বিষয়বস্তুতে চলুন

শিশু যত্নে সংক্রমণ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্করা যখন ঘন ঘন হাত ধোয়, বিশেষ করে খাওয়ার আগে, তখন সংক্রমণের বিস্তার ঘটার সম্ভাবনা কম থাকে।

শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রে সংক্রমণ হলো শিশু পরিচর্যা চলাকালীন সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া। সাধারণত ডে-কেয়ার বা স্কুলে শিশুদের একে অপরের সংস্পর্শে আসার কারণে এটি ঘটে। যখন একটি শিশু পরিচর্যা পরিবেশে অনেক শিশু একত্রিত হয়, তখন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি থেকে পুরো গ্রুপে রোগটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। সাধারণত ছড়িয়ে পড়া রোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ইনফ্লুয়েঞ্জা সদৃশ অসুস্থতা এবং আন্ত্রিক রোগ, যেমন ডায়াপার ব্যবহারকারী শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া। এই রোগগুলো ঠিক কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে তা অনিশ্চিত, তবে হাত ধোয়া সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে দেয় এবং অন্যান্য উপায়ে পরিচ্ছন্নতা বৃদ্ধি করলেও সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।

সামাজিক চাপের কারণে, শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রের কর্মীরা পরামর্শ দিলে বাবা-মায়েরা তাদের অসুস্থ শিশুদের অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে রাজি হতে পারেন। এমনকি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের (চিকিৎসক) পরামর্শের বিরুদ্ধে হলেও তারা এটি করেন। বিশেষ করে, পরিচর্যা কেন্দ্রের বাইরের শিশুদের তুলনায় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা শিশুদের অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। [তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

সংক্রমণের কৌশল

[সম্পাদনা]
একজন অসুস্থ ব্যক্তি হাঁচি দেওয়ার সময় নাক না ঢাকলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে, বিশেষ করে শিশু পরিচর্যা পরিবেশে।

"শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রে সংক্রমণ"-এর ধারণার পেছনে মূল যুক্তি হলো এমন একটি জায়গা যেখানে অনেক শিশু একে অপরের সংস্পর্শে আসে, সেটি সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে। এটি এমন একটি জায়গা যেখান থেকে সংক্রমণ এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়ে। [তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

যেসব গ্রুপ নিয়মিত হাত ধোয়, তাদের মধ্যে ফ্লু এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের প্রকোপ কম দেখা যায়। তবে হাত ধোয়া রোগ ছড়ানোর প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা ছাড়া রোগটি আসলে কোন পথে ছড়ায় তা স্পষ্ট নয়।[]

মানব পরিপাকতন্ত্র সংক্রান্ত রোগ, যেমন ডায়রিয়া বা অন্যান্য আন্ত্রিক রোগ প্রায়ই মল-মুখ পথ দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। যেসব জায়গায় শিশুদের টয়লেট প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ হয়নি, সেখানে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।[] ডায়াপার, ডায়াপার পরিবর্তনের জন্য সীমাবদ্ধ জায়গা এবং শিশুদের অপরিচ্ছন্ন অভ্যাস এসব সংক্রমণ ছড়াতে সাহায্য করে।[] ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ প্রায়ই এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির সংস্পর্শে, খাবার খাওয়ার সময় বা প্রাণীদের উপস্থিতির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।[] আন্ত্রিক রোগের কারণ হওয়া ভাইরাসগুলো কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে তা নির্ধারণ করা কঠিন।[] হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি সংক্রান্ত পর্যালোচনাগুলোতে দেখা গেছে যে, শিশু পরিচর্যার সময় এটি কীভাবে ছড়ায় তা নির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়নি। তবে এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এটি শিশু পরিচর্যা পরিবেশে সহজেই ছড়ায় এবং এটি প্রতিরোধের জন্য সুপারিশ করা বেশ কঠিন।[]

মহামারী সংক্রান্ত তথ্য

[সম্পাদনা]

শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রের সংক্রমণ একটি জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ। কারণ এটি প্রতিটি শিশুর স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এবং শিশুরা পরিচর্যা কেন্দ্র থেকে যে সংক্রমণ পায় তা তাদের পরিবার এবং সম্প্রদায়ের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।[] সাধারণত, যারা শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রে যায় তাদের সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা যারা যায় না তাদের তুলনায় ২-৩ গুণ বেশি।[]

প্রতিরোধ

[সম্পাদনা]

ব্যক্তিরা যখন পরিচর্যা পরিবেশে সংক্রমণ নিয়ে আসে এবং সেখানে সংক্রামক জীবাণু ছড়ায়, তখন শিশুরা সেই জীবাণুর সংস্পর্শে এসে সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে। সংক্রমণের এই বর্ধিত ঝুঁকি পরিচর্যা কেন্দ্রের কর্মীদের অভ্যাসের সাথে জড়িত। তবে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করলে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব।[] যেসব অভ্যাসের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা কমানো যায় তার মধ্যে রয়েছে—উপস্থিত সবার মধ্যে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, হাঁচি দেওয়ার সময় নাক-মুখ ঢাকার জন্য টিস্যু প্রদান করা, অন্যান্য কার্যক্রম থেকে আলাদা জায়গায় খাবার তৈরি করা, স্পর্শ করা হয় এমন জায়গাগুলো পরিষ্কার রাখা এবং জীবাণুনাশক ব্যবহার করা। এছাড়া ডায়াপার ব্যবহারকারী গ্রুপের ক্ষেত্রে ডায়াপার পরিবর্তন ও ফেলার সুব্যবস্থা রাখা এবং সেই জায়গা ও শিশুকে পরিষ্কার করার সঠিক নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন।[]

কোনো বস্তুর সংস্পর্শের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ করার কিছু বিকল্প উপায়ও রয়েছে। একটি শিশু কেন্দ্রে খেলনা, চেয়ার এবং ডায়াপার পরিবর্তনের টেবিলের মতো বেশি ব্যবহৃত বস্তু বা জায়গাগুলো থেকে সংক্রমণ বা রোগ ছড়াতে পারে। এসব জায়গা জীবাণুমুক্ত বা স্যানিটাইজ করলে "সালমোনেলা টাইফিমুরিয়াম" এবং "স্ট্যাফিলোকক্কাস অরিয়াস"-এর মতো ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ করা যায় যা সাধারণত সংক্রমণের কারণ হয়।[]

চিকিৎসা

[সম্পাদনা]
এই ধরনের স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক বার্তাগুলো স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে আলোচনার পরেই কেবল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে উৎসাহিত করে।

শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রের সংক্রমণগুলো সাধারণ সংক্রমণের মতোই চিকিৎসা করা যায়। তবে অসুস্থ শিশুদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের পরামর্শ ছাড়াই অপ্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার চাপ তৈরি হয়। অনেক সময় শিশুদের অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয় যা তাদের কোনো কাজে আসে না, কারণ শিশুটির এমন কোনো শারীরিক সমস্যা থাকে না যা অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে ভালো করা সম্ভব।[] এটি বিশেষ করে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায় যা অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সারানো যায় না। এছাড়া ছোট শিশুদের এবং যাদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য বিমা (ইন্সুরেন্স) রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে এটি বেশি ঘটে।[]

যারা পরিচর্যা কেন্দ্রে যায় তাদের অসুস্থ হলে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার সম্ভাবনা যারা যায় না তাদের তুলনায় দ্বিগুণ।[] এর কারণ হলো পরিচর্যা প্রদানকারীরা চান কেবল সুস্থ শিশুদেরই রাখতে। ফলে তারা বাবা-মাকে অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য চিকিৎসার জন্য চাপ দেন, এমনকি যদি তা চিকিৎসকের পরামর্শের বিরুদ্ধেও হয়। অন্যদিকে, বাবা-মায়েরা পরিচর্যা প্রদানকারীদের সন্তুষ্ট করার জন্য শিশুদের এই চিকিৎসা করাতে বাধ্য বোধ করেন।[] শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রে অ্যান্টিবায়োটিকের এই অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা (অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স) বেড়ে গেছে। যদিও এই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধি পাওয়া একটি উদ্বেগের বিষয়, বর্তমানে এর প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে আশা করা হচ্ছে যে ভবিষ্যতে এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।[]

সমাজ ও সংস্কৃতি

[সম্পাদনা]

যেসব পরিবারে বাবা-মায়েরা অসুস্থ শিশুর দেখাশোনার জন্য কাজ থেকে ছুটি নেন, তারা কাজের সময় এবং বেতন হারানোর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।[] কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, যখন বাবা-মায়েদের অসুস্থ শিশুদের সময় দেওয়ার জন্য বেতনভুক্ত ছুটি থাকে, তখন তারা চিকিৎসকের পরামর্শ নিশ্চিত না হয়ে শিশুদের অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।[১০]

শিশু পরিচর্যা প্রদানকারীরা প্রায়ই অসুস্থ শিশুদের রাখতে অস্বীকার করেন এবং বাবা-মায়েদের বিকল্প ব্যবস্থা করতে বলেন।[১১] কোনো রোগ সংক্রামক কি না তা বুঝতে না পারার কারণে অনেক সময় তারা সাধারণ অসুস্থতায় ভোগা শিশুদেরও সেবা দিতে অস্বীকার করেন, যদিও সেই রোগ অন্যদের মধ্যে ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে না।[১১]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Warren-Gash, C; Fragaszy, E; Hayward, AC (সেপ্টেম্বর ২০১৩)। "Hand hygiene to reduce community transmission of influenza and acute respiratory tract infection: a systematic review."Influenza and Other Respiratory Viruses (5): ৭৩৮–৪৯। ডিওআই:10.1111/irv.12015পিএমসি 5781206পিএমআইডি 23043518
  2. 1 2 3 4 Lee, MB; Greig, JD (অক্টোবর ২০০৮)। "A review of enteric outbreaks in child care centers: effective infection control recommendations."Journal of Environmental Health৭১ (3): ২৪–৩২, ৪৬। পিএমআইডি 18990930
  3. Bastos, J; Carreira, H; La Vecchia, C; Lunet, N (জুলাই ২০১৩)। "Childcare attendance and Helicobacter pylori infection: systematic review and meta-analysis."। European Journal of Cancer Prevention২২ (4): ৩১১–৯। ডিওআই:10.1097/cej.0b013e32835b69aaপিএমআইডি 23242007এস২সিআইডি 1016411
  4. 1 2 3 4 Nesti, MM; Goldbaum, M (জুলাই–আগস্ট ২০০৭)। "Infectious diseases and daycare and preschool education."। Jornal de Pediatria৮৩ (4): ২৯৯–৩১২। ডিওআই:10.2223/jped.1649 (নিষ্ক্রিয় ১ জুলাই ২০২৫)। পিএমআইডি 17632670{{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: ডিওআই নিষ্ক্রিয় (লিঙ্ক)
  5. Jimenez, Maribel; Martinez, Celida I.; Chaidez, Cristobal (১ ডিসেম্বর ২০১০)। "Disinfection alternatives for contact surfaces and toys at child care centers"International Journal of Environmental Health Research২০ (6): ৩৮৭–৩৯৪। বিবকোড:2010IJEHR..20..387Jডিওআই:10.1080/09603123.2010.491851আইএসএসএন 0960-3123পিএমআইডি 21161800এস২সিআইডি 25657257
  6. 1 2 Hersh, AL; Shapiro, DJ; Pavia, AT; Shah, SS (ডিসেম্বর ২০১১)। "Antibiotic prescribing in ambulatory pediatrics in the United States."। Pediatrics১২৮ (6): ১০৫৩–৬১। ডিওআই:10.1542/peds.2011-1337পিএমআইডি 22065263এস২সিআইডি 22545764
  7. 1 2 Rooshenas, L; Wood, F; Brookes-Howell, L; Evans, MR; Butler, CC (মে ২০১৪)। "The influence of children's day care on antibiotic seeking: a mixed methods study."The British Journal of General Practice৬৪ (622): e৩০২–১২। ডিওআই:10.3399/bjgp14x679741পিএমসি 4001146পিএমআইডি 24771845
  8. Holmes, SJ; Morrow, AL; Pickering, LK (১৯৯৬)। "Child-care practices: effects of social change on the epidemiology of infectious diseases and antibiotic resistance."Epidemiologic Reviews১৮ (1): ১০–২৮। ডিওআই:10.1093/oxfordjournals.epirev.a017913পিএমআইডি 8877328
  9. McCutcheon, H; Fitzgerald, M (মে ২০০১)। "The public health problem of acute respiratory illness in childcare."Journal of Clinical Nursing১০ (3): ৩০৫–১০। ডিওআই:10.1046/j.1365-2702.2001.00486.xপিএমআইডি 11820539
  10. Thrane, N; Olesen, C; Md, JT; Søndergaard, C; Schønheyder, HC; Sørensen, HT (মে ২০০১)। "Influence of day care attendance on the use of systemic antibiotics in 0- to 2-year-old children."Pediatrics১০৭ (5): E৭৬। ডিওআই:10.1542/peds.107.5.e76পিএমআইডি 11331726
  11. 1 2 Hashikawa, A. N.; Juhn, Y. J.; Nimmer, M.; Copeland, K.; Shun-Hwa, L.; Simpson, P.; Stevens, M. W.; Brousseau, D. C. (১৯ এপ্রিল ২০১০)। "Unnecessary Child Care Exclusions in a State That Endorses National Exclusion Guidelines"Pediatrics১২৫ (5): ১০০৩–১০০৯। ডিওআই:10.1542/peds.2009-2283পিএমসি 3047469পিএমআইডি 20403929

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]