সাইকেল চালনা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

সাইকেল চালানো হলো মূলত পরিবহণ, বিনোদন, ব্যায়াম বা খেলাধুলার জন্য সাইকেলের ব্যবহার, যাকে বাইকিং বা বাইসাইক্লিংও বলা হয় । যারা সাইক্লিং করে থাকেন তাদেরকে সাইক্লিস্ট, বাইকারস বা মাঝে মাঝে বাইসাইক্লিস্টসও বলা হয় । শুধু মাত্র দুই চাকার সাইকেল ছাড়াও একচাকার সাইকেল, তিন চাকার সাইকেল, চার চাকার সাইকেল এমনকি একই ধরণের মানুষ চালিত যেকোন যানবাহন চালানোও সাইক্লিং-এর অন্তর্ভূক্ত (এইচপিভি) ।

বাইসাইকেল ১৯ শতকে উদ্ভাবিত হয়েছিল এবং সারাবিশ্বে এখন প্রায় ১০০ কোটির মত বাইসাইকেল রয়েছে । বিশ্বের অনেক জায়গায় এটি এখন প্রধান পরিবহণের মাধ্যম ।

সংক্ষিপ্ত থেকে মাঝারি দূরত্বের ক্ষেত্রে সাইকেল চালানোকে খুবই ফলপ্রসূ এবং পরিবহণের কার্যকরী উপায় হিসেবে ধরা হয় । মোটর গাড়ির তুলনায় বাইসাইকেল অনেক বেশি সুবিধা দিয়ে থাকে, যেমন-  সাইক্লিং, সহজ পার্কিং, সহজেই নড়াচড়া করা ক্ষমতা বৃদ্ধি ইত্যাদির কারণে স্থায়ী শারীরিক ব্যায়াম করা যায় এবং এর দ্বারা রাস্তা, সাইকেলের পথ ও গ্রামীণ সড়কে সহজে প্রবেশ করা যায় । সীমিত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, স্বল্প বাতাস ও শব্দ দূষণ এবং খুবই অল্প পরিমাণে যানজট সৃষ্টির মত সুবিধাও সাইক্লিং দিয়ে থাকে । এটি ব্যবহারকারী তথা সমাজের আর্থিক খরচ বিশাল ভাবে কমিয়ে আনে (খুবই সামান্য রাস্তার ক্ষতি, অল্প পরিমাণ রাস্তার ব্যবহার) । বাসের সামনে বাই সাইকেল রাখার তাকের ব্যবস্থা করে পরিবহন এজেন্সিগুলো তাদের সেবা দেওয়ার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে ।

সাইক্লিং এর অসুবিধার মধ্যে রয়েছেঃ সোজাভাবে থাকার জন্য চালককে বাইসাইকেল এর ভারসাম্য বজায় রাখা, মোটর গাড়ির তুলনায় সংঘর্ষে কম সুরক্ষা, প্রায়ই ভ্রমণের দীর্ঘসূত্রিতা, আবহাওয়ার অবস্থার উপর নাজুকতা, যাত্রী পরিবহনে অসুবিধা এবং মূল কথা হচ্ছে মাঝারি থেকে লম্বা দূরত্বের সাইক্লিং করার জন্য মৌলিক পর্যায়ের শারীরিক যোগ্যতা দরকার ।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৯ শতকে উদ্ভাবিত হওয়ার পরে সাইক্লিং দ্রুতই একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে পরিণত হয়েছে । বর্তমানে বিশ্ব জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ মানুষ সাইকেল চালাতে পারে ।[10]

উপকরণ[সম্পাদনা]

অনেক দেশেই সড়ক পরিবহন এর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত বাহন হচ্ছে বাইসাইকেল । এটি তৈরি হয়েছে সহজ জ্যামিতিক পদ্ধতিতে, চালককে সড়কের আঘাত থেকে রক্ষা করতে এবং কম গতিতে চালানো সহজ করতে । ইউটিলিটি বাইসাইকেলে সচরাচর কিছু উপকরণ  যেমন মাডগার্ড (কাদা থেকে রক্ষাকারী উপকরণ) , প্যানিয়ার র‍্যাক এবং লাইট যোগ করা হয়  যা এর দৈনন্দিন কার্যকারিতা আরও বাড়ায় । যেহেতু এটি পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যম হিসেবে খুবই কার্যকরী, বিভিন্ন কোম্পানি সাপ্তাহিক বাজার থেকে শুরু করে শিশুদেরকেও সাইকেলে বহন করার জন্য পদ্ধতির উন্নয়ন করেছে । কিছু নির্দিষ্ট দেশ বাইসাইকেলের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে  এবং বাইসাইকেলকে তাদের প্রাথমিক পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে ধরে নিয়েই সংস্কৃতির উন্নয়ন ঘটেছে । ইউরোপ ডেনমার্ক এবং নেদারল্যান্ডে মাথাপিছুতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে সাইকেল রয়েছে এবং তারা প্রতিদিনের পরিবহনে প্রায়ই বাইসাইকেল ব্যবহার করে থাকে ।

রোড বাইকগুলো বেশ সোজা আকৃতির এবং ছোট হুইলবেজ থাকার কারণে আরো বেশি নড়নক্ষম হয়েছে যদিও ধীরে ধীরে চালানোটা কষ্টকর। বাইকের ডিজাইনে হ্যান্ডেলবার কিছুটা নিচের দিকে রাখার কারণে চালককে সামনের দিকে বেশি ঝুঁকে থাকতে হয়, যা মাংসপেশিকে (বিশেষ করে গ্লুটিয়াস ম্যাক্সিমাস মাসল) শক্তিশালী করতে সাহায্য করে এবং উচ্চ গতিতে চলার সময় বাতাসের বাধা কমাতে সাহায্য করে । গুণগত মান, টাইপ এবং ওজনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাইসাইকেলের দাম ৫০ মার্কিন ডলার থেকে শুরু করে ২০ হাজার মার্কিন ডলারের বেশিও হতে পারে (বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দামি বাইক হলো ড্যামিয়েন হার্স্ট এর কাস্টম ম্যাডোন যা ৫০০,০০০ মার্কিন ডলারে বিক্রয় হয়েছিল [১৩]) , [১৪]। যাইহোক, ইউসিআই নীতিমালা অনুযায়ী একটি বৈধ রেসিং বাইক 6.8 কেজির নিচে হতে পারবে না (বাইরের প্রায় সকল রোড বাইসাইকেল ৩.২ কেজির (৭ পাউণ্ড) মত হতে পারে [১৫]) । কেনার আগে বাইকটি ওজন করে নিতে হবে এবং পরীক্ষামূলক ভাবে রেস দেওয়ার টেস্ট করা যেতে পারে । বাইকের ড্রাইভট্রেইন এর উপাদান গুলো বিবেচনা করা উচিত । নতুনদের জন্য একটি মাঝারি গ্রেডের ডিরেইলার উপযুক্ত যদিও অনেক ইউটিলিটি বাইক হাফ গিয়ার দ্বারা সজ্জিত থাকে । যদি চালক বেশিরভাগ সময়ে পাহাড়ে আরোহণ করার পরিকল্পকনা করেন সেক্ষেত্রে একটি ট্রিপল-চেইনরিং ক্রাঙ্কসেট গিয়ার সিস্টেম যুক্ত বাইক পছন্দ করা উচিত । অন্যথায় তুলনামূলক হালকা এবং স্বল্প দামের ডাবল চেইনরিং-ই ভালো । অনেক সাধারণ স্থায়ী চাকা যুক্ত বাইকও পাওয়া যায় ।

পাহাড়ের বাইকের পাশাপাশি অনেক রাস্তার বাইকে ক্লিপলেস প্যাডেল থাকে যাতে ক্লিটের মাধ্যমে বিশেষ ধরনের জুতো লাগানো থাকে, যার মাধ্যমে চালক প্যাডেলে চাপ দিতে এবং টেনে তুলতে পারে । বাই সাইকেলের জন্য অন্যান্য আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রের মধ্যে থাকতে পারে সামনে ও পিছনের লাইট, বেল অথবা হর্ণ, শিশুদের বহন করার সিট, সাইক্লিং করার জন্য জিপিএস সংবলিত কম্পিউটার, বার টেপ, ফেন্ডার (মাডগার্ড), ব্যাগ রাখার তাক লাগেজ বাহক, প্যানিয়ার ব্যাগ, পানির বোতল এবং বোতল রাখার ঝুড়ি ।

মৌলিক রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত এর জন্য একজন সাইক্লিস্ট একটি পাম্প (অথবা কার্বন-ডাই-অক্সাইডের কার্ট্রিজ), পাংচার মেরামতের কিট, একটি টায়ার লিভার এবং এক সেট চাবি সাথে নিতে পারেন । বিশেষ ধরনের জুতো, গ্লোভস, এবং হাফ প্যান্ট সাথে করে নিলে সাইক্লিং আরো বেশি কার্যকরী এবং আরামদায়ক হতে পারে ।

ওয়াটারপ্রুফ পোশাক যেমন- টুপি, জ্যাকেট, ট্রাউজার (প্যান্ট), ওভারশু এবং সহজে দৃশ্যমান কাপড়-চোপড় যেগুলো মোটর গাড়ির ঝুঁকি থেকে বাঁচার জন্য ব্যবহার করার উপদেশ দেওয়া যেতে পারে যা বর্ষার সময় সাইক্লিংকে আরো সহনীয় করতে পারে ।

আইনিভাবে অথবা স্বেচ্ছায় নিরাপত্তার জন্য কিছু জিনিসপত্র সাথে রাখা উচিত । সেগুলো হচ্ছেঃ হেলমেট, জেনারেটর অথবা ব্যাটারি চালিত লাইট, প্রতিফলক এবং ভালো শব্দ তৈরি করতে পারে এমন বেল অথবা হর্ণ । অতিরিক্ত হিসেবে স্টাডেড টায়ার এবং বাইসাইকেল কম্পিউটার রাখা যেতে পারে ।

এছাড়াও বাইক বিভিন্ন ধরনের ডিজাইনের সিট এবং হ্যান্ডেল বার দিয়েও সাজানো যেতে পারে ।

দক্ষতা[সম্পাদনা]

শিশুদেরকে সাইকেল চালানোর দক্ষতা সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়ার জন্য অনেক স্কুল ও পুলিশ ডিপার্টমেন্ট শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে, বিশেষ করে তাদেরকে সড়কের নিয়ম কানুন গুলো সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়, যেহেতু তারা সাইক্লিস্ট হওয়ার জন্য আবেদন করে । বয়স্ক সাইক্লিস্টদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য "লীগ অফ আমেরিকান বাইসাইকেল" এর মত কিছু সংস্থাও রয়েছে ।

সাধারণভাবে চালানোর বাইরেও আরেকটি দক্ষতা হচ্ছে রোডে দক্ষভাবে এবং নিরাপদ ভাবে সাইকেল চালানোর দক্ষতা থাকা । সাইক্লিং এর মাধ্যমে মোটর গাড়ির ট্রাফিকে গাড়ির মতো রোডের জায়গা দখল করে সাইকেল চালানোটা একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি । অন্যদিকে নেদারল্যান্ড ও ডেনমার্কের মতো দেশে, যেখানে সাইক্লিং খুবই জনপ্রিয়, সেখানে সাইক্লিস্টদের হাইওয়ে ও প্রধান সড়কের পাশে অথবা সম্পূর্ণ আলাদা কোন বাইক লেনে চলতে দেওয়া হয় । অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয় সড়ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে থাকে, যেখানে শিশুরা প্রত্যেকে তাদের স্কুলের পাশের সড়কে একটি চক্র সম্পন্ন করে যা পরীক্ষক দ্বারা যাচাই করা হয় ।

অবকাঠামো[সম্পাদনা]

সাইক্লিস্ট, পথচারী এবং মোটর গাড়ির চালকরা রাস্তার নকশা সম্পর্কে আলাদা আলাদা দাবি করে যা দ্বন্দ্বের কারণ হতে পারে । কিছু বিচার ব্যবস্থা মোটর চালিত যানবাহন কে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে, উদাহরণস্বরূপ এক লেনের সড়ক ব্যবস্থা তৈরি করা, মুক্তভাবে ডান দিকে মোড় নেওয়ার সুবিধা দেওয়া, অধিক মাত্রায় গাড়ি ঘোরানোর সুবিধা দেওয়া এবং স্লিপ রাস্তা তৈরি করা । অন্যান্য ব্যবস্থায় বাইক লেন ও সাইকেলের রাস্তা তৈরির মাধ্যমে এবং বিভিন্ন রকমের 'ট্রাফিক কামিং' পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে সাইক্লিস্টের বেশি বেশি সাইক্লিং করার জন্য উৎসাহিত করা হয়, যাতে মোটর গাড়ির প্রভাব কমে আসে ।

যে সকল বিচার ব্যবস্থায় মোটর গাড়ি কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, সেখানে সাইক্লিং কিছুটা কমে গেছে । আর যেখানে সাইক্লিং করার অবকাঠামো তৈরি হয়েছে সেখানে সাইক্লিং করার হার মোটামুটি স্থির রয়েছে অথবা বেড়েছে [১৭]। মাঝে মাঝে সাইক্লিং এর বিরুদ্ধে কিছু চরম পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে । সাংহাইয়ে, ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে শহরের কিছু সড়কে সাইকেল ভ্রমণ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, যেখানে একসময় সাইকেল ভ্রমণ ছিল সেকানকার পরিবহন ব্যবস্থায় প্রধান মাধ্যম । [১৮]

যে সকল জায়গা গুলোতে সাইক্লিং খুবই জনপ্রিয় এবং উৎসাহিত করা হয়, সে সকল এলাকায় সাইকেল চুরি কমাতে সাইকেল স্ট্যান্ড, তালাবদ্ধ করা যায় এমন ছোট গ্যারেজ এবং টহল দেওয়া হয় এমন সাইকেল পার্কের ব্যবস্থা রাখা হয় । স্থানীয় সরকার গণপরিবহনের বাইরে বিশেষ সংযুক্ত ব্যবস্থা দেওয়ার মাধ্যমে অথবা গণপরিবহনে বাইসাইকেল বহন করার অনুমতি দেওয়ার মাধ্যমে সাইক্লিংকে উৎসাহিত করতে পারে । বিপরীত ভাবে, যেসব শহরে সাইক্লিং করা তেমন উৎসাহিত করা হয় না সেখানে নিরাপদ সাইকেল পার্কিং এর সুবিধা অনুপস্থিত থাকা একটি নৈমিত্তিক অভিযোগ ।

কিছু শহরে ব্যাপক মাত্রায় সাইক্লিং এর অবকাঠামো পাওয়া যেতে পারে। কিছু শহরের  ডেডিকেটেড রাস্তা গুলো প্রায়ই স্কেটার, স্কুটার, স্কেটবোর্ডার এবং পথচারীদের জন্য মুক্ত করা থাকে । একটি সংঘর্ষে ব্যবহারকারীদের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন সহ ডেডিকেটেড সাইক্লিংয়ের ক্ষেত্রে অবকাঠামোগুলো প্রত্যেক বিচারব্যবস্থার আইনে আলাদাভাবে বিচার করা হয় । বিভিন্ন ধরনের আলাদা আলাদা সুবিধার ক্ষেত্রে কিছু বিতর্কও রয়েছে ।

বিশেষ করে গ্রাম্য এবং তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত দূরত্বে পরিবহনের জন্য উপযুক্ত হওয়ার কারণে (বিনোদনের সাথে তুলনীয়) সাইকেলকে পরিবহনের একটি টেকসই পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয় । কেজি স্টাডি এবং ভালো অনুশীলন, যা কিছু শহরে এই ধরনের কার্যকরী সাইক্লিংকে উৎসাহিত করে এবং উদ্দীপিত করে, সেগুলো স্থানীয় পরিবহনের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় পোর্টাল এটিলিসে পাওয়া যেতে পারে ।