ই নিজের সম্পর্কে অতিরিক্ত উচ্চ ধারণা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

আলফ্রেড এ্যাডলার

[সম্পাদনা]

আলফ্রেড এ্যাডলার সর্বপ্রথম “সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স” পরিভাষাটি ব্যবহার করেন। তিনি দাবি করেন যে, সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স মূলত ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স বা হীনমন্যতার গভীর অনুভূতিকে অতিক্রম করার প্রয়োজনীয়তা থেকেই আসে[৫] এ্যাডলারের রচনায় সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স ও ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স একে অপরের কার্যকারণ হিসেবে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত।[৬] এই বিষয়ে তার রচনাসমূহের মধ্যে রয়েছে: Understanding Human Nature (1927)[৭] এবং Superiority and Social Interest: A Collection of Later Writings, যা এ্যাডলারের লেখা ২১টি প্রবন্ধের সংকলন এবং ১৯৬৪ সালে তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়।[৮]

এ্যাডলার স্বাভাবিক সাফল্য অর্জনের প্রচেষ্টাকে সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স থেকে পৃথক করেন।[৯] সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স আসলে হীনমন্যতার অনুভূতিকে অতিরিক্তভাবে আড়াল বা ক্ষতিপূরণ করার চেষ্টা মাত্র।[৫] তিনি উল্লেখ করেন যে, ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভোগা ব্যক্তিরা সেই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার উপায় হিসেবে একপ্রকার সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে আক্রান্ত হয় এবং এর মাধ্যমে তারা মূলত নিজেদের আত্মমর্যাদাকে কোনো না কোনোভাবে অতিরঞ্জিত করে তোলে।[৯] বীরত্বের স্বপ্ন এবং সাফল্যের ভ্রান্ত ধারণা এ্যাডলারের কাছে এমন প্রচেষ্টার প্রতিক্রিয়াশীল স্বভাবকে প্রকাশ করেছিল।[৬][১০]

এ্যাডলার তার লেখায় যাকে “শ্রেষ্ঠত্বের সাধনা” বলে আখ্যায়িত করেছেন, সেটিকে তিনি মানব স্বভাবের একটি সর্বজনীন বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেন।[৫] তবে তার মতে, সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ অন্যের ওপর ব্যক্তিগত প্রাধান্য বিস্তার করতে চায় না; বরং কর্মের মাধ্যমে নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ ও সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে প্রচেষ্টা চালায়। যারা সত্যিকারের সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভোগেন, তারা মূলত অহংকারী কল্পনায় এবং একচ্ছত্র আধিপত্যের অপরিবর্তনীয় স্বপ্নে বিভোর থাকেন।[১][১১]

অন্যান্য ব্যাখ্যা

[সম্পাদনা]
  • অপরদিকে, আলফ্রেড এ্যাডলারের রচনার প্রায় বিশ বছর পর প্রকাশিত মানসিক রোগের ডায়াগনস্টিক ও স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল (ডিএসএম)-এর একটি সংস্করণে এই ধারণার সঙ্গে একমত দেখা যায়নি যে, সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স (ডিএসএম IV-এ এর আনুষ্ঠানিক নাম গ্র্যান্ডিওস ডেলিউশন) কেবল ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সের প্রভাব থেকেই উদ্ভূত হয়।[১২] ডিএসএম IV উল্লেখ করেছে যে, এই ডেলিউশন ডিসঅর্ডারের দ্বিতীয় কারণ হতে পারে অতিরঞ্জিত মানসিক অবস্থার প্রভাব।

সাংস্কৃতিক উদাহরণ

[সম্পাদনা]
  • পিকাসোর প্রাক্তন সঙ্গী ফার্নান্দে অলিভিয়েরের মতে, সাধারণ পরিবার এবং ছোট আকৃতির কারণে পিকাসো সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভুগতেন।[১৩] অলিভিয়েরের ভাষ্যমতে, "তিনি বলতেন, কেবল সেইসব জিনিসই তাকে স্পর্শ করতে পারে, যেগুলোর তুলনায় তিনি নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন।"[১৪]
  • বেটহোফেনের আভিজাত্যের ভান ছিল সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সের ফলাফল;[১৫] তবে সেই একই জটিলতাই তার অসাধারণ সঙ্গীতসাফল্যের প্রেরণায় রূপ নিয়েছিল। তরুণ সঙ্গীতশিল্পীর আত্মগর্বী দাবির প্রসঙ্গে আর্নস্ট ব্লখ বলেন— “বেটহোফেন হওয়ার জন্য তার এই ঔদ্ধত্য অপরিহার্য ছিল।”[১৬]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 Adler, Alfred (১৯১৭)। The Neurotic Constitution: Outlines of a Comparative Individualistic Psychology and Psychotherapy। নিউ ইয়র্ক: Moffat, Yard & Co। পৃ. xvii। ... চরিত্রের বৈশিষ্ট্যসমূহ, বিশেষত যেসব বৈশিষ্ট্য স্নায়ুরোগ থেকে আসে, তা জীবনের হিসাব মেলাতে এবং জীবনের উত্থান-পতনের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে পৌঁছাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এই বৈশিষ্ট্যসমূহের মাধ্যমেই মানুষ জীবনের প্রতি একটি নির্দিষ্ট মনোভাব গ্রহণ করতে পারে, যা তাকে নিরাপত্তাবোধ এবং শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি অর্জনের সেই লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়।
  2. ↑ "সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স" (৫ম সংস্করণ)। American Heritage Dictionary of the English Language। ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ৫ অক্টোবর ২০২০।
  3. ↑ অ্যাডলার 1917, p. 327 "সাধারণত, একজনের মধ্যে বিচ্যুতি এবং জটিলতা দেখা যায়, যার মধ্য দিয়ে তার 'স্যাডিস্টিক' (অধিক আনন্দ লাভের জন্য অন্যদের কষ্ট দেওয়া) বৈশিষ্ট্যটি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে হারিয়ে যায়। এভাবেই মনোরোগগ্রস্ত ব্যক্তি দুর্বলদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে সফল হয়, অথবা সে এমন দক্ষতা ও কৌশলের সাথে কাজ করে যে এমন একটি আগ্রাসন তৈরি করতে পারে যা তাকে অন্যদের ওপর আধিপত্য বিস্তার ও নির্যাতন করতে সাহায্য করে।।
  4. ↑ "সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স"। স্টেডম্যানের মেডিক্যাল ডিকশনারি। সংগ্রহের তারিখ ৫ অক্টোবর ২০২০। ...একগুচ্ছ আচরণ, যেমন—আক্রমণাত্মক মনোভাব, দৃঢ়তা, এবং আত্মগরিমা—যা গভীরতর অযোগ্যতাবোধকে অতিরিক্তভাবে পুষিয়ে নেওয়ারই ফল।
  5. 1 2 3 Adler, Alfred (৩০ ডিসেম্বর ১৯৬৪)। আলফ্রেড এ্যাডলারের স্বতন্ত্র মনোবিজ্ঞান: তার রচনাসমূহ থেকে নির্বাচিত অংশে একটি পদ্ধতিগত উপস্থাপন (১ম সংস্করণ)। নিউ ইয়র্ক: বেসিক বুকস। আইএসবিএন ৯৭৮০০৬১৩১১৫৪৩। ওসিএলসি 5692434। {{বই উদ্ধৃতি}}: আইএসবিএন / তারিখের অসামঞ্জস্যতা (সাহায্য)
  6. 1 2 হারলড, মোসাক; মানিয়াচ্চি, মাইকেল (২০১৩)। অ্যাডলারিয়ান মনোবিজ্ঞানের প্রাইমার: আলফ্রেড এ্যাডলারের বিশ্লেষণাত্মক-আচরণগত-সাংখ্যিক মনোবিজ্ঞান। মিল্টন পার্ক: টেইলর অ্যান্ড ফ্রান্সিস গ্রুপ। পৃ. ৮৩। ডিওআই:10.4324/9780203768518। আইএসবিএন ৯৭৮০২০৩৭৬৮৫১৮।
  7. ↑ Adler, Alfred (১৯২৭)। "Understanding human nature"। New York: Greenberg, Publisher, Inc.। সংগ্রহের তারিখ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ – Internet Archive এর মাধ্যমে।
  8. ↑ টোয়াল, রবার্ট এ. (ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬)। "আলফ্রেড এ্যাডলার—শ্রেষ্ঠত্ব এবং সামাজিক আগ্রহ: পরে লেখা সংকলনের সমালোচনা [সংক্ষেপ]"। সাইকোথেরাপি (জার্নাল)। ৩ (১): ৪৩–৪৪। ডিওআই:10.1037/h0087963। ইআইএসএসএন 1939-1536। সংগ্রহের তারিখ ৭ নভেম্বর ২০১৯ – PsycNET (psycnet.apa.org) এর মাধ্যমে।
  9. 1 2 স্চার্ফ, রিচার্ড এস. (২০১১)। মনোচিকিৎসা ও পরামর্শের তত্ত্ব: ধারণা ও মামলা। বস্টন: সেনগেজ। পৃ. ১৩০। আইএসবিএন ৯৭৮০৩৫৭৬৭১০৪৭।
  10. ↑ এ্যাডলার, আলফ্রেড (২০০২)। আলফ্রেড এ্যাডলার সংকলিত ক্লিনিক্যাল রচনা। বেলিংহ্যাম, ওয়াশিংটন: আলফ্রেড অ্যাডলার ইনস্টিটিউট। পৃ. ৭৮।
  11. ↑ Gregory, Richard, সম্পাদক (১৯৮৭)। The Oxford Companion to the Mind (2nd সংস্করণ)। Oxford University Press। পৃ. ৩৬৮, ৬। আইএসবিএন ৯৭৮০১৯৮৬৬১২৪৫ – Internet Archive (archive.org) এর মাধ্যমে।
  12. ↑ মানসিক রোগের ডায়াগনস্টিক ও স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল: DSM-IV (৪র্থ সংস্করণ)। ওয়াশিংটন, ডিসি: আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন। ১৯৯৪। আইএসবিএন ০৮৯০৪২০৬১০। ওসিএলসি 29953039।
  13. ↑ Richardson, J. (১৯৯২)। A Life of Picasso, Vol. I: The Early Years, 1881–1906। লন্ডন: Pimlico। পৃ. ৪৮–৪৯। আইএসবিএন ৯৭৮০৩৯৪৫৩১৯২২।
  14. ↑ Richardson, J. (১৯৯৬)। A Life of Picasso, Vol. II: The Cubist Rebel: 1907–1916। লন্ডন: Pimlico। পৃ. ১৮৯। আইএসবিএন ৯৭৮০৩৭৫৭১১৫০৩।
  15. ↑ Graf, Max (১৯৪৭)। From Beethoven to Shostakovich: The psychology of the composing process। নিউ ইয়র্ক: Philosophical Library।
  16. ↑ Solomon, Maynard (১৯৮৮)। Beethoven Essays। Harvard University Press। পৃ. ৫৫। আইএসবিএন ৯৭৮০৬৭৪০৬৩৭৭৮।