সিলেট গণভোট

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সিলেট গণভোট
সিলেট কি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত পূর্ববাংলায় যোগদান করবে?
অবস্থানসিলেট, আসাম, ব্রিটিশ রাজ
তারিখ৬ জুলাই ১৯৪৭ (1947-07-06)
ফলাফল
ভোট %
হ্যাঁ ২,৩৯,৬১৯ ৫৬.৫৬‏%
না ১,৮৪,০৪১ ৪৩.৪৪‏%
সঠিকভাবে ভোট ৪,২৩,৬৬০ ৭৭.৪৮‏%
বেঠিক বা ভোটহীন ১,২৩,১৫৫ ২২.৫২‏%
মোট ভোট ৫,৪৬,৮১৫ ১০০.০০%

সিলেট গণভোট হচ্ছে সিলেটে অনুষ্ঠিত একটি গণভোট যেখানে সিলেট, আসাম-এর সাথে থাকবে এবং নতুন দেশ ভারতের সাথে যুক্ত হবে নাকি পূর্ব বঙ্গ-এর সাথে যুক্ত হয়ে নতুন দেশ পাকিস্তানে যোগ দেবে এই প্রশ্নে গণভোটের একটি ব্যবস্থা। গণভোটটি সিলেট ভারতের নাকি পাকিস্তানের অংশ হবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে আয়োজিত হয়।[১] সিলেট গণভোট ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ৬ ও ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়।[১] ইতিপূর্বে ৩ জুলাই এ বিষয়ে সরকারি ঘোষণা দেয়া হয়েছিল।[১]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৭৬৫ সালে এই অঞ্চলে ব্রিটিশ আগমনের পূর্বে সিলেট সরকার মুঘল সাম্রাজ্যের বেঙ্গল সুবাহের অংশ ছিল। প্রাথমিকভাবে কোম্পানি রাজ সিলেটকে তার বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে অন্তর্ভুক্ত করে। ১০৯ বছর পর ১৮৭৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আসামের বাণিজ্যিক উন্নয়নের সুবিধার্থে সিলেটকে অনিয়ন্ত্রিত প্রধান কমিশনার প্রদেশের (উত্তর-পূর্ব সীমান্ত) অংশ করা হয়। ১০ আগস্ট জেলার বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা, যা হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের সমন্বয়ে গঠিত, থেকে ভাইসরয় লর্ড নর্থব্রুকের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়া সত্ত্বেও এই স্থানান্তর কার্যকর করা হয়।[২] নর্থব্রুক যখন সিলেট সফরে আসেন তখন এই বিক্ষোভ কমে যায় যখন বাংলার কলকাতা থেকে শিক্ষা ও ন্যায়বিচার পরিচালিত হবে,[৩] সেই সাথে সিলেটের হিন্দু জমিদাররা আসামের চা এস্টেটে কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং তাদের পণ্যের বাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ উপলব্ধি করেন।[৩]

১৯০৫ সালে বাংলার প্রথম বিভাজনের পর নতুন প্রদেশের সুরমা উপত্যকা ও পার্বত্য জেলা বিভাগের অংশ হিসেবে সিলেটকে সংক্ষেপে পূর্ব বাংলা ও আসামের সাথে পুনরায় যুক্ত করা হয়। যাইহোক, এটি স্বল্পস্থায়ী ছিল যখন সিলেট আবার ১৯১২ সালে বাংলা থেকে পৃথক হয়ে ওঠে, যখন আসামকে প্রধান কমিশনার প্রদেশে পুনর্গঠন করা হয়।[৪] ১৯২০-এর দশকে সিলেট পিপলস অ্যাসোসিয়েশনসিলেট-বেঙ্গল রিইউনিয়ন লীগের মতো সংগঠনগুলো সিলেটকে বাংলায় পুনর্বহালের দাবিতে জনমত গড়ে তুলে।[৫] যাইহোক, মুহাম্মদ বখত মজুমদার এবং সৈয়দ আব্দুল মজিদ সহ পুনর্মিলন লীগের নেতারা পরবর্তীতে সুরমা উপত্যকা মুসলিম সম্মেলনের সময় ১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সিলেট ও কাছাড় বাংলায় স্থানান্তরের বিরোধিতা করেন; আব্দুল মজিদের আঞ্জুমান-ই-ইসলামিয়া এবং মুসলিম স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন দ্বারা সমর্থিত।

প্রেক্ষাপট[সম্পাদনা]

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের মাধ্যমে ভারতপাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এসময় বর্তমান সিলেট বিভাগ আসামের অংশ ছিল। দেশ বিভাগের পর সিলেট ভারতে থাকবে নাকি পাকিস্তানে যোগ দেবে এই প্রশ্নে গণভোটের ব্যবস্থা হয়। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ভারত স্বাধীনতা আইনের ধারা ৩ মোতাবেক গণভোট সংক্রান্ত কার্যক্রমের বৈধতা দেওয়া হয়।[১]

ভারত বিভাজন সংগঠিত হয়েছিল ধর্মীয় সীমারেখা বরাবর। যেখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা পাকিস্তান গঠন করে এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা ভারত গঠন করে।[৬] আসামের মধ্যে সিলেট একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা ছিল যা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশের মধ্যে ছিল। সিলেটের লোকজন সিলেটি বা বাংলায় কথা বলত যেখানে এই প্রদেশের বাকি লোকজন আসামি ভাষায় কথা বলত। আসাম সরকার মনে করত সিলেট কে সরিয়ে দিলে এটা আরো বেশি স্বদেশী হবে এবং ফলে অধিক শক্তিশালী হবে। আসামের প্রধানমন্ত্রী গোপিনাথ বরদলই ১৯৪৬ সালে বলেন যে তার ইচ্ছা “সিলেটকে পূর্ব বঙ্গে হস্তান্তর করা”।[৭]

ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

নির্বাচন পরিচালনার জন্য এইচ. সি. স্টর্ক‌কে রেফারেন্ডাম কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। নির্বাচনের জন্য ২৩৯টি কেন্দ্র ঠিক করা হয়। এতে মোট ৪৭৮ জন প্রিসাইডিং অফিসার ও ১৪৩৪ জন পোলিং অফিসার ছিলেন।[১]

ফলাফল[সম্পাদনা]

গণভোটে সিলেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেয়। এর ফলে সিলেট আসাম থেকে আলাদা হয়ে পাকিস্তানভুক্ত হয়। তবে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিলেও র‍্যাডক্লিফ রোয়েদাদে সিলেটের করিমগঞ্জের কিছু থানা ও আশেপাশের অধিকাংশ মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।[১][৮] নিচের ছকে[১] গণভোটের ফলাফল প্রদর্শিত হয়েছে:

মহকুমা ভোটার সংখ্যা পাকিস্তানের পক্ষে ভোট ভারতের পক্ষে ভোট
সিলেট উত্তর ১,৪১,১৩১ ৬৮,৩৮১ ৩৮,৮৭১
করিমগঞ্জ ১,০০,২৪৩ ৪১,২৬২ ৪০,৫৩৬
হবিগঞ্জ ১,৩৫,৫২৬ ৫৪,৫৪৩ ৩৬,৯৫২
দক্ষিণ (মৌলভীবাজার) ৭৯,০২৪ ৩১,৭১৮ ৩৩,৪৭১
সুনামগঞ্জ ৯০,৮৯১ ৪৩,৭১৫ ৩৪,২১১
মোট ৫,৪৬,৮১৫ ২,৩৯,৬১৯ ১,৮৪,০৪১

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "সিলেট গণভোট, ১৯৪৭"বাংলাপিডিয়া। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০২-১৭ 
  2. Fazal, Tanweer (২০১৩-১০-১৮)। Minority Nationalisms in South Asia (ইংরেজি ভাষায়)। Routledge। পৃষ্ঠা ৫৩। আইএসবিএন 978-1-317-96647-0 
  3. Hossain, Ashfaque (২০১৩)। "The Making and Unmaking of Assam-Bengal Borders and the Sylhet Referendum*"Modern Asian Studies (ইংরেজি ভাষায়)। 47 (1): 250–287। আইএসএসএন 0026-749Xডিওআই:10.1017/S0026749X1200056X 
  4. Taylor, William Cooke (১৯৮৭)। A Popular History of British India (ইংরেজি ভাষায়)। Mittal Publications। পৃষ্ঠা ৫০৫। 
  5. Fazal, Tanweer (২০১৩-১০-১৮)। Minority Nationalisms in South Asia (ইংরেজি ভাষায়)। Routledge। পৃষ্ঠা ৫৪। আইএসবিএন 978-1-317-96647-0 
  6. "History - British History in depth: The Hidden Story of Partition and its Legacies"bbc.co.uk। BBC। সংগ্রহের তারিখ ২০ নভেম্বর ২০১৬ 
  7. Daniyal, Shoaib। "With Brexit a reality, a look back at six Indian referendums (and one that never happened)"Scroll.in। Scroll। সংগ্রহের তারিখ ২০ নভেম্বর ২০১৬ 
  8. আহমদ, আবুল মনসুর (১৯৬৯)। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর। খোশরোজ কিতাব মহল। আইএসবিএন 9844380006