বিষয়বস্তুতে চলুন

শিরা সুবাহ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
শিরার সুবাহ
মুঘল সাম্রাজ্যের বিভাগ
১৬৮৭ - ১৭৬৬
শিরার পতাকা
মুঘল সাম্রাজ্যের আলম পতাকা

১৭৪৬–১৭৬০ সালে কর্ণাটকের ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধের সময় দক্ষিণ ভারতের মানচিত্রে মুঘল প্রদেশ শিরা (Sira) প্রদর্শিত হচ্ছে
রাজধানীশিরা
আইনসভামুঘল দরবার
ঐতিহাসিক যুগপ্রারম্ভিক আধুনিক যুগ
 প্রতিষ্ঠিত
১৬৮৭
 বিলুপ্ত
১৭৬৬
পূর্বসূরী
উত্তরসূরী
বিজাপুর সালতানাত
মারাঠা সাম্রাজ্য
বর্তমানে যার অংশভারত

শিরা সুবাহ (ফার্সি: صوبه سِرا), যা কর্ণাটক-বালাঘাট নামেও পরিচিত, ছিল দক্ষিণ ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের একটি সুবাহ (সাম্রাজ্যিক প্রথম স্তরের প্রদেশ)। ১৬৮৭ সালে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব (১৬৮৬ সালে বিজাপুর এবং ১৬৮৭ সালে গোলকোন্ডা জয়ের পর) এটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এটি ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। তুঙ্গভদ্রা নদীর দক্ষিণে অবস্থিত কর্ণাটক অঞ্চল নিয়ে এই প্রদেশটি গঠিত হয়েছিল।[] এর রাজধানী ছিল শিরা শহরে।[]

এই সুবাহটি সাতটি পরগনা (জেলা) নিয়ে গঠিত ছিল: বাসবপাটনা, বুদিহাল, শিরা, পেনুকোন্ডা, দোড্ডবল্লাপুর, হোসকোটে এবং কোলার। এছাড়া হরপনহাল্লি, কোন্দারপি, আনেগুন্দি, বোদনুর, চিত্রদুর্গ এবং মহীশূরকে মুঘলরা এই প্রদেশের করদ রাজ্য হিসেবে গণ্য করত।[]

ইতিহাস

[সম্পাদনা]

মুঘল সেনাবাহিনী মহীশূর মালভূমি অঞ্চল দখল করার পর ১২টি পরগনা নবগঠিত শিরা সুবাহর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।[] অবশিষ্ট অঞ্চলগুলো স্থানীয় 'পালাইয়াক্কারার' (পলিগার) শাসকদের অধীনে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়, তবে শর্ত ছিল যে তারা শিরার প্রাদেশিক সরকারকে নিয়মিত কর প্রদান করবে।[]

১৭৫৭ সালে মারাঠারা শিরা দখল করে নেয়, কিন্তু ১৭৫৯ সালে মুঘলরা এটি আবার ফিরে পায়।[] দুই বছর পর হায়দার আলী, যার পিতা এই প্রদেশের কোলার জেলার মুঘল সামরিক গভর্নর (বা ফৌজদার) ছিলেন, শিরা দখল করেন এবং নিজেকে "শিরার নবাব" উপাধিতে ভূষিত করেন।[] তবে ১৭৬৬ সালে তার ভাইয়ের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে প্রদেশটি আবার মারাঠাদের হাতে চলে যায়। ১৭৬৭ সালে মারাঠা পেশোয়া প্রথম মাধবরাও হায়দার আলীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে তাকে পরাজিত করেন এবং শিরা সুবাহকে মারাঠা কনফেডারেশনে অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৭৭৪ সালে হায়দার আলীর পুত্র টিপু সুলতান তার পিতার জন্য অঞ্চলটি পুনরুদ্ধার না করা পর্যন্ত এটি মারাঠাদের অধীনেই ছিল।[]

সুবাহদার (গভর্নর)

[সম্পাদনা]

১৬৮৬ সালে কাসিম খান (খাসিম খান বা কাসিম খান নামেও পরিচিত) এই প্রদেশের প্রথম সুবাহদার (গভর্নর) নিযুক্ত হন।[] আট বছর সফলভাবে শাসন করার পর ১৬৯৪ সালে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু হয়। ধারণা করা হয়, হয় তিনি মারাঠা আক্রমণকারীদের হাতে নিহত হন, অথবা তার হেফাজতে থাকা রাজকীয় কোষাগার মারাঠারা লুট করার অপমানে তিনি আত্মঘাতী হন।[] তার পরবর্তী অধিকাংশ সুবাহদার মাত্র এক বা দুই বছর স্থায়ী হয়েছিলেন।[] ১৭২৬ সালে দিলাওয়ার খান নিযুক্ত হওয়ার পর অবশেষে এই প্রদেশে স্থিতিশীলতা আসে, যার শাসনকাল ১৭৫৬ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল।[]

শিরার সুবাহদারগণ[]
নামশাসনকালনামশাসনকাল
কাসিম খান১৬৮৬–১৬৯৪গালিব খান১৭১৩–১৭১৪
আতিশ খান১৬৯৪–১৬৯৭দরগা কুলি খান১৭১৪–১৭১৫
মুরাদ মনসুর খান১৬৯৭–১৭০৪আবিদ খান১৭১৫–১৭১৬
দিলিয়াকত মনসুর খান১৭০৪–১৭০৬মুলাহাওয়ার খান১৭১৬–১৭২০
পুদাইল উল্লাহ খান১৭০৬–১৭০৭দরগা কুলি খান১৭২০–১৭২১
দাউদ খান১৭০৭–১৭০৯আব্দুল রসুল খান১৭২১–১৭২২
সাদাতুল্লাহ খান১৭০৯–১৭১১তাহির মুহাম্মদ খান১৭২২–১৭৪০
আমিন খান১৭১১–১৭১৩দিলাওয়ার খান১৭৪০–১৭৫৬

প্রশাসন

[সম্পাদনা]
কর্ণাটকের শিরা শহরে মুঘল আমলের জামে মসজিদ (২০০৭)

অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে চাষাবাদের উপর কর নির্ধারণ 'আমানি' বা 'সরকার' (প্রাদেশিক সরকার) ব্যবস্থাপনার অধীনে ছিল। বেশ কয়েক ধরনের কর্মকর্তা রাজস্ব সংগ্রহ ও পরিচালনা করতেন।[] এর মধ্যে বেশিরভাগ পদই পূর্ববর্তী বিজাপুর সালতানাতের অধীনে বিদ্যমান ছিল, যেমন— 'দেশমুখ', 'দেশপাণ্ডে', 'মজমুন্দার' এবং 'কানুনগো'।[] 'দেশমুখ'রা গ্রামের প্রধানদের সাথে হিসাব সমন্বয় করতেন; 'দেশপাণ্ডে'রা গ্রামের রেজিস্ট্রারের হিসাবপত্র যাচাই করতেন; এবং 'কানুনগো'রা সরকারি নিয়মকানুন নথিবদ্ধ করতেন এবং গ্রামের কর্মকর্তা ও বাসিন্দাদের কাছে তা ব্যাখ্যা করতেন।[] সবশেষে, 'মজমুন্দার'রা কর নির্ধারণ ও প্রদানের চূড়ান্ত নথি প্রস্তুত করতেন এবং তা জারি করতেন।[]

সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত গ্রামের এবং তালুকের হিসাবপত্র অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ভাষা কন্নড় এবং এর লিপিতে প্রস্তুত করা হতো।[] কিন্তু বিজাপুর আক্রমণের পর মারাঠা সর্দাররা শাসনভার গ্রহণ করলে তারা হিসাবরক্ষণে মারাঠি ভাষা ও লিপি প্রবর্তন করেন। এমনকি অনেক পলিগার প্রধানের শাসনাধীন এলাকাতেও মারাঠি ভাষা প্রচলিত হয়ে যায়। শিরা সুবাহ গঠিত হওয়ার পর মুঘল সাম্রাজ্যের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ফার্সি ব্যবহৃত হতে শুরু করে।[]

রাজধানী ও স্থাপত্য

[সম্পাদনা]
বেঙ্গালুরুর লালবাগ উদ্যান, যা শিরা শহরের 'খান বাগ' উদ্যানের আদলে নির্মিত। (১৭৯৪ সালের ছবি)

প্রদেশের রাজধানী শিরা শহর দিলাওয়ার খানের আমলে সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধি লাভ করে এবং এটি ৫০,০০০ বাড়ি থাকার মতো আয়তনে বিস্তৃত হয়।[] শিরার প্রাসাদ এবং সরকারি স্থাপত্যগুলো অন্যান্য ভবন নির্মাণের মডেলে পরিণত হয়। বেঙ্গালুরুতে হায়দার আলীর প্রাসাদ এবং শ্রীরঙ্গপত্তনমে টিপু সুলতানের প্রাসাদ—উভয়ই শিরার দিলাওয়ার খানের প্রাসাদের আদলে তৈরি করা হয়েছিল।[] ইম্পেরিয়াল গ্যাজেটিয়ার অফ ইন্ডিয়া অনুসারে, বেঙ্গালুরুর বিখ্যাত লালবাগ উদ্যান এবং বেঙ্গালুরু দুর্গ যথাক্রমে শিরার 'খান বাগ' উদ্যান এবং শিরা দুর্গের আদলে ডিজাইন করা হতে পারে।[]

১৭৮২ সালে টিপু সুলতান তার পিতার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর শিরা থেকে ১২,০০০ পরিবারকে (যাদের অধিকাংশই সরকারি কর্মকর্তা ছিল) তার নতুন রাজধানী শহর গঞ্জামে স্থানান্তরিত করেন। বর্তমানেও শিরা শহরে মুঘল আমলের বেশ কিছু স্থাপনা টিকে আছে, যার মধ্যে শিরা জামে মসজিদ অন্যতম।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]
  • Imperial Gazetteer of India: Provincial Series (১৯০৮), Mysore and Coorg, Calcutta: Superintendent of Government Printing.
  • Rice, Lewis (১৮৯৭a), Mysore: A Gazetteer Compiled for the Government, Volume I, Mysore In General, Westminster: Archibald Constable and Company.
  • Rice, Lewis (১৮৯৭b), Mysore: A Gazetteer Compiled for the Government, Volume II, Mysore, By Districts, Westminster: Archibald Constable and Company.