সামাজিক প্রত্যাখ্যান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
A woman walking towards a man who has raised his hand towards her and is turning away
This scene of the Admonitions Scroll shows an emperor turning away from his consort, his hand raised in a gesture of rejection and with a look of disdain on his face.[১]

সামাজিক প্রত্যাখ্যান তখনই ঘটে, যখন কোনো ব্যক্তিকে কোনো সামাজিক সম্পর্ক থেকে অথবা কোনো সামাজিক আদানপ্রদান থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বহিষ্কার করা হয়। সামাজিক প্রত্যাখ্যানের মধ্যে পারস্পরিক প্রত্যাখ্যান (অথবা সঙ্গী বিচ্ছেদ), প্রেমঘটিত প্রত্যাখ্যান এবং পারিবারিক বিচ্ছেদ গণ্য হয়ে থাকে। একজন ব্যক্তি কিছু ব্যক্তির দ্বারা অথবা একটা সম্পূর্ণ গোষ্ঠীর দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। এছাড়াও, প্রত্যাখ্যান সক্রিয়ভাবে হতে পারে; যেমন, উৎপীড়নের মাধ্যমে, উত্ত্যক্তকরণের মাধ্যমে অথবা পরিহাসের মাধ্যমে; অথবা এটা নিষ্ক্রিয়ভাবেও হতে পারে; যেমন কাউকে উপেক্ষা করে অথবা নীরব আচরণের মাধ্যমে। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অভিজ্ঞতা গ্রহীতার ব্যক্তিগত, এমনকী প্রত্যাখ্যান আদৌ না ঘটলেও এটি অনুভূত হতে পারে। এক্ষেত্রে অস্ট্রাসিজম বা সামাজিক বহিষ্করণ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত (প্রাচীন গ্রিসে ভোটের মাধ্যমে সাময়িক নির্বাসনে পাঠানোকে বলা হত অস্ট্রাসিজম)।[২]

যদিও মানুষ সামাজিক জীব, তবু জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে কিছু পরিমাণ প্রত্যাখ্যান একেবারেই অনিবার্য। তৎসত্ত্বেও, প্রত্যাখ্যান যদি দীর্ঘায়িত অথবা ধারাবাহিক হয়, কিম্বা যখন সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়, অথবা ব্যক্তিটি যখন প্রত্যাখ্যান সম্বন্ধে অত্যন্ত সংবেদনশীল হন, তখন প্রত্যাখ্যান একটি সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। একটা সম্পূর্ণ গোষ্ঠীর দ্বারা যদি প্রত্যাখ্যান হয়, তবে প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিটির ওপর তা বিশেষভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যা তার ক্ষেত্রে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার জন্ম দেবে।[৩]

বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে বেশ কিছু ক্ষতিকর মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে; যেমন, একাকীত্ববোধ, কম আত্মমর্যাদাবোধ, আক্রমণাত্মক মনোভাব, এবং বিষণ্ণতা।[৩] এছাড়া এটা সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার বোধ এবং ভবিষ্যত প্রত্যাখ্যানের প্রবল আশঙ্কারও জন্ম দেয়।[৪]

স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তা[সম্পাদনা]

মানুষ সামাজিক জীব আর সেই কারণে প্রত্যাখ্যান মানসিকভাবে যন্ত্রণাদায়ক এবং তাই অন্যান্য মানুষের সাথে সামাজিক আদানপ্রদান খুবই জরুরী। আব্রাহাম মাস্‌লো এবং অন্যান্য তাত্ত্বিকদের মতে, ভালবাসা এবং একাত্মতাবোধ মানুষের মধ্যে প্রাথমিক প্রেরণা জোগায়।[৫] মাস্‌লোর মতে, প্রতিটা মানুষেরই, এমনকি যাঁরা অন্তর্মুখীন তাদেরও, মানসিকভাবে সুস্থ থাকবার জন্য স্নেহ-ভালবাসা দেওয়া ও নেওয়ার প্রয়োজন হয়।

মনস্তাত্ত্বিকেরা এটা মনে করেন যে এই প্রয়োজন মেটানোর জন্য সাধারণ যোগাযোগ বা সামাজিক আদানপ্রদান যথেষ্ট নয়। পরিবর্তে, একটি যত্নশীল পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা ও বজায় রাখবার জন্য প্রগাঢ় প্রেরণার প্রয়োজন হয়। মানুষের যেটা প্রয়োজন, তা হল সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্থিতিশীল হওয়া এবং সেই সম্পর্কের মধ্যেকার আদানপ্রদান সন্তোষজনক হওয়া। যদি এই দুটি বিষয়ের একটি না থাকে, তবে মানুষ নিজেকে একাকী এবং অসুখী মনে করে।[৬] ফলত, দেখা যাচ্ছে, প্রত্যাখ্যান ব্যাপারটা যথেষ্টই ভয়াবহ। প্রকৃতপক্ষে, মানুষের উদ্বেগের বেশিরভাগই আপাতভাবে আসে সামাজিক বহিষ্করণের চিন্তা থেকে।[৭]

একটা গোষ্ঠীর সদস্য হওয়াও কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিচয়, এটা আত্ম-ধারণা তৈরি করতে সাহায্য করে। ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্ক লিয়ারির মতে, আত্মমর্যাদার মূল উদ্দেশ্যই হল সামাজিক সম্পর্ককে পর্যবেক্ষণ করা এবং সামাজিক প্রত্যাখ্যানকে চিহ্নিত করা। এক্ষেত্রে, আত্মমর্যাদাবোধ একটি সমাজমিটারের মত কাজ করে যেটা প্রত্যাখ্যানের চিহ্ন দেখলেই নেতিবাচক আবেগের জন্ম দেয়।[৮]

সমাজ মনস্তত্ত্ব এটা নিশ্চিত করে বলতে পারে যে সামাজিক স্বীকৃতির একটা প্রেরণাদায়ক ভিত্তি আছে। বিশেষ করে, প্রত্যাখ্যানের ভয় থেকে দলগত চাপের ফলে অনুক্রমতার জন্ম হয় (কখনো কখনো এটাকে আদর্শ প্রভাবও বলে) এবং তা থেকে অন্যের দাবীর কাছে নতিস্বীকারও করতে হয়। সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং সামাজিক আদানপ্রদানের প্রয়োজনীয়তা কেবলমাত্র তখনই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যখন আমরা মানসিক চাপের মধ্যে থাকি।  

শৈশবে[সম্পাদনা]

সমাজমিতি এবং অন্যান্য রেটিং ব্যবস্থা অনুসরণ করে সঙ্গী প্রত্যাখ্যানকে পরিমাপ করা যায়। সমীক্ষা বলছে, কিছু শিশু খুব জনপ্রিয় হয়, তারা সাধারণত বেশি রেটিং পায়, অনেক শিশু মাঝামাঝি, তাদের রেটিংও হয় মাঝারি এবং কিছু অল্পসংখ্যক শিশু হয় প্রত্যাখ্যাত, তাদের রেটিং সাধারণত খুব কম হয়। প্রত্যাখ্যানের পরিমাপের একটি পদ্ধতিতে শিশুদের বলা হয় যে তারা যেন তাদের পছন্দ ও অপছন্দ অনুযায়ী তাদের সঙ্গীদের একটি তালিকা তৈরি করে। যেসব শিশু প্রত্যাখ্যাত তারা কম ‘পছন্দ’-এর তুলনায় ‘অপছন্দ’-এর ভাগটাই বেশি পায়। যেসব শিশু অবহেলিত শ্রেণীভুক্ত, তারা ‘পছন্দ’ ও ‘অপছন্দ’ উভয় ক্ষেত্রেই কম মনোনয়ন পায়।

পেনসিলভ্যানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির কারেন বিয়ারম্যানের মতে, যে সকল শিশুরা তাদের সঙ্গীদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়, তাদের বেশিরভাগের মধ্যেই নিম্নলিখিত আচরণগুলির অন্তত একটি পরিলক্ষিত হয়ঃ

       ১. সমাজমুখী মনোভাবের অভাব, যেমন পালা করে কাজ করা, ভাগ করে নেওয়া।

       ২. আক্রমণাত্মক অথবা ধ্বংসাত্মক মনোভাবের বৃদ্ধি।

       ৩. অমনোযোগী, অপরিণত অথবা অতিরিক্ত আবেগপূর্ণ আচরণের বৃদ্ধি।

       ৪. সামাজিক উদ্বেগের বৃদ্ধি।

বিয়ারম্যান বলেন যে মিশুকে শিশুদের সামাজিক উপলব্ধির স্তর উন্নত হয় এবং তারা জানে কখন এবং কিভাবে খেলার সঙ্গীদের সঙ্গে মিশতে হয়। যেসব শিশুদের প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় থাকে, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধ্বংসাত্মক মনোভাব নিয়ে সঙ্গীদের মধ্যে প্রবেশ করবার চেষ্টা করে, অথবা আদৌ না মিশে একলা থাকে। আক্রমণাত্মক স্বভাবের শিশুরাও সঙ্গীদের দ্বারা গৃহীত হতে পারে, যাদের দৌড়ে দক্ষতা আছে অথবা যাদের সামাজিক দক্ষতা আছে, এবং যারা এসব ব্যাপারে কম দক্ষ, এরা উক্ত কম-দক্ষতাসম্পন্ন শিশুদেরকে জ্বালাতন করবার ক্ষেত্রে অগ্রণী হয়। যেসব শিশুরা সংখ্যালঘু, যেসব শিশুরা কোন কারণে কোন অক্ষমতায় ভুগছে অথবা যেসব শিশুদের আচরণ বা ব্যবহার অস্বাভাবিক, তাদের প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সঙ্গীদলের সাধারণ নিয়মানুযায়ী, কখনও কখনও শিশুদের মধ্যে খুব সামান্য পার্থক্যও তাদের প্রত্যাখ্যান অথবা অবজ্ঞার পথে ঠেলে দিতে পারে। যেসব শিশুরা কম মিশুকে অথবা সাধারণভাবে একলা খেলাধূলা করাই পছন্দ করে, তারা তুলনামূলকভাবে কম প্রত্যাখ্যাত হয় তাদের থেকে যারা, সামাজিকভাবে বাধা পায় এবং এসব নিয়ে নিরাপত্তাহীনতা অথবা উদ্বেগে ভোগে।

সঙ্গীদের দ্বারা একবার প্রত্যাখ্যাত হয়ে গেলে সেটা স্থায়ীভাবেই রয়ে যায় এবং তার ফলে একটা শিশুর পক্ষে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা খুবই সমস্যাসঙ্কুল হয়ে যায়। গবেষকরা দেখেছেন যে একজন শিশুকে অন্য স্কুলে নিয়ে গেলে সে যদি সাধারণভাবে অবজ্ঞার শিকার হয়, তার থেকেও বেশি স্থায়ী, বেশি ক্ষতিকর এবং বেশিদিন ধরে বজায় থাকে যদি সে সক্রিয় প্রত্যাখ্যানের শিকার হয়। এর একটি কারণ হল এক্ষেত্রে সঙ্গীদল তাদের সম্মানের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের সৃষ্টি করে যেটি একটি পক্ষপাতমূলক সংস্কার হিসেবে কাজ করে এবং অন্যান্য সামাজিক আদানপ্রদানের ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করে। সেই কারণে প্রত্যাখ্যাত এবং জনপ্রিয় শিশুরা যদি একই আচরণ করে এবং সমানভাবে কাজ করতে পারে, তবুও জনপ্রিয় শিশুদের প্রতিই বেশি পক্ষপাত দেখানো হয়।

প্রত্যাখ্যাত শিশুদের আত্মমর্যাদাবোধ কম হয়, এবং তারা অবসাদের মতো সমস্যাগুলিকে নিজেদের মধ্যে অন্তঃস্থ করে তোলে। কিছু প্রত্যাখ্যাত শিশুর ক্ষেত্রে এর বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়, তাদের মধ্যে অবসাদের বদলে আক্রমণাত্মক আচরণ দেখা যায়। দুক্ষেত্রের গবেষণাতেই আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু এদের মধ্যে পারস্পরিক প্রভাবের প্রমাণও আছে। অর্থাৎ যেসকল শিশুদের সমস্যা রয়েছে তাদের প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং এই প্রত্যাখ্যানের ফলে তাদের মধ্যেকার সমস্যাগুলি আরো বেড়ে ওঠে। ক্রমাগত সঙ্গী প্রত্যাখ্যান শিশুর বিকাশের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে যেটি সময়ের সাথে সাথে আরো খারাপ দিকে যায়।

প্রত্যাখ্যাত শিশুরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উৎপীড়নের শিকার হয় এবং সাধারণদের তুলনায় কম তাদের বন্ধুসংখ্যাও কম হয়, কিন্তু এইসকল শর্তগুলি সবসময় উপস্থিত নাও থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কিছু জনপ্রিয় শিশুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু থাকে না, অথচ কিছু প্রত্যাখ্যাত শিশুর তা থাকে। অন্তত একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু থাকাকে প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে কম ক্ষতিকর মনে করা হয়।

১৯৯৫ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত স্কুলে গুলি চালানোর ঘটনার একটি সমীক্ষা বলছে, দুটি ক্ষেত্র ছাড়া বাকী সব ক’টি ক্ষেত্রেই (৮৭%) সঙ্গী বিচ্ছেদ একটি সাধারণ সমস্যা ছিল। নথিভুক্ত প্রত্যাখ্যানের অভিজ্ঞতায় তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘস্থায়ী উভয় প্রত্যাখ্যানকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং দেখা গেছে যে উভয় ক্ষেত্রেই প্রত্যাখ্যান থেকে জন্ম নেয়, সমাজচ্যুত হওয়ার অভিজ্ঞতা, উৎপীড়নের শিকার হওয়া এবং প্রেমঘটিত বিচ্ছেদ। লেখকগণ মনে করেন যে যদিও প্রত্যাখ্যানের ফলস্বরূপ স্কুলে গুলি চালানোর মতো ঘটনা ঘটে, তবে এক্ষেত্রে অন্যান্য নির্ধারকও কাজ করে যেমন অবসাদ, আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখবার অক্ষমতা এবং অন্যান্য মনোবিকার।

সামাজিক প্রত্যাখ্যানের শিকার যেসকল শিশু, তাদের সাহায্যের জন্য কিছু কিছু কর্মসূচী নেওয়া হয়। ৭৯টি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার একটা বৃহৎ পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছে যে সামাজিক দক্ষতার প্রশিক্ষণ খুবই কার্যকরী (r = .৪০ কার্যকরী আকার), এর সাফল্যের হার ৭০%, যেখানে নিয়ন্ত্রিত দলের ক্ষেত্রে সাফল্যের হার ৩০%। সময়ের সাথে সাথে অবশ্য কার্যকরী দিকটার অবনমন ঘটে; পরবর্তী পরীক্ষাগুলির ক্ষেত্রে দেখা যায় কার্যকরী আকারের পরিমাণ কিছুটা হলেও কমেছে (r = .৩৫)।

পরীক্ষাগারে[সম্পাদনা]

পরীক্ষাগারে করা গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে যে বাইরের লোকেদের থেকে পাওয়া ক্ষণস্থায়ী প্রত্যাখ্যানও একজন ব্যক্তির ওপর জোরালো প্রভাব ফেলতে পারে (যদি তাৎক্ষণিক হয়)। কিছু কিছু সমাজ-মনোস্তাত্ত্বিক পরীক্ষায় সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যাত কিছু মানুষকে যথেচ্ছভাবে বাছাই করা হয়েছে এবং দেখা গেছে যে তারা বেশি আক্রমণাত্মক, অন্যকে ধোঁকা দিতে ইচ্ছুক, অন্যকে সাহায্য করার ব্যাপারে তাদের অনীহা এবং তারা দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের থেকে স্বল্প মেয়াদী লক্ষ্য পূরণের জন্যেই কাজ করে। প্রত্যাখ্যান থেকে খুব সহজেই আত্ম-পরাজয়ী এবং সমাজবিরোধী মনোভাবের জন্ম হয়।

গবেষকরা পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন যে সামাজিক প্রত্যাখ্যান মস্তিষ্কে কিভাবে প্রভাব ফেলে। একটি পরীক্ষা থেকে জানা যায় যে সামাজিক প্রত্যাখ্যানের ফলশ্রুতিস্বরূপ শারীরিক যন্ত্রণা এবং “সামাজিক যন্ত্রণা”র শিকার হলে মানব মস্তিষ্কের পৃষ্ঠদেশীয় সম্মুখবর্তী সিঙ্গুলেট কর্টেক্স সক্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে, fMRI নিউরোইমেজিং পরীক্ষার মাধ্যমে জানা গেছে যে সামাজিক প্রত্যাখ্যান সংক্রান্ত ছবিগুলো দেখানো হলে মানবমস্তিষ্কের তিনটি অঞ্চল সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই অঞ্চলগুলি হল পরবর্তী বা পোস্টেরিয়র সিঙ্গুলেট, প্যারাহিপ্পোক্যাম্পাল গাইরাস এবং পৃষ্ঠদেশীয় সম্মুখবর্তী সিঙ্গুলেট কর্টেক্স। এছাড়া, যেসকল ব্যক্তি প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে বেশি সংবেদনশীল (নিচে দেখুন), তাদের বাম প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স এবং ডান পৃষ্ঠদেশীয় সুপিরিয়র ফ্রন্টাল গাইরাস কম সক্রিয় হয়ে যায় যা কিনা প্রত্যাখ্যানের আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ কম থাকাকেই সূচিত করে।

বার্কলের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাম্প্রতিক পরীক্ষা থেকে জানা যায় যে যাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ কম থাকে এবং মনঃসংযোগের প্রতি কম নিয়ন্ত্রণ থাকে, প্রত্যাখ্যান সংক্রান্ত ছবি দেখালে তাদের মধ্যে চোখ বুজে ফেলে চমকে ওঠার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এইসকল পরীক্ষা এটাই জানায় যে যেসকল ব্যক্তিরা নিজেদের সম্বন্ধে খারাপ ধারণা নিয়ে চলে তাদের প্রত্যাখ্যাত হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে; কিন্তু এইসকল ব্যক্তিরা নিজেদের আবেগীয় বহিঃপ্রকাশকে নিয়ন্ত্রিত এবং সংযত করতে পারে।

মায়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পরীক্ষা থেকে জানা যায় যে একজন ব্যক্তি যখন সাম্প্রতিককালে  সামাজিক প্রত্যাখ্যানের শিকার হয়, তখন তাদের আসল এবং নকল হাসির পার্থক্য চেনার ক্ষমতা সামাজিকভাবে গৃহীত এবং আবেগ-নিয়ন্ত্রিত অংশগ্রহণকারীদের চেয়ে বেশি হয়। যদিও সামাজিকভাবে গৃহীত এবং আবেগ-নিয়ন্ত্রিত অংশগ্রহণকারীরা অন্যান্য দিকগুলোতে বেশি পারদর্শী হয় (এদের মধ্যে এসকল ক্ষেত্রে পারস্পরিক কোন পার্থক্য থাকে না), প্রত্যাখ্যাত অংশগ্রহণকারীরা এই কাজটিতে অনেক বেশি ভাল ফল দেখায়; তাদের কাজ প্রায় ৮০% সঠিক হয়। এই পরীক্ষাটি মনে রাখবার মতো, কারণ সামাজিক প্রত্যাখ্যানের ফলস্বরূপ সামান্য কিছু ইতিবাচক এবং অভিযোজিত ফলাফলের মধ্যে এটিও একটি বলে গণ্য করা হয়।

বল লোফালুফি/সাইবারবল পরীক্ষা[সম্পাদনা]

একটি সাধারণ পরীক্ষামূলক পদ্ধতি হল “বল লোফালুফি”, যেটি পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের কিপ উইলিয়ামস্‌ এবং তার সহকর্মীরা উদ্ভাবন করেছিলেন। এই পদ্ধতিতে তিনজন ব্যক্তির একটি দল থাকে যারা একটি বল নিয়ে লোফালুফি খেলতে থাকে। প্রকৃত অংশগ্রহণকারীর অজ্ঞাতে, দলটির বাকী দুজন পরীক্ষকের নির্দেশমত এবং পূর্ব-নির্ধারিত একটি স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী কাজ করে। একটি বিশেষ পরীক্ষায়, অর্ধেকের বেশি ক্ষেত্রেই প্রকৃত অংশগ্রহণকারীকে কয়েকটি লোফালুফির পর সরিয়ে দেওয়া হয় এবং এমনভাবে তা করা হয় যেন সে আর বল না ধরতে পারে। কয়েক মিনিটের পরীক্ষাতেই মূল অংশগ্রহণকারীর মধ্যে রাগ, দুঃখ ইত্যাদি নেতিবাচক আবেগের জন্ম হয়। এই পরীক্ষার ফলাফল আত্মমর্যাদা এবং অন্যান্য ব্যক্তিত্বগত পার্থক্যের ওপর নির্ভর করে না।

এইসকল পরীক্ষার ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য দেখা যায়। একটি পরীক্ষায় দেখা গেছে যে মহিলাদের মধ্যে অ-মৌখিকভাবে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেশি এবং পুরুষরা নিজেদের দ্রুত বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং তারা মুখরক্ষার কিছু উপায় এমনভাবে বের করে যাতে মনে হয় তারা ব্যাপারগুলো নিয়ে আদৌ ভাবান্বিত নয়। গবেষকরা এ থেকে এটাই মনে করেন যে মহিলারা সকলের সাথে একাত্মতার ভাবটা ফিরিয়ে আনতে চায় এবং পুরুষেরা নিজেদের আত্মমর্যাদা ফিরে পেতে বেশি আগ্রহী থাকে।

“সাইবারবল” নামে উপরোক্ত পরীক্ষাটির একটি কম্পিউটারাইজড সংস্করণও উদ্ভাবন করা হয়েছে এবং এ থেকেও একই ফল পাওয়া যায়। সাইবারবলের ক্ষেত্রে একটি ভার্চুয়াল বল নিয়ে লোফালুফি খেলা হয় যেখানে অংশগ্রহণকারীকে এটা বোঝানো হয় যেন সে অন্য কম্পিউটারে থাকা দুজন আলাদা প্রতিযোগীর সাথে খেলছে যাদের প্রত্যেকেই বাকী দুজন প্রতিযোগীর যেকোন একজনকে বল ছুঁড়ে দিতে পারে। প্রথম কয়েক মিনিটের জন্য অংশগ্রহণকারীকে খেলাতে নেওয়া হয়, কিন্তু তারপরেই তাকে অন্য প্রতিযোগীরা বের করে দেয় যাতে পরবর্তী তিন মিনিটের মধ্যে সে আর বল না পায়। এই সহজ এবং অল্প সময়ের বহিষ্কারের পরে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে রিপোর্ট নিলে দেখা যায় যে তাদের মধ্যে ক্ষোভ এবং দুঃখের পরিমাণ বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং চারটি প্রয়োজনের স্তর নিম্নগামী হয়েছে। একই ফল তখনও দেখা যায় যখন অংশগ্রহণকারীরা দল-বহির্ভুত সদস্যদের দ্বারা বহিষ্কৃত হয়, যখন দল-বহির্ভুত সদস্যটি হয় খুবই নগণ্য একজন ব্যক্তি (যেমনটা করা হয় কু ক্লুক্স ক্ল্যানের ক্ষেত্রে), যখন তারা জানে যে তাকে একটি কম্পিউটারের দ্বারা বহিষ্কার করা হয়েছে, এবং এমনকি যখন এভাবে বহিষ্কৃত হলে তাদেরকে আর্থিক পুরস্কার দেওয়া হয় এবং দলে অন্তর্ভুক্ত করা হলে তাকে আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করতে হয়।

মানুষ কম্পিউটারের সাথে খেলছে, এটা জানলেও, নিজেকে প্রত্যাখ্যাত মনে করে। সাইবারবল ব্যবহার করে করা কয়েকটি পরীক্ষা থেকে সম্প্রতি জানা গেছে যে প্রত্যাখ্যান মানুষের ইচ্ছাশক্তি অথবা আত্ম-নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে দূর্বল করে তোলে। বিশেষ করে, যেসকল ব্যক্তিরা প্রত্যাখ্যাত হয় তাদের মধ্যে ছোট বিস্কুট খাওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায় এবং স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল জানলেও বিস্বাদু পানীয় খাওয়া তারা পছন্দ করে না। এইসকল পরীক্ষা থেকে এটাই জানা যায় যে যেসকল ব্যক্তিদের মধ্যে সামাজিক উদ্বেগ বেশি রয়েছে, প্রত্যাখ্যানের নেতিবাচক প্রভাব তাদের মধ্যে বেশিদিন ধরে ক্রিয়াশীল থাকে।

বহিষ্কারের মনস্তত্ত্ব[সম্পাদনা]

বহিষ্কারের মনস্তত্ত্ব নিয়ে বেশিরভাগ গবেষণার কাজই সমাজ মনোবিজ্ঞানী কিপ উইলিয়ামস্‌ করেছেন। তিনি এবং তার সহকর্মীরা বহিষ্কারের একটি মডেল উদ্ভাবন করেছেন যার দ্বারা বিভিন্ন প্রকার বহিষ্কারের জটিলতা এবং তার ফলাফলের পদ্ধতি সম্বন্ধে জানা যায়। এর থেকে তিনি এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে বহিষ্কার এতটাই ক্ষতিকারক হতে পারে যাতে আমরা একটা দক্ষ সতর্কতা ব্যবস্থা অবলম্বন করে তাকে শনাক্ত করতে পারি এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারি।

প্রাণীরাজ্যে এবং আদিম মানবগোষ্ঠীর মধ্যে বহিষ্কারের ফলে সুরক্ষার অভাব এবং গোষ্ঠী থেকে প্রাপ্ত খাদ্যসম্পদের অভাবে মৃত্যুও ঘটতে পারে। সমগ্র সমাজ থেকে পৃথকভাবে বসবাস করারও অর্থ সঙ্গী না থাকা; তাই সামাজিক বহিষ্কারকে শনাক্ত করা হল নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা এবং বংশপরম্পরা বজায় রাখাকে সুনিশ্চিত করবার একটি অভিযোজিত প্রতিক্রিয়া।

মনে করা হয় যে সামাজিক বহিষ্কার চারটি প্রাথমিক মানব প্রয়োজনীয়তার পক্ষে অত্যন্ত বিপদ্‌জনক; সেগুলি হল, অধিকারের প্রয়োজনীয়তা, বিভিন্নরকম সামাজিক পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা, আত্মমর্যাদার স্তরকে উন্নত করে বজায় রাখবার প্রয়োজনীয়তা এবং জীবনকে অর্থবহ করে বেঁচে থাকবার প্রয়োজনীয়তা। এইসকল প্রয়োজনীয়তাগুলি বিপন্ন হয়ে পড়লে মানসিক বিপদ এবং বেদনার সম্মুখীন হতে হয়। তাই, অন্যদের তাকে বহিষ্কার করবার সম্ভাবনা কমাতে তাকে তার ব্যবহারের মাধ্যমে এবং সমাজে আরো বেশি করে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সামাজিক বহিষ্কারের এই বেদনা দূর করবার জন্য অনুপ্রাণিত করা হয়।

জনপ্রিয়তার পুনরুত্থান[সম্পাদনা]

সামাজিকভাবে বহিষ্কৃত হওয়ার থেকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার অবস্থান্তরটি কিভাবে এর ক্ষতিকারক প্রভাবগুলিকে বিপরীতমুখী করে তুলতে পারে এবং সামগ্রিকভাবে সামাজিক বহিষ্কার থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তার ভূমিকা কি হতে পারে তা নিয়ে সম্প্রতি গবেষণা হচ্ছে। জনপ্রিয়তা লাভ করবার জন্যে কোন কোন দক্ষতা অথবা সামাজিক গুণাবলী তা নিয়ে নানারকম তত্ত্ব রয়েছে; এটা মনে করা হয় যে যেসকল ব্যক্তি একসময় জনপ্রিয় ছিল এবং পরবর্তীকালে যারা সামাজিকভাবে বহিষ্কারের শিকার হয় তারা তাদের ঐ সকল দক্ষতার (যেসকল দক্ষতা একসময় তাদের জনপ্রিয় করে তুলেছিল) দ্বারা তাদের জনপ্রিয়তার পুনরুত্থান করতে পারে।

প্রেম-ভালোবাসা[সম্পাদনা]

শৈশবে প্রত্যাখ্যান সংক্রান্ত পাঠ যা দ্বারা মূলত সঙ্গী গোষ্ঠীর দ্বারা প্রত্যাখ্যানের পাঠকেই বোঝানো হয় তার পাশাপাশি কিছু গবেষক প্রেম সংক্রান্ত সম্পর্কের প্রেক্ষিতে একক ব্যক্তির দ্বারা প্রত্যাখ্যানের ওপর গবেষণা করেছেন। কিশোর এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে, যখন একজন ব্যক্তি অন্যের পরিণয় নিবেদন প্রত্যাখ্যান করে, অবজ্ঞা/অবহেলা করে, অথবা যে তার প্রতি আকৃষ্ট তার দ্বারা পরিত্যাজ্য হয়, অথবা একপার্শ্বীয়ভাবে চলতে সম্পর্কে ছেদ পড়ে, তখনই প্রেম-প্রত্যাখ্যান ঘটে। যৌবনকালে প্রতিদানহীন ভালবাসার শিকার হওয়া খুব সাধারণ অভিজ্ঞতা, কিন্তু মানুষ বয়স্ক হলে পারস্পরিক ভালবাসা তাদের মধ্যে আরো বেশি পরিমাণে দেখা যায়।

প্রেমের প্রত্যাখ্যান একটি বেদনাদায়ক, আবেগীয় অভিজ্ঞতা যার ফলে মস্তিষ্কের কডেট নিউক্লিয়াসে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় এবং এর সাথে ডোপামাইন এবং কর্টিসল হর্মোনের ক্রিয়াও যুক্ত হয়। বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ফলে বিভিন্নরকম নেতিবাচক আবেগের জন্ম হয়, যেমন ফ্রাসট্রেশান, প্রচণ্ড রাগ, হিংসা, বিদ্বেষ এবং এর থেকে হাল ছাড়া মনোভাব, হতাশা এবং সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি অবসাদের সৃষ্টি হয়।

প্রত্যাখানের সংবেদনশীলতা[সম্পাদনা]

প্রত্যাখ্যানের সংবেদনশীলতার ঘটনা নিয়ে প্রথম যে তাত্ত্বিক আলোচনা করেন তিনি হলেন কারেন হর্নি। তার মতে, এটি স্নায়বিক ব্যক্তিত্বের একটি উপাদান, এবং তিনি বলেন যে একজন ব্যক্তির মধ্যে সামান্য ধমকেই গভীর উদ্বেগ এবং অপমানিত বোধ করবার একটি প্রবণতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সাধারণভাবে কাউকে অপেক্ষা করতে বলাকেই একটি প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখা যেতে পারে এবং সেক্ষেত্রে তা প্রচণ্ড ক্রোধ এবং শত্রুতার জন্ম দিতে পারে।

অ্যালবার্ট মেহ্‌রাবিয়ান প্রত্যাখ্যানের সংবেদনশীলতাকে পরিমাপ করবার জন্য একটি প্রাথমিক প্রশ্নাবলী তৈরি করেছেন। মেহ্‌রাবিয়ান বলেন যে সংবেদনশীল ব্যক্তিরা তাদের মতামত প্রদান করার ব্যাপারে অনিচ্ছুক থাকেন, বিতর্ক অথবা বিতর্কিত আলোচনা এড়িয়ে যান, তারা কারুর ওপরে কিছু চাপিয়ে দেওয়া অথবা কাউকে কিছু অনুরোধ করবার ব্যাপারে অনিচ্ছুক থাকেন, অন্যদের থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেলে খুব সহজেই আহত হন এবং প্রত্যাখ্যান এড়াবার জন্য তারা পরিচিত লোকেদের মধ্যে এবং পরিস্থিতির মধ্যে থাকাই পছন্দ করেন।

আরো সাম্প্রতিক (১৯৯৬) সংজ্ঞা অনুসারে প্রত্যাখ্যানের সংবেদনশীলতাকে বলা হয় এমন একটি অবস্থা যার মধ্যে রয়েছে সামাজিক প্রত্যাখ্যানের প্রতি “উদ্বেগ নিয়ে আশঙ্কা করা, উপলব্ধির তৎপরতা এবং অতি প্রতিক্রিয়াশীলতার” প্রবণতা। উপলব্ধির তৎপরতা এবং প্রত্যাখ্যানের প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রটি ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্ভর করে। প্রত্যাখ্যানের অনুভূতির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পার্থক্যগুলির কারণ কি, সে সম্বন্ধে ভালভাবে জানা যায়নি। প্রত্যাখ্যানের অনুভূতি এবং বাতিকগ্রস্ত হওয়ার মধ্যে সম্পর্ক থাকায় মনে করা হয় যে এর একটি জিনগত প্রবণতা আছে। অন্যান্যরা বলেন যে প্রথম দিকের অনুরাগসঞ্জাত সম্পর্ক এবং বাবা-মায়ের দ্বারা প্রত্যাখ্যান থেকেই প্রত্যাখ্যানের অনুভূতি গড়ে ওঠে; সঙ্গী প্রত্যাখ্যানও এখানে একটি ভূমিকা নেয় বলে মনে করা হয়। উৎপীড়ন, যেটা কিনা সঙ্গী প্রত্যাখ্যানের একটা চূড়ান্ত রূপ, সেটা পরবর্তী কালে প্রত্যাখ্যানের অনুভূতির জন্ম দিতে পারে বলে মনে করা হয়। যদিও এইসকল তত্ত্বগুলির সমর্থনে কোন চূড়ান্ত প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্য[সম্পাদনা]

সামাজিক প্রত্যাখ্যান মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বেশ বড় রকমের প্রভাব ফেলে। বাওমেস্টার এবং লিয়ারি প্রকৃতপক্ষে বলেছেন, অধিকারবোধের অতৃপ্ত চাহিদার ফলে স্বভাবের ক্ষেত্রে এবং মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অবশ্যসম্ভাবীরূপে সমস্যার সৃষ্টি করে। স্বভাব পরিবর্তন সংক্রান্ত এই ধারণার সমর্থন জন বোওলবি তার গবেষণায় দেখিয়েছেন। বিবিধ পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেছে যে সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যাতদের মধ্যে উদ্বেগের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি হয়। পাশাপাশি, একজন ব্যক্তি তার অবসাদের পরিমাণ যতটা অনুভব করে এবং তাদের সামাজিক সম্পর্কগুলি সম্বন্ধে সে যতটা সচেতন থাকে তার সাথে তার প্রত্যাখ্যানের উপলব্ধির পরিমাণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। প্রত্যাখ্যান আবেগীয় স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক সুস্থতার ক্ষতি করে। সামগ্রিকভাবে, বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে যে যেসকল ব্যক্তিরা সামাজিকভাবে গৃহীত অথবা যারা নিরপেক্ষ বা নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রয়েছে তাদের তুলনায় সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে নেতিবাচক আবেগ বেশি থাকে এবং ইতিবাচক আবেগের পরিমাণ কম থাকে।

প্রত্যাখ্যানের আবেগীয় সাড়ার পাশাপাশি, শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাবও কিছু কম নয়। খারাপ সম্পর্কের মধ্যে থাকা অথবা বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঘটনা আয়ু কমিয়ে দেয়। এছাড়াও, বিবাহের এক দশক পরে, অবিবাহিত অথবা সদ্য-বিবাহিতদের তুলনায় বিবাহ-বিচ্ছেদ হওয়া মহিলাদের মধে শারীরিক রোগের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। পারিবারিক বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যাখ্যাত হলে তার মধ্যে মাতৃ-পরিচয়ের মূল জায়গাটিই বিশ্বাসভঙ্গের শিকার হয়। পুনর্মিলনের সম্ভাবনাও (যদিও খুব কম) এর অবসান ঘটাতে পারে না। বিচ্ছেদের ফলে সৃষ্ট আবেগীয় অবস্থা এবং সামাজিক কলঙ্ক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাবা-মায়ের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে।

একজন ব্যক্তি সামাজিক প্রত্যাখ্যানের শিকার হলে তার শরীরের অনাক্রম্যতা ব্যবস্থাও (ইম্যুন সিস্টেম) ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর কারণে এইচ.আই.ভির মত রোগীদের ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে। কোলে, কেমেনি এবং টেলর একটি গবেষণা করেছেন যেখানে যেসকল পুরুষ সমকামির প্রত্যাখ্যানের অনুভূতি নেই তাদের সাথে যাদের তা আছে তাদের সঙ্গে এইচ.আই.ভি রোগের ক্রমবৃদ্ধির পার্থক্য সম্বন্ধে পরীক্ষা করা হয়েছে। ন’বছর ধরে চলা এই পরীক্ষায় নিম্ন টি-হেল্পার কোষের দ্রুততর হার দেখে এইডসের রোগের প্রাক্‌-শনাক্তকরণ সম্ভব হয়। তারা গবেষণা করে এটা জেনেছেন যে যেসকল রোগীরা প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারে অনুভূতিহীন তাদের তুলনায় যারা এ ব্যাপারে অনুভূতিশীল তারা এই রোগে গড়ে ২ বছর কম বাঁচে।

স্বাস্থ্যের অন্যান্য দিকও প্রত্যাখ্যানের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রত্যাখ্যানের পরিবেশ কল্পনা করলে সিস্টোলিক এবং ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ বেড়ে যায়। যেসকল ব্যক্তিরা সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যাত হয় তাদের মধ্যে টিবি হওয়ার প্রবণতা এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। অস্ত্রোপ্রচারের পর যন্ত্রণা এবং অন্যান্য শারীরিক যন্ত্রণাও প্রত্যাখ্যান এবং বিচ্ছিন্নতার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সামাজিক প্রত্যাখ্যান বুদ্ধিবৃত্তির হ্রাস ঘটায়। ম্যাকডোনাল্ড এবং লিয়ারি বলেছেন যে সামাজিক প্রত্যাখ্যান এবং সামাজিক বহিষ্কার শারীরিক বেদনার জন্ম দেয় কারণ এই বেদনা আমাদের টিকে থাকবার ক্ষেত্রে সতর্কীকরণের ভূমিকা নেয়। সামাজিক প্রাণী হিসেবে আমাদের বেড়ে ওঠবার কারণে, সামাজিক আদানপ্রদান এবং সম্পর্কগুলি আমাদের টিকে থাকবার জন্য জরুরী, এবং শারীরিক বেদনার ব্যবস্থাটা আমাদের শরীরেই বর্তমান রয়েছে।

সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে এবং শিল্পে[সম্পাদনা]

প্রত্যাখ্যানের শৈল্পিক রূপায়ণ বিভিন্ন রকম শিল্পের ক্ষেত্রে দেখা যায়। সিনেমার যেসকল জ্যঁরে  প্রত্যাখ্যানের ঘটনা প্রায়শই দেখানো হয়, তার একটি হল রোম্যান্টিক কমেডি। হি ইজ জাস্ট নট দ্যাট ইন্টু ইউ নামক সিনেমাটিতে প্রধান চরিত্রটি মানুষের ব্যবহার চেনা এবং তাকে ভুল ব্যাখ্যা করবার চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিল। এখানে তার প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভীতি ফুটে ওঠে, যখন এর একটি চরিত্র মেরি বলে ওঠে, “এবং এখন আপনাকে সাতটি আলাদা আলাদা প্রযুক্তির দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হতে এইসকল বিভিন্ন পোর্টাল পরীক্ষা করতে হবে। কি বিরক্তিকর!”

নাটক এবং সঙ্গীতের আসরেও সামাজিক প্রত্যাখ্যানের দিকটি তুলে ধরা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৬০এর দশকের প্রেক্ষাপটে নির্মিত হেয়ারস্প্রে নামক সিনেমাটিতে ট্রেসি টার্নব্লাড নামক ১৫ বছর বয়সের একজন অতিরিক্ত ওজনের নৃত্যশিল্পীর গল্প বলা হয়েছে। ট্রেসি এবং তার মা’কে ওজন এবং শারীরিক আকৃতি সংক্রান্ত সামাজিক চাহিদার সঙ্গে যুঝতে হয়েছে।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]


  1. McCausland, Shane (২০০৩), First Masterpiece of Chinese Painting: The Admonitions Scroll, British Museum Press, পৃষ্ঠা 75, আইএসবিএন 978-0-7141-2417-9 
  2. "Definition of ostracize | Dictionary.com"www.dictionary.com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০৮-০১ 
  3. The social outcast : ostracism, social exclusion, rejection, and bullying। Williams, Kipling D., Forgas, Joseph P., Hippel, William von.। New York: Psychology Press। ২০০৫। আইএসবিএন 9780203942888ওসিএলসি 162520851 
  4. Richman, Laura Smart; Leary, Mark R. (April 2009). "Reactions to Discrimination, Stigmatization, Ostracism, and Other Forms of Interpersonal Rejection". Psychological Review. 116 (2): 365–383. doi:10.1037/a0015250. hdl:10161/11810. ISSN 0033-295X. PMC 2763620. PMID 19348546. 
  5. <410::aid-pits2310070426>3.0.co;2-3 "Psychology and teaching. Maslow, Abraham H. Motivation and personality, 2nd Ed. New York: Harper & Row, 1970, 369 p., $5.95 (paper)"Psychology in the Schools7 (4): 410–410। 1970-10। আইএসএসএন 0033-3085ডিওআই:10.1002/1520-6807(197010)7:4<410::aid-pits2310070426>3.0.co;2-3  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)
  6. Baumeister RF, Leary MR (1995). "The need to belong: desire for interpersonal attachments as a fundamental human motivation". Psychol Bull. 117 (3): 497–529. doi:10.1037/0033-2909.117.3.497. PMID 7777651. 
  7. Baumeister, Roy F.; Tice, Dianne M. (1990-6)। "Point-Counterpoints: Anxiety and Social Exclusion"Journal of Social and Clinical Psychology (ইংরেজি ভাষায়)। 9 (2): 165–195। আইএসএসএন 0736-7236ডিওআই:10.1521/jscp.1990.9.2.165  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)
  8. Leary, Mark R.; Downs, Deborah L. (১৯৯৫)। Efficacy, Agency, and Self-Esteem। Boston, MA: Springer US। পৃষ্ঠা 123–144। আইএসবিএন 9781489912824