বিষয়বস্তুতে চলুন

শবনম (উপন্যাস)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

শবনম সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত একটি প্রেমের উপন্যাস, যা ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি আফগানিস্তানে অবস্থানরত এক বাঙালি যুবক মজনূন এবং তুর্কি বংশোদ্ভূত আফগান তরুণী শবনমের প্রেমকাহিনী নিয়ে রচিত। তাদের প্রথম দেখা, পরিচয়, প্রেম, বিবাহ এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে তাদের বিচ্ছেদ—এই সবই উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু। লেখকের কাব্যিক ভাষা, বহুভাষার ব্যবহারে সমৃদ্ধ সংলাপ এবং দার্শনিক ভাবনা উপন্যাসটিকে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করেছে।

শবনম
লেখকসৈয়দ মুজতবা আলী
অনুবাদকনাজেস আফরোজ
প্রচ্ছদ শিল্পীধ্রুব এষ
প্রকাশনার স্থানবাংলাদেশ
ভাষাবাংলা
বিষয়প্রেম
ধরনচিরায়ত বাংলা উপন্যাস
প্রকাশকপ্রথম: ত্রিবেণী প্রকাশন , বর্তমান: স্টুডেন্ট ওয়েজ
প্রকাশনার তারিখ
প্রথম: জানুয়ারি ১৯৬০, বর্তমান: ২০১৫
ইংরেজিতে প্রকাশিত
২০১৫
মিডিয়া ধরনমুদ্রিত গ্রন্থ
পৃষ্ঠাসংখ্যা১৪৪ (৩য় সংস্করণ) , ২১৯ (সর্বপ্রথম)
আইএসবিএন ৯৮৪১৮০০৬৭৫

কাহিনী সংক্ষেপ

[সম্পাদনা]

মজনুন, সিলেটের এক বাঙালি যুবক, আফগানিস্তানের কাবুল শহরে কলেজে পড়ানোর জন্য যান। সেখানে তার সহকারী আবদুর রহমানের সঙ্গে বসবাস করেন। কাবুলে অবস্থানকালে মজনুন সর্দার আওরঙ্গজেবের কন্যা শবনম বানুর সঙ্গে পরিচিত হন এবং প্রথম দর্শনেই তার প্রেমে পড়েন। শবনমের সৌন্দর্য ও বুদ্ধিমত্তা মজনূনকে মুগ্ধ করেতাদের মধ্যে গভীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একসময় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধও হয়। কিন্তু আফগানিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তাদের সুখের সময় দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
তারপর?

চরিত্রসমূহ

[সম্পাদনা]
  • মজনূন – উপন্যাসের নায়ক, সিলেটের বাঙালি যুবক, আফগানিস্তানে শিক্ষক।
  • শবনম – উপন্যাসের নায়িকা, সর্দার আওরঙ্গজেবের কন্যা, তুর্কি বংশোদ্ভূত আফগান তরুণী।

শবনমের রূপের বর্ণনা লেখকের ভাষায় শোনা যাক,

এমন সময় গটগট করে বেরিয়ে এলেন এক তরুণী। প্রথম দেখেছিলুম কপালটি। যেন তৃতীয়ার ক্ষীণচন্দ্র। শুধু, চাঁদ হয় চাপা বর্ণের, এর কপালটি একদম পাগমান পাহাড়ের বরফের মতোই ধবধবে সাদা। নাকটি যেন ছোট বাঁশী। ওইটুকুন বাঁশীতে কি করে দুটো ফুটো হয় জানি নে। নাকের ডগা আবার অল্প অল্প কাঁপছে। গাল দুটি কাবুলেরই পাকা আপেলের মত লাল টুকটুকে, তবে তাতে এমন একটা শেড রয়েছে যার থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় এটা রুজ দিয়ে তৈরী নয়। চোখ দুটি লাল না সবুজ বুঝতে পারলুম না। পরনে উত্তম কাটের গাউন। জুতো উচু হিলের।

আবার শবনমের মুখে একফোঁটা ঘাম দেখে মাজনূন:

শবনমের মুখে শবনম!

রচনার ইতিহাস

[সম্পাদনা]

সৈয়দ মুজতবা আলী তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শবনম উপন্যাসটি রচনা করেন। তিনি আফগানিস্তানের কাবুলে শিক্ষকতা করার সময় সেখানকার সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। এই অভিজ্ঞতাগুলোই শবনম উপন্যাসের পটভূমি ও চরিত্র সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ‘শবনম’ বইটি প্রকাশের পূর্বে ৩ বৈশাখ ১৩৬৭ থেকে ১১ ভাদ্র ১৩৬৭ পর্যন্ত কলকাতার একটি পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় বইয়ের কাহিনি। শবনম ১৯৬০ সালে প্রথম গ্রন্থ আকারে বের হয় অধুনালুপ্ত ত্রিবেণী প্রকাশন থেকে। প্রথম সংস্করণের পৃষ্ঠাসংখ্যা ২১৯, দাম ছিল পাঁচ টাকা।

উক্তি

[সম্পাদনা]

মূল : শবনম উপন্যাসের উক্তি

  • "সরল হৃদয় মনে করে প্রেম লুকায়ে রাখিতে পারে
    কাঁচের ফানুস মনে ভাবে লুকায়েছে শিখাটারে।"

  • "আমার বিরহে তুমি অভ্যস্ত হয়ে যেয়ো না।
    আমার মিলনে তুমি অভ্যস্ত হয়ে যেয়ো না।"

  • "কে বল সহজ, ফাঁকা যাহা তারে, কাঁধেতে বহিতে যাওয়া।
    জীবন যতই ফাঁকা হয়ে যায়, ততই কঠিন বওয়া।"

  • শত্রু বেদনা দেয় মিলনে, মিত্র দেয় বিরহে।

  • গোড়া আর শেষ, এই সৃষ্টির জানা আছে, বল কার?
    প্রাচীন এ পুঁথি, গোড়া আর শেষ পাতা কটি ঝরা তার?

  • "হে খুদা, আদম এবং হাওয়ার মধ্যে, ইউসুফ এবং জোলেখার মধ্যে, হজরৎ এবং খাদিজার মধ্যে যে প্রেম ছিল, এ দুজনার ভিতর সেই রকম প্রেম হোক।"

  • আরও

গুণীজনের মন্তব্য

[সম্পাদনা]

শবনম উপন্যাসটি সম্পর্কে বিভিন্ন লেখক,পাঠক,সমালোচকসহ অনেক ব্যক্তিবর্গ তাদের মতামত প্রকাশ করেছেন।

মিলন, বিচ্ছেদ, পুনর্মিলন-অ-দৃশ্য লোকে পুনর্মিলন-এই তিনে মিলে প্রেমজীবনের পূর্ণতা, প্রেমিকের সার্থকতা। 'শবনম্' উপন্যাসে লেখক অশেষ নৈপুণ্যে পাঠককে বস্তুলোক থেকে জ্যোতির্লোকে নিয়ে গেছেন। মরমীয়া (মিস্টিক) সাধনার পথে পৌঁছে দিয়েছেন নায়ককে। উপন্যাসের শেষে এই পরম-প্রাপ্তিতে নায়কের ভালোবাসার সিদ্ধি। লেখকের শিল্পসাধনার পরম সার্থকতা। (বিশদ আলোচনার জন্য পশ্য পশ্য বর্তমান বর্তমান লেখকের 'মধ্যাহ্ন থেকে সায়াহ্নে বিংশ শতাব্দীর বাংলা উপন্যাস')। []

  • অহনা বিশ্বাস বলেছেন,

দেশকাল ধর্ম মানবিকতা সব মিলিয়ে এমন উপন্যাস, আহা, একালে লেখা হয় না কেন একটাও। []

ইহা কি উপন্যাস? হঠাৎ এই প্রশ্নটি মনে উদয় হইল কেন? দেখিতেছি, ইহাতে ‘নায়ক’ (মজনূঁন), ‘নায়িকা’ (শবনম) অদৃশ্যপ্রায় ক্ষীণ-সূত্র নির্ভর একটি ঘটনা (কাবুলে বাচ্চা-ই-সাকার উত্থান-পতন) এমনকি সংলাপ (আসলে ‘প্রলাপ’) ও ট্র্যাজেডি বা বিষাদান্ত্য পরিণতি (প্রকৃতপক্ষে ‘বিরহ’) প্রভৃতি উপন্যাসসুলভ যাবতীয় বস্তু বর্তমান। তথাপি এই জাতীয় একটা অদ্ভুত প্রশ্ন মনে জাগিয়া উঠিল কেন? কারণ ঘটনাপ্রবাহসঞ্জাত চরিত্র সৃষ্টিই উপন্যাসের মূল উপাদান এবং ইহাই ইহাতে অনুপস্থিত। তবে, ইহা কি একখানি নাটক? না, তা কিছুতেই নহে। কারণ নাটকের কোন লক্ষণই ইহাতে বর্তমান নাই। তবে ‘শবনম’ কি সাহিত্যের চির অভিজাত শাখা-কাব্য? কিন্তু, ছন্দোবদ্ধ কাব্য তো ইহাতে দেখিতেছি না। কি করিয়া ইহাকে কাব্য বলিব? তথাপি মন সোল্লাসে বলিয়া উঠে, ভাবমধুর ও রসঘন বাক্যের সমাহার যদি ‘কাব্য’ নামে অভিহিত হয়- তাহা পদ্যে রচিত হউক বা গদ্যে লিখিত হউক- ‘শবনম’ নিশ্চয়ই একখানা ‘কাব্য’-না, একখানা সৃষ্টিমুখর প্রেমকাব্য।”

এছাড়াও, অনেক পাঠক ও সমালোচক শবনম-কে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা প্রেমের উপন্যাস হিসেবে বিবেচনা করেন। তারা মনে করেন, উপন্যাসটির ভাষাশৈলী, চরিত্র চিত্রণ ও কাহিনীর গভীরতা বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।

উৎসর্গপত্রে লেখক

[সম্পাদনা]

অমরাত্মা রাজশেখরকে সাহিত্যাচার্য পরম শ্রদ্ধাস্পদ রাজশেখর বসুকে এক খানা পুস্তক উৎসর্গ করিবার বাসনা আমি বহুকাল ধরিয়া মনে মনে পোষণ করিয়াছি, কিন্তু স্বরচনার মূল্য সম্বন্ধে সর্বদাই সন্দিহার থাকি বলিয়া সাহস সঞ্চয় করিতে পারি নাই। গত পৌষ তাঁহার শরীর অকম্মাৎ অত্যন্ত অসুস্থ হইয়া পড়াতে সর্ব শঙ্কাসঙ্কোচ ত্যাগ করিয়া তাঁহার দৌহিত্রের মাধ্যমে আমার মনস্কামনা পূর্ণ করিবার জন্য তাঁহার অনুমতি ভিক্ষা করি। রাজশেখর সহাদয় সজ্জন ছিলেন ~ তাঁহার সদর অনুমতি লাভ করিয়া অবিক্ষন কৃতকৃতার্থ হয়। আজ আমার ক্ষোভ অপরিসীম বা স্বহস্তে তাঁহার চরণকমলে পুস্তিকাখানি নিবেদন করিতে পারিলাম না।

[]

সত্যতা

[সম্পাদনা]

মুজতবা আলীর ভ্রমণ কাহিনীর ঘ্রাণ শবনমেও পাওয়া যাবে, উপন্যাসটি আত্মবর্ণনায় লেখা বলে, পাঠকের বারবার মনে হবে, সত্যিই কি মুজতবা আলীর সাথে শবনম নামের কোনো নারীর প্রণয় ছিল? সে জিজ্ঞাসার উত্তর তিনি নিজেই দিয়েছেন, তার ভ্রাতুষ্পুত্র, বাংলাদেশ সরকারের সাবেক রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীর প্রশ্নে,

বাঘে মানুষ খায়, এটা সত্যি তো, না কি? হ্যাঁ, তা তো বটেই।’ তা হলে এই বাঘে মানুষ খেয়েছে কি না তা দিয়ে কম্মটা কী? কী আর বলব, বোকার মতো মুখ করে বসে রইলাম। চাচা বললেন, “শোনো, যুবক-যুবতী প্রেম করে, সেটা যেমন সত্যি, এই গপ্পও তেমনই সত্যি! তবে তুমি যেহেতু গাড়ল, তাই খোলসা করে বলছি। কাবুলে থাকাকালীন একজন কাবুলি নারীর সঙ্গেই আমার পরিচয় হয়েছিল। সে আমার বাড়ি রোজ সকালে দুধ দিয়ে যেত। তার বয়স ৮০!” আমার বিস্ময় কাটানোর জন্যই বোধহয় আরও একটু যোগ করেছিলেন চাচা, “ভাতিজা, বাড়াও, বাড়াও! কল্পনাশক্তিটা আর একটু বাড়াও হে!” [] "

পাদটীকা

[সম্পাদনা]
  1. পৃষ্ঠা ৫১, সৈয়দ মুজতবা আলী জন্মশতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ,মিত্র ও ঘোষ পাব্লিশার্স প্রাঃ লিঃ , ২০০৪
  2. পৃষ্ঠা ৫৪, সৈয়দ মুজতবা আলী জন্মশতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ,মিত্র ও ঘোষ পাব্লিশার্স প্রাঃ লিঃ , ২০০৪
  3. উৎসর্গ পাতা, শবনম , সৈয়দ মুজতবা আলী
  4. আনন্দবাজার পত্রিকা

আরও পড়ুন

[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]