বিষয়বস্তুতে চলুন

শরণার্থীদের অবস্থান সংক্রান্ত কনভেনশন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
শরণার্থীদের অবস্থানের সম্পর্কিত কনভেনশন
  শুধুমাত্র ১৯৫১ সালের কনভেনশনের পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র
  শুধুমাত্র ১৯৬৭ সালের প্রোটোকলের পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র
  উভয় কনভেনশন ও প্রোটোকলের পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র
  অপক্ষভুক্ত রাষ্ট্র
স্বাক্ষরপ্রদান২৮ জুলাই ১৯৫১
অবস্থানজেনেভা, সুইজারল্যান্ড
কার্যকর২২ এপ্রিল ১৯৫৪
স্বাক্ষরদানকারী১৪৫
পক্ষ
  • কনভেনশন: ১৪৬[]
  • প্রোটোকল: ১৪৭[]
স্বাক্ষীজাতিসংঘের মহাসচিব
সম্পূর্ণ পাঠ্য
উইকিসংকলনে 1951 Refugee Convention

শরণার্থীদের অবস্থানের সম্পর্কিত কনভেনশন, যা ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন বা ২৮ জুলাই ১৯৫১ সালের জেনেভা কনভেনশন নামেও পরিচিত, একটি জাতিসংঘ-প্রণীত বহুপাক্ষিক চুক্তি যা কে শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন তা নির্ধারণ করে এবং যারা আশ্রয় পেয়েছেন তাদের অধিকার এবং আশ্রয়দাতা দেশসমূহের দায়িত্ব নির্ধারণ করে। এই কনভেনশনে এমন কিছু ব্যক্তিকে শরণার্থী হিসেবে গণ্য না করার কথাও বলা হয়েছে, যেমন যুদ্ধাপরাধী। কনভেনশন অনুসারে, শরণার্থী ভ্রমণপত্রধারীরা কিছু ক্ষেত্রে ভিসাবিহীন ভ্রমণের সুবিধাও পেতে পারেন।

এই কনভেনশন ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্যনির্বাহী চুক্তির ৭৮ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে।[]

এই শরণার্থী কনভেনশন ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণার ১৪ অনুচ্ছেদের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বলা হয়েছে, নিপীড়নের শিকার ব্যক্তি অন্য দেশে আশ্রয় চাইতে পারবেন। একজন শরণার্থী, কনভেনশনে উল্লেখিত অধিকার ছাড়াও, কোন একটি দেশে অতিরিক্ত সুবিধা বা অধিকার পেতে পারেন।[]

এই কনভেনশনে ঘোষিত অধিকাংশ অধিকার আজও বলবৎ রয়েছে। তবে কেউ কেউ যুক্তি দেখিয়েছেন যে, একবিংশ শতাব্দীর জটিল শরণার্থী পরিস্থিতি—যেমন রাষ্ট্রের পরিবর্তিত চরিত্র, অর্থনৈতিক অভিবাসী, পরিবেশগত অভিবাসী, এবং আধুনিক যুদ্ধের ফলে জনসংখ্যা স্থানচ্যুতি—নতুন একটি চুক্তির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে যা এই পরিবর্তিত বাস্তবতা প্রতিফলিত করবে।[]

তবুও, পুনর্বহাল না করার নীতি (non-refoulement) অর্থাৎ শরণার্থীকে এমন দেশে ফেরত না পাঠানো যেখানে তার জন্য বিপদ রয়েছে—এর মতো মৌলিক নীতিগুলি এখনো কার্যকর রয়েছে এবং ১৯৫১ সালের কনভেনশন এই অধিকারগুলোর মূল উৎস। []

ইতিহাস

[সম্পাদনা]

১৯৫১ সালের কনভেনশনের পূর্বে, জাতিপুঞ্জ ১৯৩৩ সালের ২৮ অক্টোবর গৃহীত আন্তর্জাতিক শরণার্থীদের অবস্থান সম্পর্কিত কনভেনশন এর মাধ্যমে কিছু প্রশাসনিক ব্যবস্থার নীতিমালা নির্ধারণ করেছিল। এতে নানসেন সার্টিফিকেট ইস্যু, পুনর্বহাল (refoulement), আইনগত বিষয়াবলি, শ্রম পরিবেশ, শিল্প দুর্ঘটনা, কল্যাণ ও সাহায্য, শিক্ষা, করনীতি এবং পারস্পরিকতা থেকে অব্যাহতি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল, এবং শরণার্থীদের জন্য কমিটি গঠনের ব্যবস্থাও ছিল।[] তবে জাতিপুঞ্জের এই কনভেনশন প্রধানত উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন এবং রুশ বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট শরণার্থী সংকট মোকাবেলার জন্য তৈরি হয়েছিল এবং মাত্র নয়টি দেশ এটি অনুমোদন করেছিল, ফলে এর প্রভাব ছিল সীমিত।[]

১৯৫১ সালের কনভেনশন গৃহীত হয়েছিল ১৯৫১ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ-আয়োজিত শরণার্থী ও রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের অবস্থান সম্পর্কিত এক সম্মেলনে। কনভেনশনটি ১৯৫১ সালের ২৮ জুলাই অনুমোদিত হয় এবং ১৯৫৪ সালের ২২ এপ্রিল কার্যকর হয়। প্রাথমিকভাবে এটি ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারির পূর্ববর্তী ইউরোপীয় শরণার্থীদের সুরক্ষা দানের জন্য সীমিত ছিল (মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বাস্তুচ্যুতদের জন্য), তবে রাষ্ট্রসমূহ চাইলে একটি ঘোষণা দিয়ে এর আওতা অন্যান্য অঞ্চলের শরণার্থীদের ওপরও প্রয়োগ করতে পারত।

১৯৬৭ সালের প্রোটোকল সময়সীমা ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা বাতিল করে "যেকোন ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই" সকল শরণার্থীর ওপর প্রযোজ্য হয়। তবে পূর্বে কনভেনশনের দলভুক্ত রাষ্ট্রসমূহ যে ঘোষণাগুলি দিয়েছিল, তা বহাল রাখা হয়েছিল।[]

পক্ষভুক্ত রাষ্ট্রসমূহ

[সম্পাদনা]

২০ জানুয়ারি ২০২০ পর্যন্ত, ১৯৫১ সালের কনভেনশনে ১৪৬টি দেশ এবং ১৯৬৭ সালের প্রোটোকলে ১৪৭টি দেশ পক্ষভুক্ত হয়েছে।[][][] মাদাগাস্কার এবং সেন্ট কিটস ও নেভিস কেবলমাত্র কনভেনশনের পক্ষভুক্ত, অন্যদিকে কেপ ভার্দে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভেনেজুয়েলা কেবলমাত্র প্রোটোকলের পক্ষভুক্ত।

যুক্তরাষ্ট্র ১৯৬৮ সালে প্রোটোকলটি অনুমোদনের মাধ্যমে ১৯৫১ সালের মূল দলিলের অধিকাংশ বাধ্যবাধকতা (ধারা ২–৩৪) এবং প্রোটোকল দ্বারা সংশোধিত ধারা ১ এর আওতাভুক্ত হয়েছে, যা “রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন” হিসেবে বিবেচিত হয়।[]

শরণার্থীর সংজ্ঞা

[সম্পাদনা]

গ্র্যান্ডফাদার ধারা (ইংরেজি: Grandfather clause), যেটি গ্র্যান্ডফাদার নীতি, গ্র্যান্ডফাদারিং অথবা গ্র্যান্ডফাদার্ড ইন নামেও পরিচিত, একটি বিধান যার মাধ্যমে পুরাতন কোনো নিয়ম কিছু বিদ্যমান অবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য থাকে, যদিও নতুন নিয়ম ভবিষ্যতের সব পরিস্থিতিতে কার্যকর হয়। কনভেনশনের ধারা ১(ক) অনুসারে, পূর্ববর্তী কনভেনশন অনুযায়ী স্বীকৃত ব্যক্তিদের “গ্র্যান্ডফাদারিং” করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে:

... ১২ মে ১৯২৬ এবং ৩০ জুন ১৯২৮-এর চুক্তিসমূহ অথবা ২৮ অক্টোবর ১৯৩৩ এবং ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৮-এর কনভেনশন, ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯-এর প্রোটোকল অথবা আন্তর্জাতিক শরণার্থী সংস্থার সংবিধান অনুযায়ী ...

— তবে যারা পূর্ববর্তী ব্যবস্থার আওতায় শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হননি, তাদের এই উপধারা (খ)-এর আওতাভুক্ত হওয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়নি।

কনভেনশনের ধারা ১(খ)-এ শরণার্থীকে নিম্নরূপভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে:[১০][১১]

১ জানুয়ারি ১৯৫১ সালের পূর্ববর্তী ঘটনাবলির কারণে এবং জাতি, ধর্ম, জাতীয়তা, নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্যপদ অথবা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে নিপীড়নের যথার্থ আশঙ্কায় নিজের জাতীয় দেশের বাইরে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তি, যে দেশটির সুরক্ষা পেতে অক্ষম অথবা উক্ত আশঙ্কার কারণে সেই সুরক্ষার সুবিধা নিতে অনিচ্ছুক; অথবা যে ব্যক্তি, যার কোনো জাতীয়তা নেই এবং পূর্ববর্তী ঘটনাবলির ফলে নিজের পূর্ববর্তী বসবাসের দেশের বাইরে অবস্থান করছে, এবং যে ব্যক্তি উক্ত দেশে ফিরে যেতে অক্ষম অথবা উক্ত আশঙ্কার কারণে ফিরে যেতে অনিচ্ছুক।

সময়ের প্রবাহে এবং নতুন শরণার্থী সংকটের আবির্ভাবে, ১৯৫১ সালের কনভেনশনের নির্দিষ্ট তারিখভিত্তিক বিধানসমূহ পরবর্তী শরণার্থীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এর ফলে একটি শরণার্থীদের মর্যাদা সম্পর্কিত প্রোটোকল প্রস্তুত করা হয়, যা ৪ অক্টোবর ১৯৬৭ সালে কার্যকর হয়।[১২] জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের উপর এই প্রটোকলের আওতাভুক্ত শরণার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক সুরক্ষা প্রদানের দায়িত্ব অর্পিত হয়।[১৩] প্রোটোকল অনুযায়ী, শরণার্থী বলতে সেই সব ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যারা ১৯৫১ সালের কনভেনশনের সংজ্ঞার আওতাভুক্ত, তবে “১ জানুয়ারি ১৯৫১ সালের পূর্ববর্তী ঘটনাবলির কারণে ...” — এই শব্দসমূহকে বাদ দিয়ে সংজ্ঞাটি প্রয়োগ করা হয়েছে।[১৪]

কয়েকটি গোষ্ঠী ১৯৫১ সালের কনভেনশনকে ভিত্তি করে আরও বস্তুনিষ্ঠ[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] সংজ্ঞা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও তাদের পরিভাষা ১৯৫১ কনভেনশনের চেয়ে ভিন্ন, তবুও নতুন এই সংজ্ঞাসমূহের উপর কনভেনশনটির গভীর প্রভাব রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আফ্রিকান ইউনিটি সংস্থা (বর্তমানে আফ্রিকান ইউনিয়ন) কর্তৃক ১৯৬৯ সালে গৃহীত আফ্রিকায় শরণার্থী সমস্যার নির্দিষ্ট দিকসমূহ সম্পর্কিত কনভেনশন, এবং ১৯৮৪ সালের কার্টাজেনা ঘোষণা যা আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বাধ্যতামূলক না হলেও দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা, মেক্সিকোক্যারিবীয় অঞ্চলের জন্য আঞ্চলিক মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে।[১৫]

কিছু গবেষক মনে করেন যে এই সংজ্ঞাটি আধুনিক সমাজের প্রেক্ষাপটে অপর্যাপ্ত, কারণ উদাহরণস্বরূপ, পরিবেশগত শরণার্থীরা এই সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না।[১৬]

পক্ষগুলোর অধিকার ও দায়িত্ব

[সম্পাদনা]

আন্তর্জাতিক আইনের সাধারণ নীতিমতে, বলবৎ চুক্তিসমূহ স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক এবং তা সদিচ্ছার সঙ্গে পালন করতে হয়। যারা শরণার্থী সংক্রান্ত কনভেনশন অনুসমর্থন করেছে, তারা নিজেদের ভূখণ্ডে অবস্থানরত শরণার্থীদের কনভেনশনের শর্তানুযায়ী সুরক্ষা প্রদান করতে বাধ্য।[১৭]

শরণার্থীরা বাধ্য থাকবে:

  • স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলোর জাতীয় আইন মেনে চলতে (ধারা ২)

স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলো বাধ্য থাকবে:

  • তিন বছরের মধ্যে শরণার্থীদের পুনঃপ্রতিদানযোগ্যতা থেকে অব্যাহতি দিতে (ধারা ৭): এর অর্থ, একটি শরণার্থীকে কোনো অধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে তার নিজ দেশের অনুরূপ আচরণের শর্ত আরোপ করা যাবে না, কারণ শরণার্থীরা তাদের নিজ দেশের সুরক্ষা ভোগ করে না।[১৭]
  • জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে, প্রাথমিকভাবে শরণার্থীদের বিরুদ্ধে সাময়িক পদক্ষেপ নিতে পারবে (ধারা ৯)
  • শরণার্থীদের ব্যক্তিগত অবস্থা এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট অধিকার, বিশেষ করে বৈবাহিক অধিকারকে সম্মান করতে হবে (ধারা ১২)
  • শরণার্থীদের আদালতে অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে (ধারা ১৬)
  • শরণার্থীদের প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করতে হবে (ধারা ২৫)
  • শরণার্থীদের জন্য পরিচয়পত্র প্রদান করতে হবে (ধারা ২৭)
  • শরণার্থীদের ভ্রমণপত্র সরবরাহ করতে হবে (ধারা ২৮)
  • শরণার্থীদের তাদের সম্পদ স্থানান্তরের সুযোগ দিতে হবে (ধারা ৩০)
  • শরণার্থীদের অধিবাস গ্রহণ ও নাগরিকত্ব লাভের সুযোগ প্রদান করতে হবে (ধারা ৩৪)
  • জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (UNHCR) সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে (ধারা ৩৫), যাতে সংস্থাটি কনভেনশনের শর্তাবলীর বাস্তবায়ন তদারকি করতে পারে।[১৭]
  • জাতীয়ভাবে গৃহীত আইনসমূহ সম্পর্কে তথ্য দিতে হবে, যা কনভেনশন বাস্তবায়নের জন্য প্রণীত হয়েছে (ধারা ৩৬)[১৭]
  • অন্য স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বিরোধ দেখা দিলে, যদি অন্য উপায়ে নিষ্পত্তি সম্ভব না হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে নিষ্পত্তির জন্য নিয়ে যেতে হবে (ধারা ৩৮)

স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলো যা করতে পারবনা।

  • শরণার্থীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করতে (ধারা ৩)
  • কেবলমাত্র জাতীয়তার ভিত্তিতে কোনো শরণার্থীর বিরুদ্ধে ব্যতিক্রমধর্মী ব্যবস্থা নিতে (ধারা ৮)
  • শরণার্থীদের কাছ থেকে এমন কর বা রাজস্ব দাবি করতে যা তাদের নিজ দেশের নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য নয় (ধারা ২৯)
  • যারা অবৈধভাবে প্রবেশ করেছে, কিন্তু বিলম্ব না করে আত্মসমর্পণ করেছে—তাদেরকে শাস্তি দিতে (ধারা ৩১); এই ধারাটি সাধারণভাবে এভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যে, আশ্রয়প্রার্থীদের অবৈধ প্রবেশ ও অবস্থানকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।[১৮]
  • শরণার্থীদের বহিষ্কার করতে (ধারা ৩২)
  • শরণার্থীদের জোরপূর্বক সেই দেশে ফেরত পাঠাতে যেখান থেকে তারা পালিয়ে এসেছে (ধারা ৩৩)। ব্যাপকভাবে স্বীকৃত যে, জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো নিষিদ্ধ—এটি আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের অংশ। এর অর্থ হলো, এমনকি যারা ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের পক্ষভুক্ত নয়, তারাও non-refoulement বা 'অফেরত পাঠানোর' নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বাধ্য।[১৭] এই নীতির লঙ্ঘন ঘটলে, জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে হস্তক্ষেপ করতে পারে এবং প্রয়োজনে জনসাধারণকে অবহিত করতে পারে।[১৭]

শরণার্থীদের ন্যূনতমভাবে নিজ দেশের নাগরিকদের মতো আচরণ পেতে হবে নিম্নলিখিত বিষয়ে:

  • নিজ ধর্ম পালন করার স্বাধীনতা (ধারা ৪)
  • শিল্পকলা ও শিল্পসম্পত্তির অধিকার রক্ষা (ধারা ১৪)
  • রেশনিং ব্যবস্থার অধিকার (ধারা ২০)
  • প্রাথমিক শিক্ষা (ধারা ২২)
  • জনসেবা ও সহায়তা (ধারা ২৩)
  • শ্রম আইন ও সামাজিক নিরাপত্তা (ধারা ২৪)

শরণার্থীদের ন্যূনতমভাবে অন্যান্য বিদেশিদের মতো আচরণ পেতে হবে নিম্নলিখিত বিষয়ে:

  • অস্থাবর ও স্থাবর সম্পত্তি (ধারা ১৩)
  • শ্রমিক ইউনিয়ন বা অন্যান্য সমিতিতে যুক্ত হওয়ার অধিকার (ধারা ১৫)
  • মজুরি-ভিত্তিক চাকরি (ধারা ১৭)
  • আত্মনিয়োজিত পেশা বা ব্যবসা (ধারা ১৮)
  • মুক্ত পেশায় নিয়োজিত হওয়া (ধারা ১৯)
  • আবাসন সুবিধা (ধারা ২১)
  • প্রাথমিকের ঊর্ধ্বে শিক্ষা (ধারা ২২)
  • দেশের ভেতরে মুক্ত চলাচল ও বাসস্থানের স্বাধীনতা (ধারা ২৬)

অননুগততা

[সম্পাদনা]

চুক্তির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সংস্থা নেই। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের উপর তত্ত্বাবধানমূলক দায়িত্ব অর্পিত হলেও তারা এই কনভেনশন বাস্তবায়নে জোর প্রয়োগ করতে পারে না। ব্যক্তি পর্যায়ে অভিযোগ দাখিলের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। চুক্তিতে বলা হয়েছে যে, অননুগততার অভিযোগ আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে উপস্থাপন করা উচিত।[১৯] এখন পর্যন্ত কোনো দেশ এই পথে অগ্রসর হয়েছে বলে জানা যায় না।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

একজন ব্যক্তি আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত চুক্তির আওতায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটি বা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংক্রান্ত চুক্তির আওতায় জাতিসংঘ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংক্রান্ত কমিটিতে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন, কিন্তু এখনও পর্যন্ত শরণার্থী চুক্তিভঙ্গের জন্য এমন কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।

চুক্তিভঙ্গকারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অন্য রাষ্ট্রসমূহ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশ এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

বর্তমানে চুক্তি লঙ্ঘনের বাস্তব পরিণতি বলতে যা দেখা যায়, তা হলো: ১) গণমাধ্যমে জনসমক্ষে সমালোচনা এবং ২) জাতিসংঘ ও অন্যান্য রাষ্ট্রের মৌখিক নিন্দা। তবে বাস্তবে এই পদক্ষেপগুলো তেমন কার্যকর প্রতিরোধ হিসেবে প্রমাণিত হয়নি।[২০]


সমালোচনা ও সাম্প্রতিক বিতর্ক

[সম্পাদনা]

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) মিশরের নতুন "বিদেশিদের আশ্রয় আইন" নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থাটি জানায়, এই আইন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এটি ১৯৫১ শরণার্থী কনভেনশন ও আফ্রিকান শরণার্থী কনভেনশনের লঙ্ঘন করে।[২১]

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অভিযোগ করে যে খসড়া আইনটি জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার বা অধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই তৈরি হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক কার্যকলাপে নিষেধাজ্ঞা, আইনগত সহায়তার ঘাটতি ও অবৈধ অনুপ্রবেশকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—যা কনভেনশনের ৩১ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী।[২১]

আইনে কিছু মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হলেও, শরণার্থীদের মর্যাদা বাতিলের ব্যাপারে অতিরিক্ত ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে যা স্বেচ্ছাচারিতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এছাড়াও, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ "স্থায়ী শরণার্থী বিষয়ক কমিটি" গঠন নিয়েও উদ্বেগ জানায়, যা জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে।

এই আইনটি সুদানের সংঘাতজনিত শরণার্থী সংকটের প্রেক্ষাপটে প্রণীত হলেও, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন সংস্থা এটিকে মানবাধিকারের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।[২২]

২০২১ সালে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা অভিযোগ তোলে যে গ্রিসের ‘পুশব্যাক’ নীতি ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন লঙ্ঘন করছে।  [২৩]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 3 "Chapter V – Refugees and Stateless Persons"United Nations Treaty Series। ২২ জুলাই ২০১৩। ১৪ নভেম্বর ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২২ জুলাই ২০১৩
  2. "Consolidated Version of the Treaty on the Functioning of the European Union"Official Journal of the European Union। ২৬ অক্টোবর ২০১২। সংগ্রহের তারিখ ৬ জুন ২০২৩
  3. Convention relating to the Status of Refugees, Article 5.
  4. Schoenholtz, Andrew I. (২০১৫)। "The New Refugees and the Old Treaty: Persecutors and Persecuted in the Twenty-First Century"Chicago Journal of International Law১৬ (1)। এসএসআরএন 2617336। সংগ্রহের তারিখ ৬ জুন ২০২৩
  5. 1 2 3 Jaeger, Gilbert (সেপ্টেম্বর ২০০১)। "On the history of the international protection of refugees" (পিডিএফ)International Review of the Red Cross৮৩ (843): ৭২৭–৭৩৭। ডিওআই:10.1017/S1560775500119285এস২সিআইডি 145129127
  6. "No. 8791 Protocol relating to the Status of Refugees. Done at New York, on 31 January 1967"। Treaty Series – Treaties and international agreements registered or filed and recorded with the Secretariat of the United Nations (পিডিএফ)। খণ্ড ৬০৬। United Nations। ১৯৭০। পৃ. ২৬৮। সংগ্রহের তারিখ ১৯ অক্টোবর ২০১৩
  7. UNHCR: States Parties to the Convention and Protocol, সংগৃহীত ১৫ জুলাই ২০১০
  8. "Chapter V – Refugees and Stateless Persons"United Nations Treaty Series। ২২ জুলাই ২০১৩। ১ এপ্রিল ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২২ জুলাই ২০১৩
  9. Joan Fitzpatrick, "The International Dimension of U.S. Refugee Law", 15 Berkeley J. Int'l. Law 1, Berkeley Law Scholarship Repository, 1997
  10. United Nations High Commission for Refugees. (2012). Text of Convention. সংগ্রহের তারিখ ৫ মে ২০১২। ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৭ জুন ২০১২ তারিখে
  11. "What is a Refugee? Definition and Meaning | USA for UNHCR"unrefugees.org। সংগ্রহের তারিখ ২৩ অক্টোবর ২০২২
  12. United Nations High Commission for Refugees 2011 § C(8).
  13. United Nations High Commission for Refugees 2011 § E(14).
  14. Protocol Relating to the Status of Refugees of 31 January 1967 – English text, Article I § 2.
  15. UNHCR. "La Situación de los Refugiados en América Latina: Proteccion y Soluciones Bajo el Enfoque Pragmático de la Declaración de Cartagena Sobre los Refugiados de 1984". 2004 (in Spanish). http://www.oas.org/DIL/xxxiv/Documentos/Juan%20Carlos%20Murillo/JCMurillo.DOCUME~1.DOC
  16. Lee, Eun Su; Szkudlarek, Betina; Nguyen, Duc Cuong; Nardon, Luciara (এপ্রিল ২০২০)। "Unveiling the Canvas Ceiling: A Multidisciplinary Literature Review of Refugee Employment and Workforce Integration"International Journal of Management Reviews২২ (2): ১৯৩–২১৬। ডিওআই:10.1111/ijmr.12222আইএসএসএন 1460-8545এস২সিআইডি 216204168
  17. 1 2 3 4 5 6 UNHCR: Refugee protection: A Guide to International Refugee Law, 2001, আইএসবিএন ৯২-৯১৪২-১০১-৪, সংগৃহীত: ১৯ আগস্ট ২০১৫
  18. Yewa Holiday (২৪ মার্চ ২০১৭)। "The Problem with the Prosecution of Refugees"। University of Oxford, Faculty of Law। সংগ্রহের তারিখ ১ জুলাই ২০১৮[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  19. Convention relating to the Status of Refugees, Article 38.
  20. "Crikey clarifier: does Australia's refugee policy breach UN rules?"crikey.com.au। ২৯ নভেম্বর ২০১২। সংগ্রহের তারিখ ২৩ অক্টোবর ২০২২
  21. 1 2 "Egypt's new asylum law violates international refugee rights: HRW"www.jurist.org (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ১৬ জুন ২০২৫
  22. "Egypt urged to reject new refugee law for violating international refugee rights"Jurist। সংগ্রহের তারিখ ১৪ জুন ২০২৫
  23. AA, DAILY SABAH WITH (৩ মার্চ ২০২১)। "'Greece's migrant pushbacks clear violation of Refugee Convention'"Daily Sabah (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১৬ জুন ২০২৫