সিরাজগঞ্জের গামছা

সিরাজগঞ্জের গামছা বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ জেলায় উৎপাদিত সুতোয় বোনা তাঁতজাত পণ্য, যা স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে বহুল পরিচিত।[১] এটি কেবল শরীর মোছার কাজে নয়, সাধারণ মানুষের টুপি ও জামা, বিশেষত শিশুদের জামা তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের শিল্প মন্ত্রণালয় ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০ এপ্রিল সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতের এই গামছাকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের নিবন্ধন সনদ প্রদান করে।[২]
ইতিহাস
[সম্পাদনা]নামকরণ
[সম্পাদনা]‘গামছা’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে বাংলা শব্দ গা (শরীর) ও মোছা (পরিষ্কার করা) থেকে। প্রাচীনকালে হাত, মুখ বা শরীর ধোওয়ার পর শরীর মোছার জন্য গামছা ব্যবহৃত হতো, যা আধুনিক যুগের তোয়ালের পূর্ববর্তী রূপ হিসেবে বিবেচিত। ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের ভূস্বামী সিরাজউদ্দিন চৌধুরী ১৮০৯ সালের দিকে ভূতের দিয়ার মৌজার নাম পরিবর্তন করে ‘সিরাজগঞ্জ’ রাখেন। পরবর্তীকালে এই অঞ্চলে উৎপাদিত গামছাই ‘সিরাজগঞ্জের গামছা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।[৩]
বর্তমান অবস্থা
[সম্পাদনা]ব্রিটিশ আমলে সিরাজগঞ্জের তাঁতি সম্প্রদায় গামছা উৎপাদন শুরু করে, পরবর্তীতে অন্যান্য সম্প্রদায়ও এ পেশায় যুক্ত হয়। একসময় এ গামছা উত্তরাঞ্চলসহ সমগ্র ভারতবর্ষে রপ্তানি হতো। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর পাঁচলিয়া-সিরাজগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের পাশে স্কুলমাঠে গামছা, সুতা ও রঙের হাট বসানো হয়, যা ধীরে ধীরে “গামছার হাট” নামে পরিচিতি পায়।[৪] বর্তমানে সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, শাহজাদপুর, কামারখন্দ ও উল্লাপাড়া উপজেলায় অসংখ্য পরিবার গামছা শিল্পের সঙ্গে জড়িত। গামছা কেনাবেচার জন্য সোহাগপুর, এনায়েতপুর, শাহজাদপুর, পাঁচলিয়া ও সিরাজগঞ্জ শহরে বড় হাট গড়ে উঠেছে, যার মধ্যে পাঁচলিয়া এলাকা বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ।[৫] সিরাজগঞ্জের গামছা বাংলাদেশসহ স্পেন, ফ্রান্স, ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, লাতিন আমেরিকা, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত, শ্রীলংকা ইত্যাদি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। তাছাড়া, গামছা দিয়ে তৈরি পোশাক, ন্যাপকিন ইত্যাদিও উল্লিখিত দেশে রপ্তানি হচ্ছে।[১]
বৈশিষ্ট্য
[সম্পাদনা]সিরাজগঞ্জের গামছা ১০০% তুলার সুতা দিয়ে তৈরি হয়, যা দেখতে আকর্ষণীয় ও ব্যবহারে আরামদায়ক। এর আয়তন ভেদে দাম ভিন্ন হয়। নকশার বৈচিত্র্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে টানা ও পড়েন উভয় দিকে বিভিন্ন রঙের সুতা ব্যবহার করা হয়, যার ফলে চেক ও স্ট্রাইপ নকশা ফুটে ওঠে। সাধারণত গামছায় লাল, নীল, হলুদ, সবুজ ইত্যাদি উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
আরো দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 গাজী শাহাদাত হোসেন বিরোধী (৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩)। "হরেক সুতোয় বোনা সিরাজগঞ্জের গামছা"। প্রতিদিনের সংবাদ। সংগ্রহের তারিখ ১৮ আগস্ট ২০২৫।
- ↑ "বাংলাদেশের জিআই পণ্য এখন ৫৫টি"। জাগো নিউজ। ৩০ এপ্রিল ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ১৮ আগস্ট ২০২৫।
- ↑ ঢাকাই মসলিন, ড. আবদুল করিম (২০১৬), পৃষ্ঠা. ৫৪-৫৫
- ↑ স্বপন চন্দ্র দাস (৭ জুন ২০১৬)। "গামছার গ্রাম পাঁচলিয়া"। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম। সংগ্রহের তারিখ ১৮ আগস্ট ২০২৫।
- ↑ রিংকু কুণ্ডু (৭ নভেম্বর ২০২৪)। "সিরাজগঞ্জের পাঁচলিয়ায় প্রতি হাটে ৩-৪ কোটি টাকার গামছা ও সুতা বিক্রি"। সংগ্রহের তারিখ ১৮ আগস্ট ২০২৫।