সুখের রসায়ন
ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত ১৩০৮ সালের একটি ফারসি অনুলিপির প্রচ্ছদ | |
| লেখক | আল-গাজ্জালি |
|---|---|
| মূল শিরোনাম | কিমিয়া-ই সাদাত (ফার্সি: کیمیای سعادت) |
| অনুবাদক | মুহাম্মাদ মুস্তাফা আন-নাওয়ালি, ক্লড ফিল্ড, জে ক্রুক |
| প্রকাশনার স্থান | পারস্য |
| ভাষা | ফার্সি ভাষা |
| বিষয় | ইসলামি নীতিশাস্ত্র ও দর্শন |
প্রকাশনার তারিখ | ১২শ শতকের প্রথম দিক |
| এলসি শ্রেণী | B753.G33 |
কিমিয়া-ই সাদাত ( ফার্সি: کیمیای سعادت ইংরেজি: The Alchemy of Happiness/Contentment ) হল আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল-গাজ্জালীর রচিত একটি বই। তিনি একজন ফার্সি ধর্মতত্ত্ববিদ, দার্শনিক এবং প্রখ্যাত মুসলিম লেখক। তাকে প্রায়ই ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ ও রহস্যবাদীদের একজন হিসেবে মনে করা হয়। কিমিয়া-ই সা'আদাত তাঁর জীবনের শেষের দিকে ৪৯৯ হিজরি/১১০৫ খ্রিস্টাব্দের কিছু আগে লেখা হয়েছিল। এটি লেখার সময় মুসলিম বিশ্ব রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অস্থিরতার মধ্যে ছিল। গাজ্জালী লক্ষ্য করেছিলেন যে দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছিল। সেই সাথে সুফিরা ইসলামের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান অবহেলা করার জন্য সমালোচিত হচ্ছিলেন। এই বইটি প্রকাশের পর গাজ্জালী পণ্ডিত ও সুফিদের মধ্যে উত্তেজনা অনেকটা কমাতে সক্ষম হন। "কিমিয়া-ই সাদাত" ইসলামের আচার-অনুষ্ঠান পালন, মুক্তির পথ ও পাপ থেকে দূরে থাকার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে। এর সুফিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং আত্ম-শৃঙ্খলা ও ত্যাগের ওপর গুরুত্বারোপের জন্য বইটি সমকালীন অন্যান্য ধর্মতাত্ত্বিক রচনা থেকে আলাদা ছিল।[১]
| ইসলাম সম্পর্কিত একটি ধারাবাহিকের অংশ সুফিবাদ |
|---|
|
|
গঠন
[সম্পাদনা]কিমিয়া-ই সাদাত এবং ও এর অনুবাদগুলো নবীর কিছু উপদেশ দিয়ে শুরু হয়। বইটি মোট চারটি প্রধান অংশে বিভক্ত। প্রতিটিতে দশটি করে অধ্যায় রয়েছে:
- এবাদত (ধর্মীয় কর্তব্য)
- মঞ্জিয়াত (পরিত্রাণ)
- মুআমালাত (ইসলামের মানব সম্পর্কের দিক)
- মোহলেকাত (অভিশাপ)
সা‘আদা (সুখ)
[সম্পাদনা]"সা‘আদা" (সুখ) ইসলামী দর্শনে একটি কেন্দ্রীয় ধারণা, যা মানুষের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়। এটি পরকালের "চূড়ান্ত সুখ"-এর অংশ। গাজ্জালী মনে করতেন, মানুষ যখন তার আত্মাকে শারীরিক অস্তিত্ব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে এবং "সক্রিয় বুদ্ধি" পর্যায়ে পৌঁছায়, তখনই এই সুখ অর্জিত হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বর-প্রদত্ত যুক্তিশক্তি ব্যবহার করে মানুষকে আধ্যাত্মিকতা রসায়নের দিকে আকৃষ্ট হতে হবে। যা আত্মাকে পার্থিবতা থেকে ঈশ্বরের প্রতি পুরোপুরি নিবেদিত করে। এটিই চূড়ান্ত সুখ দিতে পারে। গাজ্জালী শরিয়ত অনুযায়ী জীবনযাপনের মাধ্যমে বিচার দিবসে এর গভীর অর্থ বোঝার ওপর জোর দিয়েছেন।
কিমিয়া
[সম্পাদনা]"কিমিয়া" বা রসায়ন একটি প্রয়োগমূলক ও রহস্যময় বিজ্ঞান। এটি শতাব্দী ধরে অধ্যয়ন করা হচ্ছে। মূলত, কিমিয়া মহাবিশ্বের একটি সম্পূর্ণ ধারণা এবং পার্থিব প্রাণী এবং মহাবিশ্বের মধ্যে সম্পর্কের প্রতিনিধিত্ব করে।[২] ধধর্মীয় দার্শনিকরা এটিকে একটি ধর্মীয় শৃঙ্খলা হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছেন। এর আধ্যাত্মিক মাত্রার কারণে কিমিয়াকে সব গুপ্তবিদ্যার (যেমন জ্যোতিষশাস্ত্র, জাদু) মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করা হয়। গাজ্জালী বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীর সবকিছু ঈশ্বরের আত্মার প্রকাশ, তাই সবকিছুই কিমিয়ার অংশ।[২]
ইহইয়া উলূম আল-দীন
[সম্পাদনা]এটি একটি সাধারণ ভুল ধারণা যে কিমিয়া-ই সা'আদাত হল ইহিয়া 'উলূম আল-দীনের পুনর্লিখন করা হয়েছে। ইহইয়া উলূম আল-দীন গাজ্জালী একটি আধ্যাত্মিক সংকটের পর লিখেছিলেন। তখন তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে কয়েক বছর নির্জনে কাটান। এটি আরবি ভাষায় রচিত হয়েছিল। এখানে দেখানো হয়েছে যে কীভাবে একজন সুফির জীবন ইসলামী আইনের দাবির উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হতে পারে। ইহিয়া উলূম আল-দীন এবং কিমিয়া-ই সা'আদাতের মধ্যে মিল রয়েছে। তবে কিমিয়া-ই সা'আদাতের চারটি অধ্যায়ে প্রাসঙ্গিক ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনা রয়েছে যা উভয়কে আলাদা করে।কিমিয়া-ই সা'আদাত ফারসি ভাষায় লেখা হয়েছিল, যাতে গাজালির স্বদেশবাসীর কাছে এটি সহজবোধ্য হয়। কিমিয়া-ই সা'আদাত তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত রচনা। তবে এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ইহইয়া উলুম আদ-দীন-এর মূল শিক্ষা সহজ ভাষায় উপস্থাপন করা।
অনুবাদ এবং সম্পাদনা
[সম্পাদনা]"কিমিয়া-ই সাদাত" পারসি থেকে উর্দু, তুর্কি, আজারবাইজানি ও জার্মান ভাষায় অনূদিত হয়েছে। হুসাইন-খাদিভ-ই জাম প্রায় দুই দশক আগে এর প্রথম অর্ধেক সম্পাদনা করেন। এ সংস্করণ আগের গুলোর তুলনায় উন্নত ছিল। ১৮৯৫ সালে মির্জা মুহাম্মদ ইউসুফ আলী এটিকে বাংলায় "সৌভাগ্য স্পর্শমণি" নামে অনুবাদ করেন।
১৯১০ সালে ক্লদ ফিল্ড উর্দু ও তুর্কি অনুবাদের ভিত্তিতে ইংরেজিতে একটি সংক্ষিপ্ত অনুবাদ প্রকাশ করেন। এলটন এল. ড্যানিয়েল এটিকে পারসি মূলের সঙ্গে তুলনা করে অধ্যায় ও অনুচ্ছেদ পুনর্বিন্যাস করেন এবং টীকা যোগ করেন। সর্বশেষ অনুবাদ ২০০৮ সালে জে ক্রুক করেন। তবে পণ্ডিতরা মনে করেন, মূল ফারসি থেকে নতুন ও পূর্ণাঙ্গ অনুবাদের তুলনা হয় না।[১]
''আল্লাহ পৃথিবীতে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী প্রেরণ করেছেন, যাতে তারা মানুষকে এই আধ্যাত্মিক রসায়নের বিধান শিক্ষা দিতে পারে। একই সাথে আত্মসংযমের ফলে তাদের হৃদয়কে নিম্নতর গুণাবলি থেকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পারে। এই আধ্যাত্মিক রসায়নকে সংক্ষেপে বলা যায়—দুনিয়া থেকে মন সরিয়ে নেওয়া। এর চারটি উপাদান হলো: নিজেকে জানা, ঈশ্বরকে জানা, এই পৃথিবীকে যথাযথভাবে জানা, এবং পরকালকে যথাযথভাবে জানা''।