সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রো

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রো , স্টেট ইউনিয়ন অভ সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রো নামেও পরিচিত। এটি দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি দেশ যা ১৯৯২ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ফেডারেল রিপাবলিক অভ যুগোশ্লাভিয়া নামে পরিচিত ছিল। ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়ার ভাঙনের পর এর দুইটি ফেডারেল প্রজাতন্ত্র থেকে সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রো তৈরি হয়। ১৯৯২ সালে সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রো প্রজাতন্ত্র দুটি একটি ফেডারেশন তৈরি করে, যা ফেডারেল রিপাবলিক অভ যুগোশ্লাভিয়া বা সংক্ষেপে যুগোশ্লাভিয়া নামে পরিচিত।

ফেডারেল ইউনিয়ন তৈরির প্রথম কয়েকবছর, দেশটি পূর্বতন যুগোশ্লাভিয়ার একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদেরকে দাবি করে কিন্তু অন্যান্য প্রজাতন্ত্র কর্তৃক বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। জাতিসংঘেও তাদের সদস্যপদের আবেদন খারিজ করা হয়। [১] পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে ২০০০ সালে স্লোবোদান মিলোসেভিচ কে ফেডারেলের রাষ্ট্রপতি থেকে অপসারণের পর দেশটি তাদের এই দাবি বাতিল করে এবং যুগোশ্লাভিয়া শান্তি সম্মেলনের সালিসি কমিশনের শর্তানুযায়ী অন্যান্য প্রজাতন্ত্রের সাথে যৌথ উত্তরাধিকারের শর্তের সাথে ঐক্যমতে পৌঁছায়। ২০০০ সালের ২৭ শে অক্টোবর দেশটি জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য আবারো আবেদন করে এবং ১ নভেম্বর আবেদনটি গৃহীত হয়।[২]

ফেডারেল রিপাবলিক অভ যুগোশ্লাভিয়া (সংক্ষেপে এফআরওয়াই) স্লোবোদান মিলোসেভিচ দ্বারা প্রভাবিত ছিল। যিনি প্রথমদিকে সার্বিয়ার রাষ্ট্রপতি (১৯৮৯-১৯৯৭) ছিলেন এবং পরবর্তীতে যুগোশ্লাভিয়ার রাষ্ট্রপতি (১৯৯৭-২০০০) হন। এসময়ের মধ্যে তিনি বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে জোরপুর্বক অপসারণের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেন।[৩] প্রথমদিকে মন্টিনিগ্রো সরকারে বিদ্যমান তার বহু সমর্থক পরবর্তীতে তার নীতির কারণে দূরে সরতে থাকেন। ১৯৯৬ সালের ক্ষমতার পটপরিবর্তনে তা চরম পরিণতি প্রাপ্ত হয়, যখন তার সাবেক মিত্র মিলো দুকানোভিচ তার নীতি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী করে তোলেন, মন্টিনিগ্রোর ক্ষ্মতাসীন দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং মিলোসেভিচ সরকারের প্রতি অনুগত সাবেক নেতা মমির বুলাতোভিচ কে অপসারণ করেন। বুলাতোভিচকে ফেডারেল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেলগ্রেডে নিয়োগ দেয়া হলে দুকানোভিচ মন্টিনিগ্রো সরকার আলাদাভাবে চালানো শুরু করেন এবং সার্বিয়া থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্নতার দিকে নিয়ে যান। এভাবেই ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রো বাহ্যত একীভূত রাষ্ট্র হিসেবে দৃশ্যমান হলেও স্থানীয় পর্যায়ে আলাদাভাবে পরিচালিত হতে থাকে, এসময় সার্বিয়ার প্রাশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু ছিল বেলগ্রেড আর মন্টিনিগ্রোর জন্য পোদোগোরিকা।

কার্যত আলাদাভাবে পরিচালিত হওয়া ফেডারেল রাষ্ট্রটির সামরিক ক্ষেত্র ব্যতীত অন্য সকল কার্যাবলি দুটি আলাদা রাষ্ট্রের ন্যায় পরিচালিত হত। এমনকি অর্থনীতিও আলাদা ছিল, মন্টিনিগ্রোতে ইউরোর প্রচলন থাকলেও সার্বিয়াতে তা ছিল না। এমতাবস্থায় ২১ মে, ২০০৬ সালে মন্টিনিগ্রো স্বাধীনতা প্রস্তাব গৃহীত হয়, যে প্রস্তাবে ৫৫.৫% ভোটার স্বাধীনতার পক্ষে ভোট প্রদান করেন। ৩ জুন ২০০৬ সালে মন্টিনিগ্রো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করলে ৮৮ বছর পুর্বের যুগোশ্লাভিয়া দেশটির সর্বশেষ ইউনিয়ন হিসেবে প্রচলিত রাষ্ট্রটি ভেঙে যায়। এর পরবর্তীতে সার্বিয়া এই ইউনিয়নটির উত্তরাধিকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যেখানে মন্টিনিগ্রো নতুন রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক সংগঠনসমূহের সদস্যপদ লাভের জন্য আবেদন করতে থাকে।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৯৯০ সালে যুগোশ্লাভিয়ার ভাঙনের পরও সার্বিয়ামন্টিনিগ্রো পূর্বতন রাষ্ট্রকে মেনে চলার ব্যাপারে একমত হয় ও ১৯৯২ সালে নতুন যুগোশ্লাভিয়ার জন্য একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে। পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় ভাঙন ধরার পর নতুন রাষ্ট্রটি মুক্তবাজার অর্থনীতি গ্রহণ করে। কমিউনিস্ট লাল তারকা পতাকা থেকে অদৃশ্য হয় এবং জাতীয় প্রতীকে সমাজতন্ত্রের প্রতীক সরে গিয়ে জায়গা করে নেয় দুই মাথা বিশিষ্ট ঈগল, যাতে সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রো উভয় দেশের প্রতীক স্থান পায়। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নতুন করে রাষ্ট্রপতি পদ তৈরি করা হয় এবং ১৯৯৭ সালে গণতান্ত্রিক উপায়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগ পর্যন্ত একজন রাষ্ট্রপতি প্রাথমিকভাবে নিযুক্ত হন।

বিভক্তির উদ্ভব[সম্পাদনা]

মন্টিনিগ্রো[সম্পাদনা]

১৯৯৬ সাল থেকেই সার্বিয়ান নেতৃত্ব ও মন্টিনিগ্রোর নেতৃত্বের অংশবিশেষের মাঝে রাজনৈতিক বিরোধ জনসম্মুখে স্পষ্ট হতে শুরু করে। ১৯৯৮ সালে মন্টিনিগ্রোর প্রধানমন্ত্রী দুকানোভিচ রাষ্ট্রপতি বুলাতোভিচের সাথে প্রকাশ্যে ক্ষমতার দ্বন্দে আবির্ভূত হন। এমন সময় ডয়েচ মার্ক কে মুদ্রা হিসেবে ঘোষণা দিয়ে অর্থনৈতিক ভাবে মন্টিনিগ্রো প্রজাতন্ত্র নিজেদের আলাদা ঘোষণা করে। ১৯৯৯ সালে কসোভো যুদ্ধ এবং ন্যাটো বাহিনীর বোমা হামলার পরিপ্রেক্ষিতে দুকানোভিচ "আ প্ল্যাটফর্ম ফর রিডেফিনেশন অফ রিলেশনস উইদইন সার্বিয়া এন্ড মন্টিনিগ্রো" নামে একটি খসড়া পেশ করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর প্রাশসনিক কার্যাবলির বিভক্তিকরণ। মিলোসেভিচ এই প্ল্যাটফর্ম কে অসাংবিধানিক বলে নাকচ করে দেন। দুইটি প্রজাতন্ত্রেই তখন রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক উচ্চস্তরের নেতাদের গুম খুন বেড়ে যায় এবং রাজনৈতিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি হয়। ২০০০ সালের ভেতরেই মিলোসেভিচ ক্ষমতা হারান। এসময় পুরো ফেডারেলের রাজনৈতিক সংস্কার দূরে রেখে দুকানোভিচ শুধু মন্টিনিগ্রোর স্বাধীনতার উপর জোর দেয়া শুরু করেন। এসময় থেকেই মন্টিনিগ্রো সরকার প্রাক-স্বাধীনতা নীতি গ্রহণ করে এবং বেলগ্রেডে ক্ষমতা পরিবর্তন সত্ত্বেও মন্টিনিগ্রো সরকারের সাথে রাজনৈতিক অস্থিরতা উত্তেজনার সকল সীমা অতিক্রম করে।

কসোভো যুদ্ধ[সম্পাদনা]

১৯৯৭ সালে মিলোসেভিচের দ্বিতীয় ও শেষ বৈধ মেয়াদ অবসানের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি আবারো জয়ী হন। এর মাধ্যমে যুগোশ্লাভিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর উপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পায়। ক্ষমতায় বসার পরপরই তিনি সশস্ত্র বাহিনীকে কসোভোর বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমনে নিযুক্ত করেন। ১৯৯৮ থেকে ১৯৯৯ সালে চলমান এই সংঘর্ষকে কসোভো যুদ্ধ বলা হয়।

The Zašto?(Serbian Cyrillic: Зашто, "Why?") Monument, dedicated to the employees of the Radio Television of Serbia (RTS) who were killed during NATO bombing of the RTS building in 1999.

যুগাশ্লাভিয়া সশস্ত্র বাহিনী সেখানে নৃশংস হত্যাকান্ড চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। গণহত্যা ঠেকাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো বাহিনী "ইউনাইটেড এলাইড ফোর্স" নামে যুগোশ্লাভিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম বেলগ্রেড শহরে বিমান আক্রমণ শুরু হয় যার নেতৃত্ব দিয়েছিল ন্যাটো। যুগোশ্লাভিয়ার উপর বিমান হামলা শুরু করার পর সার্বিয়ার সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ বাহিনী ও আধা-সামরিক বাহিনীগুলো কসোভোয় বসবাসরত আলবেনিয়ানদের উপর নির্মম গণহত্যা শুরু করে। এদের ভিতর উল্ল্যেখযোগ্য হল চুসকা গণহত্যা[৪] এবং পদুয়েভো গণহত্যা[৫]। সার্বিয়ান বাহিনীর গণহত্যা থামাতে ন্যাটো জোট বাহিনী বিমান হামলা বন্ধ করার ঘোষণা দেয় এবং একইসময় মিলোসেভিচ কসোভো থেকে সকল যুগোশ্লাভ ও সার্ব বাহিনীকে সরিয়ে আনতে সম্মত হন। ভয়াবহ সিরিজ বিমান হামলার পর, মিলোসেভিচের এই সিদ্ধান্তের পর ন্যাটো শান্তিরক্ষী বাহিনী কসোভোতে প্রবেশ করে।

কনফেডারেশন প্রতিষ্ঠা[সম্পাদনা]

২০০২ সালে সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রো সরকার নতুন এক সমঝোতা চুক্তিতে উপনীত হয় যেখানে তারা যুগোশ্লাভিয়া নামটি রাষ্ট্রের নাম হিসেবে আর না ব্যবহারের ব্যাপারে একমত হয়। এতে করে ৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৩ সালে ফেডারেল এসেম্বলি অভ যুগোশ্লাভিয়া একটা মৈত্রী সংঘ বা কনফেডারেশনে পরিণত হয়- যার নাম হয় স্টেট ইউনিয়ন অভ সার্বিয়া এন্ড মন্টিনিগ্রো। যদিও এসময় সাধারণভাবে যুগোশ্লাভিয়া নামটি অনেক জায়গায় ব্যবহৃত হত। অবশেষে ২১ মে ২০০৬, রবিবার মন্টিনিগ্রোর ৫৫.৫% অধিবাসী স্বাধীন মন্টিনিগ্রোর প্রস্তাবে সম্মতি ভোট প্রদান করার মাধ্যমে কার্যত মন্টিওনিগ্রো স্বাধীন হয়ে পড়ে। এই নির্বাচনে মোট ভোট প্রদানের সংখ্যা ছিল ৪ লক্ষ ৭৭ হাজারের মত, যা মোট ভোটার সংখ্যার ৮৬ শতাংশেরও বেশি।

এরপর ৩ জুন ২০০৬ সালে মন্টিনিগ্রো এবং ৫ জুন ২০০৬ সালে সার্বিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এভাবেই যুগোশ্লাভিয়া ভেঙে বের হয়ে আসা সর্বশেষ ইউনিয়নটিও বিলুপ্ত হয়।

রাজনীতি[সম্পাদনা]

১৯৯২ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান যুগোশ্লাভিয়ার ফেডারেল এসেম্বলি দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা ছিল। নিম্নকক্ষের নাম ছিল কাউন্সিল অভ সিটিজেনস এবং উচ্চকক্ষের নাম ছিল কাউন্সিল অভ রিপাবলিক। যুগশ্লাভিয়ার নেতৃত্ব কখনোই স্থিতবস্থায় ছিল না কেননা, চারবছরের বেশি কোন রাষ্ট্রপতি স্ব-পদে বহাল থাকতে পারেননি। ১৯৯২-১৯৯৩ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন ডোবরিকা কোসিক, যিনি পূর্বতন যুগোশ্লাভিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা ছিলেন। ১৯৯৩ সালে তিনি তার বিরোধী দলের নেতা স্লোবোদান মিলোসেভিচ দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত হন। কোসিকের বদলে ক্ষমতায় আসেন জোরান লিলিচ যিনি ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকেন। এরপর মিলোসেভিচ ক্ষমতায় বসেন। ২০০০ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগ ওঠে, যার প্রতিবাদে যুগোস্লাভিয়ার জনগণ রাস্তায় নেমে আসে ও মিলোসেভিচকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে। তারপরে ক্ষমতায় বসেন ভজিস্লাভ কজতুনিকা, যিনি সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর নতুন সংবিধান প্রণয়ন পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকেন।

ফেডারেশন নতুন সংবিধানের মাধ্যমে একটি স্টেট ইউনিয়ন রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ায় দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা বিলুপ্ত হয়ে যায়। অ্যাসেম্বলি অভ দ্যা স্টেট ইউনিয়ন নামে এককক্ষ বিশিষ্ট এই আইনসভার ৯১ জন সদস্য ছিল সার্বিয়ান আর ৩৫ জন ছিল মন্টিনিগ্রোর। পরবর্তীতে এই আইনসভা থেকে ভেতোজার মারোভিচ একইসাথে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০০৬ সালে সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর আলাদা হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত তিনি স্টেট ইউনিয়নের প্রথম ও শেষ রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

ভৌগলিক অবস্থা[সম্পাদনা]

সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রো একত্রে ১,০২,৩৫০ বর্গকিলোমিটারের (৩৯,৫১৮ বর্গমাইল) একটি রাষ্ট্র ছিল, যেখানে সমুদ্র উপকূল ছিল ১৯৯ কিলোমিটার (১২৪ মাইল)। সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর ভৌগলিক অবস্থার মাঝে বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান। সার্বিয়ার ভূমি অপেক্ষাকৃত সমতল ও ছোট টিলাবিশিষ্ট যেখানে মন্টিনিগ্রোকে তুলনামূলকভাবে অসমতল ও পাহাড়ি অঞ্চল বলা চলে। সার্বিয়ার কসোভো ও মেতোহিজা অঞ্চল মন্টিনিগ্রোর মত পাহাড়ি প্রকৃতির। সার্বিয়া বর্তমানে পুরোপুরিভাবে স্থলবেষ্টিত, কারণ একমাত্র সমুদ্র উপকূল মন্টিনিগ্রোর সাথে যুক্ত।

জলবায়ুর দিক দিয়েও দুটি অংশে বিস্তর বৈচিত্র্য বিদ্যমান। দেশটির উত্তরাঞ্চলের দিকে মহাদেশীয় জলবায়ু বিদ্যমান, সাধারণভাবে যার ফলে এই অঞ্চলে শীতে ঠান্ডা ও গ্রীষ্মে গরম এই দুটিমাত্র আবহাওয়াগত অবস্থান পরিলক্ষিত হয়। মধ্যভাগের আবহাওয়া অনেকটা ভূমধ্যসাগরীয় ও মহাদেশীয় জলবায়ুর মিশ্রণের মত। দক্ষিনাঞ্চলের উপকূলের জায়গাগুলোতে জলবায়ু আবার আড্রিয়াটিক জলবায়ুর মত, যেখানে উপকূল থেকে দূরের দক্ষিণাঞ্চলের অভ্যন্তরের জায়গা গুলোতে গ্রীষ্ম ও শরৎকালে প্রচন্ড উষ্ণতা বিরাজ করে এবং শীতকালে তুষারপাত সহ তীব্র শীত পরিলক্ষিত হয়।

বেলগ্রেড ছিল জনসংখ্যার দিক দিয়ে এই রাষ্ট্রের বৃহত্তম শহর, যেখানে প্রায় ১৫,৭৪,০৫০ জন মানুষের বসবাস ছিল। রাষ্ট্রটির অন্যান্য শহরগুলোর মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হল পোদোগোরিকা, সাবোটিকা, প্রিস্টিনা, নিস ক্রাগুজেভাক, নোভি সাদ প্রভৃতি। এসব শহরগুলোতে গড় জনসংখ্যা ছিল ১,০০,০০০-২,৫০,০০০ জন।

লোকবৈচিত্র্য[সম্পাদনা]

সার্বিয়া এবং মন্টিনিগ্রোতে ইউরোপের যেকোন অঞ্চলের তুলনায় অধিকতর লোকবৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়েছে। এই অঞ্চলের জনগণের মধ্যে ১৯৯১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৬২.৩% সার্ব, ১৬.৬% আলবেনীয় এবং ৫% মন্টিনিগ্রিন ছিল। দেশটিতে উল্ল্যেখযোগ্য হারে যুগোশ্লাভ, হাঙ্গেরিয়ান, রোমানিয়ান, মুসলিম (আদিবাসী), রোমা, ক্রোটা, বুলগেরিয়ান, মেসিডোনিয়ান প্রমুখ জাতিগোষ্ঠীর লোক দেখা যায়। বেশিরভাগ আদিবাসীদের বসবাস কসোভো এবং ভোজদোভিনা প্রদেশে, যেখানে অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসবাসও রয়েছে। আলবেনীয়দের বড় অংশ বাস করে কসোভোতে। প্রেসোভো উপত্যকায় অল্প সংখ্যক আলবেনীয়রা বাস করে। বসনিয়ান সহ স্লাভিক মুসলিমরা এই ফেডারেল রাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী শহর যেমন সার্বিয়ান সীমান্তের শহর নোভী পাজার এবং মন্টিনিগ্রোর সীমান্তবর্তী শহর রোহাজেতে বাস করে।

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

যুগোশ্লাভিয়ার ভাঙনের ফলে সৃষ্ট নতুন ফেডারেল রাষ্ট্রটির অর্থনৈতিক অবস্থা শুরু থেকেই ছিল নাজুক। তার উপর সময়ে সময়ে বিভিন্ন অর্থনৈতিক অবস্রোধ দেশটির অর্থনীতিকে ভেঙে দেয়। ১৯৯০ এর শুরুর দিকে যুগোশ্লাভিয়ান দিনারের অতিরিক্ত মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই মুদ্রাস্ফীতি সামাল দিতে পারলেও কসোভোর যুদ্ধ দেশটির অর্থনীতির আকার নব্বই দশকের শুরুর তুলনায় একেবারে অর্ধেক করে ফেলে। ২০০০ সালে মিলোসেভিচের অপসারণের পর ডেমোক্রেটিক অপোজিশন অভ সার্বিয়ার সাথে কোয়ালিশন করে গঠিত নতুন সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেয়। ২০০০ সালে পুনরায় আইএমএফ এর সদস্যপদ লাভের পর যুগোশ্লাভিয়া অর্থনৈতিকভাবে অন্যান্য দেশের সাথে যুক্ত হয়। পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ লাভের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের যাত্রা শুরু করে।

মন্টিনিগ্রোর প্রজাতন্ত্র রাজনৈতিক অমিলের কারণে অর্থনীতিতে পৃথক পথে চলতে থাকে মিলোসেভিচের যুগ থেকেই। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে দুটি প্রজাতন্ত্রে আলাদা আলাদা দুটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংক স্থাপিত হয়। এসময় মন্টিনিগ্রো ডয়েচ মার্ক কে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে কার্যত সার্বিয়া থেকে অর্থনৈতিকভাবে আলাদা হয়ে যায়। যদিও পরবর্তীতে ইউরোর আগমনে ডয়েচ মার্ক বাদ দেয়া হয় মুদ্রা হিসেবে। সার্বিয়ার সরকার যুগোস্লাভিয়ান দিনারই ব্যবহার করতে থাকে, শুধু এর নাম পরিবর্তন করে নেয় সার্বিয়ান দিনার হিসেবে।

ফেডারেল অবস্থায় সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রোতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্থ করেছিল সেই সময়, ইউরোপীয় অর্থনীতিতে স্থবিরতা সেই সময় ফেডারেল অভ সার্বিয়া এন্ড মন্টেনিগ্রোর অর্থনৈতিক অবস্থার প্রভূত ক্ষতি সাধন করে। আইএমএফ এর সাথে ,মিলিত ব্যবস্থাপনা অর্থনৈতিকভাবে এই দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তার পরেও বেকারত্বের উচ্চহার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অচলাবস্থার মূল কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়। দূর্নীতি দেশটির উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ করে। কালোবাজারি ও উচ্চ অপরাধ প্রবণতা সাবেক অর্থনীতিকে পর্যুদস্ত করে।

যাতায়াত ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

সার্বিয়া বিশেষত মোরোভা নদীর উপত্যকা এই অঞ্চলের যাতায়াত ব্

যবস্থায় এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। প্রায় এই অঞ্চলকে পূর্ব-পশ্চিমের মিলনস্থল বলা হয়, যার কারণ এই অঞ্চলের অতীতের উত্তাল ইতিহাস। গ্রীস ও এশিয়া মাইনর থেকে ইউরোপ মহাদেশের মূল ভূখন্ডে যাবার জন্য এটাই সবচেয়ে সহজ স্থলপথ।

যুগোশ্লাভিয়ার যুদ্ধ শুরু হবার আগ পর্যন্ত ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া ও মেসিডোনিয়া প্রজাতন্ত্রের ভিতর দিয়ে যাওয়া "ব্রাদারহুড এন্ড ইউনিটি হাইওয়ে" ইউরোপের যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম একটি মহাসড়ক ছিল। নিরাপত্তা ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার সাথে সাথে যুদ্ধের পর এই মহাসড়কটি তার পূর্বের কার্যকারিতা ফিরে পায়।

সার্বিয়ার মধ্য দিয়ে বয়ে চলা দানিয়ুব নদী অন্যতম একটি আন্তর্জাতিক জলপথ।

মন্টিনিগ্রোর প্রধান সমুদ্রপথের নাম পোর্ট অভ বার।


টিকা[সম্পাদনা]

১। সার্বো-ক্রোয়েশিয়ান উচ্চারণনীতিঃ https://en.wikipedia.org/wiki/Help:IPA/Serbo-Croatian

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Wood, Michael C. (১৯৯৭)। "Participation of Former Yugoslav States in the United Nations and in Multilateral Treaties"Max Planck Yearbook of United Nations Law Online1 (1): 231–257। doi:10.1163/187574197x00092আইএসএসএন 1389-4633 
  2. "November 28 Highlights"Neurology55 (10): 1427–1427। ২০০০-১১-২৮। doi:10.1212/wnl.55.10.1427আইএসএসএন 0028-3878 
  3. Ramet, Sabrina P., 1949- Pavlaković, Vjeran (২০০৭)। Serbia since 1989 : politics and society under Milošević and after। University of Washington Press। আইএসবিএন 9780295985381ওসিএলসি 770801462 
  4. "Justice for Kosovo - Massacre at Cuska"americanradioworks.publicradio.org। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৭-১১ 
  5. "BBC News | Inside Kosovo | Velika Krusa"news.bbc.co.uk। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৭-১১