বিষয়বস্তুতে চলুন

সাঈদ ইবনে উসমান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সাঈদ ইবনে উসমান
মৃত্যুআনু.৬৮০
দাম্পত্য সঙ্গী
  • রামলা বিনতে আবি সুফিয়ান (উম্মে হাবিবা নয়)
  • একজন অজ্ঞাত স্ত্রী
সন্তান
  • মুহাম্মাদ
  • আয়েশা
  • উন্মে সাঈদ
  • আবান
পিতা-মাতা
আত্মীয়উমাইয়া রাজপরিবার (বংশ)

সাঈদ ইবনে উসমান ইবনে আফফান ( আরবি: سَعِيد بْنُ عُثْمَانُ بْنُ عَفَّان الأُمَوِيّ; মৃ. আনু.৬৮০ ) মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ানের শাসনামলে ৬৭৬ থেকে ৬৭৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত খুরাসানের একজন উমাইয়া সেনাপতি ও সামরিক গভর্নর। তিনি খলিফা উসমান ইবন আফফানের ( শা. ৬৪৪–৬৫৬) পুত্র। বৃহত্তর খোরাসানে তাঁর স্বল্পমেয়াদী শাসনামলে তিনি মাওয়ারান্নাহর গভীরে একটি অভিযান শুরু করেন এবং এক বা দুইবার সোগদীয় সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন। জানা যায় যে, তিনি বুখারা দখল করেন এবং সমরকন্দ অবরোধ করেন। সমরকন্দের শাসকদের কাছ থেকে তিনি করদ স্বীকৃতি আদায় করতে সক্ষম হন এবং শহরটি তাঁর কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে নিয়মিত খাজনা প্রদান করতে সম্মত হয়। এরপর তিনি অগ্রসর হয়ে তিরমিজ অধিকার করেন। মুয়াবিয়া তাকে সম্ভবত তাকে এই উদ্বেগের কারণে বরখাস্ত করেন যে, তার জনপ্রিয়তা ও যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্য মুয়াবিয়া কর্তৃক মনোনীত উত্তরসূরি ইয়াজিদকে ( শা. ৬৮০–৬৮৩) প্রভাবিত করতে পারে। ৬৮০ সালে মদিনায় তাকে তাঁর কয়েকজন সোগদীয় দাস হত্যা করে।

জীবনী

[সম্পাদনা]

তিনি ছিলেন খলিফা উসমান ইবন আফফানের (শা. ৬৪৪–৬৫৬) পুত্র এবং উসমানের স্ত্রী ফাতিমা বিনতে ওয়ালিদের ছেলে, যিনি কুরাইশ গোত্রের প্রভাবশালী মাখজুম গোত্রের সন্তান ছিলেন।[] খলিফা মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ানের (শা. ৬৬১–৬৮০) উসমানের হত্যার বিচারের দাবিতে আলি ইবনে আবি তালিবের আনুগত্য স্বীকার করেননি। অবশেষে তাঁদের মধ্যে যুদ্ধ হয় এবং আলির হত্যাকাণ্ডের পর মুয়াবিয়া খলিফা হন।[] পরবর্তীতে মুয়াবিয়া নিজের পুত্র ইয়াজিদকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। সাঈদ যখন তিনি খবর পান যে, মুয়াবিয়া তাঁর পুত্র ইয়াযিদকে খিলাফতের উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেছেন, তখন তিনি মদিনা ত্যাগ করে দামেস্কে মুয়াবিয়ার কাছে যান এবং এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অভিমত জানান।[] মধ্যযুগীয় মুসলিম ইতিহাসবিদ মাদা'নি (মৃ. ৮৪৩) ও আল বালাজুরির ( মৃ. ৮৯২) বর্ণনা অনুসারে, সাঈদ দামেস্কে গিয়ে মুয়াবিয়ার কাছে নিজেকে উচ্চপদে নিযুক্ত করার আবেদন করেন। মুয়াবিয়া তাকে জিজ্ঞাসা করেন যে, তিনি সত্যিই কি খিলাফতের পদ চাইছেন, যেমন গুজব শোনা যাচ্ছে।[] সাঈদ তার পক্ষ থেকে যুক্তি দেখান যে, যেহেতু সে উসমানের ছেলে এবং তার মা উচ্চবংশীয় কুরাইশী মহিলা ( বিপরীতে ইয়াজিদের মা মায়সুন বিনতে বাহযাল ছিলেন কালব গোত্রীয়।), তাই খিলাফতের ক্ষেত্রে তিনি ইয়াজিদের তুলনায় অধিক যোগ্য ও বৈধ প্রার্থী।[][] মদিনার কিছু মানুষ, বিশেষ করে আনসারদের একটি অংশ তাকে এই পদ দাবিতে সমর্থন বা উৎসাহ দেয়।[] এছাড়াও সিরিয়ার উমাইয়া নেতা মারওয়ান ইবনুল হাকাম সম্ভবত মদিনায় মুয়াবিয়ার শাসনকে পছন্দ করতেন না এবং তিনি উমাইয়াদের আবুল আস শাখায় খিলাফতের পদ ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন (মারওয়ান ও সাঈদ এই একই শাখার ছিলেন এবং মুয়াবিয়া সুফিয়ানি শাখার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন)। তাই ধারণা করা হয় যে, তিনিও গোপনে সাঈদকে উৎসাহ দেন।[] মুয়াবিয়া সাঈদের এই যুক্তি গ্রহণ করেন; যদিও ইবনে কাসির (মৃ. ১৩৭৩) উল্লেখ করেন যে, তিনি সাঈদের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন যে, সে ইয়াজিদের তুলনায় বেশি যোগ্য।[]

খোরাসানের গভর্নর

[সম্পাদনা]

বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখিত হয়েছে যে, মুয়াবিয়া সাঈদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তাকে খোরাসানে নিযুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন, যা খিলাফতের একেবারে প্রাচ্যের প্রদেশ ছিল। আরো বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি সাঈদের অনুরোধেই খোরাসানের দায়িত্বে তাকে নিয়োগ করেন।[][] যেভাবেই হোক, খলিফা সাঈদকে উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের কাছে পাঠান। ইবনে জিয়াদ তখন বসরা এবং প্রাচ্য খিলাফতের গভর্নর ছিলেন এবং তিনি সাঈদকে ৬৭৫/৭৬ সালে বৃহত্তর খোরাসানের বিজয়াভিযানে কমান্ডার হিসেবে নিয়োগের নির্দেশনা প্রদান করেন।[] খলিফার নির্দেশ অনুসারে ইবনে জিয়াদ সাঈদকে চার মিলিয়ন দিরহাম প্রদান করেন, যা তার অধীনে থাকা ৪,০০০ সৈন্যের মধ্যে বিতরণ করা হয়। যদিও সাঈদের বাহিনীতে মুহাল্লাব ইবনে আবি সুফরা মতো কয়েকজন দক্ষ কমান্ডার ছিল, তবুও তার সৈন্যবাহিনীর অনেকেই বাসরার বন্দী ও অন্যান্য অশান্ত উপজাতীয় সদস্য ছিল, যারা মাঝে মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত।[] খোরাসানে যাত্রাকালে সাঈদ বনু তামিম গোত্রের কিছু উগ্র যোদ্ধাকেও নিজের বাহিনীতে নিয়োগ করেন বলে জানা যায়।[]

তবে এরপর মুয়াবিয়া সাঈদের দায়িত্ব সীমিত করে কেবল সামরিক বিষয়াদিতে সীমাবদ্ধ করে দেন এবং তাঁর পরিবর্তে ইশাক ইবনে তালহাকে আর্থিক দায়িত্বভার অর্পন করেন। কিন্তু ইশাক খোরাসান যাওয়ার পথেই মারা যান এবং তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে দায়িত্ব পান আসলাম ইবনে জুরা, যিনি খোরাসানে কায়স গোত্রের নেতা ও প্রদেশটির সাবেক উপ-গভর্নর ছিল।[১০] ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ শাবানের বর্ণনা মতে, মুয়াবিয়া কর্তৃক সাঈদ ও ইশাককে নিয়োগের মূল উদ্দেশ্য ছিল খোরাসান থেকে প্রাপ্ত অতিরিক্ত রাজস্ব, পাশাপাশি ঐ অঞ্চলের বিজয়াভিযানে প্রাপ্ত গনিমত, যার এক পঞ্চমাংশ বায়তুল মালে জমা করা হতো। তবে খোরাসানের বাহিনীতে যে সব আরব কোটিপতি সৈনিক ছিল, তারা সাধারণভাবে এর বিরোধিতা করেন। কারণ তারা প্রদেশের প্রধান রাজস্ব নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিল। ইশাকের মৃত্যুর পর এবং আসলাম তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর মুয়াবিয়া কায়স গোত্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন। এর উদ্দেশ্য ছিল, সিরিয়ার প্রধান সামরিক কমান্ডাররা যেন ইয়াযিদের মনোনয়নের বিরোধীতা না করে। এই পরিস্থিতিতে সাঈদকে আসলামের সঙ্গে সরকারী অংশীদার হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হতে হয়েছিল।[১১]

যুদ্ধের জন্য বাহিনী প্রস্তুত করার পরে সাঈদ আমু দরিয়ার পূর্ব দিকে অভিযান শুরু করেন, যা ৬৭৪ সালে ইবন জিয়াদ কর্তৃক পরিচালিত আগের অভিযানের চেয়ে আরও গভীরে ছিল। তিনি একটি সোগদী বাহিনীকে পরাজিত করে তাদের একটি শহর দখল করেন এবং পরে তিরমিজ দুর্গে অবস্থান গ্রহণ করেন।[১২] আবু উবায়দা (মৃ. ৮২৫), আল-বালাজুরি, তাবারি (মৃ. ৯২৩), নরশাখিসহ (মৃ. ৯৫৯) প্রমুখ ঐতিহ্যবাহী মুসলিম ইতিহাসবিদেরা এই অভিযানের বিবরণে ভিন্নতা অবলম্বন করেছেন।[১৩] আল-বালাজুরি ও নরশাখি উল্লেখ করেন যে, সাঈদের আমু দরিয়া পার হওয়ার ঘটনা বুখারার রাণী খাতুনকে খিলাফতের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করতে প্ররোচিত করেছিল।[১৩] কিন্তু খাতুন পরে নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন, যখন সেখানে ১,২০,০০০ সমর্থক সেনা পৌঁছায়। সেই বাহিনীতে তুর্কি, সগদীয় ও কিশ ও নাসাফের সৈন্যরা ছিল। সাঈদের বাহিনী এই শক্তিশালী সেনাদলকে পরাস্ত করে বিজয় অর্জন করে বুখারায় প্রবেশ করে। পরে অনেক সগদীয় সৈন্য তাঁর দলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সৈন্যদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায় এবং তারা সমরকন্দকে তিন দিন ধরে অবরোধ করে রাখে। পরে সমরকন্দ বিজিত হয় এবং তা খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত হয়।[১৩] ইতিহাসবিদ আবু উবাইদা উল্লেখ করেন যে, সাঈদ নিজেই সমরকন্দ অবরোধ করেন। এরপর তিনি তিরমিজ দখল করেন এবং এখানেই খাতুনের প্রদত্ত কর ও খিলাফতের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করেন।[১৩]

বরখাস্ত, মৃত্যু ও ঐতিহ্য

[সম্পাদনা]

মুয়াবিয়া ৬৭৭ খ্রিষ্টাব্দে সাঈদকে পদ থেকে বরখাস্ত করেন। [][] এটি সম্ভবত সাঈদের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্যের কারণে হয়েছিল, যা তাঁকে ইয়াজিদের প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছিল।[] ইবনে আসাকির (মৃ ১১৭৬ খ্রি.) উল্লেখ করেন যে, মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে সাঈদ মদিনায় ফিরে আসেন।[১৪]

মদিনায় ফিরে আসার সময় তিনি পঞ্চাশজন সাগদীয় দাস নিয়ে আসেন। তিনি মদিনায় তাদের জমিতে কাজ করানোর জন্য নিযুক্ত করেন।[১৫] পরবর্তীতে এই সাগদীয় দাসদেরই কয়েকজন সাঈদকে হত্যা করে। তারা সম্ভবত কুপার দিয়ে সাঈদের বাগানেই তাঁকে হত্যা করে। পরে তারা নিজেরাও আত্মহত্যা করে। মারওয়ান সাঈদকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেন, কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। কারণ দাসরা বাগানের দরজা বন্ধ করে রেখেছিল।[]

সাঈদের দুইজন স্ত্রী ছিলেন; তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন রমলা (উম্মে হাবিবা নয়)। তিনি আবু সুফিয়ান ইবনে হার্বের কন্যা ছিলেন। তাঁর অন্য স্ত্রীর নাম কোনো সূত্রে উল্লেখ নেই। রমলার গর্ভে মুহাম্মাদ নামে সাঈদের এক ছেলে হয় এবং তার সম্পর্কেও তেমন কিছু জানা যায় না। এছাড়া আয়েশা নামে তাঁর একজন মেয়েও ছিলেন, যাকে মুয়াবিয়ার পুত্র আবদুল্লাহ বিবাহ করেন।[১৫]

সাঈদের দ্বিতীয় স্ত্রী থেকে জন্মগ্রহণকারী মেয়ের নাম ছিল উম্মে সাঈদ। তিনি যথাক্রমে খলিফা হিশাম ইবনে আব্দুল মালিক (শা. ৬২৪–৭৪৩), আব্বাস ইবনুল ওয়ালিদ (প্রথম আল ওয়ালিদের পুত্র) ও আবদুল আজিজ ইবনে উমরের (খলিফা দ্বিতীয় উমরের পুত্র) সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিছু সূত্রে আবান নামে সাঈদের আরেকজন ছেলের বর্ণনা পাওয়া যায়। সাঈদের মাওলা ( আযাদকৃত মুসলিম দাস) ও উমাইয়া বিরোধী নেতা আবুল উমায়তির একজন উচ্চপদস্থ নেতা ছিলেন, যিনি ৯ম শতাব্দীর প্রথম দিকে আব্বাসিদের পক্ষে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন।[১৬]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Ahmed 2010, পৃ. 111–112।
  2. Wellhausen 1927, পৃ. 135।
  3. 1 2 3 4 5 Ahmed 2010, পৃ. 112।
  4. Madelung 1997, পৃ. 343, note 86।
  5. Madelung 1997, পৃ. 342–343।
  6. 1 2 3 4 Madelung 1997, পৃ. 343।
  7. Madelung 1997, পৃ. 341–342।
  8. Ahmed 2010, পৃ. 112, note 578।
  9. 1 2 3 Shaban 1979, পৃ. 38।
  10. Shaban 1979, পৃ. 37।
  11. Shaban 1979, পৃ. 37–38।
  12. Gibb 1923, পৃ. 19–20।
  13. 1 2 3 4 Gibb 1923, পৃ. 20।
  14. Ahmed 2010, পৃ. 113, note 583।
  15. 1 2 Ahmed 2010, পৃ. 113।
  16. Madelung 2000, পৃ. 333।

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]
  • Ahmed, Asad Q. (২০১০)। The Religious Elite of the Early Islamic Ḥijāz: Five Prosopographical Case Studies। Oxford: University of Oxford Linacre College Unit for Prosopographical Research। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৯০০৯৩৪-১৩-৮
  • Madelung, Wilferd (১৯৯৭)। The Succession to Muhammad: A Study of the Early Caliphate। Cambridge: Cambridge University Press। আইএসবিএন ০-৫২১-৫৬১৮১-৭
  • Madelung, Wilferd (২০০০)। "Abūʿl-ʿAmayṭar the Sufyani"Jerusalem Studies in Arabic and Islam২৪: ৩২৭–৩৪২।
  • Shaban, M. A. (১৯৭৯)। The 'Abbāsid Revolution। Cambridge: Cambridge University Press। আইএসবিএন ০-৫২১-২৯৫৩৪-৩
  • Wellhausen, Julius (১৯২৭)। The Arab Kingdom and its Fall। Margaret Graham Weir কর্তৃক অনূদিত। Calcutta: University of Calcutta। ওসিএলসি 752790641