বিষয়বস্তুতে চলুন

শান্তিগোপাল

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
শান্তিগোপাল পাল
জন্ম
বীরেন্দ্রনারায়ণ পাল

(১৯৩৪-০৪-০৪)৪ এপ্রিল ১৯৩৪
বাগবাজার কলকাতা ব্রিটিশ ভারত (অধুনা পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)
মৃত্যু৫ নভেম্বর ২০১২(2012-11-05) (বয়স ৭৮)
পেশাঅভিনেতা
দাম্পত্য সঙ্গীচৈতালী পাল
সন্তানঅনির্বাণ পাল (পুত্র) ও এক কন্যা
পিতা-মাতাফণীন্দ্রনাথ পাল (পিতা)
কমলা দেবী (মাতা)

শান্তিগোপাল পাল বা শুধু শান্তিগোপাল (৪ এপ্রিল ১৯৩৫ – ৫ নভেম্বর ২০১২) ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের যাত্রাজগতের এক প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা[][] যাত্রা সম্রাট হিসাবে পরিচিত তিনি যাত্রাপালা তথা লোকনাট্যের মাধ্যমে সারা বাংলায় ও পূর্ব ভারতের গ্রামীণ শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে জীবন উৎসর্গ করেন।[] তাঁর আসল নাম ছিল বীরেন্দ্রনারায়ণ পাল।

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন

[সম্পাদনা]

বীরেন্দ্রনারায়ণ পালের জন্ম ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের ৪ এপ্রিল ব্রিটিশ ভারতের অধুনা পশ্চিমবঙ্গের উত্তর কলকাতার বাগবাজারে। পিতা ফণীন্দ্রনাথ পাল ও মাতা কমলা দেবী। অল্প বয়সে মাতৃহারা হলে তিনি সৎমা তারা দেবীর কাছে প্রতিপালিত হন। বিদ্যালয়ের পাঠ বাগবাজারের হরনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল, ক্রিকেট সহ যাত্রার প্রতি তাঁর প্রবল আকর্ষণ ছিল। ভালো বাঁশি বাজাতে পারতেন। পাড়ায় 'মেবার পতন' নাটকে তাঁর অভিনয়ে হাতেখড়ি হলেও মণীন্দ্রনাথ কলেজে পড়ার সময় থেকেই "উদয়াচল" নাট্যদল ও সারকারিনা প্রেক্ষাগৃহের প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব অমর ঘোষের কাছে বীরেন্দ্রনারায়ণের আসল প্রশিক্ষণ। অমর ঘোষের উদয়াচল নাট্যদলে অভিনয় করেন- 'প্রতিমূর্তি', 'সাইক্লোন', 'রাহু', 'হাঁচি', 'পথের পাঁচালি' প্রভৃতি নাটকে।

কর্মজীবন

[সম্পাদনা]

শেষে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে বীরেন্দ্রনারায়ণ গ্রুপ থিয়েটারের মানসিকতা নিয়েই চলে আসেন তিন টাকার মজুরিতে রয়েল বীণাপাণি অপেরায়।[] অভিনয় করলেন 'বিপ্লবী সন্তান', 'দস্যুকন্যা', 'ভাগ্যের বলি' প্রভৃতি যাত্রাপালায়। কিন্তু ঠিক যেন মেলাতে পারছিলেন না। শেষে যখন নট্ট কোম্পানি হতে ডাক পান, নাটকের স্কুলিং ছেড়ে যাত্রার স্কুলিংএ নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকেন। অভিনেতা শিব ভট্টাচার্যের পরামর্শে চলে আসেন তরুণ অপেরায়। যাত্রাপালা 'সোনাই দীঘি' করলেন। কিন্তু ব্যবসা তেমন হল না। তাই শেষে কম বাজেটে নামি-দামি শিল্পী না নিয়ে, পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক পালা ছেড়ে নতুন আঙ্গিকের নাটকে মানুষের মন জয় করতে ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে লিজ নেন তরুণ অপেরা। নতুন পালাকার শম্ভু বাগ কে দিয়ে লেখালেন হিটলার। নিজের প্রশিক্ষক অমর ঘোষের নির্দেশনায়, নতুন টেকনিক মাইক্রোফেনের ব্যবহারে আর নিজের অমানুষিক পরিশ্রমে হিটলার-এ জার্মান স্বৈরশাসকের ভূমিকায় অভিনয় করলেন ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে ৩৪ বৎসর বয়সী শান্তিগোপাল'। 'সুপার-ডুপার হিট' হল - ২০০০ রজনীও অতিক্রান্ত হল - যাত্রাপালার জগতে যা কখনো হয়নি। এরপর তাঁকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। যাত্রাপালায় অনবদ্য চরিত্রায়ণ করেন - লেনিন, স্টালিন, মাও ৎসে-তুং, কার্ল মার্কস, নেলসন ম্যান্ডেলা থেকে শুরু করে স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুসহ — জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নেতাদের সব চরিত্রেই।

প্রায় ছয় দশকের দীর্ঘ কর্মজীবনে শান্তিগোপাল তাঁর দল 'তরুণ অপেরা'-র মাধ্যমে গ্রামীণ বাংলায় যাত্রানাট্যের শিল্পকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন।[] এবং বামপন্থায় বিশ্বাসী তিনি যাত্রাপালার মাধ্যমে গ্রামীণ শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে জীবন উৎসর্গ করেন।

১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে, ৫২ বছর বয়সে, সুভাষচন্দ্র বসুর উপর ভিত্তি করে নির্মিত নাটক ‘আজাদ হিন্দের শেষ লড়াই’-এ অভিনয় শেষে তিনি চিরতরে যাত্রামঞ্চ ত্যাগ করেন।[]

যাত্রামঞ্চ ত্যাগ করার পরে শান্তিগোপাল বেশ কিছু নাট্যদলে কাজ করেন।২০০৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি 'নন্দিক' নামে একটি নাট্যদলও গঠন করে তিনি মঞ্চনাটক পরিচালনা করতেন।[] তবে আর পেরে ওঠেন নি। তাঁর শেষ অভিনয় ছিল গত ২০১১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে। তিনি তাঁর স্ত্রী চৈতালী পালের লেখা 'জনশত্রু' নাটকে[] একজন তেজস্বী স্কুল শিক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় করেন।[]

ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও কালজয়ী চল্লিশটি চরিত্রে অনন্য অভিনয়ের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন শান্তিগোপাল। তাঁর বিখ্যাত ও মঞ্চ কাঁপানো কয়েকটি যাত্রাপালার তালিকা নিচে দেওয়া হল-

  • ঘুম ভাঙার গান (১৯৬৭) পালাকার- শম্ভু বাগ
  • হিটলার (১৯৬৮)
  • লেনিন (১৯৬৯)
  • আমি সুভাষ (১৯৭১)
  • কার্ল মার্কস
  • স্টালিন
  • চেঙ্গিস খান
  • কালপুরুষ (বিরসা মুন্ডার বিদ্রোহী জীবন অবলম্বনে)
  • আট ঘণ্টা লড়াই (শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অধিকারের গল্প)
  • মাও সে-তুং
  • নেলসন ম্যান্ডেলা
  • সবে তো কলির সন্ধ্যা (১৯৯১)

১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিপ্রাপ্ত জনপ্রিয় বাংলা চলচ্চিত্র জব চার্ণকের বিবি তে অভিনয় করেন তিনি।[]

সম্মাননা

[সম্পাদনা]

যাত্রাসম্রাট শান্তিগোপাল তাঁর বহুমুখী প্রতিভায়, সংলাপ বলার স্বতন্ত্র শৈলীতে, অনবদ্য অভিনয়ে, যাত্রাপালা তথা বাংলার লোকনাট্যকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দেন। দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এমনকি বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমার দর্শকাসনে থেকে প্রশংসা করেছেন। লেনিন যাত্রাপালার নির্বাচিত অংশের অভিনয় করতে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আমন্ত্রণ পান। ১৪ দিনের সফরে বিভিন্ন সোভিয়েত রাশিয়ার বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করেন। লেনিনের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তাঁকে 'সোভিয়েত ল্যান্ড নেহেরু পুরস্কার' প্রদান করা হয়।[]

ব্যক্তিগত জীবন ও জীবনাবসান

[সম্পাদনা]

প্রবীণ লোকনাট্যশিল্পী তথা যাত্রাসম্রাট শান্তিগোপাল পাল ২০১২ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর সোমবার উত্তর কলকাতার উপকণ্ঠে বরাহনগরে নিজ বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পরলোকগমন করেন। তিনি স্ত্রী চৈতালী, এক কন্যা এবং পুত্র অনির্বাণ পালকে রেখে গেছেন। অনির্বাণও একজন যাত্রাশিল্পী।

যাত্রাশিল্পের মানোন্নয়নে এবং যাত্রাপালার সাথে শিল্পীদের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে "শান্তিগোপাল-তপন কুমার পুরস্কার" প্রবর্তন করে। []

যাত্রাজগতের কিংবদন্তি অভিনেতার বর্ণময় জীবন, তাঁর কালজয়ী পালা এবং যাত্রাশিল্পে তাঁর অবদান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে বিষ্ণুপদ ঘোষ বিরচিত গ্রন্থ যাত্রাসম্রাট শান্তিগোপাল শীর্ষক গ্রন্থে।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. "কলকাতার কড়চা - দুশো বছরে আলোকচিত্র - যাত্রাগোপাল"। সংগ্রহের তারিখ ২৪ মে ২০২৬
  2. "Jatra Samrat Shanti Gopal passes away"। সংগ্রহের তারিখ ২৩ মে ২০২৬
  3. 1 2 3 "Veteran 'Jatra' artist Shantigopal Pal dies"। সংগ্রহের তারিখ ২৩ মে ২০২৬
  4. 1 2 "Man who was Hitler"। সংগ্রহের তারিখ ২৬ মে ২০২৬
  5. 1 2 3 "The curtain falls"। সংগ্রহের তারিখ ২৬ মে ২০২৬
  6. "জব চার্ণকের বিবি"। সংগ্রহের তারিখ ২৩ মে ২০২৬
  7. "শান্তিগোপাল-তপন কুমার পুরস্কার" (পিডিএফ)। সংগ্রহের তারিখ ২৬ মে ২০২৬