লেত্রঁজে

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

লেত্রঁজে (L'Étranger) নোবেল বিজয়ী ফরাসি সাহিত্যিক আলবেয়ার কামু'র সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস। ১৯৪২ সালে এটি ইংরেজিতে অনুদিত হয়। ইংরেজি শিরোনাম দেয়া হয় দ্য আউটসাইডার অথবা দ্য স্ট্রেঞ্জার, এবং এই নামেই এটি বহির্বিশ্বে বেশি পরিচিত।

দ্য আউটসাইডার সম্পর্কে কামুর কথা[সম্পাদনা]

বেশ অনেকদিন আগে দ্য আউটসাইডার'কে আমি একটিমাত্র বাক্যে তুলে ধরেছিলাম: যে ব্যক্তি মায়ের শবযাত্রায় কাঁদে না, আমাদের সমাজ মনে করে তাকে মৃত্যদন্ড দেয়া উচিত। আমার ধারণা বাক্যটি কিছু কিছু পাঠকের কাছে বেশ হেঁয়ালিপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। তবে আমি শুধু এটুকুই বোঝাতে চেয়েছি যে, উপন্যাসটির নায়ককে অভিযুক্ত করার কারণ হলো সে আর সবার মতো গড্ডালিকা-প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয় না। এই অর্থে সে সমাজের কাছে একজন বাইরের লোক, একজন আগন্তুক।সে যেন জীবনের পাড় ঘেষে হাঁটছে, শহর নয় বরং শহরতলীতেই তার উপস্থিতি, একাকী এবং অনুভূতিপ্রবণ। একারণেই হয়তো কোন কোন পাঠক তাকে পতিত বলে মনে করেছেন। কিন্তু তার চরিত্রকে আরো ভালো করে বুঝতে হলে, অন্তত লেখকের মনে যে ছবিটি ছিল তাকে আরেকটু স্পষ্ট করে জানতে হলে, নায়ক মরসোঁ ঠিক কোন পন্থায় সবাই যা করে চলেছে তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তা বুঝতে হবে। উত্তরটা সরল: সে মিথ্যা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। শুধুমাত্র যা সত্য নয় সেটা বলাই মিথ্যা নয়, সত্যকে বাড়িয়ে বলাটাও একপ্রকার মিথ্যা। একিভাবে মানব হৃদয়ের বেলায়, একজন যা অনুভব করছে তারচে বেশী বলাটাও মিথ্যা বলা। জীবনকে সরলতর করতে আমরা সবাই প্রতিটি দিন এটা করে থাকি। কিন্তু মরসোঁ জীবনকে সরলতর করতে চায়নি। সে নিজে যা, শুধু সেটাই সে বলে, নিজের অনুভূতিকে আড়াল করতে অস্বীকৃতি জানায়। স্বভাবতই এতে করে সমাজ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, তাকে সময়োচিত রীতি মেনে কৃত অপকর্মের জন্য অনুশোচনা করতে বললে, সে উত্তরে বলে, এধরনের কাজে সে অকৃত্রিম অনুশোচনার জায়গায় বরং বিরক্তি বোধ করে। আর এই ন্যুয়াঁস(nuance)-ই তাকে সমাজের চোখে নিন্দিত করে তোলে।

তাই, আমার মতে, মরসোঁ পতিত নয়, বরং একজন দুঃখী এবং অনাবৃত মানুষ, যে এমন এক সূর্যকে ভালোবাসে যার আলো দূর করে দেয় সব ছায়া। তাকে একজন আবেগ বিবর্জিত মানুষ মনে করাটা ঠিক হবে না, বরং সে এক অবিচল ও নিগূঢ় ভালোবাসা দ্বারা তাড়িত: পরম এবং সত্যের প্রতি ভালোবাসা। জীবন ও অনুভূতিজাত এই সত্য আজো সমাজের চোখে ক্ষতিকর মনে হলেও, এটাকে বাদ দিয়ে আত্মজয় কিংবা বিশ্বজয় কখনোই সম্ভব হবে না।

কাজেই দ্য আউটসাইডার'কে যার বীর হওয়ার প্রতি বিন্দুমাত্র আকর্ষণ নেই, কিন্তু সত্যের জন্যে যে মৃত্যুকে হাসিমুখে আলিঙ্গন করতে প্রস্তুত এমন একজন মানুষের গল্প হিসাবে বিবেচনা করলে খুব একটা ভুল হবে না। আমি আরো একবার হেঁয়ালি করে বলেছিলাম যে, মরসোঁ চরিত্রটিকে আমি এমনভাবে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি, যাতে মনে হবে একমাত্র সেই হতে পারে আমাদের ক্রাইস্ট। আমার দেয়া এখনকার ব্যাখ্যার মাধ্যমে আশা করি এটা পরিষ্কার হবে যে, আমি ঈশ্বরকে নিন্দা করিনি। বরং একজন শিল্পীর তার তৈরি চরিত্রগুলির প্রতি যেমন বিদ্রূপমাখা একপ্রকার ভালোবাসা থাকতে পারে, এটা তেমনি এক অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ।(আলবেয়ার কামু: ৮ ই জানুয়ারি, ১৯৫৫)