বিষয়বস্তুতে চলুন

শিশুদের জন্য বিশ্ব সম্মেলন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
শিশুদের জন্য বিশ্ব সম্মেলন
বিশ্বব্যাপী শিশুদের জন্য সম্মেলন
তারিখসেপ্টেম্বর ২৯–৩০, ১৯৯০
স্থলজাতিসংঘ
শহরনিউ ইয়র্ক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
চেয়ারইউএনআইসিইএফ (UNICEF)
ওয়েবসাইটইউনিসেফ অফিসিয়াল সাইট

জাতিসংঘের শিশুদের জন্য বিশ্ব সম্মেলন ২৯–৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৯০ তারিখে নিউ ইয়র্ক সিটিতে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হয়। সেই সময় পর্যন্ত এটি ছিল রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের বৃহত্তম সমাবেশ, যেখানে তারা ২০০০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী শিশুদের কল্যাণে একগুচ্ছ লক্ষ্য পূরণের অঙ্গীকার করেছিলেন। এটিই ছিল প্রথমবার যখন কোনো জাতিসংঘ সম্মেলন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত বিস্তৃত লক্ষ্যসমূহের জন্য একটি ব্যাপক কর্মসূচি নির্ধারণ করেছিল।

এই বিশ্ব সম্মেলনের প্রধান ফলাফল ছিল 'শিশুদের সুরক্ষা, জীবনরক্ষা এবং বিকাশের জন্য বিশ্ব ঘোষণা' এবং ২০০০ সালের মধ্যে শিশুদের মানব উন্নয়নের বিশদ লক্ষ্যমাত্রা সম্বলিত একটি 'কর্মপরিকল্পনা'-তে যৌথ স্বাক্ষর। এই সম্মেলন বিশ্বজুড়ে শিশুদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিশ্রুতির এক দশকের সূচনা করে। এ ছাড়াও এটি ১৯৯০-এর দশকে জনসংখ্যা, পরিবেশ, খাদ্য, মানবাধিকার, সামাজিক উন্নয়ন এবং নারীর অধিকার বিষয়ে ধারাবাহিক জাতিসংঘ সম্মেলনের পটভূমি তৈরি করে দেয়।

প্রকল্পের উৎপত্তি

[সম্পাদনা]

১৯৮৯ সালে কানাডার প্রধানমন্ত্রী ব্রায়ান মুলরনি, মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারক, মালির প্রেসিডেন্ট মুসা ট্রাওরে, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট কার্লোস স্যালিনাস দে গর্তারি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো এবং সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী ইঙ্গভার কার্লসন এই সম্মেলনের প্রস্তাব করেছিলেন। এই ছয়জন নেতা "সকল দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং মানব সমাজের মূল উপাদান হিসেবে শিশুদের বেঁচে থাকা, সুরক্ষা এবং বিকাশ নিশ্চিত করার কৌশল ও লক্ষ্যসমূহের প্রতি সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে মনোযোগ আকর্ষণ এবং অঙ্গীকার প্রচারের জন্য" একযোগে কাজ করেছিলেন। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব হাভিয়ের পেরেস দে কুয়েইয়ার প্রকল্পটি গ্রহণ করেন এবং সম্মেলনটিকে ইউনিসেফ ও জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থার সমর্থন প্রদান করেন। এই অনুষ্ঠানে মোট ১৫৯টি সরকারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এতে ৭২টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং ৮৭টি দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

সম্মেলনের এজেন্ডাটি তিনটি প্রধান সংস্থা— ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি, এডুকেশন ফর অল (ইউনেস্কোর নেতৃত্বে) এবং জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) নির্বাহী বোর্ড দ্বারা ব্যাপকভাবে অনুমোদিত হয়েছিল। ইউনিসেফ ছিল এই সম্মেলনের প্রধান অবদানকারী। সম্মেলনের পরবর্তী প্রতি বছর ইউনিসেফ সম্মেলনের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরি করে তাদের বিভিন্ন প্রকাশনার মাধ্যমে প্রকাশ করত।

শিশুদের জন্য বিশ্ব সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল যখন বিশ্ব প্রথমবারের মতো শিশুদের বেঁচে থাকা এবং বিকাশের বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ আগ্রহ প্রদর্শন করতে শুরু করেছিল। এর এক বছর আগে শিশু অধিকার সনদ গৃহীত হয়েছিল। এটি সরাসরি শিশুদের অধিকারের ওপর আলোকপাতকারী একটি মানবাধিকার চুক্তি। সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এই দলিলটি কার্যকর হয়েছিল।

নির্ধারিত লক্ষ্যসমূহ

[সম্পাদনা]

সম্মেলনে মোট ২৭টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের স্বাস্থ্য এবং বেঁচে থাকার সম্ভাবনা উন্নত করা। লক্ষ্যগুলোকে ছয়টি বিভাগে ভাগ করা যায়: স্বাস্থ্য, বেঁচে থাকা, নারী স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা এবং সুরক্ষা। এই লক্ষ্যগুলো ১৯৯০-২০০০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এই দশ বছরের পর বিশ্ব নেতারা আবার মিলিত হওয়ার কথা ছিল যেন এই দশকে অর্জিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করা যায়।

স্বাস্থ্য

[সম্পাদনা]

স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে নয়টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বেঁচে থাকা

[সম্পাদনা]
বাংলাদেশে একটি পথশিশু
  • শিশু মৃত্যু এবং ৫ বছরের কম বয়সী মৃত্যুহার: শিশু মৃত্যুহার এবং অনূর্ধ্ব-৫ মৃত্যুহার এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস
  • পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা: খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য জ্ঞান ও সহায়ক পরিষেবার প্রচার
  • তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ (ইনফ্লুয়েঞ্জা সদৃশ অসুস্থতা): পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে এআরআই জনিত মৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস

নারীর স্বাস্থ্য

[সম্পাদনা]
  • প্রসবকালীন যত্ন: সকল গর্ভবতী নারীর জন্য প্রসবপূর্ব যত্নের সুবিধা
  • মাতৃদুগ্ধ পান: চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত শিশুদের শুধুমাত্র মাতৃদুগ্ধ পান করানো এবং জীবনের দ্বিতীয় বছর পর্যন্ত পরিপূরক খাবারের সাথে মাতৃদুগ্ধ পান অব্যাহত রাখতে সকল নারীকে ক্ষমতায়ন করা
  • প্রসবকালীন যত্ন: উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা এবং প্রসূতি সংক্রান্ত জরুরি অবস্থার জন্য সকল গর্ভবতী নারীর রেফারেল সুবিধার সুযোগ নিশ্চিত করা
  • কন্যা শিশু এবং গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া
  • মাতৃমৃত্যু হার: এই হার অর্ধেকে নামিয়ে আনা
  • কম জন্ম-ওজন: কম ওজনের জন্মহার ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা
১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে নাইজেরীয় গৃহযুদ্ধের সময় একটি মেয়ে। নাইজেরীয় অবরোধের ফলে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষের এই ছবিগুলো বিশ্বব্যাপী বিয়াফ্রানদের জন্য সহানুভূতি জাগিয়ে তুলেছিল।

পুষ্টি

[সম্পাদনা]
  • অপুষ্টি: পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে তীব্র ও মাঝারি মানের অপুষ্টি অর্ধেকে নামিয়ে আনা
  • পানি: নিরাপদ পানীয় জলের সর্বজনীন সুযোগ নিশ্চিত করা

শিক্ষা

[সম্পাদনা]
  • পরিবার পরিকল্পনা: খুব তাড়াতাড়ি, ঘন ঘন, খুব দেরিতে বা অত্যধিক গর্ভাবস্থা প্রতিরোধের জন্য সকল দম্পতির তথ্য ও পরিষেবার সুযোগ নিশ্চিত করা
  • উন্নত জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা এবং মূল্যবোধ: উন্নত জীবনযাপনের জন্য ব্যক্তি ও পরিবারের জ্ঞান, দক্ষতা এবং মূল্যবোধ অর্জনের হার বৃদ্ধি করা
  • মৌলিক শিক্ষার সর্বজনীন সুযোগ: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার বয়সী অন্তত ৮০ শতাংশ শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা
  • শিক্ষার সর্বজনীন সুযোগ, যেখানে কন্যা শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা এবং নারীদের সাক্ষরতা প্রশিক্ষণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে
  • প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ: ইসিডি কার্যক্রমের সম্প্রসারণ, যার মধ্যে স্বল্পব্যয়ী পারিবারিক ও কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত থাকবে

সুরক্ষা

[সম্পাদনা]
  • অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা উন্নত করা
  • শারীরিক বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ: ১৯৯০-এর দশকের শেষ নাগাদ সকল দেশে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধির প্রসার এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া

প্রতিষ্ঠিত আইনসমূহ

[সম্পাদনা]

সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৯০ সালে 'শিশুদের সুরক্ষা, জীবনরক্ষা এবং বিকাশের জন্য বিশ্ব ঘোষণা' এবং একটি 'কর্মপরিকল্পনা' স্বাক্ষর করা। শিশুদের সুরক্ষা, জীবনরক্ষা এবং বিকাশের জন্য বিশ্ব ঘোষণাটি বিশ্বব্যাপী শিশুদের প্রতি একটি লিখিত অঙ্গীকার হিসেবে কাজ করে। এটি সম্মেলনের কারণ এবং নির্ধারিত লক্ষ্যগুলোর সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরে। কর্মপরিকল্পনাটি বিশ্ব ঘোষণার একটি পরিপূরক অংশ, যেখানে লক্ষ্যগুলো কীভাবে পূরণ করা হবে তার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ব ঘোষণা

[সম্পাদনা]

শিশুদের সুরক্ষা, জীবনরক্ষা এবং বিকাশের জন্য বিশ্ব ঘোষণাটি পাঁচটি বিভাগে বিভক্ত: চ্যালেঞ্জ, সুযোগ, কাজ, অঙ্গীকার এবং পরবর্তী পদক্ষেপ।

চ্যালেঞ্জ: বিশ্বের অসংখ্য শিশুকে সাহায্য করা যারা তাদের বৃদ্ধি ও বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে এমন বিপদের সম্মুখীন। বিশেষ করে যারা দারিদ্র্য, অপুষ্টি, যুদ্ধ এবং ব্যাধির শিকার।

সুযোগ: ঘোষণা করা হয় যে সম্মেলনের লক্ষ্যসমূহ পূরণ করা হবে একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এবং বিশ্ব নেতাদের অবশ্যই শিশু অধিকার সনদে সম্মত বাধ্যবাধকতাগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। ১৯৮৯ সালে শিশু অধিকার সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছিল; এটি ছিল প্রথম আন্তর্জাতিক চুক্তি যা অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকারের পাশাপাশি নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ সুদান একমাত্র দেশ যারা এই সনদটি অনুসমর্থন করেনি।

  • কাজ এবং অঙ্গীকার: এই উভয় অংশ সম্মেলনের নির্দিষ্ট লক্ষ্যগুলো আরও ব্যাখ্যা করতে ব্যবহৃত হয়।
    • শিশুদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানো
    • প্রসবপূর্ব স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানো
    • নারীদের ভূমিকা ও মর্যাদা শক্তিশালী করা
    • শিক্ষার সুযোগ প্রদান করা
    • গৃহহীন, শরণার্থী, প্রতিবন্ধী এবং নির্যাতিত শিশুদের জীবন উন্নত করা
    • যুদ্ধের বিপদ থেকে শিশুদের রক্ষা করা
    • দারিদ্র্যের ওপর বিশ্বব্যাপী আঘাত হানার জন্য কাজ করা

পরবর্তী পদক্ষেপ: 'শিশুদের সুরক্ষা, জীবনরক্ষা এবং বিকাশের জন্য বিশ্ব ঘোষণা' কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তা নির্দিষ্ট করার জন্য 'কর্মপরিকল্পনা' গ্রহণ।

কর্মপরিকল্পনা

[সম্পাদনা]

কর্মপরিকল্পনাটি আরও সুনির্দিষ্ট জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগের জন্য একটি কাঠামো। এটি শিশুদের জন্য বিশ্ব সম্মেলনের ঘোষণার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি লক্ষ্যকে আলাদাভাবে বিবেচনা করে। এটি প্রতিটি লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতির ফলো-আপ এবং পর্যবেক্ষণের ওপরও গুরুত্বারোপ করে। সকল লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রাথমিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জাতীয় সরকারগুলোকে। প্রতিটি দেশ জাতীয় কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে কৌশল তৈরি করতে সম্মত হয়েছিল যেন এই ২৭টি বৈশ্বিক লক্ষ্য জাতীয় বাস্তবে রূপ নিতে পারে। মোট ১৫৫টি দেশ জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছিল।

বিশেষ অধিবেশন

[সম্পাদনা]
নিউ ইয়র্ক সিটিতে জাতিসংঘের সদর দপ্তর
শিশুদের বিশেষ অধিবেশনে শিশুদল

৮–১০ মে ২০০২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ শিশুদের জন্য একটি বিশেষ অধিবেশন আয়োজন করে। ১৯৯০ সালের শিশুদের জন্য বিশ্ব সম্মেলনের পর এক দশকে শিশুদের জন্য অর্জিত অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য এটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এটি ১৯৯০ সালে করা প্রতিশ্রুতিগুলোকে নবায়ন করার এবং আগামী দশকের জন্য নির্দিষ্ট কার্যক্রমের অঙ্গীকার করার মাধ্যম হিসেবেও কাজ করেছিল। অধিবেশনে প্রায় ৭০টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান উপস্থিত ছিলেন। সারা বিশ্ব থেকে শিশুদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তারা অসংখ্য সহায়ক ইভেন্টে অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান ছিল ৯ মে অনুষ্ঠিত 'শিশুদের জন্য নেতৃত্বের উদযাপন'। অনুষ্ঠানটি ঐক্যের এক আবহ তৈরি করেছিল এবং অধিবেশনের মধ্যে একটি উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল, তবে সমাবেশের প্রকৃত উদ্দেশ্যটি ভুলে যাওয়া হয়নি।

সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ এবং পদ্ধতিগত ফলো-আপ প্রক্রিয়ার কারণে এই বিশ্ব সম্মেলন জাতিসংঘের অন্য যেকোনো সমাবেশ থেকে আলাদা হয়ে আছে। শিশুদের ওপর মহাসচিবের প্রতিবেদন, যার শিরোনাম ছিল "আমরা শিশুরা", ১৩৫টি দেশ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে জাতীয় পর্যায়ের পর্যালোচনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল। সেই সময়ে বিশ্বের শিশুদের অবস্থার ওপর এটিই ছিল সবচেয়ে ব্যাপক গবেষণা। "আমরা শিশুরা" রিপোর্টটি ছিল ঐ দশকে অর্জিত নগণ্য অগ্রগতির একটি পরিসংখ্যানগত উপস্থাপনা। প্রতিবেদনে বলা হয়, “বিশ্ব শিশুদের জন্য বিশ্ব সম্মেলনের অধিকাংশ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে”। নির্ধারিত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে খুব কম লক্ষ্যকেই সফল বলা যেতে পারে, কিছু অগ্রগতি দেখিয়েছে, তবে অধিকাংশই পূরণ হয়নি।

সফলতা

[সম্পাদনা]

কিছু অগ্রগতি

[সম্পাদনা]
  • শিশু মৃত্যু এবং ৫ বছরের কম বয়সী মৃত্যুহার: শিশু মৃত্যু এবং অনূর্ধ্ব-৫ মৃত্যুহারে এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস
  • হাম: ১৯৯৫ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী নির্মূলের প্রধান পদক্ষেপ হিসেবে হামে মৃত্যু ৯৫ শতাংশ এবং হামের সংক্রমণ ৯০ শতাংশ হ্রাস
  • অপুষ্টি: পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে তীব্র ও মাঝারি অপুষ্টি অর্ধেকে নামিয়ে আনা
  • মাতৃদুগ্ধ পান: চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত শিশুদের শুধুমাত্র মাতৃদুগ্ধ পান করানো এবং জীবনের দ্বিতীয় বছর পর্যন্ত পরিপূরক খাবারের সাথে মাতৃদুগ্ধ পান অব্যাহত রাখতে সকল নারীকে ক্ষমতায়ন করা
  • কম জন্ম-ওজন: কম ওজনের জন্মহার ১০% এর নিচে নামিয়ে আনা
  • পরিবার পরিকল্পনা: সকল দম্পতির তথ্য ও পরিষেবার সুযোগ নিশ্চিত করা যেন খুব তাড়াতাড়ি, ঘন ঘন, খুব দেরিতে বা অত্যধিক গর্ভাবস্থা প্রতিরোধ করা যায়
  • প্রসবকালীন যত্ন: সকল গর্ভবতী নারীর জন্য প্রসবপূর্ব যত্নের সুবিধা
  • পানি: নিরাপদ পানীয় জলের সর্বজনীন সুযোগ
  • মৌলিক শিক্ষার সর্বজনীন সুযোগ: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার বয়সী অন্তত ৮০ শতাংশ শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা
  • শিক্ষার সর্বজনীন সুযোগ, কন্যা শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা এবং নারীদের সাক্ষরতা প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া
  • প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ: ইসিডি কার্যক্রমের সম্প্রসারণ, যার মধ্যে স্বল্পব্যয়ী পারিবারিক ও কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত
  • অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা উন্নত করা

কোনো অগ্রগতি হয়নি

[সম্পাদনা]
  • রুটিন টিকাদান: টিকাদানের উচ্চ হার বজায় রাখা
  • মাতৃমৃত্যু হার: এই হার অর্ধেকে নামিয়ে আনা
  • রক্তাল্পতা: নারীদের মধ্যে আয়রনের অভাবজনিত রক্তাল্পতা এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস

সীমিত তথ্য

[সম্পাদনা]

বাকি ৬টি লক্ষ্যের ক্ষেত্রে সীমিত বা অনির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে

"আমরা শিশুরা" রিপোর্টে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতার জন্য আর্থিক বাধাকে দায়ী করা হয়েছে। সমালোচকরা উল্লেখ করেন যে, জাতিসংঘের অনেক সম্মেলনে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা কখনও পূরণ হয় না এবং কাগজের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে খুব কমই রূপ পায়। 'কানাডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন জার্নাল' এই অগ্রগতির অভাবের জন্য জাতিসংঘের সম্মেলন থেকে আসা দলিলগুলোকে দায়ী করেছে, কারণ এগুলো আইনি দলিল বা বাধ্যতামূলক চুক্তির বদলে নিছক নীতিগত দলিল। তবে এটিও উল্লেখ করা হয়েছে যে, শিশুদের জন্য এই বিশেষ অধিবেশন আগামী দশকের জন্য শিশুদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক নীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে দেবে।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  • জেনিফার কিটস এবং ক্যাথরিন ম্যাকডোনাল্ড (২০০২)। "জাতিসংঘের শিশুদের জন্য বিশেষ অধিবেশন: আক্রান্ত শিশু অধিকার," "কানাডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন"
  • জাতিসংঘের বেসরকারি লিয়াজোঁ পরিষেবা (মে ২০০২)।"সাধারণ পরিষদের শিশুদের জন্য বিশেষ অধিবেশন," "NGLS রাউন্ডআপ"
  • জাতিসংঘ মিডিয়া স্বীকৃতি এবং লিয়াজোঁ ইউনিট (২০০২)।"ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যারল বেলামি কর্তৃক মহাসচিবের রিপোর্ট ‘আমরা শিশুরা’-র সূচনা," "প্রেস বিজ্ঞপ্তি"
  • জাতিসংঘ মিডিয়া স্বীকৃতি এবং লিয়াজোঁ ইউনিট (২০০২)।" কর্মসূচি এবং কার্যক্রম," "শিশুদের জন্য বিশেষ অধিবেশন"
  • জাতিসংঘ মিডিয়া স্বীকৃতি এবং লিয়াজোঁ ইউনিট (২০০২)। "শিশুদের জন্য বিশ্বের লক্ষ্যসমূহ," "জাতিসংঘের শিশুদের জন্য বিশেষ অধিবেশন"
  • জনতথ্য বিভাগ (১৯৯৭)। "শিশুদের জন্য বিশ্ব সম্মেলন (১৯৯০)," "শিশু সম্মেলনসমূহ"
  • ইউনিসেফ "শিশুদের প্রতি একটি প্রতিশ্রুতি," "তথ্য প্রকাশনা"
  • ইউনিসেফ (২০০২) "শিশুদের জন্য বিশ্ব সম্মেলনের পর থেকে অগ্রগতি (পরিসংখ্যানগত পর্যালোচনা),"
  • বার্টেল, আর্নেস্ট জে. ও'ডোনেল, আলেহান্দ্রো। । ইউনিভার্সিটি অফ নটর ডেম প্রেস, ২০০১, পৃ. ১-৩৭৮
  • ভারত। নারী ও শিশু উন্নয়ন বিভাগ। । [নয়াদিল্লি] : নারী ও শিশু উন্নয়ন বিভাগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়, ভারত সরকার, ১৯৯১। পৃ (৫-১১) (২৪-২৬)
  • অ্যান আর. পেবলি। । র‍্যান্ড কর্পোরেশন, ১৯৯৩। পৃ ১-৫

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]