বিষয়বস্তুতে চলুন

সমরকন্দের যুদ্ধ (৭১২)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সমরকন্দের যুদ্ধ (৭১২)
মুসলিমদের মাওয়ারাননহর বিজয়ের অংশ

৮ম শতাব্দীতে মাওয়ারাউন্নাহার
তারিখ৭১২
অবস্থান
ফলাফল উমাইয়াদের বিজয়
অধিকৃত
এলাকার
পরিবর্তন
উমাইয়াদের হাতে সমরকন্দের দখল
বিবাদমান পক্ষ
উমাইয়া খিলাফত সগদীয় নগররাষ্ট্র
গকতুর্ক খানাত
সেনাধিপতি ও নেতৃত্ব প্রদানকারী
কুতাইবা ইবনে মুসলিম
আবদুর রহমান ইবনে মুসলিম
সালেহ ইবনে মুসলিম
গুর্ক আত্মসমর্পণকারী যু. বন্দী
ইনেল কাখান
কুল তেগিন
শক্তি
২০,০০০ যোদ্ধা অজানা
হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি
অজানা ব্যাপক

সমরকন্দের যুদ্ধ ছিল ৭১২ সালে উমাইয়া ও সমরকন্দের সোগদীয় শাসকের মধ্যে সংঘটিত একটি সামরিক সংঘাত। এতে উমাইয়ারা বিজয় অর্জন করে এবং সমরকন্দ ইসলামি খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত হয়।

পটভূমি

[সম্পাদনা]

৭০৯ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া সেনাবাহিনীর বুখারা বিজয় করার পর উমাইয়া সেনাপতি কুতাইবা ইবনে মুসলিম তার ভাই আবদুর রহমান ইবনে মুসলিমকে সমরকন্দে প্রেরণ করেন। তৎকালীন সমরকন্দের সোগদীয় শাসক ছিলেন তারখুন। এর আগেই তাদের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী তারখুন উমাইয়াদের কাছে খাজনা বা কর প্রদান করবেন এবং এর বিনিময়ে উমাইয়া বাহিনী সমরকন্দ আক্রমণ করবে না। সমঝোতার ফলে আপাতত সমরকন্দ সরাসরি সামরিক আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়।[১][২] কিন্তু সমরকন্দের অনেক ব্যবসায়ী ও অভিজাত ব্যক্তি তারখুনের এই নীতি পছন্দ করেননি। তারা মনে করতেন, উমাইয়াদের কাছে খাজনা দেওয়া দুর্বলতার পরিচয় এবং এতে তাদের নগররাষ্ট্রের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তারখুনের এই আপোষমূলক অবস্থানের বিরুদ্ধে শহরের প্রভাবশালী মহলে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে এবং অবশেষে তারা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা করে এবং গুর্ক নামের একজনকে নতুন শাসক হিসেবে বেছে নেয়।[৩][৪] তারখুনকে সিংহাসনচ্যুত করা হয় এবং পরে তিনি আত্মহত্যা করেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। তার এই করুণ পরিণতি উমাইয়াদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। তারা তারখুনের মৃত্যুকে নিজেদের মিত্রের প্রতি অবিচার হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে সরাসরি সমরকন্দ আক্রমণের আগে উমাইয়া বাহিনীকে আরো কিছু সামরিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে তাদেরকে সিস্তানের শাসক জুম্বিলের বিদ্রোহ দমন করতে হয়। পরের বছর ৭১২ সালে দ্বিতীয় আযকাজোরের ভাইয়ের বিদ্রোহও দমন করতে হয়। [৫][৬]

যুদ্ধ

[সম্পাদনা]

৭১২ খ্রিস্টাব্দে কিছু বিরতির পর উমাইয়ারা সমরকন্দের দিকে অগ্রসর হয়। সমরকন্দ ছিল সোগদিয়ার সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী নগরী এবং কার্যত তার রাজধানী।[৭] কুতাইবা ও তার ভাই আব্দুর রহমান প্রায় ২০,০০০ জন মুসলিম সৈন্য নিয়ে সমরকন্দ অভিমুখে রওনা হন। বলা হয়, এই বাহিনীতে বোখারা ও খাওয়ারেজম থেকে আগত সৈন্যরাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সমরকন্দের শাসক গুরাক কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলার দৃঢ় সংকল্প করেন। তিনি মাওয়ারান্নাহরের অন্যান্য শাসকের কাছেও সাহায্যের আবেদন জানান; বিশেষ করে তাশখন্দের রাজা ও ফারগানার ইখশিদের কাছে এবং তিনি তাদের সতর্ক করে দেন যে, তারা যদি সাহায্যে এগিয়ে না আসে, তবে সমগ্র মাওয়ারান্নাহর বিপদের সম্মুখীন হবে। উভয় শাসকই তার আহ্বানে সাড়া দেন এবং একটি বৃহৎ বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হন।[৮][৯][১০]

কুল তেগিনকে তাশখন্দ–ফারগানার যৌথ বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রেরণ করা হয়। তুর্কিরা রাতে মুসলমানদের উপর আকস্মিক হামলা চালানোর চেষ্টা করে; কিন্তু কুতাইবা তাদের পরিকল্পনার কথা জানতে পারেন এবং নিজের ভাই সালেহকে একটি ছোট বাহিনীসহ পাঠিয়ে তাদের ওপরই অতর্কিত আক্রমণ চালান। রাতের এই যুদ্ধ অত্যন্ত তীব্র ও রক্তক্ষয়ী ছিল। অনেক সংঘর্ষ ও দীর্ঘ অবরোধের পর শেষ পর্যন্ত মাওয়ারান্নাহর জোট পরাজিত হয়। অনেকেই নিহত হয় এবং অল্পসংখ্যক লোককে বন্দি করা হয়। গুরাক আত্মসমর্পণ করে এবং উমাইয়াদের হাতে আটক হয়। [১১] মুসলমানরা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও ঘোড়াও অর্জন করে। কুতাইবা সেই ছোট বাহিনীকে তাদের অর্জিত গনিমত পুরো সেনাবাহিনীর সঙ্গে ভাগ না করে নিজেদের মধ্যেই রাখার অনুমতি দেন।[১২][১৩][১৪][১৫][১৬]

মাওয়ারান্নাহরের যৌথ সেনাবাহিনীর পরাজয় সমরকন্দের সগদীয়দের মনোবল ভেঙে দেয়। কুতাইবা ইবনে মুসলিম অবিরাম নগরটিতে আক্রমণ ও প্রাচীরভেদী হামলা চালাতে থাকেন। এর ফলে নগরপ্রাচীরে একটি বড় ফাঁক সৃষ্টি হয়। মুসলিম বাহিনী যখন চূড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন সমরকন্দবাসীরা শান্তির প্রস্তাব দেয়। শাসক গুরাক।আত্মসমর্পণ করার পর কুতাইবা তাকে মৃত্যুদণ্ড না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং পরবর্তীতে উভয়পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। এরপর উমাইয়া খিলাফত সমরকন্দে একটি সামরিক ছাউনি।স্থাপন করে। কুতাইবা এই ছাউনিকে কৌশলগত ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেন এবং সেখান থেকে পরবর্তীতে শাস ও ফারগানার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন।[১৭][১৮][১৯][২০][১৫][১৬]

পরবর্তী অবস্থা

[সম্পাদনা]

কুতাইবা সামারকন্দে ৪,০০০ সৈন্য মোতায়েন করেন, যাদের নেতৃত্ব দেন তার ভাই আবদুর রহমান। গুরাক সোগদিয়ার রাজা থাকলেও তার নতুন রাজধানী হয় ইশতিখন। শহরটি কেবল মুসলমানদের জন্য একটি কেল্লা হিসেবে গড়ে ওঠে। এরপর কুতাইবা শহরের অগ্নিপুজার মন্দিরগুলো সরিয়ে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।[২১][২২] তিনি সমরকন্দের সমস্ত মূর্তিকেও ধ্বংস করার নির্দেশ দেন। অমুসলিমদের শহরে প্রবেশের অনুমতি কেবল তখনই দেওয়া হতো, যখন তাদের হাতে কাদামাটির মুদ্রা (ক্লে সীল) দিয়ে অনুমতির চিহ্ন দেওয়া থাকত।[২৩]

সমরকন্দ বিজয় মুসলিমদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজয় ছিল। এরপর ৭১৩ সালে কুতাইবা ইবনে মুসলিম আরও এগিয়ে সোগদিয়ায় প্রবেশ করেন এবং অন্যান্য অঞ্চলের উপর কর চাপানো শুরু করেন। এভাবেই উমাইয়ারা তখন তাং রাজবংশের সীমান্তের কাছে পৌঁছে যায়।এবং এর ফলে আরব ও সোগদিয়া উভয়ই চীনা সমর্থন পাওয়ার জন্য দূত প্রেরণ শুরু করে।[২৪]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. ↑ Gibb, H. A. R, p. 41
  2. ↑ Hugh Kennedy, p. 263
  3. ↑ Gibb, H. A. R, p. 42
  4. ↑ Hugh Kennedy, p. 267
  5. ↑ Gibb, H. A. R, p. 42-43
  6. ↑ Hugh Kennedy, p. 267-268
  7. ↑ Hugh Kennedy, p. 268
  8. ↑ Hugh Kennedy, p. 269
  9. ↑ Gibb, H. A. R, p. 44
  10. ↑ Percy Sykes, p. 163
  11. ↑ N. Frye, Richard (১৯৯৬)। The Heritage of Central Asia From Antiquity to the Turkish Expansion। Markus Wiener Publishers। পৃ. ২১১। আইএসবিএন ১৫৫৮৭৬১১১X। Qutaiba then turned against Samarkand, which had withheld tribute, and after many skirmishes and a siege of the city Ghurak surrendered. A strong Arab garrison was installed in the city, and Qutaiba made it the base for further operations against Shash, Khojent and Ferghana. He did not execute Ghurak, who made his peace with the Arabs, although the circumstances of his rule in Samarkand are unclear.
  12. ↑ Hugh Kennedy, p. 269
  13. ↑ Gibb, H. A. R, p. 44
  14. ↑ Percy Sykes, p. 163
  15. 1 2 Beckwith, Christopher I. (১৯৯৩)। The Tibetan Empire in Central Asia: A History of the Struggle for Great Power Among Tibetans, Turks, Arabs, and Chinese During the Early Middle Ages। Princeton University Press। পৃ. ৭৭। আইএসবিএন ০৬৯১০২৪৬৯৩। In 93 A.H./A.D. 712 Qutayba b. Muslim continued his successful campaigns of conquest by force and trickery. After taking Khwarizmia by treachery, he marched on Samarkand, assisted by Bukharan and Khwarizmian troops. This caused Gurak, the prince of Samarkand, to write to the king of Tashkent for help. In this hour of need, Qapaghan Qaghan responded. Because Qapaghan had become the protector of Ferghana by his conquest of the Tiirgis and because he had also become the overlord of the king of Tashkent, major support of Samarkand was in order. He sent Kul Tegin, in command of an Eastern Turkic army with men of Tashkent and Ferghana as well, to attack the besieging Arabs. The Arabs defeated them, however, and although the Eastern Turks profited greatly from this expedition into Sogdiana,'" Qutayba still managed to enter Samarkand and establish a garrison there.
  16. 1 2 Beckwith, Christopher I. (২০০৯)। Empires of the Silk Road: A History of Central Eurasia from the Bronze Age to the Present। Princeton University Press। পৃ. ১৩৩। আইএসবিএন ৯৭৮০৬৯১১৩৫৮৯২। In 712 Qutayba seized Khwarizm by trickery and settled an Arab colony there. In that year, he also besieged Samarkand. Its king appealed to Tashkent for help, so as overlords of Tash-kent the Eastern Türk sent an army led by Köl Tigin into Sogdiana in his support. But Qutayba prevailed. The Türk were forced to withdraw, and the Arabs established a garrison in Samarkand
  17. ↑ N. Frye, Richard (১৯৯৬)। The Heritage of Central Asia From Antiquity to the Turkish Expansion। Markus Wiener Publishers। পৃ. ২১১। আইএসবিএন ১৫৫৮৭৬১১১X। Qutaiba then turned against Samarkand, which had withheld tribute, and after many skirmishes and a siege of the city Ghurak surrendered. A strong Arab garrison was installed in the city, and Qutaiba made it the base for further operations against Shash, Khojent and Ferghana. He did not execute Ghurak, who made his peace with the Arabs, although the circumstances of his rule in Samarkand are unclear.
  18. ↑ Hugh Kennedy, p. 269-270
  19. ↑ Gibb, H. A. R, p. 44
  20. ↑ Percy Sykes, p. 163
  21. ↑ Hugh Kennedy, p. 270
  22. ↑ Percy Sykes, p. 163
  23. ↑ Hugh Kennedy, p. 270
  24. ↑ Hugh Kennedy, p. 270-271

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]
  • Gibb, H. A. R (1923), The Arab conquests in Central Asia.[1]
  • Hugh Kennedy (2007), The Great Arab Conquests How The Spread Of Islam Changed the World We Live in. [2]
  • Percy Sykes (1940), A History Of Afghanistan Vol. I.