বিষয়বস্তুতে চলুন

শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতারকাণ্ড

শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতারকাণ্ড
অপারেশন সার্চলাইটের অংশ
১৯৭১ সালের এপ্রিলে করাচি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রেফতারকৃত শেখ মুজিবুর রহমান
তারিখ২৬ মার্চ ১৯৭১ (1971-03-26)
সময়রাত ১.৩০ (ইউটিসি+৬)
স্থিতিকাল৯ মাস ও ১৩ দিন
অবস্থান৬৭৭/৩২ ধানমন্ডি, নতুন ঢাকা, পূর্ব পাকিস্তান, পাকিস্তান
স্থানাঙ্ক২৩°৪৫′০৬″ উত্তর ৯০°২২′৩৬″ পূর্ব / ২৩.৭৫১৭° উত্তর ৯০.৩৭৬৭° পূর্ব / 23.7517; 90.3767
ধরনগ্রেফতার
কারণঅসহযোগ আন্দোলন
অংশগ্রহণকারীপাকিস্তান সেনাবাহিনী
ফলাফলশেখ মুজিবুর রহমানকে পাঞ্জাবের লায়ালপুর কারাগারে প্রেরণ
নিহত১
গ্রেফতারশেখ মুজিবুর রহমান
অভিযোগরাষ্ট্রদ্রোহ
বিচারসামরিক আদালতে রুদ্ধদ্বার কক্ষে বিচার
রায়মৃত্যুদণ্ড

২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে রাত ১.৩০ মিনিটে (ইউটিসি+৬) নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সদ্য অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় অবস্থিত তার ব্যক্তিগত বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে। এই গ্রেফতার অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল অপারেশন বিগ বার্ড যা অপারেশন সার্চলাইটের সাথে ঘটেছিল। গ্রেফতারের পর তাকে লায়ালপুর কারাগারে পাঠানো হয় এবং ২ আগস্টে সামরিক আদালতে তার বিচার গোপনে করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনেছিল।

মাসব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের পর শেখ মুজিবকে গ্রেফতারের পরপরই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয় এবং শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গড়ে তোলা হয়। ৪ ডিসেম্বরে সালে সামরিক আদালত শেখ মুজিবকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে যা গোপন রাখা হয়েছিল। তবে আদালতের রায় কার্যকর করার পূর্বে বাংলাদেশ ও ভারতের মিত্রবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে আক্রমণ করে এবং ফলশ্রুতিতে ১৬ ডিসেম্বরে সালে ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণের পর ইয়াহিয়া খানের সরকারের পতন ঘটে এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের নতুন রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর শেখ মুজিবকে ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে মুক্তি দেয়।

পটভূমি

[সম্পাদনা]

শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থান

[সম্পাদনা]
১৯৬৬ সালে পাকিস্তানের লাহোরে শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯২০ সালে ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ফরিদপুর জেলায় জন্মগ্রহণকারী শেখ মুজিবুর রহমান[ক] ১৯৩৮ সালে বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্রলীগ এবং ১৯৪৩ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সদস্য হন।[১] ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গ প্রদেশ ভেঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গ গঠিত হয় এবং পূর্ববঙ্গ (পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান) পাকিস্তানের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। তৎকালীন সময়ে পাকিস্তান আন্দোলনে জড়িত শেখ মুজিব একজন ছাত্রনেতা ছিলেন। তিনি পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে দলটিতে ভাঙ্গনের ফলে এর সভাপতি আবদুল হামিদ খান ভাসানী দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করেন, যার ফলে ঘটনাক্রমে শেখ মুজিব দলটির একচ্ছত্র নেতৃত্বে পরিণত হন।[২] ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি জাতীয় রাজনীতি ছেড়ে প্রাদেশিক রাজনীতির প্রতি মনোনিবেশ করেন।[৩] ১৯৬০-এর দশকের প্রথমদিকে তিনি পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার উদ্দেশ্যে ভারতের ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় গিয়েছিলেন, তবে তার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়েছিল।[৪]

১৯৬৬ সালে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের রাজধানী লাহোরে অনুষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক সম্মেলনে ছয় দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন যা তৎকালীন সরকার, ডানপন্থী, বামপন্থী ও চীনের নিকট থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছিল। সেই প্রস্তাবে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে পুনর্গঠন এবং প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র ছাড়া অন্যান্য দায়িত্বগুলো পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের উপর অর্পণ করতে বলা হয়েছিল।[৫] তৎকালীন সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে ছয় দফা বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়, তবে ১৯৬৮ সালে ভারতের সাহায্যে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে বাংলাদেশ গঠনের চেষ্টার অভিযোগে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে। সরকার তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করে যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে পরিচিত। কিন্তু মামলার বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণের তীব্র বিরোধিতার ফলে সরকার মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়।[৬] এরপর শেখ মুজিবুর রহমানের দলের জনপ্রিয়তা অনেক বৃদ্ধি পায়।[৭] ব্রিটিশ সরকারের গোপন নথিপত্র অনুযায়ী ১৯৬৯ সালে তারা শেখ মুজিবকে এমন একজন সম্ভাবনাময় রাজনীতিবিদ হিসেবে দেখেছিলেন যিনি পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন।[৮]

নির্বাচন ও পরবর্তী ঘটনা

[সম্পাদনা]
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের দিন শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের পতন হয় এবং তিনি ইয়াহিয়া খানের নিকট ক্ষমতা তুলে দেন। নতুন রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে জাতীয় ও প্রাদেশিক পর্যায়ে নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা বাস্তবায়নের বিনিময়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেন। ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে তার দল নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।[৯] ৬ দফা বাস্তবায়ন অবশ্যম্ভাবী বুঝতে পেরে পশ্চিম পাকিস্তান ভিত্তিক অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ভীত হয়ে পড়ে।[১০] নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর সরকার দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো আওয়ামী লীগকে শাসনক্ষমতা দেওয়ার বিরোধিতা করে।[১১] এমন পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডের নিকট পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদেরকে সহায়তা করবে কিনা এমন প্রশ্ন করে এসোর আঞ্চলিক জেনারেল ম্যানেজারের মাধ্যমে শেখ মুজিব বার্তা প্রেরণ করলে উত্তরে ব্লাড পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে অপারগতা প্রকাশ করে। পরবর্তীতে পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ সিম্পসন ফারল্যান্ড ব্লাডের উত্তরকে সমর্থন করেন। এরপর শেখ মুজিব একজন সংবাদদাতার মারফতে ব্লাডকে ছয় দফার ভিত্তিতে সংবিধান কার্যকর করা কিংবা একজন রাষ্ট্রপতির অধীনে পাকিস্তানকে একটি মিত্রসংঘে রূপান্তর করার ব্যাপারে ইয়াহিয়া খানকে রাজি করানোর অনুরোধ করলে ব্লাড তা নাকচ করে দেন।[১২] অর্গানাইজার নামক ভারতীয় ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে করা দাবি অনুযায়ী ফারল্যান্ড নেতৃত্বাধীন একটি মার্কিন প্রতিনিধিদল শেখ মুজিবের সাথে দেখা করে পূর্ব পাকিস্তানের সন্দ্বীপকে একটি নৌঘাঁটি করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিকট হস্তান্তর করার বিনিময়ে পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারকে সমর্থন করার প্রস্তাব করেছিল, যা শেখ মুজিব প্রত্যাখ্যান করেন।[১৩]

৩ মার্চে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হওয়ার কথা থাকলেও এর দুই দিন আগে রাষ্ট্রপতি তা স্থগিত করে দেন। যার ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণ ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে[১৪] এবং ২ মার্চ থেকে স্বশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়।[১৫] ৩ মার্চে পল্টন ময়দানে শেখ মুজিবের উপস্থিতিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ বাংলাদেশের জন্য 'স্বাধীনতার ইশতেহার' ঘোষণা করেন এবং শেখ মুজিবকে এর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করা হয়।[১৬] এরপর ৬ মার্চে ইয়াহিয়া অধিবেশনের নতুন তারিখ হিসেবে ২৫ মার্চ ঘোষণা করেন।[১৭] ১৫ মার্চে শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে পূর্ব পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা অনানুষ্ঠানিকভাবে চলে আসে।[১৮] ১৬ থেকে ২২ মার্চ পর্যন্ত শাসনক্ষমতা সম্পর্কে ইয়াহিয়ার সাথে শেখ মুজিবের আলোচনা চলমান থাকলেও এরই মাঝে পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য ও রসদ আসতে থাকে। ২২ মার্চে দ্বিতীয়বারের মতো অধিবেশন স্থগিত করা হয়।[১৯] ২৩ মার্চে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান সরকারের নিকট পাকিস্তান মিত্রসংঘ প্রস্তাব করে যার মধ্যে পূর্ব ও পশ্চিমের জন্য পৃথক সংবিধান তৈরির দাবি করা হয়েছিল।[২০] একই দিনে রাষ্ট্রপতি ভবন, সেনানিবাস, বিমানবন্দর ও গভর্নর হাউস ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র পাকিস্তানের পতাকার বদলে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। শেখ মুজিব তার বাসভবনে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে এই পতাকা উত্তোলন করেন।[২১] পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন পরিস্থিতি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়কার পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।[২২]

গ্রেফতার

[সম্পাদনা]

প্রস্তুতি

[সম্পাদনা]
অপারেশন সার্চলাইটে ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান প্রধান লক্ষ্যবস্তু।

মার্চেই ভারতের রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং পাকিস্তানের করাচি থেকে চট্টগ্রামে সৈন্য ও অস্ত্র প্রেরণের খবরকে উদ্ধৃত করে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সদস্যদের উপর হামলা করার সম্ভাব্য পরিকল্পনা তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছিল।[২৩] উল্লেখ্য যে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের আগে একাধিকবার কারাভোগ করেছিলেন যার সময়কাল আনুমানিক ৪,৩৯৪ দিন।[২৪] ২৩ মার্চে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দল শেখ মুজিবের বাসভবন শনাক্ত ও তার এলাকা পরিদর্শন করে।[২৫] ২৪ মার্চে শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করার চূড়ান্ত আদেশ দেওয়া হয়।[২৬] তাকে গ্রেফতারের অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল "অপারেশন বিগ বার্ড"।[২৭] সেদিন বিকেলে শেখ মুজিব তার দলের একাধিক শীর্ষ নেতাদের ঢাকা ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।[২৮] ২৫ মার্চে ঢাকায় একটি সামরিক অভিযান পরিচালনার গুজব শোনা যাচ্ছিল।[২৬]

সেই দিন সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করেন। রাষ্ট্রপতির পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগের সংবাদ লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ আর চৌধুরী শেখ মুজিবকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, যিনি রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা দলের সদস্য ছিলেন। সেদিনই লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান মেজর জেনারেল খাদিম হুসেন রাজাকে অপারেশন সার্চলাইট বাস্তবায়ন করার নির্দেশ দেন।[২৯] শেখ মুজিবকে গ্রেফতারের জন্য স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপের ৩য় কমান্ডো ব্যাটালিয়নকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।[৩০] গ্রেফতার অভিযানের জন্য আনুমানিক ৭০ সেনাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।[৩১] অপারেশন সার্চলাইট চলাকালে সেনা সদস্যদের মাঝে কথোপকথনের সংকেত হিসেবে তখন শেখ মুজিবকে "ময়না" হিসেবে অভিহিত করা হয়।[২৬]

রাত ৮টায় ঢাকা সেনানিবাস থেকে শেখ মুজিবের বাসভবনে চিরকুটের মাধ্যমে খবর পাঠানো হয় যে সেখানে রাতে আক্রমণ হতে যাচ্ছে। এরপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সন্দেহজনক কার্যক্রমের খবর পাওয়ার পর শেখ মুজিব তার দলের নেতাকর্মীদের পালিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তিনি বাসভবনে রয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।[৩২] ওই সময়ের মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র হামলা চলতে থাকে এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সিরাজুল আলম খান শেখ মুজিবের নিকট থেকে তার পক্ষ হয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা ও স্বাধীনতার সমর্থক সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের লড়াই করার অনুমতি চেয়ে নেন।[৩৩] এছাড়া তার দলের অন্যতম নেতা তাজউদ্দীন আহমদ শেখ মুজিবের বাড়িতে এসে তাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন, যা শেখ মুজিব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।[৩৪]

গ্রেফতার অভিযান

[সম্পাদনা]
২০২৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনের ধ্বংসাবশেষ।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন যে গ্রেফতারের আগে রাত ১০.৩০ টায় তিনি চট্টগ্রামে স্বাধীনতা ঘোষণার একটি বার্তা প্রেরণ করেছিলেন।[৩৫][খ] ইয়াহিয়ার করাচিতে পৌঁছানোর খবর পাওয়ার পর রাত ১১.৩০ টায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্ব কমান্ড পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের সদরদপ্তরে হামলা করার পর শেখ মুজিবের বাসভবনের দিকে রওনা করে।[৩৭] সেখানে যাওয়ার পথে সেনাদলকে জনসাধারণ ও ব্যারিকেডের মুখোমুখি হতে হয়।[৩১] ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২৬ মার্চে রাত ১২.৫০ টায় শেখ মুজিব বাসভবনে ছিলেন এবং তার টেলিফোন সক্রিয় ছিল।[৩৮] অভিযান চলাকালে বাসভবনের এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছিল।[৩১] তখন শেখ মুজিবের বাসভবনে তিনি ছাড়াও তার স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এবং দুই ছেলে শেখ জামাল ও শেখ রাসেল ছিল।[গ][৩৯] এরপর রাত ১.৩০ টায় সেনাদল বাসভবনের সামনে পৌঁছে গুলিবর্ষণ শুরু করে।[৪০] ফলে শেখ মুজিব বাড়ি থেকে বের হয়ে গুলিবর্ষণ বন্ধ করতে বলে। তারপর সেনাবাহিনী তাকে গ্রেফতার করে।[৪১] গ্রেফতারের পর ওয়্যারলেসের মাধ্যমে টিক্কা খানকে গ্রেফতারের খবর জানানো হয়।[২৭] গুলিবর্ষণের ফলে তখন একজন নৈশপ্রহরী মারা গিয়েছিল। গ্রেফতারের পর সেনাবাহিনীর আরেকটি দল এসে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে বাসভবনের ক্ষতিসাধন করে। টিক্কা খানের মতে যাতে কোনো বিদেশী রাষ্ট্র শেখ মুজিবকে পালাতে সাহায্য করতে না পারে সেজন্য তারা তার গ্রেফতারের ঘটনা গোপন রেখেছিল।[৪২]

আটক করার পর তাকে নির্মাণাধীন জাতীয় পরিষদ ভবনে নিয়ে গিয়ে তারপর সেনানিবাসের ১৪তম ডিভিশন অফিসার্স মেসে স্থানান্তর করে।[৪৩] একই দিনে তাকে স্থানান্তর করে জেনারেল অফিসার কমান্ডিংয়ের বাসভবনের পাশে অবস্থিত ক্যান্টনমেন্ট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে রাখার পর কমান্ড হাউজে আনা হয়।[২৬] তাকে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের ভবনেও বন্দি রাখা হয়েছিল।[৪২][৪৪] এরপর ২৭ মার্চে তাকে সেখান থেকে ফ্ল্যাগ স্টাফ হাউজে নেওয়া হয়।[৪৪] সেদিনই সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে শেখ মুজিবকে ২৬ মার্চে রাত ১.৩০ টায় গ্রেফতার করা হয়েছে।[৪৫] তারপর ঢাকা থেকে তাকে বিমানে করে ৩০ মার্চে করাচিতে আনার পর[৪৪] ১ এপ্রিলে বিমানে করে রাওয়ালপিন্ডিতে নিয়ে যাওয়া হয়।[৩৫] ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দি করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।[৪৪] তখন কোন কারাগারে বন্দী রাখা হবে তা নিয়ে সরকারের মধ্যে আলোচনা চলছিল। এরপর আলোচনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী[৪৬] অবশেষে তাকে পাঞ্জাবের লায়ালপুর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।[৪৭] পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরের ১২৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত লায়ালপুর পাকিস্তানের উষ্ণতম স্থান ছিল যার সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড তখন ছিল ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।[৪৬] টিক্কা খান দাবি করেছিলেন যে তিনি তিন ব্যান্ড রেডিওর মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার পর বাধ্য হয়ে তাকে গ্রেফতার করেছিলেন।[৪৮] তারপর ১৩ ডিসেম্বরে[৩০] তাকে মিয়ানওয়ালী কারাগারে হেলিকপ্টারে করে স্থানান্তর করা হয়েছিল।[৪৯]

উত্তরপ্রভাব

[সম্পাদনা]

রুদ্ধদ্বার কক্ষে বিচার

[সম্পাদনা]
২০১১ সালে ফয়সালাবাদ কেন্দ্রীয় কারাগার (পূর্বে লায়ালপুর কারাগার), যেখানে শেখ মুজিবকে বন্দী রাখা হয়েছিল

রেডিও অস্ট্রেলিয়া দাবি করেছিল যে ২৬ মার্চে মধ্যরাতে রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান একটি ব্যক্তিগত কথোপকথনে শেখ মুজিবুর রহমানের নিশ্চিত মৃত্যু নিশ্চিত করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন।[৫০] ১৯ জুলাই ১৯৭১ সালে ইয়াহিয়া জানান যে শেখ মুজিবের বিচার গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনালে সম্পন্ন করা হবে।[৫১] ২ আগস্ট ১৯৭১ সালে সরকার নয় দিন পর শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার শুরু করার ঘোষণা দেয়। মামলার অভিযোগ হিসেবে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। আগস্টে প্রকাশিত পূর্ব পাকিস্তানের সংকট সম্পর্কে শ্বেতপত্রেও শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের একই অভিযোগ করা হয়েছিল। যদিও বাস্তবতার সাথে অভিযোগের অমিল ছিল, কেননা পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত বিদেশী সাংবাদিকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ২৫ মার্চের পূর্বে আওয়ামী লীগের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না।[২২] শেখ মুজিবের বিচারকার্য গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।[৫২]

বিচারের জন্য গঠিত সামরিক ট্রাইব্যুনালের নেতৃত্ব ব্রিগেডিয়ার রহিমউদ্দিন খানকে দেওয়া হয়েছিল।[৫৩] বাংলাদেশ থেকে আদালতে শেখ মুজিবের পক্ষে বার্নাড শেরিডান অ্যান্ড কোম্পানিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে পাকিস্তান সরকার তাদের আদালতে লড়ার সুযোগ দেয়নি।[৫৪] পূর্বনির্ধারিত তারিখে বিচার শুরু হয়েছিল। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে অভিযুক্ত যাতে তার পক্ষের আইনজীবী বাছাই করতে পারেন সেজন্য সেদিনই তা মুলতবি করা হয়েছিল।[৫৫] আদতে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর তখন পূর্ব পাকিস্তান সংকটের জন্য সমাধান বের করার উদ্দেশ্যে পাকিস্তান সরকারকে বিচারকার্য বিলম্বিত করতে পরামর্শ দিয়েছিল।[৫৬] ১৮ আগস্টে বাংলাদেশের শুভাকাঙ্খী এক পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার জানায়, পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবকে সামরিক ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হতে সমন জারি করলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং এক পর্যায়ে সরকার জুম্মন আবাদী নামক বিশেষ রক্ষীকে শেখ মুজিবের খাবার ও পানিতে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিল, যা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। শুভাকাঙ্খীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে হত্যাচেষ্টার খবরটি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় সেনাবাহিনী সেই বিশেষ রক্ষীকে হত্যা করে।[৫৭] ১৯ আগস্টে প্রথমবারের মতো শেখ মুজিব আদালতের সামনে হাজির হন। তখন তার পক্ষে আইনজীবী নিযুক্তের সুযোগ দেওয়া হলে তিনি তার দলের কামাল হোসেনকে চেয়েছিলেন, কিন্তু তা সম্ভব না হওয়ায়[ঘ] তিনি এ কে ব্রোহীকে বাছাই করেন। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করায়[৫৯] মামলা চলাকালে শেখ মুজিব আত্মপক্ষ সমর্থন না করার সিদ্ধান্ত নেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া বিচারের রায়ে শেখ মুজিবের মৃত্যুদণ্ডাদেশ হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন।[৬০]

শেখ মুজিবের পক্ষে স্বাক্ষী হিসেবে বিচারপতি আলভিন রবার্ট কর্নেলিয়াস, রাজনীতিবিদ আবদুল হাফিজ পীরজাদা ও সরকারি কর্মকর্তা এম এম আহমদ সহ একাধিক ব্যক্তিকে ব্রোহী জেরা করতে চাইলে আদালত নাকচ করে দেয়। অভিযুক্ত তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছিলেন।[৬১] বিচারের রায় কি হতে পারে তা অনুমান করতে পেরে তিনি তখন বিচারকার্যে অসহযোগিতা করার মাধ্যমে বিচারের সময় দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছিল।[৩৫] সরকার শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে অন্তত ৫০ জন[৬২] সাক্ষীকে উপস্থিত করেছিল। মামলা চলাকালে তার জাতীয় সদস্যপদ বাতিল করা হয়নি।[৫৫] একই সময় পূর্ব পাকিস্তানে পরিস্থিতি আরো নাজুক হতে থাকলে কর্তৃপক্ষকে বিচারকার্য তড়িঘড়ি করে সমাপ্ত করতে দেখা যায়।[৬৩] বিচারকার্য সম্পন্ন হওয়ার পর ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে সামরিক আদালত শেখ মুজিবকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে।[৬২] তবে বিচারের রায় তখন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।[৩৫] আইনজ্ঞ সুব্রত রায় চৌধুরীর মতে এই বিচারপ্রক্রিয়া অবৈধ ছিল।[৬৪] ইয়াহিয়া কারা কর্তৃপক্ষকে শেখ মুজিবের ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে টেলিগ্রাম পাঠানোর নির্দেশ দেন।[৬৫]

মুক্তিযুদ্ধ ও বিদ্রোহী সরকার

[সম্পাদনা]
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে যশোর জেলায় মিত্রবাহিনী

অপারেশন সার্চলাইটের ফলে পূর্ব পাকিস্তানে পরিকল্পিত গণহত্যা ঘটে।[৬৬] গণহত্যার ফলে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তত ৮০ লাখ মানুষ পালিয়ে গিয়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে।[৬৭] গ্রেফতারের ঘটনার পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়।[৬৮] ২৬ মার্চে পাকিস্তান বেতারে দেওয়া ভাষণে শেখ মুজিব ও তার দলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি দেশদ্রোহিতার অভিযোগ তুলেন।[৬৯][ঙ] তিনি তার দলকে নিষিদ্ধ করেন।[৬৬] একই দিনে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের এম এ হান্নান ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের উদ্যোক্তা আবুল কাশেম সন্দ্বীপ শেখ মুজিবের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা সম্প্রচার করে। এরপর ২৭ মার্চে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী মেজর জিয়াউর রহমান বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে নিজের নামে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।[৭১][চ]

এসবের ফলস্বরূপ ১০ এপ্রিলে তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নির্বাচনে জয়লাভকারী জাতীয় ও প্রাদেশিক সদস্যদের সমর্থনে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করা হয় এবং বন্দী শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়।[৭২] প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাজউদ্দীন বন্দী রাষ্ট্রপতিকে মুক্ত করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করতে থাকেন।[৭৩] এছাড়া জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত শিলিগুড়ি সম্মেলনে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে বিলুপ্ত করে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাখা হয়।[৭৪] তবে এসবের মাঝে শেখ মুজিবের অনুপস্থিতি যুদ্ধের উপর তার প্রভাব বিস্তারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক জগতে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মুখ্য চরিত্র হিসেবে গণ্য হতে থাকেন।[৬৩] ৩ ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ও ভারতের তৈরি মিত্রবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করে আক্রমণ শুরু করে।[৭৫] তারপরের দিন তাজউদ্দীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে প্রেরিত চিঠিতে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতিপ্রদানের জন্য অনুরোধ করেন, ফলে ৬ ডিসেম্বরে ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।[৭৩] প্রতিপক্ষের আক্রমণের ফলে ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তান আত্মসমর্পণ করে।[৬৮] ১৮ ডিসেম্বর থেকে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ঢাকা থেকে পরিচালিত হতে থাকে।[৭৬]

প্রতিক্রিয়া

[সম্পাদনা]
(বামদিক থেকে) ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধান নিকোলাই পদগর্নি ও যুগোস্লাভ রাষ্ট্রপতি জোসিপ ব্রজ টিটো।

শেখ মুজিবের বন্দী হওয়ার সংবাদ পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী)-এর চেয়ারম্যান আবদুল হামিদ খান ভাসানী স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন "আল্লাহ দেশকে রক্ষা করবেন"।[৭৭] ২ এপ্রিল ১৯৭১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রপতি নিকোলাই পদগর্নি ইয়াহিয়াকে পাঠানো চিঠিতে শেখ মুজিবের গ্রেফতারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।[৭৮] গ্রেফতারের কয়েক মাসের মধ্যে পাকিস্তানের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান শেখ মুজিবের সাথে কথা বলে সমঝোতা করার মাধ্যমে দেশকে বাঁচানোর পরামর্শ দিয়ে ইয়াহিয়াকে দুইবার চিঠি পাঠিয়েছিলেন।[৭৯] শেখ মুজিবের বিচারকার্য শুরু করার সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী শরণ সিং পাকিস্তানকে গুরুতর পরিণতির ব্যাপারে সতর্ক করে। ৮ আগস্টে[৮০] ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন বাঁচানোর জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চব্বিশটি দেশের প্রতি আহ্বান জানায়।[৫২] ১০ আগস্টে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের সিদ্ধান্তের খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘ ও পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর হস্তক্ষেপ কামনা করে।[৮১] ১৩ আগস্টে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বক্তৃতায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বলেন যে অবৈধ রাষ্ট্রপতির অধিকার নেই জনগণের রায়ে নির্বাচিত শেখ মুজিবের বিচার করার।[৫৩] ২০ অক্টোবরে যুগোস্লাভিয়ার রাষ্ট্রপতি জোসিপ ব্রজ টিটো ব্যক্ত করেন যে ভারতীয় উপমহাদেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য শেখ মুজিবের মুক্তি গুরুত্বপূর্ণ।[৮২]

১৭ আগস্টে আন্তর্জাতিক জুরিস্ট কমিশন পাকিস্তান সরকারের সিদ্ধান্তে প্রতিবাদ জানায়।[৮৩][৬৪] ৪ নভেম্বরে[৮৪] পাকিস্তানের বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিরা একত্রে শেখ মুজিবের মুক্তি চেয়ে বিবৃতি প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে স্বাক্ষরদানকারীদের মধ্যে ছিলে রাজনীতিবিদ আসগর খান, লেখক ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, রাজনীতিবিদ সি আর আসলাম, সাংবাদিক মাজহার আলী খান, শ্রমিক নেতা মির্জা ইব্রাহিম সহ আরও অনেকে। অন্যদিকে ইয়াহিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে জনগণ চাইলে তিনি শেখ মুজিবকে মুক্তি দিবেন।[৮৫] ১১ আগস্টে ব্রিটেনের লন্ডনের হাইড পার্কে শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে আয়োজিত সভায় অন্তত ১৫,০০০ মানুষ অংশগ্রহণ করে। ১৩ আগস্টে ভারতের কলকাতায় তার মুক্তির দাবিতে মার্কিন ও সোভিয়েত দূতাবাসের সামনে ৫,০০০ বুদ্ধিজীবী বিক্ষোভ করে।[৮১] আগস্টে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রেরিত পত্রে বাংলাদেশ লীগ অব আমেরিকা আশঙ্কা প্রকাশ করে যে সম্ভবত শেখ মুজিবকে ৩১ মার্চের পূর্বে হত্যা করা হয়েছে, কেননা পাকিস্তান সেনাবাহিনী তার অস্তিত্বের কোনো অকাট্য প্রমাণ হাজির করেনি। পত্রে দাবি করা হয়েছিল যে সংবাদপত্রে প্রকাশিত করাচী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বন্দী শেখ মুজিবের আলোকচিত্রটি আদতে তার গ্রেফতারের ঘটনার আগে তোলা। এছাড়া পত্রে দাবি করা হয় যে সামরিক ট্রাইব্যুনালে তাকে নিঃসন্দেহে বিশ্বাসঘাতক ঘোষণা দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে যেহেতু পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি তাকে ইতোমধ্যে বিশ্বাসঘাতক আখ্যা দিয়েছেন।[৮৬] ১৩ সেপ্টেম্বরে শেখ মুজিবকে সমর্থন করে যুক্তরাজ্যের প্রাক্তন রাজ্যসচিব আর্থার বটমলি মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোকে পাকিস্তানের উপর চাপ দেওয়ার জন্য বলেন।[৮২] ৫ অক্টোবরে সোভিয়েত আফ্রো-এশীয় সংহতি কমিটি শেখ মুজিবের বিচারকে "প্রসহন" হিসেবে আখ্যায়িত করে।[৮৭]

পরিণতি

[সম্পাদনা]

মুক্তি

[সম্পাদনা]
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ।

যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর শেখ মুজিবের মুক্তির বিষয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়,[৮৮] তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায় এবং তার মুক্তির বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের উপর চাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে।[৬৮] ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিব দাবি করেছিলেন যে জুলফিকার আলী ভুট্টো তাকে বলেছিলেন যে ইয়াহিয়া পদত্যাগের পূর্বে জালিয়াতি করে শেখ মুজিবের মৃত্যুদণ্ডাদেশ সম্পন্ন করার জন্য ১৯৭১ সালের অক্টোবরে আদেশ দেওয়ার স্বাক্ষরিত জাল নথি তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভুট্টোর সম্মতি ছিল না বিধায় তা করা যায়নি।[৮৯] শেখ মুজিবকে কী করা হবে সে ব্যাপারে জানতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী আগ্রহী ছিলেন, তাই ইন্দিরা পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যসচিব মোজাফফর হোসেনের স্ত্রীর মাধ্যমে ভুট্টোর সাথে লন্ডনে যোগাযোগ করেন, যিনি ১৮ ডিসেম্বরের পূর্বে বিমানে করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পথে ব্রিটেনের লন্ডনে যাত্রাবিরতিতে ছিলেন। ভুট্টো মোজাফফরের স্ত্রীকে জানান যে শেখ মুজিবকে মুক্তি দেওয়া হবে এবং তার বিনিময়ে ভারতকে কিছু দিতে হবে।[৯০] ২০ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়ার পতনের পর ভুট্টো পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হোন।[৯১] ২১ ডিসেম্বরে ভুট্টো জানিয়েছিলেন যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেখ মুজিবকে গৃহবন্দী করা হবে।[৮৮] এর আগে ১৫ ডিসেম্বরে কারাগারের কিছু কর্মকর্তা শেখ মুজিবকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে মিয়ানওয়ালীর কয়েদীদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিল যে পূর্ব কমান্ডের প্রধান মিয়ানওয়ালীর আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুর জন্য শেখ মুজিবকে দায়ী করে তাকে হত্যা করতে কয়েদীদের প্ররোচিত করা হয়েছিল। ফলে ১৬ ডিসেম্বর রাতে তাকে কারাগার থেকে গোপনে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।[৩০]

এরপর ২৬ ডিসেম্বরে শেখ মুজিবকে গোপনে কারাপ্রহরী হাবিব আলী একটি গেস্ট হাউজে নিয়ে যান।[৯২][৯৩] ২৭ ডিসেম্বরে চকলালায় রাষ্ট্রপতি ভুট্টোর সাথে তার প্রথম দেখা হয়। তখন তিনি শেখ মুজিবকে সংযুক্ত আরব প্রজাতন্ত্রের আদলে দুই দেশের মধ্যে একটি শিথিলতম সংঘরাষ্ট্র তথা মিত্রসংঘ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেই সময় অর্থ, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা অভিন্ন রেখে মিত্রসংঘ প্রতিষ্ঠার জন্য আলোচনা করা হয়েছিল।[৯৪][৯৫] এরপর ১ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে তাকে সাহিলায় অবস্থিত একটি বাংলোয় নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে তার সাথে ভুট্টোর আবার দেখা হয়েছিল।[৯৬][৯৩] শেখ মুজিবের অনুরোধে ভুট্টো কামাল হোসেনকে হরিপুর কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে তার সাথে দেখা করান।[৯৩] শেখ মুজিবের সাথে একাধিকবার বৈঠকের পর জুলফিকার আলী ভুট্টো তাকে মুক্তি দিতে রাজি হন।[৯৭] ৫ জানুয়ারিতে করাচিতে অনুষ্ঠিত জনসভায় পাকিস্তানের জনসাধারণ শেখ মুজিবের মুক্তির ব্যাপারে সায় দিলে তার মুক্তির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।[৮৮] ৭ জানুয়ারিতে ভুট্টো আলোচনার ব্যাপারে স্মরণ করিয়ে দিলে শেখ মুজিব ব্যাপারটা গোপন রেখে অপেক্ষা করতে বলেছিলেন।[৯৪]

স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

[সম্পাদনা]
১৯৭২ সালে ঢাকায় স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে শেখ মুজিবুর রহমান।

শেখ মুজিব মুক্তি পাওয়ার পর ৮ জানুয়ারিতে বিমানে করে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে পৌঁছান।[৪৬] বিমানে করে পাকিস্তান থেকে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার সময় সেই বিমানে পাকিস্তান হকি দলের মাঝে তাকে গুপ্তহত্যার উদ্দেশ্যে কিছু ছদ্মবেশী ব্যক্তি রওনা করেন। ভারতীয় গোয়েন্দারা গুপ্তহত্যার খবর সম্পর্কে অগ্রিম জেনে যাওয়ায় তারা লন্ডন ও দিল্লিতে তার উপর নজরদারি ও নিরাপত্তা বাড়িয়ে দেয়।[৯৮] পৌঁছানোর পূর্বে পাকিস্তান সরকার টেলিগ্রাম করে যুক্তরাজ্য সরকারকে জানিয়ে দিয়েছিল যে শেখ মুজিব অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত যেন তার লন্ডনে পৌঁছানোর সংবাদ প্রকাশ করা না হয়। সেখানে তিনি ২৬ ঘণ্টা অবস্থান করেন।[৯৯] লন্ডনে পৌঁছানোর পর ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ তাকে অভিনন্দন জানান এবং তাদের মাঝে একটি বৈঠক হয় যেখানে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক এবং নতুন দেশটির স্বীকৃতির বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছিল।[১০০] লন্ডনে যাওয়ার পর যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম এম রেজাউল করিম শেখ মুজিবকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার খবর প্রথম জানিয়েছিলেন।[১০১][ছ]

সেখানে তিনি সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন। সেখানেও তিনি জানান যে বাংলাদেশে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত ভুট্টোর প্রস্তাবের কোনো জবাব তিনি দিতে পারবেন না।[১০২] তার লন্ডন থেকে বাংলাদেশ যাত্রা করার সম্ভাব্য তারিখ ও সময় গোপন রাখা হয়েছিল।[৯৯] ৯ জানুয়ারিতে টেলিফোনে ইন্দিরা দিল্লিতে যাত্রাবিরতি নেওয়ার প্রস্তাব দিলে শেখ মুজিব গ্রহণ করেন।[৮৮] একই দিনে তিনি বিমানে করে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে ১০ জানুয়ারির সকালে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের বিমান ভারতের দিল্লিতে থামার পর[৪৬][১০৩] সেখানে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় এবং তিনি সেখানে জনতার অনুরোধে বাংলায় ভাষণ দেন।[১০৪] সেদিনই ইন্দিরার সাথে শেখ মুজিবের প্রথম দেখা হয়েছিল।[১০৫] সফরের অন্যতম যাত্রী সরকারি কর্মকর্তা ফারুক আহমেদ চৌধুরীর মতে দিল্লির পর শেখ মুজিবের কলকাতায় থেমে তারপর সেখান থেকে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করার কথা থাকলেও আকস্মিক পরিকল্পনা পরিবর্তন করে কলকাতা সফর বাতিল করা হয়।[১০৬] একই দিনে দুপুর ১.৪১ টায় ঢাকা পৌঁছানোর মাধ্যমে তিনি সদ্য স্বাধীন মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন।[৪৬][৮৮] বাংলাদেশে ফেরার পর তিনি রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া ভাষণে ভুট্টোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।[১০৭] ১১ জানুয়ারিতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেখ মুজিব বাংলাদেশে অস্থায়ী শাসনতান্ত্রিক আদেশ জারি করে যা ১৯৭০ সালের সাধারণ ও প্রাদেশিক নির্বাচনের বৈধ সদস্যদের নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ গণপরিষদের উপর ভিত্তি করে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন করে। ১২ জানুয়ারিতে শেখ মুজিব বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন।[১০৮]

কিংবদন্তি

[সম্পাদনা]

১৯৭১ সালের মে মাসে তাজউদ্দীন আহমদ ও তার সমর্থকদের সাথে আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাকর্মীদের দ্বন্দ্ব বেড়ে গিয়েছিল। তখন তাজউদ্দীনের বিপক্ষ থেকে গুঞ্জন উঠেছিল যে তিনি ক্ষমতার লোভে শেখ মুজিব যেন পাকিস্তান সরকারের কাছে গ্রেফতার হন সেজন্য ভূমিকা রেখেছেন।[১০৯] স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে শেখ মুজিবের মুক্তি ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ ও প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদের মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব ছিল। মোশতাক বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেয়ে শেখ মুজিবের মুক্তিকে অধিক প্রাধান্য দিতেন।[১১০] শিলিগুড়ি সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির ব্যাপারে আলোচনা হয়েছিল।[৭৪] সম্মেলনে তাজউদ্দীন বক্তৃতায় সে প্রসঙ্গে বলেছিলেন,[১১১]

আমরা স্বাধীনতা চাই। স্বাধীনতা পেলেই বঙ্গবন্ধুকে আমাদের মাঝে পাব। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যদি খোদা না করুন, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু হয় পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে, তাইলে বঙ্গবন্ধু শহীদ হয়েও স্বাধীন বাঙ্গালী জাতির ইতিহাসে অমর ও চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন। তিনি একটি নতুন জাতির জনক হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃত হবেন। ব্যক্তি মুজিব, ব্যক্তি নজরুল, তাজউদ্দীন, কামরুজ্জামান কেউ হয়ত বেঁচে থাকবেন না। একদিন না একদিন আমাদের সকলকেই মরতে হবে।

— তাজউদ্দীন আহমদ, শিলিগুড়ি সম্মেলন, ৬ জুলাই ১৯৭১

অন্যদিকে ৩০ জুলাইয়ের পর মোশতাক কলকাতায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেলকে বন্দী শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তিদানের বিনিময়ে দুই অঞ্চলের মধ্যে মিত্রসংঘ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের বার্তা প্রেরণ করেছিলেন।[১১১] ফলে ১৬ ডিসেম্বরের পর মোশতাককে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে পদচ্যুত করা হয়।[১১২] শেখ মুজিবের বিচারের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ "শেখ মুজিবস ট্রায়াল" শিরোনামে একটি পোস্টার প্রকাশ করেছিল। বাঙালিরা পাকিস্তান কর্তৃক তার বিচারের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি, সেজন্য তারা এর বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন পরিচালনা করেছিল। তাদের বিক্ষোভ ও মিছিলে "শেখ মুজিবের শেখ মুজিবের, মুক্তি চাই মুক্তি চাই" স্লোগান তখন বহুলভাবে ব্যবহৃত হতো।[৫৬] অর্গানাইজারের প্রতিবেদনে করা দাবি অনুযায়ী সেপ্টেম্বরে কারাগারে বন্দি শেখ মুজিবকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিকট সন্দ্বীপ হস্তান্তর করার বিনিময়ে তাকে মুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়ার উদ্দেশ্যে দুইবার দেখা করতে চাইলে তিনি ফারল্যান্ডের নিকট দেখা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।[১৩]

শেখ মুজিবের গ্রেফতার সম্পর্কে একটি প্রচলিত বিতর্ক হলো, তিনি গ্রেফতারের আগে পালিয়ে গিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেলেও তা না করে আত্মসমর্পণ করেছেন। তবে শেখ মুজিবের মতে তিনি তখন পালিয়ে গেলে সেনাবাহিনী তাকে খুঁজে বের করার জন্য ঢাকাবাসীর উপর নির্যাতন করত।[১১৩] স্বাধীনতা-পরবর্তী মুজিবী আমলে রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রাক্তন সদস্য এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের রাজনীতিবিদ আ. স. ম. আবদুর রব অভিযোগ করেছিলেন যে ১৯৭১ সালে শেখ মুজিব স্বেচ্ছায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করেছিলেন, তাই তিনি ইতিহাসের সর্বপ্রথম রাজাকার। তার এই বক্তব্য তখন বিতর্ক সৃষ্টি করে।[৭৭] সাংবাদিক মোহাম্মদ মোদাব্বেরের মতে যেহেতু একটি বিপ্লবের নেতা স্বেচ্ছায় সরকারের নিকট হার মেনে নেয় না, সেহেতু শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ার পর বাঙালি তরুণদের মনে এই নিয়ে দ্বিধা দেখা দিয়েছিল যে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমর্থক না হওয়ায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিকট রহস্যজনকভাবে আত্মসমর্পণ করেছিলেন কিনা।[১১৪] ইতিহাসবিদ বদরুদ্দীন উমর শেখ মুজিবের গ্রেফতারের ঘটনাকে আত্মসমর্পণ আখ্যা দেন। তার মতে আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থনকারী বুদ্ধিজীবীরা এটিকে গ্রেফতার বললেও আদতে এটি শেখ মুজিবের আত্মসমর্পণ, কেননা তিনি সবাইকে পালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে নিজে বাড়িতে বসে ছিলেন; যা ইঙ্গিত দেয় যে তিনি সেনাদের আসার অপেক্ষায় ছিলেন।[১১৫] এছাড়া অনুপস্থিতির ফলে শেখ মুজিব স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে পারেননি বিধায় উমর তার আত্মসমর্পণের সমালোচনা করেন। তবে গবেষক গোলাম মুরশিদের মতে যেহেতু শেখ মুজিব বামপন্থীদের মতো বিপ্লবী নন বরং একজন সংবিধানবাদী ছিলেন, সেহেতু উমরের সমালোচনা যৌক্তিক নয়।[৩৪]

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর শেখ মুজিবের এবং তাজউদ্দীনের পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠে। ২০২৫ সালের মার্চে তাজউদ্দীনের মেয়ে শারমিন আহমদ দাবি করেন যে আইনজীবী ও আওয়ামী লীগ নেতা আমীর-উল ইসলাম তাজউদ্দীনকে জানিয়েছিলেন যে শেখ মুজিব তার লুকিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে গ্রেফতার হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন।[১১৬] ৪ জুন ২০২৫ সালে জাতীয় নাগরিক পার্টির রাজনীতিবিদ সারজিস আলম বলেন যে প্রাক-স্বাধীনতা আমলে শেখ মুজিবের অবদান থাকলেও তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় স্বেচ্ছায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক বন্দিত্ব গ্রহণ করে যুদ্ধের মাঠে অনুপস্থিত ছিলেন।[১১৭]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. ↑ বঙ্গবন্ধু নামে পরিচিত।
  2. ↑ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা কে দিয়েছিলেন তা নিয়ে বিতর্ক বিদ্যমান।[৩৬]
  3. ↑ তার আরেক ছেলে শেখ কামাল এবং দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা অপারেশন সার্চলাইটের আগেই বাসভবন ছেড়ে চলে গিয়েছিল।[৩৯]
  4. ↑ ১৯৭১ সালের এপ্রিলে কামাল হোসেনকে পাকিস্তান সরকার গ্রেফতার করে।[৫৮]
  5. ↑ রাষ্ট্রপতি অসহযোগ আন্দোলনে শেখ মুজিব ও তার দলের কর্মকাণ্ডকে কারণ হিসেবে দেখিয়েছিলেন।[৭০]
  6. ↑ যদিও চাপে পড়ে তিনি ৩০ মার্চে শেখ মুজিবুর রহমানের নামে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।[৭১]
  7. ↑ যদিও কামাল হোসেনের মতে তার আগেই মিয়ানওয়ালী কারাগারের ডিআইজি খবরটি শেখ মুজিবুর রহমানকে জানিয়েছিলেন।[১০১]

উদ্ধৃতি

[সম্পাদনা]
  1. ↑ মামুন, মুনতাসীর (২০২০) [২০১৯]। বঙ্গবন্ধুর জীবন: ছাত্র রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতি (১৯২০-১৯৪৯)। অনন্যা। পৃ. ২১, ২৪। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৮৪-৪৩২-৭১৭-৭।
  2. ↑ সাঈদ ২০০৫, পৃ. ১৩–১৫।
  3. ↑ হাসান, মোরশেদ শফিউল (২০১৮) [২০১৪]। স্বাধীনতার পটভূমি ১৯৬০ দশক। অনুপম প্রকাশনী। পৃ. ১১২। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৮৪-৪০৪-৩৬৯-৫।
  4. ↑ সাঈদ ২০০৫, পৃ. ২৮।
  5. ↑ সাঈদ ২০০৫, পৃ. ৩৯।
  6. ↑ সাঈদ ২০০৫, পৃ. ৪৪।
  7. ↑ Rashiduzzaman, M. (১৯৭০)। "The Awami League in the Political Development of Pakistan"। Asian Survey। ১০ (7)। University of California Press: ৫৭৪–৫৮৭।
  8. ↑ খান, মিজানুর রহমান (২৬ মার্চ ২০২০)। "ব্রিটিশ নথিতে মুজিব"। প্রথম আলো।
  9. ↑ সাঈদ ২০০৫, পৃ. ৬৩।
  10. ↑ শামসুদ্দিন, একেএম (১৭ মার্চ ২০২০)। "বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়ার প্রহসনমূলক বৈঠক"। যুগান্তর। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২।
  11. ↑ সাঈদ ২০০৫, পৃ. ৬৪।
  12. ↑ আহমদ, মহিউদ্দিন (২০১৭)। আওয়ামী লীগ: যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১। প্রথমা প্রকাশন। পৃ. ৩৫–৩৬। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৮৪-৯২৭৪২-৪-৭।
  13. 1 2 "Mujib refused to allow U.S. base in Bay of Bengal"। অর্গানাইজার (ইংরেজি ভাষায়)। ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। পৃ. ৬।
  14. ↑ সাঈদ ২০০৫, পৃ. ৬৬।
  15. ↑ আবু মো. দেলোয়ার হোসেন এবং এ.টি.এম যায়েদ হোসেন (২০১২)। "অসহযোগ আন্দোলন ১৯৭১"। ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর (সম্পাদকগণ)। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। আইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১। ওসিএলসি 883871743। ওএল 30677644M।
  16. ↑ হক, সাজিদুল (৩ মার্চ ২০২১)। "৩ মার্চ ১৯৭১: এল স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপরেখা"। বিডিনিউজ২৪.কম। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২।
  17. ↑ সাঈদ ২০০৫, পৃ. ৬৯।
  18. ↑ আর্যু ২০০৯, পৃ. ৪৩।
  19. ↑ সাঈদ ২০০৫, পৃ. ৮০।
  20. ↑ চৌধুরী ১৯৯১, পৃ. ১৬২–১৬৩।
  21. ↑ হক, সাজিদুল (২৩ মার্চ ২০২১)। "২৩ মার্চ ১৯৭১: 'পাকিস্তান দিবস' মুছে গেল প্রতিরোধের পতাকায়"। বিডিনিউজ২৪.কম। ২৪ মার্চ ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২।
  22. 1 2 ব্লেয়ার, হ্যারি ডাব্লিউ (১৯৭১)। "Sheikh Mujib and Deja Vu in East Bengal: The Tragedies of March 25"। ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি (ইংরেজি ভাষায়)। ৬ (৫২)।
  23. ↑ সলিম ১৯৯৮, পৃ. ২৭–২৮।
  24. ↑ "বঙ্গবন্ধুর জেলজীবনের খতিয়ান"। দৈনিক ইত্তেফাক। ১৭ জুন ২০২১।
  25. ↑ জামান ২০০৮, পৃ. ৮৬।
  26. 1 2 3 4 আহমদ, মহিউদ্দিন (২৫ মার্চ ২০২৩)। "বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যেভাবে গ্রেপ্তার হলেন"। প্রথম আলো। ২৫ মার্চ ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  27. 1 2 "বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারে চালানো হয়েছিলো 'অপারেশন বিগ বার্ড'"। ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশন। ২৫ মার্চ ২০১৯।
  28. ↑ উমর, বদরুদ্দীন (২০০৬)। The Emergence Of Bangladesh (ইংরেজি ভাষায়)। খণ্ড ২। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। পৃ. ৩৩৩। আইএসবিএন ০-১৯-৫৯৭৯০৮-৭।
  29. ↑ "২৫শে মার্চ রাতে যেভাবে গ্রেফতার করা হয়েছিলো শেখ মুজিবকে"। বিবিসি। ৩১ মার্চ ২০১৭। ৩১ মার্চ ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  30. 1 2 3 খান, মাসুদ হাসান (২৪ মার্চ ২০২১)। "স্বাধীনতার ৫০ বছর: শেখ মুজিব যেদিন পাকিস্তানের কারাগারে হত্যার ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন"। বিবিসি। ২৪ মার্চ ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  31. 1 2 3 জামান ২০০৮, পৃ. ৮৭।
  32. ↑ মাসকারেনহাস ১৯৮৯, পৃ. ১০৬।
  33. ↑ সলিম ১৯৯৮, পৃ. ২৮।
  34. 1 2 মুরশিদ, গোলাম (২০১৬) [২০১০]। মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর: একটি নির্দলীয় ইতিহাস। প্রথমা প্রকাশন। পৃ. ৭৮। আইএসবিএন ৯৭৮৯৮৪৮৭৬৫৩৭১।
  35. 1 2 3 4 শ্যানবার্গ, সিডনি এইচ (১৮ জানুয়ারি ১৯৭২)। "He Tells Full Story of Arrest and Detention"। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস (ইংরেজি ভাষায়)।
  36. ↑ শুভ্র, সৌমিত্র (২৬ মার্চ ২০২৫)। "বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে এখনো বিতর্ক কেন?"। বিবিসি।
  37. ↑ আর্যু ২০০৯, পৃ. ৪৯–৫০।
  38. ↑ সলিম ১৯৯৮, পৃ. ২৯।
  39. 1 2 শেখ, এমরান হোসাইন (২৬ মার্চ ২০২২)। "বন্দিদশায় কেমন ছিল বঙ্গবন্ধুর পরিবার"। বাংলা ট্রিবিউন।
  40. ↑ সলিম ১৯৯৮, পৃ. ৩১।
  41. ↑ সলিম ১৯৯৮, পৃ. ৩২।
  42. 1 2 সলিম ১৯৯৮, পৃ. ৩৩।
  43. ↑ জামান ২০০৮, পৃ. ৮৮।
  44. 1 2 3 4 সাইয়িদ ২০১১, পৃ. ৩৪।
  45. ↑ "MUJIB ARRESTED"। ডেইলি বিজনেস পোস্ট (ইংরেজি ভাষায়)। ২৮ মার্চ ১৯৭১। পৃ. ১।
  46. 1 2 3 4 5 "লায়ালপুর কারাগার থেকে ঢাকা, ফিরে দেখা সেইসব দিনগুলো"। যায়যায়দিন। ১০ জানুয়ারি ২০২১। ১৩ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  47. ↑ সলিম ১৯৯৮, পৃ. ৩৬।
  48. ↑ সলিম ১৯৯৮, পৃ. ৩৪।
  49. ↑ সলিম ১৯৯৮, পৃ. ৫৫।
  50. ↑ সলিম ১৯৯৮, পৃ. ৩৮।
  51. ↑ সাইয়িদ ২০১১, পৃ. ৩৫।
  52. 1 2 সলিম ১৯৯৮, পৃ. ৪৬।
  53. 1 2 আহসান, সৈয়দ বদরুল (৮ আগস্ট ২০১৯)। "When Pakistan put Bangabandhu on trial"। ঢাকা ট্রিবিউন (ইংরেজি ভাষায়)।
  54. ↑ দে, তপন কুমার (২০১১)। আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও নারীধর্ষণ। জাগৃতি প্রকাশনী। পৃ. ৭১। আইএসবিএন ৯৭৮৯৮৪৮৪১৬৬৩১।
  55. 1 2 সলিম ১৯৯৮, পৃ. ৫০।
  56. 1 2 মুনতাসীর মামুন, সম্পাদক (২০১৩) [২০০৫]। মুক্তিযুদ্ধ কোষ। খণ্ড প্রথম। সময় প্রকাশন। পৃ. ৫৬৪–৫৭১। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৮৪-৮৯৪২-৮৪-০।
  57. ↑ "শেখ মুজিবর রহমানকে বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টা"। বিপ্লবী বাংলাদেশ। খণ্ড ১ম নং ৩য়। ২৯ আগস্ট ১৯৭১।
  58. ↑ হোসেন, এম আই (২০১৪) [২০১৩]। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ: বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ। ইস্টার্ন পাবলিকেশন্স। পৃ. ৯৮।
  59. ↑ সাইয়িদ ২০১১, পৃ. ৩৬।
  60. ↑ সলিম ১৯৯৮, পৃ. ৪৮।
  61. ↑ "পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর বিচার শুরু"। সমকাল। ১০ আগস্ট ২০২১।
  62. 1 2 সলিম ১৯৯৮, পৃ. ৫৪।
  63. 1 2 আহসান, সৈয়দ বদরুল (২০১৪)। From Rebel To Founding Father: Sheikh Mujibur Rahman (ইংরেজি ভাষায়)। নয়াদিল্লি: নিয়োগী বুকস। পৃ. ২৪৭–২৫০। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৩-৮৩০৯৮-১০-১।
  64. 1 2 আর্যু ২০০৯, পৃ. ৫৯।
  65. ↑ সলিম ১৯৯৮, পৃ. ৫৮।
  66. 1 2 চৌধুরী ১৯৯১, পৃ. ১৭০।
  67. ↑ মাসকারেনহাস ১৯৮৯, পৃ. ১২৯।
  68. 1 2 3 "বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস ১০ জানুয়ারি"। বাংলানিউজ২৪.কম। ১০ জানুয়ারি ২০১৯। ১০ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  69. ↑ সাঈদ ২০০৫, পৃ. ২৬২।
  70. ↑ "President Yahya's Broadcast To Nation : AWAMI LEAGUE COMPLETELY BANNED AS POLITICAL PARTY ALL POLITICAL ACTIVITIES IN COUNTRY ALSO PROHIBITED : SEQUEL GRAVE SITUATION SHEIKH MUJIB & HIS PARTY DECLARED ENEMIES OF PAKISTAN"। ডেইলি বিজনেস পোস্ট (ইংরেজি ভাষায়)। ২৭ মার্চ ১৯৭১। পৃ. ১।
  71. 1 2 জামান ২০০৮, পৃ. ৯৪।
  72. ↑ ইশতিয়াক, আহমাদ (১০ এপ্রিল ২০২১)। "১০ এপ্রিল: মুজিবনগর সরকার গঠন ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র দিবস"। দ্য ডেইলি স্টার। ১১ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  73. 1 2 আক্তার, সুলতানা। "মুক্তিযুদ্ধকালীন বঙ্গবন্ধুর মুক্তি প্রসঙ্গ: তাজউদ্দীন আহমদের ভূমিকা"। দ্য জাহাঙ্গীরনগর রিভিউ, পার্ট সি। ৩০। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: ১৬৯–১৭৬। আইএসএসএন 2306-3920।
  74. 1 2 হক, মুহাম্মদ লুৎফুল (৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪)। "মুক্তিযুদ্ধের অজানা অধ্যায়"। প্রথম আলো।
  75. ↑ সাইয়িদ ২০১১, পৃ. ১০৬।
  76. ↑ জামান ২০০৮, পৃ. ২১১।
  77. 1 2 হোসেন, খোন্দকার মকবুল (২০০২)। স্বাধীনতা যুদ্ধের আলোকে জিয়া খালেদা বি এন পি। জ্ঞান বিতরণী। পৃ. ৫৪, ৫৬।
  78. ↑ সলিম ১৯৯৮, পৃ. ৩৭।
  79. ↑ আহসান, সৈয়দ বদরুল (২৮ অক্টোবর ২০২০)। "Ayub Khan: the story of a dictator"। দি এশিয়ান এজ (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৫ নভেম্বর ২০২৫।
  80. ↑ আর্যু ২০০৯, পৃ. ৫৮।
  81. 1 2 লুৎফুল হক, মুহাম্মদ (১৫ ডিসেম্বর ২০১৯)। "পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর বিচার বন্ধ ও মুক্তির দাবিতে আবেদন"। প্রথম আলো। ১৩ জুলাই ২০২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  82. 1 2 আর্যু ২০০৯, পৃ. ৫৪।
  83. ↑ সলিম ১৯৯৮, পৃ. ৪৭।
  84. ↑ সাইয়িদ ২০১১, পৃ. ৭৫।
  85. ↑ সলিম ১৯৯৮, পৃ. ৫২।
  86. ↑ হাসান হাফিজুর রহমান, সম্পাদক (২০০৯)। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র। খণ্ড ৪র্থ। হাক্কানী পাবলিশার্স। পৃ. ৩০২।
  87. ↑ সাইয়িদ ২০১১, পৃ. ৫৯।
  88. 1 2 3 4 5 ইশতিয়াক, আহমাদ (১০ জানুয়ারি ২০২৩)। "অবশেষে মহানায়কের ঘরে ফেরা"। দ্য ডেইলি স্টার। ৯ জানুয়ারি ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  89. ↑ সলিম ১৯৯৮, পৃ. ৫৯।
  90. ↑ হাবিবা, উম্মে (২০২৪)। মো. আলাউদ্দিন মজুমদার (সম্পাদক)। "মুজিব-ইন্দিরার রাজনৈতিক সম্পর্ক: একটি বিশ্লেষণ"। দ্য চিটাগং ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব সোশ্যাল সায়েন্সেস। ৩৪। চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়: ১১২।
  91. ↑ সাইয়িদ ২০১১, পৃ. ১০৮।
  92. ↑ সাইয়িদ ২০১১, পৃ. ১০৮–১০৯।
  93. 1 2 3 সাইয়িদ ২০১১, পৃ. ১১৭।
  94. 1 2 ওয়ালপার্ট, স্ট্যানলি (১৯৯৩)। "President Bhutto "Picks Up the Pieces" (December 1971-July 1972)"। Zulfi Bhutto of Pakistan: His Life and Time (ইংরেজি ভাষায়)। নিউ ইয়র্ক: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস। পৃ. ১৭৪–১৭৫।
  95. ↑ সলিম ১৯৯৮, পৃ. ৬১।
  96. ↑ সাইয়িদ ২০১১, পৃ. ১০৯–১১০।
  97. ↑ সাইয়িদ ২০১১, পৃ. ১২৮।
  98. ↑ খান, আবেদ (৬ আগস্ট ২০১৯)। "পাকিস্তান থেকে মুক্ত বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পাঠানো হয় গুপ্তঘাতক"। কালের কণ্ঠ। ৮ আগস্ট ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  99. 1 2 আহমদ, মহিউদ্দিন (১০ জানুয়ারি ২০২৩)। "লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর ২৬ ঘণ্টা"। প্রথম আলো। ১০ জানুয়ারি ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  100. ↑ হাসান, মেহেদী (১০ জানুয়ারি ২০২৪)। "ন্যাশনাল আর্কাইভসের নথিতে বঙ্গবন্ধুর লন্ডন সফর"। কালের কণ্ঠ। ৬ আগস্ট ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  101. 1 2 শেখ, এমরান হোসাইন (১৬ ডিসেম্বর ২০১৭)। "বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীনের খবর পেয়েছিলেন যখন"। বাংলা ট্রিবিউন।
  102. ↑ "লন্ডনে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু"। বণিক বার্তা। ১১ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ জুলাই ২০২৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  103. ↑ ভট্টশালী, অমিতাভ (১০ জানুয়ারি ২০২৪)। "কারামুক্তির পর দিল্লিতে নেমে যা বলেছিলেন শেখ মুজিব"। বিবিসি। ১০ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  104. ↑ নয়ন, তানজিমুল (১০ জানুয়ারি ২০১৯)। "বঙ্গবন্ধুর মুখে বাংলা ভাষণ শুনতে চাইলেন ভারতের জনগণ (ভিডিও)"। বাংলা ট্রিবিউন। ৬ আগস্ট ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  105. ↑ "শেখ মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধীর প্রথম দেখা হওয়ার দিনটি"। বিবিসি। ১০ জানুয়ারি ২০২০। ২০ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  106. ↑ চৌধুরী, ফারুক আহমেদ (১০ জানুয়ারি ২০২২)। "বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে, স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পথে"। প্রথম আলো। ১০ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  107. ↑ "স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ"। দৈনিক ইনকিলাব। ১৫ মার্চ ২০২৩। ১৬ মার্চ ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  108. ↑ সাইয়িদ, আবু; বেনু, শাহজাহান মৃধা (২০১৮)। দিনলিপি: বঙ্গবন্ধুর শাসন সময় ১৯৭২। অনন্যা। পৃ. ২৩–২৪। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৮৪-৪৩২-৫০৬-৭।
  109. ↑ জামান ২০০৮, পৃ. ১২১।
  110. ↑ জামান ২০০৮, পৃ. ১৩২–১৩৩।
  111. 1 2 পারভেজ, আজিজুল (১ ডিসেম্বর ২০২১)। "একাত্তরেও ষড়যন্ত্র: ধরা পড়ে গৃহবন্দী ছিলেন খন্দকার মোশতাক"। ঢাকা প্রকাশ। ২২ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২২ ডিসেম্বর ২০২৪।
  112. ↑ জামান ২০০৮, পৃ. ১৩৭।
  113. ↑ "২৫ মার্চ, ১৯৭১ 'অপারেশন বিগ বার্ড'"। বায়ান্ননিউজ.কম। ২৫ মার্চ ২০২২।
  114. ↑ মোদাব্বের, মোহাম্মদ (১৯৮১)। ইতিহাস কথা কয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। পৃ. ২৭১।
  115. ↑ "True history of Liberation War has not been written: Badruddin Umar"। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (ইংরেজি ভাষায়)। ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪।
  116. ↑ "'মুজিব ভাই তো গোসল করে পরিপাটি হয়ে গ্রেফতার হওয়ার জন্য রেডি'"। যুগান্তর। ২৩ মার্চ ২০২৫।
  117. ↑ "মুক্তিযুদ্ধের সময় শেখ মুজিব ইচ্ছাকৃতভাবে কারাবন্দি ছিলেন: সারজিস"। সারাবাংলা.নেট। ৪ জুন ২০২৫।

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]