বিষয়বস্তুতে চলুন

লুও ঈগলস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
লুও ঈগলেটস; কবরস্থানের রক্ষক, ওজসিচ কোসাকের চিত্রকর্ম, ১৯২৬, ক্যানভাসে তেলরং, ৯০ x ১২০ সেমি, পোলিশ আর্মি মিউজিয়াম, ওয়ারশ

লুও ঈগলস (পোলীয়: Orlęta lwowskie) হলো স্নেহমিশ্রিত একটি শব্দ যা পোলিশ শিশু সৈন্যদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় যারা পূর্ব গ্যালিসিয়ায়, পোলিশ-ইউক্রেনীয় যুদ্ধের সময় (১৯১৮-১৯১৯) লুও (ইউক্রেনীয়: L'viv) শহরের জন্য যুদ্ধ করেছিল। []

প্রেক্ষাপট

[সম্পাদনা]

বর্তমানে ইউক্রেনীয় ভাষায় লভিভ (পোলিশ: লভুভ) নামে পরিচিত শহরটি অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরির ভাঙনের আগে লেমবের্গ নামে পরিচিত ছিল এবং এটি সম্রাট কার্লের গ্যালিসিয়া ও লোডোমেরিয়া রাজ্যের রাজধানী ছিল। সমগ্র রাজ্যে পোলরা ছিল জাতিগতভাবে প্রধানগোষ্ঠী, তবে পূর্ব গ্যালিসিয়ায় ইউক্রেনীয়রাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল (৬১%), যেখানে পোলরা ছিল একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যালঘুশ্রেণি (২৭%) এবং এরা ইহুদিদের সঙ্গে মিলিতভাবে শহরগুলিতে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল।[] ১৯১০ সালের অস্ট্রিয়ান আদমশুমারি অনুযায়ী, লেমবের্গ শহরের জনসংখ্যার ৫১% ছিল রোমান ক্যাথলিক, ২৮% ইহুদি এবং ১৯% ইউক্রেনীয় গ্রিক ক্যাথলিক; শহরের জনসংখ্যার ৮৬% পোলিশ ভাষায় কথা বলত এবং ১১% ইউক্রেনীয় ভাষায়।[] হ্যাবসবার্গ রাজতন্ত্রের শেষ দিনগুলোতে, ১৯১৮ সালের ১ নভেম্বর, অস্ট্রিয়ান সেনাবাহিনীর ইউনিটভুক্ত ইউক্রেনীয় সৈন্যরা লেমবের্গের সরকারি ভবন ও সামরিক গুদাম দখল করে, সারা শহরে ইউক্রেনীয় পতাকা উত্তোলন করে এবং একটি নতুন ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রের জন্ম ঘোষণা করে। ইউক্রেনীয় সংখ্যালঘু এই ঘোষণাকে উৎসাহের সঙ্গে সমর্থন করলেও, শহরের ইহুদি সংখ্যালঘু এ বিষয়ে অধিকাংশই নিরপেক্ষ থাকে এবং পোলিশ সংখ্যাগরিষ্ঠরা নিজেদের ইউক্রেনীয় শাসনের অধীনে আবিষ্কার করে হতবাক হয়ে যায়।[] এই সামরিক বিপ্লবের প্রতিক্রিয়ায় পোলিশ সংখ্যাগরিষ্ঠরা সারা শহরজুড়ে বিদ্রোহে ফেটে পড়ে। মাত্র ২০০ জন পোলিশ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ও স্কাউট শহরের পশ্চিম প্রান্তের একটি স্কুলে প্রতিরোধের একটি ছোট ঘাঁটি গড়ে তোলে এবং মাত্র ৬৪টি সেকেলে রাইফেল নিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞ ইউক্রেনীয় সৈন্যদের পরাজিত করতে সক্ষম হয়। প্রাথমিক সংঘর্ষের পর প্রতিরক্ষাকারীদের সঙ্গে শত শত স্বেচ্ছাসেবক যোগ দেয়, যাদের বেশিরভাগই ছিল বয় স্কাউট, ছাত্র ও তরুণ। লড়াইয়ের প্রথম দিনেই এক হাজারেরও বেশি মানুষ পোলিশ বাহিনীতে যোগ দেয়।

বর্ণনা

[সম্পাদনা]

তাদের মধ্যে অনেক তরুণ স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন, যারা পরে লুও ঈগলেটস নামে পরিচিত হন। শুরুতে এই শব্দটি কেবল তাদের জন্য ব্যবহৃত হতো, যারা ১৯১৮ সালের ১ থেকে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত শহরের ভেতরে সংঘটিত যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে ১৯১৮ সালের ২৩ নভেম্বর থেকে ১৯১৯ সালের ২২ মে পর্যন্ত ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর অবরোধের সময় লড়াই করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শব্দটির প্রয়োগের পরিধি বিস্তৃত হয়, এবং বর্তমানে এটি পোলিশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ ও পোলিশ–বলশেভিক যুদ্ধে পোল্যান্ডের পক্ষে পূর্ব গালিসিয়া অঞ্চলে লড়াই করা সব তরুণ সৈনিকের জন্য ব্যবহৃত হয়। লভিভের তরুণ পোলিশ নাগরিকদের পাশাপাশি, প্রজেমিশ্ল শহরের জন্য পোলিশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদেরও প্রায়ই প্রজেমিশ্ল ঈগলেটস (প্রজেমিস্কি অরলেটা, অর্থাৎ “প্রজেমিশ্ল ঈগলেটস”) নামে উল্লেখ করা হয়। []

কবরস্থান

[সম্পাদনা]
লুওয়ের রক্ষকদের কবরস্থান

পোলিশ–ইউক্রেনীয় সংঘাতের পর লভিভ ঈগলেটসদের, লিচাকিভ কবরস্থানের একটি অংশ, লভিভের রক্ষকদের কবরস্থানে (পোলিশ জনপ্রিয় নাম: সিমেন্টার্জ অরল্যাট লওস্কিচ) সমাধিস্থ করা হয়। এই কবরস্থানে কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয় ধরনের সৈনিকদের দেহাবশেষ ছিল, যার মধ্যে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগত বিদেশি স্বেচ্ছাসেবকরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। লভিভের রক্ষকদের কবরস্থানটির নকশা করেন লভিভ স্থাপত্য ইনস্টিটিউটের ছাত্র রুডলফ ইন্দ্রুখ, যিনি নিজেও একজন ঈগলেট ছিলেন। সেখানে সমাহিত উল্লেখযোগ্য ঈগলেটদের মধ্যে ছিলেন ১৪ বছর বয়সি ইয়েরজি বিটশান,শহরের রক্ষকদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ এবং যার নাম পোল্যান্ডের আন্তঃযুদ্ধকালীন সময়ে একটি প্রতীকে পরিণত হয়।

ঈগলেটদের এই সমাধিক্ষেত্রেই শায়িত আছেন ছয় বছর বয়সি অসভাল্ড আনিসিম্মো, যিনি তার বাবা মিখাউয়ের সঙ্গে ইউক্রেনীয় মিলিশিয়াদের হাতে নিহত হন। []

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব গালিসিয়া দখল করার পর অর্থাৎ পোল্যান্ডে সোভিয়েত আক্রমণ এবং প্রদেশটি থেকে জাতিগত পোলিশদের বহিষ্কারের পর—১৯৭১ সালে কবরগুলো ধ্বংস করা হয় এবং লভিভের রক্ষকদের কবরস্থানটিকে প্রথমে পৌর বর্জ্য ফেলার স্থান, পরে ট্রাক ডিপোতে পরিণত করা হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও স্বাধীন ইউক্রেন রাষ্ট্র গঠনের পর, স্থানীয় জাতীয়তাবাদীদের বাধা সত্ত্বেও কবরস্থানটি পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়। তবে ২০০৪ সালের ইউক্রেনীয় অরেঞ্জ বিপ্লবে পোল্যান্ডের সমর্থন স্থানীয় বিরোধিতাকে অনেকটাই দুর্বল করে দেয়, এবং ২০০৫ সালের ২৪ জুন পোলিশ–ইউক্রেনীয় যৌথ অনুষ্ঠানে কবরস্থানটি আনুষ্ঠানিকভাবে পুনরায় খুলে দেওয়া হয়। শেষ জীবিত লভিভ ঈগলেট, মেজর আলেক্সান্দার সালাতস্কি (জন্ম ১২ মে ১৯০৪), ২০০৮ সালের ৫ এপ্রিল টিখি শহরে মৃত্যুবরণ করেন।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Kuta, Stephen Robert (২০১৯)। Semper Fidelis, The Lwów Eaglets। Loma Publishing। আইএসবিএন ৯৭৮১৯১৬৪৭৬২৭১
  2. Timothy Snyder. (2003). The Reconstruction of Nations. New Haven: Yale University Press. pg. 123
  3. New International Encyclopedia, Volume 13. 1915. Lemberg. pg. 760
  4. Orest Subtelny, Ukraine: a history, pp. 367–368, University of Toronto Press, 2000, আইএসবিএন ০-৮০২০-৮৩৯০-০
  5. "Obrona Przemyśla w 1918 roku" (পোলিশ ভাষায়)। ২ সেপ্টেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২১ মে ২০১৪
  6. (পোলীয় ভাষায়) M. Gałęzowski, Na wzór Orląt lwowskich

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]