শহীদ ওমর ফারুক

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

শহীদ ওমর ফারুক ১৯৭১ সালের ২৩শে মার্চ পিরোজপুরে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। তিনি তৎকালীন পিরোজপুর মহাকুমা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও পিরোজপুরের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৯শে মে স্বাধীন বাংলার পতাকা সহ পাকবাহিনীর হাতে তিনি ধরা পড়েন এবং তাকে বলা হয় "পাকিস্তান জিন্দাবাদ" বললে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে।মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও সে "জয় বাংলা" বলেছিল একারণে তার ব্যাগে থাকা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা লোহার রডে বেঁধে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে সেই রড ওমর ফারুকের মাথায় বিদ্ধ করে তাকে হত্যা করা হয় এবং বাকি সকল মুক্তিযোদ্ধাদের কে শিক্ষা দেয়ার জন্য রড বিদ্ধ অবস্থায় ওমর ফারুকের লাশ গাছের সাথে তিনদিন পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখা হয়। [১]

প্রাথমিক জীবন[সম্পাদনা]

ওমর ফারুকের জন্ম ১৯৫০ সালের ১২ মার্চ কাউখালী উপজেলার আমড়াজুড়ি গ্রামে। তার বাবার নাম মরহুম সৈয়দুর রহমান শরীফ। মায়ের নাম কুলসুম বেগম। ওমর ফারুকের বোন বর্তমান পিরোজপুর মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সালমা রহমান হ্যাপী ।এবং ছোট বোনের নাম রেশমা। [২]

শিক্ষা ও কর্মজীবন[সম্পাদনা]

ওমর ফারুক পিরোজপুরের সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের বি.কম শ্রেণির ছাত্র এবং একইসাথে সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের ভিপি ছিলেন ।তিনি তৎকালীন পিরোজপুর মহাকুমা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও পিরোজপুর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ছিলেন। [৩]

পিরোজপুরে প্রথম পতাকা উত্তোলন[সম্পাদনা]

২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশের সোনালী মানচিত্র অংকিত একটি পতাকা নিয়ে পিরোজপুরে আসেন ওমর ফারুক। পিরোজপুর শহরের টাউনক্লাব ময়দানের শহীদ মিনারের পাদদেশে ছাত্র জনতার অংশ গ্রহণে এক সমাবেশে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ওমর ফারুক পিরোজপুরে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। সেদিন ২৩ মার্চ  সকাল ১১ টার মধ্যে কানায় কানায় পূর্ন হয়ে যায় মাঠটি আর সকলের সামনেই পিরোজপুরের আকাশে প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন শহীদ ওমর ফারুক । [৪]

আন্দোলন ও অবদান[সম্পাদনা]

২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করলে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। এ সময় ওমর ফারুক এলাকার ছাত্র-যুবকদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন।এদিকে ২ মে পিরোজপুর ট্রেজারির কোষাগার লুট হয়। ৩ মে বরিশাল থেকে পাকিস্তানি বাহিনী এসে পিরোজপুর দখল করে নেয়। ট্রেজারি থেকে অস্ত্র নেওয়ার দায়ে ওমর ফারুকসহ তার সহযোগীদের নামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়। এ মামলায় তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হলে পিরোজপুরে প্রকাশ্যে চলার পথ বন্ধ হয়ে যায়। পিরোজপুরে না আসতে পেরে স্বরূপকাঠির আটঘর-কুড়িয়ানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা মৌজে আলী মিয়ার বাড়িতে আশ্রয় নেন ভারত যাওয়ার জন্য।৪ মে পিরোজপুর শহর দখল করে নেয় পাক সেনারা। ফারুক তখন জেলার স্বরুপকাঠীর আটঘর-কুড়িয়ানার পেয়ারা বাগানে থেকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ২৫ মে আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বরিশাল যান। সেখানে ঠিকানা পেয়ে মাটিভাঙা হয়ে ভারতের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন ওমর ফারুক। ২৯ মে ১৯৭১ সকাল ৬ টায় বাউলাকান্দা ফেরার পথে এক সময়ে পিরোজপুরে কর্মরত পুলিশ সদস্য হানিফ তাকে চিনে ফেলেন এবং আলবদরদের সহায়তায় আটক করে প্রথমে তাকে বরিশাল কোতোয়ালী থানায় নিয়ে যায়। পরদিন (৩০ মে ১৯৭১) তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় বরিশাল ৩০ গোডাউনের টর্চার সেলে। ৪ জুন বরিশালের কীর্তন খোলা নদীর তীরে ১৪ গোডাউন ঘাটের বধ্যভূমিতে নিয়ে ৩২ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের রক্ত পিপাসু নরপিচাশ কর্নেল আতিকের নির্দেশে সহযোদ্ধাদের নাম ও অবস্থান জানার জন্য অমানবিক নির্যাতন করা হয় ফারুককে।

ফারুকের সাথে আটক থাকা এক মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হক স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জানান, ফারুকের সাথে থাকা ব্যাগের ভিতর তল্লাশি চালিয়ে ৭ টি বাংলাদেশি পতাকা পেয়েছিল রাজাকাররা। তিনি জানান, নির্যাতনের সময় তাকে পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলতে বলা হয়। যতবার তাকে পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলতে বলা হয় ততবার সে তার শরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে জয় বাংলা বলে চিৎকার দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে কর্ণেল আতিকের নির্দেশে লোহার একটি রডের এক মাথায় সেই বাংলাদেশি একটি পতাকা বেধে অন্য অংশটি একটি হাতুরী দিয়ে টাকিয়ে টাকিয়ে ওমর ফারুকের মাথায় ঢুকিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। এক সময় শরীরের সব রক্ত ঝরে গেলে তার কন্ঠ অস্ফুট হয়ে আসে এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

আব্দুল হক আরো জানিয়েছিলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের শিক্ষা দিতে তিনদিন গাছের সাথে ঝুলিয়ে রেখেছিল পাক সেনারা। পরে  তার মৃত দেহটি কীর্তন খোলার উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে ছুড়ে ফেলে দেয় পাক হায়নারা।তার প্রিয়জনেরা আজও এই মৃত দেহের সন্ধান পায়নি। [৫][৬]

পিরোজপুর মুক্ত দিবস[সম্পাদনা]

পিরোজপুর মুক্ত দিবস ৮ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এ দিনে পিরোজপুর পাকহানাদার, রাজাকার ও আলবদর মুক্ত হয়। এই দিনে ঘরে ঘরে উড়েছিল লাল সবুজের বিজয় পতাকা। পিরোজপুরের ইতিহাসে এ দিনটি বিশেষ স্মরণীয় দিন।ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পিরোজপুরের অদূরে চালিতাখালী গ্রাম থেকে এক দড়িতে বেধে আনা হয় মোসলেম আলী শেখ, আব্দুর রহমান সরদার, খাউলবুনিয়ার আব্দুল গফ্ফার মাস্টার, জলিল হাওলাদার, জুজখোলার সতীশ মাঝি এবং শামছু ফরাজীসহ ১২ জন স্বাধীনতাকামীকে।তাঁদেরকে বলেশ্বরের বধ্যভূমিতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর দুপুর ১২ টায় তৎকালীন পিরোজপুর মহকুমা শহর শত্রুমুক্ত হয় এবং সমাপ্তি ঘটে দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের। পিরোজপুরের ঘরে ঘরে উত্তোলিত হয় বিজয়ের পতাকা মুক্তিযুদ্ধের সময় পিরোজপুর ছিল মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টরের অধীন সুন্দরবন সাব-সেক্টর মেজর জিয়াউদ্দিন আহমেদ এর কমান্ডের আওতায়। [২]

ওমর ফারুকের মায়ের অপেক্ষা[সম্পাদনা]

প্রায় অন্ধ মা কুলসুম বেগম এখনও রাস্তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন এই বুঝি বড় ছেলে ফিরল বলে।আর পুত্র শোকে শোকাতুর পিতা সৈয়দুর রহমান শরীফ স্বাধীনতার কিছুদিন পরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।ওমর ফারুকের বোন সালমা রহমান হ্যাপী বলেন, ‘আমার মা কুলসুম বেগম এখন মৃত্যুশয্যায়। সুস্থ থাকার সময় তিনি কোনোদিন আমাদের ঘরের দরজা বন্ধ করতে দেননি। বলতেন, দরজা খুলে রাখ, ফারুক এসে ডাক দিবে। আর দরজা বন্ধ দেখলে সে কষ্ট পাবে।’হ্যাপী আরও বলেন, ‘মায়ের নির্দেশে আমরা ভাইয়ের জন্য প্রতি বেলাতেই দু’মুঠো ভাত বেশি রান্না করতাম। মা বলত ফারুক কখন এসে বলে, মা ভাত দাও। [৭]

ওমর ফারুক সড়কের নামকরন ও স্মৃতি সংরক্ষণ[সম্পাদনা]

স্বাধীনতার পরে পিরোজপুর শহরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাটির নাম করণ করা হয়েছে শহীদ ওমর ফারুক সড়ক নামে।এছাড়াও পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদের একটি হলরুমের নাম রাখা হয়েছে শহীদ ওমর ফারুক ‌মিলনায়তন।বোন সালমা রহমান হ্যাপী ভাইয়ের নামে গড়ে তুলেছেন শহীদ ওমর ফারুক শিশু শিক্ষালয়,শহীদ ওমর ফারুক পাঠাগার পিরোজপুরের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন পর্যায়ে পাক বাহিনীর হাতে পৈশাচিক নৃশংসতায় শহীদ হয়েছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা, তাদের মধ্যে ২৮ জন মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য ১৯৭৮ সালে তৎতকালীন মহকুমা প্রশাসক ডঃ সালাহ উদ্দীনের উদ্যোগে বলেশ্বর নদীর পূর্বপাড়ে নির্মিত হয় একটি স্মৃতিসৌধ। এটি পরিচিতি লাভ করে পুরাতন খেয়াঘাট বধ্যভূমি হিসেবে। [৮]

ওমর ফারুককে নিয়ে চলচ্চিত্র ও ডকুমেন্ট[সম্পাদনা]

ওমর ফারুকের এই বাস্তব ঘটনা নিয়েই নির্মিত হচ্ছে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ওমর ফারুকের মা’।সরকারি অনুদানের এ চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন এম এম জাহিদুর রহমান বিপ্লব। ছবিটির কেন্দ্রীয় চরিত্র মা হিসেবে দিলারা জামান ও ওমর ফারুক চরিত্রে অভিনয় করবেন সাঈদ বাবু।এ ছাড়া অন্যান্য চরিত্রে দেখা যাবে বন্যা মির্জা, শাহেদ শরীফ খান, খাইরুল আলম সবুজ, নাজনীন হাসান চুমকি, সালমা রহমান, আইনুন পুতুল, রিপন চৌধুরী, কাজী রাজু, সৈয়দ শুভ্র, মুকুল সিরাজ, এ বি এম মোতাহারুল ইসলাম, প্রণব ঘোষ, রোশেন শরিফ, তুহিন আহমেদ প্রমুখ। [৯][১০]

এছাড়াও ওমর ফারুকের ঘটনা ও তার মায়ের ছেলের জন্য অপেক্ষার করুন কাহিনীর ডকুমেন্টারিটিতে ওমর ফারুক(বীর মুক্তিযোদ্ধা)কে হত্যার নির্মম কাহিনী এবং পরবর্তী সময়ে তার পরিবারের করুণ দিনযাপনের গল্প উঠে এসেছে এতে।তাকে রাজাকাররা নৃশংসভাবে হত্যা করে। ওমর ফারুকের মা মুক্তিযুদ্ধের ৪৫ বছর পরেও তার হারানো ছেলের ঘরে ফেরার প্রত্যাশায় দিন যাপন করেন। ন্যাশনাল পলিমার নির্মিত এই ভিডিওচিত্রে ফারুক চরিত্রে অভিনয় করেছেন জহুরুল ইসলাম ডালিম। এটি নির্মাণ করেছেন পরিচালক অতনু আদিত্য। [১১][১২]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "পিরোজপুর মুক্ত দিবস ৮ ডিসেম্বর - বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)"www.bssnews.net। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৯-১৯ 
  2. "পিরোজপুর সদর উপজেলা"http (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৯-১৯ 
  3. timetouchnews.com। "পিরোজপুরের শহীদ ওমর ফারুক"timetouchnews.com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৯-১৯ 
  4. "পিরোজপুরে প্রথম পতাকা উত্তোলণ করেন ওমর ফারুক"www.amaderbarisal.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৯-১৯ 
  5. "AmaderBarisal.com - পিরোজপুরে প্রথম পতাকা উত্তোলণ করেন ওমর ফারুক"www.amaderbarisal.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৯-১৯ 
  6. "মুক্তিযুদ্ধে পিরোজপুর"উইকিপিডিয়া। ২০২০-০৯-০৩। 
  7. BanglaTribune। "আজও অপেক্ষায় 'ওমর ফারুকের মা'"। BanglaTribune (ইংরেজি ভাষায়)। 
  8. "অন্যের সুখে হ্যাপি | কালের কণ্ঠ"Kalerkantho। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৯-১৯ 
  9. প্রতিবেদক, নিজস্ব। "এই টাকায় ছবি হয়?"Prothomalo। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৯-১৯ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  10. "শুরু হল 'ওমর ফারুকের মা'"sonalinews.com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৯-১৯ 
  11. "একজন ওমর ফারুক ও তার মা" 
  12. "একজন ফারুকের গল্প | বাংলাদেশ প্রতিদিন"Bangladesh Pratidin (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৯-১৯