সীরাতে খাতামুল আম্বিয়া

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সীরাতে খাতামুল আম্বিয়া
সীরাতে খাতামুল আম্বিয়া বইয়ের প্রচ্ছদ.jpeg
বাংলা অনুবাদের প্রচ্ছদ
লেখকমুহাম্মদ শফি উসমানি
মূল শিরোনামআরবি: اوجز السير لخير البشر‎, প্রতিবর্ণী. আওজাযুস সিয়ার লি খাইরিল বাশার‎, উর্দু: سیرت خاتم الانبیاء ﷺ‎, প্রতিবর্ণী. সীরাতে খাতামুল আম্বিয়া
অনুবাদক
  • বাংলা
    • ফাহিম সিদ্দিকী
    • মুহাম্মদ যুবায়ের
    • মুহাম্মদ আনওয়ারুল বারী
    • মুহাম্মদ খালেদ
দেশভারত
ভাষাউর্দু (মূল)
মুক্তির সংখ্যা
১ খণ্ড
বিষয়ইসলাম
ধরনসীরাত
প্রকাশিত১৯২৫ (উর্দু)
প্রকাশকইসলামিয়া কুতুবখানা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ (বাংলা)
মিডিয়া ধরন
পৃষ্ঠাসংখ্যা১২৪ (উর্দু)
আইএসবিএন৯৭৮-৯৬৯৫৮৩২৩৫৬
ওসিএলসি১৯৫৪৬৫৭২
২৯৭.৬৩ বি
ওয়েবসাইটইশা ছাত্র আন্দোলন লাইব্রেরি

সীরাতে খাতামুল আম্বিয়া (উর্দু: سیرت خاتم الانبیاء ﷺ‎‎ ) দেওবন্দি ইসলামি পণ্ডিত মুহাম্মদ শফি উসমানি কর্তৃক উর্দু ভাষায় রচিত একটি জনপ্রিয় ও বিশুদ্ধ সীরাত গ্রন্থ। গ্রন্থটি পাঠ্যবই হিসেবে রচনা করা হয়েছে এবং সংক্ষেপায়ণের জন্য এতে নবী জীবনের শুধুমাত্র প্রধান বিষয় সমূহ আলোচিত হয়েছে। গ্রন্থটি সর্বপ্রথম ১৯২৫ সালে ‘আওজাযুস সিয়ার লি খাইরিল বাশার ’ নামে প্রকাশিত হয়। এই নামটি প্রচলিত না হওয়ায় ২য় সংস্করণে ‘সীরাতে খাতামুল আম্বিয়া ’ নামে মুদ্রিত হয় এবং এই নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করে। তৎকালীন প্রভাবশালী পণ্ডিত আশরাফ আলী থানভী এটি অত্যন্ত পছন্দ করেন এবং ঘোষণা দিয়ে অন্যান্যদেরও বইটির প্রতি উৎসাহিত করেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে এটি মাজাহির উলুম, সাহারানপুর সহ উপমহাদেশের অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ইসলামি সংগঠনের পাঠ্যবই হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং এ ধারা পরবর্তীতেও অব্যাহত আছে।

পটভূমি[সম্পাদনা]

বইটি রচনার পটভূমি উল্লেখ করতে গিয়ে লেখক বলেছেন,[১]

উর্দু ভাষায় নতুন ও পুরনাে বহু সীরাতগ্রন্থ রচনা করে ভারতবাসী আলেমগণ তাঁদের কর্তব্য পালন করেছেন। কিন্তু আমার দৃষ্টি বহুদিন ধরে এমন একটি সংক্ষিপ্ত সীরাত গ্রন্থ অনুসন্ধান করছিল, যা যেকোনাে কর্মব্যস্ত মুসলমান নর-নারী অতি অল্প সময়ে পড়ে শেষ করে নিজের ঈমানকে সতেজ করতে পারে এবং নবীর আদর্শকে আপন সুপথের দিশারী হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। সে সাথে এটি যেন ইসলামি সংগঠন এবং মাদ্রাসা সমূহের প্রাথমিক পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যে গ্রন্থটিতে মূল বর্ণনায় সতর্কতা বজায় রেখে অতি সংক্ষেপে নবী জীবনের পূর্ণ চিত্র অবিকল ও পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করা হয়; কিন্তু উর্দু ভাষায় এমন কোনাে গ্রন্থ আমার নজরে পড়েনি। ইতিমধ্যে শিমলার কয়েকজন বন্ধু তাঁদের ইসলামি সংগঠনের জন্য এ ধরনের একটি গ্রন্থের প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করে অধমের নিকট এ ব্যাপারে অনুরােধ জানায়। তাই নিজ জ্ঞানের স্বল্পতা এবং অধ্যয়নের ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও এই আশায় কলম ধরলাম যে, যখন আল্লাহ তাআলার দরবারে সাইয়িদুল কাওনাইন (সৃষ্টিজগতের নেতা) নবী করীম সাঃ-এর জীবনী লেখকদের নাম পেশ করা হবে তখন সে তালিকার এক কোণে এ অধমের নামটিও স্থান পাবে। কবির ভাষায়,

“যে বাগানে গাইছে সদা হাজার হাজার বুলবুলি,
সেই বাগানে আমিও ঢুকে সবার সাথে বোল তুলি”

বৈশিষ্ট্য[সম্পাদনা]

বইয়ের ভূমিকাতে লেখক বইটির কিছু বৈশিষ্ট্য আলোচনা করেছেন। যথা:[১] [২][৩]

  1. বইটি দীর্ঘায়িত না করার জন্য লেখক আরবের ভৌগোলিক বিবরণ, ইসলাম পূর্ব আরব-অনারব জগতের সার্বিক অবস্থা যা সীরাত সংশ্লিষ্ট মনে করা হয়, তা এড়িয়ে শুধুমাত্র সেই সকল অবস্থার বিবরণ প্রদান করা যথেষ্ট মনে করেছেন যা একান্তই নবীর জীবনের সাথে সম্পর্কিত। আর এই সংক্ষেপায়ণের কারণেই বইটির নাম রাখা হয়েছিল ‘আওজাযুস সিয়ার লি খাইরিল বাশার ’ (সর্বশ্রেষ্ঠ মানবের সংক্ষিপ্ত জীবন চরিত)
  2. বইটি সংক্ষিপ্ত করার সাথে সাথে পরিপূর্ণতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় বিষয় ও জরুরি ঘটনাগুলো সন্নিবেশিত করা হয়েছে।
  3. জিহাদ, বহু বিবাহ ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে ইসলাম বিরোধীদের বক্তব্যের উত্তর দেয়া হয়েছে।
  4. বইটির মূল উত্‍স নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্যগ্রন্থ সমূহের উদ্ধৃতি; যথাস্থানে পৃষ্ঠা নং সহ উল্লেখ করা হয়েছে।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

বইটি রচনার পর লেখকের পীর আশরাফ আলী থানভী বইটি অত্যন্ত পছন্দ করে খানকায়ে এমদাদিয়ার পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং তার রচিত ‘তাতিম্মাতে অসিয়্যত’ নামক পুস্তিকাতে ঘোষণা দিয়ে অন্যান্যদেরও বইটির প্রতি উৎসাহিত করেন। ফলে তিনমাসের মধ্যে এটি মাজাহির উলুম, সাহারানপুর সহ পাঞ্জাব, হিন্দুস্তানবাংলার শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ইসলামি সংগঠনের পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তীতেও এই দ্বারা অব্যাহত থাকে।[১] বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালে। এর মূল নাম ছিল ‘আওজাযুস সিয়ার লি খাইরিল বাশার’। নামটি প্রচলিত না হওয়ায় ২য় সংস্করণে ‘সীরাতে খাতামুল আম্বিয়া’ নামে এটি মুদ্রিত হয় এবং এই নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করে।[৪][৫]

গ্রন্থটির অসংখ্য বঙ্গানুবাদ বের হয়েছে।[৩] অনুবাদকদের মধ্যে রয়েছেন: ফাহিম সিদ্দিকী, মুহাম্মদ যুবায়ের, মুহাম্মদ আনওয়ারুল বারী, মুহাম্মদ খালেদ প্রমুখ।

গঠন[সম্পাদনা]

বইয়ের শুরুতে আসগর হুসাইন দেওবন্দির একটি ভূমিকা রয়েছে। লেখক আলোচ্য বিষয়সমূহকে মোট ১৪১টি শিরোনামে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে হিজরি-পূর্ব জীবনী আলোচনা করতে ৬৩টি এবং তারপরের অংশটুকু হিজরি সন অনুযায়ী ১১ ভাগে ভাগ করে ৭৭টি শিরোনামে আলোচনা করা হয়েছে। সর্বশেষ শিরোনাম 'জাওয়ামিউল কালিম'।[১]

প্রথমেই লেখক নবীর বংশ পরিচয় উল্লেখ করেছেন। তারপর ধারবাহিকতা বজায় রেখে ওনার জন্মপূর্ব বরকত প্রকাশ, জন্মলগ্নের অবস্থা, পিতার মৃত্যু, দুধপান এবং শৈশবকাল এবং নবীর প্রথম মুখনিঃসৃত বাক্য কি ছিল তা আলোচনা করেছেন।[১]

তাছাড়া হিজরি সনের পূর্বে নবীর মাতা ও আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যু আলোচনা করেছেন। নবীর দুইবার সিরিয়া সফর পরবর্তী খাদিজার সাথে বিবাহ, “আযওয়াজে মুতাহহারাত”-এর পরিচয় ও বিবাহ সংঘটনের উল্লেখযোগ্য কারণও বাদ পড়েনি এই পুস্তিকাটিতে। মোটামুটি নবীর হিজরি-পূর্ব অবস্থা যতটুকু একজন মানুষের জানা থাকা আবশ্যক তা সম্বন্ধে যথেষ্ট ধারণা দেয়া হয়েছে গ্রন্থটিতে। আর নবী জীবনের ৫৩ বছর অতিবাহিত হয়েছে হিজরি সন গণনার পূর্বেই।[১]

হিজরি পরবর্তী জীবন সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিতে সনভিত্তিক একে একে নবীর জিহাদী জীবন আলোচনা করা হয়েছে।[১]

“ইসলাম তরবারির মাধ্যমে প্রচারিত হয়নি” এই শিরোনামে যারা বলে বেড়ায় ইসলাম তরবারির জোরে প্রসার লাভ করেছে তাদের জবাব প্রদান করা হয়েছে। মোটামুটি জিহাদের বিধিসম্মত হওয়া ও জিহাদের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের ব্যাপারে সু-ধারণা বজায় রাখার আলোচনা রয়েছে। তারপর নকশা আকারে বুঝার সুবিধার্থে পাঠকদের একটি শিক্ষণীয় বিষয় উপস্থাপন করেছেন তা হলো নবীর ২৩টি গাযওয়া[ক] ও ৪৩ টি সারিয়ার[খ] সংক্ষিপ্ত একটি রূপরেখা।[১]

২য় হিজরির আলোচনায় উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো কিবলা পরিবর্তন, গাযওয়ায়ে বদর এবং সারিয়ায়ে আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশের ঘটনা। ৩য় হিজরির আলোচনায় উল্লেখযোগ্য সকল ঘটনা গাযওয়ায়ে উহুদ ও গাযওয়ায়ে গাতফানের ঐতিহাসিক যুদ্ধ। ৪র্থ হিজরির আলোচনায় বীরে মাউনা অভিমুখে সারিয়ায়ে মুনজিরের ঘটনা উল্লেখযোগ্য বলে বিবেচিত। ৫ম হিজরিতে কুরাইশইহুদিদের একতা বন্ধনে যৌথ ষড়যন্ত্র ও আহযাবের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ৬ষ্ঠ হিজরিতে হুদাইবিয়ার সন্ধি, বাইয়াতে রিদওয়ান এবং বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের নিকট পত্রের মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত প্রেরণ এবং এ বছরেই আল্লাহর তলোয়ার ঘোষিত খালিদ বিন ওয়ালিদআমর ইবনুল আস ইসলাম গ্রহণ করেন। ৭ম হিজরির আলোচনা গাযওয়ায়ে খায়বার, ফাদাক বিজয় এবং উমরার কাযা আদায়। ৮ম হিজরিতে সারিয়ায়ে মুতামক্কা বিজয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসের বাঁক ঘুরিয়ে দেয়া ঘটনাগুলো সংঘটিত হয়। ৯ম হিজরিতে তাবুক যুদ্ধ, হাজ্জুল ইসলাম, প্রতিনিধি দলের আগমন ও দলে দলে ইসলাম গ্রহণের ঘটনাগুলো প্রণিধানযোগ্য। ১০ম হিজরিতে নবী বিদায় হজ্জের জন্য ২৫শে জিলকদ সোমবার মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। ১১শ হিজরির আলোচনা সারিয়ায়ে উসামা, অন্তিম পীড়া এবং মৃত্যুবরণের সময় নবীর সর্বশেষ উক্তি ছিল 'আমি রফিকে আ'লাকে পছন্দ করি' অপর বর্ণনায় রয়েছে ওনার শেষ উক্তি ছিল "নামাজ নামাজ"।[১]

বইয়ের শেষ অংশে জাওয়ামিউল কালিম শিরোনামে লেখক নবীর ব্যাপক অর্থবোধক ৪০টি হাদিস একত্রিত করেছেন।[১]

উৎস[সম্পাদনা]

সূত্রধর্মী এই গ্রন্থটি রচনায় লেখক যেসব উৎসের সহায়তা নিয়েছেন তার মধ্যে রয়েছে:[১]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. ইসলামের পরিভাষায় গাযওয়া অর্থ যে সমস্ত যুদ্ধে ইসলামের নবী স্বশরীরে অংশগ্রহণ করেছেন।
  2. ইসলামের পরিভাষায় সারিয়া অর্থ যে সমস্ত যুদ্ধে ইসলামের নবী সশরীরে অংশগ্রহণ করেননি কিন্তু প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. মুহাম্মদ শফি, মুফতি (১৯৬২)। সীরাতে খাতামুল আম্বিয়া (উর্দু ভাষায়)। এএসআইএন B07L14GKJVওসিএলসি 19546572lay summary 
  2. উল্লাহ, আহসান (২০১৮)। "রিসার্চ স্টাডি অন দ্য কন্ট্রিবিউশন অফ মুফতি মুহাম্মদ শফি ইন সিরাহ স্টাডিজ" [সিরাহ স্টাডিজে মুফতি মুহাম্মদ শফির অবদান নিয়ে গবেষণা]। জার্নাল অফ ইসলামিক এন্ড রিলিজিয়াস স্টাডিজপাকিস্তান: হরিপুর বিশ্ববিদ্যালয়। (১): ৯৫—১০৫। আইএসএসএন 2519-7118ডিওআই:10.12816/0048278 
  3. মারুফ, আবদুল্লাহ (১০ ডিসেম্বর ২০১৭)। "বাংলা ভাষায় কালজয়ী ৯ সীরাতগ্রন্থ"আমাদের সময় [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  4. জাহান, ইবরাত (২০১৩)। "সীরাত সাহিত্যে দারুল উলুম দেওবন্দের অবদান"আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়: ১৮। 
  5. খানম, খেহখাশান (২০১৮)। বিংশ শতাব্দীতে সীরাতের উপর রচিত উর্দু বইসমূহের একটি গবেষণা (উর্দু ভাষায়)। সুন্নি ধর্মতত্ত্ব বিভাগ, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়। পৃষ্ঠা ১৬৪–১৬৬। 

গ্রন্থপঞ্জি[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]