বিষয়বস্তুতে চলুন

সা' (পাত্র)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মুরিনীয় শাসনামলের সাদাকাতুল ফিতর পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত তামার তৈরি মরক্কীয় ‘সা’ (পরিমাপক যন্ত্র)।

‘সা’ (আরবি: ص‍َاع) ছিল প্রাচীন ইসলামি বিশ্বে ব্যবহৃত একটি পরিমাপের একক, যার ব্যাপক সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। এর সঠিক পরিমাণ নির্দিষ্ট না হলেও আরবি শব্দ ‘সা’ -এর অর্থ হলো ছোট পাত্র, যা কুরআনে উল্লেখিত শব্দ ‘সুয়াআ‘ (আরবি: صواع; পাত্র বা গ্লাস) এর সাথে সম্পর্কিত। মুদ এবং মাকুকের সাথে মিলিত হয়ে ‘সা’ আরব উপদ্বীপে বহুল ব্যবহৃত একটি পরিমাপের একক ছিল।[১] ‘সা’ -এর সাথে ইসলামের কিছু ইবাদতের হিসাব জড়িত রয়েছে। যেমনঃ যাকাতুল ফিতর, ফিদিয়া এবং পবিত্রতা।[২]

‘সা’ এবং নিসফে ‘সা’ এর পরিমাণ উল্লেখ করা হলোঃ

অন্যান্য আরবি পরিমাপের অনুপাত

[সম্পাদনা]

মধ্যযুগীয় আরবি লেখকদের মধ্যে সাধারণ ঐক্যমত্য রয়েছে যে, ১ সা' সমান ৪ মুদ। নবম শতাব্দীর পণ্ডিত আল-খাওয়ারিজমি ইঙ্গিত দিয়েছন যে, এটিই ছিল মদীনার লোকদের মতামত। একইভাবে দশম শতাব্দীর শামসউদ্দীন আল-মাকদিসী বলেছেন যে, হিজাজে ১ সা' = ৪ মুদ = ১/৩ মকুক। [১] আল জাহরাবী সা'কে জেস্টেসের সাথে সম্পর্কিত করে ঘোষণা করেছেন যে, রোমে ১ সা' =১০ জেস্টেস। [৫]

যেহেতু সা' ভরের বিভিন্ন পরিমাপের সাথে সম্পর্কিত ছিল, তাই অনেক মানসম্মত সমস্যা এতে দেখা দিয়েছিল এবং র‍িতলের সাথে এর সম্পর্ক বিশেষভাবে বিতর্কিত ছিল। এতে দুটি প্রচলিত মতামত ছিল:

  • ১ সা' = ৮ রিতল ছিল এবং কুফার লোকেরা ১ সা'-কে এভাবেই সংজ্ঞায়িত করতেন। [৬] এটি খলিফা উমর শপথের প্রায়শ্চিত্ত করার সময়ও ব্যবহার করতেন। [১]
  • ১ সা' = ৫ ১/৩ রিতল ছিল এবং মদিনার লোকেরা ১ সা' কে এভাবেই সংজ্ঞায়িত করত। মুয়াবিয়ার শাসনামলে মদিনার গভর্নর ছিলেন সাঈদ ইবনে আল-আস এবং তিনি এটিকে এই হিসাবেই গণ্য করতেন। [১]

আল-জুওয়াইনি বর্ণনা করেছেন যে, মদিনায় খলিফা হারুন আল-রশিদের সামনে ইমাম শাফি'ঈ ও হানাফী ফকিহ আবু ইউসুফ সা'র পরিমাপ নিয়ে বিতর্ক করেছিলেন। খলিফা তখন মুহাজিরদের বংশধরদের তাদের সাʿ নিয়ে আসার আমন্ত্রণ জানান, যা তারা নিজেদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল। যখন দেখা গেল যে, ইমাম শাফিʿই প্রদত্ত পরিমাপই (১ সাʿ = ৪ মুদ = ৫ ১/৩ রতল) সঠিক, তখন আবু ইউসুফ শেষ পর্যন্ত এই মতের সাথে একমত হন। [৭] বাগদাদে ১ রিতল = ১৩০ দিরহাম হওয়ায় মুসলিম বিদ্বানগণ নিম্নলিখিত সমীকরণও প্রতিষ্ঠা করেনঃ ১ সাʿ = ৬৯৩ ১/৩ দিরহাম। [৮]

ফিকহি অর্থ

[সম্পাদনা]

মুদে মতো সাʿরও ইসলামে একটি পরিমাপক যন্ত্রের চেয়েও অতিরিক্ত প্রতীকী ও ধর্মীয় অর্থ রয়েছে। আনাস ইবন মালিক কর্তৃক উল্লেখিত ও সহিহ বুখারীসহ বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া একটি হাদিস অনুসারে, নবী মুহাম্মদ খাইবারের যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে আল্লাহর কাছে মুসলিমদের সাʿ ও মুদে বরকত দানের জন্য দোয়া করেছিলেন। [৯]

সাʿ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাদকাতুল ফিতর পরিমাপের জন্য, যা এক প্রকার পবিত্র দান এবং ঈদুল-ফিতরের পূর্বে প্রদান করা বাধ্যতামূলক। এই দানের পরিমাণ হল পরিবারের প্রতিজন সদস্যের জন্য শস্যভেদে এক বা অর্ধ সাʿ পরিমাণ। ইসলামি ঐতিহ্য অনুসারে, নবী মুহাম্মদ হিজরতের বছর (৬২৩/৬২৪ খ্রি.) এই পরিমাণ নির্ধারণ করেছিলেন। যদি মুদ বা সাʿ মাপার কোনো সরঞ্জাম না থাকে, তাহলে যাকাতুল ফিতরের শস্যের পরিমাণ দুই হাত একত্রে করে পরিমাপ করা যেতে পারে। এভাবে চারবার দুই হাত একত্রে করে দিলে তা এক সাʿ সমান হবে। [১০]

ফেজে প্রচলিত নিয়ম ছিল যে, যদি কোনো দরিদ্র ব্যক্তি নিজের প্রতিবেশীদের থেকে যাকাতুল-ফিতর বিতরণের সময় অতিরিক্ত শস্য পেত, তাহলে তাকে সেই অতিরিক্ত অংশ অন্য দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করতে হতো। প্রত্যেক পরিবারের সদস্যের জন্য মাত্র এক সাʿ শস্য রাখা অনুমোদিত ছিল। [১১]

যাকাতুল-ফিতর পরিমাপের জন্য পরিমাপক পাত্র হিসেবে বিশেষ সাʿ তৈরি করা হতো। [১২] উদাহরণস্বরূপ, মেরিনীয় সুলতান আবুল হাসান আলী ইবন উসমান (শাসনকাল ১৩৩১-১৩৫১) তামার তৈরি একটি পাত্র নির্মাণ করেছিলেন, যা নবী যুগের সা' হিসেবে গণ্য হতো। [১৩] একটি শিলালিপিতে দীর্ঘ সনদ খোদাই করা ছিল, যা প্রমাণ করে যে, এই পরিমাপক পাত্রের মান নির্ধারণ নবীর সাহাবি যায়েদ ইবন সাবিত পর্যন্ত সংযুক্ত ছিল। [১২]

হাদিসের ভিত্তিতে, সাʿ সেই সর্বনিম্ন পানির পরিমাণ হিসেবেও গণ্য করা হত, যা বৈধ গোসল করার জন্য প্রয়োজনীয়। [১৪]

সাʿ ব্যবহারের তথ্য শুধুমাত্র আরব উপদ্বীপে পাওয়া যায়। আল-মাকদিসি উল্লেখ করেছেন যে, আরবরা জাহাজে দুটি ভিন্ন সাʿ একক ব্যবহার করত; একটি ছোট সাʿ, যা নাবিকদের ক্ষতিপূরণের জন্যে এবং একটি বড় সাʿ, যা ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য ব্যবহৃত হত। [১৫]

মেট্রিক পদ্ধতি অনুযায়ী

[সম্পাদনা]

‘সা’ মূলত কোনো বাটখারা নয়; বরং একটি পাত্র বিশেষ। তাই ভিন্ন ভিন্ন ফসলের ওজন ‘সা’ হিসাবে ভিন্ন ভিন্ন হয়। ওয়ালথার হিন্তসের মতে–যিনি আইয়ুবীয় যুগের একটি মুদ পাত্রের ওপর নির্ভর করেন–নবীর যুগের ‘সা’ এর আয়তন ছিল চার লিটার এবং এই পরিমাপকে গমের ওজনে রূপান্তর করলে ৩২০০ গ্রাম পাওয়া যায়।[১৬] মেরিনীয় সুলতান আবুল হাসানের জন্য নবীর যুগের ‘সা’ এর আদলে নির্মিত ‘সা’ এর আয়তন ছিল ২.৭৫ লিটার।[১৭]

মদিনার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়া বিভাগের প্রধান আব্দুল মুহসিন বিন হামাদ আল আব্বাদের ছাত্রদের মতে, ‘সা’ সম্পর্কে ফুকাহাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত হলোঃ

সম্পর্কিত ইসলামি হুকুম

[সম্পাদনা]
  • যাকাতুল ফিতর: নবী মুহাম্মদ যাকাতুল ফিতর বা ফিতরার জন্য এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ যব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।[১৮]
  • ওজু ও গোসলের পানির পরিমাণ: সাহাবি আনাস ইবনে মালিক হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে: আল্লাহর নবী এক মুদ পানি দিয়ে ওজু করতেন এবং এক সা’ থেকে পাঁচ মুদ পর্যন্ত পানি দিয়ে গোসল করতেন।[১৯]

সূত্র

[সম্পাদনা]

আরবি সূত্র

[সম্পাদনা]

অন্যান্য

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 3 4 Šams ad-Dīn al-Maqdisī: Kitāb Aḥsan at-taqāsīm. 1906, S. 98.
  2. ↑ Šams ad-Dīn al-Maqdisī: Kitāb Aḥsan at-taqāsīm. 1906, S.98।
  3. ↑ [আওযানে শরইয়্যাহ, মুফতী মুহাম্মাদ শফী; পৃ. ১৮; মেট্রিক/আন্তর্জাতিক পদ্ধতি সংক্ষিপ্ত বিবরণ (জনসাধারণের জন্য) ১৯৮২; বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্স ইনস্টিটিউশন পৃ. ৩]
  4. 1 2 "সাদাকাতুল ফিতর আধা সা গম : হাদীস ও সুন্নায়, আছার ও ইজমায়"। www.alkawsar.com। সংগ্রহের তারিখ ২৬ মার্চ ২০২৫।
  5. ↑ Henri Sauvaire: "Arab Metrology.
  6. ↑ Al-Ḫwārizmī: Kitāb Mafātīḥ al-ʿulūm. 1895, S. 14.
  7. ↑ Al-Ǧuwainī: Muġīṯ al-ḫalq fī tarǧīḥ al-qaul al-ḥaqq. Kairo 1934. S. 19f. Digitalisat
  8. ↑ Sauvaire: "Matériaux". 1886, S. 400f.
  9. ↑ Ṣaḥīḥ al-Buḫārī, Kitāb al-Ǧihād wa-s-Siyar, Nr. 2732. OnlineVersion on Wikisource
  10. ↑ Bel: "Sāʿ" in Encyclopaedia of Islam . Vol. IV, p. 1.
  11. ↑ Bel: "Note sur trois anciens vases". 1917, p. 363.
  12. 1 2 Bel: "Note sur trois anciens vases". 1917, p. 370.
  13. ↑ Bel: "Note sur trois anciens vases". 1917, pp. 364, 366.
  14. ↑ Bel: "Sāʿ" in' 'Encyclopedia of Islam' '. Vol. IV, p. 1.
  15. ↑ Šams ad-Dīn al -Maqdisī: Kitāb Aḥsan at-taqāsīm . 1906, p. 99.
  16. ↑ Hinz: Islamic Mass and Weights. 1970. p. 51.
  17. ↑ Bel: "Note sur trois anciens vases". 1917, p. 364, 366.
  18. ↑ رواه البخاري في صحيحه
  19. ↑ البخاري (1/84)، مسلم (1/258)، أحمد (3/112، 116، 259، 282، 290)